Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা - ১৬৬, ১৬৭ ও ১৬৮

2020-11-01
জড়াইয়া পড়িয়াছে, তখন গ্রন্থিচ্ছেদন করিবার জন‍্য এক দীর্ঘকাল অনুপস্থিত, ভক্তিপ্রবণ দাদামহাশয়ের প্রয়োজন হইয়াছে। তিনি নিজ স্বাভাবিক সহানুভূতি ও সূক্ষ্মদৃষ্টির বলে সহজেই অণিমার হৃদয়-সমস‍্যা বুঝিয়া লইয়াছেন ও তাহার সমাধানও করিয়া দিয়াছেন। দাদামহাশয় যখন ভধান্তি-নিরসন করিয়া দিলেন, তখন অণিমার মনে আর কোনো বিরোধের গ্লানি রহিল না---নিষ্ফল আত্মপীড়নের দায় হইতে অব‍্যাহতি লাভ করিয়া সে তাহার নিজের ও তাহার ধৈর্যশীল, চিরসহিষ্ণু প্রণয়াস্পদের বিড়ম্বিত জীবনকে সার্থক করিয়া তুলিয়াছে।
     'জ‍্যোতিঃহারা' উপন‍্যাসটির প্রধান ত্রুটি এই যে, বিরোধ ও মিলন উভয়ই তর্কমূলক, ধর্মবিষয়ক মতভেদের উপর প্রতিষ্ঠিত। যামিনী ও অণিমার মধ‍্যে যেমন কোনো সত‍্যকার হৃদয়গত অনৈক‍্য ছিল না, সেইরূপ তাহাদের আকর্ষণও অনেকটা আদর্শ সাম‍্য ও চরিত্র সংগতি হইতে উদ্ভূত; প্রেমের দুর্নিবার শক্তি তাহাদের মনের উপর ক্রিয়া করিয়াছিল কি না, তাহা সন্দেহের বিষয়। তাহাদের মিলনও একটা বহিঃশক্তির মধ‍্যস্থতায় সম্পাদিত হইয়াছে ----কৃত্রিম বাধা একটা অনুরূপ কৃত্রিম উপায়ের দ্বারাই অপসারিত হইয়াছে। সুতরাং এই সমস্ত ব‍্যাপারে হৃদয় বৃত্তির খুব যথেষ্ট স্ফুরণ হইয়াছে বলিয়া মনে হয় না। যামিনী, অণিমা উভয়েরই জীবনের উপর একটা রিক্ত ধূসরতার ছায়া সঞ্চারিত হইয়াছে। বঞ্চিত প্রেমের ফাঁক পুরণের জন‍্য তাহারা যে শিক্ষা বিস্তার, পরোপকার-ব্রতের ভার গ্রহণ করিয়াছে, তাহাতে তাহাদের জীবনীশক্তি যেন মন্দীভূত হইয়া শীর্ণধারায় সুনির্দিষ্ট কর্তব‍্যের বাঁধা খাতে ধীরে ধীরে অগ্রসর হইয়াছে। আদর্শবিষয়ক তর্ক ও সৎকর্মের পরিকল্পনা তাহাদের জীবনের উচ্ছ্বাস-চাপল‍্যের উপর পাষাণভারের ন‍্যায় চাপিয়া বসিয়াছে। বরং দুইটি অপ্রধান চরিত্রের হৃদয়ে --বরেন্দ্রকৃষ্ণ ও জ‍্যোৎস্নার অন্তঃকরণে ---প্রেমের তীব্র বিদ‍্যুৎ-শিখা জ্বলিয়া উঠিয়া তাহাদিগকে প্রেমিকের প্রাপ‍্য অসামান‍্যতা আনিয়া দিয়াছে। তবে বরেন্দ্রকৃষ্ণের চিত্ত-বিশুদ্ধি ও জ‍্যোৎস্নার আত্মবিসর্জন ---এ উভয়ই অনেকটা melodramatic, অতিনাটকীয় লক্ষণাক্রান্ত। যামিনীর প্রতি আক্রমণও কতকটা অস্বাভাবিক --আমাদের পারিবারিক জীবনের যুদ্ধক্ষেত্রে যে সমস্ত অস্ত্রশস্ত্রের ক্ষেপ-প্রতিক্ষেপ হইয়া থাকে, বন্দুকের গুলিকে তাহাদের সহিত সমশ্রেণীভুক্ত করা চলে না। মোট কথা, উপন‍্যাসটিতে যে সমস‍্যা আলোচিত হইয়াছে তাহা যথেষ্ট পরিমাণে উপন‍্যাসোচিত গুণে সমৃদ্ধ নয়। ইহার মধ‍্যে এমন কোনো দৃশ‍্য নাই যাহা উচ্চাঙ্গের ঔপন‍্যাসিক উৎকর্ষের সাক্ষ‍্য দিতে পারে।
( ৭ )

'চক্র' উপন‍্যাসটি প্রেমের ঘাত-প্রতিঘাতের সঙ্গে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র-কাহিনীর সংমিশ্রণ। সিভিলিয়ান তরুণ লাহা তাহার প্রণয়িনী কৃষ্ণা মল্লিকের চিত্তজয়ে ব‍্যর্থনোরথ হইয়া প্রতিদ্বন্দ্বী বিনয় শীলকে রাজনৈতিক অপরাধে অভিযুক্ত করিয়া নিজ প্রণয়-সাধনার পথ হইতে সারাইতে চাহিয়াছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চক্রান্ত ভেদ হইয়া আসল উদ্দেশ‍্যটি প্রকাশিত হইয়া পড়িয়াছে। তরুণের প্রণয়-সাধনায় একনিষ্ঠতা, প্রেমিক-হৃদয়ের চরম ক্ষমাশীলতা ও প্রেমের আত্মলোপী আতিশয‍্যই বিনয়ের বিরুদ্ধে তাহার ষড়যন্ত্রের হেয়তাকে অনেকটা ক্ষালিত ও ক্ষমার্হ করিয়া তুলিয়াছে।
     কৃষ্ণার পিতা ডাঃ মল্লিকের আভিজাত‍্য-গর্বের একটা করুণ দিক আছে; ইহাকে নিছক স্বার্থপধিয়তা ও বিলাসাসক্তি বলিয়া মনে করিতে আমাদের অন্তঃকরণ সায় দেয় না। দারিদ‍্য ও অসহায় অন্ধত্বের মধ‍্যেও তিনি তাঁহার পূর্বজীবনের ঐশ্বর্য-গরিমার স্মৃতি ও ব‍্যবহারিক আদর্শকে প্রাণপণে আঁকড়াইয়া ধরিয়া আছেন ও তাঁহার এই চিরাভ‍্যস্ত জীবনযাত্রা-প্রণালীর দোহাই দিয়া তিনি কন‍্যার সহসা পরিবর্তিত জীবনাদর্শের বিরুদ্ধে লড়িয়াছেন। কৃষ্ণার জীবনে যাহা-কিছু সংশয়-জড়িমা, তাহা আসিয়াছে তাহার পিতার প্রবল প্রতিকূলতার দিক দিয়া; তরুণের প্রতি কর্তব‍্যবোধ সে সম্পূর্ণরূপেই অস্বীকার করিয়াছে। মৃতপ্রেমের সিংহাসনে কৃতজ্ঞতায় প্রেতমূর্তিকে বসাইয়াও নিজ ঋণভার লঘু করার প্রয়োজনীয়তা সে অনুভব করে নাই। কৃষ্ণার এই অকুণ্ঠিত নির্মমতাই পাঠকের মনে তরুণের প্রতি একটু করুণার উদ্রেক করে ও উভয়ের মধ‍্যে সহানুভূতির সামঞ্জস‍্য রক্ষা করে।
     গ্রন্থ-মধ‍্যে বিনয়-ঊর্মিলার শৈশব-চাপল‍্য-প্রখর, দুরন্তপনার অন্তরাল-প্রচ্ছন্ন প্রলয়লীলার চিত্রটি সর্বাপেক্ষা মধুর ও উপভোগ‍্য হইয়াছে। দাম্পত‍্য-প্রণয়ের চিরপ্রথাগত সনাতন চিত্রের সহিত ইহার কোনো মিল নাই, অথচ ইহার সমস্ত দুর্ধর্ষতা ও তীব্র বিরোধের মধ‍্যেও আকর্ষণের গোপন গতিবিধি লক্ষ‍্যগোচর হয়। নিদারুণ অভিজ্ঞতার চাপে ঊর্মিলার চপলমতি বালিকা হইতে বিষণ্ন-গম্ভীর যৌবনে পরিণতির চিত্রটি বেশ সুন্দর ও সুসংগত হইয়াছে।
     বিনয় ও কৃষ্ণার সহকর্মিতা হইতে প্রণয়-আকর্ষণের পরিণতি বেশ স্বাভাবিক হইয়াছে, কিন্তু ইহাতে বিনয়ের চরিত্রটি কতকটা খর্ব করা হইয়াছে। কৃষ্ণার দিকে আকৃষ্ট হইবার সময় ঊর্মিলার স্মৃতি যে তাহাকে পিছন দিকে টানে নাই বা তাহার মনে কোনো অন্তর্দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে নাই, ইহা তাহার লঘুচিত্ততার পরিচয়। মোট কথা, ইহারা উভয়েই রাজনৈতিক ঘূর্ণিপাকে আবর্তিত হইয়া তাহাদের ব‍্যক্তিস্বাতন্ত‍্য কতকটা হারাইয়াছে। সমগ্র উপন‍্যাসটিও অনেকটা এই দোষমুক্ত হইয়াছে ---ইহাতে চরিত্রস্ফুরণ অপেক্ষা ঘটনাবিন‍্যাস সমধিক প্রাধান‍্য লাভ করিয়াছে। সেইজন‍্য ইহা খুব উচ্চাঙ্গের উৎকর্ষের দাবি করিতে পারে না।
     'হারানো খাতা'কে অনেকটা পূর্বোক্ত পর্যায়ে ফেলা যায়। এখানেও সমস্ত কৌতূহল কেন্দ্রীভূত হইয়াছে নিরঞ্জনের আত্মগোপনের রহস‍্যভেদে। নিরঞ্জনের ডায়েরি হইতে তাহার মস্তিষ্কবাকার ও বিপর্যস্ত স্মৃতিশক্তির বিশ্লেষণের কতকটা চেষ্টা থাকিলেও ইহার প্রধান প্রয়োজনীয়তা হইতেছে তাহার পৃর্ব-জীবনের ইতিহাস সংকলনে; অর্থাৎ ইহার প্রকৃত কার্য মনস্তত্ত্বমূলক নহে, ঘটনা স্মৃতিমূলক। নরেশচন্দ্রের

সহিত পরিমলের দাম্পত‍্য-সম্পর্কের মধ‍্যে যে ঘাত-প্রতিঘাত ও অসম্পূর্ণ সহানুভূতির চিত্র পাওয়া যায়, তাহা মনস্তত্ত্বের দিক দিয়া গভীর না হইলেও নিখুঁত। এই দাম্পত‍্য-বিরোধের বর্ণনা ও রাজবাড়ির পরিজনবর্গের কুৎসা ও পরিনিন্দাপূর্ণ, মুখরোচক আলাপের বিবরণটিও বাস্তবতার দিক দিয়া বেশ উপভোগ‍্য হইয়াছে। নরেশচন্দ্র ও সুষমা উভয়েরই ব‍্যক্তিত্বস্ফুরণ আদর্শবাদ ও সমাজনীতি-প্রভাবের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হইয়াছে। সুষমা ও 'চরিত্রহীন'--এর সাবিত্রী---উভয়ের সমস‍্যা ও মনোভাব প্রায় একই প্রকারের; কিন্তু সাবিত্রীর ব‍্যক্তিত্বটি আমাদের নিকট যেরূপ স্বচ্ছ ও ভাষ্বর হইয়া উঠিয়াছে, সুষমার ছায়াময় অস্পষ্টতার সহিত তাহার কোনোই তুলনা চলে না। আদর্শ চরিত্রমাত্রই যে অবাস্তব হইবে তাহা নহে; তবে তাহার বিশ্লেষণেও বাস্তবযীতির প্রাধান‍্য থাকা চাই। সুষমার চরিত্র-বিশ্লেষণ এরূপ কোনো প্রত‍্যক্ষ অনুভূতির মুদ্রাঙ্কিত বাস্তবতার পরিচয় মিলে না।
( ৮ )

বোধ হয় 'মা'ই (১৯২০) অনুরূপা দেবীর সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় উপন‍্যাস। এক দিক দিয়া ইহার জনপ্রিয়তা খুবই যুক্তিসংগত। পৌরাণিক যুগ হইতে আমাদের মনে যে ভাবের ঝংকার বাজিতেছে, লেখিকা এই উপন‍্যাসে আমাদের সেই চিরপরিচিত সুরটিই জাগাইয়াছেন, যুগযুগান্তের প্রবণতাকে উদবুদ্ধ করিয়াছেন। কঠোর কর্তব‍্যপালনের জন‍্য নিরপরাধা সাধ্বী স্ত্রী-পরিত‍্যাগের কাহিনী আমাদের সমবেদনাকে যেরূপ প্রবলভাবে আকর্ষণ করে, সেই প্রবল আকর্ষণের মূলে আছে বাল্মীকি-কৃত্তিবাসের করুণা-সিক্ত, অপরূপ কবি-কল্পনা। কাজে কাজেই যে কেহ বিষয়-নির্বাচনে এই কবি-গুরুদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন, তিনিই উত্তরাধিকারসূত্রে অতি সহজে আমাদের হৃদয় জয় করিবার শক্তি লাভ করিয়া থাকেন। আমাদের মতো ভাবাতিরেকপ্রবণ জাতিকে অতীতের উত্তুঙ্গ শিখর হইতে প্রবহমান ভাবধারা সহজেই ভাসাইয়া লইয়া যায়। বিশেষত, 'মা' নামে এমন একটা মন্ত্র-শক্তি নিহিত আছে, যাহার প্রভাব কেবল আমাদের সাহিত‍্যরসবোধের রাজ‍্যেই সীমাবদ্ধ নহে। মা যে কেবল আমাদের গার্হস্থ‍্য-জীবনের কেন্দ্র, কেবল যে উহার সমস্ত স্নেহ-মমতা-ভক্তিধারার উৎস ও প্রতীক তাহা নহে, আমাদের ধর্মসাধনা ও ঈশ্বরারাধনার সমস্ত অতীন্দ্রিয় মহিমা তাহাকে নিজ জ‍্যোতির্মণ্ডলবেষ্টিত করিয়াছে। এই নামের ডাকে আমাদের সমস্ত সুকুমার অনুভবনশক্তি, সমস্ত অন্তর্নিহিত করুণা সাড়া দিবার জন‍্য উন্মুখ হইয়াই থাকে।
     অবশ‍্য জনপ্রিয়তা ও সাহিত‍্যিক উৎকর্ষ ঠিক এক বস্তু নহে। বিষয়-বস্তুর অনাদি প্রাচীনত্বই ইহার ঔপন‍্যাসিক মৌলিকতার প্রতিবন্ধকস্বরূপ দাঁড়াইয়াছে। যাহাকে আমরা কাব‍্যের অমৃত-নষ‍্যন্দ-নিষিক্তরূপে দেখিতে অভ‍্যস্ত হইয়াছে, উপন‍্যাসের তীক্ষ্ণ, মোহাবেশহীন বিশ্লেষণ যেন তাহার পক্ষে ঠিক উপযোগী বলিয়া বোধ হয় না। কাব‍্যের অনুকরণ-প্রবৃত্তি ঔপন‍্যাসিকের উচ্ছ্বাসকে সর্বদাই ঊর্ধোবাৎক্ষিপ্ত রাখিতে চেষ্টা করে। Sentimentality র অজস্র অবিরল ধারা উপন‍্যাসের প্রান্তভূমিকে সিক্ত কর্দমাক্ত করিয়া তোলে। এই উপন‍্যাসে লেখিকার মন্তব‍্য ও জীবন-সমালোচনা এই ভাবাতিরেক দোষে দুষ্ট হইয়াছে। অজিতের পিতার জন‍্য ব‍্যাকুল, মোহান্ধ প্রতীক্ষায় এই আতিশয‍্যপ্রিয়তা লক্ষিত হয়। পিতার প্রতি আকর্ষণ, মত্ততার মতো তাহার বুদ্ধি-বিবেচনা, তাহার আত্মহিতজ্ঞানকে অভিভূত করিয়াছে, তাহাকে ধ্বংসের পথে টানিয়া বাহির করিয়াছে। অরবিন্দের পিতৃ-আজ্ঞা-পালনের উৎকট, নির্মম আতিশয‍্যেও ইহার দ্বিতীয় উদাহরণ মিলে। সে যেন একটা সুকঠোর ব্রতের মতো পিতার নৃশংস আদেশ অক্ষরে অক্ষরে, কায়মনোবাক‍্যে পালন করিতে আত্মনিয়োগ করিয়াছে। মনোরমার স্মৃতিকে পর্যন্ত তাহার মনের গভীর তলদেশ হইতে উৎপাটিত করিতে প্রয়াসী হইয়াছে। মনোরমাও গভীর প্রেমের সহজ অন্তর্দৃষ্টিবলে স্বামীর অবস্থাসংকটের বিষয় অবগত হইয়াছে ---নিজের স্বামী-প্রেমের পূর্ণাধিকারিণী জানিয়া এই অনিচ্ছাকৃত প্রত‍্যাখ‍্যান স্বীকার করিয়া লইয়াছে। অজিত যখনই পিতার অবিচার ও নিঃস্নেহতার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ অভিযোগ আনিয়াছে, মনোরমা তখনই তাহাকে পিতার অমানুষিক আত্মোৎসর্গের কথা সহিত একসুরে মন বাঁধিতে পারে নাই; তাহার মন বিদ্রোহ করিয়াছে, ব‍্যর্থ অভিমানে গুমরাইয়া অশরীরী প্রেতাত্মার মতো অন্ধকারে মুখ ঢাকিয়া পিতার অনুসরণ করিয়াছে, নিজ সুনাম ও ভবিষ‍্যতের আশা সমস্তই রক্তশোষণকারী আকাঙ্ক্ষার নিকট বলি দিয়াছে। শেষে মাতার মৃত‍্যুশয‍্যার পার্শ্বে বিমাতা ব্রজরাণীকে মাতৃ-সম্বোধন করিয়া তাহার সকল বিদ্রোহ-বিক্ষোভ শান্তিতে বিলীন হইয়াছে।
     উপন‍্যাস-মধ‍্যে সর্বাপেক্ষা উপভোগ‍্য অংশ অরবিন্দ ও ব্রজরাণীর দাম্পত‍্য-সম্পর্কের বর্ণনা। অরবিন্দের ব‍্যবহারে নিখুঁত নিশ্ছিদ্র লৌকিক কর্তব‍্যপালনের সঙ্গে অবিচলিত উদাসীনতার সমন্বয় হইয়াছে। মনোরমার প্রতি বাক‍্যে বা ব‍্যবহারে সে কিছুমাত্র স্নেহ প্রকাশ করে নাই---যৌবনের সেই প্রথম-প্রেমরাগরঞ্জিত অধ‍্যায় সে একেবারে জীবন হইতে নিশ্চিহ্ন করিয়া মুছিয়া ফেলিয়াছে। অথচ তাহার ক্ষুদ্রতম কার্যে, তাহার সূক্ষ্মতম ইঙ্গিতে ব্রজরাণী নিঃসংশয়ে বুঝিয়াছে যে, তাহার সবটুকু প্রেম, সবটুকু উৎসাহ তাহার সপত্নী নিঃশেষে শুষিয়া লইয়াছে; প্রেমের পাত্রে তাহার জন‍্য এতটুকু উদবৃত্ত পড়িয়া নাই। সমস্ত লৌকিক কর্তব‍্যপালনের মধ‍্যে অরবিন্দের নিঃসঙ্গ অনাসক্ত মনের চিত্রটি খুব চমৎকারভাবে ফুটিয়া উঠিয়াছে। জীবনের সহজ সমৃদ্ধি, প্রাণরসের নিগূঢ় সঞ্চরণ তাহার শেষ হইয়া গিয়াছে---প্রতিজ্ঞা-পালনের শুষ্কবৃন্তে সে কোনোরূপে নিজেকে ধরিয়া রাখিয়াছে মাত্র। স্নেহ-প্রবৃত্তির এই নির্মম নিপীড়নে, এই কঠোর আত্মনিগ্রহে তাহার জীবনী-শক্তি তিল তিল করিয়া ক্ষয় হইতে চলিয়াছে। অবশেষে যে পক্ষাঘাত আসিয়া তাহাকে শয‍্যাশায়ী করিয়াছে তাহা এই জীবনব‍্যাপী আত্মনিরোধের চরম, অবশ‍্যম্ভাবী পরিণতি মাত্র। আবার আজিতের কাঙাল স্নেহবুভুক্ষা তাহার ছায়ার ন‍্যায় নিঃশব্দ, অবিরাম পিতৃ-অনুবর্তন, এই পরিণতির গতিবেগ বর্ধিত করিয়াছে। অরবিন্দের এই অমানুষিক আত্মবলিদানের প্রত‍্যেক স্তরটি আমাদের নিকট জীবন্ত উজ্জ্বল বর্ণে ফুটিয়া উঠিয়াছে।

     ব্রজরাণীর চরিত্রটিও খুব সুন্দররূপে ফুটিয়াছে। তাহার বঞ্চিত অশান্ত চিত্ত তাহার চারিদিকে সর্বদাই একটা ক্ষুদ্র ঘূর্ণিবায়ুর সৃষ্টি করিয়াছে। অরবিন্দের পরিবারে তাহার অনধিকার-প্রবেশ যেন তাহার সমস্ত জীবনকে একটা সন্দিগ্ধ অনিশ্চয়তার বিষ-বায়ুতে দূষিত করিয়াছে ---কোথাও যেন সে তাহার সহজ, স্বাভাবিক স্থানটি পায় নাই। সে তাহার নিজের গৃহে আপনাকে শত্রুদুর্গে বন্দিনী বলিয়া অনুভব করিয়াছে। তাহার অভিমানপ্রবণ মন সর্বত্রই একটা গোপন ষড়যন্ত্রের সন্ধান পাইয়াছে, একটা কষ্টনিরুদ্ধ অবজ্ঞা ও তাচ্ছিল‍্যের ক্রূর হাস‍্য যেন তাহার চতুস্পার্শ্বে বিচ্ছুরিত হইয়াছে। ইহার উপর তাহার সন্তানহীনতা তাহার জীবন-সমস‍্যাকে আরও ঘনীভূত করিয়াছে। যে স্বর্ণ-সেতু বাহিয়া সে বিচ্ছেদের লবণ-সমুদ্র উত্তীর্ণ হইয়া সংসারের কেন্দ্রস্থলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করিতে পারিত, তাহা তাহার ভাগ‍্যদোষে অরচিতই রহিয়া গিয়াছে। শাশুড়ির ঔদাসীন‍্য ও ননদ শরৎশশীর প্রকাশ‍্য প্রতীকূলতা তাহাকে নিজ দুর্ভাগ‍্য সন্বন্ধে সর্বদাই সচেতন রাখিয়াছে। সুতরাং ফল দাঁড়াইয়াছে যে, ব্রজরাণী পরিবার-মধ‍্যে একটি সজীব আগ্নেয়গিরির ন‍্যায় তাহার চতুস্পার্শ্বে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছড়াইয়াছে। এই অগ্নিবৃষ্টি সর্বপেক্ষা অধিক বর্ষিত হইয়াছে বেচারা অরবিন্দের উপরে। স্বামীর প্রতি অসংগত অভিমান ও ক্রোধের দ্বারা সে তাহার দুঃখের পাত্র পূর্ণ করিয়াছে ও শেষ পর্যন্ত স্বামী হারাইতে বসিয়াছে। কিন্তু তাহার সমস্ত অগ্নুৎপাতের কেন্দ্রস্থলে এক স্নেহ-শীতল, সন্তান-বৎসল মাতৃহৃদয় লুক্কায়িত ছিল সেই মাতৃহৃদয় অবশেষে তাহার ঈর্ষা-দ্বেষ-সংকীর্ণতার উপর জয়ী হইয়াছে। অজিতের মাতৃসন্মোধন তাহার জীবনে এক নূতন অধ‍্যায় উন্মীলিত করিয়াছে --সে অবশেষে নিজ চির-ঈপ্সিত মাতৃত্বের গৌরবময় সিংহাসনে নিরাপদভাবে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে।
     অন‍্যান‍্য গৌণ চরিত্রে মধ‍্যে শরৎশশী খুব জীবন্ত হইয়া উঠিয়াছে। পারিবারিক তুলাদণ্ডের সাম‍্যরক্ষার জন‍্য ছোটো ননদ ঊষাকে ব্রজরাণীর পক্ষপাতিনীরূপে চিত্রিত করা হইয়াছে ---কিন্তু তাহার জীবন তাহার সংক্ষিপ্ত প্রয়োজনীয়তাকে ছাড়াইয়া যায় নাই। মৃত‍্যুঞ্জয়বাবুর অতলস্পর্শী নীচতার প্রতিরূপ আমাদের বাস্তব সমাজে বিরল নহে ---তথাপি উহার চরিত্রের মধ‍্যেও একটু আতিশয‍্যপ্রিয়তা আবিষ্কার করা যাইতে পারে। মনোরমার সহিত রাবেয়ার সখিত্বের চিত্র মনোরমার সর্বরিক্ত জীবনে সন্তান-বাৎসল‍্য ছাড়া আরও একটা দিকের অস্তিত্বের ইঙ্গিত দিয়াছে, কিন্তু তাহাতে মনোরমা-চরিত্রের শোক-স্তব্ধ নিঃসঙ্গতার মধ‍্যে কোনো বৈচিত‍্যের ক্ষীণতম আভাসও সঞ্চারিত হয় নাই। মোটের উপর, মন্তব‍্যের অসংযত বিস্তার ও অতিরঞ্জন-প্রবৃত্তি সত্ত্বেও 'মা' উপন‍্যাসটির স্থান উপন‍্যাস-জগতে বেশ উচ্চে।
     'বাগদত্তা' উপন‍্যাসে ঘটনা-বিন‍্যাসের অত‍্যধিক জটিলতা কৃত্রিমতার হেতু হইয়াছে। আমাদের প্রাত‍্যহিক জীবনেও অপ্রত‍্যাশিত দৈব-সংঘটনের অবশ‍্য অবসর আছে; কিন্তু কমলা ও গৌরীকে লইয়া দৈবের যে নিত‍্য-পরিবর্তনশীল খেলা চলিয়াছে, তাহাকে বাস্তব জীবনের আবেষ্টনে স্থান দেওয়া কঠিন। এই অপ্রত‍্যাশিতের বারংবার আবির্ভাবে উপন‍্যাসটির স্বাভাবিক অগ্রগতি পুনঃপুনঃ প্রতিহত হইয়াছে। বিশেষত গৌরীর জন্মরহস‍্য ও পিতৃনিরূপণ লইয়া যে বিস্ময়কর পরিবর্তনের সূচনা হইয়াছে তাহাকে ঐন্দ্রজালিক প্রক্রিয়ার পর্যায়ে ফেলা যাইতে পারে। দৈব যেন মানুষের যত্নরচিত ব‍্যবস্থা প্রত‍্যাশিত পরিণতিকে লণ্ডভণ্ড, বিপযস্ত করিয়া একপ্রকার হিংস্র, ত্রূর আনন্দ লাভ করিয়াছে। দৈবপ্রভাব যেখানে এরূপ তীক্ষ্ণভাবে প্রবল, সেখানে মানুষের স্বাধীন, ঘাত-প্রতিঘাতের রসধারা জমাট বাঁধিবার অবসর পায় না। এ ক্ষেত্রেও ঠিক তাহাই হইয়াছে।
     উপন‍্যাসের চরিত্রগুলিও দৈবের ক্রীড়নকস্বরূপ হওয়ায় তাহাদের ব‍্যক্তিত্বস্ফুরণের সুযোগ পায় নাই। উমাকান্ত ভট্টাচার্য ও মণীশ একেবারে আদর্শলোকের অধিবাসী, মর্ত‍্য-জীবনের সহিত তাঁহাদের সংযোগ নিতান্ত আলগা ধরনের। পৃথিবীর সহিত তাঁহাদের সম্পর্ক কেবল স্থান গত, হৃদয় গত নহে। যাঁহারা মরজগতের সংঘর্ষ-বিরোধের মধ‍্যে ঊধর্ব-নিহিত-দৃষ্টি হইয়া ধ‍্যানমগ্নভাবে বিচরণ করেন, যাঁহারা নিষ্কাম ধর্মের বর্ম-পরিহিত হইয়া সংসার-রণক্ষেত্রের অস্ত্রশস্ত্রের দ্বারা অক্ষত-শরীর থাকেন, তাঁহাদের স্থান আর যেখানেই হউক, মানুষের অর্সখ‍্য-বিচিত্র আশা-তৃষা-বিষাদ-উদবেল জীবন-কাহিনী যে উপন‍্যাস সেখানে তাঁহাদের স্থান নাই। কাব‍্যে আমরা অতি-মানবের দর্শন আকাঙক্ষা করি; উপন‍্যাসে আমাদের সমশ্রেণীস্থ,---কোথাও গৌরবোজ্জ্বল, কোথাও পরাভব-ম্লান, কিন্তু সর্বত্র যুদ্ধচিহ্নিত ---মিশ্র জীব দেখিতে চাই। উমাকান্তের মনে কখনো কোনো বাহ‍্য ঘটনা ছায়াপাত করে বলিয়া মনে হয় না; তাঁহার নির্বিকার চিত্ত কোনো আঘাতেই বিক্ষব্ধ হয় না। মণীশ অবশ‍্য ঔদাসীন‍্যের এতটা চরমোৎকর্ষে এখনও পৌঁছিতে পারে নাই---কিন্তু তথাপি তাহার অন্তরে কোনো বিক্ষোভের চাঞ্চল‍্য দৃষ্টিগোচর হয় না, সমস্ত ব‍্যথা-বেদনা, সমস্ত আশাভঙ্গ সে নীরবে সহ‍্য করে। কমলার শোকে পিষ্ট জীবনে উচ্ছ্বাসের বাহ‍্যচাঞ্চল‍্য সমস্তই অন্তর্লীন হইয়াছে; মণীশের সহিত বিবাহের সম্ভাবনায় তাহার মন হর্ষোচ্ছ্বাসে ফুলিয়া উঠিয়াছে, কিন্তু তাহার চিরাভ‍্যস্ত আত্মসংযম এই পরিপূর্ণ আন্দস্ফীতির দুই-একটি মাত্র তরঙ্গকে বাহিরে আসিতে দিয়াছে। শচীকান্তের সহিত অবাঞ্ছিত বিবাহের পরই তাহার চরিত্রের প্রস্তর-কঠিন দৃঢ়তা পূর্ণ বিকাশ লাভ করিয়াছে। সে শচীকান্তের অগ্নিস্রাবের ন‍্যায় জ্বালাময় প্রেমে দারুণ উপেক্ষা ও অবজ্ঞার শীতল বারি ঢালিয়াছে; এক মুহূর্তের আত্মবিস্মৃতি তাহার অটল সংকল্পের তীব্র দ‍্যুতিকে ঝাপসা করিয়া দেয় নাই। তথাপি যেন মনে হয় যে, তাহার অজ্ঞাতসারে শচীকান্তের সর্বত‍্যাগী প্রণয় তাহার মনের অবচেতন প্রদেশে প্রভাব বিস্তার করিয়াছিল। শচীকান্তকে যে সে অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপাইয়া পড়িবার প্রেরণা দিয়াছিল, তাহা দয়া অপেক্ষা আরও কোনো গূঢ়তর, গভীরতর মূল হইতে সমুদ্ভূত। যে স্বত্বে সে শচীকান্তকে নিশ্চিত মৃত‍্যুমুখে প্রেরণ করিবার অধিকার অর্জন করিয়াছিল তাহা কেবল প্রেমই দিতে পারে। কমলার চরিত্রটি খুব সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ-শক্তিরই নিদর্শন।
     গ্রন্থ-মধ‍্যে সর্বাপেক্ষা সজীব ও প্রাণবেগ-চঞ্চল চরিত্র শচীকান্তের। তাহার স্বভাবত উচ্ছৃঙ্খল, আত্মসুখপরায়ণ প্রকৃতি পিতার আদর্শকে সম্পূর্ণরূপেই অস্বীকার করিয়াছে। তাহার প্রেম হিতাহিত জ্ঞানশূন‍্য, ন‍্যায়-অন‍্যায়-বিচারবোধ-রহিত। এই প্রেমের জন‍্য সে বন্ধুত্ব, সাংসারিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ‍্য, মান-সম্ভ্রম, পারিবারিক শান্তি, শেষ জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দিয়াছে। নৈহাটি স্টেশনের প্লাটফর্মে সেই