Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা - ১০৬, ১০৭ ও ১০৮

2020-07-31
     ইন্দ্রনাথ লোকটি যেমন ব‍্যবহারে দুর্বোধ‍্য, সেইরূপ পাঠকের পক্ষেও দুরধিগম‍্য --তীক্ষ্ণ মনীষাসম্পন্ন তার্কিকতার অন্তরালে তাঁহার ব‍্যক্তিত্ব-রহস‍্যটি চাপা পড়িয়া গিয়াছে। তাঁহার দলপতিত্ব তাঁহার ব‍্যক্তিত্বকে অতিক্রম করিয়া গিয়াছে; তিনি অপরকে নিয়ন্ত্রণ করিতে এতই ব‍্যস্ত যে, নিজের জীবনের মূলনীতি-সম্বন্ধে কোনোরূপ ধরা-ছোঁয়া দেন নাই। ইন্দ্রনাথের চরিত্রটি উপন‍্যাসের পটভূমি-হিসাবেও ভালো ফুটিয়া উঠে নাই--অতীন-এলার প্রেমের পরিপন্থিরূপেও তাঁহার ভূমিকা মোটেই স্পষ্ট নহে।
     মানুষ-হিসাবে বটু ও কানাই বরং ইন্দ্রনাথ অপেক্ষা সুস্পষ্ট হইয়াছে। বটুর ঈর্ষাকষায়িত স্থূল লালসা ও কানাই-এর অনাবৃত সুবিধাবাদ ও সহানুভূতি-স্নিগ্ধ cynicism তাহাদিগকে সাধারণ মানুষের পর্যায়ে আনিয়া ফেলিয়াছে। তাহাদিগকে আমরা চিনিতে ও বুঝিতে পারি, কিন্তু ইন্দ্রনাথের উচ্ছ ভাবধারা ও নীচ কার্যপ্রণালীর মধ‍্যে কোনো সামঞ্জস‍্য আমরা খুঁজিয়া পাই না।
     উপন‍্যাসটির সম্বন্ধে একটি যে প্রধান অভিযোগ আনা হইয়াছে তাহা বিপ্লববাদের চিত্রের ঐতিহাসিকতা ও সত‍্যানুবর্তিতা-বিষয়ক। অনেকেই অভিযোগ করিয়াছেন যে, লেখক বিপ্লববাদের যে ছবি আঁকিয়াছেন তাহা কাল্পনিক, বাস্তবানুগামী নহে। ইহার কৈফিয়ত হিসাবে লেখক 'প্রবাসী'তে যাহা লিখিয়াছেন তাহা প্রণিধানযোগ‍্য। তাঁহার আত্মপক্ষসমর্থন ইহাই যে, লেখক ইতিহাস অনুসরণ করিতে বাধ‍্য নহেন ---যে প্রতিবেশ তিনি গড়িয়া তুলিয়াছেন তাহা ঐতিহাসিক না হইলেও উপন‍্যাস-বর্ণিত প্রেমের বৈশিষ্ট‍্যের যথেষ্ট কারণ কি না ইহাই সমালোচকের প্রধান বিচার্য বিষয়। রবীন্দ্রনাথের এই যুক্তি মূলত সত‍্য হইলেও বর্তমান ক্ষেত্রে সম্পূর্ণরূপে প্রযোজ‍্য নহে। বিপ্লববাদের চিত্র সম্পূর্ণ সত‍্য না হইলেও ক্ষতি নাই; কিন্তু যেখানে প্রেমের সহিত ইহার প্রতিযোগিতা, সেখানে অন্তত ইহার চিতটি এমন চিত্তাকর্ষক, এমনই উচ্চ-আদর্শ-অনুপ্রাণিত হওয়া চাই, যাহাতে অতীন ও এলার অনিশ্চয়তা ও দ্বিধাভাব স্বাভাবিকতার দাবি করিতে পারে। বর্তমান উপন‍্যাসে বিপ্লববাদের এমন একটা বীভৎস, কলঙ্ক-কালিমা-লিপ্ত চিত্র দেওয়া হইয়াছে, যাহাতে প্রেমের সহিত ইহার প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা কল্পনা করা একেবারেই অসম্ভব। ব্রহ্মবান্ধব উপাধ‍্যায়ের সহিত ইন্দ্রনাথের কোনো বাস্তবিক সাদৃশ‍্য আছে কি না তাহাতে সমালোচকের কিছু যায় আসে না; ব্রহ্মবান্ধবের অনুরাগী ভক্তেরা এই সাদৃশ‍্যের ইঙ্গিতে ক্ষুণ্ন হইতে পারেন, কিন্তু আর্টের দিক হইতে এই আলোচনার বিশেষ কোনো সার্থকতা নাই। কিন্তু সমালোচকের প্রকৃত অভিযোগ এই যে, বিপ্লববাদের সাধারণ চিত্রটি উপন‍্যাস-বর্ণিত প্রেমের রূপ-নির্ধারণের কারণরূপে যথেষ্ট নহে। রবীন্দ্রনাথের কৈফিয়তে এই অভিযোগের কেনো সদুত্তর মিলে না। এমন কি বিপ্লববাদীদের সাধারণ জীবনযাত্রার যবনিকার অন্তরালে প্রচ্ছন্ন বিপদের যে অস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় তাহাও মনের মধ‍্যে যথেষ্ট শঙ্কিত উদ্বেগ জাগায় না। মাঝে মাঝে হুইসলের শব্দ পাই বটে, কিন্তু ইহা রঙ্গালয়ের মেকি হুইসল, ইহা আসন্ন বিপদের তীক্ষ্ণ সূচনা, রহস‍্যপূর্ণ অগ্রদূত-হিসাবে মনকে স্পর্শ করে না। এলার জীবনে এমন কি শঙ্কাময় সম্ভাবনা আসন্ন যাহাতে ক্লোরোফর্মের সাহায‍্যে তাহাকে চেতনার দ্বার রুদ্ধ করিতে হইবে, সেই ভয়াবহ পরিণতির সুরটি উপন‍্যাস-মধ‍্যে বাজিয়া উঠে না। যে প্রতিবেশের মধ‍্যে সে এতদিন নিঃশব্দ আত্মপ্রসাদের সহিত বিচরণ করিতেছিল তাহা কেন হঠাৎ এরূপ অসহনীয় ও শ্বাসরোধকারী হইল উঠিল তাহার পরিচিত। যাহাকে নূতন আবির্ভাব বলিয়া মনে করা যাইতে পারে তাহা অতীনের বিপদ; কিন্তু এই বিপদের আশঙ্কাতেই যে এলা কেন আত্মহত‍্যার জন‍্য উন্মুখ হইয়াছে তাহা সুস্পষ্ট নহে। মোট কথা, প্রতিবেশের চারিদিকের বেষ্টনী-রেখাটি ছেদহীন ও উজ্জ্বল হইয়া উঠে নাই--সমগ্র অবস্থাটি আমাদের মানস-নেত্রে অবিচ্ছিন্ন ঐক‍্যে প্রতিভাত হয় না।
     হয়তো এরূপ বিস্তৃত সমালোচনা লেখকের স্বচ্ছন্দবিকশিত, অনায়াসস্ফূত, বিরল-রেখার স্বল্পাভাসে গঠিত-দেহ ক্ষুদ্র চিত্রের পক্ষে ঠিক উপযুক্ত নহে। বিপ্লবপন্থার মোটামুটি চিত্রটি দেওয়া হয়তো তিনি আমাদের কল্পনা-সাহায‍্যে পুনর্গঠিত করিয়া লইতে বলিয়াছেন---পূর্ণকায় চিত্র দেওয়া হয়তো তাঁহার উদ্দেশ‍্য-বহির্ভূত। এই বর্ণবিরল বেষ্টনীরেখার মধ‍্যে একটিমাত্র অংশে তিনি তাঁহার চিত্রতুলিকার সমস্ত উজ্জ্বল বর্ণ ঢালিয়া দিয়াছেন --তাহা অতীনের তীব্র, আত্মগ্লানির প্রণয়াবেগ। উপন‍্যাসের অন‍্যান‍্য অংশ অস্পষ্ট, ভাসা-ভাসা ধরনের, তাহাতে তর্ক আছে, epigram আছে, বিশ্লেষণ আছে, কিন্তু উপন‍্যাসের যে আসল প্রাণস্পন্দন সেই সম্পূর্ণ অনুভূতি নাই। এমন কি এলার সাড়ার (response) মধ‍্যেও প্রাণবেগ নাই ---ইহার নিজের কোনো চাঞ্চল‍্য, কোনো তরঙ্গভঙ্গ নাই, ইহা কেবল নিশ্চল তটভূমির ন‍্যায় অতীতের অপ্রতিরোধনীয় প্রণয়ধারাকে আশ্রয় দিয়াছে মাত্র। ঔপন‍্যাসিক হিসাবে লেখককে কেবল এই একটিমাত্র খণ্ডাংশ (episode) দিয়া বিচার করিতে হইবে। রবীন্দ্রনাথের প্রেম-চিত্রগুলি প্রায় সমস্তই উচ্চাঙ্গের; তাঁহার কবি-কল্পনার সহজ অনুভূতির বলেই তিনি প্রেমের নিগূঢ় মর্মস্পন্দন ও ইহার অতীন্দ্রিয় আভাস ফুটাইয়া তুলিতে পারেন। অতীনের প্রেম-নিবেদনের মধ‍্যেও প্রেমের এই স্বরূপ-অভিব‍্যক্তির পরিচয় মেলে, ইহার নিজস্র রাগিণীটি ধ্বনিত হয়। গ্রন্থ-মধ‍্যে বৈপ্লবিক প্রতিবেশ যদি আর কিছু নাও করিয়া থাকে, তথাপি ইহা অতীনের প্রেমের প্রকৃতি ও প্রকিশভঙ্গি নির্ধারণ করিয়াছে--প্রেমের স্রোতস্বতী বিপ্লববাদের চড়ায় বাধাপ্রাপ্ত হইয়া এক ক্ষুব্ধ, আত্মগ্লানিময়, অথচ করুণ বিষণ্ণ সুরে বহিয়া চলিয়াছে। দৈবাহত প্রেমের ক্ষুব্ধ অভিযোগ ও বেদনাময় পূর্বস্মৃতি আশ্চর্য সুসংগতির সহিত অভিব‍্যক্তি লাভ করিয়াছে। ইহার দীপ্ত, জ্বালাময় বিকাশের সহিত তুলনায় গ্রন্থের অন‍্যান‍্য চিত্র--বৈপ্লবিক ষড়যন্ত্র, ইন্দ্রনাথের উত্তুঙ্গ ব‍্যক্তিত্ব, বটুর নীচ ঈর্ষা ও কানাই-এর গ্লানিকর সহানুভূতি, এলার নিষ্ক্রিয় প্রতিনিবেদন ---এই সমস্তই ম্লান ও নিষ্প্রভ হইয়াছে। চারিদিকের পিঙ্গল ভস্মাবরণমধ‍্যে একখণ্ড কাষ্ঠ যেমন অকস্মাৎ অগ্নিদীপ্ত হইয়া উঠে, সেইরূপ উপন‍্যাসটির ধূসর ও অস্পষ্ট বেষ্টনী-রেখার মধ‍্যে একমাত্র অতীনের প্রেমই উজ্জ্বল ও প্রাণধর্মী হইয়াছে --উপন‍্যাসের রত্ন-ভাণ্ডারে 'চার-অধ‍্যায়' -এর ইহাই একমাত্র বিশিষ্ট দান।

     রবীন্দ্রনাথের ক্ষুদ্রকায় উপন‍্যাসগুলির মধ‍্যে 'মালঞ্চ' (১৯৩৪) একটি বেশেষ স্থান অধিকার করে। উপন‍্যাসটির ক্ষুদ্রাবয়বের সহিত সংগতি রাখিয়াই ইহাতে যে সমস‍্যাটি আলোচিত হইয়াছে তাহাও ক্ষুদ্র। মৃত‍্যুশয‍্যাশায়িনী নীরজার ঈর্ষা-বিকার, প্রতিদ্বন্দ্বিনীর বিরুদ্ধে স্বামিপ্রেম ও ফুলবাগানের উপর তাহার অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখার প্রচণ্ড চেষ্টাই উপন‍্যাসের বিষয়। নীরজার দশ বৎসরের সার্থক প্রেম রোগজীর্ণ মনের ছোঁয়াচে হঠাৎ নীচ, সন্দেহাত্মক ঈর্ষায় রূপান্তরিত হইয়াছে। তাহার স্বামী আদিত‍্য এই ঈর্ষার অতর্কিত ধাক্কায় আবিষ্কার করিয়াছে যে, সে তাহার বাল‍্য-সঙ্গিনী ও কর্ম-সহযোগিনী সরলাকে ভালোবাসে এবং এই ভালোবাসা তাহার স্ত্রীর প্রতি কর্তব‍্যকে ছাপাইয়া দুর্বার হইয়া উঠিয়াছে। সরলা নীরব কর্মনিষ্ঠা ও অক্ষুণ্ণ আত্মসংযমের অন্তরালে বহুদিন যাবৎ আদিত‍্যের প্রতি ভালোবাসা অজ্ঞাতসারে পোষণ করিয়া আসিতেছে; তাহার বিবাহে অসম্মতিই এই ভালোবাসার অস্বীকৃত লক্ষণ। নীরজার ঈর্ষাই তাহাকে এই অস্বীকৃত প্রেম-সম্বন্ধে প্রথম সচেতন করিয়াছে। সরলার আত্মসংযম কিন্তু বৈরাগ‍্যপ্রিয়তার চরম রিক্ততায় পৌঁছায় নাই; যখন সে বুঝিয়াছে যে, এ প্রেম উভয়ের জীবনের সার্থকতার পক্ষে অবশ‍্য প্রয়োজনীয়, তখন সে ইহাকে প্রত‍্যাখ‍্যান করে নাই। তাহার কারাবরণ আত্মবলিদান বা সুলভ ভাবোচ্ছ্বাস নহে; ইহা একদিকে আত্মপরীক্ষার অবসর-সৃষ্টি, অন‍্যদিকে আদিত‍্যকে মরণোম্মুখ পত্নীর প্রতি অধিকৃত চিত্তে শেষ কর্তব‍্য পালন করিবার জন‍্য সুযোগ-প্রদান। উপন‍্যাসের মধ‍্যে রমেন হইল সকলের fiend, philosopher ও guide--- সে এই ক্ষুদ্র সংঘাতে আলোড়িত জীবন-নাট‍্যের সহানুভূতিপূর্ণ দর্শক। তাহার সূক্ষ্ম অন্তর্দৃষ্টিবলে সে এই সংঘাতের পরস্পর-বিরোধী শক্তিগুলি-সম্বন্ধে স্পষ্টে ধারণা করিয়া লইয়াছে --প্রত‍্যেকের নিগূঢ় উদ্দেশ‍্য ও ক্রিয়া-প্রণালী সহানুভূতির চক্ষে দেখিয়াছে ও বুঝিয়াছে। নীরজার ব‍্যর্থ, অভিমান-ক্ষুব্ধ প্রেমই যে তাহার সমস্ত অসহিষ্ণুতা, নির্মম আঘাত ও অনুদার কার্পণ‍্যের কারণ সেই গোপন রহস‍্য তাহার নিকট জলবৎ স্বচ্ছ। সরলার প্রতি তাহার সংকুচিত প্রেমনিবেদনে কোথাও যে একটা অজ্ঞাত অথচ দুর্লঙঘ‍্য বাধা আছে তাহা সে সহজ সংস্কারবলেই বুঝিয়াছে, সেইজন‍্যই তাহার প্রেম কখনও অশান্ত, উদবেল হইয়া উঠে নাই। কেবল আদিত‍্য সম্বন্ধে তাহার গভীর সূক্ষ্মদৃষ্টির সেরূপ কোনো অবিসংবাদিত প্রমাণ আমরা পাই না --কেননা এই রহস‍্য সে পূর্ব হইতে জানিলে সরলার প্রতি তাহার অনুরাগকে ফুটিতে দিত না। এই চারিজনে মিলিয়া উপন‍্যাসটির ক্ষুদ্র রঙ্গমঞ্চ ভরিয়া তুলিয়াছে।
     এ পর্যন্ত যাহা বলা হইল তাহা হইতে ধারণা হইবে যে, উপন‍্যাসটি অন‍্যান‍্য উপন‍্যাসের ন‍্যায়, একটি সাধারণ প্রেমের বিরোধ-কাহিনী; কিন্তু ইহার আসল বিশেষত্বের ইঙ্গিত ইহার নামকরণের মধ‍্যে নিহিত রহিয়াছে। মালঞ্চই ইহার প্রচ্ছদপট রচনা করিয়াছে; সমস্ত উপন‍্যাসটির আকাশ-বাতাস পুষ্পোদ‍্যানের গন্ধে সুরভির হইয়াছে। আদিত‍্য ও নীরজার প্রেমের অনুপম সুষমার রহস‍্য এইখানেই যে; এই প্রেম পুষ্প-সাহচর্যে ঠিক ফুলের মতোই বর্ণে গন্ধে বিকশিত হইয়া উঠিয়াছে। ইহার গতিবিধি, ইহার হ্রাস-বৃদ্ধি সমস্তই ফুলের বক্ষ-স্পন্দনের সহিত সমতালে নিয়মিত হইয়াছে। পুষ্পের মদির আবেশে ইহার নিবিড়তা ঘনীভূত হইয়াছে; ইহার ক্ষণস্থায়ী জীবনের অবসাদ ও অবসরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পরাগ-সৌরভ সঞ্চারিত হইয়া ইহার নবীন মাধুর্য ও সরসতাকে অক্ষুণ্ণ রাখিয়াছে। নীরজার প্রেমের সহিত তাহার স্বহস্তরচিত পুষ্পোদ‍্যানটির এক আশ্চর্য একাত্মতা সুপ্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। পুষ্পোদ‍্যানটি যেন এই প্রেমের একটি জীবন্ত নিদর্শন ও প্রতীক। সেইজন‍্য নীরজার ঈর্ষা প্রধানত এই ফুলবাগানের উপর স্বত্বাধিকার-প্রতিষ্ঠার পথ ধরিয়াই আত্মপ্রকাশ করিয়াছে। সে বুঝিয়াছে যে, বাগানের ফুল ও তাহার স্বামীর হৃদয়ে প্রেম ঠিক একই নিয়মে বিকশিত হয়; এক বিষয়ের অধিকার লোপ অপর বিষয়ে অধিকার লোপের অভ্রান্ত পূর্বসূচনা। ফুলবাগানই তাহার প্রেম-বিষয়ক প্রতিদ্বন্দ্বিতার যুদ্ধক্ষেত্র; এইখানেই তাহার প্রেমিক জীবনের জয়-পরাজয়ের চূড়ান্ত নির্ণয় হইবে। তাই সে এত ব‍্যাকুল, সর্বগ্রাসী আগ্রহের সহিত বাগানটিকে আঁকড়াইয়া ধরিয়াছে; তাই সে সরলাকে স্বামীর হৃদয় হইতে পারুক বা না পারুক বাগান হইতে নির্বাসন করিবার জন‍্য এত প্রবল জেদ দেখাইয়াছে। আবার তাহার ঈর্ষাক্ষত হৃদয়ের সহিত কীটদষ্ট ফুলের যে তুলনা ব‍্যঞ্জিত হয়, তাহা কেবল কাব‍্যালংকারের দিক দিয়া নহে। তাহার মনোবিকারের মধ‍্যে দিয়া যাহা অনতিকাল পূর্বে ফুলের মতো সুকুমার ও মনোজ্ঞ ছিল তাহারই বিকৃতি অনুভব করা যায়। শেলির The Sesitive Plant নামক বিখ‍্যাত কবিতাটি মানুষের ক্ষণস্থায়ী ও সূক্ষ্মানুভূতিময়; ফুলগুলিও রমণীর মতোই ব্রীড়াসংকুচিত ও স্পর্শাসহিষ্ণু। রবীন্দ্রনাথের উপন‍্যাসে অনেকটা সেইরূপ ভাবসাদৃশ‍্য অনুভব করা যায়। এই সাদৃশ‍্যই উপন‍্যাসটিকে সাধারণ ঈর্ষা-বিরোধের কাহিনী হইতে উচ্চতর কবিত্বের স্তরে উন্নীত করিয়াছে।
     নীরজার শেষ দৃশ‍্যের কায‍্যকলাপ কিন্তু এই ভাবগত সুসংগতির বিরোধিতা করে। হয়তো মনস্তত্ত্ব-বিশ্লেষণের দিক দিয়া তাহার শেষ মুহূর্তের তীব্র বিরাগ মানব-মনের যথাযথ চিত্র হইতে পারে। নিঃস্বত্ব হইয়া অন‍্যের হাতে স্বামি-সমর্পণের জন‍্য মনকে ত‍্যাগের উচ্চসুরে বাঁধা বাস্তব-জীবনে খুব বেশি সম্ভবপর হয় না--- বৈরাগ‍্যের প্রলেপ ভেদ করিয়া আদিম মনের তীব্র আসক্তি ও ভোগ-লিপ্সা ফুটিয়া বাহির হয়। সুতরাং এ ক্ষেত্রে নীরজার ব‍্যবহার খুবই সংগত ও স্বাভাবিক। কিন্তু উপন‍্যাসটির উৎকর্ষের প্রধান কারণ ইহার মনস্তত্ত্ব-বিশ্লেষণ নহে, ইহার ভাবগত সুষমা ও সামঞ্জস‍্য; এবং নীরজার অন্তিম মুহূর্তের ব‍্যবহারে এই ঐক‍্যের হানি হইয়াছে। উপন‍্যাসটির পটভূমি পুষ্পোদ‍্যান হইতে রুক্ষ-কর্কশ, পুষ্প-সৌরভহীন বাস্তব জগতে স্থানান্তরিত হইয়াছে। 'পারিব না, পারিব না', ---নীরজার এই শেষ-উচ্চারিত বাক‍্যে ঈর্ষার যে তীব্র, ঝাঁজালো সুর ফুটিয়াছে, তাহাতে ভাব-সংগতি ও বর্ণ-সুষমার মায়াজাল ছিন্ন-ভিন্ন হইয়া গিয়াছে ---মানব-প্রকৃতির এক অদম‍্য উচ্ছ্বাসের দমকা হাওয়া তাহাকে ইভের ন‍্যায় স্বর্গচ‍্যুত করিয়া পুষ্পোদ‍্যানের ক্ষীণ সুরভিটিকে নিঃশেষে উড়াইয়াছে। কলাকৌশলের দিক দিয়া এই পরিচ্ছেদটিকে একটা ত্রুটি বলিয়া বিবেচনা করা যাইতে পারে।

     ত্রুটি-সম্পর্কে আরও একটি বিষয়ের উল্লেখ করা যাইতে পারে। ক্ষুদ্র উপন‍্যাসে সুরগত ঐক‍্যের এত বেশি প্রয়োজনীয়তা যে, অনাবশ‍্যক অংশ নির্মমভাবে বর্জন করিতে হইবে। বাস্তবতার প্রয়োজনেও তাহাদের স্থান দেওয়া উচিত হইবে না। এই বিচার-নীতি-অনুসারে হলধর মালি ও রোশনী আয়ার প্রবর্তনের যৌক্তিকতা বিচার-সাপেক্ষ। রোশনীর একটা বিশেষ কর্তব‍্য আছে --সে নীরজার স্বগতোক্তির বাহন; নীরজার মান-অভিমান, ঈর্ষা-জ্বালা সমস্তই তাহাকে আশ্রয় করিয়া উচ্ছ্বসিত হইয়াছে, সুতরাং নীরজার চরিত্র-বিকাশের সহায়-হিসাবে তাহার একটা সার্থকতা আছে। তবে তাহার বাংলা ভাষায় এতটা অধিকার জন্মিয়াছে যে, তাহার হিন্দুস্থানিত্বের শেষনিদর্শন-স্বরূপ 'খোঁখী' উচ্চারণটি অনেকটা anachronism বা কাল-বৈষম‍্যের লক্ষণ‍্যের মতোই ঠেকে। হলধরের উপন‍্যাস-মধ‍্যে সেরূপ কোনো অপরিহার্য কর্তব‍্য নাই---সে কেবল নীরজার ঈর্ষা-জর্জর মনের একটা দিকের উপর আলোকপাত করিয়াছে। সরলার বিরুদ্ধে তাহার ঈর্ষা এতই অশোভনরূপে তীব্র হইয়াছে যে, বাগানের মালিদিগের মধ‍্যেও সে অবাধ‍্যতার প্রশ্রয় দিয়া সরলতা কর্তব‍্যপালন কঠোরতর করিয়া তুলিয়াছে। হলার এইটুকু পরিচয় যথেষ্ট হইত; কিন্তু ইহার বেশি পরিচয় দিতে গিয়া তাহার যেটুকু স্বতন্ত্র ব‍্যক্তিত্ব ফুটিয়াছে, তাহাতে উপন‍্যাসের ভাবসামঞ্জস‍্য বা সূক্ষ্ম সুরগত ঐক‍্যের হানি হইয়াছে বলিয়া মনে হয়। যে ক্ষুদ্র উপন‍্যাসের স্থান-সংকীর্ণতা এত অধিক যে, রমেন, সরলা ও আদিত‍্যের মতো প্রধান চরিত্রগুলিরও কেবল ছবিতেই (profile) আমাদের সন্তুষ্ট থাকিতে হয়, সেখানে হলার প্রতি মনোযোগের আধিক‍্য অনেকটা অপব‍্যয় বলিয়াই ঠেকে। আসল কথা, সময়বিশেষে বাস্তবপ্রিয়তাও একটা প্রলোভনের ফাঁদ হইয়া দাঁড়ায়; এবং এই প্রলোভন অতিক্রম করিতে খুব সূক্ষ্ম কলাকৌশল ও সামঞ্জস‍্যবোধের প্রয়োজন হয়। রবীন্দ্রনাথের মতো শ্রেষ্ঠ শিল্পী ও কলাবিদও সম্পূর্ণরূপে এই বিপদ হইতে আত্মরক্ষা করিতে পারেন নাই। এই সমস্ত সামান‍্য ত্রুটি-বিচ‍্যুতি বাদ দিলে 'মালঞ্চ' রবীন্দ্রনাথের শেষ বয়সের ক্ষুদ্র উপন‍্যাসগুলির মধ‍্যে বোধ হয় সর্বশ্রেষ্ঠ স্থান দাবি করিতে পারে।
     রবীন্দ্রনাথের সমস্ত উপন‍্যাসাবলী সমগ্রভাবে আলোচনা করিলে উপন‍্যাস-জগতে তাঁহার স্থান-সম্বন্ধ আমরা একটা ব‍্যাপক ধারণা করিতে পারি। পূর্বেই বলা হইয়াছে সে, বঙ্কিমচন্দ্রের পর বাংলা উপন‍্যাসের অগ্রগতি যখন রুদ্ধপ্রায় হইয়াছিল, তখন রবীন্দ্রনাথই তাহার জন‍্য নূতন পথ উন্মুক্ত করিয়াছেন। তাঁহার অসাধারণ প্রতিভা যাহা স্পর্শ করিয়াছে তাহাই দ‍্যুতিমান হইয়া উঠিয়াছে এবং উপন‍্যাসের উপর তাঁহার প্রভাবের যে ছাপ পড়িয়াছে তাহা মুছিবার নহে। আধুনিক বঙ্গ-উপন‍্যাস তাঁহার প্রদর্শিত পথে চলিয়াছে। কিন্তু তথাপি যেন মনে হয় উপন‍্যাস তাঁহার বিধি-নিয়োজিত কর্মক্ষেত্র নহে। তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও অসাধারণ কবি-প্রতিভাই তাঁহাকে এই বিদেশ-পর্যটনে অবাধ ছাড়পত্র দিয়াছে। তাঁহার উপন‍্যাসাবলী জীবনের জনতাকীর্ণ, গ্রন্থিবহুল কেন্দ্রভাগের ভিতর দিয়া নিজেদের পথ করিয়া লয় নাই; তাহারা অধিকার করিয়াছে মানব-জীবনের অপেক্ষাকৃত নির্জন সীমান্ত-প্রদেশ। আমাদের জনবহুল পল্লীগ্রাম, দ্বন্দ্ববহুল সংসার ও পরিবার, দারিদ্র ও ঈর্ষাবিদ্বেষের খরতাপক্লিষ্ট জীবনযাত্রা ---ইহাদের অন্তর্নিহিত প্রখর বাস্তবতা হইতে তাঁহার সৌন্দর্যপ্রিয় কবি-প্রকৃতি সংকুচিত হইয়াছে। শিলং-এর বর্ষাধৌত পার্বত‍্য প্রকৃতি, ইহার প্রেমের দীপ্ত অরুণিমার বহিঃপ্রকাশ-স্বরূপ সূর্যাস্তরাগ, কলিকাতার নক্ষত্রদীপ্ত, শান্তিস্নিগ্ধ নীরব অন্ধকার, নদীতীরের শ‍্যামল তরু-শ্রেণীর অন্তরালমুক্ত সূর্যোদয় ---ইহারাই তাঁহার উপন‍্যাসের পাত্র-পাত্রীদের কর্মক্ষেত্রের প্রতিবেশ রচনা করিয়াছে। অসাধারণত্বের প্রতি কবি-প্রতিভার যে স্বাভাবিক প্রবণতা আছে, তাহা তাঁহার উপন‍্যাসকেও প্রভাবিত করিয়াছে। বিষয়-নির্বাচন, চরিত্র-পরিকল্পনা, অন্তর্নিহিত সমস‍্যার বিশেষত্ব ---সর্বত্রই এই অসাধারণত্বের ছাপ আছে। তাঁহার সৃষ্ট চরিত্রগুলিকে ঠিক আমাদের প্রতিবেশী, আমাদের সাধারণ জীবনের সমসুখদুঃখভাগী বলিয়া মনে করা যায় না---'চোখের বালি'র পর হইতেই তিনি এই স্বাতর‍্য অবলম্বন করিয়াছেন---'চোখের বালি'ই তাঁহার শেষ সামাজিক ও পারিবারিক উপন‍্যাস। গোরা, আনন্দময়ী, নিখিলেশ, সন্দীপ, অমিত, লাবণ‍্য, কুমুদিনী ---ইহাদিগকে হঠাৎ আমাদের প্রাত‍্যহিক জীবনের বহুপদ চিহ্নাঙ্কিত রাস্তাঘাটে দেখিবার উপায় নাই। ইহাদের সমস‍্যা, ইহাদের জীবনযাত্রা, ইহাদের আদর্শ---সমস্তের মধ‍্যেই একটা অসাধারণত্বের স্পর্শ আছে। ইহারা বাংলা ভাষা ব‍্যবহার করে, অনেকে বাঙালি পোশাক-পরিচ্ছেদও পরিধান করে, বঙ্গসমাজ ও পরিবারের সঙ্গে ইহাদের একটা শিথিল সম্বন্ধে আছে, বাঙালি-জীবনের মধুর রসধারা ইহার আকণ্ঠ পান করিয়াছে----কিন্তু ইহাদের নিগূঢ় বক্তিত্বের অনন‍্যসাধারণ বৈশিষ্ট‍্য প্রকৃতপক্ষে সমাজ-ও-পরিবার-নিরপেক্ষ। শরৎচন্দ্রের সৃষ্ট চরিত্রের সঙ্গে ইহাদের তুলনা করিলেই ইহাদের প্রকৃতিগত পার্থক‍্য সহজেই বুঝা যাইবে। তাই রবীন্দ্রনাথের গভীর প্রভাব সত্ত্বেও তাঁহার উপন‍্যাস-ক্ষেত্রে প্রকৃত শিষ‍্য কেহ নাই ---তিনি কোনো নূতন বংশের প্রতিষ্ঠাতা হন নাই। তাঁহার প্রণালীর গূঢ়তত্ত্ব অননুকরণীয়। তাই রবীন্দ্রনাথের উপন‍্যাসাবলী বঙ্গসাহিত‍্যের অমূল‍্য স্থায়ী সম্পদ হইলেও উপন‍্যাসের অগ্রগতির প্রধান ধারার সহিত ইহারা যোগরহিত। ঔপন‍্যাসিক উপাদানের সহিত অসাধারণ কবি-প্রতিভার পুনরায় সমন্বয় না হইলে ভবিষ‍্যৎ যুগে রবীন্দ্রনাথের প্রকৃত অনুবর্তী মিলিবে না।
( ৯ )
রবীন্দ্রনাথের ছোটো গল্প

ছোটো গল্প ও উপন‍্যাসের মধ‍্যে যে প্রভেদ, তাহা কেবল আকারগত নহে, অনেকটা প্রকৃতিগত। ছোটো গল্পের আয়তন ক্ষুদ্র, সেইজন‍্য ইহার আর্টও স্বতন্ত্র। উপন‍্যাসের ব‍্যাপকতা ও বৃহৎ পরিধি নাই বলিয়াই ইহার বিষয়-নির্বাচনে একটু বিশেষ নৈপুণ‍্যের প্রয়োজন। ইহাতে জীবনের এমন একটি খণ্ডাংশ বাছিয়া লইতে হইবে, যাহা ইহার স্বল্প-পরিসরের মধ‍্যেই পূর্ণতা লাভ করিবে। ইহার আরম্ভ ও উপসংহার উভয়ের মধ‍্যেই বিশেষ রকম নাটকোচিত গুণের সন্নিবেশ থাকা চাই। উপন‍্যাসের মতো ধীর-মন্থর গতিতে ইহার আরম্ভ হইবার অবসর