Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা - ১৬৩, ১৬৪ ও ১৬৫

2020-10-27
সুরমা আবার কর্তৃত্বভার গ্রহণ করিল এবং অমর ও চারুর হিতৈষী বন্ধু হিসাবে তাহাদের সাহচর্য করিতে লাগিল। এইবার সে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হইল যে, সে অমরের সহিত ব‍্যবহারে কোনো সংকোচ দেখাইয়া তাহাদের পূর্বসম্বন্ধের বেদনাময় স্মৃতি আর জাগাইয়া রাখিবে না।
     এইবার অমরের পরিবর্তনের পালা শুরু হইল। সে সুরমার স্বার্থলেশশূন‍্য ব‍্যবহারে তাহার প্রতি একটা বিস্ময়-মিশ্রিত শ্রদ্ধা অনুভব করিতে লাগিল, এবং এই শ্রদ্ধার ভিতর দিয়া অনুতাপব‍্যথার বিদ‍্যুৎ-চমক প্রেমের গোপন সঞ্চারের সাক্ষ‍্য দিল। অতুলের গুরুতর অসুখে সুরমার অক্লান্ত সেবা অমরকে তাহার দিকে আরও প্রবলভাবে আকৃষ্ট করিল। অমরের অন‍্যমনা চিন্তিত ভাব তাহার প্রবল অন্তর্দ্বন্দ্বের পরিচয় দিতে লাগিল। শেষে সে আত্মদমনশক্তি হারাইয়া পলায়নে বিপদের হাত হইতে অব‍্যহতি খুঁজিল। মুঙ্গেরে রোগ-শয‍্যায় অপ্রকৃতিস্থ মস্তিষ্কের বিকারের মধ‍্য দিয়া তাহার এই অস্থিমজ্জাগত, দৃঢ়মূল অনুরাগ অস্বাভাবিক তীব্রতার সহিত ফুটিয়া বাহির হইল। শেষে একদিন তাহার ব‍্যাকুল প্রেমনিবেদনের উত্তরে সুরমা তাহাকে কঠোর আঘাত দিতে বাধ‍্য হইল --- সে অমরের সহিত ক্ষীণতম সম্পর্কও অস্বীকার করিয়া কেবল চারুর সহিত সম্পর্কের জন‍্যই তাহার সহিত মেলামেশা করে ইহা স্পষ্টাক্ষরে বুঝাইয়া দিল। আরও কয়েকদিন পরে সুরমা অমরের নিকট চিরবিদায় লইল।
     ইহার পর উপন‍্যাসের দ্বিতীয়ভাগে গল্পের ঘটনাস্থল ও পাত্র-পাত্রীর পরিবর্তন হইল। সুরমার পিত্রালয়ে, নূতন আবেষ্টন ও লোকজনের মধ‍্যে সুরমার সমস‍্যাসংকুল জীবনের ধারা শীর্ণ গতিতে প্রবাহিত হইতে লাগিল। মধ‍্যে মধ‍্যে চারুর পত্রে, তাহার স্নেহপূর্ণ, দুঃখিত অনুযোগে, অতুলের অপরিবর্তিত ভালোবাসায় ও একবার চারুর অপ্রত‍্যাশিত আগমনে পুরাতন জীবনের সহিত যোগসূত্র কোনও রকমে বজায় রহিল বটে, কিন্তু মোটের উপর দ্বিতীয় খণ্ডে একটা নূতন জীবন ধারার প্রবর্তন হইল। প্রকাশ ও উমা এখন সুরমার প্রধান স্নেহপাত্র ও ভাবনার বিষয় হইয়া দাঁড়াইল, কিন্তু ইহারাও তাহার চিরন্তন সমস‍্যার জালে জড়িত হইয়া পড়িল। বাল-বিধবা, সরলতার প্রতিমূর্তি উমার প্রতি প্রকাশের স্ফুটনোন্মুখ অনুরাগ সুরমা নির্মমভাবে দলিয়া পিষিয়া নষ্ট করিয়া দিল বটে, কিন্তু এই নিষ্ঠুর উন্মূলন তাহার মনকে বেদনাসিক্ত ও অশ্রুসিঞ্চিত করিয়া প্রেমের বিকাশের জন‍্য প্রস্তুত করিয়াছে। প্রকাশও বাল‍্যবন্ধুর অধিকারে সুরমার কার্যের অপক্ষপাত সমালোচনার দ্বারা তাহার কোমলতাহীন, শুষ্ক বিচার করিবার প্রবৃত্তি, প্রবল আত্মাভিমান, ইত‍্যাদি দোষ-ত্রুটির প্রতি তাহাকে সচেতন করিয়া তুলিয়াছে। মন্দাকিনীর একান্ত কুণ্ঠিত, আত্মসুখ সম্বন্ধে সম্পূর্ণ উদাহীন, প্রতিদান-অনপেক্ষী স্বামিসেবাও সুরমার মোহভঙ্গে সহায়তা করিয়াছে। তথাপি সুরমা প্রাণপণ শক্তিতে আত্মসমর্পণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়াছে। এই অবিশ্রান্ত ঘাত-প্রতিঘাতে সে অবসন্ন হইয়া পড়িয়াছে, বিরাট বিশ্বজোড়া শ্রান্তি তাহার বুকে চাপিয়া বসিয়াছে; উদ্দেশ‍্যবিহীন জীবনের বোঝা তাহার পক্ষে দুর্বহ হইয়াছে, তাহার সবল, আত্মনির্ভরশীল প্রকৃতি একটা আভ‍্যন্তরীণ দুর্বলতায় ভাঙিয়া পড়িয়াছে। অবশেষ নদীস্রোতে খাতমূল তীরতরুর ন‍্যায় তাহার প্রবল আত্মাভিমানের উচ্চমন্দির ধূলিসাৎ হইয়াছে। কাশীতে চারুর সহিত বার কয়েক দেখা-সাক্ষাৎ হইয়া সে নিজ দুর্বলতা বুঝিয়া অমরের সান্নিধ‍্য হইতে দূরে পলায়ন করিয়াছিল। কিন্তু শেষবারে প্রকাশ মন্দার সহিত শ্বশুরবাড়ি গিয়া বিদায়মুহূর্ত সে তাহার পূর্বকৃত অস্বীকার প্রত‍্যাহার করিয়া অভিমানে জলাঞ্জলি দিল। অভিমানে যে স্বীকারোক্তির কণ্ঠরোধ করিয়া সত‍্যসম্বন্ধকে মানিতে চাহে নাই, নবাঙ্কুরিত প্রেম ও নবজাগ্রত কর্তব‍্যবুদ্ধি সেই মিথ‍্যাদম্ভপ্রসূত বাধা ঘুচাইয়া আজ স্বামি-স্ত্রীর অবিচ্ছেদ‍্য সম্বন্ধ স্বীকার করিয়া লইল। প্রথম বিদায় দিনের অসমাপ্ত ও অপ্রকৃত উত্তর আজ সংশোধিত হইয়া সমাপ্ত হইল। অশ্রুজলসিক্ত পুনর্মিলনের মধ‍্যে দীর্ঘবিচ্ছেদের অবসান হইল।
     এই উপন‍্যাসটির বিশ্লেষণ-কুশলতা সম্বন্ধে পূর্বেই বলা হইয়াছে। অমর ও সুরমার ভাববিপর্যয়ের স্তরগুলি অতি চমৎকারভাবে দেখানো হইয়াছে। তাহাদের কথাবার্তা ও ব‍্যবহার অতি নিপুণভাবে তাহাদের পরিবর্তনশীল সূক্ষ্ম ঘাত-প্রতিঘাতগুলি ফুটাইয়া তুলিয়াছে। চরিত্রগুলি সমস্তই বেশ সজীব হইয়াছে --অমর, চারু, উমা, মন্দা প্রভৃতি সকলেই যেন আমাদের চিরপরিচিত প্রতিবেশীর মতো। সুরমার মতো এমন সূক্ষ্ম ও গভীরভাবে পরিকল্পিত, প্রতি অঙ্গভঙ্গিতে জীবন্ত, প্রাণের নিগূঢ় স্পন্দনে লীলায়িত চরিত্র বোধ হয় বঙ্গ-উপন‍্যাসে নারী-জগতে দুর্লভ। তাহার মনের প্রত‍্যেক অলি-গলি, তাহার ব‍্যক্তিত্বের সূক্ষ্মতম স্ফুরণ পর্যন্ত আমাদের অনুভূতির নিকট দিবালোকের ন‍্যায় স্পষ্ট ও ভাস্বর হইয়া উঠিয়াছে। তাহার সহিত তুলনায় বঙ্কিম ও রবীন্দ্রনাথের যে-কোনো নায়িকা যেন বাহির হইতে দেখা স্বল্প-পরিচিত জীব বা কবি-কল্পনার কল্পলোকের অধিবাসী বলিয়া মনে হয়। শরৎচন্দ্রের নায়িকারা অবশ‍্য খুব গভীর উপলব্ধির ও পরিকল্পনার সাক্ষ‍্য দেয়; কিন্তু অবস্থার অসাধারণত্বই প্রধানত তাহাদের সুস্পষ্ট ব‍্যক্তিত্ব-স্ফুরণের হেতু বলিয়াই যেন তাহারা যে বায়ুমণ্ডলে নিশ্বাস গ্রহণ করে তাহাতে oxygen-এর একটু মাত্রাধিক‍্য মনে হয়। ব‍্যায়াম বা দৈহিক কসরতের সময় অবশ‍্য পেশিগুলি ফুলিয়া উঠিয়া স্পষ্টভাবে দৃষ্টিগোচর হয়; কিন্তু সাধারণ জীবনযাত্রার ধীর, স্বল্পোত্তেজিত গতিবিধিতে যে অঙ্গ-সৌষ্ঠব ফুটিয়া উঠে তাহা সহজ বলিয়াই আরও মনোহর। সুরমা-চরিত্র এই সহজ, সাবলীল অঙ্গ-সৌষ্ঠবে মনোজ্ঞ, জীবনের স্বতঃস্ফূর্ত স্বচ্ছন্দগতিতে প্রাণময়।
( ৬ )

অনুরূপা দেবীর (১৮৮২-১৯৫৮) উপন‍্যাসগুলির মধ‍্যে অন্তত তিনখানি ---'মন্ত্রশক্তি' (১৯১৫), 'মহানিশা' (১৯১৯) ও 'পথহারা' প্রথম শ্রেণীর উৎকর্ষের দাবি করিতে পারে। 'গরীবের মেয়ে'-র স্থান ইহাদের কিছু নিম্নে। অন‍্যান‍্য উপন‍্যাসের মধ‍্যে 'মা' 'বাগদত্তা' মন্তব‍্যের অতি প্রাচুর্যে কতকটা অযথা ভারাক্রান্ত হইলেও মোটের উপর উচ্চশ্রেণীর। 'চক্র' ও 'হারানো খাতা'তে ঘটনা-বিন‍্যাসের জটিলতা চরিত্র-বিশ্লেষণকে অতিক্রম করিয়া গিয়াছে। 'পোষ‍্যপুত্র' ও 'জ‍্যোতিঃহারা' উপন‍্যাসোচিত বিশিষ্ট গুণে সমৃদ্ধ বলিয়া মনে হয় না---ঘটনার চাপে চরিত্র-বিকাশের সতেজ স্ফূর্তি প্রতিহত হইয়াছে। 'রামগড়' ও 'ত্রিবেণী'--অনুরূপা দেবীর ঐতিহাসিক উপন‍্যাসদ্বয়--সম্পূর্ণ পৃথক শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। এইবার উপন‍্যাসগুলির উল্লেখের বিপরীতক্রমে উহাদের বিস্তৃত আলোচনা করা যাইবে।

     ঐতিহাসিক উপন‍্যাসের প্রতি লেখিকার ঠিক স্বাভাবিক প্রবণতা ছিল, তাহা বলা যায় না--সামাজিক উপন‍্যাসই তাঁহার শক্তির প্রকৃত ক্ষেত্র। সুতরাং 'রামগড়' উপন‍্যাসে তিনি অনেকটা জোর করিয়াই অপরিচিত রাজ‍্যে পদক্ষেপ করিয়াছেন। ভারতের ইতিহাসকে কল্পনা-সাহায‍্যে পুর্নগঠন করা ও তাহার বিক্ষিপ্ত, বিচ্ছিন্ন রন্ধ্র পূরণ করিয়া তাহাতে প্রাণসঞ্চার করা যে নিতান্ত কঠিন কার্য তাহা স্পন্দন ও অসাধারণ উচ্ছ্বাসের চঞ্চল গতিবেগ অনুভব করা যায়, বিশেষজ্ঞদের মধ‍্যেও সেরূপ পরিচয়ের একান্ত অভাব। বিশিষ্ট ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ‍্যোপাধ‍্যায় বৌদ্ধযুগ অবলম্বনে উপন‍্যাস লিখিতে চেষ্টা করিয়াছেন, কিন্তু তাহাতে ইতিহাসের শুষ্কপঞ্জরে প্রাণ-সংযোগ হয় নাই, অনিপুণ-বিন‍্যস্ত তথ‍্যের পাষাণ স্তূপ ভেদ করিয়া উপন‍্যাসোচিত রসধারা প্রবাহিত হয় নাই। এরূপ অবস্থায় অনুরূপা দেবীও সম্পূর্ণরূপে সাফল‍্যলাভ করেন নাই তাহাতে আশ্চর্যের বিষয় কিছুই নাই। তথাপি এই উপন‍্যাসে প্রাচীন যুগের অসাধারণ উত্তেজনা ও সংঘর্ষের তরঙ্গভঙ্গ অনেকটা পাঠকের অনুভবগম‍্য হয়।
     'রামগড়' উপন‍্যাসটি বৌদ্ধযুগে প্রবল সার্বভৌম সম্রাট কোশলপতির সহিত ক্ষুদ্র প্রজাতন্ত্রমূলক রাজ‍্যের নায়ক লিচ্ছবি ও শাক‍্য-রাজবংশীয়দের বিরোধের ইতিহাস। এই বিরোধ প্রত‍্যেক ক্ষেত্রেই, অপাত্রন‍্যস্ত ও ব‍্যর্থকাম প্রণয়জ্বালা হইতে ধূমায়িত হইয়াছে। ইন্দ্রজিৎ, পুষ্পমিত্র, বসন্ত-শ্রী, শুক্লা, অমিতা, সুদক্ষিণা--সকলেই এই ব‍্যর্থ প্রণয়ের ঘূর্ণাবর্তে আবর্তিত হইয়াছে ও রাজনৈতিক বিপ্লব প্রজ্বলিত করিতে নিজ জ্বালাময় হৃদয়ের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ প্রেরণ করিয়াছে। অবশ‍্য প্রাচীন ও মধ‍্যযুগে, প্রাচ‍্যে ও পাশ্চাত‍্যে এই উভয় মহাদেশেই, বিবাহ ও বংশাভিমান রাজনৈতিক সমস‍্যাকে ঘনাইয়া তুলিবার একটা মুখ‍্য কারণ ছিল। কিন্তু তথাপি মনে হয় যে, বর্তমান উপন‍্যাসে প্রণয়ের রাজনৈতিক মর্যাদা একটু অযথা-রকম বাড়াইয়া তোলা হইয়াছে। মোট কথা ট্রাজেডির সমস্ত উপাদান এই অগ্ন‍্যুৎক্ষেপে যথাযথ বিন‍্যস্ত হইয়াছে। অত‍্যাচারী ও অত‍্যাচারিত উভয়ের সহযোগিতায় ইহা প্রজ্বলিত হইয়াছে। সুরজিতের শুক্লা সম্বন্ধে স্বার্থান্ধ ঔদাসীন‍্য, ইন্দ্রজিতের দানবোচিত জিঘাংসাবৃত্তি, পুষ্পমিত্রের রূপোন্মাদনা, বিরূঢ়কের মদোদ্ধত সাম্রাজ‍্য-গর্ব, বসন্ত-শ্রীর ঈর্ষাকলুষিত দৃষ্টিহীনতা---এই সমস্ত বিরুদ্ধ শক্তিই মহাকালের রুদ্রনৃত‍্যে নিজ নিজ গতিবেগ সঞ্চারিত করিয়াছে।
     চরিত্র-চিত্রণ ও ঘটনা-বিন‍্যাসের দিক দিয়া উপন‍্যাসটির মধ‍্যে অনেক ত্রুটি, অপূর্ণতা আবিষ্কার করা যায়। ইন্দ্রজিতের চরিত্রে দানবোচিত নৃশংসতা ছাড়া আর কোনও উচ্চতর মনোবৃত্তির পরিচয় মিলে না। শুক্লার চরিত্রও মোটেই ফোটে নাই ---পুষ্পমিত্রেরও অতর্কিত পরিবর্তন ঠিক বিশ্বাসযোগ‍্য বলিয়া মনে হয় না। মোট কথা, এই সমস্ত চরিত্রই রোমান্স রাজ‍্যের অধিবাসী, কতকগুলি চির-প্রথাগত নির্দিষ্ট ধারার অনুবর্তনকারী; তাহাদের মধ‍্যে ব‍্যক্তিত্বদ‍্যোতক কোনো গুণের বিশ্লেষণ-চেষ্টা নাই। বরং বসন্ত-শ্রীর ঈর্ষাবিকৃত চিত্তদাহ ও অমিতার কোমল, আত্মসমর্থনে অপটু সলজ্জতার মধ‍্যে কতকটা বাস্তবতার পরিচয় মিলে। সুদক্ষিণার তিতিক্ষা ও আত্মনিগ্রহও অমানুষিক, বিশ্লেষণের মানদণ্ড দিয়া তাহার বিচার চলে না। উপন‍্যাসের প্রকৃত-বর্ণনাগুলিও অত‍্যন্ত উচ্ছ্বাসময় ও কাব‍্যগন্ধী; বাস্তব প্রতিবেশ হিসাবে তাহাদের কোনো মূল‍্য নাই; উপন‍্যাস-মধ‍্যে একমাত্র বাস্তব চিত্র কোশল-রাজের রাজসভার বর্ণনা ---সেখানে সভাসদদের মধ‍্যে স্তাবকতার নির্লজ্জ প্রতিযোগিতার চিত্রটি বাস্তবরসে সমৃদ্ধ হইয়াছে। ইন্দ্রজিতের তীক্ষ্ণবুদ্ধি ও নব নব উদ্ভাবন-শক্তিই তাহাকে মামুলি চাটুকারদের সহিত তুলনায় রাজপ্রসাদের পথে অগ্রবর্তী করিয়াছে। যথোচ্ছাচারী ক্ষমতাদৃপ্ত রাজার সংসর্গ যে কীরূপ ভয়াবহ, তাহার অনুগ্রহ-নিগ্রহ যে কতই পরিবর্তনশীল, সভাসদদের প্রাণ ও মান কত সূক্ষ্ম সূত্রের উপর ঝুলিয়া থাকে, এই দৃশ‍্যগুলিতে তাহার চমৎকার বিবরণ মিলে।
     এই উপন‍্যাসের আরও একটি বিশেষত্ব এই যে, ইহাতে বৌদ্ধ জগতের কেন্দ্রস্থল ও মধ‍্যমণি গৌতম বুদ্ধ স্বয়ং আবির্ভূত হইয়াছেন। কিন্তু উপন‍্যাস-মধ‍্যে তাঁহার প্রভাব সেরূপ লক্ষণীয় নহে। তাঁহার নিষ্ক্রিয়তা ও সংসার-বৈরাগ‍্য তাঁহাকে রাজনৈতিক রঙ্গ-মঞ্চে উদাসীন দর্শকশ্রেণীভুক্ত করিয়াছে। বৌদ্ধধর্ম বীরত্বের ও আত্মনির্ভরশীল পৌরুষের পরিপন্থী বলিয়া ইহা রাজনৈতিক জগতে একটা অবজ্ঞা-মিশ্রিত অনুকম্পার পাত্র হইয়াছে ---তবে মোটের উপর সামাজিক জীবনে ইহা একটা সংকুচিত আশ্রয় লাভ করিয়াছে। রাজরোষানলের নির্মম নির্যাতন ইহাকে সহ‍্য করিতে হয় নাই। রাজসভাসদ্ ও সৈন‍্যাধ‍্যক্ষের মধ‍্যে অনেকেই প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধমতাবলম্বী ছিলেন ---ইহা লইয়া রাজা মাঝে মাঝে তাঁহাদের উপর বিদ্রূপ-কটাক্ষ করিয়াছেন। বৌদ্ধধর্মের প্রতি রাজশক্তির ও প্রজাসাধারণের এই বিশেষ মনোভাব ঠিক ইতিহাসসম্মত কি না তাহা ঐতিহাসিকের বিচারের বিষয়।
     'ত্রিবেণী' (১৯২৮) উপন‍্যাসে বাংলা ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল ও বৈশিষ্ট‍্যপূর্ণ অধ‍্যায় লেখিকার আলোচনার বিষয় হইয়াছে। পালবংশীয় মহীপাল দেবের অত‍্যাচার ও কুশাসনের বিরুদ্ধে বাংলার প্রজাশক্তির অভ‍্যুত্থান ও তাহাদেরই প্রতিনিধি দিব‍্যোক ও ভীম কৈবর্তরাজের সিংহাসনাধিরোহণ ---বাংলার ইতিহাসে অভূতপূর্ব ঘটনা। ইতিহাসের পিছনে প্রজাসাধারণের যে মনোভাব প্রচ্ছন্ন থাকিয়া রাজনৈতিক পরিবেশের আসল প্রেরণা যোগায়, একবার মাত্র তাহা যবনিকার অন্তরাল হইতে বাহিরে আসিয়া সুস্পষ্টভাবে আত্মপ্রকাশ করিয়াছে। সুতরাং জনসাধারণের এই বৈপ্লবিক মনোবৃত্তি ফুটাইয়া তোলাই এই ঐতিহাসিক উপন‍্যাসের মর্মকথা। লেখিকা এই দুরূহ কার্যে বিশেষ সফল হইয়াছেন বলা যায় না। দাম্পত‍্য-প্রেমের গোলাপ জল দিয়া বিপ্লবের বিস্ফোরক উপাদান গঠিত হয় না। উপন‍্যাসে ভীমের পারিবারিক জীবনের উপরই অত‍্যধিক জোর দেওয়া হইয়াছে ---প্রজাশক্তির সংঘবদ্ধতা ও তাহাদের মধ‍্যে আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রবল ইচ্ছার স্ফুরণের কোনো বিশ্বাসযোগ‍্য বিবৃতি দেওয়া হয় নাই। দশম-একাদশ শতাব্দীতে বাঙালি জাতিহিসাবে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নবজন্ম লাভ করিয়াছে ---সেই আমাদের অতি প্রাচীন পূর্বপুরুষগণ কেমন ছিলেন তাহা অনুমান করিবার কল্পনাশক্তিও আমাদের নাই। অন্তত তাঁহারা যে আমাদের মতো কর্মবিমুখ, বাক্সর্বস্ব ও গার্হস্থ‍্য-জীবনে সংকীর্ণ-সীমাবদ্ধ ছিলেন না ইহা স্বতঃসিদ্ধভাবে ধরিয়া লওয়া

যায়। যে দিব‍্যোক ও ভীম রাষ্ট্রবিপ্লবের নেতৃত্ব গ্রহণ করিয়া প্রবল রাজশক্তির উচ্ছেদসাধন করিয়াছিলেন ও অবলীলাক্রমে নূতন শাসনব‍্যবস্থা গড়িয়া তুলিয়াছিলেন, তাঁহাদের জীবন যে শুধু জাল বাহিয়া ও পারিবারিক ক্ষুদ্র সংঘর্ষের মৃদু উত্তেজনার মধ‍্যেহ অতিবাহিত হয় নাই তাহা জোর করিয়া বলা চলে। কৈবর্তরাজদ্বয়ের সংসারিক ও রাজনৈতিক জীবনের মধ‍্যে যে প্রকাণ্ড বিচ্ছেদ অনুভূত হয়, লেখিকা তাহা পূরণ করিবার বিশেষ চেষ্টা করেন নাই। বাঙালি জনসাধারণের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মধ‍্যে যে সতেজ রাষ্ট্রচেতনা না থাকিলে তাহাদের পক্ষে এই গুরুত্বপূর্ণ গণ-আন্দোলনে ঝাঁপাইয়া পড়া সম্ভবপর হইত না, উপন‍্যাসে তাহারও কোনো আভাস মিলে না। প্রতিবেশ-রচনায় অসাফল‍্যই উপন‍্যাসের প্রধান ত্রুটি।
     অবশ‍্য লেখিকা যে সেই সুদূর অতীতের যুগোচিত বৈশিষ্ট‍্য ফুটাইতে চেষ্টা করেন নাই তাহা নয়। বৌদ্ধ ও হিন্দুধর্মের পাশাপাশি অবস্থান, সমাজ-জীবনে বিলাসের আধিক‍্য ও নঢীর প্রাধান‍্য, রাজপ্রাসাদে ভ্রাতৃ-বিরোধ ও মূলত রাজনৈতিক প্রয়োজনে অনুষ্ঠিত বিবাহে দাম্পত‍্য সহৃদয়তার অভাব, রাজশক্তির অপ্রতিহত যথেচ্ছাচার, এমন কি রাজনর্তকীয় মুখে প্রাকৃত ভাষার রচিত গানের আরোপ এই সমস্তই অতীত যুগের প্রতিচ্ছবি পাঠকের মনে মুদ্রিত করার প্রয়াস। তথাপি বোধ হয় যেন ইহারা অতীতের ইতিহাস-সৌধের গৃহসজ্জার উপকরণ মাত্র ---ইহাদের মধ‍্যে চিত্রসৌন্দর্য আছে, জীবনস্পন্দন নাই। সমাজ ও রাজনৈতিক জীবনে প্রাণশক্তির মূল যে গভীর স্তরে প্রোথিত থাকে, লেখিকা ততদূর পর্যন্ত পৌঁছাইতে পারেন নাই। রাজশক্তি ও প্রজাশক্তি উভয়কেই তুল‍্যরূপে শূন‍্যগর্ভ বলিয়া মনে হয়---একটি যেন বিলাসস্ফীত বুদবুদ্ মাত্র, অপরটি যেন ইন্দ্রজাল-সৃষ্ট অমূল তরু। একের পতন ও অপরের প্রতিষ্ঠা উভয়েই যেন ভোজবাজির আকস্মিকতার লক্ষণাক্রান্ত। যুদ্ধ-বিগ্রহের বর্ণনায় প্রাণহীন গতানুগতিকতাও আদর্শগত কোনো স্পষ্টধারণা না থাকার স্বাভাবিক ফল। বঙ্কিমচন্দ্রের 'মৃণালিনী'র 'যবন-বিপ্লব' শীর্ষক অধ‍্যায়ের অগ্নিজ্বালাময় অনুভূতির অনুরূপ কিছু এ-উপন‍্যাসে নাই।
     এই প্রতিবেশগত অস্পষ্টতা বাদ দিলে কতকগুলি দৃশ‍্য ঐতিহাসিক উপন‍্যাসের উপযুক্ত উন্মাদনার, বীরত্বপূর্ণ, উচ্চআদর্শ-প্রভাবের পরিচয় দেয়। উজ্জ্বলার আত্মহত‍্যায় মহীপালের উন্মনা, অনুতাপ-ক্লিষ্ট মনোভাব, দিব‍্যোকের সনাতন রাজভক্তির প্রত‍্যাখ‍্যান-মুহূর্তে অগ্নিজ্বালাময় অন্তর্বেদনা, পট্টমহাদেবীর দুষ্কৃতকারী স্বামীর প্রতি অবিচলিত ভক্তিনিষ্ঠা, ভীমের বৈরাগ‍্যধূসর চিত্তের অনমনীয় দৃঢ়তা ও রামপালদেবের প্রগাঢ়, অতুলনীয় মহানুভবতার দৃশ‍্যগুলি স্মৃতির উপর স্থায়ী রেখায় অঙ্কিত হয়। চরিত-পরিকল্পনাও মোটের উপর সুষ্ঠু হইয়াছে। রাজপরিবারের চরিত্র-চিত্রণ সনাতন আদর্শেরই অনুবর্তন করিয়াছে--তবে রামপালের অন্তর্দ্বন্দ্ব তাহার গোষ্ঠীপরিচয়কে অতিক্রম করিয়া তাহার ব‍্যক্তিস্বাতন্ত‍্যকে স্ফুটতর করিয়াছে। দিব‍্যোক ও ভীমের চরিত্রবিকাশ ও পরিণতি অনেকটা অস্পষ্টই রহিয়া গিয়াছে ---মৎস‍্যজীবীর সাম্রাজ‍্যস্রষ্রটায় পরিবর্তনের ঘটনামূলক বিবৃতি ছাড়া অন্তর্লোকের রহস‍্য-উদঘাটনের কোনো চেষ্টা হয় নাই। প্রকৃতি-বর্ণনা ও ভাগগভীর অন্তর্বিক্ষোভের আলোচনা বাগাড়ম্বর ও পরিমিতিহীন মন্তব‍্য-বিশ্লেষণের গুরুভারে ক্ষুণ্ন ও ব‍্যাহত হইয়াছে।
( ৬ )

অনুরূপা দেবীর সামাজিক উপন‍্যাসসমূহের মধ‍্যে 'পোষ‍্যপুত্র' (১৯১১) কাঁচা হাতের রচনা। জমিদার-পুত্র বিনোদকুমারের স্নেহবুভুক্ষু অভিমান-প্রবণতা উপন‍্যাসটির সমস্ত ক্রিয়ার মৌলিক শক্তি (motive force)। সে পিতার উপর তুচ্ছ কারণে অভিমান করিয়া গৃহ হইতে বাহির হইয়াছে; কৃতজ্ঞতাকে ভালোবাসা বলিয়া ভ্রম করিয়া শিবানীকে বিবাহ করিয়াছে। তারপর সে যাহা করিয়াছে তাহা ভদ্রসন্তানের সম্পূর্ণ অযোগ‍্য ---একটা অমানুষিক হৃদয়হীনতার নিদর্শন। সে পত্রদ্বারা নিজ আসন্ন মৃত‍্যুসংবাদ প্রচার করিয়াছে, আরোগ‍্যলাভের পর একটা আশ্বাসসূচক সংবাদ পর্যন্ত দেয় নাই। তাহার খামখেয়ালি চরিত্র প্রত‍্যেক ধাক্কায় এক-একটা অতর্কিত পরিবর্তনের মোড় ফিরিয়াছে। দারুণ অভিমান-প্রবণতা ও দুর্ভেদ‍্য আত্মগোপনশীলতা তাহার চরিত্রের প্রধান উপাদান; মোটের উপর তাহার চরিত্রে কোনো বিশ্লেষণ-গভীরতা নাই ও উহা আমাদের সহানুভূতি আকর্ষণ করিতে পারে না।
     অন‍্যান‍্য চরিত্রগুলির মধ‍্যেও এই বিশ্লেষণ-গভীরতার অভাব দেখা যায়। স্নেহদুর্বল শ‍্যামাকান্ত, দৃঢ়চেতা রজনীনাথ, ব্রীড়াসংকুচিতা শান্তি, উদ্ধতপ্রকৃতি পোষ‍্যপুত্র হেমেন্দ্র ---সকলের সন্মন্ধেই এই মন্তব‍্য খাটে। কেবল শিবানীর প্রস্তর-কঠিন, প্রকাশ-বিমুখ চরিত্রটির মধ‍্যে অপেক্ষাকৃত গভীর অন্তর্দৃষ্টির পরিচয় পাওয়া যায়। গৌণ চরিত্রদের মধ‍্যে সিদ্ধেশ্বরী অত‍্যন্ত সজীব হইয়াছে, তাহার কর্কশ কলহপ্রিয়তা তাহার মেয়েজামাই -এর প্রতি স্বাভাবিক স্নেহকেও একটা বক্র, বিরুদ্ধ গতি দিয়াছে।
    উপন‍্যাসের নামকরণের যৌক্তিকতা সম্বন্ধেও একটা সংশয় জাগে। উপন‍্যাসের প্রকৃত নায়ক বিনোদ ---হেমেন্দ্র নহে।
     'জ‍্যোতিঃহারা' (১৯১৫) উপন‍্যাসটির পরিণাম লেখিকার কোনো এক শ্রদ্ধাস্পদ আত্মীয়ের অনুরোধে, বিয়োগান্ত হইতে মিলনান্তে রূপান্তরিত হইয়াছে। ইহাতেই বুঝা যায় যে, উপন‍্যাসের বর্ণিত ঘটনাগুলির কোনো অবশ‍্যম্ভাবী পরিণতি নাই, লেখিকার ইচ্ছানুসারে তাহাদের মোড় ফিরানো যাইতে পারে। এই যদৃচ্ছা-প্রবর্তিত পরিবর্তন উপন‍্যাস বা নাটকের পক্ষে একটা অপকর্ষের নিদর্শন বলিয়া গণ‍্য হয়। বাস্তবিকই, ইহার বিশুদ্ধ ঔপন‍্যাসিক গুণ খুব উচ্চাঙ্গের বলিয়া মনে হয় না। যামিনী ও অণিমার মিলনে যে কোনো স্বাভাবিক অলঙ্ঘনীয় বাধা আছে তাহা লেখিকা সপ্রমাণ করিতে পারেন নাই।
     অণিমা যামিনীকে প্রত‍্যাখ‍্যান করার পর হঠাৎ তাহার জীবনের সমস্ত প্রয়োজন, সমস্ত রুচি ও স্বাদ হারাইয়া ফেলিয়াছে। তাহার গ্রন্থ-পাঠ, নাস্তিক‍্যবাদের আলোচনা, তাহার পরিহতব্রত কিছুই যেন তাহার অবলম্বনহীন জীবনকে খাড়া রাখিতে পারে না। সে তাহার অত‍্যন্ত পরিচিত জীবনযাত্রার গণ্ডি হইতে ছুটিয়া বাহির হইতে চাহিয়াছে। এই সময় যখন তাহার জীবন এক দুশ্ছেদ‍্য জটিলতাজালে