Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা - ১৭৫, ১৭৬ ও ১৭৭

2020-12-02
একাধিপত‍্য বজায় রাখিবার জন‍্য সেইরূপ সচেষ্ট থাকিত। কিন্তু তাহার এই ঈর্ষাপরবশ অতি-সতর্কতাই তাহার অধিকারস্খলনের হেতু হইয়াছে। অমৃতকে সেই আমদানি করিয়া খাল কাটিয়া কুমির আনিয়াছে। শেষ পর্যন্ত বিমল তাহাকে একেবারে পরিত‍্যাগ করিয়াছে এমন কি তাহার খাওয়া-পরারও একটা ব‍্যবস্থা করিতে ভুলিয়াছে। মঙ্গলার যতই দোষ থাকুক, তাহার অন্তিম দৃশ‍্য তাহার প্রতি আমাদের সহানুভূতি উদ্রেক করে।
     উপন‍্যাস-ক্ষেত্রে, বিশেষত মহিলা-ঔপন‍্যাসিকদের মধ‍্যে অনুরূপা দেবীর স্থান সম্বন্ধে পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে। তাঁহার কয়েকখানি উপন‍্যাস-সাহিত‍্য চিরস্মরণীয়তা লাভের উপযুক্ত। তাঁহার রচনার মধ‍্যে নারী-হস্তের স্পর্শ নির্ভুলভাবে নির্দেশ করা কঠিন ---সাধারণত তাঁহার মন্তব‍্যের প্রাচুর্য ও বিশ্লেষণের গুরুত্ব পুরুষের পাণ্ডিত‍্য পরুষ আলোচনার কথাই স্মরণ করাইয়া দেয়। তথাপি তাঁহার উপন‍্যাসের মধ‍্যে কতকগুলি দৃশ‍্য রচয়িত্রীর নারীসুলভ কমনীয়তার নিদর্শন। 'মা' উপন‍্যাসে ব্রজরাণীর নিদারুণ অভিমান ও ঈর্ষা; 'গরীবের মেয়ে'তে নীলিমার বঞ্চিত হৃদয়ের প্রেম-বুভুক্ষা; 'মন্ত্রশক্তি'তে বাণীর নিগূঢ় মর্মোদঘাটন; 'পথ-হারা'তে উৎপলার দাখিল করা যাইতে পারে।
     নিরুপমা ও অনুরূপা দেবী উপন‍্যাস-ক্ষেত্রে যে বিশেষ দিকের পথপ্রদর্শন করিয়াছেন, সেই পথে অন‍্যান‍্য মহিলা-ঔপন‍্যাসিকও তাঁহাদের অনুসরণ করিয়াছেন। ইঁহাদের সকলের রচনার বিস্তৃত আলোচনার স্থানাভাব; বিশেষত তাঁহাদের মধ‍্যে এমন কোনো নূতনত্ব বা মৌলিকতা নাই, যাহা বিশেষ করিয়া বিশ্লেষণযোগ‍্য। এই সমস্ত লেখিকার মধ‍্যে ইন্দ্রিরা দেবীর 'স্পর্শমণি' দাম্পত‍্য-মনোমালিন‍্যের পুরাতন বিষয়ের উপর প্রতিষ্ঠিত। ইনি মোটের উপর নিরুপমা-অনুরূপারই ধারার অনুবর্তন করিয়াছেন। এই শ্রেণীর অন‍্যান‍্য লেখিকার মধ‍্যে প্রভাবতী দেবী সরস্বতী ও শৈলবালা ঘোষজায়া অনেকগুলি উপন‍্যাস রচনা করিয়াছেন। কিন্তু ইঁহাদের মধ‍্যে নূতন ধারা প্রবর্তনের বিশেষ কোনো পরিচয় পাওয়া যায় না। মোটের উপর ইঁহারা সকলেই কম-বেশি পুরাতন আদর্শ ও সমাজ-ব‍্যবস্থার প্রতি সহানুভূতি-সম্পন্না ও এই আদর্শ সংঘর্ষের যুগে পুরাতনেরই পোষকতা করেন। এই পর্যন্ত উপন‍্যাস-ক্ষেত্রে স্ত্রীজাতির অবদান, বিশেষত্বের দিক দিয়া, আশানুরূপ পর্যাপ্ত হয় নাই। পুরাতন জীবনযাত্রায় নারীর স্থান ও সমস‍্যা ইহাদের কল্পনাকে উদ্বুদ্ধ করিয়াছে সত‍্য, কিন্তু এই সমস‍্যার আলোচনা অনেকটা সংকীর্ণ গণ্ডির মধ‍্যে সীমাবদ্ধ হইয়াছে; ইহাদের মধ‍্যে যথেষ্ট বৈচিত‍্য ও ভাবগভীরতা সঞ্চারিত হয় নাই। ইহা হয়তো বিষয়-বস্তুর দৈন‍্য ও সংকীর্ণতার অবশ‍্যম্ভাবী ফল। কিন্তু বহু-উপনাসে Jane Austen ও George Eliot-এর আবির্ভাব এখনও প্রত‍্যাশিত ভবিষ‍্যৎ সম্ভাবনার মধ‍্যেই অন্তর্ভুক্ত।
( ১২)

সীতা ও শান্তা দেবীর উপন‍্যাসাবলীর সাধারণ প্রকৃতি সম্বন্ধে পূর্বেই আলোচনা করা হইয়াছে। মহিলা-রচিত উপন‍্যাস-সাহিত‍্যের একটি নূতন স্তর ইঁহাদিগের মধ‍্যে সচিত হইয়াছে। ইঁহাদের বিষয়-বস্তু, ভাষা ও জীবন সম্বন্ধে আলোচনা ও মন্তব‍্য এতই অভিন্ন যে, ইঁহাদের পরস্পরের সহিত তুলনায় বিশেষত্ব নির্ধারণ করা অত‍্যন্ত দুরূহ। ইঁহারা যেন সাহিত‍্যাকাশের যুগ্ম-তারা, যাহাদের রশ্মির পার্থক‍্য অনুভবগম‍্য নহে।
     সীতা দেবীর রচনার মধ‍্যে অনেকগুলি ছোটো গল্পের সমষ্টি ও কতকগুলি পূর্ণাঙ্গ উপন‍্যাস আছে। 'ব্রজমণি', 'ছায়াবীথি' ও 'আলোর আড়াল' -এইগুলি ছোটো গল্প; 'পথিক-বন্ধু' (১৩২৭), 'রজনীগন্ধা' (১৩২৮), 'পরভৃতিকা' (১৩৩৭), 'বন‍্যা' এই কয়টি পূর্ণাঙ্গ উপন‍্যাস। ছোটো গল্পগুলির মধ‍্যে অধিকাংশই সামাজিক বৈষম‍্য ও অসংগতিমূলক ---আলোচনা বিশেষত্ব-বর্জিত। কতকগুলির বিষয় রোমান্টিক ও ব‍্যক্তিত্ব-বৈশিষ্ট‍্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। 'আলোর আড়াল' ও 'ভ্রষ্টতারা' নামক দুইটি গল্প এই সমষ্টির মধ‍্যে উল্লেখযোগ‍্য। পূর্বোল্লিখিত গল্পে অন্ধ স্বামীর সহিত বিবাহিত অতি কুৎসিত-দর্শনা স্ত্রীর খেদোচ্ছ্বাসের মধ‍্যে যথেষ্ট সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ ও ভাষা-গৌরব আছে।
     পূর্ণাঙ্গ উপন‍্যাসের মধ‍্যে 'পরভৃতিকা' উৎকর্ষের দিক দিয়া সর্বনিম্ন স্থান অধিকার করে। ইহার গার্হস্থ‍্য জীবনযাত্রার মধ‍্যে চমকপ্রদ ঘটনার সন্নিবেশ হইয়াছে। মেয়ে স্কুল ও বোর্ডিয়-এর স্নেহহীন আবেষ্টনের রুদ্ধ-কঠোর প্রতিবেশ কৃষ্ণার চরিত্রের স্বাভাবিক মাধুটিকে আরও বিকশিত করিয়াছে। তাহার সহপাঠিনীগণ ও যে পরিবারে সে শিক্ষয়িত্রীর কার্য গ্রহণ করিয়াছে সেই পরিবারের সহিত তাহার বিচিত্র সম্পর্কের বিষয় সুচিত্রিত হইয়াছে, তবে এই বর্ণনাতে চরিত্রোন্মেষ অপেক্ষা ঘটনা-বৈচিত‍্যের উপরই অধিক ঝোঁক পড়িয়াছে। তাহার বর্মাপ্রবাসের বিবরণের আকর্ষণ উপন‍্যাস হিসাবে নয়, ভ্রমণকাহিনী হিসাবে। সুধীরের সহিত কৃষ্ণার পরিচয় ও ইহার ফলে তাহাদের মধ‍্যে ক্রমশ প্রণয়োন্মেষ-বর্ণনার মধ‍্যে অপটু হস্তের নিদর্শন মিলে। তারপর উহাদের জন্মরহস‍্যভেদের ফলে উহাদের আপেক্ষিক অবস্থার পরিবর্তন, ---সুধীরের অভিমানদৃপ্ত আত্মমর্যাদাবোধের স্ফুরণ ও কৃষ্ণার অতর্কিত সৌভাগ‍্যে বিস্ময়বিমূঢ় ভাবের চিত্র ---আশানুরূপ উৎকর্ষ লাভ করে নাই। বিশেষত যে দৃশ‍্যে সুধীর মাতার নিকট কৃষ্ণার প্রতি নিজ অনুরাগের রহস‍্য ব‍্যক্ত করিয়াছে তাহাতে একটা অশোভন ব‍্যস্ততা ও অভব‍্যতা প্রকটিত হইয়াছে; মোট কথা, চরিত্রসৃষ্টি ও উপন‍্যাসোচিত ঘাত-প্রতিঘাতের দিক দিয়া উপন‍্যাসটির স্থান তাদৃশ উচ্চ নহে।
     'পথিক-বন্ধু' উপন‍্যাসটি রচনা-কালের দিক দিয়া অগ্রবর্তী হইলেও উৎকর্ষের দিক দিয়া 'পরভৃতিকা' অপেক্ষা প্রশংসনীয়। 'পরভৃতিকা'তে ঘটনাবৈচিত‍্যের আধিক‍্য উপন‍্যাসোচিত রস-বিকাশের অন্তরায় হইয়া দাঁড়াইয়াছে। 'পথিক-বন্ধু'তেও ভ্রমণকাহিনীর উপভোগ‍্য রসের

অভাব নাই, কিন্তু এই ভ্রমণবৃত্তান্ত ও প্রকৃতি-বর্ণনার মধ‍্য দিয়া চরিত্রগুলির ভাবপরিবর্তন সূচিত হইয়াছে। ঠাকুরপাড়ার ঘনশ‍্যাম, বর্ষাস্নিগ্ধ, বন‍্য প্রকৃতি, সাঁওতাল পরগণাব ঊষর প্রতিবেশের মধ‍্যে শিমূলফুলের দীপ্ত রক্তরাগ ও বসন্তের বর্ণসমারোহ, পুরীর সমুদ্রতরঙ্গের অশান্ত, চিরমুখর রোদনোচ্ছ্বাস ও সৃষ্টিলোপকারী মহাঝটিকা ---এ সমস্তই কেবল যে উচ্চাঙ্গের বর্ণনাশক্তির পরিচয় তাহা নহে, দেবপ্রিয় ও অনিন্দিতার সম্পর্কটি মাধুর্যরসে ও ব‍্যাকুল হৃদয়াবেগে পরিপূর্ণ করিয়া তোলার সহা-স্বরূপ ইহাদের একটা বিশেষ মনস্তত্ত্বমূলক প্রয়োজনীয়তা আছে।
     উপন‍্যাসটির আখ‍্যান-বস্তুর মধ‍্যেও কতকটা নূতনত্ব আছে। দেবপ্রিয় তাহার শিক্ষাসমাপ্তির পর দেশের বালক-বালিকার মধ‍্যে আনন্দ-প্রচারের ব্রত গ্রহণ করিয়াছে---বায়োস্কোপের ছবি, গ্রামোফোনের গান, নানারূপ ক্রীড়াকৌতুক দেখাইয়া শীর্ণদেহ, শুষ্কমন শিশুদের মুখে হাসি ফুটাইয়া তোলাই তাহার জীবনের কাজ। এই প্রচারকার্যের মধ‍্যে সে প্রণয়ব‍্যাপারে প্রত‍্যাখ‍্যাতা ও বিষাদমগ্না অনিন্দিতার সহিত পরিচিত হইয়াছে। ঠাকুরপাড়ার স্নিগ্ধ-শ‍্যাম প্রকৃতির প্রতিবেশের মধ‍্যে তাহাদের প্রথম পরিচয়ে তাহারা পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হইয়াছে ও তাহাদের প্রথম আলাপ সৌজন‍্য, সরস, অথচ নির্দোষ আনন্দ-বিনিময় ও শিষ্ট, বিনীত প্রশংসাবাদের জন‍্য উপভোগ‍্য হইয়াছে। কিন্তু অনিন্দিতার সদ‍্যতিক্ত অভিজ্ঞতা তাহার চিত্তপ্রবাহের মুখে পাষাণভারের ন‍্যায় চাপিয়া বসিয়াছে---সে তাহার মনের রশ্মিকে টানিয়া ধরিয়া সবলে তাহার মুখ ফিরাইয়াছে। তাহাদের দ্বিতীয় আলাপে অপরিচয়ের বাধা-সংকোচ অনেকটা কাটিয়া গিয়াছে ---অনিন্দিতা দেবপ্রিয়কে বন্ধু বলিয়া স্বীকার করিয়াছে; কিন্তু তাহাদের বন্ধোত্বকে যে সে কোনো ক্রমেই প্রণয়ের পর্যায়ে উন্নীত হইতে দিবে না তাহাও স্পষ্টাক্ষরে জানাইয়াছে। অনিন্দিতার সমস্ত ব‍্যবহারের উপর একটা ম্লান বিষাদ ও শোকস্তব্ধ গাম্ভীর্যের ছায়াপাত সুন্দরভাবে দেখানো হইয়াছে। তাহার প্রত‍্যাখ‍্যানকারী প্রথম প্রণয়ীর সহিত অতর্কিত সাক্ষাতে তাহার হৃদয়ে যে জ্বালাময় নৈরাশ‍্যের পুনরাবির্ভাব হইয়াছে, তাহার প্রভাবে সে দেবপ্রিয়ের প্রথম প্রণয়নিবেদনকে প্রত‍্যাখ‍্যান করিয়াছে। কিন্তু এই প্রত‍্যাখ‍্যানের পরেই তাহার বিক্ষুব্ধ হৃদয়ের মানদণ্ড আবার সমতাপ্রাপ্ত হইয়াছে --- প্রেম তাহার স্বাভাবিক ক্ষুধা ও ব‍্যাকুলতা লইয়া তাহার হৃদয়ে নবজাগ্রত হইয়াছে ও সে অনুতপ্তহৃদয়ে দেবপ্রিয়ের সন্ধান করিতে চলিয়াছে। কলিকাতায় তাহার অশান্ত মন পারিবারিক সংকীর্ণ গণ্ডির মধ‍্যে একটা বিক্ষোভ জাগাইয়া, আঘাত করিয়া ও কঠোরতর প্রতিঘাত সহ‍্য করিয়া, অতিরিক্ত অভিমান-প্রবণতা ও অশ্রুপাতের দ্বারা আপন দুঃসহ বেদনাকে মুক্তি দিতে চাহিয়াছে। ঠাকুরপাড়াতে দেবপ্রিয়ের মাতার তিরস্কার-বাক‍্যে সে দেবপ্রিয়ের যে কতটা ক্ষতি করিয়াছে তাহা সে অনুভব করিয়াছে। এই অনুভব তাহার অনুতাপ ও হৃদয়াবেগের মাত্রা অসংবরণীয়রূপে বাড়াইয়াছে। শেষে সে তীর্থযাত্রার অছিলায় নিজ প্রণয়াস্পদের মানস-অভিসারে বাহির হইয়াছে। এই নিরুদ্দেশযাত্রা শেষ হইয়াছে পুরীতে সমুদ্রতীরে ---সেখানে তাহার অভিসার সাফল‍্যমণ্ডিত হইয়াছে, সে তাহার প্রণয়াস্পদের সাক্ষাৎলাভ করিয়া ও তাহার নিকট সম্পূর্ণ আত্মনিবেদন করিয়া প্রেমের প্রতি অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করিয়াছে। শেষ পরিচ্ছেদে তাহাদের বিবাহিত জীবনের চিত্র কিন্তু অনিন্দিতার ধ‍্যানবিষ্ট, আত্মসমাহিত প্রণয়াভিসারের উপযুক্ত হয় নাই --- আনন্দ-পরিবেশনে স্বামীর সহযোগিতায় প্রণয়ের নিজস্ব আনন্দ-নিবিড়তা ফিকে হইয়া গিয়াছে। দেবপ্রিয়ের চরিত্রের এতটা গভীর আলোচনা নাই, তথাপি তাহার আনন্দপ্রচার-ব্রত তাহার ব‍্যক্তিত্বকে কতকটা বৈশিষ্ট‍্য দিয়াছে। গ্রন্থের অন‍্যান‍্য চরিত্র, অনিন্দিতার পারিবারিক আবেষ্টনের চিত্র প্রভৃতি লঘুবিরল রেখায় অঙ্কিত হইয়াছে।
     'বন‍্যা' উপন‍্যাসটি একটি সামাজিক অসংগতির উপর প্রতিষ্ঠিত। সুপর্ণা ও সুবর্ণার মাতা তাহার পিতা প্রতুলচন্দ্রের সম্পূর্ণ অজ্ঞাতসারে ও তাঁহার সুস্পষ্ট ইচ্ছার বিরুদ্ধ এক ক্রূরপ্রকৃতি পরিবারে তাহার বিবাহ দিয়াছিল। এই বিবাহের ফল মোটেই শুভ হয় নাই --- শেষ পর্যন্ত মৃত‍্যুশয‍্যাশায়িনী মাতাকে দেখিতে আসার অপরাধে শ্বশুরবাড়ির দ্বার তাহার নিকট চিররুদ্ধ হইয়া গিয়াছে।
     সুপর্ণার লজ্জাকুণ্ঠিত, অশিক্ষিত গ্রাম‍্যবধূ হইতে স্বাধীন, আত্মনির্ভরশীল মহিলাতে পরিবর্তনই উপন‍্যাসটির প্রধান বিষয়। এই পরিবর্তনের চিত্র খুব সাধারণ, ইহার মধ‍্যে কোনও গভীর মনস্তত্ত্বমূলক আলোচনা খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। সুদর্শনের প্রণয়-নিবেদনে সুপর্ণার তুমুল অন্তর্দ্বন্দ্বের ছাপ তাহার মন অপেক্ষা দেহকে অধিক চিহ্নিত করিয়াছে বলিয়া মনে হয়। সাধারণ hysteria- গ্রস্ত, স্নায়বিক উত্তেজনাপ্রবণ স্ত্রীলোক এরূপ অবস্থায় যাহা করে, সে ঠিক তাহাই করিয়াছে; তাহার শিক্ষা-দীক্ষা, তাহার স্বাধীনতালাভের প্রয়াস যে তাহার বিশেষ কোনো সাহায‍্য করিয়াছে তাহা বোঝা যায় না। শ্রীবিলাসের চরিত্রও বেশ সুচিত্রিত হইয়াছে তবে তাহার মধ‍্যে কোনও redeeming feature-এর আভাস মাত্র নাই। তাহার কথাবার্তার মধ‍্যে কোথাও এতটুকু আবেগের কম্পন বা আত্মগ্লানির আন্তরিকতা নাই---যখন সে সুপর্ণাকে প্রসন্ন করিতে প্রাণপণ চেষ্টা করিয়াছে, তখনও তাহার সমস্ত অনুরোধ-উপরোধের মধ‍্য দিয়া শুষ্ক-নীরস স্নেহহীনতার কর্কশ কণ্ঠ আত্মগোপন করিতে পারে নাই। সুপর্ণা তাহার মুঠোর মধ‍্যে আসা মাত্রই সে তৎক্ষণাৎ সমস্ত ভদ্রতা-সুরুচির বাহ‍্যাবরণ বিসর্জন দিয়াছে ----তীব্র শ্লেষ ও ইতর প্রভুত্বপ্রিয়তা তাহার কথায় ও ব‍্যবহারে অসংকোচে আত্মপ্রকাশ করিয়াছে। শ্রীবিলাসকে কতকটা হীন বর্ণে চিত্রিত করিয়া লেখিকা তত্ত্বালোচনার নিকট human interest -এর বলি দিয়াছেন। শ্রীবিলাসের ইতর ও পাশবিক ব‍্যবহারের জন‍্য তাহার দিকে সুপর্ণার মন অনুমাত্রও আকৃষ্ট হইতে পারে নাই---তাহার ও সুদর্শনের মধ‍্যে কোনও প্রতিদ্বন্দ্বিতা সম্ভব হয় নাই। যদি সে যথার্থ অনুতপ্ত হইত, পূর্ব অপরাধের প্রায়শ্চিত্তের জন‍্য সত‍্যসত‍্যই ব‍্যাকুল হইত, তাহা হইলে সুপর্ণার জীবন-সমস‍্যা ঘনীভূত হইত ও উপন‍্যাসের রস জমাট বাঁধিত। কিন্তু লেখিকা সেই কঠোরতর পরীক্ষার সম্মুখীন হন নাই। শ্রীবিলাস, সুদর্শন ও সুপর্ণার প্রণয়ের পথে কেবল একটা বহির্জগতের আকস্মিক বাধা মাত্র ---যখন বন‍্যার জলে তাহাকে ভাসাইয়া লইয়া গিয়াছে, তখন সকলেই একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলিয়াছে। কাহারও স্মৃতির উপর সে ক্ষীণমাত্র ছায়াও ফেলে নাই, প্রেমিক মনের অন্ধকারতম কোণেও তাহার অশরীরী ছায়ামূর্তি উঁকি-ঝুঁকি মারে নাই। শ্রীবিলাসের মতো স্বামী রূপকথার রাক্ষস-দৈত‍্যেরই আধুনিক সংস্করণ মাত্র।

( ১৩ )

'রজনীগন্ধা' ( ফাল্গুন, ১৩২৮) লেখিকার সর্বশ্রেষ্ঠ উপন‍্যাস। স্ত্রীজাতির পক্ষ হইতে, তাহাদের অন্তর্দৃষ্টির বৈশিষ্ট‍্য প্রতিফলিত করিবার জন‍্য, উপন‍্যাস লিখিলে কীরূপ নূতন আর্টের সৃষ্টি হইতে পারে, 'রজনীগন্ধা' তাহার একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত। ক্ষণিকাদের পরিবার ও গৃহস্থালির ব‍্যবস্থার যে চিত্র দেওয়া হইয়াছে তাহা অতি সুন্দর ও স্ত্রীজাতিসুলভ সূক্ষ্মদৃষ্টির পরিচয় প্রদান করে। ক্ষণিকা, মেনকা, লালু তিনটি ভাই-ভগিনীর চরিত্র-বৈশিষ্ট‍্য অতি চমৎকারভাবে অঙ্কিত হইয়াছে। পরিবারের পুরুষ-কর্তৃত্ব নিতান্ত ক্ষীণ ও অস্পষ্ট রেখায় চিহ্নিত হইয়াছে --- ক্ষণিকার বাবা চিররুগ্ন ও অকর্মণ‍্য, তাহার দাদা প্রবোধ স্বার্থপর ও কর্তব‍্যজ্ঞানহীন। নারীর হাতে চিত্রতুলিকা থাকিলে পুরুষের ভাগ‍্যে এইরূপ বিরল বর্ণবিন‍্যাস খুব স্বাভাবিক। ক্ষণিকার ভাগ‍্যবিড়ম্বিত জীবন কৈশোর হইতেই সংসারের গুরুভারে অভিভূত---বোর্ডিং-এ সঙ্গিনীদের আমোদ-প্রমোদ ও চটুল হাস‍্যপরিহাস তাহার মনে কোনো তারুণ‍্যের হিল্লোল জাগাইতে পারে নাই। একজন তরুণী শিক্ষয়িত্রী মনোজার অর্থসাহায‍্যে তাহার শিক্ষা চলিতেছে --- তাহার অভিমান-প্রবণতা ও সংকুচিত ভাব যেন ভাগ‍্যদেবীর কৃপণতার বিরুদ্ধে তাহার ক্ষুব্ধ অভিযোগ। ইতিমধ‍্যে পিতার গুরুতর অসুখে শিক্ষার উচ্চাভিলাষ বিসর্জন দিয়া তাহাকে চাকরি খুঁজিতে হইয়াছে ও স্বভাবভোলা, উদাসীনচিত্ত অধ‍্যাপক অনাদিনাথের গৃহে তাহার গৃহস্থালির অভিভাবকরূপে চাকরি মিলিয়াছে। এই চাকরিই তাহার চিরবঞ্চিত জীবনে অপ্রত‍্যাশিতভাবে প্রণয়-দেবতার মুগ্ধ আবির্ভাব ঘটাইয়াছে। প্রথম দর্শনেই সে অনাদিনাথের প্রতি অনিবার্যভাবে আকৃষ্ট হইয়াছে। অনাদিনাথের একান্ত ঔদাসীন‍্য ও আত্মসমাহিত অনাসক্তি তাহার প্রণয়ের মাধুর্যের মধ‍্যে দুঃসহ বেদনার সঞ্চার করিয়াছে। তাহার এই ব‍্যর্থ প্রণয়-বেদনার গভীর আত্মজিজ্ঞাসা, ক্ষুব্ধ-করুণ দীর্ঘশ্বাস, ভাগ‍্যের বিরুদ্ধে ধূমায়িত বিদ্রোহ, এ সমস্তেরই যে বিবরণ দেওয়া হইয়াছে তাহা বাংলা উপন‍্যাস-সাহিত‍্যে অতুলনীয়। ক্ষণিকার এই অন্তস্তাপদুঃসহ প্রেম, শান্ত মৌনতার অন্তরালে অগ্নিস্ফুলিঙ্গবিক্ষেপী দাহ আমাদিগকে Charlotte Bronte -এর উপন‍্যাসে Rochester -এর প্রতি Jane Eyre -এর জ্বালাময় প্রণয়ের কথা স্মরণ করাইয়া দেয়। Jane Eyre-এর মতো ক্ষণিকার বহিঃসৌন্দর্যের কোনো আভাস নাই ---তাহারই মতো তাহার অতৃপ্ত বুভুক্ষা ও অসংকোচ অধিকার-প্রার্থনা। সাধারণত স্ত্রীজাতির যে লজ্জা-সংকোচ-শালীনতা তাহার প্রণয়-নিবেদনের কণ্ঠরোধ করে, ক্ষণিকা বা Jane Eyre-এর নিভৃত চিন্তায় তাহারা কোনোরূপ ছায়াপাত করে নাই; তাহাদের কামনার উলঙ্গ সত‍্য সূর্যালোকে শানিত তরবারির ন‍্যায় উদ্দীপ্ত হইয়া উঠিয়াছে। ব‍্যর্থতার সম্ভাবনা তাহার চিত্তকে শান্ত না করিয়া আরও অসংবরণীয়রূপে উতল করিয়া তুলিয়াছে। অনাদিনাথের সাধারণ সৌজন‍্য ও শিষ্টাচার, তাহার অতিরিক্ত পরিশ্রমের জন‍্য উদ্বেগ-প্রকাশ ও ক্ষমা-প্রার্থনা, তাহার বঞ্চিত জীবনে প্রেমের অভাব সম্বন্ধে বেদনা-বোধকে আরও তীব্রতর করিয়াছে। অনাদিনাথের ঔদাসীন‍্য বরং সহনীয়, কিন্তু তাঁহার মৌখিক ভদ্রতা, মনিব হিসাবে তাঁহার অনিন্দনীয় ব‍্যবহার অশ্রুপ্লাবনে তাহার ধৈর্যের বাঁধ ছুটাইতে চাহিয়াছে। গিরিডি-প্রবাসকালে শীতের এক নির্জন, নক্ষত্রালোকিত সন্ধ‍্যায় একত্র ভ্রমণ তাহার প্রণয়ের পাত্রকে কানায় কানায় পূর্ণ করিয়াছে; রহস‍্যলোকের অদৃশ‍্য প্রভাব যেন এই সান্ধ‍্যভ্রমণের অখাণ্ডিত অবসর, নিগূঢ় আত্মোপলব্ধি ও অতীন্দ্রিয় অনুভূতির নবজন্মস্পন্দনের ভিতর দিয়া, তাহার প্রেমকে বিশ্বজগতের নিঃশব্দ সুরপ্রবাহের সহিত মিলাইয়া দিয়াছে।
     কলিকাতায় ফিরিবার পর তাহার এই অশ্রান্ত অন্তর্দ্বন্দ্ব এত সাংঘাতিক আকার ধারণ করিয়াছে যে, মাতার অসুখের সুযোগ লইয়া সে রণক্ষেত্র হইতে দূরে সরিয়া আত্মরক্ষা করিয়াছে। ইতিমধ‍্যে অনাদিনাথের সহিত মনোজার বিবাহ-সংবাদ তাহাকে বজ্রাঘাতের মতো অভিভূত করিয়াছে। ব‍্যর্থ প্রেমের জ্বালাময় অনুভূতি তাহার পূর্বকৃতজ্ঞতাকে এমন কি চিরসংস্কারলব্ধ ধর্মজ্ঞানকে হঠাইয়াছে ---মনোজার পূর্বহিতৈষিতা ও সতীত্ব-ধর্মের সনাতন ধারণা তাহার ঈর্ষাকলুষিত মনোবিকারের প্রবলতার নিকট পরাজয় স্বীকার করিয়াছে। তাহার মানসিক অবস্থার এই স্তরের বিশ্লেষণ বাস্তবতার দিক দিয়া খুব চমৎকার হইয়াছে। বিশেষ চেষ্টা সত্ত্বেও সে মনোজার প্রতি তাহার মনোভাব সুস্থ ও স্বাভাবিক রাখিতে পারে নাই---মনোজার আনায়স-লব্ধ, অবহেলায় উপভুক্ত বিজয়-গৌরব নিজ লজ্জাকর পরাভবকে ধিক্কার দিয়াছে। শেষে মনোজা অসাধ‍্য-রোগাক্রান্ত হইলে তাঁহার অক্লান্ত সেবা-শুশ্রূষা দ্বারা সে পূর্বোপকারের ঋণ-পরিশোধের ছদ্মবেশে নিজ ব‍্যর্থ, অন্তর্দাহকারী প্রণয়াকাঙক্ষাকে বহিঃনিষ্ক্রমণের পথ দিয়াছে। তাহার এই চাতুরী মনোজার অন্তর্দৃষ্টির নিকট ধরা পড়িয়াছে --- একই প্রণয়াস্পদের প্রতি অনুরাগ দুইটি নারীর গোপন কথাটি পরস্পরের নিকট ব‍্যক্ত করিয়া দিয়াছে। মনোজার মৃত‍্যুর পর অনাদিনাথ দুঃসহ শোকের কুহেলিকাবৃত হইয়া ক্ষণিকার নিকট আরও দুরধিগম‍্য হইয়াছেন ---- স্বর্গগতা পত্নীর স্মৃতির মধ‍্যে তিনি এমন নিশ্চিহ্নভাবে মগ্ন হইয়াছেন যে, সমস্ত বাহ‍্যজগতের সহিত ক্ষণিকাও তাঁহার ধ‍্যানসমাহিত চক্ষুর সম্মুখে ছায়াবাজির ন‍্যায় বিলীন হইয়াছে। ভগ্নহৃদয়ে গৃহে ফিরিয়া ক্ষণিকা রোগের উত্তপ্ত ছায়াবাজির মধ‍্য দিয়া নিজ চিরনিরুদ্ধ বিদ্রোহের তপ্ত বাষ্প নিঃসরণ করিয়া দিয়াছে----চিরসহিষ্ণু তাহার মুখে অনভ‍্যস্ত বিদ্রোহবাণী তাহার মাতা ও পরিবারস্থ অন‍্যান‍্য সকলকে আশ্চর্যান্বিত করিয়াছে। শেষে একবার প্রত‍্যাখ‍্যানের পর সে তাহার আবাল‍্য সুহৃৎ ও চির-উপকারক চিন্ময়ের প্রেমনিবেদন স্বীকার করিয়া লইয়াছে। তাহার অন্তরের রহস‍্য মনোজা ও চিন্ময়ের নিকট অজ্ঞাত ছিল না ---উভয়েই প্রেমের স্বচ্ছ অনাবিল দৃষ্টিশক্তির বলে এই গোপন রহস‍্যের সন্ধান পাইয়াছিল। চিন্ময়ের নিকট ক্ষণিকা যাহা নিবেদন করিয়া দিল, তাহার মধ‍্যে প্রথম প্রেমের দুর্দমনীয় আবেগ ছিল না, আশাভঙ্গের তিক্ত স্বাদ তাহার মাধুর্যকে কতকটা নীরস করিয়াছিল; কিন্তু ইহার শান্ত, শীতল স্বচ্ছ প্রবাহ যে তাহাদের জীবনকে চিরসরস ও শ‍্যামল রাখিয়াছিল, তাহাতে সন্দেহের কোনো অবসর নাই। নারীর দিক হইতে প্রেমের তীব্র, অপ্রতিরোধনীয় প্রভাবের এরূপ বিবরণ বাংলা উপন‍্যাসে বিরল এবং ইহাই উপন‍্যাসটির গৌরবময় বিশেষত্ব।