Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা - ১৬০, ১৬১ ও ১৬২

2020-10-25
যায়; তাহাদের কথোপকথন, তাহাদের পরস্পরের প্রতি ব‍্যবহারে একটা নূতন ভদ্রতা, সুরুচি, হাস‍্য-পরিহাস ও শ্রদ্ধার আদর্শ গড়িয়া উঠিতেছে তাহা অনুভব করা যায়। এই সামাজিক ইতিহাস-পরিবর্তনের বিবৃতি বলিয়া ইঁহাদের উপন‍্যাসগুলির একটা বিশেষ মূল‍্য আছে।
(  ৫  )

এইবার নিরুপমা দেবী ও অনুরূপা দেবীর কতকগুলি উপন‍্যাসের অপেক্ষাকৃত বিস্তৃত আলোচনা করা যাইতে পারে। ইঁহারা একই পর্যায়ভুক্ত, ইঁহাদের আদর্শ, মনোভাব, জীবন-সমালোচনার ধারা ও বিশ্লেষণ-প্রণালী অনেকটা এক রকমের। ইঁহাদের মধ‍্যে তুলনায় আপেক্ষিক শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ করা কঠিন। অনুরূপা দেবীর অধিকার-ক্ষেত্র বিস্তৃততর; তাঁহার উপন‍্যাসের সংখ‍্যা ও বিষয়-বৈচিত‍্য নিরুপমা দেবী অপেক্ষা অনেক বেশি; নিরুপমা দেবীর কলাকৌশল অধিকতর সংযত ও সুনিয়ন্ত্রিত। অনুরূপার মন্তব‍্য অনেক সময় পাণ্ডিত‍্যভারাক্রান্ত ও গুরুপাক; নিরুপমার মন্তব‍্যের মধ‍্যে এই দোষের প্রায় সম্পূর্ণ অভাব; অত‍্যুক্তিপ্রবণতা ও অসংযত উচ্ছ্বাস তিনি প্রায় সম্পূর্ণভাবেই বর্জন করিয়াছেন। সৃষ্টিশক্তির দিক দিয়া অনুরূপার শ্রেষ্ঠত্ব; কলাকুশলতা ও চিত্তবিশ্লেষণে নিরুপমাই বোধ হয় প্রাধান‍্যের দাবি করিতে পারেন। নিরুপমার সর্বোৎকৃষ্ট উপন‍্যাস 'দিদি' বোধ হয় অনুরূপার সর্বোৎকৃষ্ট উপন‍্যাস 'মন্ত্রশক্তি' হইতে উচ্চতর সৃষ্টি। উচ্ছ্বসিত, আবেগময় দৃশ‍্য-চিত্রণে নিরুপমা অনুরূপার সমকক্ষ নহেন; 'মন্ত্রশক্তি', 'পথ-হারা', 'বাগ্দত্তা' ও 'মহানিশা' হইতে এইরূপ তীব্র, অগ্নিজ্বালাময়, ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ আলোড়নের অনেক দৃষ্টান্ত সংকলিত হইতে পারে। নিরুপমার চিত্তবিশ্লেষণ অপেক্ষাকৃত ধীর, সংযত ও বাহ‍্য বিক্ষোভ অপেক্ষা অন্তরগভীরতার লক্ষণাক্রান্ত।
     নিরুপমা দেবীর উপন‍্যাস ও ছোটো গল্প সংখ‍্যায় অল্প; তাহাদের মধ‍্যে বিষয়-বৈচিত‍্যেরও অভাব আছে; কিন্তু সব কয়টিই কলাকৌশলে বিশেষ সমৃদ্ধি। প্রেমের বিরোধ ও দাম্পত‍্য-জীবনের সংঘর্ষ প্রায় সমস্ত উপন‍্যাসেরই বিষয়; এবং ইহা লেখিকার বিশেষ কৃতিত্বের নিদর্শন যে, এই সংঘর্ষের উপাদান আমাদের সাধারণ, বৈচিত‍্যহীন গার্হস্থ‍্য-জীবন হইতেই আহরিত হইয়াছে। ক্বচিৎ কখনও তাঁহাকে রোমান্সের অসাধারণত্বের মুখাপেক্ষী হইতে হইয়াছে, কিন্তু এই সমস্ত স্থলেও রোমান্সের বৈচিত‍্য খুব স্বাভাবিকভাবেই অবতারিত হইয়াছে, কোনো উদ্ভট অস্বাভাবিকত্ব ইহার উপর ছায়াপাত করে নাই। বিরোধের উদ্ভট, বৃদ্ধি ও উপশমের চিত্রটি খুব নিপুণভাবে ও সূক্ষ্ম অনুভূতির সহিত বিশ্লেষিত হইয়াছে। ভাষা-সংযম ও উচ্ছ্বাস-বর্জন লেখিকার চরিত্রাঙ্কন ও বিশ্লেষণের বিশেষত্ব; এই মিতভাষিতার গুণে যেখানে সত‍্যসত‍্যই তিনি উচ্ছ্বসিত আবেগ, ভাবগভীরতার মুহূর্তগুলি বর্ণনা করিয়াছেন, সেখানে বর্ণনা উচ্চাঙ্গের উৎকর্ষমণ্ডিত হইয়া উঠিয়াছে। তাঁহার সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণশক্তি, সুকুমার চিন্তাশীলতা ও জীবন-সমালোচনার অন্তর্নিহিত একটা কোমল-করুণভাব তাঁহার নারী-হস্তের লঘু স্পর্শটি চিনাইয়া দেয়। তিনি মোটের উপর আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক ব‍্যবস্থার প্রতি সহানুভূতিসম্পন্না; কোথাও তিনি বিদ্রোহের নিশান ওড়ান নাই; তীব্র উচ্চকণ্ঠে বিদ্রোহ ঘোষণা করিয়া বহু শতাব্দীর নির্মম কণ্ঠরোধের প্রতিশোধ লন নাই; অথচ এই স্বাভাবিক মৃদু ও কোমল কণ্ঠ, এই সূক্ষ্ম অথচ মর্মভেদী সমালোচনা যে নারীর সে বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকে না।
    নিরুপমার সর্বপ্রথম উপন‍্যাস 'উচ্ছৃঙ্খল' অপরিণত বয়সের রচনা। উপন‍্যাসের অন্তর্নিহিত রসটি ইহাতে জমিয়া উঠে নাই---ঘটনাগুলি যেন বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত, ভাবগত ঐক‍্যে গ্রথিত হয় নাই। উপন‍্যাসটির মধ‍্যে এক ভাষায় ও বিশ্লেষণে সংযম ছাড়া লেখিকার ভবিষ‍্যৎ পরিণতির বিশেষ কোনো পূর্বসূচনা মিলে না।
     'অন্নপূর্ণার মন্দির'- এ লেখিকার প্রকৃত শক্তির প্রথম পরিচয় লাভ করা যায়। উপন‍্যাসখানি একটি দরিদ্র পরিবারের করুণ ইতিহাস; ইহার মধ‍্যে দারিদ‍্যের দুঃসহ ব‍্যথা ও অপমানের একটা তীব্র, জ্বালাময় অভিব‍্যক্তি হইয়াছে। সতীর চরিত্রটির দৃপ্ত তেজস্বিতা, নীরব সহিষ্ণুতা ও অনমনীয় আত্মসম্মানজ্ঞানের সমন্বয় অপূর্ব হইয়াছে। অথচ এই প্রস্তর-কঠিন দৃঢ়তার অন্তরালে একটা কোমল আর্দ্র প্রণয়োন্মুখতার আভাস ইহাকে আরও রমণীয় ও জটিল করিয়া তুলিয়াছে। বিশ্বেশ্বরকে লিখিত তাহার বিদায়-লিপির মধ‍্যে বজ্রকঠোর প্রত‍্যাখ‍্যানের পশ্চাতে এই দ্রবীভূত প্রেম-প্রবাহের গোপন অস্তিত্বের পরিচয় মিলে --- যেন আগ্নেয়গিরির অভ‍্যন্তরে স্বচ্ছ শীতল নির্ঝর। সতীর পত্রখানি তাহার হৃদয়-রক্ত দিয়া লেখা --- ভাবের এরূপ উচ্ছ্বসিত জ্বালাময় প্রকাশ বঙ্গসাহিত‍্যে দুর্লভ। মৃত‍্যুশয‍্যাশায়িত রামশঙ্করের সতীর প্রতি অন্তিম আশীর্বাদের মধ‍্যেও এই দুঃসহ অগ্নিজ্বালা বিচ্ছুরিত হইয়াছে।
     গ্রন্থ-মধ‍্যে অন‍্যান‍্য চরিত্রের সেরূপ লক্ষণীয় কোনো বিশেষত্ব নাই। বিশ্বেশ্বর, অন্নপূর্ণা ও জাহ্নবী অনেকটা typical, শ্রেণীবিশেষের প্রতিনিধি মাত্র, ব‍্যক্তিত্বসূচক গুণ তাহাদের মধ‍্যে সেরূপ প্রকটিত হয় নাই। গৌণ চরিত্রের মধ‍্যে এক সাবিত্রীই অকুণ্ঠিত ব‍্যক্তিত্বের দাবি করিতে পারে। তাহার বিবাহে প্রেম-সার্থকতার আনন্দ অনেকটা শঙ্কা-কুণ্ঠিত ও সংকোচশীর্ণ হইয়াছে। তাহার প্রেমের মধ‍্যে অনেকখানি কৃতজ্ঞতার ভাব জড়িত হইয়াছে ---কুণ্ঠার তুষারস্পর্শ প্রেমের শদলপদ্মকে পূর্ণবিকশিত হইতে দেয় নাই। আত্মবিসর্জনকারিণী সতীর ম্লান, বিষাদময় স্মৃতি যেন মধ‍্যবর্তিনী হইয়া তাহাদের দাম্পত‍্যমিলনের নিবিড় একাত্মতায় বাধা দিয়াছে। স্মামীর প্রতি এই কুণ্ঠাজড়িত ভাবটি সাবিত্রীর মনে প্রশংসনীয় অর্ন্তদৃষ্টি ও সুসংগতির সহিত স্থায়ী করা হইয়াছে। সতীর প্রভাব জীবনে-মরণে উপন‍্যাস-মধ‍্যে অক্ষুণ্ণ হইয়া রহিয়াছে।
     'বিধিলিপি' (১৯১৭) লেখিকার আর একখানি প্রথম শ্রেণীর উপন‍্যাস। জ‍্যোতিষ-শাস্ত্রে অত‍্যধিক বিশ্বাস জীবনে কীরূপে tragedy -র সৃষ্টি করে, বিপদের প্রতিষেধক উপায়গুলিই কীরূপে বিপদকে আবাহন করিয়া আনিয়া জ‍্যোতিষ-গণনার সার্থকতা সম্পাদনা করে, উপন‍্যাসটি সেই বিষয়ে রচিত।

     চরিত্রসৃষ্টি হিসাবে মহেন্দ্র ও কাত‍্যায়নীর স্থানই সর্বশ্রেষ্ঠ। ইহাদের মধ‍্যে সম্পর্কের জটিল বিরোধের চিত্র আশ্চর্য সুসংগতি ও সূক্ষ্মদৃষ্টির সহিত ফুটাইয়া তোলা হইয়াছে। কাত‍্যায়নী-সম্বন্ধে অপ্রত‍্যাশিত বাধা পাইয়া মহেন্দ্রের মন নিদারুণ অভিমানে ভরিয়া উঠিয়াছে, কিন্তু তখন পর্যন্ত সে আশা একেবারে ত‍্যাগ করে নাই। কাত‍্যায়নীর পিতৃভক্তি কিন্তু তাহার প্রেমকে সম্পূর্ণরূপেই জয় করিয়াছে। কোনো দুর্বলতা, কোনো মানসিক বিক্ষোভ তাহার অবিচলিত দৃঢ়সংকল্পকে আন্দোলিত করে নাই। মহেনন্দ্রের প্রতি অনুরাগ হয়তো তাহার মগ্নচৈতন‍্যে সুপ্ত ছিল, কিন্তু তাহার অণুমাত্র আভাসও সে চেতনার ঊধর্বতন স্তর পর্যন্ত পৌঁছিতে দেয় নাই। মহেন্দ্রের সহিত তাহার প্রতি কথাবার্তায়, প্রত‍্যেকটি ব‍্যবহারে লেশমাত্র স্নেহ, করুণ সমবেদনার আভাস পর্যন্ত সযত্নে বর্জিত হইয়াছে, পাছে তাহাদের মধ‍্যে কোথাও প্রেমের ক্ষুদ্রতম বীজ লুক্কায়িত থাকে, পাছে মহেন্দ্র কোমলতাকে ছদ্মবেশী প্রেম বলিয়া ভুল করিয়া কোনোরূপ মোহ হৃদয়ে পোষণ করে। তাহার এই স্নেহাভাসশূন‍্য নির্মমতাই মহেন্দ্রকে জগতের প্রতি একটা সন্দেহপূর্ণ বিদ্বেষ জর্জর করিয়া তুলিয়া তাহার অধঃপতনের সোপান নির্মাণ করিয়াছে।
     কাত‍্যায়নীর উপেক্ষা মহেন্দ্র কোনও মতে সহ‍্য করিয়া কর্মস্রোেতে আপনাকে ডুবাইতে চেষ্টা করিতেছিল। কিন্তু জমিদারের সঙ্গে তাহার বিবাহ-প্রসঙ্গে তাহার বিদ্বেষ বিজাতীয় তীব্রতা লাভ করিয়া তাহাকে অধঃপতনের পথে আরও নামাইয়া দিল। এখন হইতে কাত‍্যায়নীর প্রতি তাহার ব‍্যবহার একটা তীব্রজ্বালাময় ব‍্যঙ্গ-বিদ্রূপের ঝাঁজে উত্তপ্ত হইয়া উঠিল; এবং কামাখ‍্যানাথের সমস্ত উদার মহানুভবতা তাহার অসংগত বিদ্বেষের মাত্রাধিক‍্যই ঘটাইতে লাগিল। মহেন্দ্র একটা রীতিমত Byronic hero হইয়া উঠিল। এই সময় কমলার ব‍্যাপারের উপলক্ষ লইয়া জমিদারের প্রতি তাহার বিদ্বেষ মনোরাজ‍্যের সীমা ছড়াইয়া ব‍্যবহারিক জগতে আত্মপ্রকাশ করিল; জমিদারের ক্ষমাতে তাহার বিকৃত বুদ্ধি কামাখ‍্যানাথের চক্ষে নিজ অকিঞ্চিৎকরত্বেরই প্রমাণ আবিষ্কার করিয়া তাহার বিদ্বেষের মাত্রা বাড়াইয়া তুলিল। শেষে কমলার উদ্ধারের ব‍্যাপারে নিরঞ্জনের হস্তক্ষেপে তাহার অসহিষ্ণুতা চরম সীমায় পৌঁছিয়া tragedy র সৃষ্টি করিল। দ্বাবিংশ পরিচ্ছেদে কাত‍্যায়নী ও মহেন্দ্রের বিদায়দৃশ‍্য উপন‍্যাস-সাহিত‍্যে হতাশ-প্রেমিকের অগ্নিজ্বালাময় ভাবোদিগরণে চমৎকার দৃষ্টান্ত। সাধারণত এইরূপ দৃশ‍্য ভাবাতিরেকপ্রবণতার (sentimentality) জন‍্য অতি-নাটকীয় (melodamatic) ও অলংকারবহুল ভাষা-প্রয়োগে গুরুভার হইয়া থাকে। কিন্তু মহেন্দ্রের সরল, বাহুল‍্যবর্জিত কথার মধ‍্যে আগ্নেয়গিরির জ্বলন্ত নিঃস্রাবের মতো একটা অন্তররুদ্ধ, গভীর জ্বালার উষ্ণ স্পর্শ অনুভব করা যায়। ব‍্যর্থ প্রেমের রুদ্ধ আক্রোশ প্রতি শব্দে ফুটিয়া উঠিয়াছে। মনস্তত্ত্বের দিক দিয়াও ইহা মহেন্দ্রের ব‍্যবহার ও কার্যকলাপের খুব সংযত ও সন্তোষজনক ব‍্যাখ‍্যা জোগায়।
     কাত‍্যায়নীর চরিত্রের বহুমুখী জটিলতা আরও উচ্চাঙ্গের কলাকৌশলের পরিচয় দেয়। মহেন্দ্রের সহিত তাহার সম্বন্ধের কথা মহেন্দ্রের চরিত্র-বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে আলোচিত হইয়াছে। কামাখ‍্যানাথের সহিত তাহার সম্বন্ধের রেখাগুলি যেমন অসাধারণ জটিল, তেমনই আশ্চর্যরূপ সুস্পষ্ট ---প্রত‍্যেকটি রেখা সুচিন্তিত ও দৃঢ়হস্তে অঙ্কনের সাক্ষ‍্য প্রদান করে --কোথাও অস্পষ্টতা ও অসম্পূর্ণ ধারণার চিহ্ন নাই। মহেন্দ্রের প্রত‍্যাখ‍্যানের মধ‍্যে তাহার কোথাও অনুশোচনা বা অন্তর্দ্বন্দ্বের আভাস মাত্র নাই; পিতার আদেশ তাহার ইচ্ছাকে সম্পূর্ণভাবে লোপ করিয়াছে। কামাখ‍্যানাথের সহিত সম্বন্ধ-স্বীকারেও সেই অলঙঘনীয় পিত্রাদেশের প্রভাব সুপরিস্ফুট। সপ্তম পরিচ্ছেদে কামাখ‍্যানাথ ও কাত‍্যায়নীর পরস্পর কথোপকথনের মধ‍্যে একদিকে যেমন কাত‍্যায়নীর অনমনীয় দৃঢ়চিত্ততার পরিচয় পাওয়া যায়, অপরদিকে সেইরূপ তাহার সূক্ষ্ম পরিমাণবোধ ও অভ্রান্ত সংগতিবিচারের নিদর্শন মিলে। কামাখ‍্যানাথের প্রতি তাহার ভক্তি ও শ্রদ্ধানিবেদনের মধ‍্যে ভালোবাসার কোনো গন্ধ নাই --স্থিল, অচঞ্চল আত্মসমর্পণ আছে, কোনো দাবিদাওয়া নাই; বিবাহের বন্ধন-স্বীকার আছে, কিন্তু মানস-স্বামীর প্রতি কোনো দায়িত্ব-অর্পণ নাই। লেখিকার বিশেষ কৃতিত্ব এই যে, তাহাদের পরস্পরের প্রতি ব‍্যবহার যে সূক্ষ্ম রেখার অনুবর্তন করিয়াছে তাহা হইতে তিলমাত্র বিচ‍্যুতি ঘটিতে তিনি দেন নাই; শ্রদ্ধাকৃতজ্ঞতার বর্ণবিরল ধূসরতার উপর কোথাও প্রেমের গাঢ় রক্তিমা সঞ্চারিত হইতে দেন নাই। শেষ পরিচ্ছেদে মহেন্দ্রের প্রতি চির-অস্বীকৃত অনুরাগের অনিবার্য স্ফুরণের দৃশ‍্যে কাত‍্যায়নীর প্রস্তর-কঠিন হৃদয় প্রথম ও শেষ বার দ্রবীভূত হইয়াছে; এই অপ্রত‍্যাশিত অভিভবে শ্রদ্ধাকে ভালোবাসায় রূপান্তরিত করিবার একটা ব‍্যাকুলতা সর্বপ্রথম আত্মপ্রকাশ করিয়াছে। সঙ্গে সঙ্গেই মৃত‍্যু আসিয়া তাহার এই নবজাগ্রত সমস‍্যার সমাধান করিয়া দিয়াছে। রমার সহিত তুলনায় তাহার চরিত্রের এই দৃঢ় আত্মপ্রত‍্যয় ও ভগবদ্ভক্তি ও ভালোবাসার অভাবের দিকটা খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়াছে --রমার চক্ষে তাহার চরিত্রে দুর্বলতার আসল কেন্দ্রস্থলটি ধরা পড়িয়াছে। কাত‍্যায়নী-চরিত্রের পরিকল্পনা ও পরিণতি সর্বাঙ্গসুন্দর হইয়াছে।
     অন‍্যান‍্য চরিত্রের মধ‍্যে কামাখ‍্যানাথ বিশেষ উল্লেখযোগ‍্য। সাধারণত দেখা যায় যে, কামাখ‍্যানাথ-জাতীয় চরিত্রেরা অতিরিক্ত আদর্শমূলক হওয়ার জন‍্য বাস্তবতা ব‍্যক্তিস্বাতন্ত‍্য হারাইয়া ফেলে---পৌরাণিকযুগের আদর্শ, প্রজারঞ্জক, কর্তব‍্যপরায়ণ রাজার স্মৃতি আসিয়া উহাদের সীমারেখাগুলিকে ম্লান ও অস্পষ্ট করিয়া দেয়। কিন্তু কামাখ‍্যানাথ-সম্বন্ধে এ সমালোচনা প্রযোজ‍্য নহে। তাঁহার সমস‍্যা ও সমস‍্যা-সমাধানের চেষ্টার মধ‍্যে এমন বিশেষত্ব আছে, যাহাতে তাঁহার বাস্তবতার তীক্ষ্ণতা অণুমাত্র কুণ্ঠিত হয় নাই। আদর্শবাদের মধ‍্যে এই বস্তুতন্ত্রতার সংরক্ষণ লেখিকার বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয়।
     ঘটনা-বিন‍্যাসে, চরিত্র-চিত্রণে ও ভাবগভীরতায় উপন‍্যাসটি শ্রেষ্ঠ স্থান অধিকার করে। ইহার প্রকৃতি বর্ণনার মধ‍্যেও খুব সূক্ষ্ম কলাকৌশলের পরিচয় পাওয়া যায় ---ইহার প্রাকৃতিক দুর্যোগের চিত্তগুলির মধ‍্যে উচ্চাঙ্গের বর্ণনা-নৈপুণ‍্য ছাড়া গ্রন্থ-বর্ণিত ঘটনার সহিত একটা গভীর ভাবগত সংগতি আছে। নক্ষত্রখচিত নভোমণ্ডল ও ঝঞ্ঝা-বিদ‍্যুৎ-বজ্রাঘাতে আলোড়িত মেঘান্ধকার নৈশ আকাশ ইহার পটভূমিকা (background)---ইহার অন্তর-বাহির উভয়ই একইরূপ রহস‍্যের বিদ‍্যুচ্ছটায় উদ্ভাসিত। এই ব‍্যঞ্জনাশক্তি উপন‍্যাসটির

বিচিত্র আকর্ষণ বাড়াইবার হেতু হইয়াছে। উপন‍্যাসের আরও একটি উৎকর্ষ লক্ষিতব‍্য। বঙ্গসাহিত‍্যের উপন‍্যাসে স্বাভাবিক উপায়ে রোমান্সের অবতারণা যে কত দুঃসাধ‍্য ইহা আমরা পূর্বে দেখিয়াছি। বর্তমান উপন‍্যাসে কিন্তু জ‍্যোতিষ-শাস্ত্রে বিশ্বাসের ভিতর দিয়া এই রোমান্স নিতান্ত সহজ উপায়েই পারিবারিক জীবনের মধ‍্যে প্রবর্তিত হইয়াছে।
     'বিধিলিপি'তে রোমান্স ও বাস্তবতার মধ‍্যে যে একটি সূক্ষ্ম সামঞ্জস‍্য রক্ষিত হইয়াছে, 'শ‍্যামলী'তে (১৯১৮) তাহা ক্ষুণ্ণ হওয়ার লক্ষণ পাওয়া যায়। ইহার আদর্শবাদ অতিরঞ্জিত হইয়া বস্তুতন্ত্রতার সীমা অতিক্রম করিয়াছে। অনিলের বিরাট আত্মোৎসর্গ ও রেবার নীরব, অবিচলিত ধৈর্য ---এই দুই-এর মধ‍্যেই অতিরেকের অস্বাভাবিকতা আছে। বিশেষত, রেবা উপন‍্যাসের মধ‍্যে একটি অতর্কিত আবির্ভাব --রাস্তায় কুড়ানো মেয়ে না অনিলদের সংসারে না উপন‍্যাস-মধ‍্যে---কোথাও নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করিতে পারে নাই। অনিলের প্রতি তাহার ভালোবাসা কীরূপে এত দৃঢ়মূল হইল তাহার কোনো ব‍্যাখ‍্যা উপন‍্যাস-মধ‍্যে মিলে না। রেবার চরিত্রও ভালো করিয়া ফুটে নাই, তাহার ব‍্যক্তিত্ব, তাহার নীরব সহিষ্ণুতা ও জীবনব‍্যাপী আত্মোৎসর্গের অন্তরালে চাপা পড়িয়া গিয়াছে। আসল কথা অনিল ও রেবা আদর্শ-জগতের জীব; আমাদের সাধারণ পারিবারিক আবেষ্টনের মধ‍্যে তাহারা ঠিক জীবন্ত হইয়া উঠে নাই। উপন‍্যাস-মধ‍্যে যাহা ফুটিয়াছে তাহা প্রেমের প্রভাবে অর্ধজড় শ‍্যামলীর মধ‍্যে মায়ামমতা-ও-সূক্ষ্ম অনুভূতিপূর্ণ নারী-হৃদয়ের অপ্রত‍্যাশিত স্ফুরণ। মূক হৃদয়ের অব‍্যক্ত হাহাকার, প্রকাশের পথ খুঁজিবার একটা ব‍্যাকুল প্রয়াস, শব্দময় জগৎকে চক্ষু দিয়া অনুভব করিবার একটা প্রচণ্ড, ক্লান্তিকর চেষ্টা, তাহার অতি সামান‍্য কারণে উত্তেজিত, দুর্দমনীয় মনোবিপ্লব ---অসম্পূর্ণ, প্রকৃতি-বিড়ম্বিত জীবনের সমস্ত ক্ষুণ্ণ অভাববোধের একটি চমৎকার কবিত্বপূর্ণ, অথচ মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণের দিক দিয়া নিখুঁত চিত্র উপন‍্যাসটির গৌরব বর্ধন করিয়াছে। প্রকৃতির অসংখ‍্য বাণী, মানব-হৃদয়ের অগণ‍্য ভাবপ্রবাহ, সমাজ-জীবনের সমস্ত জটিল ব‍্যবস্থা ও কঠোর অনুশাসন কীরূপ বক্রপথে, কীরূপ খণ্ডিত, অসম্পূর্ণ অর্ধোক্তির আকারে ভাষাহীনতার অতলস্পর্শ গহ্বরে প্রতিধ্বনিত হয়, এই অন্ধকারময় আঁকা-বাঁকা সুড়ঙ্গপথের মধ‍্য দিয়া কীরূপে প্রেমের সর্বজয়ী আলোক বিচ্ছুরিত হয়, প্রেমের মায়াস্পর্শে কীরূপে সমস্ত সুপ্ত, জড়িমাগ্রস্ত প্রবৃত্তি ও অনুভূতিগুলি দুঃস্বপ্নাভিভূত নিদ্রা হইতে জাগিয়া ধীরে ধীরে মুকুলিত হইয়া উঠে এই চিত্তবিকাশের একটা পরিপূর্ণ, সমৃদ্ধ বিবরণ আমাদের বিস্ময়মিশ্রিত শ্রদ্ধার উদ্রেক করে। উপন‍্যাস-মধ‍্যে এক শ‍্যামলী-চরিত্রই বাস্তবতার মর্যাদা রক্ষা করিয়াছে, অথচ তাহার অবস্থাবৈশিষ্ট‍্যই তাহাকে রোমান্সের অসাধারণত্ব আনিয়া দিয়াছে।
     'দিদি' (১৯১৫) নিরুপমা দেবীর সর্বশ্রেষ্ঠ উপন‍্যাস। ইহার বিষয়-গার্হস্থ‍্য উপন‍্যাসের খুব সাধারণ, চিরপরিচিত ব‍্যাপার ---দাম্পত‍্য মনোমালিন‍্য । কিন্তু এই সাধারণ বিরোধের চিত্রটি এরূপ ব‍্যাপকভাবে, এরূপ সূক্ষ্ম মনস্তত্ত্ববিশ্লেষণের সহিত অঙ্কিত হইয়াছে যে, উপন‍্যাস-সাহিত‍্যে একটি অত‍্যুজ্জ্বল রত্ন হইয়া দাঁড়াইয়াছে। অবশ‍্য অমরের সহিত চারুর বিবাহ-ব‍্যাপারটা কতকটা আকস্মিকভাবে ও অবিশ্বাস‍্যভাবে সংঘটিত হইয়াছে। দেবেনের নিকট বিবাহ-ব‍্যাপার অপ্রকাশ, সুরমার সহিত অপরিচয়, চারুকে একাকিনী কলিকাতার বাসায় রাখিয়া তাহার মনে প্রণয় সঞ্চারের অবসর প্রদান, চারু সম্বন্ধীয় সমস্ত ব‍্যাপার বাড়ি হইতে গোপন রাখা---এই সমস্ত ঘটনাবিন‍্যাসের মধ‍্যে যে একটু কষ্টকল্পনা, একটু সম্ভাবনীয়তার অভাব আছে তাহা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু এইটুকু ত্রুটি মানিয়া না লইলে উপন‍্যাসটির ভিত্তিভূমিই রচিত হয় না। এই সূচনার পর হইতে অমর, সুরমা ও চারু এই তিনজনের পরস্পর সম্পর্কের মধ‍্যে যে জটিল ঘাত-প্রতিঘাতের জোয়ার-ভাটা চলিয়াছে তাহার বিশ্লেষণ একেবারে অতুলনীয়, সকল দিক দিয়াই অনবদ‍্য। এই বিরোধের পরিবর্তন-স্তরগুলি যেমন সূক্ষ্ম অনুভূতির সহিত লক্ষিত হইয়াছে, তেমন দৃঢ়, অকম্পিত রেখা-বিন‍্যাসের দ্বারা পৃথকীকৃত হইয়াছে।
     অমরের সহিত সুরমার প্রথম পরিচয়ের উপরেই কেমন একটা বক্র শনির দৃষ্টি পড়িয়াছে। সুরমার মধ‍্যে অন‍্য সদ্গুণ যাহাই থাকুক, নববধূ-সুলভ লজ্জা-সংকোচের একান্ত অভাব ছিল। প্রথম হইতেই তাহার ব‍্যবহারে একটা কর্তৃত্বাভিমানের সুর, একটা অসংকোচ বৈষয়িক আলোচনার ভাব মাথা উঁচু করিয়া প্রেমের মধুর রঙিন স্বপ্নাবেশকে টুটাইয়া দিয়াছে। অমরও নিজ ব‍্যবহারের মধ‍্যে অপরাধীর লজ্জিত ---অনুতপ্ত ভাব ফুটাইতে পারে নাই; একটা স্পর্ধিত উপেক্ষার সুর তাহাদের কথাবার্তার মধ‍্যে প্রকট হইয়া স্বামি-স্ত্রীর মধ‍্যে ব‍্যবধান বিস্তৃততর করিয়াছে।
     তারপর পিতার মৃত‍্যুশয‍্যার পার্শ্বে আমন্ত্রিত হইয়া অমর ও চারু দীর্ঘ নির্বাসনের পর পিতৃগৃহে পুনঃপ্রবেশ করিয়াছে। অমর পিতার প্রতি ব‍্যবহারের জন‍্য অনুতাপ ও আত্মগ্লানিতে পূর্ণ; কিন্তু পত্নীর সম্বন্ধে সে যে দারুণ অবিচার করিয়াছে সে বিষয়ে সে একেবারেই উদাসীন। হরনাথবাবু চারুকে সুরমার হাতে সঁপিয়া দিয়াছেন, কিন্তু পুত্র পুত্রবধূর মধ‍্যে কোনো একটা আপস-নিষ্পত্তি করিবার আশু প্রয়াস করেন নাই। তিনি ভবিষ‍্যৎ কালের উপর এই নিদারুণ হৃদয়ক্ষত উপশমের ভার দিয়াই চলিয়া গেলেন; তিনি তাঁহার মানব চরিত্রাভিজ্ঞতা হইতে বুঝিয়াছিলেন যে, এই গভীর মালিন‍্যরেখা মৃত‍্যু-পথ-যাত্রীর একটা ইচ্ছাপ্রকাশে মাত্র মুছিবার নহে। সেইজন‍্য অপরাধী পুত্র-সম্বন্ধে তিনি বধূকে কোনো অনুরোধ করেন নাই। সুরমা চারুকে নিজ স্নেহময় ক্রোড়ে টানিয়া লইল, কিন্তু অমরের সহিত তাহার আলাপ কেবল পিতার চিকিৎসা-সম্বন্ধীয় আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ রহিল।
     হরনাথবাবুর মৃত‍্যুর পরে সুরমার ব‍্যবহার আবার পরিবর্তিত হইল। সে অমর ও চারুর সহিত সমস্ত সমন্ধ বিচ্ছিন্ন করিয়া লইল ও সংসারের কর্তৃত্ব ছাড়িয়া দিল। সাংসারিক বিশৃঙ্খলা নিবারণের জন‍্য অমর তাহার অনুরোধ করিতে গিয়া উপেক্ষা ও অবহেলা লাভ করিল। কেবল চারু তাহার স্বভাবসিদ্ধ সরলতা ও নির্ভরশীলতার গুণে সুরমার ঔদাসীন‍্যের বর্ম ভেদ করিয়া তাহার হৃদয়মধ‍্যে চিরস্থায়ী আসন চারু তাহার স্বভাবসিদ্ধ সরলতা ও নির্ভরশীলতার গুণে সুরমার ঔদাসীন‍্যের বর্ম ভেদ করিয়া তাহার হৃদয়মধ‍্যে চিরস্থায়ী আসন করিয়া লইল, সুরমা তাহার স্নেহময়ী দিদিতে রূপান্তরিত হইল। ইতিমধ‍্যে অমরের সাংসারিক অব‍্যবস্থার প্রতিষেধ-জন‍্য