Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা - ১৭৮, ১৭৯ ও ১৮০

2020-12-08

( ১৪ )

'উদ‍্যানলতা' উপন‍্যাসটি সীতা ও শান্ত দেবীর যুগ্ম রচনা ---- ইঁহাদের লিখনভঙ্গির অভিন্নতার চমৎকার সাক্ষ‍্য দেয়। ইহার মধ‍্যে কোন্ অংশ কাহার রচনা তাহা নিতান্ত সূক্ষ্ম আলোচনার দৃষ্টিতেও ধরা পড়ে না। ইঁহাদের বর্ণনাভঙ্গি, জীবন-সমালোচনার ধারা, চরিত্রসৃষ্টির বিশেষত্ব আশ্চর্যভাবে মিশিয়া গিয়াছে। উপন‍্যাসটির মধ‍্যে কিন্তু গভীরতার একান্ত অভাব। মুক্তির জীবনের যে বিস্তৃত, দিনলিপিমূলক কাহিনী দেওয়া হইয়াছে, তাহাতে তাহার উপরিভাগের ঔজ্জ্বল‍্য---লঘু, চটুঁল, হাস‍্যপরিহাস-চঞ্চল প্রবাহ, ঠাকুরমার সঙ্গে ক্ষুদ্র সংঘর্ষ ও পিতার অপরিমিত স্নেহাদরে অবাধ স্বাধীনতার আস্বাদ ---এই সমস্ত দিকই চমৎকার ফুটিয়াছে। জ‍্যোতি ও ধীরেনের সহিত সংস্পর্শ মুক্তির জীবনে যে অতি ক্ষীণ জটিলতার সৃষ্টি করিয়াছে, তাহাতে ইহার সাধারণ লঘুপ্রবাহ ক্ষুণ্ন হয় নাই। এই উভয় প্রণয়ীর বিরুদ্ধ আকর্ষণে তাহার চিত্ত যে সামান‍্য দোল খাইয়াছে তাহার মধ‍্যে কোনো আবেগগভীরতা নাই। মোট কথা, মুক্তির জীবনের লঘুচপল আবর্তন তাহার মনে কোনো গভীর পরিণতি মুদ্রিত করিয়া দেয় নাই---সে তাহার বোর্ডিং-জীবনের ক্ষুদ্র মান-অভিমান, ঈর্ষা-কলহ, সখিত্ব, প্রভৃতির সীমারেখা ছাড়াইয়া কখনোই জীবনের সমস‍্যাসংকুল পথে পদক্ষেপ করে নাই। সে চিরকিশোরী রহিয়া গিয়াছে। শিবেশ্বরের সংস্কারকত্ব অনাবশ‍্যকরূপে উৎকট আতিশয‍্যের পর্যায় উঠিয়াছে। মোক্ষদার চরিত্রে সহজ স্নেহপ্রবণতার সহিত অন্ধ গোঁড়ামির সংমিশ্রণ খুব ভালো ফোটে নাই; শিবেশ্বর ও মুক্তির সঙ্গে তাহার কোথাও একটা সহজ মিলনের ক্ষেত্র গড়িয়া উঠে নাই। মোট কথা, উপন‍্যাসটি সুখপাঠ‍্য হইলেও গভীরতার দিক দিয়া মোটেই সমৃদ্ধ নহে।
( ১৫ )

শান্তা দেবীর ছোটো-গল্পসমষ্টির মধ‍্যে 'ঊষসী', 'সিঁথির সিঁদূর' 'বধূবরণ' উল্লেখযোগ‍্য। ইহাদের মধ‍্যে কয়েকটি গল্প ভাব ও ভাষার দিক দিয়া উৎকর্ষলাভ করিয়াছে। 'সুনন্দা', 'সিঁথির সিঁদুর' ও 'আঁধারের যাত্রী'-এই তিনটি গল্পে কবিত্বপূর্ণ উচ্ছ্বাসেরই প্রাধান‍্য। 'সুনন্দা একটি পতিতার গর্ভজাতা কুমারীর নিষ্ফল প্রণয়ের উচ্ছ্বসিত খেদোক্তি; 'সিঁথির সিঁদূর' এক নবোঢ়া পত্নীর দাম্পত‍্য-সমস‍্যামূলক। স্বামীর সহিত পরিপূর্ণ মিলনে বাধা পাইয়া সে জানিতে পারিল যে, স্বামী তাহার রূপসী উপপত্নীকে সংসারের কেন্দ্রস্থলে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছে। এ ক্ষেত্রে মনে হয় যে, স্বামী সম্বন্ধে তাহার গভীর খোদোক্তি বা সুদীর্ঘ চিত্তবিশ্লেষণ একেবারেই অপ্রযুক্ত, কেননা এরূপ স্বামীর সম্বন্ধে যে স্ত্রী খেদ প্রকাশ করিতে পারে সে একেবারেই আত্মসম্মানবর্জিত ও পাঠকের সহানুভূতির অযোগ‍্য। 'আঁধারের যাত্রী' প্রেমাস্পদের দ্বারা প্রতারিত এক অন্ধ কিশোরীর সংসারের প্রতি অভিমান-প্রকাশ। কতকগুলি গল্পের প্রেরণা আসিয়াছে আমাদের সমাজ-ব‍্যবস্থার উৎকট বৈষম‍্য ও অসামঞ্জস‍্যের দিক হইতে। 'পৌষ-পার্বণ'- এ এক যুবতী বিধবার তাহার শিশু দেবরের প্রতি পুত্রবাৎসল‍্য ও ভালোবাসার অন্ধ অতিশয‍্যের কাহিনী বর্ণিত হইয়াছে---এই গল্পটি স্পষ্টত শরৎচন্দ্রের দ্বারা প্রভাবিত হইয়াছে, কিন্তু শরৎচন্দ্রের করুণ-রস-সৃজনের সিদ্ধহস্ততা ইহার মধ‍্যে নাই। 'পিতৃদায়' গল্পে অপরিমিত অর্থলোভ আমাদের সামাজিক জীবনের সর্বপ্রধান মাঙ্গল‍্য-কর্ম বিবাহের যে দারুণ জটিলতার সৃষ্টি করিয়াছে তাহারই আলোচনা আছে; কিন্তু এই অতি পুরাতন বিষয়ের আলোচনায় লেখিকা পুত্রবধূ অলকার চরিত্রের মধ‍্য দিয়া একটু নূতনত্বের অবতারণা করিয়াছেন। অলকার অতি কঠোর আত্মসম্মানবোধ ও অনমনীয় স্বাধীনতাস্পৃহা, তাহার প্রস্তরকঠিন দৃঢ়সংকল্প তাহার বাক‍্যে ও ব‍্যবহারে সুন্দররূপে প্রতিফলিত হইয়াছে। 'ময়ূর-পুচ্ছ' পল্লীগ্রামের অশিক্ষিত আবেষ্টনের মধ‍্যে শিক্ষিতা বধূর দূরবস্থার কাহিনী। ইহার বিষয়-বস্তু মামুলি ও আলোচনা বিশেষত্ববর্জিত। 'শিক্ষার পরীক্ষা'য় একটু হাস‍্য-রসের প্রবর্তন হইয়াছে তবে ইহা কেবল ঘটনামূলক, আলোচনামূলক নহে। 'বধূবরণ' সমষ্টিতে 'মানের দায়' ও 'রাজলক্ষ্মী' এই দুইটি গল্পে বৈবাহিক সম্পর্কের মধ‍্যে বংশগৌরব ও অর্থপ্রাচুর্যের তারতম‍্য লইয়া যে নিষ্ঠুর-করুণ অসামঞ্জস‍্য ও ঘাত-প্রতিঘাতের সৃষ্টি হয় তাহারই আলোচনা হইয়াছে। দ্বিতীয় গল্পে রাজলক্ষ্মীর পিতামহ ধরণীমোহনের চরিত্রে তাহার ঐশ্বর্যের জাঁকজমকের জুয়াখেলা গল্পটিকে আর্টের উচ্চস্তরে উন্নীত করিয়াছে। এই চরিত্র-গৌরবই সমস্ত বাহিরের বিপদজালকে আবাহন করিয়া আনিয়াছে, ও চারিদিকের দুঃখ-কুহেলিকার মধ‍্যে উন্নত গিরিশৃঙ্গের ন‍্যায় মাথা তুলিয়া দাঁড়াইয়াছে। দুইটি গল্পেরই পরিশেষ অনেকটা আকস্মিক ও অসমঞ্জস হইয়াছে। 'ফুটকী', 'ভুটকি' ও 'সৃষ্টিছাড়া' এই তিনটি গল্পে স্নেহ-প্রেম-ভালোবাসার তির্যক গতি, আাঁকা-বাঁকা গলিপথে সঞ্চরণ-প্রবণতার ইঙ্গিত দেওয়া হইয়াছে। 'ফুটকী' গল্পে মাণিক ও ফুটকীর সম্বন্ধে শরৎচন্দ্রের 'পরিণীতা' গল্পে শেখর ও ললিতার সম্পর্কের পুনরাবৃত্তি---তবে শরৎচন্দ্রের গল্পের করুণ, উচ্চসুরে বাঁধা মূর্ছনার পরিবর্তে এখানে একটা ছেলেমানুষি হাসির সরল ঝংকার শোনা যায়। 'ভুটকী' একটা সাঁওতাল মেয়ের নানারূপ বিচিত্র মনোভাবের মধ‍্যে মনিবের শিশুপুত্রের প্রতি ভালোবাসার প্রাধান‍্যের কাহিনী---গল্পটির রস কিন্তু মোটেই জমাট বাঁধে নাই, ঐক‍্যহীন বৈচিত‍্যের নানা প্রণালীর মধ‍্যে বহুধা বিভক্ত হইয়া অতি শীর্ণধারায় প্রবাহিত হইয়াছে। 'সৃষ্টিছাড়া' গল্পে কৃত্রিম জীবনযাত্রায় চিরাভ‍্যস্ত একটি তরুণী ও পাশের বাড়ির এক মধ‍্যবিত্ত গৃহস্থের অতি সংকীর্ণ, যন্ত্রবদ্ধ ব‍্যবস্থার মধ‍্যে বর্ধিত এক খেয়ালি, চঞ্চলপ্রকৃতি যুবক পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হইয়াছে। এই দুইজন যেন দুই বিভিন্ন কৃত্রিম ব‍্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হইয়া এই বিদ্রোহের উতলা বায়ুতে পরস্পরের নিকট আসিয়া পড়িয়াছে। তাহাদের পরস্পরের প্রতি যে আকর্ষণ তাহা সম্পূর্ণ অভাবাত্মক (negative) ও বিদ্রোহমূলক। তাহাদের মধ‍্যে ব‍্যক্তিগত পরিচয়ের একান্ত অভাব। 'মধুমালতী' গল্পে ভগিনী-স্নেহের একটি মৌলিক চিত্র পাওয়া যায় ---এই স্নেহের আতিশয‍্যই কিন্তু ভগিনীদের মনোমালিন‍্য ও বিচ্ছেদের হেতু হইয়াছে। 'পথহারা' গল্পটিতে করুণরস উচ্ছ্বসিত হইয়া পড়িয়াছে ---তীর্থপথযাত্রিণী, আত্মীয়সঙ্গচ‍্যুতা, চিরস্নেহবুভুক্ষিতা মন্দার জীবনে মৃত‍্যুশয‍্যায় পণয়-

দেবতার অতর্কিত আবির্ভাবের কাহিনীর করুণ বেদনা পাঠককে অভিভূত করে। কুম্ভমেলায় স্নানার্থী পুণ‍্যলোভোন্মত্ত জন-সমুদ্র, পথহারা আশ্রয়প্রার্থী নারীর প্রতি গার্হস্থ‍্য-জীবনের নিরাপদ বেষ্টনে সুরক্ষিতা সমজাতীয়াদের নির্মম ঔদাসীন‍্য ও কুৎসিৎ সন্দেহ, মন্দার প্রতি সোমনাথের করুণ সমবেদনার প্রণয়ে পরিণতি, সোমনাথের প্রণয় প্রস্তাবে মন্দার প্রথম বিরক্তিবোধ ও আত্মহত‍্যা-সংকল্প, তারপর এই প্রণয়নিবেদনের মাধুর্য ও পবিত্রতার নিকট ধীরে ধীরে আত্মসমর্পণ, হাসপাতালের মৃত‍্যু-শয‍্যায় তাহাদের বিবাহবাসর-রচনা, ইহলোকের পাথেয় ফুরাইবার মুহূর্তে পরজন্ম সম্বন্ধে ব‍্যাকুল আলোচনা ---এই সমস্তই অতি চমৎকারভাবে বর্ণিত হইয়াছে। 'রুদ্ধ গৃহ' গল্পটি রোমান্সের রহস‍্যময়, নিবিড় অনুভূতিতে পরিপূর্ণ। ভাষা ও ভাবের মন্থর ঐশ্বর্যে ইহা রবীন্দ্রনাথের দার্জিলিং-এ ক‍্যালকাটা রোডের ধারে আসীনা-বদ্রাওন-নবাবপুত্রীর অপরূপ কাহিনিটি স্মরণ করাইয়া দেয়। বঞ্চিত প্রেমের করুণ প্রতারণার মায়াজাল সমস্ত গল্পটির আকাশ-বাতাসকে নিবিড়ভাবে আচ্ছন্ন করিয়া আছে। দীর্ঘদিনের ব‍্যর্থ প্রতীক্ষায় অতিক্রান্তযৌবনা প্রণয়িনীকে মানস মূর্তির ধ‍্যানে তন্ময়, উদভ্রান্তচিত্ত প্রেমিক কাছে পাইয়া চিনিতে পারিল না। তাই অন্ধকারের মধ‍্যে আত্মগোপন করিয়া যামিনী অভিলাষের নিকট অভিসারিণী হইয়াছে; আলোকের প্রথম অরুণরেখার সঙ্গে সঙ্গেই সে বিদ‍্যুৎশিখার ন‍্যায় অন্তর্হিত হইয়াছে। যে প্রণয়-দেবতার মন্দিরে অভিলাষ পূজার সযত্নে-সংগৃহীত ঐশ্বর্যসম্ভার পুঞ্জীভূত করিয়াছে, তাহার অধিষ্ঠাত্রী দেবী সেই শূন‍্য সিংহাসনে একদিনের জন‍্যও ব‍্যাকুল চেষ্টাকে উপহাস করিয়া দিবালোকের সঙ্গে সঙ্গে শূন‍্যতায় মিলাইয়া গিয়াছে। অন্ধকারের মানস-সুন্দরী দিবালোকে লোল-চর্মা স্খলিতদশনা বৃদ্ধা দাসীতে পরিণত হইয়াছে। অথচ অভিলাষ প্রতিদিনই আশা করে যে, তাহার আবেশময় নিশিস্বপ্ন দিবালোকের মধ‍্যে মূর্তি পরিগ্রহ করিয়া তাহার সম্মুখে দাঁড়াইবে ---এই অশ্রান্ত আকুলতা তিল তিল করিয়া তাহার জীবনশক্তিকে ক্ষয় করিয়া তাহাকে মৃত‍্যুর দ্বারে আনিয়া দাঁড় করাইয়াছে। এই গল্পটি বাস্তব আবেষ্টনের মধ‍্যে রোমান্স-সৃষ্টির কুশলতায় অপূর্ব সৌন্দর্যমণ্ডিত হইয়াছে। সমস্ত ছোটো গল্পের মধ‍্যে চিত্ত-বিশ্লেষণ ও মনোবৃত্তির ঘাত-প্রতিঘাতের দিক দিয়া 'পরাজয়' গল্পটি সর্বশ্রেষ্ঠ। ইহাতে মহালক্ষ্মী ও রজনী---এই দুই বাল‍্যসখীর মধ‍্যে একপ্রকার বিশেষ ঈর্ষা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার সংঘর্ষ হইয়াছে। রূপসী মহালক্ষ্মীর মনে আশ্রিতা দরিদ্র-কন‍্যা রজনী সম্বন্ধে ঈর্ষা ও দর্পের মধ‍্যবর্তী একপ্রকার মিশ্র মনোবৃত্তি বিরাজ করিত। এই সদর্প আত্মগৌরব চরম সীমায় উঠিল যখন তাহার প্রত‍্যাখ‍্যাত প্রার্থী শিবসুন্দরের সহিত রজনীর বিবাহ হইল। রজনী তাহার পরিত‍্যক্ত উচ্ছিষ্ট পাইয়া পরম কৃতার্থ হইয়াছে এইরূপ একটা মনোভাব মহালক্ষ্মীকে আত্মপ্রসাদে স্ফীত করিয়া তুলিল। কিন্তু এইবার দর্পচূর্ণ হইয়া ঈর্ষানুভবের পালা আসিল। মহালক্ষ্মী বিবাহের অল্পদিন পরে বিধবা হইল; পক্ষান্তরে রজনীর স্বামি-সৌভাগ‍্য আদর্শস্থানীয় হইয়া উঠিল ও মহালক্ষ্মীকে চক্ষুঃশূলের ন‍্যায় বিধিতে লাগিল। শেষে আর সহ‍্য করিতে না পারিয়া সে রজনীকে অচিরবৈধব‍্যের অভিশাপ দিয়াছে; কিন্তু এই অভিশাপ ফলিয়া যাইবার পর সে আতঙ্কিতচিত্তে আবিষ্কার করিয়াছে যে, যে আঘাত সে তাহার বাল‍্য-সহচরীর বুকে হানিয়াছে তাহা স।স্রগুণ হইয়া ফিরিয়া তাহার বুকে বাজিয়াছে ---প্রতিদ্বন্দ্বিনীর স্বামী তাহার নিজেরই অবিস্মৃত দয়িত ছিল। মোটের উপর ভাষা ও ভাবের উৎকর্ষে সীতা দেবীর সহিত তুলনায় শান্তা দেবীর ছোটো গল্পগুলিকে শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া যাইতে পারে।
( ১৬ )

'জীবন-দোলা'----শৈশব হইতেই বিধবা এক নারীর, বিচিত্র ভাব-তরঙ্গের মধ‍্য দিয়া পূর্ণতাপ্রাপ্তির ইতিহাস। সমস‍্যামূলক উপন‍্যাসের সমস‍্যার প্রাধান‍্য যেমন ব‍্যক্তিগত জীবনকে অভিভূত করে, এখানেও সেইরূপ গৌরীর সমস‍্যা তাহার ব‍্যক্তিত্বকে অতিক্রম করিয়া মাথা তুলিয়াছে গৌরীর জীবন স্বাধীন, সাবলীল ভাবে স্ফূর্তি পায় নাই, ইহা তাহার কেন্দ্রগত সমস‍্যার চারিদিকে দানা বাঁধিয়াছে। আজকাল অধিকাংশ ইউরোপীয় উপন‍্যাস-সাহিত‍্য সমস‍্যামূলক; সেখানে সমালোচনার প্রয়োজনের নিকট অবাধ, স্বাধীন ব‍্যক্তিত্বস্ফূরণ, চিরন্তন মানব-প্রকৃতির অকুণ্ঠিত উন্মেষকে খর্ব করা হইয়াছে। ইহাদের মধ‍্যে ভাব অপেক্ষা বুদ্ধিগত আলোচনারই প্রাধান‍্য; তৎসত্ত্বেও ইহারা সাহিত‍্যিক উৎকর্ষ লাভ করিতে সমর্থ হইয়াছে। 'জীবন-দোলা' ও এই শ্রেণীর উপন‍্যাস এবং এই আদর্শ অনুসারে বিচার করিলে ইহা মধ‍্যম রকমের উৎকর্ষের দাবি করিতে পারে। এই উপন‍্যাসের প্রধান দোষ হইতেছে যে, এক গৌরী ছাড়া অন‍্যান‍্য চরিত্রের কোনো স্বতন্ত্র ব‍্যক্তিত্ব নাই; ইহারা কেবল গৌরীর চরিত্র বিকাশের উপায়স্বরূপ ব‍্যবহৃত হইয়াছে; গৌরীকে প্রভাবিত করা, বিচিত্র সংস্পর্শের ঘাত-প্রতিঘাতে তাহার সুপ্ত আশা-আকাঙক্ষাগুলিকে উদ্বোধিত করা ব‍্যতিরেকে তাহাদের জীবনের জন‍্য কোনো উদ্দেশ‍্য নাই। তাহার পিতা হরিকেশব, মাতা তরঙ্গিণী, ভাই শঙ্কর, তাহার সহকর্মী ও সম্ভাবিত প্রেমিকদ্বয় ---সঞ্জয় ও অপূর্ব ---সকলেরই জীবন যেন একটা উদ্দেশ‍্য-নিয়ন্ত্রিত যান্ত্রিকতার প্রতিচ্ছবি মাত্র। এমন কি তাহার প্রেমোন্মেষও একটা স্বতঃস্ফূর্ত, বেগবান-মনোবৃত্তি নয়, ইহা সমাজসেবার যন্ত্রবদ্ধ কর্তব‍্যের নীরস ক্লান্তি অপনোদনের জন‍্য একটা রসায়ন মাত্র। প্রেমের অফুরন্ত উৎস হইতে সমাজকর্তব‍্যপালনের জন‍্য গতিবেগ ও শক্তিসঞ্চার করাই যেন জীবনে প্রেমের আবাহনের উদ্দেশ‍্য। এই পরাধীন প্রেম জনহিতৈষণার সংকীর্ণ খাতে অতি শীর্ণ, সংকুচিতভাবে প্রবাহিত হইয়াছে, ঐরাবতকে ভাসাইবার দুর্জয়, কূলপ্লাবী শক্তি ইহার নাই। যে সঞ্চয় তাহার কর্তব‍্যভারক্লিষ্ট মনে প্রেমের বর্ণ-সমারোহ সঞ্চারিত করিয়াছে তাহার মধ‍্যেও ব‍্যক্তিত্বের কোনো স্পন্দন অনুভব করা যায় না। নিছক সমস‍্যার দিক দিয়াও আলোচনা যে খুব গভীর ও সম্পূর্ণ হইয়াছে তাহাও বলা যায় না। বিবাহের পরেই তাহাদের জীবন-নাট‍্যে যবনিকাপাত হইয়াছে, যেন বিবাহই তাহার জীবন-সমস‍্যার চরম সমাধান। বিবাহিত জীবনে তাহাদের সমাজ-সেবার আদর্শ কতদূর অক্ষুণ্ন থাকিলে, তাহাদের কর্মনিষ্ঠা কীরূপ

নূতন শক্তি ও প্রেরণা লাভ করিল তাহার কোনোই আলোচনা নাই। প্রেম যেখানে স্বাধীনভাবে কাম‍্য, সেখানে বিবাহে পরিসমাপ্তি স্বাভাবিক হইতে পারে; কিন্তু সে যেখানে কর্তব‍্যের অনুচর মাত্র সেখানে তাহার জয়গানকেই সমাপ্তি-সংগীতে পরিণত করা সমীচীন নহে।
     মোটের উপর গৌরীর জীবনেতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়গুলি সুন্দরভাবে চিত্রিত হইয়াছে। গৌরীর স্বপ্নময় কৈশোর-জীবনের চিত্র মনস্তত্ত্ববিশ্লেষণের দিক দিয়া অতি চমৎকার হইয়াছে। অন‍্যান‍্য বালিকারা এই কৈশোরের সহিত প্রায় সম্পূর্ণ অপরিচিত থাকে---তাহাদের বাল‍্য ও যৌবনের মধ‍্যে কোনো কল্পনাজড়িত, স্বপ্নবিহ্বল মধ‍্যবর্তী অবস্থা প্রসারিত থাকে না। তাহাদের জীবনে প্রেমের ফুল ফুটিবার আগেই বিবাহের বন্ধন ও মাতৃত্বের দায়িত্ব তাহার সুকোমল বৃন্তকে ভারাক্রান্ত করে। বস্তুতন্ত্রতার প্রচণ্ড অভিঘাত তাহাদের মদির স্বপ্ন-জড়িমাকে ছিন্নভিন্ন করিয়া টুটাইয়া দেয়। গৌরী এই নবার্জিত কল্পনাবিলাস লইয়া আর তাহার পুরাতন সংসারের সংকীর্ণ খাঁচাতে নিজেকে কুলাইতে পারে নাই, বৃহত্তর আশ্রয়ের জন‍্য চারিদিকে ব‍্যাকুল দৃষ্টিক্ষেপ করিয়াছে। বোর্ডিং হাউসের বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও জনসেবাব্রতের মধ‍্যে সে নবজন্ম লাভ করিয়াছে ও জীবনের উদ্দেশ‍্য ও প্রেমের পরম সার্থকতার সহিত তাহার পরিচয় ঘটিয়াছে। প্রেম তাহার জীবনে আবির্ভূত হইয়াছে নবোন্মেষিত চিন্তাশক্তির স্বল্পালোকিত, সংকীর্ণ পথ দিয়া, কোনো প্রবল, অনিবার্য অনুভূতির রাজপথ দিয়া নহে। তাহার কর্মজীবনের সহচরদের মধ‍্যে একজন, কেবল কর্মপ্রেরণার উত্তেজনার মধ‍্য দিয়াই, তাহার মধ‍্যে প্রেমের উদ্ধোধন করিয়াছে। কিন্তু এই প্রেম নিতান্ত ক্ষীণ ও রক্তহীন বলিয়াই মনে হয়।
( ১৭ )

শান্তা দেবীর সর্বশ্রেষ্ঠ উপন‍্যাস 'চিরনতনী' সীতা দেবীর 'রজনীগন্ধা'র সহিত আশ্চর্যরূপ সাদৃশ‍্যবিশিষ্ট। উভয়েরই নায়িকা, তাহাদের জীবনের সমস‍্যা ও অভিজ্ঞতা, ও তাহাদের পরিবার-প্রতিবেশ প্রায় অভিন্ন। করুণা ও ক্ষণিকার জীবন প্রায় পরস্পরের প্রতিচ্ছবি বলিলেও চলে। ক্ষণিকার ন‍্যায় করুণার পরিবারও কনিষ্ঠ ভ্রাতা, ভগিনী ও একজন উদাসীন অভিভাবক-স্থানীয় ব‍্যক্তি লইয়া গঠিত। মেনকা ও লালু, অরুণা ও রেণুতে যেন তাহাদের দ্বিতীয় সত্তার সন্ধান পাইয়াছে। কনিষ্ঠ ভ্রাতা-ভগিনীর দায়িত্বজ্ঞানহীন কৈশোর-চাপল‍্য ও আমোদপ্রিয়তার সহিত তুলনায় ক্ষণিকা ও করুণার অকাল-গাম্ভীর্য ও অবসরহীন, অনলস কর্মপরায়ণতা আরও পরিস্ফুট হইয়াছে। তবে মোটের উপর করুণার জীবনে ভাগ‍্যদেবীর বিরূপতার মাত্রা অপেক্ষাকৃত কম। তাহার জীবনসমস‍্যার তীব্রতা তুলনায় মৃদুতর। ক্ষণিকার জীবনসংগ্রামের অসহনীয়তা অপ্রাপণীয় প্রেম বহুগুণে বাড়াইয়া দিয়াছে। করুণার জীবন অবাঞ্ছিত প্রেমের অভিভব হইতে আত্মরক্ষার একটা সুচিরব‍্যাপী চেষ্টা; ক্ষণিকার জীবন অলভ‍্য প্রেমের দিকে ক্ষুব্ধ-ব‍্যাকুল, নিষ্ফল কর-প্রসারণ। ক্ষণিকার হৃদয়ে অতৃপ্ত কামনার হাহাকার যে বিদ্রোহের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছাড়াইয়াছে, করুণার জীবনে তাহা গলিয়া অশ্রুর আকারে ঝরিয়াছে, অন্তর্গূঢ় নীরব বেদনায় রূপান্তরিত হইয়াছে। ক্ষণিকার প্রেম উগ্র বহ্নিশিখার ন‍্যায় সমস্ত বাধা-সংকোচ ভস্মসাৎ করিতে ছুটিয়াছে--কৃতজ্ঞতাবোধ, ধর্মের অনুশাসন তাহার মনকে সংযমের বন্ধনে বাঁধিতে পারে নাই। করুণা প্রথমত অবিনাশের অনুল্লঙ্ঘনীয় আদেশের ন‍্যায় প্রচণ্ড প্রেমনিবেদনের স্পর্শ হইতে সংকুচিত হইয়া আপনাকে সরাইয়া লইয়াছে। কিন্তু শান্তির আশা ও ঋণশোধের পবিত্র কর্তব‍্য উভয়েই একযোগে তাহাকে অবিনাশের নির্ভরযোগ‍্য, নিশ্চিন্ত আশ্রয়ের দিকে আকর্ষণ করিয়াছে। প্রেম অবশ‍্য সাংসারিকতার দিক হইতে অনিন্দনীয় এই ব‍্যবস্থায় রাজি হয় নাই, কিন্তু প্রেমের এই ভীরু অসম্মতিকে প্রাধান‍্য দেওয়ার মতো অবস্থা করুণার ছিল না। তাই অবিনাশের প্রস্তাবকে প্রকাশ‍্যভাবে প্রত‍্যাখ‍্যান না করিয়া সে নিজের মনের সঙ্গে বোঝাপড়া করিবার জন‍্য অবিনাশের উগ্র, অসহিষ্ণু সান্নিধ‍্য হইতে দূরে সরিয়া আসিয়া পল্লীজীবনের নিভৃত অন্তরালে আত্মগোপন করিয়াছে।
     এই পল্লীজীবনের সহিত পরিচয় তাহার প্রত‍্যক্ষভাবে না থাকিলেও শতদলের মুগ্ধ বর্ণনার মধ‍্য দিয়া তাহার কল্পনাশক্তির সহিত ইহার একটা নিবিড়, ঘনিষ্ঠ যোগ ছিল। আবার এই পল্লীশ্রীর কেন্দ্রস্থলে অধিষ্ঠিত থাকিয়া ইহার শান্ত জীবনযাত্রায় যে প্রাণস্পন্দনের সংযোগ করিয়াছিল, সেই ব‍্যক্তির সম্বন্ধে তাহার মনের একটা স্বাভাবিক উন্মুখতা ছিল। করুণার হৃদয়ের উপর সুপ্রকাশ যে এত সহজে নিজ প্রভাব বিস্তার করিতে পারিয়াছিল তাহার কারণ এই যে, সে করুণার কল্পনানেত্রের সন্মুখে পল্লী-সৌন্দর্যের জীবন্ত প্রতিমূর্তি, প্রতীকরূপে বহুদিন ধরিয়া জাজ্বল‍্যমান ছিল --- সুতরাং যখন নিতান্ত অপ্রত‍্যাশিতভাবে পল্লীপ্রবাসের সঙ্গে সঙ্গেই তাহার দর্শন মিলিল, তখন করুণা তাহার চিত্তের ব‍্যাকুল আবেগ দিয়া উভয়কেই হৃদয়ে বরণ করিয়া লইল। তারপর সহজ আলাপ ও সৌজন‍্যের মধ‍্য দিয়া তাহাদের পরিচয় অগ্রসর হইতে একেবারে নিবিড় প্রেমের পর্যায়ে পৌঁছিল। করুণা ও সুপ্রকাশের প্রণয়-কাহিনীটি কবিত্বময় অনুভূতি, সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ, বহিঃপ্রকৃতির সহিত অন্তরঙ্গ যোগ ও একপ্রকার মুগ্ধ, আত্মবিস্তৃত তন্ময়তার জন‍্য উপন‍্যাস-সাহিত‍্যের একটা স্থায়ী সম্পদরূপে পরিগণিত হইবার যোগ‍্য।
     করুণার মন যদিও অধিকাংশ সময় আকাশকুসুমের গন্ধে সুরভিত ও কল্পলোকের বাতাসে হিল্লোলিত হইয়াছে, তথাপি তাহার চরিত্রে বাস্তব উপাদানের অভাব নাই। তাহার মনোবীণা রোমান্সের নায়িকার মতো একটা অস্বাভাবিক আদর্শের উঁচু সুরে বাঁধা নাই। তাই অবিনাশের প্রেমকে সে সরাসরি প্রত‍্যাখ‍্যান করিতে পারে নাই। অবিনাশে পরুষ, প্রভুত্বসূচক প্রেমনিবেদন তাহাকে প্রচণ্ড দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ‍্যে ফেলিয়াছে ---এই দ্বন্দ্বের মীমাংসার জন‍্য সে শতদলের উপেদশপ্রার্থী হইয়াছে। শতদলের সংস্পর্শে তাহার জীবনে এক নূতন প্রভাব প্রবেশ লাভ করিয়াছে। শতদলের নিজের অতীতসুখস্মৃতিবিভোর, শান্ত, করুণ সহিষ্ণুতা তাহার জ্বালাময় বিদ্রোহোন্মুখতাকে