Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা - ১৪৫, ১৪৬ ও ১৪৭

2020-09-27
তাহার মনের সাবলীল বিচিত্র আন্দোলনকে একেবারে নিশ্চল করিয়া দিয়াছে। গঙ্গামাটির সমস্ত জীবনটার উপরেই একটা গুরুভার অবসাদ, একটা চির-বিচ্ছেদের বিষাদ-করুণ ছায়া সর্বব‍্যাপী হইয়া চাপিয়া আছে। এতদিন ধরিয়া রহস‍্যময় প্রেমের যে লুকোচুরি-খেলা চলিতেছিল, যে শীর্ণ প্রবাহে লজ্জা-সংকোচ-আত্মসম্মানের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাধার মধ‍্যে কোনো রকমে পথ করিয়া চলিতেছিল, সাময়িক উচ্ছ্বাসের আবেগে যাহা বর্ষাস্ফীত স্রোতস্বিনীর ন‍্যায় দুর্বার হইয়া উঠিতেছিল, সে আজ ধর্ম ও আচারের বালুকারাশির মধ‍্যে একেবারে শুকাইয়া গেল। এই পরিণামে রাজলক্ষ্মীর আধ‍্যাত্মিক উন্নতি ও শান্তি কতটা বাড়িল, তাহার কোনো সন্ধান মিলিল না, কিন্তু শ্রীকান্তের পুরোবর্তী জীবন দিগন্তব‍্যাপী মরুভূমির মতো ধূ ধূ করিতে লাগিল। ধর্ম স্বহস্তে যে প্রেমের সমাধি দিয়াছে, তাহার পুনর্জীবনের আর কোনোই আশা রহিল না, শুধু স্মৃতির শুকতারাটি তাহার উপর সমুজ্জ্বল হইয়া রহিল।
     'শ্রীকান্ত' -এর তৃতীয় পর্বে চিন্তাশীলতা, জীবন সমালোচনার শক্তি বাড়িয়াছে বই কমে নাই; কিন্তু খাঁটি সৃষ্টিশক্তির দীপ্তি যেন কতকটা ম্লান হইয়া আসিয়াছে। গঙ্গামাটির ক্ষুদ্র, সংকীর্ণ পরিধির মধ‍্যে যে কয়টি মানুষের সাক্ষাৎ মিলিয়াছে তাহাদের ব‍্যক্তিগত জীবন অপেক্ষা তাহাদের সমস‍্যাই বড়ো। সুনন্দার দৃপ্ত তেজস্বিতার কাহিনী শুনি বটে, কিন্তু রাজলক্ষ্মী বা অভয়ার মতো তাহার প্রকৃতির ঘনিষ্ঠ পরিচয় পাই না। ধীরে ধীরে সন্দেহ জাগিয়া উঠে যে, শরৎচন্দ্র প্রত‍্যক্ষ অনুভূতির ক্ষেত্র অতিক্রম করিয়া সমস‍্যার কণ্টকাকীর্ণ ক্ষেত্রে পদক্ষেপ করিতেছেন। সন্ন‍্যাসী ব্রজানন্দ ততটা মানুষ নহেন, যতটা দেশপ্রীতির নিবিড় বেদনাবোধের মূর্ত প্রকাশ। কেবল কুশারী-গৃহিণী ও অগ্রদানী ব্রাহ্মণ চক্রবর্তি-গৃহিণী এই দুইজনের মধ‍্যেই স্বপ্ল-পরিমাণ প্রাণের ঝলক দেখা যায়; কিন্তু এই তৃতীয় পর্বে যে ব‍্যক্তি সর্বাপেক্ষা লাভবান হইয়াছে সে রতন। পূর্ববর্তী পরিচ্ছেদগুলিতে সে মাত্র রাজলক্ষ্মীর বিশ্বস্ত, কর্মঠ ভৃত‍্য ছিল; কিন্তু এই গঙ্গামাটির জলহাওয়া, যাহা শ্রীকান্ত-রাজলক্ষ্মীর সম্বন্ধের নিবিড় মাধুর্য শুকাইয়া তুলিয়াছে, রতনের ব‍্যক্তিত্ব-বিকাশের পক্ষে খুব অনুকূল হইয়াছে। এই হাওয়ায় সে যেন অনেকটা বাড়িয়া উঠিয়াছে। শ্রীকান্তের একান্ত অসহায়ত্বের ও কুণ্ঠিত অধীনতার ছবিটি তাহার চোখে স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে ---শ্রীকান্তের প্রতি সে একটা সমবেদনার টান অনুভব করিয়াছে।
     'শ্রীকান্ত'- এর চতুর্থ খণ্ডে বন্ধু-প্রীতি ও প্রেম --এই দুই পুরাতন সুরেরই পুনরাবৃত্তি হইয়াছে--এবং পুরাতন পুনরাবৃত্তিতে নবীনতার যে অবশ‍্যম্ভাবী অপচয় হয়, এখানেও তাহাই ঘটিয়াছে। গহরের আত্ম-প্রতারণায় করুণ সাহিত‍্য-চর্চার সূত্র ধরিয়া শ্রীকান্তের সহিত তাহার বন্ধুত্বের যে চিত্র দেওয়া হইয়াছে তাহা মোহের নিবিড়তায় ও দুঃসাহসের উদ্দীপনায় ইন্দ্রনাথের সহিত প্রীতি-সম্পর্কের কাছাকাছিও যাইতে পারে নাই। ইহা পৌঢ়ত্বের বন্ধুত্ব, যাহাতে পূর্বস্মৃতি ও মোহভঙ্গই সমস্ত স্থান অধিকার করিয়াছে। সমস্ত বিষয়টি আলোচনা করিলে গহরের সহিত শ্রীকান্তের কোনো ঘনিষ্ঠ অন্তরঙ্গতার পরিচয় মিলে না --গ্রামের যে রুক্ষ, বিশীর্ণ, ঝরা পাতার জঞ্জাল-আবর্জনায় হতশ্রী চিত্র দেওয়া হইয়াছে তাহা যেন তাহাদের রাক্ত, মন্দবেগ বন্ধুত্বের যোগ‍্য পটভূমি ও প্রতীক। গহরের লাঞ্ছিত সাহিত‍্যিক দুরাকাঙক্ষা তাহার প্রতি একটা করুণ সহানুভূতির উদ্রেক করে, কিন্তু শ্রীকান্তের জীবনের সহিত তাহার যোগসূত্র নিতান্ত ক্ষীণ, অলক্ষিত-প্রায়; এই নূতন সম্পর্ক তাহার জীবনের কোনো অনাবিষ্কৃত রহস‍্যের উপর আলোকপাত করে না। এই সমস্ত মন্তব‍্য কমললতার সহিত প্রেমাভিনয়ের দৃশ‍্যগুলি-সম্বন্ধে আরও অধিকরূপে প্রযোজ‍্য। প্রেমের অকারণ আকস্মিকতা হয়তো ইহার একটা প্রধান উপাদান; কিন্তু জীবনে যাহা আকস্মিক, সাহিত‍্যে একটা কার্য-কারণ-শৃঙ্খলার ভিতর দিয়া তাহার উদ্ভব ও পরিণতির ধারাবাহিক ইতিহাস আমরা দেখিতে চাই; প্রেমের বনফুল যে পর্যন্ত আমাদের হৃদয়-রসে পুষ্ট ও পূর্ণবিকশিত না হয়, সে পর্যন্ত তাহার সহিত আমাদের রক্তের আত্মীয়তা আমরা সম্পূর্ণ স্বীকার করি না। রাজলক্ষ্মীর ক্ষেত্রে যে প্রেম আমাদের চোখের উপর নিগূঢ় জীবনীরসে পূর্ণ ও শতদলের অম্লান সৌন্দর্যে বিকশিত হইয়া উঠিয়াছে, কমললতার প্রেম সেরূপ কোনো অখণ্ডনীয় প্রমাণ লইয়া নিজ জন্মস্বত্ব সাব‍্যস্ত করে না। এই সদ‍্যোজাত প্রেমের কোনো গভীর তলদেশ পর্যন্ত প্রসারিত মূল নাই, ইহা জলজ উদ্ভিদের ন‍্যায় একপ্রকার অস্বাস্থ‍্যকর প্রাচুর্যে হৃদয়ের উপরিভাকে আচ্ছন্ন করিয়াছে; ইহার প্রণয়-নিবেদনের অতিপল্লবিত বাহুল‍্য ইহার আন্তরিকতাকে অতিক্রম করিয়াছে। পৌঢ় বয়সের বন্ধুত্বের ন‍্যায় পৌঢ় বয়সের প্রেমও একপ্রকার মলিন, বিবর্ণ তেজোহীনতা আছে, এবং কমললতার প্রেমে এই পাণ্ডুর রক্তাল্পতাই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। যে কৌশোর ও প্রথম যোবনের উদ্দাম আবেগের স্মৃতি এই পৌঢ় প্রেমের একমাত্র অবলম্বন, যাহার বিচ্ছুরিত আলোকে ইহার মুখমণ্ডলের উপর মধ‍্যে মধ‍্যে একটা ক্ষণস্থায়ী রক্তিম দীপ্তি খেলিয়া যায়, এখানে সেই জীবনী-উৎসেরও একান্ত অভাব। সুতরাং এই প্রণয়-কাহিনী-সুলভ ভাববিলাস অপেক্ষা আন্তরিতার কোনো উচ্চতর দাবি করিতে পারে না। রাজলক্ষ্মীকে যে শেষ পর্যন্ত কমললতার সহিত প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইতে হইয়াছে, তাহার গ্রাস হইতে শ্রীকান্তকে উদ্ধার করিবার জন‍্য অনভ‍্যস্ত, অশোভন লোলুপতার অভিনয় করিতে হইয়াছে, ইহাতে তাহার ও শ্রীকান্তের উভয়েরই প্রেমের অবমাননা করা হইয়াছে। শ্রীকান্তের চরিত্রের যে অসাধারণত্ব তাহার প্রধান আকর্ষণের হেতু ছিল, তাহা এই চতুর্থ ভাগে একটা ধূসর বর্ণহীনতার মধ‍্যে অবলুপ্ত হইয়াছে। তৃতীয় ভাগে দুর্বলতার সূচনা দেখা দিয়াছিল, চতুর্থ ভাগে তাহা নিঃসংশয়য়িতরূপে সুপ্রতিষ্ঠিত হইয়াছে।
( ৬ )
মতবাদ প্রধান ও পূর্বানুবৃত্তিমূলক উপন‍্যাস


'শ্রীকান্ত'- এর তৃতীয় পর্বের সহিত শরৎচন্দ্রের প্রতিভার মধ‍্যাহ্ন-দীপ্তি শেষ হইয়াছে বলিয়া মনে হয় --উহার সৌন্দর্যের সহিত অপরাহ্ণের ম্লান ছায়া মিশিয়াছে। ইহাতে আশ্রচর্যের বিষয় কিছুই নাই। যে রস প্রত‍্যক্ষ অভিজ্ঞতার মধ‍্যে পাক খাইয়া জমিয়া উঠে তাহার প্রবাহ অফুরন্ত হইতে পারে না। বরং আশ্চর্য ইহাই যে, এতদিন ধরিয়া এত বিচিত্র অবস্থার মধ‍্যে আমাদের বাঙালি-জীবনের মরুভূমে এই

রসের অবিচ্ছিন্ন প্রবাহ সম্ভব হইল কী করিয়া? নিছক সমস‍্যা-প্রিয়তার যে ইঙ্গিত 'শ্রীকিন্ত' -এর তৃতীয় পর্বে পাই তাহা তাঁহার পরবর্তী রচনায় আরও সুস্পষ্ট হইয়াছে। তাঁহার 'শেষপ্রশ্ন' - এ (১৯৩১) তত্ত্বপ্রিয়তার দিক অত‍্যন্ত বাড়িয়া উঠিয়া কলাকৌশলকে বহু পশ্চাতে ফেলিয়াছে। বিদ্রোহের যে সুর অভয়া-রাজলক্ষ্মী-সাবিত্রীর মধ‍্যে জীবনের রসধারায় সিক্ত ও তাহার বিচিত্র জটিল অভিব‍্যক্তির সহিত জড়িত হইয়া আমাদের বাঙালি-সমাজ ও ধর্মসংস্কারের গূঢ় অপরিহার্য প্রতিকূলতার মধ‍্যে নিবিড়তা লাভ করিয়াছে, তাহা কমলের চরিত্রে একটা বাধাবন্ধহীন, হৃদয়-সম্পর্ক-রহিত তর্কের আতশবাজির মতো জ্বলিয়া নিঃশেষ হইয়াছে। সে সাবিত্রী-অভয়া-রাজলক্ষ্মীর সহোদরা বা স্বজাতীয়া নহে --ইহারা বাঙালি, ইহাদের বিদ্রোহ যাহার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়া বাহিরে আসিতেছে তাহা সমস্ত সমাজ ও যুগ-যুগান্তরব‍্যাপী ধর্মবিধির সম্মিলিত শক্তি। কমলের জন্ম যেন সোভিয়েট রুশদেশে--তাহার বিদ্রোহ কোনো বিরুদ্ধ শক্তির প্রতিঘাত অনুভব না করিয়া, নিতান্ত অবলীলাক্রমে একটা অস্বাভাবিক তীক্ষ্ণতার সহিত আত্মপ্রকাশ করিতেছে ইহার বাচালতার মুখ চাপিয়া ধরে না। কমল একটা বুদ্ধিগ্রাহ‍্য মতবাদের সুস্পষ্ট ও জোরাল অভিব‍্যক্তি মাত্র, জীবনের পরিপূর্ণ বিকাশ নহে; একটা ইঞ্জিনের বাঁশি, হৃদয়-স্পন্দন নহে।
     'শেষপ্রশ্ন' উপন‍্যাসটি প্রধানত বিতর্কমূলক মতবাদ-আলোচনার ক্ষেত্র, ইহাকে ঔপন‍্যাসিক-গুণ-সমৃদ্ধ বলা যায় না। ইহার একমাত্র চরিত্র কমল; অন‍্যান‍্য চরিত্র কমল-কেন্দ্রের চারিদিকে বিন‍্যস্ত, কমলের তীক্ষ্ণ ব‍্যক্তিত্বের ও দৃঢ় জীবননীতির বিভিন্নরূপ প্রতিক্রিয়ার বাহন মাত্র। কমলের যুক্তিপ্রয়োগ ও স্বীয় মতবাদ-প্রতিষ্ঠার নৈপুণ‍্য অসাধারণ। কিন্তু তাহার জীবনে এই ব‍্যতিক্রমধর্মী ও নেতিমূলক নীতি সত‍্যই মূর্ত হইয়াছে কি না সেখানেই সন্দেহ। হিন্দুসমাজে প্রচলিত ও বদ্ধমূল সংস্কাররূপে গৃহীত আদর্শবাদ --সংযম, ব্রহ্মচর্য, দাম্পত‍্য-সম্পর্কের অবিচল নিষ্ঠা ও স্মৃতির মর্যাদা এবং সুপ্রাচীন ঐতিহ‍্যের প্রতি শ্রদ্ধা --কমলকে তীব্র প্রতিবাদ ও প্রত‍্যাখানে উত্তেজিত করিয়াছে। তাহার মতে ইহা কেবল জীবনের উপর দুর্ভর বোঝা মাত্র। কোনোরূপ সম্পর্কের স্থায়িত্বে আবদ্ধ না হইয়া, সম্পর্কচ্ছেদে কোনও মনোবেদনাকে প্রশয় না দিয়া, কেবল মুক্তপ্রাণে, নিরাসক্ত চিত্তে তাৎক্ষণিক আনন্দকে অন্তরের সমস্ত বলিষ্ঠ গ্রহণশীলতা দিয়া উপভোগ করা --ইহাই তাহার মতে জীবনের পরম সার্থকতা। ক্ষণিক আনন্দ-মুহূর্তসমূহের উদ্ধর্তিত ও ঘনীভূত রূপই যে, আদর্শনিষ্ঠ-জীবনদর্শন, ক্ষণিকতার অতৃপ্তি ও দুঃখান্তিকতা প্রতিরোধ করার জন‍্যই যে আদর্শবাদমূলক স্থায়ী আনন্দের প্রয়োজন ও এই রূপান্তরের পিছনে যে সমস্ত সভ‍্য ও সংস্কৃতিবান সমাজের অভিজ্ঞতালব্ধ প্রত‍্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন আছে তাহা বুঝিবার মতো ধৈর্য ও শিক্ষা কমলের নাই। অবশ‍্য এই আদর্শের যে বিকৃতি, সংযম ও অতীত-নিষ্ঠা যে অযথা কৃচ্ছ্রসাধন ও আত্মপীড়নের রূপ পরিগ্রহ করিয়া মৌলিক জীবনানন্দের ভিত্তি হইতে স্খলিত হইয়াছে তাহা স্বীকার্য। কিন্তু ইহার প্রতিকার বিচ্ছিন্ন ও বন্ধনহীন আনন্দে প্রত‍্যাবর্তন নহে, আনন্দকেন্দ্রিক জীবনাদর্শের পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
     উপন‍্যাসের তাত্ত্বিক বিচারফল যাহাই হউক, তাহার দ্বারা উহার উৎকর্ষ নিরূপিত হইবে না। ঔপন‍্যাসিক এক বিশেষ মেজাজের মানুষের সম্পূর্ণ একপেশে মতও উপস্থাপিত করিতে পারেন, যদি এই উপস্থাপনা কেবল তত্ত্বালোচনা না হইয়া জীবননিষ্ঠ হয়। কমলের মত যাহাই হউক, এই মত তাহার জীবন-সম্পর্কিত হইয়া কতটা প্রাণময় হইয়াছে তাহাই আসল বিচার্য বিষয়। আমরা উপন‍্যাসে কমলের যে পরিচয় পাই, তাহা তাহার তিনজন পুরুষের সহিত হৃদয়-সম্পর্কের ইতিহাসমূলক। শিবনাথের সহিত তাহার শৈব বিবাহের ও তাহার প্রণয়ীদত্ত শিবানী নাম-গ্রহণের পিছনের প্রেরণাটি অনুক্ত রহিয়া গিয়াছে, এই সম্পর্কচ্ছেদের কাহিনীও হেতুবাদ-সাহায‍্যে স্পষ্টীকৃত হয় নাই। অবশ‍্য কমলের অসামান‍্য রূপবহ্নিই যে পুরুষ-পতঙ্গকে নির্বিচারে উহারদিকে আকৃষ্ট করিয়াছে, ইহা বুঝাইতে ঔপন‍্যাসিক বিশ্লেষণ নিষ্প্রয়োজন --মানবের আদিম মোহ উর্বশীর ন‍্যায় আপনাতে আপনি সম্পূর্ণ, বিশ্লেষণ-নিরপেক্ষ। শিবনাথের প্রকৃতির ইতর অর্থলোলুপতার ইঙ্গিত দেওয়া হইয়াছে, ইহাই তাহাকে ধনীদুহিতা মনোরমার প্রতি প্রেমনিবেদনে উন্মুখ করিয়াছে। কিন্তু কমলের স্বপ্লস্থায়ী দাম্পত‍্য-জীবনে শিবনাথের মোহভঙ্গের কোনো বর্ণনাই পাই না। তবে শিবনাথের দ্বারা পরিত‍্যক্ত হইবার পর কমলের বলিষ্ঠ, অনুশোচনাহীন, সম্পূর্ণ ভাববিলাসমুক্ত আত্মনির্ভরশীলতার চিত্রটিই উপন‍্যাস-মধ‍্যে তাহার একমাত্র ভাবাত্মক (positive) পরিচয়। তাহার তীক্ষ্ণবুদ্ধি ও তর্কনিপুণতা, তাহার অনলস সেবাকুশলতা ও সময় সময় বিশেষত, আশুবাবুর ক্ষেত্রে রমণীয় স্নিগ্ধ আচঁরণ ও তাহার সংযত আত্মমর্যাদাবোধ তাহাকে মোটামুটি চিনাইয়া দিলেও তাহার বিশিষ্ট অন্তর-রহস‍্যের উপর কোনো আলোকপাত করে না। আগ্নেয়গিরির পারিপার্শ্বিকে যে শ‍্যামশস্পশোভিত উপত‍্যকা বিরাজিত তাহার সৌন্দর্যময় বর্ণনায় তো অগ্ন‍্যুৎপাতের অন্তর জ্বালার কোনো পরিচয় মিলে না। শিবনাথের প্রতি সে কেন আকর্ষণ অনুভব করিল, কেনই-বা তাহার জীবন হইতে সে সরিয়া গেল তাঁহার সম্বন্ধে এই অতি প্রয়োজনীয় প্রশ্নগুলির কোনো উত্তর পাওয়া যায় না।
     আর যে দুইজন পুরুষের দিকে সে আকৃষ্ট হইয়াছে, তাহাদের মধ‍্যে একজন রাজেন। রাজেনের সঙ্গে তাহার সংযোগ সেবাকার্যের মাধ‍্যমে। এই উপলক্ষে তাহাদের যে ঘনিষ্ঠতা হয় তাহা উভয়ের এক কক্ষে শয়ন পর্যন্ত প্রসারিত হইয়াছিল। কিন্তু রাজেনের একান্ত ভাববিকারহীন ঔদাসীন‍্য, তাহার অপ্রলুব্ধ পুরুষপ্রকৃতির বলিষ্ঠতাই কমলের মনে আকর্ষণের হেতু হইয়াছিল। রাজেন ও সে দুই সম্পূর্ণ বিপরীত আদর্শানুসারী --তাহার মতবাদের প্রতি রাজেনের সুস্পষ্ট অবজ্ঞা। এক্ষেত্রে কমলের মনে তাহার প্রতি প্রেমানুভূতি কেবল চরিত্রদৃঢ়তার প্রতি শ্রদ্ধারই নামান্তর। ইহার কোনো মনস্তাত্ত্বিক ব‍্যাখ‍্যা বা দ্বন্দ্বমূলক পরিচয় নাই বলিয়াই ইহা উপন‍্যাসে গৌণ। এমন কি কমলের প্রণয়াকাঙক্ষার প্রজাপতিধর্মিত্ব ও আকস্মিকতা ছাড়া ইহা তাহারও কোনো নিগূঢ় ব‍্যক্তিপরিচয় বহন করে না।
     উপন‍্যাস-মধ‍্যে কমলের প্রণয়চর্চার সুস্পষ্টতম অভিব‍্যক্তি ঘটিয়াছে অজিতকে অবলম্বন করিয়া। অজিতের চরিত্রও অত‍্যন্ত অনির্দিষ্ট

রহিয়া গিয়াছে। তাহার কমলের প্রতি মনোভাব গ্রহণ-বর্জনের, উন্মুখতা-বিমুখতার বিপরীত বিন্দুর মধ‍্যে অসহায়ভাবে আবর্তিত হইয়াছে। কমল গায়ে পড়িয়া তাহার সহিত অন্তরঙ্গ হইতে চেষ্টা করিয়াছে, অনুরাগ-নির্ভরতার নানামুখী প্রকাশে তাহার প্রতি প্রেম-নিবেদন করিয়াছে, কিন্তু অজিতের মনে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ঘোচে নাই। কমলের সঙ্গে তাহার মতের আকাশ-পাতাল পার্থক‍্য; কমলের সমস্ত গায়ে-পড়া ঘনিষ্ঠতা তাহার এই পার্থক‍্যবোধকে সম্মোহিত করিতে পারে নাই। শেষ পর্যন্ত সে তাহার সমস্ত ঐশ্বর্য-সম্ভার, তাহার নবক্রীত মোটরগাড়ি ও আরাম-সচ্ছলতার অপর্যাপ্ত আয়োজন, কিন্তু সংশয়ক্ষুব্ধ হৃদয় লইয়া, কমলের সহিত ধর্মানুষ্ঠানহীন, একান্তভাবে হৃদয়-নির্ভর মিলনে যুক্ত হইয়াছে। এই মিলনে তাহার অনুসৃত ক্ষণিকতাবাদ কতটুকু উদাহৃত হইবে তাহার কোনো ইঙ্গিত নাই। কমলের অশ্রান্ত নব-নব-পুরুষ-সম্পর্কিত প্রেমাভিসার অজিতে আসিয়া চিরনিবৃত্তি লাভ করিবে এরূপ মনে করার কোনো হেতু নাই। অজিতের দ্বিধাদোদুল চরিত্রে না আছে নিশ্চিন্ত নির্ভরতার আশ্রয়, না আছে কমলের ক্ষুধা মিটাইবার উপযোগী মানস বৈচিত‍্য। উপন‍্যাসের এক জায়গাতে শেষ হইবেই কিন্তু এই উপসংহার চরিত্র-পরিণতির কোনো সুস্পষ্ট পর্যায়ের চিহ্নাঙ্কিত নহে।
   :  উপন‍্যাসের অন‍্যান‍্য চরিত্রও সবই আকস্মিকতাধর্মী ও যদৃচ্ছ-সংগৃহীত, কোনো কার্য-কারণের অমোঘ শৃঙ্খল একত্রিত নহে। ইহাদের মধ‍্যে আশুবাবুই তাঁহার বিরাট দেহ, সরস অন্তর ও উদার, সমন্বয়শীল হৃদয় লইয়া কেন্দ্রস্থ পুরুষের ন‍্যায় বিরাজ করিতেছেন, কিন্তু তাঁহার কেন্দ্রিকতা, কেবল স্থানমলক, চরিত্রাশ্রয়ী নহে। তিনি কমলকে সবচেয়ে বেশি বুঝিয়াছিলেন ও তাহার প্রতি সর্বাধিক স্নেহপরায়ণ ছিলেন; কিন্তু তাঁহার সহিতই কমলের নীতিগত পার্থক‍্য সর্বাপেক্ষা বেশি। তাঁহার পরলোকগত স্ত্রীর স্মৃতির প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত‍্য কমলের চক্ষে একটা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক সংস্কার। তাঁহার একমাত্র কন‍্যা মনোরমাও তাঁহাকে মর্মান্তিক আঘাত দিয়া শিবনাথের প্রতি অনুরক্তা হইয়াছে। এবং সর্বাপেক্ষা বিপর্যয়জনক ব‍্যাপার হইল তাঁহার প্রতি নীলিমার অনুরাগ-পোষণ। এ সমস্ত ব‍্যাপারেই কমলকে লইয়া যে বিপুল আলোড়ন জাগিয়াছে, যে তুমূল তর্ক-বিতর্ক উদ্দাম হইয়াছে, আশুবাবুই তাঁহার সহৃদয় আতিথেয়তার জন‍্য তাহার একটি গার্হস্থ‍্য পটভূমিকা, বিভিন্ন বিরুদ্ধ মিলনভূমি রচনা করিয়াছেন। তাঁহার নিজের অংশ কেবল সামঞ্জস‍্য-স্থাপনের, আঘাত-প্রত‍্যাঘাতের তীব্রতা-হ্রাসের, গৌণ প্রয়াসেই সীমাবদ্ধ হইয়াছে।
     অবিনাশ বাবু, অক্ষয় বাবু, হরেন ইহারা বাদবিতণ্ডার উদ্দাম ঝড়ে আবর্তিত হইয়াছে, কিন্তু ঝটিকাতাড়িত ধূলিকণা অপেক্ষা ইহাদের দিকে বোধ হয় ম‍্যালেরিয়ায় ভুগিয়াই খানিকটা নৈতিক ক্ষয়িষ্ণুতার লক্ষণ দেখাইয়াছেন; তাহার অনমনীয় প্রতিরোধ ঈষৎ কোমল হইয়া কমলের প্রতি কিছুটা শ্রদ্ধা-সম্ভ্রমপূর্ণ মনোভাবে পরিণত হইয়াছে। হরেন গ্রন্থ-মধ‍্যে কথা বলিয়াছে সব চেয়ে বেশি ও কাজ করিয়াছে সব চেয়ে কম। শেষ পর্যন্ত ব্রহ্মচর্য-আশ্রম উঠাইয়া দিয়া সে কমলের মতবাদের মর্যাদা রাখিয়াছে ও সর্বাশ্রচ‍্যুতা নীলিমাকে আশ্রয় দিয়া উপন‍্যাসে তাহার কিঞ্চিৎ প্রয়োজনীয়তা প্রতিষ্ঠা করিয়াছে।
     নারী-চরিত্রগুলিও প্রায় একইরূপ নিষ্প্রয়োজনীয় ও দৈবাগত বলিয়া মনে হয়। মনোরমা প্রধান চরিত্র হইতে একেবারে নিষ্ক্রিয় ও অনুপস্থিত চরিত্রে পর্যবসিত হইয়াছে। সে কমলের মুখ‍্য প্রতিযোগী ও বিপরীত ভাবাদর্শের প্রতীক ছিল। কিন্তু শিবনাথের সহিত অকস্মাৎ উন্মোষিত প্রণয়ের সূত্র ধরিয়া সে উপন‍্যাসের বাহিরে চলিয়া গিয়াছে। মাঝে মধ‍্যে তাহার নাম শুনা গেলেও তাহার পিতার মনোবেদনা ও অপরের আলোচনার বিষয়ীভূত হইলেও সে চিরতরে যবনিকার অন্তরালবর্তিনী হইয়াছে।
     নীলিমা আর একটি অবসিত-মহীমা নারী-চরিত্র। সে কতকটা কমলের জীবনবাদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল, কিন্তু আচরণের দিক দিয়া কমলের অনুবর্তিনী হইবার তাহার কোনো প্রবণতা দেখা যায় নাই। অবিনাশবাবুর সহিত তাহার সম্পর্ক গৃহিণীপনার স্তর অতিক্রম করিয়া কোনো কোমলতর হৃদয়-সংবেদনে পৌঁছিয়াছিল কি না সন্দেহ। তবে তাহার মনে সঞ্চিত ক্ষোভের অতর্কিত বহিঃপ্রকাশ ও অবিনাশ সম্বন্ধে তাহার গূঢ় অভিমান সেইরূপ সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। আশুবাবুর সহিত তাহার হৃদয়াবেগঘটিত, অশ্রু-উদ্বেল সম্পর্ক-জটিলতা শুধু আশুবাবুর নয়, পাঠকের মনেও বিস্ময়াপ্লুত অবিশ্বাস জাগায়। লেখক এই অপ্রত‍্যাশিত প্রণয়োন্মেষের উদ্ভবরহস‍্য উন্মোচন করিতে কোনো চেষ্টাই করেন নাই, সম্পূর্ণ আকস্মিক পরিণতিরূপেই আমাদের নিকট উপস্থাপিত করিয়াছেন। বেলার সম্বন্ধে তাহার আক্রমণাত্মক রূঢ়ভাষণ তাহার প্রধূমিত অন্তর্দাহের কিছুটা পরিচয় দেয়। মোট কথা, নীলিমা-চরিত্রে যে ব‍্যক্তিত্ব-বিকাশ ও প্রেমরহস‍্য-স্ফুরণের সম্ভাবনা ছিল, লেখক তাহাকে পরিস্ফুট করেন নাই। সে উপগ্রহরূপেই কমলসম্বন্ধীয় বাগবিতণ্ডার কক্ষৃবর্তন করিয়াছে, প্রেমের আভিজাত‍্য-গৌরবে স্বাধীন আত্মপ্রকাশ করে নাই। লেখকের নিকট চরিত্রৌৎসুক‍্য যে গৌণ ও মতবাদ-আলোচনাই যে প্রধান তাহা নীলিমার অর্ধস্ফুট ব‍্যক্তিত্বেই প্রমাণিত। হরেনের গৃহে আশ্রয় লওয়াতে তাহার বাসস্থান পরিবর্তন অপেক্ষা আর কোনো নিগূঢ় আন্তর পরিবর্তন সূচিত হয় নাই।
     বেলা একেবারেই গৌণ; সে নীতির দিক দিয়া কমলের সহধর্মী। কিন্তু তাহার মনোলোকে কমলের সূক্ষ্ম সুরুচি ও সৌকুমার্যবঞ্চিত। সে বৈপরীত‍্যের দ্বারা কমলের আপেক্ষিক শ্রেষ্ঠত্বই প্রকাশ করিয়াছে।
     'বিপ্রদাস' (মাঘ, ১৩৪১) উপন‍্যাসে শরৎচন্দ্রের পূর্ব-গৌরবের অনেকটা পুনরুদ্ধার হইয়াছে। অতি কঠোর আচার-অনুষ্ঠাননিষ্ঠ মুখুজ‍্যে পরিবারের সঙ্গে স্বপ্লকালস্থায়ী সংস্রবে আধুনিক শিক্ষা-প্রাপ্তা বন্দনার চিত্ত-জগতে যে গুরুতর বিপ্লব সংঘটিত হইয়াছিল তাহারই ইতিহাস ইহার বিষয়বস্তু। বন্দনা এই আচার-বিচারের অতি-সতর্ক শুচিতার দ্বারা একই সময়ে আকৃষ্ট ও প্রত‍্যাহত হইয়াছিল; ইহাকে বুদ্ধির দ্বারা অনুমোদন করিতে পারে নাই, কিন্তু অন্তরের মধ‍্যে গ্রহণ করিয়াছে। এই আচারনিষ্ঠতার প্রভাবে তাহার সমস্ত