Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা - ১৫১, ১৫২ ও ১৫৩

2020-10-12
অনির্দেশ‍্য কারণে কুলত‍্যাগিনী হইয়াছেন। যে পরপুরুষের আকর্ষণে তাঁহার এই অপ্রত‍্যাশিত কক্ষচ‍্যুত ঘটিয়াছে, সেই রমণীবাবুর মধ‍্যে কোনো আকর্ষণীয় গুণের সন্ধান মিলে না। রুক্ষ, পুরুষ-প্রকৃতি, স্থূল ভোগ-লালসার ইতর এই লোকটি কী যাদুমন্ত্র-প্রভাবে সবিতার মতো মহীয়সী রমণীর প্রণয়ভাজন হইল তাহা শেষ পর্যন্ত রহস‍্যাবৃতই থাকিয়া যায়। সবিতা অনেকবার তাঁহার আদর্শচ‍্যুতির কারণ নির্দেশ করিতে গিয়া শেষ পর্যন্ত অদৃষ্টের উপরেই দায়িত্ব আরোপ করিয়াছেন। গ্রন্থের ৩০০ পৃষ্ঠায় লেখক ব্রজবাবুর সহিত তাঁহার যৌবন-কাঙিক্ষত উচ্ছ্বসিত প্রণয়-মিলনের অপূর্ণতার কথা উল্লেখ করিয়া একটা কারণ দিবার চেষ্টা করায়াছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবিতার আচরণকে একটা আকস্মিক বিপ্লবের পর্যায়ভুক্ত করিয়া নিজ বিশ্লেষণ-প্রয়াস অর্ধ-সম্পূর্ণ রাখিয়াছেন। পদস্খলনের পর সবিতার চরিত্রে মহিমার আরোপ যেন সীতাবর্জনের পর রামের চরিত্র-মহাত্ম‍্য-জ্ঞাপন। এ যেন নাটকীয় climax বা চরম সংঘাতের মুহূর্তের পর নাট‍্যরম্ভ। যে দুর্বার শক্তি সবিতাকে গৃহকত্রীর্র সম্ভম, স্বামী ও সন্তানের স্নেহবন্ধন ও যুগযুগান্তব‍্যাপী, অস্থিমজ্জাগত ধর্মসংস্কারের সুদৃঢ় বেষ্টনী হইতে টানিয়া বাহির করিয়াছে তাহার অন্তরলোকের প্রধান পরিচয়। তাহার মধ‍্যেই তাহার ব‍্যক্তিত্ব-রহস‍্য নিহিত আছে। ইহাকে একটা দুর্বোধ‍্য খেয়াল বলিয়া উড়াইয়া দিলে ঔপন‍্যাসিকের সৃষ্ট চরিত্রদের সম্বন্ধে তাঁহার সর্বজ্ঞতার যে প্রত‍্যাশা আমরা করি তাহা ক্ষুণ্ণ হয়। লেখকের বিরুদ্ধে পাঠকের অনুযোগের একটা প্রধান কারণ এই যে, সবিতার চরিত্র-রহস‍্য-উন্মোচনে তিনি তাহাদের সহিত পূর্ণ সহযোগিতা করেন নাই।
     এই প্রাথমিক ত্রুটি ছাড়িয়া দিলে ইহা স্বীকার করা যায় যে, লেখক সবিতার চরিত্রে যে মহনীয়তা ও অন্তঃরুদ্ধ বেদনার ও আত্মগ্লানির অবিরাম জ্বালা দেখাইতে চাহিয়াছেন তাহাতে তিনি উদ্দেশ‍্যানুরূপ সফলতা লাভ করিয়াছেন। সবিতার প্রণয়োন্মেষের যে কাহিনী আমাদের সন্মুখে অভিনীত হইয়াছে তাহার বিষয়, বিমলবাবুর সহিত তাঁহার নূতন অন্তরঙ্গ সম্বন্ধ গড়িয়া উঠা। ইহাই তাঁহার শেষের পরিচয় এবং ইহার অনুসারেই উপন‍্যাসের নামকরণ হইয়াছে। ব্রজবাবুর সংসারে সর্বময়ী কত্রী, স্বামীর শুভানুধ‍্যায়িনী, যাঁহার দাম্পত‍্য-সম্পর্ক নিছক শ্রদ্ধা, ভক্তি ও কল‍্যাণ-কামনার উপর প্রতিষ্ঠিত ও সম্পূর্ণরূপে প্রেমের বৈদ‍্যুতী-আকর্ষণ-বর্জিত -- ইহাই তাঁহার প্রথম পরিচয়। রমণীবাবুর ইতর, ভোগলিপ্সা-কলঙ্কিত সাহচর্যের মধ‍্যে নিজ কৃতকর্মের চরম তিক্ততা-আস্বাদানের দৃঢ় সংকল্প এবং সমস্ত অনুশোচনা সূক্ষ্ম মানস অতৃপ্তি ও প্রতিবাদের আত্মসংবৃতি সবিতার চরিত্রের বিশেষ অভিব‍্যক্তি। এই দ্বাদশবর্ষব‍্যাপী আত্মবিলোপের মধ‍্যেই তাঁহার দ্বিতীয় পরিচয় লিপিবদ্ধ আছে। পৌঢ় জীবনে বঞ্চিত হৃদয়াবেগ, কন‍্যা ও স্বামীর দ্বারা প্রতিহত হইয়া, বিমলবাবুর সহজ ভদ্রতা, সুরুচি-সংযম ও অকৃত্রিম হিতৈষণার চারিদিকে নূতন মধুচক্র রচনা করিয়াছেন এবং ইহার মধ‍্যেই তাঁহার শেষ ও সত‍্য পরিচয়ের স্বাক্ষর মুদ্রিত হইয়াছে। এই দেহলালসাহীন, সূক্ষ্ম ভাববিনিময়ের তন্তুজালরচিত অভিনব সম্পর্কের মধ‍্যে অতিক্রান্ত-যৌবন, অপগত-মোহ, দুঃখ-বেদনার অভিঘাতে বিচিত্রজ্ঞান ও অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ, নর-নারীর এক নূতন মিলনের আদর্শ মূর্ত হইয়াছে। এই সম্বন্ধ অনেকটা দ্রুতগতিতে সহজ শিষ্টাচার হইতে নিঃস্বার্থ কল‍্যাণ-কামনার ভিতর দিয়া প্রেমের অন্তরঙ্গতার স্তরে পৌঁছিয়াছে; সবিতার দিক দিয়া ইহা যেন অনেকটা নিশ্চিন্ত, নির্ভরযোগ‍্য আশ্রয়ের অনুসন্ধান; বিমলবাবুর দিক দিয়া তাঁহার রমণী-প্রভাবশূন‍্য শুষ্ক অন্তরে দুঃখমথিত নারী-হৃদয়ের স্নিগ্ধ অমৃত-নির্যাস-নিষেকের জন‍্য ব‍্যগ্রতা।
     এই সম্বন্ধের অঙ্কুরোদগম হইতে পরিপক্কতা পর্যন্ত ক্রমবিকাশের সমস্ত স্তরগুলি আলোচনা করিলে মনের মধ‍্যে ইহার অনিবার্যতা সম্বন্ধে কিছু সন্দেহ জাগে। এই উপলক্ষে উভয়ের মধ‍্যে যেথেষ্ট ভাব-বিনিময়, প্রীতি-শ্রদ্ধার আদান-প্রদান ও আদর্শবাদমণ্ডিত হৃদয়াবেগের নিবেদন হইয়াছে; কিন্তু এই সমস্তের মধ‍্য দিয়া প্রেমের বিদ‍্যুৎশিখা জ্বলিয়া উঠিয়াছে বলিয়া মনে হয় না। সাবিত্রী ও রাজলক্ষ্মীর ক্ষেত্রে আমরা নানা ঘাত-প্রতিঘাত, বহুবিধ আকর্ষণ-বিকর্ষণের মন্থনের ভিতর দিয়া, চাপিয়া রাখা প্রেমের উত্তাপ ও দাহ, ইহার আনন্দ-বেদনা-মিশ্র, লাঞ্ছনা-গৌরব-জড়িত মনোভাবের প্রত‍্যক্ষ স্পর্শ অনুভব করি। কমললতা ও সবিতার ক্ষেত্রে কিন্তু প্রেমের আবির্ভাবকে অনেকটা সুলভ ভাবাতিশয‍্যের অতি আর্দ্র জলাভূমি হইতে অনায়াসে-ক্ষরিত বলিয়া ঠেকে। ইহারা যেন অতি সহজেই প্রেমের মাধ‍্যাকর্ষণে আত্মসমর্পণ করিয়াছে --সাধনা ব‍্যতিরেকেই সিদ্ধিলাভ করিয়াছে। আমাদের সামাজিক আবেষ্টন, ধর্মসংস্কার ও মানস-বৈশিষ্ট‍্যের বিষয় বিবেচনা করিলে প্রেমের এই অত‍্যর্কিত পরিণতিকে ঠিক স্বাভাবিক মনে হয় না। রাখাল ও সারদার সম্রপর্কের মধ‍্যে প্রেমের নির্মম নিষ্পেষণ, মর্মগ্রন্থিচ্ছেদী, তীক্ষ্ণতা অনুভব হয়---যদিও পুনরাবৃত্তির জন‍্য এই প্রকার চিত্রণের অভিনবত্ব অনেকটা ম্লান হইয়াছে। ইহার সহিত সবিতা-বিমলবাবুর শান্ত, উচ্ছ্বাসহীন, নিরুত্তাপ সম্বন্ধের যথেষ্ট পার্থক‍্য। হয়তো বা এই শেষোক্ত সম্পর্ক প্রেমই নহে, ইহা প্রেমের ছদ্মবেশী সহৃদয় বন্ধুতা মাত্র। পৌঢ় জীবনের প্রেমে রক্তিমাভা অনেকটা ধূসরায়িত হইয়াই থাকে। এই সম্বন্ধের পরিণতি হইয়াছে মিলনে নহে, সম্ভাবিত মিলনের প্রতীক্ষায়। সে যাহা হউক, সবিতার এই নূতন প্রেমিক-বরণের ব‍্যাপারে আমরা রাখালের মতো কতকটা অনস্থাশীলই থাকিয়া যাই। প্রণয়িনী অপেক্ষা জননীরূপেই তাঁহার শ্রেষ্ঠ পরাচয়।
     রাখাল ও তারকের বন্ধুত্বের ঈর্ষাপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পর্যবসান লেখকের প্রথম পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত ছিল কি না ঠিক বলা যায় না। অন্তত গ্রন্থারম্ভে, যখন দুই বন্ধুর সৌহার্দ‍্য ও সমপ্রাণতার বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে, তখন এরূপ পরিণতির কোনো ইঙ্গিতের ---তারকের চরিত্রে স্বার্থের জন‍্য বড়োমানুষের আনুগত‍্য ও আত্মসম্মানজ্ঞানহীন উচ্চাভিলাষের --কোনো গোপন বীজের চিহ্ন চোখে পড়ে না। মনে হয় যেন শ্রীযুক্তা রাধারাণী দেবী বন্ধুত্বের সরল-প্রবাহিত ধারাটির এই নূতন দিকে মোড় ফিরাইয়াছেন। যদি তাহাই হয়, তবে এই পরিবর্তনটি কলাকৌশল ও মনস্তত্ত্বজ্ঞানের দিক দিয়া বেশ সমীচীনই হইয়াছে; ঈর্ষার বেগবান জীবনীশক্তিতে রাখাল ও তারক উভয়েই প্রাণধর্মী হইয়া উঠিয়াছে। বিশেষত, ইহাতে রাখালের চরিত্র-গৌরব বাড়িয়াছে ও সারদার প্রতি তাহার মনোভাব কল্পিত বাধার প্রেরণায়, মান-অভিমানের লীলায় স্ফুটতর ও গভীরতর হইয়াছে।

     অন‍্যান‍্য চরিত্রের মধ‍্যে ব্রজবাবু, রেণু ও সারদা উল্লেখযোগ‍্য। সারদার বিশেষ বিশ্লেষণের প্রয়োজন নাই --সে কেমন করিয়া জানি না সাবিত্রী, রাজলক্ষ্মী প্রভৃতির মতো কলঙ্কিত ইতিহাসের বহিরাবরণের মধ‍্যে প্রেমের অম্লান সুরভি ও দীপ্ত মহিমা অক্ষুণ্ণ রাখিয়াছে। নারী-চরিত্রের যে রহস‍্য শরৎচন্দ্রের দ্বারা বার বার উদাহৃত হইয়াছে, সারদা তাহারই শেষ অনুবৃত্তি। ব্রজবাবু আত্মভোলা ধর্মবিহ্বলতার পরিমণ্ডল হইতে নিজ ব‍্যক্তিত্বকে ঠিক উদ্ধার করিতে পারেন নাই---অপরাধিনী স্ত্রীর প্রতি তাঁহার গভীর শ্রদ্ধা ও অনুযোগহীন ক্ষমার সহিত তাহার পুনর্গ্রহণ বিষয়ে অনমধীয় মনোভাবের সামঞ্জস‍্যের উৎসটি অনাবিষ্কৃতই থাকিয়া যায়। মনে হয় যেন স্ত্রীর সহিত চিরবিচ্ছেদের সংকল্প তাঁহার নিজের নয়, তাঁহার কন‍্যার বজ্রের ন‍্যায় দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি হইতে সংক্রামিত। রেণুর মৃত‍্যুর পর ব্রজবাবু পত্নীকে সেবা-শুশ্রূষার অধিকার-সম্পর্কে কোনো বাধা দেন নাই। কাজেই তাঁহার অনিচ্ছাকে কোনো অলঙ্ঘনীয় আদর্শের অনুশাসনররূপে গ্রহণ করা যায় না। রেণুর শান্ত, নিরুচ্ছ্বাস মিতভাষিতার পিছনে যে প্রত‍্যাখ‍্যান ও প্রতিরোধশক্তি পুঞ্জীভূত হইয়াছে তাহা চেতনাহীন জড়শক্তির বিরোধিতার ন‍্যায়ই অক্ষয় ও পরিবর্তনহীন। তাহার অভিমানপুষ্ট, অবিচারের বেদনায় মোহগ্রস্থ বিবেক ও নীতিবোধ তাহার অন্তরে যে পাষাণ প্রাচীর তুলিয়াছে, তাহার ক্ষুদ্রতম ফাটল দিয়াও মাতৃস্নেহের একবিন্দু শীকরকণা, পূর্বস্মৃতির এক ঝলক উড়ো হাওয়াও প্রবেশাধিকার পায় নাই। মোটের উপর শরৎচন্দ্রের এই শেষ উপন‍্যাসটিতে তাঁহার একা প্রাপ‍্য নহে, তথাপি ইহার পরিকল্পনা ও আলোচনাভঙ্গির চমৎকারিত্ব, ঘটনাবিন‍্যাস ও হৃদয়-বিশ্লেষণের উৎকর্ষ ইহাকে শরৎচন্দ্রের অন্তিম রচনার উপযুক্ত গৌরব ও মর্যাদা অর্পণ করিয়াছে। শরৎচন্দ্রের শেষ অবদান যে তাঁহার প্রতিভার মধ‍্যাহ্নদীপ্তির রশ্মিজালমণ্ডিত --এই সিদ্ধান্ত শরৎ-সাহিত‍্যের নিকট বিদায়গ্রহণের প্রাককালে আমাদের মনে পুলকিত বিস্ময়ের সঞ্চার করে।
     বঙ্গ-উপন‍্যাস-ক্ষেত্রে শরৎচন্দ্র যে কতটা স্থান অধিকার করিয়া আছেন, কীরূপ বিরাট শূন‍্যতা পূর্ণ করিয়াছেন তাহার সম‍্যক পরিচয় দেওয়া সহজ নহে। বঙ্কিম উপন‍্যাসের জন‍্য যে নূতন পথ প্রবর্তন করিয়াছিলেন তাঁহার মৃত‍্যুর সঙ্গে সঙ্গেই সেই পথ অবরুদ্ধপ্রায় হইয়া পড়িয়াছিল। ঐতিহাসিক উপন‍্যাস তো একেবারেই লোপ পাইয়াছিল; সামাজিক উপন‍্যাসও তাঁহার গৌরব ও অর্থগভীরতা হারাইয়াছিল। রবীন্দ্রনাথ এই অবরুদ্ধ পথ কতকটা মুক্ত করিলেন বটে, কিন্তু এই বাধা অতিক্রম করিতে তিনি যে নূতন প্রণালী অবলম্বন করিলেন তাহা যেমনই বিস্ময়কর তেমনি অননুকরণীয়। তাঁহার কবি-কল্পনার মুক্ত পক্ষে আশ্রয় করিয়াই তিনি উপন‍্যাসের পথের এই পাষাণ-প্রাচীন উল্লঙঘন করিলেন। যে কবিত্বশক্তি সামান‍্যের মধ‍্যে অসামান‍্যের সন্ধান পায়, প্রকৃতির মধ‍্যে মানব-মনের উপর নিগূঢ় প্রভাবের রহস‍্য খুঁজিয়া বেড়ায়, তাহার দ্বারাই তিনি উপন‍্যাসের বিষয়গত অকিঞ্চিৎকরত্ব অতিক্রম ও রূপান্তরিত করিয়াছেন। কিন্তু তাঁহার প্রবর্তিত পথে তাঁহার পরবর্তীদের পদচিহ্ন নিতান্তই বিরল; তাঁহার কবি-প্রতিভা না থাকিলে তাহার অনুসরণ অসম্ভব। সুতরাং রবীন্দ্রনাথ উপন‍্যাসের উপর তাঁহার প্রতিভার ছাপ মারিয়াছেন সত‍্য, কিন্তু তাহার পরিধি ও প্রসার বিশেষ বৃদ্ধি করেন নাই। এই অবসরে শরৎচন্দ্র অবতীর্ণ হইয়া বাংলা উপন‍্যাসের সমৃদ্ধির নূতন পথ নির্দেশ করিয়াছেন। তিনি কবিত্বশক্তির অধিকারী না হইয়াও কেবল সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণশক্তি, চিন্তাশীলতা ও করুণরসসৃজনে সিদ্ধহস্ততার গুণে বঙ্গ-সমাজের কঠিন, অনুর্বর মৃত্তিকা হইতে নূতন রসের উৎস বাহির করিয়াছেন ও উপন‍্যাসের ভবিষ‍্যৎ গতির পথরেখা বহুদূর পর্যন্ত প্রসারিত করিয়াছেন। তিনি আমাদের পারিবারিক জীবনে অকিঞ্চিৎকর বাহ‍্য ঘটনার মধ‍্যে গূঢ় ভাবের লীলা দেখাইয়াছেন; আমাদের নারী-চরিত্রের জড়তা ও নির্জীবতা ঘুচাইয়া তাহার দৃপ্ত তেজস্বিতা ও প্রবল ইচ্ছাশক্তির পরিচয় দিয়াছেন। তিনি আমাদের সমাজ-ব‍্যবস্থার বৈষম‍্য ও অত‍্যাচারের প্রতিবাদ করিয়া একসঙ্গে স্বাধীন চিন্তা ও করুণরসের উৎস খুলিয়া দিয়াছেন। এই আত্মপীড়ননিরত জাতির ভগবদ্দত্ত দুঃখ যে নিজ মূঢ়তায় কত বাড়িয়াছে তাহা দেখাইয়াছেন। সর্বশেষে তিনি প্রেম-বিশ্লেষণের দ্বারা প্রেমের রহস‍্যময় গতি ও প্রকৃতির উপর নূতন আলোকপাত করিয়াছেন। সৃষ্টিশক্তির এই অদ্ভুত পরিচয়-দানের পর তাঁহার প্রতিভাতে ক্লান্তির লক্ষণ দেখা দিয়াছে; এবং উপন‍্যাস-সাহিত‍্যের আকাশে আবার অনিশ্চয়তার আঁধার ঘনাইয়া আসিতেছে বলিয়া মনে হয়। কিন্তু ইহা নিশ্চিত যে, এ অনিশ্চয়তার কুহেলিকা যখন কাটিয়া যাইবে ও অগ্রগতির প্রেরণা যখন আবার গতিবেগ আহরণ করিবে তখন ইহা শরৎচন্দ্রের নির্দিষ্ট পথ ধরিয়াই অগ্রসর হইয়া যাইবে। একথা নিঃসন্দেহে বলা যাইতে পারে যে, শরৎচন্দ্রই আমাদের ভবিষ‍্যৎ উপন‍্যাসের গতিনিয়ামক হইবেন।

দশম অধ‍্যায়
স্ত্রী-ঔপন‍্যাসিক
( ১ )

বাংলা উপন‍্যাস-সাহিত‍্যের ক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা স্মরণীয় ঘটনা মহিলা-ঔপন‍্যাসিকের আবির্ভাব। উপন‍্যাসের প্রধান উপজীব‍্য বিষয়---প্রেম, নর-নারীর পরস্পরের প্রতি নিগূঢ় আকর্ষণ-রহস‍্য; ইহারই অফুরন্ত বিচিত্রতা উপন‍্যাসের পৃষ্ঠায় পল্লবিত হইয়াছে। এই প্রেম-চিত্রণের ভার যদি সম্পূর্ণরূপে পুরুষেরই একচেটিয়া হয়, তাহা হইলে ইহা যে খণ্ডিত, অসম্পূর্ণ ও একদেশদর্শী হইবে ইহা অনুমান করা কঠিন নয়। সাধারণত পুরুষ-ঔপন‍্যাসিকের চিত্রে আমরা প্রেমের যে বিবৃতি পাই, তাহাকে পুরুষেরই অবিসংবাদিত প্রাধান‍্য; স্ত্রী-চরিত্র গৌণ অংশ অধিকার করিয়া থাকে। এই হৃদয়াভিযানের কাহিনীতে প্রথম পদক্ষেপ পুরুষের দিক হইতেই আসিয়া থাকে; নারী নিজ স্থানে নিশ্চল হইয়া রুদ্ধনিশ্বাসে এই যাত্রার ফল প্রতীক্ষা করে। পুরুষের মনোভাব-বিশ্লেষণেই লেখকের প্রধান প্রচেষ্টা; নারীচিত্ত-বিশ্লেষণের চেষ্টা যেখানে হইয়া থাকে, সেখানেও মূলত পুরুষের আকর্ষণের প্রতিক্রিয়ারূপেই ইহার আলোচনা।
     অবশ‍্য মনস্তত্ত ও সমাজ-প্রথার দিক দিয়াও বঙ্গসাহিত‍্য এই পুরুষ-প্রাধান‍্যই স্বাভাবিক ও অতি অল্পদিন পূর্বেও অপরিহার্য ছিল। ওকে তো আমাদের সমাজ-ব‍্যবস্থার মধ‍্যে প্রণয়ের অবসর খুব সংকীর্ণ; তার উপর যে সব স্থলে কোনো অলক্ষিত রন্ধ্রপথ দিয়া প্রেম জীবনের মধ‍্যে প্রবেশ লাভ করিয়াছে, সেখানেও নারীর কোনো বিশেষ দাবি বা অধিকারের মর্যাদা স্বীকৃতি হয় নাই। সে পুরুষের প্রেমনিবেদন হয় গ্রহণ না হয় প্রত‍্যাখ‍্যান করিয়াছে; তাহার মধ‍্যে কোনো সুরের বৈশিষ্ট‍্য, কোনো প্রকার-ভেদ আনে নাই। প্রেমে যে পুরুষ ও নারী উভয়েরই পূর্ণ সহযোগিতার প্রয়োজন, এই তথ‍্য আমাদের ঔপন‍্যাসিকেরা সত‍্য-হিসাবে স্বীকার করিলেও কার্যক্ষেত্রে অবলম্বন করেন নাই।
     আমাদের বাংলা সাহিত‍্যের কথা দূরে থাকুক, ইউরোপীয় উপন‍্যাস-সাহিত‍্যেরও প্রথম যুগে নারীর বাণী মূক ও নীরব ছিল---পুরুষের ইচ্ছার অনুবর্তন বা প্রতিরোধই তাহার একমাত্র কার্য ছিল। Jane Austen ও Bronte ভগিনীরাই প্রথম উপন‍্যাসের মধ‍্যে নারীত্বের সুরের প্রবর্তন করেন। সমস্ত জগৎ-ব‍্যাপারটা নারীর চক্ষে কীরূপ ঠেকে, নারীত্বের রঙিন চশমার মধ‍্য দিয়া কীরূপ বিচিত্র বর্ণে অনুরঞ্জিত হয়, পুরুষের সগর্ব প্রাধান‍্যাধিকার নারীর বিদ্রূপমণ্ডিত সমালোচনার বিষয়ীভূত হইয়া কীরূপ বিসদৃশ ও হাস‍্যজনক দেখায়, Jane Austen -এর উফন‍্যাসে ইংরেজ পাঠক তাহার প্রথম পরিচয় পান। আবার অন‍্য দিক দিয়া নারীর চরিত্র স্ত্রী-ঔপন‍্যাসিকের হাতে বিশেষভাবে রূপান্তরিত হইয়াছে। পুরুষের আবেশময় দৃষ্টির মধ‍্য দিয়া নারীর দৈহিক সৌন্দর্য ও অন্তর-সুষমা প্রায় আদর্শলোকের মহিমমণ্ডিত হইয়া উঠিয়াছে; নারীর স্বজাতি-সম্বন্ধে তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ-শক্তি ও কঠোর সত‍্যপ্রিয়তা এই আদর্শ জ‍্যোতিকে অনেকটা ম্লান করিয়া উপন‍্যাসের নায়িকাকে বাস্তবতার মৃত্তিকা স্পর্শ করাইয়াছে। স্ত্রী-ঔপন‍্যাসিকের বর্ণিত নারী-চরিত্রের দেহ-সৌন্দর্যের আধিক‍্য বা স্তব-স্তুতির অতিরঞ্জনের সুর নাই; আছে গভীর বিশ্লেষণ ও আত্মজিজ্ঞাসা ও নিজ অধিকার সম্বন্ধে একটা ক্ষুব্ধ, ধূমায়িত বিদ্রোহোন্মুখতা। এই বিদ্রোহের সুর, সমাজ-ব‍্যবস্থায় স্ত্রী-পুরুষের অধিকার-বৈষম‍্যের বিরুদ্ধে অনুযোগের তীব্রতা ইংরেজি উপন‍্যাসে সর্বপ্রথম Bronte ভগিনীদের উফন‍্যাসে আত্মপ্রকাশ করে। তাঁহাদের নায়িকারা প্রায়ই সৌন্দর্যহীন, সাধারণ অবস্থার স্ত্রীলোক, শিক্ষয়িত্রী বা সহচরী ইত‍্যাদিরূপ বৃত্তির দ্বারা জীবন-যাত্রা নির্বাহ করে। ব‍্যবহারে তাহারে সংকুচিতা, লজ্জাশীলা ও স্বল্পভাষিণী; কিন্তু এই বাহ‍্য শান্ত সংযত ভাবের অন্তরালে তীব্র অন্তর্বিদ্রোহের অগ্নি সর্বদাই প্রধূমিত। একটা গূঢ় অভিমান ও প্রচ্ছন্ন আত্মমর্যাদাবোধ সর্বদাই তাহাদের অনুভূতিকে তাহাদের কথাবার্তা ও ব‍্যবহারকে অসাধারণরূপে তীক্ষ্ণ ও বিদ্রোহ-কণ্টকিত করিয়া রাখিয়াছে। ভালোবাসা পাইবার যে সনাতন, রাজকীয় অধিকার নারীজাতির আছে, সেই অধিকারবোধ তাহাদের হৃদয়ে অনুক্ষণ প্রবলভাবে জাগ্রত। এই দুর্দমনীয় ইচ্ছা তাহাদের প্রতিমুহূর্তের রক্ত-সঞ্চরণের, তাহাদের প্রাত‍্যহিক জীবনযাত্রার গতিবেগ বর্ধিত করিতেছে; এই প্রেমাকাঙক্ষার অকুণ্ঠিত, লজ্জাসংকোচহীন অভিব‍্যক্তিই তাহাদের ভাষাতে তীব্র আবেগ ও উদ্দীপনা আনিয়া দিয়াছে। নারী-চরিত্রের এই একটা অপ্রকাশিত দিক Bronte-ভগিনীদের উপন‍্যাসে উদ্ঘাটিত হইয়াছে।
     জর্জ এলিয়টের উপন‍্যাসে রমণীসুলভ আর একটা বিশেষ সুর ধ্বনিত হইয়াছে। তাঁহার শেষ বয়সের উপন‍্যাসগুলি পুরুষোচিত পাণ্ডিত‍্যাভিমান ও বিশ্লেষণাধিক‍্যের দ্বারা ভারগ্রস্ত অভিভূত হইয়াছে সন্দেহ নাই; কিন্তু প্রথমদিকের উপন‍্যাসগুলিতে আমরা নারী-হস্তের লঘু কোমল স্পর্শ, শিশুর চিত্রাঙ্কনে মাতৃ-হৃদয়ের উচ্ছ্বসিত স্নেহ সুস্পষ্টভাবে অনুভব করি। তাঁহার প্রথম প্রকাশিত উপন‍্যাসগুলিতে