Go to content Go to menu
 


চণ্ডীমঙ্গল ঃ সংজ্ঞার্থ ও

2021-01-22
মঙ্গলকাব‍্যের গঠন বৈশিষ্ট‍্য ঃ
    দেবদেবীর মাহাত্ম‍্য বর্ণনার জন‍্য আখ‍্যান কাব‍্যরূপে মঙ্গলকাব‍্যের উদ্ভব। বাংলা সাহিত‍্যে মধ‍্যযুগের কাব‍্য ধারার বৃহত্তর অংশ অধিকার করে আছে মঙ্গলকাব‍্যে। ভয় ও ভক্তির মিলিতভাবের রসায়নে পাপ নিবারণ করে পুণ‍্য অর্জনের উদ্দেশ‍্যে মঙ্গলকাব‍্যে রচিত হত। এই ধারার এমন নামকরণের কারণ অনুসন্ধান করলে একাধিক যুক্তির সম্মুখীন হতে হয়। জয়দেবের কাব‍্যে 'মঙ্গল' শব্দটির প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়।
     বাংলা সাহিত‍্যে মধ‍্যযুগের সূত্রপাতে অর্থাৎ দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতাব্দীতে গ্রামের পূজা অনুষ্ঠানে মনসা, চণ্ডী, ধর্ম ইত‍্যাদি দেবদেবীর কাহিনীভিত্তিক গেয় আখ‍্যান প্রচলিত ছিল। এগুলি ব্রতকথা বা পাঁচালীর মতই আসরে গান করা হত। নানারকম, ঘরোয়া উৎসবে এসব গানের আসর বসত। ফসলের জন‍্য, জন্ম ও বিবাহ উপলক্ষ‍্যে বা দেবপূজায় গৃহস্থের মঙ্গল মুখ‍্য উদ্দেশ‍্য ছিল। তাই তদুপলক্ষ‍্যে যে গান তাকে 'মঙ্গল' বলা অস্বাভাবিক নয়। দ্রাবিড় জাতির মধ‍্যে মঙ্গল শব্দটি বিবাহ অর্থ বোঝায়। সুতরাং দেবদেবীর বিবাহ অর্থে মঙ্গল কাব‍্য নাম আসা বিচিত্র নয়। যেসব দেবদেবী এই ধরনের কাব‍্যে গৌরবান্বিত হন তাঁরা মূলতঃ অমঙ্গলের প্রতীক। তাই তাঁদের সন্তোষ বিধান করে অমঙ্গলকে প্রশমিত করার উদ্দেশ‍্যে যে কাব‍্য রচিত হয়ে আসছে তাকে মঙ্গল কাব‍্য বলা যায়। বাংলাদেশে বিবাহ অনুষ্ঠানে মেয়েলী আচারের একটি প্রধান অংশ হল মঙ্গলগান। প্রাচীন কাল থেকে মেয়েলী অনুষ্ঠানে মঙ্গল কথাটির চল অশোকের অনুশাসনেও পাওয়া যায়। প্রকৃত সাহিত‍্যেও অনুরূপ অর্থেই মঙ্গল শব্দের ব‍্যবহার পাওয়া যায়। প্রাচীন বাংলার বিবাহবিষয়ক গান মঙ্গল গাওয়া হত। এই মঙ্গল রাগ থেকে মঙ্গলকাব‍্য আসতে পারে। মঙ্গলবারে গান শুরু ও সমাপ্তি এবং মঙ্গল নামক অসুর বধের কাহিনী স্থান পাওয়ার জন‍্য কাব‍্যের নাম মঙ্গলকাব‍্য পরবর্তীকালের সংযোজন বলে নেওয়াই উচিত।
     মঙ্গলকাব‍্যে কোন দেব বা দেবীর মাহাত্ম‍্য বর্ণনা করা হয়। সুতরাং কাব‍্যের গঠনে ভিত্তিরূপে ধর্মীয় মতবাদ বা পুরান প্রসিদ্ধির ভূমিকা থাকাই স্বাভাবিক। অন্ততঃ লৌকিক কাহিনী অবলম্বনে কাব‍্যে গ্রথিত হলেও তার একটি পৌরাণিক যোগসূত্র স্থাপনের চেষ্টা করা হয়। স্বর্গের দেব দেবীর মর্ত‍্যে পূজা পাওয়ার ব‍্যাকুলতাই মর্ত‍্যজীবনের সঙ্গে স্বর্গের দেবদেবীর মর্ত‍্যে আগমনের উপলক্ষ‍্যে রচনা করে। তাই কাব‍্য দেহ স্বর্গ ও মর্ত‍্যের কাহিনীকে এক স্রোতে মিলিত করার প্রয়াসে হয়। সেজন‍্য যে কোন মঙ্গল কাব‍্যের তিনটি অংশ বা খণ্ড থাকে---বন্দনা, দেবখণ্ড এবং নরখণ্ড। বন্দনা অংশে কাব‍্যে ও পুরান কথিত হিন্দু দেব দেবীর কাছে বন্দনা থাকে। এই বন্দনার দেব দেবীরা গণেষ, শিব, বিষ্ণু ইত‍্যাদি পঞ্চদেবতা তারপর গ্রন্থ‍্যেৎপত্তির কারণ ও কবির আত্মপরিচয়, সৃষ্টি তত্ত্বের বিবরণ। সৃষ্টিতত্ত্বের পর দেবখণ্ডে মর্ত‍্যে দেব-দেবীর পূজা উপলক্ষ‍্য রচনা করার জন‍্য স্বর্গখণ্ডের বিবরণ। তারপরই আসে কাব‍্যের মূল অংশ তথা নরখণ্ড। এই নরখণ্ডে শাপভ্রষ্টে দেবদেবীর অনুচর বা সন্তান সন্ততিরা নরজন্ম লাভ করে উদ্দিষ্ট দেব দেবীর পূজাপ্রচারে আত্মনিয়োগ করে। আখ‍্যানকাব‍্যের যেটুকু আকর্ষণ তা একে কেন্দ্র করেই। নরখণ্ড এক বা একাধিক কাহিনী থাকা সম্ভব। দেব দেবীর পূজা প্রচার করে শাপগ্রস্তদের মুক্তি ঘটলে তবে গ্রন্থ সমাপ্তি হয়। একবার মঙ্গল কাব‍্য রচিত হওয়ার পর বা লৌকিক ধারা থেকে কাহিনীর উপাদান নিয়ে কাব‍্যগ্রথিত হলে পরস্পরাক্রমে কাহিনী ও রচনারীতি একইভাবে পুনরাবৃত্ত হতে থাকে বিভিন্ন কবির হাতে। সেজন‍্য কাব‍্যের গঠনরীতি একঘেয়ে ভাবে অনুসরণ করে। অনেকে একে কবিদের পূচ্ছগ্রাহিতা বলেছেন। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন যে সাধারণ শ্রোতা বা পাঠক কবির কাছ থেকে কাব‍্যেরসের জন‍্য দাবি জানাত না। ধর্ম পিপাসা মেটানো এবং নিজের ও সমাজের মঙ্গল কামনায় সে

কাব‍্যের প্রতি অনুরক্ত হত। অতএব পুনরাবৃত্তি ও একঘেয়েমির কথা তারা মনেই আনত না। ফলে গঠনের এই মূল বৈশিষ্ট‍্যের উপর আরও কতকগুলি সাধারণ রীতির প্রচলন ঘটতে দেখা যায়।
     প্রথম দিকে, অর্থাৎ মঙ্গলকাব‍্য ধারার পত্তনকালে যে প্রথা বা রীতির সূত্রপাত হয় পরবর্তী কালের কবিরা নির্বিচারে তাদের অনুসরণ করেছেন। দেহ মহিমার ছায়ায় মঙ্গলকাব‍্যৈ গুলি এতবেশী আচ্ছন্ন যে মানুষ, চরিত্র অঙ্কনে তার অনুচিত প্রয়োগ মানবজীবনের স্বাভাবিক পরিচয়কে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছে। নায়ক-নায়িকা সবক্ষেত্রেই স্বর্গভ্রষ্ট দেবশিশু, কবি কখনও এ সত‍্য বিস্মৃত হন না। (২) গ্রন্থোৎপত্তির কারণ বর্ণনায় কোন নূতনত্ব বা চমৎকারিত্ব নেই। সর্বত্রই কবি দারিদ্র বা হতাশার নিমজ্জিত হলে দেব দেবী তাকে স্বপ্নে দেখা দেন এবং তার দুঃখ দারিদ্র মোচনের বিনিময়ে তাকে দিয়ে আপন মহিমার জয়গান রচনা করিয়ে নেন। কাব‍্য রচনায় উপলক্ষ‍্য স্বপ্নাদেশ, কবি কৃপালাভ করলে, তাঁর শিক্ষাদীক্ষার অভাবও বাধা হয়ে দেখা দেয় না। কবির রসনাগ্রে সরস্বতী আশ্রয় নেন। সেজন‍্য মঙ্গলগানকে বিজয় গান নামেও বর্ণনা করা হয়।
     (৩)     দেব খণ্ডের বর্ণনায় সৃষ্টি কথার ভূমিকা স্বীকার করা হয়। ধর্ম মঙ্গলকাব‍্যে এই অংশ অপরিহার্য। শিব পার্বতীর প্রসঙ্গ কবিদের অত‍্যন্ত আকর্ষণীয় বিষয়। দক্ষযজ্ঞ সতীর দেহত‍্যাগে, উমার তপস‍্যা মদনভস্ম রতিবিলাপ এবং অবশেষে হরগৌরীর মিলন বর্ণিত হয়। তবে এই অংশে শিব শিবানীর দাম্পত‍্য জীবন বা গৃহস্থলীর বর্ণনায় সে সময়কার বাঙালী চাষী পরিবারের জীবন চিত্র ছায়াপাত করে। অবশ‍্য তাও সর্বত্র একই ভাবেই প্রথায় পর্যবসিত হয়। কোন কোন কাব‍্যে দেব দেবীর মর্তে পূজালাভের ব‍্যগ্রতা দেবীমহিমার সঙ্গে সঙ্গত নয়।
     (৪)    নরখণ্ডই মঙ্গলকাব‍্যের মূল অংশ। এই অংশে বারোমাসের সুখ দুঃখের বর্ণনা বেশ উপভোগ‍্য। নায়ক নায়িকা উভয়ের ক্ষেত্রে বারোমাসিয়া চললেও নায়িকার ক্ষেত্রেই বেশী দেখা যায়। তবে এই প্রথা মঙ্গলকাব‍্যের বাইরে লোক সাহিত‍্যে পূর্বে থেকেই ছিল। সাধারণে বিশেষ আদরের বিষয় ছিল বলেই হয়তো কবিরা তাকে মঙ্গল কাব‍্যে নির্দ্ধিধায় স্থান দিয়েছেন। তাতে মঙ্গল কাব‍্যের গৌরব বেড়েছে বই কমেনি। সে সময়কার সাহিত‍্যে ধারানির্বিশেষে এ ধরনের প্রথাকে স্থান দেওয়ার দৃষ্টান্ত দেখা যায়। তাই পণ্ডিতেরা মঙ্গল কাব‍্যের জাতীয় বৈশিষ্ট‍্যের উপাদানরূপে বারোমাসকে ব‍্যাখ‍্যা করেন। তবে বারোমাসের ঋতু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক পরিবেশের পটভূমিকায় জীবনের বিচিত্র প্রসঙ্গের বর্ণ পাঠক বা শ্রোতার মনে বিশেষ আগ্রহের সঞ্চার করে। কবির ক্ষমতা বা প্রতিভার মাত্রানুসারে কাব‍্য সার্থকতার তারতম‍্য ঘটে।
    (৫)     নারীগণের পতিনিন্দা মঙ্গলকাব‍্যে সংস্কৃত সাহিত‍্যের অনুকরণে এসেছে। কোন সামাজিক অনুষ্ঠানে বিবাহের বর বা অন‍্য পুরুষকে দেখার সময় নারীরা নিজেদের স্বামীর সঙ্গে তার তুলনা করেন। সব বিষয় পার্তির অযোগ‍্যতা দেখে নিজেদের ভাগ‍্যকে দোষী করে মনস্তাপে ভোগেন। অবশ‍্য এই ধরনের স্থূল বর্ণনায় সেকালের রুচির প্রকাশ ঘটেছে। মঙ্গলকাব‍্যে নায়িকাদের পতিব্রত‍্যের কঠোর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রসঙ্গের সঙ্গে এই লঘু চপল প্রথাগত বর্ণনায়র সামঞ্জস‍্য করা বেশ কষ্টসাধ‍্য। তাছাড়া এরকম স্থলে কোন কোন ক্ষেত্রে বর্ণনায় রুচি সীমা সহজেই লঙ্ঘিত হওয়ার সম্ভাবনা এড়ানো যায় না।
    (৬)     পাক প্রণালী ও বিবাহাচারের বর্ণনাও মঙ্গলকাব‍্যের সাধারণ বিষয়। বাঙালীর ভোজন প্রিয়তা এবং যে সব রান্নার পদ তারা পছন্দ করত তার বেশ রসায়িত বর্ণনা পাওয়া যায়। কাব‍্যে বাঙালীর জীবনের রসনাতৃপ্তির প্রসঙ্গ গৃহীত হওয়ার কারণ শ্রোতার মনোরঞ্জন। কারণ মঙ্গলকাব‍্যের নির্ভেজাল দৈবানুগত‍্যের পরিবেশে বৈচিত্র আনার উপায়রূপে এর কার্যকারিতা অস্বীকার করা চলে না।
     বিবাহাচারের বর্ণনা মঙ্গলকাব‍্যে বিশেষ স্থান দখল করে। যদিও বাংলার সর্বত্র বিবাহের আচার একরকম নয়, তবু কবিরা আঞ্চলিক বৈচিত্র পরিহার না করেই আচারের বর্ণনা দিয়েছেন। এতে বাংলার সামাজিক জীবনের নানা দিকের পরিচয় মিলেছে। বিভিন্ন স্ত্রী-আচার, শাস্ত্র ও প্রথার অনুসরণ, বিবাহের সম্বন্ধ; শ্রাদ্ধ ইত‍্যাদি, সমাজের ভূমিকা, বাসরের বর্ণনা স্থান পায়। তারপর দাম্পত‍্য কলহ, গর্ভাধান, সন্তানের জন্ম এবং বিবিধ প্রথা পালনের বর্ণনাও মঙ্গলকাব‍্যের বিষয়ীভূত। বিবাহাচারের বিস্তৃত বর্ণনা মঙ্গলকাব‍্যে কিছুটা বৈচিত‍্য আমদানি করে। বিভিন্ন মঙ্গলকাব‍্যে অনেকগুলি বিবাহ প্রসঙ্গ থাকে। তবে নানা কবির কলমে তার বিবরণ বিভিন্ন স্বাদ নিয়ে আসে। এই বর্ণনার বাস্তবধর্মিতা অস্বীকার করার উপায় নেই।

     (৭)     প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে সমুদ্রযাত্রার উল্লেখ পাওয়া যায়। মধ‍্যযুগ পর্যন্ত এই সমুদ্র বাণিজ‍্য বাঙালী জীবনের অঙ্গ ছিল। সেজন‍্য মঙ্গলকাব‍্যে বাণিজ‍্যযাত্রায় ও সমুদ্র পথের বর্ণনা স্থান পেয়েছে। কোন কোন মঙ্গলকাব‍্যে মূল কাহিনীর সঙ্গে সমুদ্রযাত্রার যোগ অচ্ছেদ‍্য। চাঁদ সদাগর ও ধনপতি সদাগরের কাহিনী মনসা ও চণ্ডীমঙ্গলের অচ্ছেদ‍্য অংশ।
    (৮)     মঙ্গলকাব‍্যে চৌতিশা স্তব ধর্মভাবনার দিক থেকে অনিবার্য। কিন্তু কবিরা শব্দগত দক্ষতা ও কৌশলের তালিকা দেওয়ার জন‍্য এবং অধিকার ফলাও করতে এই প্রথার আশ্রয় নেন। সংস্কৃতে বৃহদ্ধর্ম পুরাণে এরকম একটি চ‍ৌতিশা আছে। সমস্ত ব‍্যঞ্জনবর্ণকে ক্রমান্বয়ে আদ‍্য বর্ণরূপে নিয়ে এক একটি ছত্র রচিত হয়। এর মধ‍্যে কাব‍্যগত কোন কৃতিত্ব প্রকাশ না পেলেও কেউ বাদ দেননা।
    (৯)      আরও কতকগুলি বিষয় মঙ্গলকাব‍্যে স্থান না দিলে চলে না। এগুলির মধ‍্যে নারীর সতীত্ব পরীক্ষা, সপত্নীবিদ্বেষ, নায়ক-নায়িকার রূপ বর্ণনা, সাজসজ্জার বর্ণনা, নগর বর্ণনা, বিভিন্ন বিষয় ও বস্তুর অপ্রয়োজনীয় বিস্তৃত তালিকা প্রণয়ণ, শ্মশানদৃশ‍্যের বর্ণনা, ভূতপ্রেতের হাট, যুদ্ধের বর্ণনা ইত‍্যাদি না থাকলে মঙ্গলকাব‍্য অসম্পূর্ণ গণ‍্য হওয়ার যোগ‍্য।
     (১০)     দৈবী মহিমা প্রচার মঙ্গলকাব‍্যের মূল উদ্দেশ‍্য। এই উদ্দেশ‍্যে দেববন্দনা থেকে শুরু হয়ে প্রতিটি প্রসঙ্গের অবতারণা। সেজন‍্য দেবতার আচরণ কোন উচ্চভাবের গাম্ভীর্য ও মর্যাদাবোধের অবকাশ রাখা হয়নি। দেবদেবীর আচরণ লোভী বৈষয়িক মানুষের হীনতা ও তুচ্ছতার সীমা অতিক্রম করতে পারেনি। দেবদেবীরা স্বরূপে পূজা প্রচারের বাধ‍্য করার জন‍্য নানারূপ হীনকৌশল অবলম্বন পিছপা হননি। তাঁরা তুচ্ছ অপরাধে অথবা অপরাধ ঘটানোর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে স্বর্গের বাসিন্দাদের শাপগ্রস্ত করে মর্ত‍্যে পাঠান। মর্ত‍্যে তাঁর পূজাবিরোধীদের বশ করার জন‍্য ছলনার আশ্রয় নেন। বিভিন্ন ছদ্মবেশ ধারণ করে দেবদেবীরা মানুষের মনে তাঁর প্রতি আনুগত‍্য সঞ্চারে উপলক্ষ‍্য রচনা করেন। জন্মান্তরবাদে বিশ্বাস মঙ্গলকাব‍্যের জীবনবোধকে বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে। সেজন‍্য সমাজে দেবদেবীর এ ধরণের আচার-আচরণ সমালোচিত হত না। বিশ্বাসের ভিত্তিতে সবই সঙ্গত মনে হত। এই মনোভাব থেকেই দেববিরোধী চরিত্রকে শেষ পর্যন্ত নানা দুর্দশা ও অত‍্যাচারের অবসানে নতমস্তকে আনুগত‍্য স্বীকার করানো হয়। তারপর শাপগ্রস্ত স্বর্গবাসী শাপমুক্ত হয়ে আবার স্বর্গে গমন করেন। এইভাবে একান্ত মানবিক তুচ্ছতা ও সংকীর্ণতার বশবর্তী দেবদেবীরা মর্ত‍্যের মানুষের কাছে বাস্তব জীবনের মাটিতে নেমে আসেন।
    (১১)     গ্রন্থোৎপত্তির কারণ বর্ণনার পাশাপাশি আরও কতকগুলি বিষয় এসে যায়। তার মধ‍্যে যেটি প্রধান তা হল কবির আত্মপরিচয়। এই আত্মপরিচয় অংশ সাহিত‍্যের ইতিহাসে অত‍্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আত্মপরিচয়ে কবির ব‍্যক্তিগত ও পারিবারিক পরিচয় শুধু নয়, সেকালের সমাজের নানা দিকও আভাসিত হয়। এখানে কাব‍্যের পৃষ্ঠপোষক ও গুণগ্রাহী ব‍্যক্তিদের সম্পর্কেও নানা প্রসঙ্গ বর্ণিত হয়। সাহিত‍্যের অন‍্যান‍্য শাখাতে এর প্রয়োগ দেখা গেলেও মঙ্গলকাব‍্যে এর বিকল্প নেই। মুকুন্দরামের কাব‍্য রচিত হওয়ার পর প্রায় কোন কবিই আত্মপরিচয় বর্ণনার সুযোগ হাত ছাড়া করেননি।
     মঙ্গলকাব‍্যের বর্ণনা অত‍্যন্ত গতানুগতিক। কিন্তু ভাল কবিরা ভাষায় কাব‍্য রচনার চেষ্টা করতেন। সেজন‍্য তখনকার শ্রোতার পছন্দসই কোন কিছুই বাদ দেননি। সেই সঙ্গে ধাঁধা-প্রবাদ-প্রবচনের ব‍্যবহারেও তাঁরা কুণ্ঠিত ছিলেন না। লোকসাহিত‍্যের প্রথা ও বর্ণনারীতিকে মর্যাদা দিয়েছেন। বর্ণনার সমাপ্তিতে কবি নিজের নাম ভনিতায় যুক্ত করতে তুলতেন না।
     (১২)     কিহিনী গ্রন্থন ও চরিত্র রচনায় মঙ্গলকাব‍্যের কবিরা বিশেষ কৃতিত্ব দেখান নি। মনসামঙ্গলে চাঁদ সদাগর কেবল উল্লেখযোগ‍্য ব‍্যতিক্রম। অন‍্য চরিত্র ও ঘটনা বিশেষ ছকের অধীনে কোন স্বাধীনতা লাভের সুযোগই পায়নি। মনসামঙ্গলের কাহিনী প্রাকৃত-অপ্রাকৃতের সীমা সতর্কভাবে মেনে চলতে না পারলেও শ্রোতার কৌতূহল জীবন্ত রাখার উপযোগী করে গ্রথিত হয়েছে। অসাধারণ কর্ম সম্পাদনে উপযুক্ত চরিত্র যেমন হনুমান, বিশ্বকর্মা ইত‍্যাদি থাকলেও তাদের অপরিহার্যতা প্রমাণ হয়নি। চণ্ডীমঙ্গল কাব‍্যধারা জীবনরসিক কবি মুকুন্দরামকে উপহার দিয়েছেন। তাঁর কবিত্ব সে যুগের পক্ষে সত‍্যই অতুলনীয়। কয়েকটি বিচ্ছিন্ন অংশ বর্ণনা অবলম্বনে তা প্রতিপন্ন করা যায়। ধর্মমঙ্গল কাব‍্যে সীমান্ত বাংলার সাংস্কৃতিক সমন্বয়ের ছাপ লক্ষণীয়। দেব-দেবী প্রসঙ্গে তা বিশেষ ভাবে ধরা পড়ে কিন্তু কাহিনী এমন দুঃসাহসিক বর্ণনায় ভরপুর যে তার মাঝখানে থেকে মানব রসের সন্ধান করা প্রায় দুরূহ বলা চলে।
চণ্ডীদেবীর উৎস ঃ-
         বাংলা সাহিত‍্যের ইতিহাসে, আনুমানিক ১৩শ-১৪শ শতাব্দীতে দেব-দেবী মহাত্ম‍্যসূচক এক শ্রেণীর গেয় আখ‍্যানকাব‍্য প্রচলিত

ছিল,  ,  সাধারণভাবে তাদের মঙ্গলকাব‍্য নামে অভিহিত করা হয়। মনসা, চণ্ডী, ধর্ম, শিব, অন্নপূর্ণা ইত‍্যাদি দেবদেবী মঙ্গলকাব‍্যে গৃহীত হয়েছেন। এই সব দেবদেবীর মাহাত্ম‍্য গানে ও শ্রবণ গায়ক ও শ্রোতার মঙ্গল হয়, সাধারণের মধ‍্যে এই বিশ্বাস প্রচলিত ছিল। মঙ্গলকাব‍্য ধারার উদ্ভবের সামাজিক ও ঐতিহাসিক কারণরূপে অনেকে রাষ্ট্র বিপর্যয়জনিত বাঙালীর আত্মশক্তির উপর আস্থার অভাবের কথা বলেছেন। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে পূর্ব ভারতে মুসলমান শক্তির অধিকার বিস্তৃত হচ্ছিল। সাবেকী ধর্ম ও শাস্তের রক্ষক উচ্চবর্ণীয় হিন্দুরা সামাজিক আধিপত‍্য হারানোর আশঙ্কাবোধ করছিলেন। তাদের মনোভাবের এই দুর্বলতা সমাজের প্রভাবিত করেছিল। সর্বোপরি সাধারণ মানুষ জীবনে রোগ-শোক-দুঃখ ও দারিদ‍্যের বাস্তব প্রতিকার খুঁজে পেত না। তারা যে কোন দুবৈর পেছনে কোন ভূমিকা রয়েছে। সুতরাং দেব দেবীকে সন্তুষ্ট রাখতে ভয় ও ভক্তি নিবেদন করলে তার ফল ভাল বই মন্দ হয় না। যে দেব দেবীর অমঙ্গলের, তিনি খুশী থাকলে শুধু অমঙ্গলের নিবারণই হয় না, মঙ্গল সাধনও অবহেলায় করতে পারেন। তাই দেব-দেবীকে সন্তুষ্ট রাখার এবং তাঁর মহিমা সাধারণের মধ‍্যে প্রচার করার উদ্দেশ‍্যে বিভিন্ন মঙ্গল কাব‍্যের আবির্ভাব হয়েছিল।
        কোন কোন ঐতিহাসিক এই শ্রেণীর সাহিত‍্যকে ব্রতগীত পাঁচালী নামেও অভিহিত করেছেন। গেয় আখ‍্যাতিকারূপে এগুলি আটদিন ধরে গাওয়া হত। সে জন‍্য নামে অষ্টমঙ্গলা। এক মঙ্গলবার শুরু হয়ে অন‍্য মংগলবারে শেষ হত। শেষ দিনের পালার শেষাংশে সমগ্র কাহিনী সংক্ষেপে গাওয়া হত এটাই অষ্টমঙ্গলা। শেষ পালার আগের পালাটি সারারাত ধরে গান হত বলে, একে 'জাগরণ' নামেও বলা হয়। কোন দেব-দেবীর ব্রত বা পূজা অনুষ্ঠান উপলক্ষ‍্যে এই গানের আসর বসান হত। 'চণ্ডীমংগল' এই শ্রেণীর কাব‍্য।
        চণ্ডীমঙ্গল কাব‍্যে বর্ণিত দেবী চণ্ডী পুরানাশ্রিত দেবী নন। দেব চণ্ডীর উৎস অনুসন্ধান করতে গিয়ে নানারূপ অনুমিত তথ‍্যের উপর চণ্ডী শিবের পত্নী। মহাভারতের আগে এই পরিচয় পাওয়া যায় না। ব্রহ্মবৈবর্ত্তপূরাণ, দেবীভাগবত বৃহদ্ধর্ম পুরাণ, মার্কডেয় পুরাণ, হরিবংশ ইত‍্যাদি গ্রন্থে চণ্ডীর দেখা পাওয়া যায়। হরিবংশে 'চণ্ডী' রোগজনকে দেবতার অপদেবতা বলাই শ্রেয়। অথর্ববেদে অপদেবতা চন্দ্র কন‍্যাদের উল্লেখ পাওয়া যায়।
       ডঃ আশুতোষ ভট্টাচার্য অনুমান করেন যে 'চণ্ডী' শব্দটি কোন অষ্ট্রিক ভাষার শব্দ। কারণ ছোটনাগপুরের আদিবাসী ওরাওঁ জাতির ভাষায় 'চাণ্ডী' নামে শক্তিদেবীর সন্ধান পাওয়া যায়। তিনি মনে করেন যে চণ্ডীদেবী প্রথমে অন্-আর্য কোন সমাজে পূজিত হতেন এবং কালক্রমে আর্য সমাজে গৃহীত হন। ছোটনাগপুরের আদিবাসী জাতির পূজিত চাণ্ডীদেবী সম্পর্কে শরৎচন্দ্র রায় যে বিবরণ লিখে গেছেন তাতে শক্তিদেবী চাণ্ডীবন ও শিকারের দেবীরূপে স্বীকৃত। তাঁর পূজার মাধ‍্যম গোলাকার সাধারণ পাথর। অবিবাহিত যুবকেরাই এই দেবীর পূজক। মাঘী পূর্ণিমার দিনে বাৎসরিক পূজার আয়োজন করা হয়। যুবমণ্ডলীর মধ‍্য থেকে সেদিনের পূজক নির্বাচিত হন। বলির পশু ও অন‍্যান‍্য উপকরণ নিয়ে পূজার স্থানে চাণ্ডীশিলায় সকলে যায়। সেখানে শিলায় ও পশুর কপালে সিঁদুরের ফোঁটা দিয়ে বলি শেষ করা হয়। যুবকেরা সেখানেই রান্না করে ভোজ খায়। তারপর সন্ধ‍্যায় গ্রামের আখড়াশালে নাচগানে মাতে যুবক-যুবতীরা। এই দেবী শিলাখণ্ড সংগে রাখলে শিকারে সাফল‍্য অনিবার্য।
       'চাণ্ডী'র সঙ্গে বাঙালীর লৌকিক চণ্ডীদেবীর সম্পর্ক কি? মঙ্গলকাব‍্যে যে চণ্ডীর মাহাত্ম‍্য বর্ণিত হয়েছে, তাঁর মহিমা প্রধানতঃ দ্বিমুখী। একাংশে তিনি অরণ‍্যের অধিষ্ঠাত্রী, পশুকুলের রক্ষায়ত্রীয়া অন‍্য অংশে তিনি হৃত সামগ্রী ফিরিয়ে দেন। সেখানে সদাগরের প্রাণ ও সম্পত্তি রক্ষায় তাঁর ভূমিকা দেখা গেছে। সুতরাং তিনি অভয়া। কালকেতু আখ‍্যানের দেবী চণ্ডী পশুকুলকে রক্ষা করেছেন। তিনি শিকারীর নাগাল তেকে সব পশুকে অন্তর্হিত করেছেন। তিনি অন্-আর্য চাণ্ডী দেবীর মতই যে কোন রূপ পরিগ্রহ করতে পারেন। সুতরাং উভয় চণ্ডীর মধ‍্যেই বিশেষ পার্থক‍্য নেই।
        চণ্ডীমঙ্গল কাব‍্যগুলির আসল নাম অভয়ামঙ্গল। এই অভয়া বনের দেবী। ঋগ্বেদেব দশম মণ্ডলে এঁর স্তর আছে। ডঃ সুকুমার সেন বলেন যে এই অরণ‍্যামী নামিত বনদেবী নানা ভাব ও কল্পনার মিশ্রণে, সহস্র শতাব্দী অতিক্রম করে, কিছু রূপান্তরিত অবস্থায় চণ্ডী মংগলের মংগলচণ্ডী দেবীরূপে দেখা দিয়েছিলেন। তিনি বহুতথ‍্যের সমন্বয়ে দেবী চণ্ডীদেবীকে মংগলকাব‍্যের বিষয়ীভুক্ত করা হয়েছে সেই দেবী হয়তো বা আদিবাসী সমাজে গৃহীত হওয়ার আগে ভারতীয় ঐতিহ‍্যের প্রাচীন ধারার নিকট ঋণী।
        যুক্তিটা সহজে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু আমাদের ভারতীয় ঐতিহ‍্যে দূর্গাদেবীর সঙ্গে চণ্ডীদেবী মিশে গেছেন। দুর্গার দুটি