Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা - ১৫৭, ১৫৮ ও ১৫৯

2020-10-22
বিচার-বিতর্কের প্রলোভন হইতে অব‍্যাহতিলাভ ইহাদের পক্ষে সহজ ছিল না। ব‍্যক্তি বা পরিবারবিশেষের বাস্তবজীবনে এই তত্ত্বান্বেষণপ্রবৃত্তি ফুটাইয়া তোলার মতো বাস্তবরসসমৃদ্ধি ও নিরপেক্ষতা (detachment) খুব অল্প ঔপন‍্যাসিকেরই ছিল। শিবনাথ শাস্ত্রী প্রমুখ ঔপন‍্যাসিকেরা যুগান্তরের ঢেউয়ে এরূপ হাবুডুবু খাইয়া উপন‍্যাসের পৃষ্ঠাগুলি তত্ত্বালোচনার বাষ্পে ফাঁপাইয়া তুলিতেছিলেন। গর্ভস্থ ভ্রূণদেহের ন‍্যায় উপন‍্যাসের দেহও এই যুগে অস্ফুট ও অপরিণত ছিল। এক বঙ্কিমচন্দ্র ছাড়া সে যুগের প্রায় সমস্ত ঔপন‍্যাসিকই এইরূপ প্রতিকূল অবস্থার বিরুদ্ধে অর্ধনিষ্ফল প্রয়াস করিতেছিলেন। বঙ্কিমের প্রতিভাই এই যুগান্তরের বিশৃঙ্খলার মধ‍্য হইতে ব‍্যক্তিগত জীবনের সৌন্দর্য-পরিপূর্ণতা ফুটাইয়া তুলিতে সমর্থ হইয়াছিল; বিধবা-বিবাহ-সম্বন্ধীয় আন্দোলনের বিচ্ছিন্ন পরমাণু হইতে তিনি কুন্দনন্দিনী ও রোহিণীর মূর্তি গঠন করিয়াছিলেন।
    স্বর্ণকুমারীর সামাজিক উপন‍্যাসের অধিকাংশের মধ‍্যে এই দোষ প্রচুরভাবে বিদ‍্যমান। তাঁহার 'হুগলীর ইমামবাড়ী' উপন‍্যাসে, পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা ব‍্যাপিয়া ধর্মতত্ত্বালোচনা গল্পের সরস বাস্তবতাকে গ্রাস করিয়াছে। সন্ন‍্যাসী তাঁহার অতিমানবীয় শক্তি লইয়া বারবার উপন‍্যাসে আবির্ভৃত হইয়াছেন ও গল্পের স্রোতকে আকস্মিক পরিবর্তনের খাতে ফিরাইয়া দিয়াছেন। দার্শনিক আলোচনার অতি-প্রাদুর্ভাব ও অতি-মানবীয় শক্তির একাধিকবার প্রবর্তন ---এই দুইটিই উপন‍্যাসের প্রধান ত্রুটি। মহম্মদ ও মুন্না ---ভ্রাতা-ভগিনীর মধ‍্যে অতি মধুর স্নেহসম্পর্কের চিত্রই উপন‍্যাসের প্রধান স্থান অধিকার করে। স্বামিপরিত‍্যক্তা মুন্নার শোকোচ্ছ্বাসের মধ‍্যে করুণরসের প্রাধান‍্য অনুভব করা যায়। নবাব খাঁজহান খাঁর অস্থিরমতিত্ব, যথেচ্ছাচারপ্রিয়তা ও পাপের প্রলোভনে অন্তর্দ্বন্দ্বের চিত্রও কতকটা শক্তিমত্তার পরিচয় দেয়, কিন্তু খাঁজাহান-কাহিনীর সহিত মূল গল্পের যোগসূত্র খুব সামান‍্য; কেবল বাহ‍্য অভিভবের সম্পর্ক মাত্র। মোটের উপর উপন‍্যাসটির গ্রন্থন-প্রণালী অত‍্যন্ত শিথিল, ---ইহার বিভিন্ন অংশগুলির মধ‍্যে বন্ধন খুব আলগা রকমের। এক মহম্মদ মহসীনের উন্নত, উদার চরিত্রই উপন‍্যাসের খণ্ডাংশগুলির মধ‍্যে যৎকিঞ্চিৎ ঐক‍্যবন্ধনের হেতু হইয়াছে।
     'স্নেহলতা' উপন‍্যাসটিও (১৮৯২ ) এইরূপ সমাজ-ও-ধর্মসংস্কারমূলক তর্ক-বিতর্কের মধ‍্যে নিজ প্রধান উদ্দেশ‍্য হারাইয়া ফেলিয়াছে। জগৎবাবুর পারিবারিক জীবনের যে চমৎকার চিত্র গ্রন্থারম্ভে আমাদের আশার উদ্রেক করে, দুই-এক অধ‍্যায় পরেই তার্কিকতার একটা ঢেউ আসিয়া তাহার উজ্জ্বলতাকে মুছিয়া দিয়া গিয়াছে। জগৎবাবুর রুক্ষভাষিণী, প্রভুত্বপ্রিয়া, ধন-গর্বিতা গৃহিণী, তাঁহার আদরের মেয়ে অভিমানিনী টগর, উদার কিন্তু দুর্বলচেতা গৃহস্বামী ও শান্তস্বভাবা, সেবাকুশলা স্নেহলতা ---সকলে মিলিয়া এক চমৎকার পারিবারিক চিত্র রচনা করিয়াছে। ইহার অব‍্যবহিত পরেই সমাজ-সমালোচনা ও মতবাদপ্রচারের তীব্র চীৎকার উপন‍্যাসের সুরটি ডুবাইয়া দিয়াছে। হেম, কিশোরী, জীবন, নবীন, মোহন প্রভৃতি প্রকাণ্ড একদল যুবকের আবির্ভাব হইয়াছে, যাহাদের চরিত্রের বৈশিষ্ট‍্য কিছুই নাই, যাহারা কেবল তর্কের বল-লোফালুফির প্রয়োজনে ব‍্যবহৃত হইয়াছে। ইহারা দেশোন্নতি ও সমাজ-সংস্কারের জন‍্য সভাসমিতি স্থাপন করিয়াছে; শিল্পোন্নতির প্রয়োজনীয়তাও ইহাদের দৃষ্টি এড়ায় নাই; বিপ্লবপন্থীর গোপন ষড়যন্ত্রপ্রিয়তা ইহারা নিতান্ত নিরীহ কর্ম-প্রচেষ্টায় প্রয়োগ করিয়াছে। যাহা হউক, এই ব‍্যক্তিত্ববিহীন যুবকদের মধ‍্যে মোহন স্নেহলতাকে ও জীবন টগরকে বিবাহ করিয়া উপন‍্যাস-মধ‍্যে একটু আইনসংগত স্থান অর্জন করিয়াছে। কিশোরী ও জগৎবাবুর পুত্র চারু পরস্পর-প্রশংসা ও পানাসক্তির দ্বারা সখ‍্যতাসূত্রে আবদ্ধ হইয়া উপন‍্যাস-মধ‍্যে একটি বিরুদ্ধ স্রোতের সৃষ্টি করিয়াছে। স্নেহলতার প্রতি অত‍্যাচারের প্রতিবাদস্বরূপ মোহন পিতার আশ্রয় ত‍্যাগ করিয়া বিদেশে গিয়াছে ও সেখানে প্রাণ হারাইয়া স্নেহলতাকে বৈধব‍্যযন্ত্রণা ও অসহায়তার মধ‍্যে নিক্ষেপ করিয়াছে। এইখানে প্রথম খণ্ডের উপসংহার হইয়াছে।
     দ্বিতীয় খণ্ডে ও প্রথম খণ্ডের মধ‍্যে দশ বৎসরের ব‍্যবধান। এখানে চারুই উপন‍্যাসের নায়কের অংশ অধিকার করিয়াছে। চারুর স্ত্রীবিয়োগের পর তাহার দুঃখ খুব বিস্তৃতভাবে বর্ণিত হইয়াছে। তাহার চরিত্রেরও বিস্তৃত বিস্তৃত বিশ্লেষণ হইয়াছে। চারুর বুদ্ধি তীক্ষ্ণ, কিন্তু ক্ষণস্থায়ী। চারু ও বিধবা স্নেহলতার পরস্পরের প্রতি প্রেম-সঞ্চারই উপন‍্যাসের প্রধান বিষয়। কিন্তু তাহাদের প্রণয়-বর্ণনা অপেক্ষা বিধবা বিবাহের ঔচিত‍্য-সম্বন্ধে যুক্তিমূলক আলোচনাই উপন‍্যাস-মধ‍্যে প্রাধান‍্য লাভ করিয়াছে। চারুর মাতার ও টগরের প্রতিকূলতায় এই প্রণয় অগ্রসর হইতে পায় নাই। চারুও তাহার ক্ষণস্থায়ী প্রণয় বিস্মৃত হইয়া আবার নূতন বিবাহ করিয়া তাহার চরিত্রের অসারত্ব প্রমাণ করিয়াছে। এইরূপ চারিদিকের অত‍্যাচারে জর্জরিত-হৃদয় হইয়া স্নেহলতা আত্মহত‍্যার দ্বারা সমস্ত জ্বালা জুড়াইয়াছে। উপন‍্যাস-মধ‍্যে কেবল জগৎবাবু ও জীবনই তাহার প্রতি স্নেহশীল ও সহানুভূতিসম্পন্ন, কিন্তু সমাজের সমবেত বিরুদ্ধতার বিরুদ্ধে তাহাদের ক্ষীণ সহযোগিতা নিতান্ত অক্ষম ও দুর্বল প্রতিপন্ন হইয়াছে। মোটের উপর উপন‍্যাসে ঘটনা-পারম্পর্যের সহিত কোনো চরিত্র-পরিণতির সংযোগ হয় নাই---উপন‍্যাসের প্রকৃত রস কোথাও জমাট বাঁধে নাই।
     'কাহাকে' ( ১৮৯৮ ) লেখিকার সর্বোৎকৃষ্ট উপন‍্যাস। এক আধুনিক শিক্ষিতা মহিলা ইহাতে তাহার প্রণয়ের ভাগ‍্যবিপর্যয়-কাহিনী বিবৃত করিয়াছে। শৈশবকালে তাহার ভালোবাসার পাত্র ছিলেন তাহার পিতা --তাহার সমস্ত ব‍্যাকুল ঐকান্তিকতা, নিষ্ঠুর নিষ্ঠা ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী একধিপত‍্য পিতাকে আশ্রয় করিয়াছিল। আরও কিছুদিন পরে এক সহপাঠী আসিয়া পিতার অংশীদার হইয়া বসিল তাহার ভালোবাসা উভয়ের মধ‍্যে নির্বাচনে অসমর্থ হইয়া চঞ্চল ও দোলায়িত হইয়া উঠিল। সহপাঠীর একটা অসম্পূর্ণ গানের কয়েকটা চরণ তাহার স্মৃতিতে একটা অজ্ঞাত প্রেমের রাগিণীর ন‍্যায় বাজিতে লাগিল। তারপর অনেক বৎসর পরে সুশিক্ষিতা ও পূর্ণযুবতী নায়িকা তাহার ব‍্যারিস্টার ভগিনীপতি ও দিদির গৃহে আবার নূতন করিয়া প্রেমের আস্বাদ পাইয়াছে। এক নবীন ব‍্যারিস্টার রমানাথ --সেই পূর্ব-পরিচিত গান গাহিয়া তাহার প্রেমের পূর্বস্মৃতি জাগাইয়াছে, এবং তাহার হৃদয়ে প্রথম গভীর অনুরাগের উদ্রেক করিয়াছে। কিন্তু কিছু দিন

পরেই তাহার সন্দেহ জাগিয়াছে যে, রমনাথের প্রতি তাহার মনোভাব প্রকৃত প্রেম কি না। সংগীতের সুরের সহিত এই ভাবের এরূপ ব‍্যবহারেও খটকা লাগিবার কারণ উপস্থিত হইয়াছে। আশাভঙ্গের দারুণ আঘাতে নায়িকার মূর্ছা হইয়াছে, ও এই অসুখের সময় তাহার ভগিনীপতির বন্ধু এক ডাক্তারের আন্তরিক সমবেদনা ও আত্মীয়বৎ ব‍্যবহার তাহার প্রতি এমন একটা শ্রদ্ধার ভাব জাগাইয়াছে, যাহা প্রেমের অগ্রদূত। ইহার পর রমানাথের ব‍্যবহারে আত্মপক্ষসমর্থনের একটা ব‍্যাকুল, আন্তরিক চেষ্টা থাকিলেও, ইহার মধ‍্যে নায়িকার সূক্ষ্ম অনুভূতি স্বার্থপরতার গন্ধ পাইয়াছে। অজ্ঞাতসারে নায়িকার মন ডাক্তারের দিকে ঝুঁকিয়াছে, ডাক্তারের চিত্র তাহার হৃদয়পট হইতে রমানাথের চিত্রকে অপসারিত করিয়াছে। এই সময় নায়িকার পিতা আসিয়া তাহাকে কলিকাতা হইতে লইয়া গিয়াছেন ও স্ত্রীলোকের স্বাধীন নির্বাচনের প্রতি আর আস্থা না দেখাইয়া তাহার বাল‍্য-সহচর ছোট্টুর সহিত তাহার বিবাহ-সম্বন্ধ স্থির করিয়াছেন। ইহাতে নায়িকা বিষম অবস্থাসংকটে পড়িয়াছে--কিন্তু অবশেষে তাহার সমস্ত সন্দেহ নিরসন হইয়াছে ডাক্তার ও ছোট্টুর অভিন্নতার আবিষ্কারে। এইরূপ নানা পরিবর্তনের মধ‍্য দিয়াই শেষ পর্যন্ত নায়িকা প্রকৃত প্রেমের পরিচয় লাভ করিয়াছে।
     এই ক্ষুদ্র উপন‍্যাসটির বিশেষত্ব এই যে, ইহার মধ‍্যে আগাগোড়া স্ত্রীলোকের সুর ধ্বনিত হইয়াছে। ইহার মধ‍্যে যেথেষ্ট তর্ক-বিতর্ক আছে, যথেষ্ট পাণ্ডিত‍্যের আস্ফালন আছে, ইংরেজি সাহিত‍্য ও সমাজের তুলনামূলক সমালোচনা আছে, কিন্তু সকলের উপর দিয়া একটি স্ত্রী-হস্তের লঘু-কোমল স্পর্শ অনুভব করা যায়। এই বিশিষ্ট সুরটি কী তাহা বিশ্লেষণের দ্বারা প্রমাণ করা কঠিন, তবে ইহা অনুভব করা সহজ। বঙ্কিমচন্দ্রের 'ইন্দিরা' ও 'রজনী'তে ও রবীন্দ্রনাথের অনেক উপন‍্যাসে নারীর উক্তি ও মন্তব‍্য প্রধান স্থান অধিকার করিয়াছে, নারীর মুখ দিয়া উপন‍্যাসের বিশেষ সমস‍্যা আলোচিত হইয়াছে। কিন্তু সেখানে কথাবার্তার ভঙ্গি ও মন্তব‍্যের সুর যেন পুরুষের সহানুভূতিমূলক কল্পনার দ্বারা নারীর উপর আরোপিত হইয়াছে; ইহার খাঁটি সুরের সঙ্গে যেন একটু কবিত্বপূর্ণ উচ্চগ্রাম, একটু অতিরঞ্জনের খাদ মিশানো রহিয়াছে। ইন্দ্রিরা ও রজনীর মধ‍্যে যে সপ্রতিভতা, যে পরিহাসনিপুণতা ও বিদ্রূপপ্রবণতা পাওয়া যায়, তাহার মধ‍্যে যেন একটু পুরুষ-কল্পনার আতিশয‍্য আছে। পুরুষের চোখে স্ত্রীলোকের সৌন্দর্য যেমন, সেইরূপ তাহার মনোভাবও একটু আদর্শবাদ দ্বারা রূপান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু এখানে নায়িকার প্রত‍্যেক বাক‍্যে, প্রত‍্যেক মন্তব‍্যে একটা মৃদু সুগন্ধ পুষ্পসারের মতো নারীর অবর্ণনীয় মাধুর্য ও কোমলতা অনুভব করি। প্রারম্ভেই নারীর ঐতিহাসিক জ্ঞানের অভাব, তাহার সন-তারিখ মনে করিয়া রাখার অক্ষমতার বর্ণনাতে একটা বিশিষ্ট নারীর সুর বাজিয়া উঠে। পিতার প্রতি আদরিণী কন‍্যার মনোভাব-বর্ণনে ও এই মনোভাবে প্রেমের সমস্ত লক্ষণ আবিষ্কার করার মধ‍্যে, রমানাথের প্রতি নবজাগ্রত প্রেমবিকাশের বিশ্লেষণে, প্রেমভঙ্গের দুঃসহ বেদনা ও ক্লিষ্ট নৈরাশ‍্যে, ও তাহার প্রকৃত প্রণয়ীর সহিত শঙ্কা-ব‍্যাকুল অনিশ্চয়তার ভিতর দিয়া মিলনের গভীর তৃপ্তিতে--মোটকথা উপন‍্যাসের সমস্ত ব‍্যাপারেই নারীসুলভ সূক্ষ্মদর্শিতা ও ভাবপ্রবণতার পরিচয় পাওয়া যায়। সাধারণত পুরুষ-ঔপন‍্যাসিক আধুনিক শিক্ষিত নারীর মধ‍্যে যে প্রগলভতা ও পুরুষবুদ্ধি - প্রাধান‍্যের আরোপ করিয়া থাকেন, এখানে তাহার চিহ্নমাত্র নাই --শিক্ষা তাহাকে বাক্-সংযম দিয়াছে, তাহার রুচি মার্জিত করিয়া তাহার চরিত্র-সৌকুমার্যকে বাড়াইয়াছে। এই স্ত্রী-মনোভাবের নিখুঁত প্রতিবিম্ব-হিসাবে উপন‍্যাসটির একটি বিশেষ আকর্ষণ আছে। স্বর্ণকুমারী দেবীর দুই-একটি ছোটো গল্পের --বিশেষত, 'পেনে প্রীতি' নামক গল্পের মধ‍্যেও এই গুণসমৃদ্ধি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। স্বর্ণকুমারীর ঐতিহাসিক ও অন‍্যান‍্য সামাজিক উপন‍্যাসে চিরস্থায়িত্বের কোনো লক্ষণ নাই; কিন্তু 'কাহাকে' তাঁহার প্রতিভার শ্রেষ্ঠ দান ও অন‍্যান‍্য মহিলা-ঔপন‍্যাসিক হইতে তাঁহার প্রতিভার স্বাতন্ত‍্যের পরিচয়।
( ৪  )

স্বর্ণকুমারী দেবীর পরবর্তী মহিলা-ঔপন‍্যাসিকের হাতে উপন‍্যাস সাধারণত দুইটি বিপরীতমুখী ধারার অনুবর্তন করিয়াছে। এক শ্রেণীর লেখিকা হিন্দু-সমাজের উপর আক্রমণ ও সমালোচনার প্রতিক্রিয়ারূপে ইহার সনাতন বিধি-নিষেধ ও মূলিভূত আদর্শের পক্ষসমর্থনের কার্যে আত্মনিয়োগ করিয়াছেন। এই শ্রেণীর প্রধান প্রতিনিধি নিরুপমা দেবী ও অনুরূপা দেবী। ইঁহাদের, বিশেষত অনুরূপা দেবীর প্রায় সমস্ত উপন‍্যাসে যে স্বার্থত‍্যাগ, ভগবৎ-প্রেম ও লোকহিতৈষণা হিন্দু-সমাজের আদর্শ ও অনুপ্রেরণা, তাহাই গভীর অনুরাগ ও সহানুভূতির সহিত চিত্রিত হইয়াছে। পশ্চাত‍্য ভাবের পঙ্কিল প্রবাহে সেই আদর্শের বিশুদ্ধি মলিন হইতেছে, শান্তি ও আত্মবিসর্জনমূলক সন্তোষের উপর প্রতিষ্ঠিত আমাদের পারিবারিক জীবন কেন্দ্রভ্রষ্ট হইতেছে, ইহাই তাঁহাদের নবীন শিক্ষাসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ। অনুরূপা দেবীর একাধিক উপন‍্যাসেই একজন আদর্শ সমাজনেতা ও ধর্মনিষ্ঠ ব্রাহ্মণ-পণ্ডিতের চিত্র আছে, যিনি সাংসারিক দুঃখ-কষ্ট, অত‍্যাচার-উৎপীড়নের ঝঞ্ঝাবাতের মধ‍্যে অটল গিরিশৃঙ্গের ন‍্যায় অক্ষুণ্ণ মহিমায় দণ্ডায়মান থাকেন। এই জাতীয় চরিত্রেরা প্রায়ই শ্রেণী-বিশেষের প্রতিনিধি, ব‍্যক্তিত্বসূচক গুণ তাঁহাদের মধ‍্যে সাধারণত অস্পষ্ট থাকে; কেবল প্রতিবেশের বিভিন্নতার জন‍্য ভিন্ন ভিন্ন উপন‍্যাসে তাঁহাদের কতকটা চরিত্র-পার্থক‍্য লক্ষিত হয়। আর একপ্রকারের চিত্র এই উপন‍্যাসগুলিতে প্রায় পুনরাবৃত্ত হইতে থাকে ---স্বধর্মনিষ্ঠ, কন‍্যাস্নেহপরায়ণ জমিদার। ধর্মানুষ্ঠান প্রাচীনপ্রথানুরক্ত বাঙালি-পরিবারে যে কতখানি প্রভাব বিস্তার করিয়া থাকে এই সমস্ত উপন‍্যাসে আমরা তাহার পরিচয় পাই। শঙ্খ-ঘণ্টার আরতি-রোল, ধূপ-ধূনার সুরভি, মন্ত্রোচ্চারণের মধুর-গম্ভীর শব্দে যেন ইহাদের পাতাগুলির সঙ্গে মিশিয়া আছে। এই ধর্মানুষ্ঠান কেবল যে একটা দৃশ‍্য-সৌন্দর্য বা বাহ‍্যড়ম্বরের দিক হইতে বর্ণিত হয় তাহা নহে, অন্তরের উপর গভীর প্রভাবই ইহার বিশেষত্ব। সংসারসুখহীনা রমণী তাহার হৃদয়ের অভাব পূরণ করিবার জন‍্য দেবমন্দির মধ‍্যে অন্তরের উপর গভীর প্রভাবই ইহার বিশেষত্ব। সংসারসুখহীনা রমণী তাহার হৃদয়ের অভাব পূরণ করিবার জন‍্য দেবমন্দির মধ‍্যে আশ্রয় গ্রহণ করিয়া থাকে, দেবতার সহিত একটা মধুর স্নেহ-ভক্তির সম্পর্ক স্থাপন করিয়া সাংসারিকতার অতৃপ্ত বাসনাগুলি পুরাইবার

একটা উপায় আবিষ্কার করে। নিরুপমা দেবীর 'দিদি' ও অনুরূপা দেবীর 'মন্ত্রশক্তি' এই বিষয়ের উদাহরণস্থল। দাম্পত‍্য-মনোমালিন‍্য ও পিতা-পুত্রীর মধুর স্নেহসম্পর্ক এই উপন‍্যাসগুলির আলোচনার প্রধান বিষয়। স্বামি-স্ত্রীর গূঢ় অভিমানমূলক বিচ্ছেদ বা প্রকৃতি-বৈষম‍্যের জন‍্য মনোমালিন‍্যের নানারূপ সূক্ষ্ম পরিবর্তন এই উপন‍্যাসগুলিতে প্রতিফলিত হইয়াছে। আবার স্বামিপ্রেমবঞ্চিতা কেমন ব‍্যাকুল আগ্রহের সহিত পিতৃস্নেহের শীতল অঙ্কে আশ্রয় গ্রহণ করে, পিতা কতটা গভীর ও ব‍্যথিত করুণার সহিত অভাগিনী দুহিতার উপর নিজ স্নেহাঞ্চল বিস্তার করেন ও উভয়ের পরস্পর-সম্পর্ক কতটা সূক্ষ্ম অন্তর্দৃষ্টি, অক্লান্ত সেবা ও নীরব আত্মবিসর্জনের দ্বারা মাধুর্যমণ্ডিত হইয়া উঠে, উপন‍্যাসের পর উপন‍্যাসে সেই নিবিড় একাত্মতার ছবি উজ্জ্বলবর্ণে ফুটিয়া উঠিয়াছে। বঙ্গপরিবারের দুইটি প্রধান ভাবধারা এই উপন‍্যাসগুলির মধ‍্যে প্রবাহিত হইয়া তাহাদিগকে এক শ‍্যামল-সরস সৌন্দর্যে মণ্ডিত করিয়াছে।
     দ্বিতীয় শ্রেণীর প্রতিনিধির মধ‍্যে সীতা ও শান্তা দেবীর নাম সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ‍্য। ইঁহাদের উপন‍্যাসে বিশেষ করিয়া নারী-সমাজে আধুনিক মনোবৃত্তির প্রভাব প্রতিফলিত হইয়াছে। পাশ্রচাত‍্য শিক্ষাসংস্কারের নানামুখী আলোড়ন নারীহৃদয়ে কীরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করিয়াছে, নারীর ভাবগভীরতার মধ‍্যে পরিবর্তনের তরঙ্গ-চাঞ্চল‍্য কতখানি স্থির-সংহত হইয়াছে --এই কাহিনীর ইতিহাসই ইঁহাদের উপন‍্যাসের প্রধান বিষয়। নারী-মনের উপর পাশ্চাত‍্য প্রভাবের কতকগুলি বিভিন্ন স্তর পৃথক করা যায়। সর্বপ্রথমে আধুনিকতার ঢেউ বৈঠকখানা ভাসাইয়া লইয়া গেলেও ইহা অন্দরমহলের প্রাচীন-বেষ্টনী হইতে প্রতিহত হইয়া ফিরিয়াছে। পুরুষ যখন আধুনিকতার উগ্র সুরা পান করিয়া মাতাল হইয়াছে, তখন নারী নিজ অন্তঃপুরের অর্গল দৃঢ়ভাবে আঁটিয়া এই দুর্ভেদ‍্য অন্তরালের আশ্রয়ে আত্মরক্ষা করিয়াছে। কিন্তু অন্তঃপুর-দ্বারা এই প্রবল তরঙ্গাভিঘাতে বেশি দিন রুদ্ধ থাকে নাই; স্বামি-পুত্রের যুগ্ম আকর্ষণে নারীর যুগযুগান্তরের ভারকেন্দ্র স্থানচ‍্যুত হইয়াছে। নারী এই নূতন আবির্ভাবকে প্রথম ঘরে, ও পরে মনের কোণে ঠাঁই দিতে বাধ‍্য হইয়াছে, কিন্তু এই বাধ‍্যতামূলক আত্মসমর্পণ আন্তরিক আবাহন নহে। ভিতরের নীরব প্রতিবাদ তাহার ক্ষুব্ধ গুঞ্জরণ সংবরণ করে নাই। তারপর আসিয়াছে নারীর নিজের আকর্ষণের পালা। পরিচয়ের দ্বারা প্রথম সংকোচ কাটিয়া গেলে নারীর বিচারবুদ্ধি ও সৌন্দর্যবোধ ধীরে ধীরে এই নবীন আবির্ভাবের আকর্ষণে উন্মেষিত হইয়াছে। অবশ‍্য সর্বপ্রথম যাহা নারীর চোখে নেশা লাগাইয়াছে তাহা আধুনিকতার বাহ‍্যসৌন্দর্য ও বহির্মুখী স্বাধীনতা --জুতা-সেমিজ-গাউনের রঙিন, লীলাচঞ্চল ঢেউ ও অবাধ সঞ্চরণের উন্মাদনা। এখনও অনেক নারী এই বাহ‍্য আকর্ষণের স্তর অতিক্রম করিতে পারেন নাই। তারপর পাশ্চাত‍্য হাব-ভাব-বিলাসের সীমা ছাড়াইয়া পশ্চিমের মনোরাজ‍্যে প্রথম পদক্ষেপ, তাহার সাহিত‍্য ও চিন্তাধারার সহিত প্রথম পরিচয়। এই পরিচয়ের ফল পুরুষের মধ‍্যে যেমন, নারীর মধ‍্যে তেমন ব‍্যাপক সয় নাই --অনেক ইংরেজি সাহিত‍্য ও সমাজের সহিত ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হইয়াছেন; কেহ কেহ বা স্বর্গীয় তরু দত্ত বা সরোজিনী নাইডুর মতো উচ্চাঙ্গের ইংরেজি কবিতাও রচনা করিয়াছেন। কিন্তু মোটের উপর এই শিক্ষার ফলে নারী-সমাজে কোনো ব‍্যাপক বা ভাবগত গভীর সমন্বয়-সমাধানের যুগ আসিয়াছে। স্কুল-কলেজের শিক্ষাপ্রাপ্তা মহিলার সংখ‍্যা দিন দিন বাড়িতেছে; কিন্তু ইহাদের মধ‍্যে পাশ্চাত‍্য শিক্ষা ভাববিলাসের উপাদানভূত না হইয়া কার্যকরী বিদ‍্যার পর্যায়ভুক্ত হইতেছে। জীবন-সংগ্রামের তীব্রতায় নারী আজ কর্মক্ষেত্রে পুরুষের সহচর ও প্রতিদ্বন্দ্বী; অভাবের প্রবল তাড়না আজ তাহার সুকুমার লালিত‍্যের অপচয় করিয়া তাহার কার্যকরী শক্তিবিকাশের সহায়তা করিতেছে। তাহার মনোরাজ‍্যে আজ প্রণয়ের আবেগ ও মদির বিলাসস্বপ্নকে টুটাইয়া সাংসারিকতার কঠোর কর্তব‍্যাচিন্তা বর্ণলেশহীন ধূসরতায় ফুটিয়া উঠিতেছে। কতকগুলি আধুনিক রীতিনীতি ও প্রথা তাহার প্রাত‍্যহিক জীবনে স্থায়িভাবে স্থান পাইয়াছে। সেমিজ-ব্লাউজ তাহার বিজাতীয় বিলাস হারাইয়া সুরুচিসম্মত অঙ্গাবরণের মধ‍্যে অন্তর্ভুক্ত হইয়াছে; চায়ের টেবিলে নারীর আসন এখন অনেকটা রান্নাঘরের পিঁড়ির পর্যায়ে নামিয়াছে। এখন ইংরেজি শিক্ষাকে সে আবেশহীন সমালোচনার চক্ষে দেখিয়া তাহাকে দৈনন্দিন প্রয়োজনের একাঙ্গীভূত করিবার প্রয়োজন অনুভব করিতেছে।
     এই কঠোর জীবন-সংগ্রামে ক্ষত-বিক্ষত-হৃদয়, পুরুষের সাহচর্যে অভ‍্যস্ত, মনের নূতন অভাব ও নূতন দাবি-সম্বন্ধে সচেতন নারী নবরূপে প্রণয়কে আহ্বান করিতেছে। প্রণয় তাহার নিকট মদির আবেশ নহে, সংসার-যুদ্ধে ক্ষত হৃদয়ের শীতল প্রলেপ, প্রাত‍্যহিক কর্তব‍্যের চাপে গুরুভারগ্রস্ত, অবনমিত মনকে খাড়া, সজীব রাখিবার একটা অবলম্বন মাত্র। এই প্রেমের কোনো বাহ‍্য ঐশ্বর্যসম্ভার, কোনো সমারোহ-প্রাচুর্য নাই, আছে কুণ্ঠিত, সংকুচিত আবির্ভাব, বিরুদ্ধ অবস্থার মধ‍্যে নিজেকে বাঁচাইয়া রাখিবার একটা অন্তর্গূঢ় আবেগ। এই রিক্ত, দীন, জীবন-সংগ্রামে ধূলিধূসর প্রণয়ের চিত্রই সীতা ও শান্তা দেবীর উপন‍্যাসসমূহের প্রধান আলোচ‍্য বিষয়। ইঁহাদের নায়িকারা প্রায়ই গরিবের মেয়ে, স্কুলের ছাত্রী বা বড়োলোকের গৃহে শিক্ষয়িত্রী; অভাবের আঁচ ইহাদের শরীর-মনের সরসতাকে অনেকখানি ঝলসাইয়া দিয়াছে; তাহাদের দেহসৌন্দর্যের কোনো অহংকার নাই, স্বভাবমাধুর্য ও ব‍্যবহারের সুরুচিপূর্ণ ভদ্রতাই তাহাদের একমাত্র আকর্ষণ। তাহারা পুরুষের প্রণয়াভিব‍্যক্তির জন‍্য অপেক্ষা করে না; প্রণয়লাভের তীব্র আকাঙক্ষা, পুরুষের দিক হইতে কোনো সাড়া না পাইয়া, ব‍্যর্থ ক্ষোভে হৃদয় মধ‍্যে গুমরিয়া মরে। শেষ পর্যন্ত যখন তাহাদের প্রেমস্বপ্ন সফলতা লাভ করে, তখন তাহাদের আত্মসর্পণে কোনো উচ্ছ্বাস থাকে না, একটা শান্ত-সংযত আনন্দের পূর্ণতা তাহাদিগকে নিশ্চল, আত্মসমাহিত রাখে। রাজনীতি, সমাজনীতি, সাহিত‍্য প্রভৃতি ব‍্যাপারের আলোচনায় তাহারা পুরুষের সহিত সমকক্ষ-হিসাবে সমান আসন দাবি করে; তাহাদের আলোচনার বিশেষ ভঙ্গি, তাহাদের মনোভাবের বৈশিষ্ট‍্য এই তর্কযুদ্ধে প্রতিফলিত হয়, ও ইহাকে নূতন খাতে সঞ্চালিত করে। মোট কথা, ইঁহাদের উপন‍্যাসে স্ত্রী-পুরুষের জন‍্য আমাদের সামাজিক জীবনে যে একটা নূতন সমন্বয়-ক্ষেত্র রচিত হইতেছে তাহার সুস্পষ্ট আভাস পাওয়া