Go to content Go to menu
 


চণ্ডীমঙ্গল কাব‍্যধারা

2021-01-25
রূপ---একরূপে তিনি বনদেবী দুর্গাঅভয়া, অন‍্যরূপে বিন্ধ‍্যবাসিনী উমা পার্বতী। প্রথমরূপ তিনি গোধাবাহন, অন‍্যরূপে শঙ্করনাশিনী। উভয়ক্ষেত্রেই তিনি দুর্গম অঞ্চলের অঠিদেবী। অভয়া জীবধাত্রী বলে মঙ্গলকাব‍্যে তিনি মঙ্গলচণ্ডী। বাংলার বনদেবীরূপে চণ্ডীর পূজা মেয়েদের মধ‍্যে ব্রতরূপে প্রচলিত ছিল।
       বাংলা মঙ্গলকাব‍্যের চণ্ডী যে ব‍্যাধ ও বন‍্য পশুদের দেবতা তা কালকেতুর আখ‍্যানে স্পষ্টরূপেই ধরা পড়েছে তাছাড়া প্রাচীনকাল থেকে বাংলাদেশ বন ও বন‍্যপ্রাণী সমাকুল ছিল। পশুদের সংগে মানুষকে পাশাপাশি বাস করতে হয়েছে। সাপ, বাঘ ইত‍্যাদি অনিষ্টকর জীবজন্তুর আক্রমণে বিপুল প্রাণের বিনাশও তাদের অভিজ্ঞতার সংগী ছিল। সেজন‍্য সাপের দেবী মনসাকে নিয়ে মংগলকাব‍্যের একটি মূল ধারার সৃষ্টি হয়েছিল। তেমনি বন‍্যশ্বাপদসঙ্কুল পরিবেশে তাদের জন‍্য ভয় ভাবনা থেকে নিরাপত্তার কামনা ত‍্যাগ করতে পারেনি। সেজন‍্য বনের দেবীর কল্পনা অনিবার্য ছিল। সেই বনদেবী প্রাচীন ধারা থেকে অস্তিত্ব বজায় রেখে চলবেন, প্রচলিত দেবী বিশ্বাস থেকে উপাদান গ্রহণ করে বা সেই ধারাকেই অনুমোন করে চণ্ডীদেবীকে পূজা করার যৌক্তিকতা অস্বীকার করা যায় না। তাই আদিবাসী ঐতিহ‍্যের প্রভাব চণ্ডীদেবীর উদ্ভবের ক্ষেত্রে অনস্বীকার্য।
চণ্ডীমঙ্গল কাব‍্যধারা ঃ
        চণ্ডীদেবীকে অবলম্বন করে মধ‍্যযুগের বাংলায় বিশিষ্ট তিনটি ধারার অন‍্যতম চণ্ডীমঙ্গল কাব‍্যের ধারা গড়ে উঠেছিল। অন‍্যান‍্য কাব‍্য বর্ণিত দেবদেবীর মত চণ্ডীকেও লৌকিক ও শাস্ত্রীয় ধারার সম্মেলন বলাই সঙ্গত। প্রথম কাহিনীর দেবী চণ্ডী মুণ্ডা তথা আদিবাসী ধারার সংগে বেশী ঘনিষ্ট হলেও দ্বিতীয় কাহিনীর দেবীর সংগে তাঁর সাযুজ‍্য কম। এখানে আবার আর্য, বৌদ্ধ এবং দ্রাবিড় সংমিশ্রণের কথা পণ্ডিতেরা অনুমান করেন। তবে আমাদের মনে হয়, সেকালে লৌকিকভাবে প্রচলিত বহু স্ত্রীদেবতার যাদের উৎস নি-সংশয়ে অনুমান করা দুরূহ, তাদের মধ‍্য থেকে চণ্ডীমঙ্গলের দেবী পরিকল্পনা এসেছে।
       চণ্ডীমঙ্গলকাব‍্যের কাহিনী দুটি অংশে বিভক্ত ---কালকেতু ব‍্যাধের কাহিনী এবং ধনপতি ফুল্লরার কাহিনী। দুটি কাহিনী সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও স্বাধীন, কোন পারস্পরিক যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায় না। প্রথম কাহিনীটি প্রাচীনতর। দ্বিতীয় কাহিনীর উপর মনসামঙ্গল কাহিনীর প্রভাব আছে।
       চণ্ডীমঙ্গলকাব‍্যের উদ্ভব যেভাবেই হোক, তার সূত্রপাত ঘটেছিল অন্ততঃপক্ষে দ্বাদশ শতাব্দীর শুরুতেই। দুটি কাহিনীই সে সময়ে লোককথারূপে অপরিচিত ছিল না বলেই মনে হয়। ১৫শ শতাব্দীর মিথিলাতেও চণ্ডী কাহিনী প্রচলিত ছিল এমন অনুমান করা চলে। বৃন্দাবন দাসের চৈতন‍্যভাগবতে চণ্ডীমঙ্গল গানের আসর এবং তার জনপ্রিয়তার উল্লেখ আছে।
        চণ্ডীমঙ্গল কাব‍্যধারার প্রাচীনতম রচয়িতারূপে মানিক দত্তের নাম জানা যায়। কিন্তু যে পুঁথিগুলি পাওয়া গেছে সেগুলির লিপি কাল এবং রচনা অর্বাচীন। ছড়ার আকারে রচিত, ভাষার মধ‍্যে প্রাচীনতার ছাপ নেই। ধর্মমঙ্গলের অনুসারী সৃষ্টি পত্তনের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। দেবীর আদেশেই কবি কাব‍্য রচনায় ব্রতী হয়েছিলেন। বিবরণমত কবি নিজে গায়েনের দল গঠন করে চণ্ডীমঙ্গল আসরে গাইতেন। প্রাপ্ত পুঁথি উত্তরবঙ্গের এবং রচনাকাল সপ্তদশ শতাব্দীর পূর্বের নয়। আগে দূর্গাপূজায় এই কাব‍্য গাওয়া হত, তার প্রমাণ পাওয়া যায়।
        পরবর্তী চণ্ডীমঙ্গলের কবি দ্বিজ মাধব তাঁর কাব‍্য রচনা করেছিলেন সপ্তদশ শতাব্দীর মধ‍্য ভাগে। তাঁর কাব‍্য সারদাচরিত নামে প্রসিদ্ধ। তিনি পূর্ববাংলার চট্টগ্রাম অঞ্চলে তাঁর কাব‍্য রচনা করেছিলেন। কেউ কেউ মনে করেন যে তিনি জন্মগ্রহণ করেন পশ্চিমবঙ্গে। কিন্তু পরে চট্টগ্রাম নিবাসী হয়েছিলেন। পশ্চিমবঙ্গে তাঁর কাব‍্যের কোন পুরানো পুঁথি পাওয়া যায়নি। প্রাপ্ত পুঁথিতে কালনির্ণয় নিয়ে সমস‍্যা আছে। তিনি মুকুন্দরামের সমসাময়িক ছিলেন, এই মত অনেকেই পোষণ করে থাকেন। সুতরাং তাঁর কাব‍্য ১৫৮০ খ্রীষ্টাব্দের মধ‍্যে রচিত। মুকুন্দরাম যেমন পশ্চিমের ব্রতকথা অবলম্বনে কাব‍্য লেখেন দ্বিজমাধবের কাব‍্য তেমনি পূর্ববঙ্গের লোকশ্রুতির উপর করেছে। আশুতোষ ভট্টাচার্য একথা নির্দ্ধিধায় ব‍্যক্ত করেছেন।
        প্রচলিত মতে মুকুন্দরামের কয়েক বছর আগে দ্বিজমাধবের কাব‍্য রচিত, তাঁর কাব‍্যে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট‍্য লক্ষ‍্য করা যায়। তিনি ব‍্যাধ জীবনের ধারা বিষয়ে কোন অভিজ্ঞতার অধিকারী ছিলেন বলে মনে হয় না। তবুও তাঁর চরিত্র বিশ্লেষণের নৈপুণ‍্য থাকার জন‍্য

অপরিচিত জীবনের বাস্তবরূপ তুলে ধরায় ব‍্যর্থ হননি। সহজ ও সরল বর্ণনা তাঁর কাব‍্যের অন‍্যতম বৈশিষ্ট‍্য। ধনপতি সদাগরের কাহিনীতে লহনা-খুল্লনার সপত্নী বিরোধের কাহিনী মর্মস্পর্শী হয়ে উঠেছে বর্ণনার স্বাভাবিকতার জন‍্য। কিন্তু কালকেতু-ফুল্লরার চরিত্র অঙ্কনে বিশেষ দক্ষতা দেখা যায়না। তবে সৃষ্টি পত্তনের বর্ণনায় একটি বিশেষ প্রসঙ্গ উল্লেখযোগ‍্য ঃ মঙ্গলদৈত‍্যের অত‍্যাচার থেকে দেবগণকে চণ্ডী রক্ষা করেন বলে নাম হয় মঙ্গলচণ্ডী। দ্বিজমাধবের কাব‍্য রচনার একদশক পরেই মুকুন্দরামের কাব‍্য রচনা সম্পূর্ণ হয়। কিন্তু এই কাব‍্য ভিন্ন পরিবেশ ও ভিন্ন প্রতিভার সৃষ্টি হওয়ায় কাব‍্যের আস্বাদে পার্থক‍্য ঘটে। মুকুন্দরামের কাব‍্যই চণ্ডীমঙ্গল ধারার শ্রেষ্ঠ সম্পদ। আত্মবিবরণীর জন‍্য অসাধারণ।
        পরবর্তী কবি দ্বিজরামদের অভয়ামঙ্গল রচনা সম্পূর্ণ করেন ১৬৫৩ খ্রীষ্টাব্দে। এই কাব‍্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রচলিত ধারা অবলম্বনে রচিত। তাই রচনায় পূর্ববর্তী কবি দ্বিজমাধবের অনুসরণ আছে। কোন আত্মবিবরণী কাব‍্যে স্থান পায়নি। কাব‍্যের মধ‍্যে কালকেতুর নগর পত্তনে ফিরিঙ্গদের উল্লেখ আছে, যা দ্বিজমাধবে নেই। তবে কোন কাহিনী রচনায় রামদেবের কোন নিজস্বতার ছাপ পড়েনি। দ্বিজমাধবের কাব‍্যকে এমনভাবে অনুকরণ রামদেব করেছেন, মধ‍্য যুগের কাব‍্য যার তুলনা নেই। তারপর অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে কবি মুক্তারাম সেন চট্টগ্রামেই তাঁর অভয়াংগল কাব‍্য লেখেন। এই কাব‍্যে কবির আত্মপরিচয় বিস্তারিতভাবে আছে। কিন্তু দ্বিজমাধবের অনুকরণ নেই বললেই হয়। কাহিনী সংক্ষেপে বর্ণিত। তারপর আরও কয়েকটি গৌণ কাব‍্য রচিত হয়েছিল যার রচয়িতা হরিরাম, জয়নারায়ণ সেন ইত‍্যাদি। এই কাব‍্যগুলি কোন দিক থেকেই উল্লেখযোগ‍্য নয়।
        চণ্ডীমঙ্গল কাব‍্যধারা রাঢ়ের কবি মুকুন্দরামের প্রতিভাস্পর্শ এমন প্রভাবিত যে অন‍্য কোন কবির কাব‍্য তার কাছে অত‍্যন্ত মান মনে হয়। তাই চণ্ডীমঙ্গল সাধারণভাবে মধ‍্যযুগের মঙ্গলকাব‍্য ধারার সেরা কবি লাভ করে গৌরবান্বিত।


চণ্ডীমঙ্গল ঃ কাব‍্যপাঠ
        চণ্ডীমঙ্গলের মূল উপাখ‍্যান দুটি ---কালকেতু ও ধনপতি সদাগরের উপাখ‍্যান। প্রচলিত ধারার ঐতিহ‍্য অবলম্বনে কাব‍্য রচনা করাই মঙ্গল কাব‍্যের কবিদের ভবিতব‍্য ছিল। তাই ধারাকে লঙঘন করে কাব‍্য কাহিনীতে নূতনত্ব আনয়নের স্পর্ধা কোন কবি দেখাতে পারেন নি। যদিও মুকুন্দরাম তাঁর অভয়ামঙ্গল কাব‍্যকে অম্বিকামঙ্গল নামেও উল্লেখ করে গেছেন, তবে তা যে 'নূতন গীত' বা 'অভয়ার নূতন মঙ্গল' হয়ে উঠবে সে বিষয়ে কবি সচেতন ছিলেন। আলোচ‍্য কাব‍্য নানা দিক দিয়ে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট‍্য প্রকাশ করেছে। সেজন‍্য কবিকঙ্কণ বিবচিত চণ্ডীকাব‍্য মধ‍্যযুগের বাংলা সাহিত‍্যের ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদার আসন দাবি করে।
       কাব‍্যের উপাখ‍্যানগত দিক থেকে প্রথমভাগ মঙ্গলবার শুরু হয়ে শুক্রবারের দিবাপালা সমাপন পর্যন্ত কালকেতু কেন্দ্রিক বা আখেষ্টী খণ্ড নামে পরিচিত। বাকি অংশ বণিক খণ্ড বা ধনপতির বর্তমান আলোচনা বর্হিভূত। কালকেতু উপাখ‍্যান অংশে কবির প্রতিভা-ভালো মন্দ সব দিকে পরিচয় তুলে ধরেছে। এই অংশে দেব খণ্ডের বর্ণনায় কবির স্বাভাবিক রসবোধ ক্ষুন্ন তো হয়নি বরং অন‍্যান‍্য অংশে কবির মূল বৈশিষ্ট‍্য রূপে যা প্রকাশিত তারও সুস্পষ্ট আভাস পাওয়া যায়।
সমাজ চিত্র ঃ
        সাহিত‍্যে সমাজের বাস্তব ছবি আধুনিক যুগের অপরিহার্য বিষয়। কিন্তু মধ‍্যযুগের অসীম দৈব নির্ভরতার পরিবেশে তার অবকাশ বেশী ছিল না। সাহিত‍্যে যা স্থান পেত তা পাপপুণ‍্য ও পরলোক চিন্তার আধারেই পুষ্টি-লাভ করত। ইহা জীবনের সুখের চেয়ে পরজন্মের ভাবী পুণ‍্য সঞ্চয়ের আগ্রহ মানুষের মনোভাবকে পরিচালিত করত। বাস্তব জীবনের কামনা বাসনা চরিতার্থ করার উপায় রূপেও দৈব বলের স্থান ছিল সবার উপরে। তাই মধ‍্যযুগীয় কাব‍্যে সমাজ জীবনের ছিটেফোঁটা পরিচয় খুঁজে বার করা কষ্ট সাধ‍্য। কবি কঙ্কনের কাব‍্য থেকে ব‍্যতিক্রম রূপেই গণ‍্য হতে পারে। বিশেষ করে ষোড়শ শতাব্দীর বাঙালী সমাজের বিশিষ্ট পরিচয় এই কাব‍্যকে অনন‍্য স্বাতন্ত্র দান করেছে।
     সমাজ চিত্রের নানা দিক কাব‍্যের নানা অংশে ছাড়িয়ে আছে। কবির রসবোধ, বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা এবং তার আলোকে জীবন চিত্রনে আত্মসাপেক্ষতার স্পর্শ পেয়ে কাব‍্য ভিন্ন স্বাদের সঞ্চার করে। গ্রন্থোৎপত্তির কারণ, হর-পার্বতীর গৃহস্থলী, কুল্লরার-বারমাস‍্যা, পশুগনের নিবেদন, বিবাহের বর্ণনা সাদভক্ষণ, গুজরাটে নগর পত্তন, নারীগণের পতিনিন্দা ইত‍্যাদি অংশে সমাজের চিত্তমালা পাঠক বা শ্রোতার কাছে জীবন্ত রূপে ধরা দিয়েছে।
       কাহিনীর প্রধান নর-নারী চরিত্র সমাজের নিম্নবর্ণ ব‍্যাধ জাতির সন্তান। উচ্চ বর্ণের হিন্দু সমাজের রীতি-নীতি ও সংস্কার তাদের জীবনে সম্পূর্ণ কার্যকর হতে পারে না। কিন্তু মুকুন্দরাম এ বিষয়ে সজাগ থেকে ও চরিত্র সৃষ্টি এবং কাহিনী গ্রহণে হিন্দু সংস্কার তথা সাধারণত প্রচলিত সামাজিক ধারাকেই প্রাধান‍্য দিয়েছেন। সে সময়কার সমাজে জাতিভেদ এবং উচ্চনীচের মধ‍্যে পার্থক‍্য ছিল। ও ভারাট নগর পতনের পর বিভিন্ন জাতি ও বর্ণের মানুষদের যে বিবরণ আছে তা থেকে একথা স্পষ্ট হয়। তাছাড়া কবি নিজে বিভিন্ন স্তরের লোকের জন‍্য সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী বিভিন্ন তালিকা প্রণয়ণ করায় তা প্রমাণিত উচ্চতর সমাজে সর্বোচ্চ স্থান ছিল ব্রাহ্মনের তারপর আসে কায়স্থ, বৈশ‍্য, মহাজন, বৈদ‍্য, বণিক এবং চাষী-গোপ ইত‍্যাদি এবং অন্ত‍্যজরা সমাজের সর্বনিম্নস্তরে বাস করে। মাঝি, বাউরি, চন্ডাল, কিরাত, কোল হাড়ি, শুণ্ডী, চামার, ডোম ইত‍্যাদি সমাজে আপাঙক্তেয় এবং অস্পৃশ‍্য গণ‍্য হত এবং জনপদের বাহিরে বাস করত।

        সমাজের মানুষেরা নানা পেশায় নিযুক্ত থাকত। ব্রাহ্মণেরা বিদ‍্যাচর্চা নিয়েই থাকে, তা নয়। মূর্খ ব্রাহ্মণ কোনরকমে শিখে পুরোহিতগিরি করে। সমাজে বৈশ‍্যেরা মহাজনী করে। তারা সুদে টাকা খাটায়, পণ‍্য সামগ্রী সব বিক্রয় করে বন্ধকের কারবার করে। কাব‍্যে এই ধরণের একটি চরিত্র হল মুরারি শীল। কালকেতুর সঙ্গে তার ও তার স্ত্রীর আচরণ ও কথাবার্তায় সে সময়কার ভণ্ড, কপট বেনিয়াদের প্রতিনিধিমূলক চরিত্রের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। নানা দ্রব‍্য নিয়ে দেশে বিদেশে ব‍্যবসা বাণিজ‍্য করে বেড়ানোর কাজও অনেক করেন। বৈদ‍্যেরা রোগে চিকিৎসার কাজ করত। কিন্তু রোগ / পালাতেই করে যোগ / নানা ছলে মাগয়ে বিদায়ে।' কায়স্থেরা 'দামিন‍্যায় চাষ চষি'। চাষের ফসল লক্ষ্মীর প্রসাদরূপে আদরণীয় ছিল। সমাজে বিচিত্র পেশার মানুষ বাস করত। তেলি, কামার, কুমোর, তন্তুবায়, মালি, বারুই, নাপিত, আগুরি মোদক নানা দ্রব‍্যে বানিয়ে কাঁসারী, সাপুড়ে ইত‍্যাদি যায় বিস্তীর্ণ তালিকাভুক্ত। এছাড়া রাজকর্মচারীগণের নানান স্তরে ও মর্যাদার বিন‍্যাস ছিল । সেনাদলে পাইক, বরকন্দাজ, লেঠেল, রায় বেশে মল্ল ইত‍্যাদি যুদ্ধ পেশায় অনেক নিযুক্ত থাকত। বংশনুক্রমিক পেশার অনুসারেই সামাজিক নিয়ম ছিল।
      সমাজে মুসলমান সম্প্রদায়ের লোক কম ছিল না। কবির বর্ণনায় 'দশ বিশ বেরাদরে / বসিয়া বিচার করে / অনুদিন কেতাব কোরান তাদের পালনীয় আচার বিচার সম্পর্ক হিন্দুরা সংশয়াচ্ছন্ন। তাদের সাজপোষাক ভিন্নরকম, ইজার পরে, টোপর মাথায় দেয়, মাথা নেড়া করে মুখে দাড়ি রাখে। কিন্তু এঁটো কাঁটা মানে না ভাত খেয়ে পরণের কাপড়ে হাত মোছে। বকরি, কুকড়া ইত‍্যাদি জবাই করে। তা ছাড়া নানা রকম শ্রমের কাজে সাধারণ মুসলমানদের দেখা যায়। মৌলানা বিয়ে নিব ইত‍্যাদি দিয়ে কড়ি সংগ্রহ করে। পীরপয়গম্বরের ভজনা করে এবং দরজায় সন্ধ‍্যা দেয়। নিত‍্য নামাজ না করে তারা কাটায় না।
      রাজা মানসিংহের আমলে বাংলায় প্রজারা মোটামুটি সুখে ও সম্প্রীতির মধ‍্যে বাস করত। কবি মানসিংহের প্রশংসা করলেও গ্রন্থোৎপত্তির কারণ বর্ণনায় ডিহিদারের নিয়মের কড়াকড়িতে গ্রামত‍্যাগ করতে বাধ‍্য হয়েছিলেন। আপাতদৃষ্টে মনে (যে অত‍্যাচার সইতে না পেরে কবি সপরিবারে নিজ বাসভূমি ত‍্যাগ করে আরড়‍্যা ব্রাহ্মণভূমিতে বাঁকুড়া রায়ের গৃহে আশ্রয় নেন। সে সময় মানুষের জীবনের ধারা অন‍্যরকম ছিল। নানাভাবে ধান্দা করে সংসার পালন করতো, বিশেষ করে যারা শ্রমজীবি নয়। সে সময়ে বাংলার নূতন ভূমি ও মুদ্রা ব‍্যবস্থার পত্তন হচ্ছিল। এই নূতন ব‍্যবস্থায় কবি নিজে খাপ খাওয়াতে পারছিলেন না। সরকারী নিয়ম কঠোরভাবে পালন করতে গিয়ে ডহিদার সকলের নিন্দা ভাজন হয়। জমির দখল নিয়ে বিবাদের ফলে তাঁর তালুকদার গোপীনাথ নন্দী বন্দী হন। তাতে কবি বিশেষ ভীত হন এবং উডিষ‍্যার অন্তর্গত এলাকায় গোপনে পলায়ন করে নিরাপদ বোধ করেন। সেখানে পুরানো ভূমি ও মুদ্রা ব‍্যবস্থা তখনো চলছিল। সুতরাং কবির গৃহত‍্যাগের বর্ণনায় দুঃখ-যন্ত্রণা ও অত‍্যাচারের বিবরণ বলে আমরা যা মনে করি, তা দৈবী অনুগ্রহলাভের উপলক্ষ‍্যে রূপে অনেকটাই অতিরঞ্জিত বলে মনে হয়। সেকালে ভাগ‍্যের অন্বেষণে সাধারণ মানুষ যে সামান‍্য কারণে স্থানান্তরে বাস সরিয়ে নিতে অভ‍্যস্ত ছিল, কবিকঙ্কনের চণ্ডী কাব‍্যে তার বর্ণনা আছে। কালকেতু গুজরাট নগর পত্তন করলে সেখানে বহিরাগতদের বসতি করতে আসায় তা প্রমাণিত। সেকালে এমনিতে সামাজিক নিরাপত্তা গরীবদের পক্ষে ছিল না। অর্থনৈতিক অবস্থাও খুব ভাল ছিল না, একথা মিথ‍্যা নয়।
      কালকেতু ও ফুল্লরার সংসার যাত্রা এবং তাদের বারোমাসের জীবন যাত্রার বর্ণনায় ব‍্যাধজীবনের সুখ-দুঃখের ছায়াপাত ঘটেছে। নিম্নশ্রেণীর মানুষের জীবন যাত্রা-জন্ম, বিবাহ, মৃত‍্যু সবই বিবরণের মধ‍্যে এসেছে। বিবাহের আগে ঘটকালি, কোষ্টীবিচার, তিথিনক্ষত্র দেখে শুভদিন স্থির করা এবং বিবাহের বিচিত্র আচার অনুষ্ঠানের বর্ণনার মধ‍্যে সাধারণ বাঙ্গালী জীবনের ছবি জীবন্তভাবে ধরা দিয়েছে। গর্ভধান, সাধভক্ষণ, সন্তা জন্মের পর নাম করণ, কর্ণবেধ ইত‍্যাদি প্রসঙ্গে নানাবিধ আচার ও সংস্কার পালনের বিস্তারিত বিবরণ কাব‍্যে স্থান পেয়েছে। নানান পূজা ও বলিদানে দেবতাকে তুষ্ট করা, বৃদ্ধবয়সে কাশীযাত্রা ইত‍্যাদি কিছুই বাদ যায়নি। হর-গৌরীর বিবাহেও একই রকম প্রসঙ্গ এসেছে। দেব-দেবীদের জীবন যাপনও সাধারণ সমাজের প্রতিচ্ছবিমাত্র। বিবাহের পর সন্তান জন্ম হল। কিন্তু শিব হিমালয় ছেড়ে নড়ে না। তখন মা মেনকার সঙ্গে গৌরীর বাধে কলহ, মেনকা বলেন---
রান্ধি বাড়ি আমার কাঁকাল‍্যে হইল বাত।
ঘরে জামাই রাখিয়া জোগাব কত ভাত।