Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা - ১২১, ১২২ ও ১২৩

2020-08-17
বীরত্ব ও স্বাধীনচিত্ততা বিসর্জন দিয়া আত্মরক্ষার্থ পলায়নতৎপর করিয়াছেন। পতিতার কন‍্যার সহিত প্রেমে পড়িয়া সুরেন মোটেই শরৎচন্দ্রের চরিত্রহীন সতীশের অনুকরণ করে নাই, কলিকাতার বার্ষিক বসন্ত-মহামারীর কল‍্যাণে সে নৈতিক আত্রক্ষা করিয়া ঘরে ফিরিয়াছে। এই জাতীয় ছোটো গল্প প্রভাতকুমারের সংগ্রহে খুব বেশি নাই--অবৈধ প্রণয়মূলক জটিলতাকে যতদূর সম্ভব তিনি পরিহার করিয়াছেন।
( ৩ )

পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, প্রভাতকুমারের রচনায় ভাবগভীরতার অভাব। কিন্তু কতকগুলি ছোটো গল্পের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ আনা যায় না। 'বাল‍্য-বন্ধু' গল্পে নলিনীর কঠোর জীবন-পরীক্ষা তাহার মনে বেশ একটু গভীর বিক্ষোভ ও আলোড়নই জাগাইয়াছে। 'কাশীবাসিনী' গল্পে বিপথগামিনী মাতার দুহিতৃস্নেহ গোপনতার অন্তরাল হইতে তীব্রবেগেই প্রবাহিত। 'ভুল শিক্ষার বিপদ' -এ বক্তার শিশুসুলভ সরলতা, যাহা বাহ‍্য শিষ্টাচারের মর্যাদা রক্ষা করে না, তাহার উৎকেন্দ্রিকতা (eccentricity) ও আপাত-রুক্ষ ব‍্যবহারই গল্পটির অন্তর্নিহিত-করুণরসের আবেদনটিকে আরও মর্মস্পর্শী করিয়াছে। তাহার কমলালেবু-বর্জনের উদ্ভট খেয়াল হঠাৎ রূপান্তরিত হইয়া এক স্নেহ-কোমল, উদার হৃদয়ের করুণ শোকস্মৃতি-রূপে প্রতিভাত হইয়াছে। 'আদরিণী' গল্পে মোক্তার জয়রাম মুখোপাধ‍্যায়ের পৌরুষদৃপ্ত অথচ স্নেহবিগলিত চরিত্রটি উচ্চাঙ্গের সৃষ্টি-প্রতিভার নিদর্শন। জয়রাম আমাদিগকে রবীন্দ্রনাথের নয়নজোড়ের বাবুর কথা স্মরণ করাইয়া দেয়, কিন্তু কুসুমের ঠাকুরদাদার যে মনোবৃত্তি করুণ আত্মপ্রতারণা ও অতীতের কল্পনাবিলাসমাত্র, তাহা জয়রামের দৃপ্ত পুরুষকারের নিকট অর্জিত ঐশ্বর্যের বাস্তবরূপ পরিগ্রহ করিয়াছে। হাতিটি বিক্রয় করিবার সম্ভাবনায় যখন সে অশ্রু বিসর্জন করিয়াছে, তখন ইহা নিছক ভাবালুতা (sentimentality) মাত্র নহে, আত্মপৌরুষের পরাজয়-ক্ষোভ এই অশ্রুপ্রবাহকে লবণাক্ত করিয়াছে। ছোটো জিনিসের সহিত বড়োর তুলনা করিতে গেলে নেপোলিয়নের সিংহাসন-বর্জনের তীব্র গ্লানি ইহার মধ‍্যে কিয়ৎপরিমাণে সঞ্চারিত হইয়াছে।
     আর এক শ্রেণীর গল্পে ইংরাজ-সমাজের সম্পর্কে বঙ্গ তরুণদের মনে যে বিচিত্র সমস‍্যার উদ্ভব হয়, যে মদির উত্তেজনা সংক্রামিত হয় নানা দিক দিয়া তাহার আলোচনা হইয়াছে। দুই-একটি গল্পে--যথা, 'মুক্তি' ও 'পুনর্মূষিক' -এ --বঙ্গযুবকের উচ্ছৃঙ্খলতা ও দায়িত্ববোধহীন আমোদপ্রিয়তার কাহিনী বর্ণিত হইয়াছে। শেষোক্ত গল্পে মিস্ টেম্পলের হিন্দুধর্ম ও আচার-অনুষ্ঠানের প্রতি মূঢ় অনুরাগ একজন হিন্দু-সন্তানের জীবনে কীরূপে ক্ষণস্থায়ী জটিলতার সৃষ্টি করিয়াছিল তাহারই কৌতুকপূর্ণ বর্ণনা আছে। 'বিলাত-ফেরতের বিপদ' -এ আমাদের বাঙালি-সমাজে বিলাতি আদব-কায়দার অজ্ঞতা এক বিবাহার্থী যুবকের পথ কীরূপে বিঘ্নসংকুল করিয়াছিল তাহাই চিত্রিত হইয়াছে।
     আর কয়েকটি গল্পে বাহ‍্য বিক্ষোভ ছাড়িয়া অন্তর্দ্বন্দ্বের সীমা অতিক্রান্ত হইয়াছে। নিজ দেশ ও পরিচিত সমাজ-আবেষ্টনের মধ‍্যে যে ভাবধারা মৃদুমন্দ গতিতে প্রবাহিত হয়, তাহাই অপরিচয়ের বন্ধুর পথে গতিবেগ সংগ্রহ করিয়া ব‍্যাকুল আকাঙক্ষায় তীব্র বেগে ছুটিয়াছে। প্রভাতকুমার ইংরেজ-জীবনের যে দিক আঁকিয়াছেন তাহা আমাদেরই মতো স্নেহ-প্রেমে কমনীয়, আশঙ্কা-দুর্বল, বিরহ-মিলন-ব‍্যাকুল। এখানে রাজনৈতিক হিংসা-দ্বেষের চিহ্ন নাই, বিজেতা-বিজিতের আহংকার-আত্মগ্লানি নাই--এখানে সমস্ত বৈষম‍্য, ভেদবুদ্ধি অতিক্রম করিয়া সর্বদেশসাধারণ মানব-হৃদয়ের মিলনক্ষেত্র রচিত হইয়াছে। 'কুকুর-ছানা' গল্পে মানুষের সঙ্গে কুকুরের মধুর প্রীতি-সম্পর্ক বর্ণিত হইয়াছে। 'কুমুদের বন্ধু' গল্পটি এক হতভাগ‍্য বঙ্গযুবকের প্রতি অপেক্ষাকৃত নিম্ন কুলোদ্ভবা দাসী-জাতীয়া স্ত্রীলোকের নিঃস্বার্থ প্রেমের অতর্কিত উচ্ছ্বাসে গৌরবান্বিত হইয়াছে। 'ফুলের মূল‍্য' গল্পে একটি শ্রমজীবী ইংরেজ পরিবারের পারিবারিক স্নেহপ্রীতি মনোহর ছবি অঙ্কিত হইয়াছে! 'মাতৃহারা' গল্পে এক বর্ষীয়সী ইংরেজ রমণী এক ইংলণ্ড-প্রবাসী বঙ্গ যুবকের প্রতি ব‍্যর্থ প্রেম কীরূপে সারাছীবন ধরিয়া অক্ষুণ্ন রাখিয়াছিলেন তাহার অতি মর্মস্পর্শী বিবরণ; 'সতী' গল্পে এক বাগ্দত্তা ইংরেজ তরুণী তাহার প্রেমাস্পন্দ বসন্ত-রোগাক্রান্ত বাঙালি যুবকের জন‍্য প্রাণ বিসর্জন করিয়াছে। 'প্রবাসিনী' গল্পে বার্নস-এর প্রেম-কবিতার মাধুর্যের ভিতর দিয়া এইরূপ একটি প্রণয়-কাহিনী বিবাহের সফলতায় উত্তীর্ণ হইয়াছে। মোট কথা ইংরেজি-বাঙালির মিলন-বিযহ-বিষয়ক গল্পগুলি প্রভাতকুমারের গভীর ও করুণরস সৃষ্টিতে সিদ্ধহস্ততার পরিচয় দেয়।
     ইহার বিপরীত চিত্র 'প্রত‍্যাবর্তন' নামক গল্পে। এখানে লেখক ধর্মগত কুসংস্কারের অনুদার সংকীর্ণতা হিন্দু ও খৃষ্টান এই উভয়বিধ প্রচলিত ধর্মের ভিতর দিয়াই দেখাইয়াছেন। রামনিধি নীচ-জাতীয় বলিয়া তাহার হিন্দু সহপাঠীদের দ্বারা নির্দয়ভাবে পরিত‍্যক্ত হইয়াছে--খৃষ্টধর্মের উদার বিশ্বজনীন সত‍্য বাইবেলে পাঠ করিয়া সে অনিবার্যভাবে তাহার দিকে আকৃষ্ট সইয়াছে। কিন্তু খৃষ্টধর্মাবলম্বীদের প্রকৃত জীবনের কাছাকাছি অগ্রসর হইয়া সে আবিষ্কার করিয়াছে যে, সেখানে বর্ণ-বৈষম‍্যের উৎকটতা ও জাত‍্যভিমানের তীব্রতা আরও অসহনীয়। রামনিধির গভীর অন্তর্জ্বালা ও তীব্র মনোক্ষোভ তাহার বিসদৃশ অভিজ্ঞতার মধ‍্য দিয়া বিচ্ছুরিত হইয়াছে।
     আর এক শ্রেণীর গল্পের কথা উল্লেখ করিয়াই এই অধ‍্যায়ের উপসংহার করিব। সে গল্পগুলি --স্বদেশি আন্দোলনের উত্তেজনা ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা লইয়া লিখিত। ভাবিলে বিস্মিত হইতে হয়, যে আন্দোলন একদিকে 'সন্ধ‍্যা', 'যুগান্তর', প্রভৃতি সাময়িক সংবাদপত্রে তীব্র ঘৃণা ও বিদ্রোহ-প্রবণতার বিষ উদগিরণ করিয়াছে ও অপরদিকে নানাবিধ দমনমূলক আইনের প্রণয়নে প্রণোদিত করিয়াছে, যাহাতে শাসক-শাসিত উভয় সম্প্রদায়ের মনোবৃত্তি পরস্পরের প্রতি দীর্ঘকাল ধরিয়া বিষজর্জরিত হইয়াছে, প্রভাতকুমার সেই হলাহল সমুদ্রের মধ‍্য হইতে বিশুদ্ধ হাস‍্যরসের সুধা আহরণ করিতে সমর্থ হইয়াছেন। যখন উভয় পক্ষই যুদ্ধের উত্তেজনায় ও কোলাহলে আত্মবিস্মৃত

তখন এই উগ্র রণোন্মাদনার মধ‍্যে প্রত‍্যেকের ব‍্যবহারে এমন বিসদৃশ অসংগতির প্রাদুর্ভাব হইয়াছে, যাহা নিরপেক্ষ, স্থিরমস্তিষ্ক humorist-এর প্রচুর হাস‍্যরসের উপাদান যোগাইয়াছে। 'উকীলের বুদ্ধি' গল্পে লেখক দেখাইয়াছেন যে, দুই পক্ষের এই সাময়িক মত্ততার সুবিধা লইয়া একজন চতুর উকিল কীরূপে নিজের চাকরির সুবিধা করিয়া লইয়াছে--এক পক্ষের উৎপীড়ন অপর পক্ষের সহানুভূতি জাগাইয়াছে। 'হাতে হাতে ফল' গল্পে রাজনৈতিক ব‍্যাপারে পুলিশের অনুসন্ধান-প্রণালীর দক্ষতা ও ন‍্যায়পরতার উপর কটাক্ষপাত করা হইয়াছে--কিন্তু দারোগার পাপের যে প্রায়শ্চিত হইয়াছে তাহার মূল হইতেছে তাহার সুরার প্রতি অত‍্যাসক্তি, ইহার জন‍্য পার্লিয়ামেন্টে আন্দোলন চালাইতে হয় নাই। 'খালাস' গল্পে স্বদেশি মোকদ্দমায় বিচারকের অবস্থাসংকটের কথা বর্ণিত হইয়াছে --একদিকে তাঁহার উপরিওয়ালা ম‍্যাজিস্ট্রেট, অন‍্যদিকে তাঁহার দেশবাসী, এমন কি গৃহিণীর প্রবল সহানুভূতি, এই উভয়বিধ টানের মধ‍্যে পড়িয়া বেচারা হাকিম হাবুডুবু খাইয়াছেন। শেষ পর্যন্ত গৃহিণীর টানই প্রবলতর হইয়া তাঁহাকে কর্মত‍্যাগে প্রণোদিত করিয়াছে। 'মাদুলি' গল্পে লেখক বিপরীত দিকের চিত্র আঁকিয়াছেন --স্বদেশি প্রচারকের কূটবুদ্ধি ও চাণক‍্যনীতি অপেক্ষা এক নিরক্ষর তাঁতির সরল ধর্মজ্ঞানই তাঁহার নিকট অধিকতর আদরণীর হইয়াছে। মোটকথা, যে আন্দোলন দেশে তুমুল বিক্ষোভের সৃষ্টি করিয়াছে, তাহারই দুই-একটা ছোটোখাটো ঢ়েউকে তিনি সুকৌশলে নিজের ক্ষুদ্র প্রয়োজনে লাগাইয়াছেন।
     উপরে উদ্ধৃত উদাহরণের দ্বারা প্রভাতকুমারের ছোটো গল্পের প্রসার ও বৈচির‍্য সন্বন্ধে অনেকটা পর্যাপ্ত ধারণা করা যাইবে। ছোটো গল্পের লেখকদের মধ‍্যে তাঁহার স্থান এক রবীন্দ্রনাথের নিম্নে। তাঁহার গভীরতার অভাব হাস‍্যরসের স্বাভাবিক প্রাচুর্যে খণ্ডিত ও ক্ষালিত হইয়াছে। ছোটো গল্পের আর্ট ও রচনা-কৌশল, ইহার পরিমাণবোধ ও সমাপ্তি-বিষয়ে তাঁহার দক্ষতা অসাধারণ। দুই-একজন নবীন লেখক কল্পনাপ্রসারে ও ভাবগভীরতায় প্রভাতকুমার অপেক্ষা শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করিতে পারেন কিন্তু তাঁহাদের রচনায় স্থায়িত্ব-গুণের ( sustained power) অভাব; দুই-একটি উৎকৃষ্ট শ্রেণীর গল্পের সঙ্গে অনেক নিকৃষ্ট পর্যায়ের গল্প গ্রথিত আছে। এ বিষয়ে প্রভাতকুমারের শ্রেষ্টত্ব অবিসংবাদিত; তিনি কল্পনার উচ্চগগনে বিহার করেন না সত‍্য, কিন্তু তাঁহার রচনায় পক্ষ-ক্লান্তির নিদর্শনও বিশেষ মিলে না। গভীর আলোচনায় ও আন্তরিক দুঃখবাদচর্চায় ক্লান্ত বঙ্গসাহিত‍্য তাঁহার হাস‍্যোজ্জ্বল, কৌতুকরস ও ঘটনা-বৈচির‍্যের জন‍্য কৌতূহলোদ্দীপক রচনাকে সাদরে নিজ স্থায়ী সম্পদরূপে বরণ করিয়া লইবে।

নবম অধ‍্যায়
শরৎচন্দ্র (১৮৭৬--১৯৩৮)
( ১)

শরৎচন্দ্রের আবির্ভাবের জন‍্য বাংলার উপন‍্যাস-সাহিত‍্য কতখানি প্রস্তুত ছিল, এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা যেমন স্বাভাবিক, তাহার উত্তর দেওয়া সেইরূপ দুরূহ। তিনি বাংলার সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের যে সমস্ত উপাদানের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়াছেন, বিশ্লেষণ ও মন্তব‍্যের যে প্রণালী অবলম্বন করিয়াছেন, তাঁহার পূর্ববর্তী উপন‍্যাস-সাহিত‍্যে তাঁহার এই বিশেষত্বগুলির কতটা পূর্বসূচনা পাওয়া যায়? শরৎচন্দ্র সম্বন্ধে যে ধারণা আমাদের মধ‍্যে বদ্ধমূল হইয়াছে তাহা তাঁহার অনন‍্যসুলভ মৌলিকতার উপরই প্রতিষ্ঠিত। নিষিদ্ধ, সমাজ-বিগর্হিত প্রেমের বিশ্লেষণে, আমাদের সামাজিক রীতিনীতি ও চিরাগত সংস্কারগুলির তীক্ষ্ণ-তীব্র সমালোচনায়, স্ত্রী-পুরুষের পরস্পর সম্পর্কের নির্ভীক পুনর্বিচারে তিনি যে সাহসিকতার, যে অকুণ্ঠিত সহানুভূতি ও উদার মনোবৃত্তির পরিচয় দিয়াছেন, তাহাতে তিনি বাঙালির মনের সংকীর্ণ গণ্ডি বহুদূর ছাড়াইয়া অতি-আধুনিক ইউরোপীয় সাহিত‍্যের সহিত আত্মীয়তা স্থাপন করিয়াছেন। বাংলার উপন‍্যাস-সাহিত‍্যে যে স্রোতোহীন, শুষ্কপ্রায় খাতের মধ‍্য দিয়া অলস-মন্থর গতিতে উদ্দেশ‍্যহীনভাবে চলিতেছিল, তিনি সেখানে বহিঃসমুদ্রের স্রোত বহাইয়া তাহার গতিবেগ বাড়াইয়া দিয়াছেন, নূতন ভাবের উত্তেজনায় তাহার মধ‍্যে নব-জীবনের সঞ্চার করিয়াছেন। এই দিক দিয়া দেখিতে গেলে পূর্ববর্তী উপন‍্যাস-সাহিত‍্যের সহিত তাঁহার যোগ অতি সামান‍্য। কিন্তু ইহাই তাঁহার উপন‍্যাসের একমাত্র বিষয় নহে। তাঁহার উপন‍্যাসের আর একটি দিক আছে যেখানে তিনি পুরাতন ধারা অব‍্যাহত রাখিয়াছেন, যেখানে পুরাতন সুরেরই প্রাধান‍্য। তাঁহার অনেক উপন‍্যাসে আধুনিক প্রেম-সমস‍্যার আদৌ ছায়াপাত হয় নাই, কেবল আমাদের পারিবারিক জীবনের চিরন্তন ঘাত-প্রতিঘাতই আলোচিত হইয়াছে। শরৎচন্দ্রের উপন‍্যাসসমূহের ব‍্যাপক আলোচনা করিতে গেলে তাঁহার এই নূতন ও পুরাতন উভয় ধারাই লক্ষ‍্য করিতে হইবে। তাঁহার অসাধারণ মৌলিকতা সত্ত্বেও তিনি প্রকৃতপক্ষে বাংলা উপন‍্যাসের ক্রমবিকাশধারার বহির্ভূত নহেন।
প্রেমবর্জিত পারিবারিক বিরোধ-চিত্র

'চরিত্রহীন', 'শ্রীকান্ত' ও 'গৃহদাহ' ছাড়া বাকি উপন‍্যাসগুলিতে শরৎচন্দ্র পুরাতন ধারারই অনুবর্তন করিয়াছেন। 'কাশীনাথ', 'দেবদাস', 'চন্দ্রনাথ', 'পরিণীতা', 'বড়দিদি', 'মেজদিদি', 'বিন্দুর ছেলে', 'রামের সুমতি', 'বিরাজ বৌ', 'স্বামী', 'নিষ্কৃতি', প্রভৃতি সমস্ত গল্প বাঙালি পরিবারের ক্ষুদ্র বিরোধ ও ঘাত-প্রতিঘাতেরই কাহিনী। ইহাদের মধ‍্যে কতকগুলি একেবারে প্রেম-বর্জিত --একান্নবর্তী গৃহস্থ পরিবারের মধ‍্যে প্রেমের যে স্বপ্ল-অবসর ও অপ্রধান অংশ তাহাই ইহাদের মধ‍্যে প্রতিফলিত হইয়াছে। আর কতকগুলিতে যে প্রেমের চিত্র দেওয়া হইয়াছে তাহা সম্পূর্ণ সাধারণ ও সামাজিক বিধি-নিষেধের অনুবর্তী। প্রেমের যে দুর্দমনীর প্রভাব, সমাজ-বিধ্বংসী শক্তির মূর্তি শরৎচন্দ্রের নামের সহিত সংশ্লিষ্ট হইয়া পড়িয়াছে, তাহার দর্শন ইহাদের মধ‍্যে মিলে না। এইগুলির জন‍্যই শরৎচন্দ্র উপন‍্যাস-সাহিত‍্যের পূর্ব-ইতিহাসের সহিত সম্পর্কান্বিত হইয়াছেন।
     এই গল্পগুলির কতকগুলি সাধারণ গুণ আছে। প্রথমত, তাহারা সকলেই ক্ষুদ্রাবয়ব, ছোটো গল্পের অপেক্ষা আয়তন বেশি নয়, অথচ ইহারা ঠিক ছোটো গল্পের লক্ষণাক্রন্তও নয়। ছোটো গল্পের পরিসমাপ্তির মধ‍্যে যে একটা সাংকেতিকতা, একটা অতর্কিত ভাব থাকে, তাহা ইহাদের মধ‍্যে নাই। তাহাদের ক্ষুদ্র পরিধির মধ‍্যে যে সমস‍্যার অবতারণা হইয়াছে, তাহাদের আলোচনা ও মীমাংসা সম্পূর্ণ ও নিঃশেষ হইয়া গিয়াছে, ইহাই আমরা উপলব্ধি করি। বাংলা-সাহিত‍্যের উপন‍্যাসের আয়তন সাধারণত কীরূপ হওয়া উচিত তাহার কোনো আদর্শ নির্ধারিত হয় নাই। তবে ইউরোপীয় তিন-ভলুমে-সম্পূর্ণ উপন‍্যাসের বিস্তার যে এ ক্ষেত্রে প্রযোজ‍্য নহে, সে সন্বন্ধে সন্ধেহের বিশেষ অবসর নাই। আমাদের সাধারণ পারিবারিক জীবনে যে সমস্ত বিরোধ-সংঘাত জাগিয়া ওঠে তাহাদের গ্রন্থি বিশেষ জটিল ও দীর্ঘ নহে, সুতরাং তাহাদের আলোচনার ক্ষেত্রও অতি-বিস্তৃত হইবার প্রয়োজন নাই। এ বিষয়ে শরৎচন্দ্র তাঁহার অভ‍্যস্ত সংযম ও সহজ কলানৈপুণ‍্যের সহিত তাঁহার উপন‍্যাসগুলির যে সীমা নির্দেশ করিয়া দিয়াছেন তাহাই বঙ্গসাহিত‍্যে উপন‍্যাসের স্বাভাবিক আয়তন বলিয়া স্বীকার করা যাইতে পারে।
     এই গল্পগুলিতে পারিবারিক বিরোধের যে চিত্র দেওয়া হইয়াছে, তাহার দৃষ্টান্ত রবীন্দ্রনাথের ছোটো গল্পে মেলে। আমাদের পারিবারিক জীবনে স্নেহ, প্রেম, ঈর্ষা, প্রভৃতি মনোবৃত্তিগুলি সাধারণত যে খাতে প্রবাহিত হয়, তাহার ব‍্যতিক্রম দেখানোতেই ইহাদের