Go to content Go to menu
 


চণ্ডীমঙ্গল কাব‍্যধারা চরিত্র সৃষ্টি

2021-01-31
বাঙালি গেরস্থ ঘর জামাই চেনেনা, এমন নয়। গৌরী জানে তার বর গরীব, তাই বলে মায়ের দেওয়া খোঁটা সে হজম করে না, জবাব দেয়---রান্ধিয়া বাড়িয় মাতা কত দেহ খোঁটা / আজি হৈতে তোমার দুয়ারে দিনু কাঁটা। শিবের ঘরকন্না বর্ণনায় কবি মজার মজার বিষয়ের অবতারণা করেন। সাধারণ বাঙালী ভোজনরসিক। হর-গৌরীর কলহারম্ভ অংশে সেকালের বাঙ্গালীর রসনাতৃপ্তির জন‍্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর একটি লম্বা তালিকা বর্ণিত হয়েছে। শিবের ঘর সংসারে কিসের সুখ, গৌরীর খেদ শোনা যায়---
দারুণ দৈবের ফলে হইনু দুঃখিনী।
ভিক্ষার তাতে দারুণ বিধি করিল গৃহিণী।।

      ব‍্যাধ কালকেতুর অত‍্যাচারে পশুদের নাভিশ্বাস দেখা দিয়েছে। 'পশুগনের ক্রন্দন' অংশে তাদের মনোব‍্যথা এবং অত‍্যাচারিত হওয়ার কাহিনীতে সমাজচিত্রের আভাস দেখেছেন অনেকে। আত্ম-বিবরণীর রঙ্গ দেখার জন‍্যই এর তাৎপর্য বেড়ে গিয়েছে। পশুকুলের ক্রন্দনে নির্যাতিত মানবাত্মার আর্তনাদ ধ্বনিত বলে মনে করা হয়। কোন সন্দেহ নেই যে বাস্তব সমাজে দুর্বলের প্রতি সবলের অত‍্যাচার চিরকালীন সত‍্য। কিন্তু বনের পশুর অভয়ার নিকট তাদের জীবনের যে করুণ কাহিণী বর্ণনা করেছে তাতে কবির জীবনের অভিজ্ঞতা ছাপাপাত ঘটিয়েছে। সামাজিক কারুণ‍্যের বর্ণনা হিসাবে তা অনবদ‍্য। কিন্তু ফুল্লরার বারোমাসের দুঃখের কাহিনী যদি তার নিজের জীবনের পক্ষে সর্বাংশে সত‍্য নাও হয় তবুও দরিদ্র ব‍্যাধ পরিবারের জীবনে সাধারণ সত‍্যরূপে অনস্বীকার্য। কালকেতুর প্রথম জীবন সম্পর্কে ভাঁডু দত্ত যেকথা বলেছে তাতেও মিথ‍্যার খাদ নেই। সেই রকম ফুল্লরার মুখে যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে তার সবটাই সাধারণ ব‍্যাধ জীবনের সত‍্য। তারা সারা বছর ভাঙ্গা কুঁড়ে ঘরে রোদ, ঝড়, বৃষ্টি, শীত সহ‍্য করে কাল কাটায়। পেটে অন্ন হেঁটে বস্ত্র মেলে না। কঠোর পরিশ্রম করে, বনে বনে শিকার ও ফলমূলের সন্ধান করে যা জোটে তার মূল‍্য দেয় না সমাজ। বরং বহু ভদ্রবেশী, বানিয়া মহাজন ছলে বলে তাদের ঠকিয়ে নিয়ে সকলের ভান্ডার বৃদ্ধি করে। সবাই দরিদ্র তাই প্রয়োজনে একে অপরকে কোন সাহায‍্য করতে পারে না। নানা নিয়ম আচার-বিচার ও সংস্কারের জালে পড়ে বিধি নিষেধের পণ‍্য শ্রমের সঠিক ও সময়মত ব‍্যবহারও করা যায় না। সমাজের চাষী গৃহস্থেরা ফসলের সাথে সুখের মুখ দেখে, কিন্তু ব‍্যাধের সংসারে সেখানেও তো পথরুদ্ধ।
        সমাজে নারীর স্থান খুব উচ্চে ছিল বলে মনে হয় না। ঠক, প্রবঞ্চক ও ফড়েতে সমাজ ভরে ছিল। তারা নারীর যথার্থ মর্যাদা মর্যাদা দেবে কি করে। সামাজিক নিয়মেই নারী সমাজে অবহেলিতা। বিবাহের পর পতির ধর্ম মেনে চলাই ছিল ভবিতব‍্য। কিন্তু নারীগণে পতিনিন্দা পাঠ করলে বিপরীত মনে হয়। তবে মানসিক ও সামাজিক অবরোধের ফলে জাত প্রতিক্রিয়া বলে ধরে নেওয়াও চলে। তাদের সংসারে সতীনের অভাব হত না। কারণ বহুবিবাহ নিষিদ্ধ ছিল না। সতীনের সংসারে শান্তি ছিল না। অপরিচিতা সুন্দরী রমণীর কাছে ফুল্লরার দুঃখের ফিরিস্তি কিছুটা অতিরঞ্জিত হওয়ার এত্ত একটা কারণ। সে দুঃখের মধ‍্যে স্বামীপ্রেমের পূর্ণ অধিকারে অন‍্যের ভাগ বসুক তা চায় নি। তাছাড়া শাশুড়ী ননদী সমাবৃত পরিবারে মেয়েদের যন্ত্রণার অন্ত ছিল না। মেয়েরাও রক্ষণশীল ও অতি সতর্কতার পক্ষপাতী ছিল।
চরিত্র সৃষ্টি ঃ
        মঙ্গলকাব‍্য রীতিমাফিক রচিত হত। একটা ছকে বাঁধা কাহিনী অবলম্বন করে কাব‍্য লিখতে গিয়ে কবিরা খুব একটা স্বাধীনতা ভোগ করতে পেতেন না, অনেকেই তা চাইতেন বলেও মনে হয় না। সুতরাং কাব‍্যবর্ণনায় দেব-দেবীর মাহাত্ম তুলে ধরার দিকে সম্পূর্ণ মনোযোগ থাকত। চরিত্রগুলি গতানুগতিক এবং কাহিনী ধারার সঙ্গে অতিপরিচিত। তাই বিশেষ কোন কবির পক্ষে কাহিনী ও চরিত্রের ধারাবাঁধা পথেই, যে মালমশলা পেয়েছেন তা দিয়েই অসাধারণ সৃষ্টি প্রতিভার প্রমান দিয়েছেন। মধ‍্যযুগের কোন কাব‍্যেই প্রকৃত অর্থে মানব চরিত্রের যথার্থ রূপায়ণ ঘটেনি। মুকুন্দরাম তাঁর অর্জিত অভিজ্ঞতা, মানব চরিত্র অধ‍্যয়ন-এই সব গুণের সঙ্গে বাস্তববোধ ও কল্পনা শক্তির সুন্দর সমন্বয় সাধন করে কয়েকটি চরিত্র রচনায় অসামান‍্য সাফল‍্যের পরিচয় দিয়েছেন।
        দেব-দেবীর চরিত্রে মানবিক বৈশিষ্টের আরোপ মঙ্গলকাব‍্যে মাঝে মাঝে পাওয়া যায়। কিন্তু দেব-দেবীর মহিমাও মাহাত্মা সম্পর্কে মনোভাব পূর্বনির্ধারিত হওয়ায় এবং অলৌকিক শক্তির প্রকাশ ও প্রত‍্যাশার সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি চরিত্র হয়ে উঠা সম্ভব হয়নি। অভয়ামঙ্গলের প্রথম অংশ কালকেতু উপাখ‍্যানের নায়ক নায়িকা ও অন‍্যান‍্য কয়েকটি চরিত্র রচনাতেই মুকুন্দরামের কৃতিত্ব প্রমানিত। চণ্ডীমঙ্গলের প্রথম উপাখ‍্যানের নায়ক-নায়িকা কালকেতু-ফুল্লরা অভিজাত বা সম্পন্ন পরিবারের সন্তান নয়। তারা সমাজে নিম্নবর্ণের

বনচারী ব‍্যাধবংশের সন্তান। কিন্তু তারা শাপভ্রষ্ট দেব-দেবী। অবশ‍্য কাব‍্যে তাদের সেই ভূমিকা মাঝে মাঝে স্মরণ করিয়ে না দিলে কারও খেয়াল থাকে না। কিন্তু তবুও কালকেতুর চরিত্র গতানুগতিক। সে কবির হাতে অভিপ্রায়সিদ্ধির উপায় রূপেই বর্ণিত। সে যেন কোন পূর্বে স্থির করা পথেই আদ‍্যন্ত হেঁটে গেছে। মুকুন্দরামের চরিত্র সৃষ্টির প্রকৃত কৃতিত্ব ফুটে উঠেছে ফুল্লরা, মুরারিশীল ও ভাঁডু দত্তের চরিত্র রূপায়ণের মধ‍্য দিয়ে। এই তিনটি প্রধানতঃ মুকুন্দরামের চরিত্র সৃষ্টি ক্ষমতার অভিজ্ঞান হয়ে রয়েছে। সমালোচক শ্রীকুমার বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়ের মতে এই চরিত্র সৃষ্টির দক্ষতা আধুনিক উপন‍্যাসিরে সঙ্গে তুলনীয়।
        ফুল্লরার চরিত্র অনেকটা সঙ্গত এবং স্বাভাবিক। তার চরিত্রের সামগ্রিক রূপটি ছদ্মবেশী দেবীর কাছে তার বারোমাসের সুখদুঃখের কাহিনী বর্ণনার মধ‍্যেই প্রধানভাবে পাই। বালিকা ফুল্লরার বিবাহ থেকে আমরা কাব‍্যে তার সঙ্গে পরিচিত হই। তার রূপের কোন গতানুগতিক বর্ণনা নেই। তবে সব রকম আচার পালনের ফিরিস্তির মধ‍্যে কোথাও ফুল্লরা নেই। দেবীর পদে ভক্তিনত শ্রোতৃসমাজ তেমন কিছু কামনাও করেনি। বিবাহের পর ফুল্লরা যথারীতি সুখে সংসার পাতে। হাটে গিয়ে পসরা বিক্রয় করে, কড়ি এনে শাশুড়ীকে দেয়। তারপর শাশুড়ীর নির্দেশমত নানা খাদ‍্য রন্ধন করে। কবি গানে ব‍্যক্ত করেন---
মৎস‍্য মাংস আদি করি         পরশে ফুল্লরানারী
সুখে ভুজ্ঞে কিরাত নন্দন

কিন্তু ইতিমধ‍্যে কালকেতুর বিক্রমে আতঙ্কিত পশুদের রক্ষার জন‍্য দেবী গোধিকা বেশে কালকেতুর কুটিতে আনীত হন। সেখানে সুন্দরী নারীর বেশে দোর আগলে দাঁড়ান। ফুল্লরা তাঁকে দেখে ভয় পায়। ফুল্লরা তাঁকে দেখে ভয় পায়। তার মনে সংশয় দেখা দেয় যে এই সুন্দরী যুবতী পাছে তার সতীনের পদ দখল করে। তাকে নিবৃত করার জন‍্য কালকেতুর সংসারে দুঃখের বিবরণ দেওয়ার প্রয়াস পায়।
        ফুল্লরা তার স্বামী ও সংসারকে ভালবাসে। তাই তাতে কেউ ভাগ বসাক এ তার কাম‍্য নয়। সেজন‍্য অত‍্যন্ত চাতুর্যের সঙ্গে দুঃখের বারোমাসা বর্ণনা করে। তার জীবন যে দুর্বিষহ দুঃখের ভারে ক্লান্ত, সেটাই তুলে ধরার চেষ্টা করে। এই বর্ণনায় ফুল্লরার চরিত্রের একটি উজ্জ্বল দিক উদ্ভাসিত হয়েছে। সে প্রকৃতপক্ষে তার স্বামী ও সংসারের অপযশ ঘোষণা করেনি। কবি বলেছেন "হৃদেবিষ মুখে মধু জিজ্ঞাসে ফুল্লরা।" সংসারে সতীনের আগমনে যে অশান্তির সম্ভাবনা তাকে অঙ্কুরে নির্মূল করার জন‍্য সে কিছুটা ছলনার আশ্রয় নিয়েছে। সংসারে তার দুঃখ নেই, এমন হয়তো নয়। কিন্তু সে দুঃখ জীবনে অচ্ছেদ‍্য নির্মূল করার জন‍্য সে কিছুটা ছলনর আশ্রয় নিয়েছে। সংসারে তার দুঃখ নেই, এমন হয়তো নয়। কিন্তু সে দুঃখ তার জীবনে অচ্ছেদ‍্য বন্ধনসূত্র। তার থেকে সে পরিত্রাণ চায় না। কিন্তু স্বামীর প্রেম ও সংসারে নিঃসপত্নী অধিকার কোন মূল‍্যে বিকিয়ে দেওয়ার জন‍্য সে প্রস্তুত নয়। দেবীকে তার কুটিরদ্বার ত‍্যাগ করে যাওয়ার নির্বন্ধ ত‍্যাগ করে যাওয়ার নির্বন্ধ নিস্ফল হওয়াতে অতিব‍্যগ্রে কালকেতুর নিকটে গিয়ে সবিশেষ জানাই। তার অবস্থা-----
বিষাদ ভাবিয়া কাঁদে ফুল্লরা রূপসী।
নয়নের কজ্জলে মলিন মুখশশী।।

কিন্তু ফুল্লরা কোন অবস্থাতেই চতুরা নন। সে দেবীকে যা বলেছে তা তার আত্মরক্ষার স্বাভাবিক প্রেরণার স্বতোৎসারিত। তার নিজের নির্বুদ্ধিতার জন‍্য কলিঙ্গরাজের কোটালের হাতে কালকেতু বন্দী হয়েছে। যখন সে বীরের মত জয় করে এসেছে, তার পরে ফুল্লরার বুদ্ধি বসে তাকে ধান‍্যগোলায় লুকিয়ে থাকতে হয়েছে ধরাপড়ার কারণও ভাডু দত্তের কাপট‍্যে কালকেতুর সন্ধান জানিয়ে দেওয়া। এসবই ফুল্লরাকে একান্ত বাঙালী গৃহবধুর সমতলে নামিয়ে এনেছে। কালকেতু ধরা পড়ার পর কোটালের কাছে কালকেতুর কেবল প্রাণে বাঁচিয়ে রাখার কাতর আবেদন তার মর্যাদাবোধের পরিচায়ক নয়। এ সবই প্রথার অনুগত‍্য। তার চরিত্রের উল্লেখনীয়, তা তার বারোমাস‍্যা বর্ণনার স্বাতন্ত‍্যে মধ‍্যেই নিহিত।
        মুরারিশীলের চরিত্র কাব‍্যের অন‍্যতম আকর্ষণীয় দিক। একে কেন্দ্র করে তৎকালিন বানিয়া সমাজের ধুর্ততার জীবন্ত ছবি ধরা দিয়েছে। মধ‍্যযুগের বাংলা সাহিত‍্যে চরিত্র রচনায় মুকুন্দরাম কেন নমস‍্য তাঁর দৃষ্টান্ত মুরারি শীল এবং ভাডু দত্ত। দুটি অপ্রধান চরিত্র লেখকের জীবন অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি করে লেখনীর সামান‍্য কয়েকটি আঁচড়ে পূর্ণ চেহারায় ধরা দিয়েছে। মুরারি শীলের কাছে কালকেতুর চণ্ডীর দেওয়া অঙ্গুরীয় ভাঙিয়ে কড়ি সংগ্রহ করতে গেলে তার আচরণ থেকে আমরা তাকে এক লহমায় চিনে নিতে পারি। পাছে মাংসের দরুণ প্রপ‍্য দেন বুড়ি কালকেতু চেয়ে বসে সে জন‍্য বান‍্যানী সামণে এসে জানায় বেনে বাড়িতে নেই। এ রকম ছলনা ও

মিথ‍্যাচারে তারা সপরিবারে অভ‍্যস্ত। কিন্তু যখন শোনে মূল‍্যবান অঙ্গুরী বিক্রয় কালকেতুর উদ্দেশ‍্য তখন আর লুকায়ে থাকা সম্ভব হয়নি। লাভের আশায় বেনে খিড়কী পথ দিয়ে বাহিরে যাওয়ার সমাজে এইমাত্র বাড়ি ফেরার ভান করে কালকেতুর সামনে উপস্থিত হয়। তারপর তার সঙ্গে যে বাক চাতুরির জাল বিস্তার করে তাতে বনিয়ার স্বভাবসিদ্ধ ধূর্ততা কবি কি অক্লেশে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা বোঝা যায়। বানিয়া মুহূর্ত্তের মধ‍্যে আপন মতলব হাসিলের জন‍্য মনোভাব বজায় রেখে বাহিরের প্রকাশে তার পরিবর্ত্তন ঘটায়। অঙ্গ রীটি নামমাত্র মূল‍্যে হস্তগত করার জন‍্য সেটিকে বেঙ্গাপিতল রূপে ঘোষণা করে দেয় কালকেতুর মোট পাওনা অষ্টপণ আড়াই বুড়ি। কালকেতু বোকা হলেও দেবীর দেওয়া অঙ্গুরীর এই সামান‍্য দাম শুনে ছলনা ধরতে পারে। সে অন‍্যত্র যেতে চাইলে মুরারী লঘু পরিহাসের সঙ্গে পরিবেশকে হালকা করে তোলার জন‍্য বলে এতক্ষণ পরিহাস করিলাম তোমারে। তারপর মোটামুটি বিশ্বাসযোগ‍্য মূল‍্য দিয়ে অঙ্গুরী গ্রহণ করে। বণিকশহর কালকেতুর কথোপকথন অতি সংক্ষিপ্ত প্রসঙ্গ -কবি তার মধ‍্যেই লোক চরিত্র জ্ঞানের বিরল দক্ষতা অক্লেশে প্রমাণ করেছেন। তুলনায় ভাঁডু দত্তের প্রসঙ্গ বিস্তৃততর স্থান জুড়ে রয়েছে।
        ভাঁডু দত্তের আবির্ভাব ঘটেছে কালকেতুর গুজরাট নগর পত্তনের পর। প্রথম দর্শনে ভাঁডুর হাবভাব পাঠক ও শ্রোতাকে তার প্রতি বিমুখ করে তোলে। কালকেতুকে খুড়া সম্বোধন করে তার দাবির তালিকা দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে জাহির করার সুযোগ নেয়। প্রথম থেকেই কালকেতুর বিশ্বাস উৎপাদনের জন‍্য তার কাছে নানা কাজের প্রস্তাব দেয় এবং তার অন্তরালে সাধারণ প্রজার উপর প্রভাব বিস্তারের উদ‍্যোগ নেয়। অচিরেই তার গোঁড়া মনোভাব, পরকে ঠকিয়ে ধনবৃদ্ধি এবং নির্বিচার লালসাতৃপ্তির নির্লজ্জতা প্রকাশ হয়ে পড়ে। মুরারি শীলের সঙ্গে ভাঁডু দত্তের প্রধান পার্থক‍্য হল - মুরারি শীল পেশাগত অভ‍্যাস থেকে অধিকলাভের জন‍্য চাতুর্যের আশ্রয় নেয়, তুলনায় ভাঁডু দত্তের চরিত্র উলঙ্গ আত্মাদর ও পর - প্রবঞ্চনার কোন সাফাই দেওয়ার উপাই নেই। তার মানে ঈর্ষা ও লোভ থেকে কালকেতুকে পরামর্শ দেয় এমন ভাবে যাতে আখেরে নিজের স্বার্থসিদ্ধি হয়। সে বলে 'দেহ মোরে সর্বভার' সে তাহলে নগরে প্রজা বসানোর ব‍্যবস্থা করবে, সে সবিস্তারে কালকেতুকে নানান পরামর্শ দেয়। এইসব পরামর্শ প্রজাদের মধ‍্যে স্পষ্টতই বিভেদ নগরে প্রজা বসানোর ব‍্যবস্থা করবে, সে সবিস্তারে কালকেতুকে নানান পরামর্শ দেয়। এইসব পরামর্শ প্রজাদের মধ‍্যে স্পষ্টতই বিভেদ ও বিক্ষোভ সৃষ্টি করতে পারে, যেমন ---
       ১.         যখন পাকি ব খন্দ / পাতিবে বিষম দ্বন্দ্ব / দরিদ্রের ধান‍্যে দিবে নাগা।
        ২.        বুলান মন্ডলকে দেশমুখ করার অযৌক্তিকতা নিয়ে -
        নফরের হতে খান্ডা / বহুড়ীর হাতে ভান্ডা / পরিণামে দেহ অতি দুখ। তারপর হাটবসতি ইত‍্যাদি সর্বত্র ভাঁডুর অন‍্যায় জুলুম শুরু হয়। সে প্রজা ও হাটুরিয়াদের নানা ভাবে ঠকিয়ে কড়ি ও দ্রব‍্য বিনামূল‍্যে সংগ্রহে মনোযোগ দেয়। লোকে তার নামে অভিযোগ করে ---'যত দ্রব‍্য লয় নাহি দেয় বাড়ি'। টাকাসিকা ধুতি এবং দ্রব‍্য লুটতো আছেই, তার বেটা অত‍্যাচারে সীমাও লঙঘন করে যায়। সে প্রজাদের বাড়ির মেয়ে বৌদের সম্মানহানিতে পিছপা হয় না। কালকেতু সম্পর্কে তার মনোভাব নীচ জাতি ব‍্যাধ, তার ধনলাভ ঘটেছে --তা ঠকিয়ে যতটা পারা যায় আত্মসাৎ করায় কোন অধর্মই নেই। তাই কালকেতু যখন তার শাস্তি দানের ব‍্যবস্থা নিতে যায়, তখন অম্লান বদনে বলে ---'তিন গোটা শর ছিল এক গোটা বাঁশ / হাটে হাটে ফুল্লরাপসারা দিত মাস'। তুমি ধনবন্ত এবে আমি সে কাঙাল।। / তারপর সে স্পর্ধা ভরে ঘোষণা করে ---'পুনবর্বার হাটে মাংস বেচিবে ফুল্লরা'। এইভাবে আপাত নিরীহ একটি নীচমনা লোভী প্রবঞ্চকের শয়তানের মূর্ত্তিমান স্বরূপে উত্তরণ অভাবিত হলেও অসঙ্গ ত নয়। সে তার অভিসন্ধি চরিতার্থ করতে না পেরে অন‍্যায় আচরণের জন‍্য ন‍্যায‍্য শাস্তি পেয়ে কালকেতুর সর্বনাশ সাধনের জন‍্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। সে কলিঙ্গরাজের সমক্ষে কালকেতু সম্বন্ধে সত‍্যমিথ‍্যা মিশিয়ে এমন সব মন্ত্রণা দেয়, যাতে রাজার মনে হয় যে কালকেতু কলিঙ্গ রাজাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার স্পর্ধা দেখাচ্ছে। একদিন লোভের বেশে কলিঙ্গ ত‍্যাগ করতে ভাঁডুর মনে দ্বিধা জাগেনি। আজ ব‍্যর্থ মনোরথ হয়ে বাজার কাছে নিষ্ঠার শপথ নিচ্ছে তেমনই দ্বিধাহীন চিত্তে। কালকেতুকে ধরিয়ে দেওয়ার জন‍্য তার সক্রিয় ভূমিকার কথা বেমালুম হজম করে আবার কালকেতুর অনুগ্রহ প্রার্থী হতে তার বাধে না----
                তুমি খুড়া হৈলে বন্দী / অনুক্ষণ আমি কান্দি / বহু তোমার নাহি খায় ভাত।
                   দেখিয়া তোমার মুখ / পাররিলুঁ সব দুখ / দশদিক হইল অবদাত।।
অবশেষে প্রত‍্যাশা অনুযায়ী ভাঁডু দত্তের যে শাস্তি বিহিত হয়েছে, তার চরিত্র মনে রেখে সেজন‍্য কারও মনে একফোঁটা সহানুভূতি জাগে নি। আমাদের মনে হয় ভাঁড়ু দত্তের মত চরিত্র আমাদের সমাজে সব যুগেই দেখা গিয়েছে। এদের চরিত্রে এটা প্রধান দিক তা