Go to content Go to menu
 


কবি ঈশ্বরগুপ্ত

কবি ঈশ্বরগুপ্ত


ঈশ্বরগুপ্ত ঃ সংক্ষিপ্ত পরিচয় ঃ
      ১২১৮ বঙ্গাব্দের ২৫-এ ফাল্গুন শুক্রবার কাঁচরাপাঁড়া গ্রামে ঈশ্বরগুপ্তের জন্ম হয়। তাঁর পিতার নাম হরিনারায়ণ, মাতা শ্রীমতী দেবী এঁদের চার পুত্র ও এক কন‍্যা জন্মেছিল ---গিরিশচন্দ্র, ঈশ্বরচন্দ্র, রামচন্দ্র, শিবচন্দ্র হল পুত্রদের নাম। কলকাতায় জোড়াসাঁকোয় ঈশ্বরচন্দ্রে মামার বাড়ী। ছেলেবেলা থেকে তিনি ছিলেন অত‍্যন্ত সাহসী। ছোটবেলা থেকেই মুখে মুখে ছড়া বলতে ও তৈরী করতে পারতেন তিনি। লেখাপড়ায় তাঁর বড় একটা মন ছিল না। মাত্র তিন বছর বয়সেই নাকি কলকাতায় শয‍্যাগত অবস্থায় মশামাছির উপদ্রবে অস্থির হয়ে বলেছিলেন ঃ
"রেতে মশা দিনে মাছি,এই তাড়য়ে কলকাতায় আছি।"

         সংবাদপত্রের সম্পাদনা করা এবং পদ‍্য রচনাই ঈশ্বরগুপ্তের উল্লেখযোগ‍্য কাজ নয়। তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে গবেষণামূলক কাজটি করে গেছেন, সেটি হল কবিওয়ালাদের জীবনী সংগ্রহ করে সংবাদ প্রভাকরের সম্পাদনা ছাড়াও আরও তিনটি পত্রিকার সঙ্গে ঈশ্বরগুপ্ত যুক্ত ছিলেন। ১২৩১ বঙ্গাব্দে বন্ধু যোগেন্দ্র মোহনের অকালমৃত‍্যুর পর ঈশ্বরগুপ্ত কিছুকালের জন‍্য 'সংবাদ প্রভাকর' ---এই প্রকাশ বন্ধ রেখেছিলেন। এসময় আন্দুলের জমিদার জগন্নাথপ্রসাদ মল্লিক 'সংবাদ-রত্নাবলী' নামে একটি সংবাদ প্রকাশের জন‍্য ঈশ্বরগুপ্তকে আহ্বান করেন। চব্বিশে জুলাই ১৮৩২ সালে 'সংবাদ রত্নাবলী' প্রকাশিত হয়। প্রভাকর-এর প্রকাশানা থেকে 'পাষণ্ড-পীড়ন' নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশিত হয় (১৮৪৬ সাল ২০ জুন)। ১৮৪৭ সালের আগষ্ট মাসে 'সংবাদ সাধুরঞ্জন' নামে সাপ্তাহিক পত্র ঈশ্বরগুপ্তের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়।
       সমাজসচেতন সাংবাদিক কবি ঈশ্বরগুপ্তের ভাবনায় যুক্তি ছিল কিন্তু প্রাচীন ঐতিহ‍্য বিশেষ‍্য মধ‍্যযুগীয় গোঁড়ামি থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি তাঁর ঘটেনি। তাই কবিতায় তিনি পুরোপুরি আধুনিক হতে পারেননি। আবার একেবারে প্রাচীনপন্থীও তিনি নন। ১২৬৫ বঙ্গাব্দের ১০ই মাঘ ঈশ্বরগুপ্তের জীবনের আশা ক্ষীণ হয়ে এলে হিন্দুমতে তাঁকে গঙ্গাযাত্রা করানো হয়।
স‍্যাটায়ারিষ্ট ঈশ্বরগুপ্ত ঃ
        The Readers Companion to World literature বইতে স‍্যাটায়ার সম্পর্কে বলা হয়েছে ---" A term applied to any form of literature whose manner is a blend of criticism, wit amd ironic humour and whose immidiate aim is the ridicule or rebuke of someone or something. The target may be anything form a philosophical sysyem (Voltaire's Candide) a social evil like hypocrisy (Moliere's Tertuffe) to an individual person (Dryden'd Mac Flecknoe). It is often maintained that the ultimate purpose of satire is to reform society by exposing its voices.
       ঈশ্বরগুপ্তের 'বোধেন্দু বিকাশ' নাটকের একটি গানের প্রথমাংশ এইরকম ঃ

ও কথা, আর বোলো না, আর বোলো না,
বলছ বঁধু, কিসের ঝোঁকে?
এ বড় হাসির কথা, হাসির কথা,
হাসব লোকে, হাসবে লোকে।।
        এই 'হাসির কথা' ঈশ্বরগুপ্তের কবিতায় ছত্রে ছত্রে। রঙ্গব‍্যঙ্গ মূলক কবিতার জন‍্যই বাংলা কাব‍্যের জগতে তিনি সুপরিচিত। রঙ্গব‍্যঙ্গের জন‍্যই তাঁর কবিতা প্রাণবন্ত। বঙ্কিমচন্দ্র বলেছেন ঃ "স্থূল কথা ঈশ্বরগুপ্ত Realist এবং ঈশ্বরগুপ্ত Satirist। ইহা তাঁহার সাম্রাজ‍্য এবং ইহাতে তিনি বাঙ্গালা সাহিত‍্যে অদ্বিতীয়।" (ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত-র কবিতা সংগ্রহ/ভূমিকা
        জগদীশ্বরের সঙ্গেও কৌতুক করতে ছাড়েননি কবি ঃ
"কহিতে না পার কথা, কি রাখিব নাম।
তুমি হে আমার বাবা, হাবা আত্মারাম।।"

                ---নির্গুণ ঈশ্বর
সমগ্র জগৎকে গুপ্তকবি অগভীর দৃষ্টিতে দেখেছিলেন। প্রতিদিনের বর্ণবিরল জীবনের মধ‍্যেও তিনি রঙ্গরস অনুভব করেছেন ঃ 'এত ভঙ্গ বঙ্গ দেশ তবু রঙ্গ ভরা'।
এই রঙ্গপ্রিয়তা বাঙালীর জাতিগত বৈশিষ্ট‍্য। বিষ্ণু দে বলেন----
              "শিক্ষিত বাঙালীর সান্নিধ‍্যে আমরা ভুলে যাই যে বাঙালীর বিখ‍্যাত ভাবালুতা সাম্প্রতিক এবং শিক্ষিত বাঙালীর বিশেষত্ব মাত্র। দেশের যে ঐতিহ‍্য বিট্রিশপূর্ব শিল্পসাহিত‍্যের উৎস, সেই লোকমানসে বাচালতা থাকলেও অশ্রুজলের চর্চা নেই।"
     ঈশ্বরগুপ্তের হাস‍্যরস বিদ্রুপাত্মক। তীক্ষ্ণ সমালোচনা করেছেন ভণ্ডামির, তীব্র ব‍্যঙ্গের মাধ‍্যমে। ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের প্রতি ব‍্যঙ্গঃ
'প্রভাতে উঠিয়া সবে মিছে ফুল তুলে।
পূজার আসনে বসে, মন্ত্র যায় ভুলে।।
শিবিরে ঠেকায়ে কলা, কলা আগে চায়।
খপ করে তুলে নিয়ে, গপ করে খায়।।
          ----গ্রীষ্ম

nbsp;    ব্রাহ্মণত্বের ফাঁকিকে তিনি ব‍্যঙ্গের বস্তু করেছিলেন। 'মেকি ব্রাহ্মণ পণ্ডিত' কবিতায় টুলো পণ্ডিতকে বিদ্রুপ করেছেন ঃ
'আমরা বিপ্লের পুত্র, nbsp;    ধরিয়াছি যজ্ঞসূত্র,
nbsp;    শুন ওহে ঋতুরাজ বাপা।
জাতি ধর্মে ভিক্ষা করি,      প্রাণে যেন নাহি মরি,
চাল ভেঙ্গে পড়ে ঘর চাপা।।'

ঊনিশ শতকের হঠাৎ বাবুদের উপহাস করেছেন ঃ
'প্রতিবারে করি দান,nbsp;     না দিলে থাকে না মা
     দেনা করি খত দেন লিখে
শিষ্ট শান্ত অতি ধীর,      স্তুতি বাক‍্যে বাবুজীর,
ল‍্যাজে উঠে আকাশের দিকে।'
          ---শরদ্বর্ণন

ডিরোজিও শিষ‍্যরা ইয়ংবেঙ্গল নামে পরিচিত ছিলেন---সমসাময়িক বাংলার যুবক সম্প্রদায় ইয়ংবেঙ্গলের অনুকরণ করেছিল ফলে তাঁদের ভালো গুণগুলি অনুসৃত না হয়ে দোষগুলিই অনুসৃত হয়েছিল। এই নতুন জেনারেশনকে ব‍্যঙ্গ করে কবি বলেন ঃ
'এরা বেদ কোরাণের ভেদ মানে না,
      খেদ কোরে আর কে বোঝাবে?
ঢুকে ঠাকুর ঘরে, কুকুর নিয়ে,
জুতো পায়ে দেখতে পাবে।'
          ----দুর্ভিক্ষ ১ম গীত

বাঙালীর সাহেবিপনাকে তীব্র বিদ্রূপের কশাঘাত করেছেন গুপ্তকবি 'ইংরাজী নববর্ষ' কবিতায় ঃ
'যা থাকে কপালে ভাই টেবিলেতে খাব।
ডুবিয়া ভবের টবে, চ‍্যাপেলেতে যাব।।
কাঁটা ছুরি কাজ নাই, কেটে যাবে বাবা।
দুই হাতে পেট ভোরে খাব থাবা থাবা।।'