Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা - ১১২, ১১৩ ও ১১৪

2020-08-02
সংঘর্ষ অবশ‍্যম্ভাবী। কিন্তু ইহার বিশেষত্ব এই যে, এখানে প্রেমের নিগূঢ় দাবিই বনোয়ারীলালের বিদ্রোহাগ্নিতে ইন্ধন জোগাইয়াছে। সে জমিদার-বংশের বড়ো ছেলে বলিয়া নহে, তাহার পুরুষকারের স্বাধীন অধিকারের দ্বারাই নিজ স্ত্রী কিরণলেখার চিত্র জয় করিয়া লইতে চাহে---তাহার বাড়ির অতি-নিয়মিত ব‍্যবস্থা তাহার প্রেমিক হৃদয়ের পক্ষে যথেষ্ট খোলা ও উদার নহে বলিয়াই বংশপরম্পরাগত প্রথার সহিত তাহার বিরোধের সূত্রপাত। আর তাহার সবচেয়ে বড়ো দুঃখ এই যে, কিরণও তাহার এই বিশাল প্রেমিক-হৃদয়ের কোনো সম্মান না রাখিয়া তাহার শত্রুদলে যোগ দিয়াছে, তাহার বিরুদ্ধাচারী পরিবারবর্গের সহিত একাত্ম হইয়া মিশিয়া গিয়াছে---প্রেমের স্নিগ্ধরশ্মি-পরিবৃতা কিরণলেখা হালদারগোষ্ঠীর বড়বৌ-এর মধ‍্যে আত্মবিসর্জন দিয়াছে। এই গূঢ় বিরোধ ও অসংগতির কাহিনীটি যেমন সূক্ষ্ম অন্তর্দৃষ্টির সহিত বর্ণিত হইয়াছে, বনোয়ারীর চরিত্র-বিশ্লেষণও সেইরূপ সুন্দর হইয়াছে।
     এই বংশগৌরবের নির্দোষ, নিরীহ দিকের চিত্র 'ঠাকুরদা' গল্পে দেওয়া হইয়াছে। ন য়নজজোড়ের বাবু-বংশের শেষ প্রতিনিধি ঠাকুরদাদার বংশাভিমানে এমন একটি করুণ আত্মপ্রতারণা, মধুর সুষমা ও সহজ ভদ্রতা আছে যে, ইহা আমাদের বিরোধভাবকে মাথা তুলিতে দেয় না। 'ঠাকুরদা' গল্পটি কোনো সত‍্যান্বেষী, বাস্তবতাপ্রবণ লেখকের হাতে পড়িলে Thackeray র "Book of Snobs"-এর একতম অধ‍্যায়ে পরিণত হইতে পারিত --- রবীন্দ্রনাথের গভীর সহানুভূতি ইহাকে একটি করুণ হাস‍্যরসে অভিষিক্ত করিয়া সুন্দর ও রমণীয় করিয়া তুলিয়াছে।
     কতকগুলি গল্পে আমাদের সমাজের প্রধান কলঙ্ক ---বিবাহের অত‍্যাচার ---আলোচিত হইয়াছে, যথা, 'দেনাপাওনা', 'যজ্ঞেশ্বরের যজ্ঞ', 'হৈমনতী', ইত‍্যাদি। এই বিষয়ের আলোচনা বাংলা উপন‍্যাসের একটি অপরিহার্য অঙ্গ হইয়া দাঁড়াইয়াছে, সুতরাং এই গল্পগুলিতে রবীন্দ্রনাথ বঙ্গীয় উপন‍্যাস-সাহিত‍্যের খুব সাধারণ পথেরই অনুসরণ করিয়াছেন। এখানে লেখক কেবল অবিমিশ্র করুণ রসেরই উদ্রেক করিয়াছেন, কেবল 'হৈমন্তী' গল্পে হৈমন্তীর চরিত্রাঙ্কনে একটু বিশেষত্ব আছে। মোট কথা, এই শেষোক্ত শ্রেণীর গল্পগুলিতে রবীন্দ্রনাথের মৌলিকতা বিশেষ বিকশিত হইয়া উঠে নাই।
     ৩.  তৃতীয় পর্যায়ের গল্পগুলিতে লেখক রোমান্স-স‍‍ৃষ্টির এক অভিনব পন্থা আবিষ্কার করিয়াছেন। ইহাতে রবীন্দ্রনাথের কবি-প্রতিভা ও কবিসুলভ সূক্ষ্ম অন্তর্দৃষ্টি ঔপন‍্যাসিকের সহায়তাবিধানে অগ্রসর হইয়াছে। তিনি স্বভাবসিদ্ধ কবিত্ব শক্তির বলে তাঁহার সৃষ্ট চরিত্রগুলির কার্যকলাপ ও চিন্তাধারার সহিত বিশাল বহিঃপ্রকৃতির একটি নিগূঢ় সম্বন্ধ স্থাপন করিয়া অতি সাধারণ তুচ্ছ ঘটনাবলীরও আশ্চর্যরূপ রূপান্তর-সাধন করিয়াছেন। নিতান্ত অনায়াসে, সামান‍্য দুই-একটি রেখাপাতের দ্বারা তিনি মানব-মনের সহিত বহিঃপ্রক‍ৃতির অন্তরঙ্গ পরিচয়ের সিংহদ্বারটি খুলিয়া দিয়াছেন---তাঁহার তুচ্ছ গ্রাম‍্য কাহিনীগুলিও প্রকৃতির সূর্যচন্দ্রনক্ষত্রখচিত চন্দ্রাতপের তলে, তাহার আভাস-ইঙ্গিত- আহ্বান-বিজড়িত রহস‍্যময় আকাশ-বাতাশের মধ‍্যে, এক অপরূপ গৌরবে মণ্ডিত হইয়া উঠিয়াছে।
     আমরা পূর্বেই কতকগুলি গল্পের মধ‍্যে এই বিশেষত্ব লক্ষ‍্য করিয়াছি। কিন্তু কতকগুলি গল্প একেবারে আদ‍্যোপান্ত প্রকৃতির সহিত এই নিগূঢ় সম্পর্কের উপর প্রতিষ্ঠিত। 'সুভা' নামক গল্পটি মূক বালিকার সহিত মৌন বিরাট প্রকৃতির নিগূঢ় ঐক‍্যের পরিচয়ে আগাগোড়া পরিপূর্ণ। 'অতিথি' গল্পটি রবীন্দ্রনাথের এই ক্ষমতার চূড়ান্ত উদাহরণ। 'তারাপদ' লেখকের এক অদ্ভুত সৃষ্টি। এই সঞ্চরণশীল, প্রবহমান, চিরচঞ্চল পৃথিবীর প্রাণের সহিত তাহার এক আশ্চর্য উদাহরণ। 'তারাপদ' লেখকের এক অদ্ভুত সৃষ্টি। এই সঞ্চরণশীল, প্রবহমান, চিরচঞ্চল পৃথিবীর প্রাণের সহিত তাহার এক আশ্চর্য সহানুভূতি ও গভীর একাত্মতা আছে। মানুষের এই অবিশ্রান্ত গতিশীলতা নাই বলিয়াই তাহার ভালোবাসার মধ‍্যে এমন একটা প্রবল মোহ ও সংকীর্ণ আসক্তি দেখা যায়। তারাপদের স্নেহবন্ধনের মধ‍্যে ধরিত্রীমাতার সেই উদার, অনাসক্ত ভাব, সেই শিথিলতা ও পক্ষপাতহীনতা আছে। মানুষ নিজের জন‍্য যে ছোটো-ছোটো ঘর রচনা করে, তাহার চারিদিকের স্নেহের বেষ্টনের মধ‍্যে এক গাঢ়তর মোহাবেশ আছে---প্রকৃতির স্নেহে কোনো মোহাবেশ, কোনো ব‍্যাকুল বাষ্পসজলতা নাই। তারাপদ প্রকৃতির এই উদার অনাসক্তি, এই মোহমুক্ত চির-চঞ্চলতার মনুষ‍্য-প্রতিরূপ। ওয়ার্ডসওয়ার্থ তাঁহার লুসি, রুথ ও অন‍্যান‍্য গ্রাম‍্য নর-নারীর চিত্রে প্রকৃতির কল‍্যাণী মূর্তির একটা বিশেষ দিককে আকার দিয়াছেন --- কিন্তু তাঁহার এই মূর্তি-কল্রপনা মূলত তাঁহার প্রকৃতি-বিষয়ক দার্শনিক মতবাদের কবিত্বময় রূপান্তর। যাহার সেই দার্শনিক মতবাদে বিশ্বাস নাই, সে এই চিত্রগুলির বৈধতিয় ও নৈতিক উৎকর্ষ-বিষয়ে সন্দিহান হইবে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তাঁহার তারাপদর চরিত্রে প্রকৃতির সহিত যে সম্পর্কের ইঙ্গিত দিয়াছেন তাহা কোনো বিশেষ দার্শনিক মতবাদের উপর নির্ভর করে না, সর্বসাধারণের স্বাধীন অনুভূতিই তাহার রসোপলব্ধি করিতে পারে।
     তারাপদর সহিত 'আপদ' গল্পের নীলকণ্ঠের কতকটা অবস্থাগত সাদৃশ‍্য আছে, এবং এই দুই চরিত্রের তুলনা করিলে তারাপদ-চরিত্রের গূঢ় মাধুর্য ও পবিত্রতা বিশেষরূপে বুঝা যাইবে। তারাপদ তাহার অবারিত সহজ প্রাণের বলেই মতিবাবুদের পরিবারের সহিত মিলিত হইয়াছে; নীলকণ্ঠ জলমগ্ন হইয়া দৈববশে কিরণদের বাগানবাড়িতে আসিয়া পড়িয়াছে। একের অবাধ, অসংকোচ আতিথ‍্যগ্রহণ, অপরের কুণ্ঠিত অনুগৃহীত ভাব। তারপর পরস্রপরের চরিত্রানুরূপ উভয়ের মনোরঞ্জনের উপায়ও বিভিন্ন --তারাপদ সাঁতার দিয়া, কাজকর্মে সাহায‍্য করিয়া, নিজ সহজ শক্তির অবলীলাক্রম বিকাশে ও দাশু রায়ের পাঁচালি গাহিয়া কর্তা-গৃহিণী হইতে আরম্ভ করিয়া মাঝিমাল্লাদের পর্যন্ত মনোহরণ করিয়াছে। নীলকণ্ঠ যাত্রার দলের গানের দ্বারা, কতকটা অভিনয়ের কৃত্রিম উপায়ে কেবল কিরণবালার প্রিয়পাত্র হইয়াছে, তাহার প্রচণ্ড দৌরাত্ম‍্যের জন‍্য বাড়ির অপর সকলের বিরক্তিভাজন হইয়াছে। তারপর তারাপদর উদার হৃদয়ে ঈর্ষা, অভিমান প্রভৃতির লেশমাত্র নাই; সে প্রকৃতিমাতার স্তন‍্যপানে লালিত, তাহার অন্তঃকরণে কোনো সংকীর্ণতার ছায়া পড়ে নাই। নীলকণ্ঠ কিরণের স্নেহের ভাগ লইয়া সতীশের প্রতি ঈর্ষাপরবশ হইয়াছে ও চৌর্যরূপ হেয় কর্মে পর্যন্ত নামিয়াছে। কিন্তু প্রকৃতি তাহাকেও কতকটা ঔদার্য ও স্নেহশীলতা হইতে বঞ্চিত করে নাই; তাহার ঈর্ষাপরায়ণতা তাহার বঞ্চিত, স্নেহবুভুক্ষু হৃদয়ের একটা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া মাত্র, ইহাতে নীচতার কোনো স্পর্শ নাই। আবার দুইজনের মধ‍্যে আবির্ভাবের যেমন, তিরোধানেরও তেমনই একটা

বিভিন্নতা আছে---তারাপদ তাহার সমস্ত স্নেহবন্ধন ছিন্ন করিয়া, তাহাকে বশীকরণের সমস্ত আয়োজন পায়ে ঠেলিয়া দিয়া, উদাস অনাসক্ত প্রকৃতিমাতার বক্ষে লুকাইয়াছে; নীলকণ্ঠ সকলের বিরাগ লইয়া ও একের ক্ষুব্ধ স্নেহমাত্র সম্বল করিয়া নিতান্ত অনাদৃতভাবে পরিত‍্যক্ত হইয়াছে। তারাপদ যে প্রকৃতির সহিত একাত্ম, নীলকণ্ঠ তাহার প্রসাদের কণামাত্র পাইয়াছে।
     নীলকণ্ঠের চরিত্রের প্রধান বিশেষত্ব স্নেহের মায়াদণ্ডস্পর্শৈ তাহার সুপ্ত পুরুষোচিত আত্মসম্নানবোধের উর্দবোধন। লেখক অতি নিপুণতার সহিত তাহার এই গূঢ় পরিবর্তনের ইতিহাস বিবৃত করিয়াছেন। 'সমাপ্তি' গল্পে মৃণ্ময়ীর ন‍্যায় নীলকণ্ঠও অতি অল্পকালের মধ‍্যে ভালোবাসার স্পর্শে আত্মবিস্মৃত বাল‍্যকাল হইতে পরিণত যৌবনে অবতীর্ণ হইয়াছে। ভালোবাসার প্রভাবে এই মানসিক গূঢ় পরিবর্তন রবীন্দ্রনাথের মনস্তত্ত্ব-বিশ্লেষণে মৌলিকতার পরিচয় দেয়, এবং ইহা আমাদের সামাজিক অবস্থার সহিত বেশ সহজভাবেই মিলিয়াছে।
     ৪.  এইবার চতুর্থ পর্যায়ের গল্পগুলি আলোচনা করিব। সাধারণ বাঙালি-জীবনের সহিত অতিপ্রাকৃতের সংযোগসাধন একদিক দিয়া বিশেষ সহজ, অপর দিকে বিশেষ আয়াসসাধ‍্য। সহজ এইজন‍্য যে, আমাদের মধ‍্যে এখনও কতকগুলি বিশ্বাস ও সংস্কার সজীবভাবে বর্তমান আছে, যাহাদের অতিপ্রাকৃতের প্রতি একটা স্বাভাবিক প্রবণতা আছে। আবার অন‍্য দিকে আমাদের সাধারণ জীবন এতই বিশেষত্বহীন ও ঘটনা বিরল যে, ইহার মধ‍্যে মনোবিজ্ঞানসম্মত উপায়ের দ্বারা অতিপ্রাকৃতের অবতারণা নিতান্ত দুরূহ। 'সম্পত্তি-সমর্পণ', 'গুপ্তধন', প্রভৃতি কয়েকটি গল্প আমাদের সহজ ভৌতিক বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত ---সেগুলিতে রবীন্দ্রনাথের বিশেষ কলাকুশলতার পরিচয় নাই। দ্বিতীয় শ্রেণীর গল্পের যে প্রতিবন্ধক তাহা তিনি আশ্চর্য কল্পনা সমৃদ্ধির সহায়তায় অতিক্রম করিয়াছেন। 'নিশীথে', 'ক্ষুধিত পাষাণ' ও 'মণিহারা' এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত।
     প্রকৃত, বাস্তব-জীবনের সহিত অতিপ্রাকৃতের সমন্বয়-সাধনের দুরূহতার বিষয়ে পূর্বেই বলা হইয়াছে। ইংরেজ কবি কোলরিজ এ বিষয়ে---অপ্রতিদ্বনদ্বী শিল্পী। কিন্তু তাঁহাকেও অতিপ্রাকৃতের উপযুক্ত ক্ষেত্র রচনা করিতে অনেক আয়াস পাইতে হইয়াছে। তাঁহার Ancient Mariner ও Christabel উভয় কবিতাতেই তাঁহাকে নৈসর্গিকের সীমা লঙ্ঘন করিতে হইয়াছে, শরীরী প্রেতের আবির্ভাব ঘটাইতে হইয়াছে। আবার যে প্রাকৃতিক দৃশ‍্যের মধ‍্যে তাঁহাকে এই অনৈসর্গিকের অবতারণা করিতে হইয়াছে তাহাতেও অজ্ঞাত, অপরিচিত সুদূরের রহস‍্য মাখানো। 'Ancient Mariner'-এ মেরুপ্রদেশের নিঃসঙ্গ, ধবল তুষারস্তূপ, রৌদ্রদগ্ধ, নিবাতনিষ্কম্প অনন্ত মহাসাগরের নিবিড় নীরবতা, চঞ্চলশিখা, বিচিত্রাভ বাড়বানলের মধ‍্যে তাঁহাকে অতিপ্রাকৃতের আসন রচনা করিতে হইয়াছে। পরিচিতমণ্ডলীর মধ‍্যে আসিয়া তাঁহাকে মায়াতরী ডুবাইতে হইয়াছে। 'Christable' -এও নিশীথ-স্তব্ধ অরণ‍্যানী ও মধ‍্যযুগের রহস‍্যমণ্ডিত দুর্গাভ‍্যন্তরেই, প্রেতলোককে আমন্ত্রণ করিতে হইয়াছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ আশ্চর্য কুহকবলে আমাদের অতিপরিচিত গৃহাঙ্গনের মধ‍্যে অতিপ্রাকৃতকে আহ্বান করিয়া আনিয়াছেন এবং নৈসর্গিকের সীমা ছড়াইয়া এক পদও অগ্রসর হন নাই। ভৌতিকের মনোবিজ্ঞানসম্মত যে ব‍্যাখ‍্যা ---"the spot in the brain that will show itself out"। মস্তিষ্কবিকারের বাহ‍্য অভিব‍্যক্তি --তাহা তিনি তাঁহার গল্পগুলির মধ‍্যে সম্পূর্ণভাবে অবলম্বন করিয়াছেন। তাঁহার গল্পগুলির প্রত‍্যেকটিই আধুনিক বিজ্ঞানের কঠোরতম পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হইতে পারিবে।
     'নিশীথে' গল্পটি দ্বিতীয়বার পরিণীত, প্রথম স্ত্রীর প্রতি অপরাধ হেতু গুরুভারগ্রন্থ স্বামীর সাময়িক মনোবিকার হইতে উদ্ভূত। মৃত‍্যুশয‍্যাশায়িনী প্রথমা স্ত্রীর ত্রস্ত, ব‍্যাকুল প্রশ্ন 'ওকে, ওকে, ওকে গো' অনুতপ্ত স্বামীর মস্তিষ্কে এমন গভীর, অনপনের রেখাতে অঙ্কিত হইয়া গিয়াছে যে, সমস্ত বিশ্বব্রহ্মণ্ড এই কয়েকটি সামান‍্য আর্তবাণীর প্রতিধ্বনিতে পূর্ণ হইয়া উঠিয়াছে, সমস্ত আকাশ-বাতাশ আপন গভীর, অতলস্পর্শ স্তরে উহার শঙ্কিত শিহরণটুকু, উহার ব‍্যথিত রেশটুকু ধরিয়া রাখিয়াছে। আর মনোবিকারটুকু ঘটাইতে লেখকের বিশেষ আয়োজন-বাহুল‍্য করিতে হয় নাই---একটা উপনগরস্থ বাগানবাড়ির ম্লান, জ‍্যোৎস্নালোকিত বকুলবেদী বা পদ্মার তটে কাশবন-পরিপ্লুত, নির্জন বালুতটের মধ‍্যেই অতিপ্রাকৃতের শিহরণ জাগিয়া উঠিয়াছে। অথচ সমস্ত গল্পটির মধ‍্যে সম্ভবের সীমা অতিক্রম করিয়াছে এমন একটি রেখাও নাই। এই অতিপ্রাকৃতের অসীম সাংকেতিকতা আরব‍্য-উপন‍্যাস-বর্ণিত বোতলের মধ‍্যে আবদ্ধ দৈত‍্যদেহের ন‍্যায় সংকীর্ণপরিধি বাঙালি-জীবনের মধ‍্যে সহজেই স্থান লাভ করিয়াছে।
     'মণিহারা'ও অনেকটা 'নিশীথে'র ন‍্যায় সদ‍্যঃ- পত্নীবিয়োগবিধূর স্বামীর মনোবিকারের কাহিনী। ইহার বিশেষত্ব এই যে, এই তুষারশীতল, মৃত‍্যুরহস‍্যগূঢ় স্বপ্নকাহিনীর চারিদিকে একটা ইস্পাতের মতো শক্ত বাস্তবতার বন্ধন আঁটিয়া দেওয়া হইয়াছে। এই অদ্ভুত স্বপ্নবৃত্তান্ত যিনি বর্ণনা করিয়াছেন তাঁহার চক্ষে স্বপ্নজড়িমার লেশমাত্র নাই; বরঞ্চ একটা তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণশক্তি শানিত ছুরিকাগ্রভাগের ন‍্যায় চকচক করিতেছে। স্ত্রী-পুরুষের পরস্পর সম্বন্ধের মধ‍্যে আদিম রহস‍্য ও বর্তমান যুগের সমাজে সেই সনাতন নীতির বৈপরীত‍্য---এই অতি গভীর চিন্তাশীলতাপূর্ণ আলোচনার মধ‍্যে বুদ্ধি-তর্কের অতীত অতীন্দ্রিয় জগতের ভয়াবহ ইঙ্গিতটি আশ্চর্য সুসংগতির সহিত সন্নিবিষ্ট হইয়াছে। এই realistic stting বা বাস্তব প্রতিবেশের মধ‍্যে অতিপ্রাকৃতের অপরূপতা আরও রহস‍্যঘন হইয়া উঠিয়াছে। গল্পের উপসংহারটিও আবার বাস্তব সত‍্যকে প্রাধান‍্য দিয়া একটা সংশয়াকুল, সন্দেহবিজড়িত অনিশ্চয়তার মধ‍্যে গল্পটিকে হঠাৎ শেষ করিয়া দিয়াছে। এই সন্দেহ-দোলায় দোলায়মান পাঠকের মন বলিতে থাকে "Did I dream or Wake?"
     'ক্ষুধিত পাষাণ'-এর অতিপ্রাকৃতের মধ‍্যে বাদশাহি যুগের সমস্ত ঐশ্চর্য দীপ্তি, রাজান্তঃপুরের সমস্ত অব‍্যক্ত ক্রন্দন, সমস্ত যুগযুগান্তরসঞ্চিত ক্ষুদ্র দীর্ঘশ্বাস তাহাদের ইন্দ্রজাল বর্ষণ করিয়াছে। বিজন প্রাসাদের কক্ষে কক্ষে অতীত যুগের বিলাস-বিভ্রম উহার অতীনদ্রিয় স্পর্শ ও রহস‍্যময় সংকেত ছড়াইয়া রাখিয়াছে। কবি যেন এই পঙ্কিল উচ্ছ্বসিত কামনাপ্রবাহের মধ‍্যে হইতে তাহার সমস্ত "বস্তু-অংশ বর্জন করিয়া

রস অংশ ছাঁকিয়া লইয়াছেন।" ভাষার ধ্বনি ও ব‍্যঞ্জনা-সাংকেতিকতায় এক De Quincey -র Dream Visions ভিন্ন রবীন্দ্রনাথের "ক্ষুধিত পাষাণ" - এর অনুরূপ কিছু ইংরাজি সাহিত‍্যে খুঁজিয়া পাওয়া দুষ্কর। অবিচ্ছিন্ন সংগীতপ্রবাহে বোধ হয় De Quincey রবীন্দ্রনাথ হইতে শ্রেষ্ঠ; কিন্তু রবীন্দ্রনাথের বর্ণনায় ইংরেজ লেখকের যে প্রধান দোষ বস্তুহীনতা ও ভাবের কুহেলিকাময় অস্পষ্টতা---তাহার লেশমাত্র চিহ্ন পাওয়া যায় না। আবার এই বিস্ময়কর অভিজ্ঞতার বিবৃতি হইয়াছে স্টেশনের বিশ্রামাগারে ট্রেন-প্রতীক্ষার অবসরে। এখানেও 'realistic setting' টি লেখককে গল্পের আকস্মিক পরিসমাপ্তি ঘটাইতে সুযোগ দিয়াছে---তাঁহাকে দীর্ঘ ব‍্যাখ‍্যা দিবার অসুবিধা ভোগ করিতে দেয় নাই। এই তিনটি অতিপ্রাকৃত গল্প রবীন্দ্রনাথের আশ্চর্য কল্পনাশক্তির পরিচয় দেয় ---পৃথিবীর যে-কোনো ঔপন‍্যাসিক এই শক্তিতে গৌরবান্বিত হইতে পারিতেন। ইহা ছাড়া, আরও কতকগুলি গল্প আছে যাহাতে অতিপ্রাকৃতের ছদ্মবেশে বস্তুত প্রকৃত বিষয়েরই বর্ণনা পাওয়া যায়। 'কঙ্কাল' গল্পটিতে কথাগুলি দেওয়া হইতেছে মৃতা রমণীর মুখে, কিন্তু মৃতের এই আত্মজীবন-কাহিনীতে অতিপ্রাকৃতের তুষারশীতল স্পর্শটি আনিবার কোনো চেষ্টা নাই। যে প্রগলভা, রূপযৌবনমোহাবিষ্টা রমণী গল্পটি বলিতেছে, সে দুই-চারিটি মর্ত‍্যলোকসুলভ ব‍্যঙ্গবিদ্রূপ ছাড়া প্রেতলোকের বিশেষত্ব কিছু অর্জন করিয়াছে বলিয়া মনে হয় না। 'জীবিত ও মৃত' গল্পটিতে একটি অসাধারণ মনোভাবের বিশ্লেষণ-চেষ্টা হইয়াছে, কিন্তু ইহাতে লেখক কৃতকর্য হইতে পারিয়াছেন বলিয়া আমার মনে হয় না। জীবিতা শ্মশান-প্রত‍্যাগতা কাদম্বিনী নিজেকে সত‍্য সত‍্যই মৃত বলিয়া বিশ্বাস করিয়াছে, এবং লেখক তাহার চিন্তায় ও ব‍্যবহারে একপ্রকার সুদূর নির্লিপ্ততার ভাব মাখাইয়া দিতে চেষ্টা করিয়াছেন সত‍্য কিন্তু ইহার মধ‍্যে সেরূপ অনুভূতির গভীরতা নাই। সুতরাং গল্পের অন্তর্নিহিত ভাবটি কল্পনারসে ভরপুর হইয়া বিকশিত হইয়া উঠে নাই।
     এইখানে রবীন্দ্রনাথের গল্প-রচনার প্রধান যুগটির পরিসমাপ্তি হইয়াছে, এবং নিতান্ত আধুনিক সময়ে তিনি যে গল্পসাহিত‍্যের নূতন অনুশীলন আরম্ভ করিয়াছেন, তাহার সহিত পুরাতন গল্পগুলির এখানে ব‍্যবচনছেদ-রেখা টানা যাইতে পারে। আধুনিক গল্পগুলির আদর্শ ও রচনা-প্রণালী পূর্বতন গল্প হইতে অনেকটা বিভিন্ন। এই প্রভেদ প্রথমত বিষয়-নির্বাচনেই দেখা যায়। পূর্ব গল্পগুলি আমাদের সনাতন জীবনযাত্রার গভীর মর্মস্থল হইতে উদ্ভূত; এক-একটি গল্প যেন ইহার হৃদ-পদ্মের এক-একটি বিকশিত পাপড়ি। ইহাদের মধ‍্যে যে সমস‍্যাগুলি আলোচিত হইয়াছে, তাহা হৃদয়ের গভীররসে পরিপূর্ণ হইয়া উঠিয়াছে; তাহারা কেবল জীবনের উপরিভাগে একটা বিক্ষোভ ও আলোড়ন সৃষ্টি করে নাই। নূতন গল্পগুলির মধ‍্যে এই বাহিরের চাঞ্চল‍্য ও আন্দোলনকে অবলম্বন করিয়া বৈচিত‍্য আহরণের চেষ্টা হইয়াছে। হয়তো লেখক অনুভব করিয়াছিলেন যে, পুরাতন রসধারা শুষ্কপ্রায় হইয়া উঠিয়াছে, সেদিকে আর নূতন কিছু করিবার সম্ভাবনা অল্প সুতরাং আমাদের পুরাতন সমাজের চারিদিকে যে নবীন উন্মাদনা ফেনিল হইয়া উঠিতেছে, যে অশান্ত তরঙ্গভঙ্গ পুরাতন উপকূলের আশে-পাশে মুখরিত হইতেছে, তাহারাই বিদ্রোহ-বেগটি জীবনের ছন্দে তালে গাঁথিয়া তুলিতে তিনি যত্নবান হইয়াছেন। এই নূতন যুগের সমস‍্যাগুলি পুরাতনদের ন‍্যায় এত গভীর ও ব‍্যাপক নহে; ব‍্যক্তিবিশেষ বা শ্রেণীবিশেষের মধ‍্যেই ইহাদের প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া সীমাবদ্ধ। ইহারা প্রায়ই বুদ্ধিগ্রাহ‍্য, তীক্ষ্ণতর্ক কণ্টকিত; বুদ্ধির স্তর অতিক্রম করিয়া এখনও হৃদয়ভাবের গভীরতর স্তরে অবতরণ করে নাই। ইহাদের প্রভাব হইতে বিদ্রোহের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ, চোখাচোখা বুলি, তীক্ষ্ণ বিদ্রূপবাণ চারিদিকে ছুটিতে থাকে, অশ্রুর গভীর প্রবাহ উৎসারিত হয় না। তথাপি ইহাদের নূতনত্ব বিশেষ উপভোগ‍্য। আমাদের জীবনে যে তিল তিল করিয়া নবমেঘের সঞ্চার হইতেছে, তাহার বিদ‍্যুচ্ছটা ইহাদের মধ‍্যে সঞ্চারিত হইয়াছে। এই গল্পগুলিতে রবীন্দ্রনাথ অতি-আধুনিক উপন‍্যাসের পথপ্রদর্শক ও পূর্বসূচনাকারী।
     ইহাদের মধ‍্যে 'নষ্টনীড়' গল্পটি সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ‍্য। যদিও রচনাকাল হিসাবে ইহা পূর্ববর্তী গল্পগুলির সমসাময়িক, কিন্তু বিষয়ের দিক হইতে ইহাকে অপেক্ষাকৃত আধুনিক গল্পগুলির সমশ্রেণীভুক্ত করা যাইতে পারে। ইহার সমস‍্যাটি যে আধুনিক তাহা নহে, কিন্তু সাহিত‍্যে ইহার বিস্তৃত বিশ্লেষণ একটা নূতন ব‍্যাপার। প্রেম বস্তুটিকে আমরা এতদিন রোমান্সের বিচিত্রবর্ণরঞ্জিত করিয়া দেখিতেই অভ‍্যস্ত ছিলাম, ইহার বিচ্ছেদব‍্যথা, ইহার গোপন মাধুর্য, ইহার উচ্ছ্বসিত আবেগ, ইহার মুক্তি ও বিস্তারের দিকেই আমাদের লক্ষ‍্য নিবব্ধ ছিল। যাহাকে বাহিরের জগতে বড়ো করিয়া দেখিয়াছি, নিজ গৃহকোণে, পারিবারিক নিষিদ্ধ গণ্ডির মধ‍্যে, বিধি-নিষেধের অনুশাসনের বিরুদ্ধে তাহার যে কুৎসিত, লজ্জাকর অভিব‍্যক্তি তাহাকে আমাদের সাহিত‍্যের প্রকাশ‍্যতার মধ‍্যে টানিয়া আনিতে আমরা মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। সুতরাং সাহিত‍্যে এই নূতন আবির্ভাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অভাব হয় নাই। সাহিত‍্য-ক্ষেত্রে এই জাতীয় বিষয়ের বৈধতা লইয়াও বাদ-প্রতিবাদের অন্ত নাই। মোটের উপর এই বিষয়ে এই কথা বলা যাইতে পারে যে, কলাসৌন্দর্য ও বিশ্লেষণকুশলতা থাকিলে প্রেমের এই সমস্ত সমাজবিগর্হিত বিকাশও সাহিত‍্যের বিষয় হইতে পারে ---বিপদ সেইখানে, যেখানে ইহাকে কেবল কুৎসিত আলোচনার সুযোগ হিসাবে গ্রহণ করা হয়, যেখানে কল্পনার স্বচ্ছ-সলিলে ইহার কালিমাকে ধৌত করিবার কোনো প্রয়াস দেখা যায় না।
     রবীন্দ্রনাথ তাঁহার 'নষ্টনীড়'-এ পূর্বলিখিত শর্তগুলি সম্পূর্ণরূপে পালন করিয়াছেন। প্রথমত, অমলের প্রতি চারুলতার প্রেম একটা দুর্দমনীয়, অপ্রতিরোধনীয় হৃদয়াবেগমাত্র, ইহা চিন্তার সীমা অতিক্রম করিয়া পাপের পিচ্ছিল পথে পদক্ষেপ করে নাই। তারপর লেখক কী সুকৌশলে, পুঞ্জীভূত বেদনার কারণ দেখাইয়া এই প্রেমের উদ্ভবটিকে সম্ভব করিয়াছেন ---ভূপতির ঔদাসীন‍্য অমল ও চারুর পরস্পর স্নেহসম্পর্কের মধ‍্যে তাহাদের হৃদয়ের সুকুমার বৃত্তির স্ফুরণ, তাহাদের সাহিত‍্যচর্চার নিবিড় নেশা ও নিভূত গোপনতা, মন্দার প্রতি ঈর্ষাতে তাহার গূঢ় পরিণতি, সর্বোপরি অমলের বিবাহ-সংবাদে তাহার অনিবার্য, অনাবৃত প্রকাশ ---এই সমস্ত ক্রমবিকাশের স্তরগুলিই লেখক যথাস্থানে সন্নিবেশ করিয়া কার্যকারণ-শৃঙ্খলাটি অতি নিপুণভাবে গাঁথিয়া তুলিয়াছেন; এই কাহিনীর অন্তরতলস্থ