Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা - ১৮১, ১৮২ ও ১৮৩

2020-12-15
1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12
অনেকটা প্রশমিত করিয়াছে। উপরন্তু পল্লীশ্রীর স্নিগ্ধ শ‍্যামলতা তাহার হৃদয়ক্ষতের উপর শীতল প্রলেপ বিছাইয়া দিয়াছে। এই কল্পনায় উদ্ভাসিত, বিচিত্রসুখদুঃখমণ্ডিত পল্লীজীবনের কুসুমাস্তীর্ণ পথ দিয়াই তাহার হৃদয়ে প্রকৃত প্রেমের আবির্ভাব হইয়াছে। রাজগঞ্জের প'ড়োবাড়ির মধ‍্যে তাহার পূর্ব বন্ধন তাহার অজ্ঞাতসারে জীর্ণ, শিথিল হইয়া খসিয়া গিয়াছে। এই নূতন আবেষ্টনের মধ‍্যে তাহার হৃদয়-মন্দিরে নূতন দেবতা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। সুপ্রকাশের সঙ্গে তাহার যে প্রণয়লীলা তাহাতে বক্তব‍্য অতি সংক্ষিপ্ত, কিন্তু আত্মবিহ্বল ভাবসম্পদের প্রসার অপরিমিত। তাহাদের অতি সাধারণ কথাবার্তার রন্ধ্রপথগুলি, বসন্তের আকাশ-বাতাস যেমন পুষ্পপরাগের দ্বারা সুরভিত হয়, সেইরূপ সূক্ষ্ম নিবিড়, মাধুর্যপূর্ণ অনুভূতির দ্বারা একান্তভাবে পরিব‍্যপ্ত হইয়াছে। তারপর তাহাদের বিচ্ছেদের কাহিনী, সুপ্রকাশের পক্ষে অশান্ত ভ্রাম‍্যমাণতা ও করুণার পক্ষে নীরব, ধ‍্যানমগ্ন নিশ্চলতা---এই উভয়বিধ প্রতিক্রিয়ার মধ‍্যে পর্যবসিত হইয়াছে। শেষে তাহাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হইয়াছে। প্রণয়ীর যে ডাকে করুণা সাড়া দিয়াছে, তাহা যেন স্বপ্নের কুহেলিকাজাল ভেদ করিয়া তাহার অন্তরের চিরনিরুদ্ধ কামনার অতর্কিত বহিঃপ্রকাশ।
     করুণার পরেই উল্লেখযোগ‍্য চরিত্র শতদল। শতদল নিজে খুব ক্রিয়াশীল নহে, কিন্তু অপরের উপর তাহার প্রভাব যথেষ্ট। তাহারই সাহচর্যে ও প্রভাবে করুণার জীবনধারা নূতন খাতে প্রবাহিত হইয়াছে। জীবনকে সমস্ত চঞ্চল, অশান্ত বিক্ষেপ হইতে সংযত করিয়া কীরূপে গভীরভাবে উপলব্ধি করিতে হয় একনিষ্ঠ অতন্দ্র সাধনায় কী করিয়া মগ্ন করিতে হয়, সে শিক্ষা সে শতদলের নিকট লাভ করিয়াছে। তারপর অবিনাশের চরিত্রটি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাহার রুক্ষ্ম, পরুষ আচরণ, তাহার স্পর্ধিত প্রণয়ভিক্ষা, তাহার উগ্র, অসহিষ্ণু প্রকৃতির অন্তরালে সুপ্রকাশের প্রতি স্নেহ-কোমল, ক্ষমা-স্নিগ্ধ ব‍্যবহার মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণের দিক দিয়া খুব চমৎকার হইয়াছে। অরুণা 'রজনীগন্ধা'র মেনকা অপেক্ষা অধিকতর সহানুভূতিসম্পন্ন, ও দিদির প্রণয়ের ভাগ‍্যবিপর্যয় সে করুণ সমবেদনার সহিত লক্ষ‍্য করিয়াছে। পক্ষান্তরে রেণু অপেক্ষা লালু অধিকতর জীবন্ত হইয়াছে। এক সুপ্রকাশের চরিত্রই আশানুরূপ খোলে নাই। শতদলের সস্নেহ বর্ণনার মধ‍্য দিয়া সে প্রথম আমাদের কল্পনার নিকট উদ্ভাসিত হইয়াছে; কিন্তু তাহার সহিত চাক্ষুষ পরিচয় আমাদের পূর্বোদ্রিক্ত আশা পূর্ণ করিতে পারে নাই। শতদলের সহিত তাহার যে স্নেহ-মধুর সম্পর্কটি আমাদের মানস-নেত্রের সম্মুখে গড়িয়া উঠিয়াছিল, বাস্তব ব‍্যবহারে সে মাধুর্য প্রতিফলিত হয় নাই। প্রণয়-ব‍্যাপারেও করুণার সহিত তুলনায় তাহার অন্তর্বিক্ষোভ সেরূপ তীব্র ও মর্মস্পর্শী হয় নাই, সে অনেকটা ম্লান ও বর্ণহীন রহিয়া গিয়াছে। পুরুষের হাতে নায়িকার চিত্র যেমন অস্পষ্ট ও অগভীর হয়, বোধ হয় নারীর হাতে নায়ক-চরিত্রও ঠিক সেইরূপ দোষে দুষ্ট হইয়াছে। এই মন্তব‍্য 'রজনীগন্ধা'য় অনাদিনাথ ও 'চিরন্তনী'তে সুপ্রকাশ ---উভয়সম্বন্ধেই প্রযোজ‍্য। উভয়েই কতকটা কুহেলিকাবৃত রহিয়া গিয়াছে, তাহাদের জীবনের মর্মকথাটি যেন অপ্রকাশিত আছে। এই সামান‍্য ত্রুটি বাদ দিলে, 'চিরন্তনী উপন‍্যাস-জগতে খুব উচ্চ অঙ্গের উৎকর্ষ লাভে সমর্থ হইয়াছে --নারীর অবদানের বিশেষত্ব ইহার মধ‍্যে খুব চমৎকারভাবে প্রতিফলিত হইয়াছে।
     সীতা দেবী ও শান্তা দেবীর উপন‍্যাস-রচনা এখনও নিঃশেষিত হয় নাই। সীতা দেবীর 'মাতৃঋণ' ও 'জন্মস্বত্ব' এই দুইখানি উপন‍্যাস কিছুদিন পূর্বে শেষ হইয়াছে। কিন্তু মোটের উপর পূর্বে যে সমস্ত উপন‍্যাস আলোচিত হইয়াছে তাহাদের মধ‍্যেই তাঁহাদের রচনাবৈশিষ্ট‍্য সম‍্যকরূপে প্রতিফলিত হইয়াছে। পরবর্তী উপন‍্যাসে বিবাহ ও দাম্পত‍্য-সম্পর্কের জটিলতা লইয়া অনেক সূক্ষ্ম আলোচনা আছে, কিন্তু তথাপি 'রজনীগন্ধা' ও 'চিরন্তনী'র মধ‍্যে প্রেমবিহ্বল নারীচিত্তের বর্ণনা যে উৎকর্ষ লাভ করিয়াছে তাহার অনুরূপ কিছু দেখিতে পাই না। সুতরাং উপন‍্যাস-সাহিত‍্যের ইতিহাস-রচনার দিক দিয়া আলোচনার পরিধি-বৃদ্ধির বিশেষ প্রয়োজন আছে বলিয়া মনে হয় না।

একাদশ অধ‍্যায়
সাম্প্রতিক স্ত্রী-ঔপন‍্যাসিক
( ১ )

সাম্প্রতিক কালের উপন‍্যাসে স্ত্রী ও পুরুষ ঔপন‍্যাসিকদের মধ‍্যে দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক‍্য যে অনেকটা ক্ষীণ হইয়া আসিয়াছে ইহা পূর্বেই উল্লিখিত হইয়াছে। শিক্ষা-দীক্ষার অভিন্নতা, অবাধ সামাজিক মেলা-মেশার সুযোগ ও পূর্বতন জীবনযাত্রা পদ্ধতির রূপান্তর এই পরিণতিসাধনে সহায়তা করিয়াছে। বিশেষত বাস্তব অবস্থার প্রভাব, জীবনে অর্থনৈতিক উপাদানের গুরুত্ব, নারীর অধিকার-প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে কোমল বৃত্তির নিরোধ ও দৃঢ় আত্মনির্ভরশীলতার অনুশীলন, জীবনের প্রতি মোহনির্মুক্ত, রোমান্সবর্জিত দৃষ্টিভঙ্গির ব‍্যাপকতর প্রয়োগ আধুনিক উপন‍্যাসে নারীর দানকে বিশিষ্টচিহ্নাঙ্কিত হইবার পক্ষে অন্তরায়-স্বরূপ হইয়াছে। তথাপি বিষয় নির্বাচনে ও আলোচনা ভঙ্গিতে নারীর জীবন-পর্যালোচনায় কিছুটা স্বাতন্ত‍্য রহিয়া গিয়াছে। সম্প্রতি পরিবার-জীবনে যে নূতন-ধরনের সমস‍্যা দেখা দিয়াছে, পারিবারিক আদর্শবাদের ক্রমবিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে যে উগ্র ব‍্যক্তিস্বাতন্ত‍্যবোধ, ও পরিবারভুক্ত নর-নারীর মধ‍্যে দারুণ স্বার্থসংঘাত, ঈর্ষা-অসহযোগ ক্ষোভ-ঔদাসীন‍্য প্রভৃতি হেয় বৃত্তিগুলি অস্বস্তিজনকভাবে প্রকট হইয়া উঠিয়াছে নারীর উপন‍্যাসে তাহারই চিত্র প্রাধান‍্যলাভ করিয়াছে। যৌথ পরিবারের প্রেতাত্মা এখনও কোনো কোনো নারী-রচিত-উপন‍্যাসে নানা জটিলতার সৃষ্টি করিয়া ও নানারূপ অশান্তি-বিক্ষোভ ঘটাইয়া বাসা বাঁধিয়াছে। এখনও মাতৃকেন্দ্রিক, বহুগোষ্ঠীসমন্বিত পরিবারের অন্তর্দ্বন্দ্বক্লিষ্ট ও ভারসাম‍্যচ‍্যুত জীবনাভিনয়ের কাহিনী উপন‍্যাস হইতে সম্পূর্ণ অন্তর্হিত হয় নাই। এখনও ন' খুড়ী, মেজ বৌ, সেজ দাদা প্রভৃতি লুপ্তাবশেষ পরিবার-জীবনের নিদর্শনবাহী চরিত্রসমূহ পারিবারিক রঙ্গমঞ্চে কেহ-বা সদর্প, কেহ-বা কুণ্ঠিত পদক্ষেপে, আত্মপ্রতিষ্ঠার আস্ফালন ও আত্মবিলুপ্তি-নিষ্ক্রিয়তার মধ‍্যবর্তী নানা স্তর অধিকার করিয়া, ঘটনার জটিলতার উপর পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার জটিলতর জাল সংযোজনা করিয়া, আপন আপন সরব ও নীরব অংশ অভিনয় করিয়া যাইতেছে। কিন্তু ইহা ক্রমশ স্পষ্ট হইয়া উঠিতেছে যে, বাংলার জীবনযাত্রা হইতে একান্নবর্তী পরিবারের পুতুলনাচের খেলা চিরবিলুপ্তির পথেই অগ্রসর হইতেছে।
     এখন জীবন-রহস‍্য বহুকোষবিশিষ্ট যৌথ পরিবার হইতে সারিয়া গিয়া এককোষনির্মিত ক্ষুদ্রতর, আঁটসাঁট সংস্থার মধ‍্যেই আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্র রচনা করিতেছে। বর্তমানকালে শাশুড়ী-বৌ-এর মতবিরোধ বা জায়ে জায়ে মনোমালিন‍্য একটা গৌণ সংঘর্ষের পর্যায়েই পড়িয়াছে। এই সংঘর্ষে কোনো অভাবনীয়তার স্পর্শ নাই যাহা ঘটিবে তাহা সম্পূর্ণরূপে প্রত‍্যাশিত ও পূর্বনিয়ন্ত্রিত। ভ্রাতৃবিরোধের মামলার মতো ভ্রাতৃবিরোধের উপন‍্যাস-কাহিনীও গতানুগতিকতার বাঁধাধরা ছকে বিন‍্যস্ত হইয়াছে। শরৎচন্দ্রের পরে যৌথ বাঙালি পরিবার রসসাহিত‍্যের উপাদানের মর্যাদা হারাইয়া প্রায় আধা-সরকারি সমাজতত্ত্বালোচনার পরিমাণ বাড়াইয়াছে। এখন একই পরিবারের স্বামী-স্ত্রী বা মাতা-হইতেছে। বঙ্কিমচন্দ্র অবশ‍্য ভ্রাতৃবিরোধের সুলভ চিত্র আঁকেন নাই---তাঁহার 'রজনী'তে শচীন্দ্রনাথ কনিষ্ঠ সহোদর হইয়াও জ‍্যেষ্ঠের নিকট হইতে সমর্থনই পাইয়াছেন। তাঁহার নগেন্দ্রনাথ একক পরুষ; গোবিন্দলাল যৌথ পরিবারে লালিত হইয়াও তাঁহার অন্তরের সমস‍্যায় নিঃসঙ্গ ও পারিবারিক পার্বপ্রভাবমুক্ত। বঙ্কিমযুগে দাম্পত‍্য-কলহ এক পক্ষের অভিমান-প্রণোদিত স্থানত‍্যাগের দ্বারা সহনীয় ও ভাবের উচ্চলোকে অধিষ্ঠিত। বর্তমানকালে এই কলহ একত্রবাসের দ্বারা দৃঢ়ীকৃত ও নিরন্তর ঘাত-প্রতিঘাতে অসহনীয়রূপে ক্ষুব্ধ ও শ্বাসরোধী। প্রতিদিনকার ছোটো-খাটো ঘটনার পুঞ্জীভূত চাপে যে তিক্ত ও গ্লানিকর আবহাওয়ার সৃষ্টি হয়, তাহাই সাম্প্রতিক স্ত্রী-রচিত উপন‍্যাসের প্রধান উপজীব‍্য এবং এইখানেই বঙ্কিমের উদারতর, তুচ্ছতার মালিন‍্যমুক্ত, উন্নত আদর্শবাদের স্পর্শে গরিমামণ্ডিত ভাব-পরিবেশের সহিত উহার পার্থক‍্য।
     অতি-আধুনিক মহিলা-ঔপন‍্যাসিকদের রচনায় রোমান্সের রঙিন মোহ, ভাববিলাসের ক্ষণিক উচ্ছ্বাস বা অভিনব বিষয়ের ঘটনা-রোমাঞ্চ একেবারে অনুপস্থিত নহে। তাঁহারা মাঝে মধ‍্যে বাস্তব জটিলতার সমাধান খোঁজেন রোমান্সের আকস্মিক অবতারণায় অথবা সুলভ ভাবালুতার অতর্কিত উৎক্ষেপে। অতীত মনোভাব ও জীবনদর্শনের উত্তরাধিকার তাঁহারা সম্পূর্ণ বর্জন করিতে পারেন নাই। তাঁহাদের রমণীসুলভ কোমলতা বাস্তবের নির্মম, নিরাসক্ত মনোবিজ্ঞানের নিয়মজালে দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ জীবনবীক্ষণে ক্লান্ত হইয়া সময় সময় হৃদয়াবেগের হঠাৎ-প্লাবনে বৈজ্ঞানিক সমীক্ষাকে ভাসাইয়া দেয়। তাঁহাদের অনেক উপন‍্যাসের উপসংহার তাঁহার অনুসৃত রীতির

বিপরীতমুখী পরিণতির প্রমাণ দেয় ও আমাদিগকে যেন যুদ্ধপূর্ব-যুগের আদর্শশাসিত জীবনযাত্রার মধ‍্যে ফিরাইয়া লইয়া যায়। এই স্ব-বিরোধের মূল হয়তো আমাদের জীবনের মধ‍্যেই নিহিত আছে। আমাদের সমস্ত প্রথাবন্ধনমুক্ত, ভাবালুতাবর্জিত, সুস্থবিচারবুদ্ধি নিয়ন্ত্রিত জীবনবোধের মধ‍্যেই সদ‍্যোত‍্যক্ত আবেগমুগ্ধতা ও আদর্শানুসৃতির প্রভাব সুপ্ত আছে ও উপন‍্যাসের ভাবঘন সংকট মুহূর্তগুলিতে এই অস্বীকৃত প্রেরণাই অকস্মাৎ আত্মপ্রকাশ করে। তাই আমাদের স্ত্রী-ঔপন‍্যাসিকদের রচনায় প্রগতিশীলতার সহিত অতীতমুখীনতার, বাস্তবানুসরণের সহিত বস্তু-অতীত ভাবপ্রেরণার এক অদ্ভুত সমন্বয় দেখা যায়। যুগমনের বাস্তব চিত্রে ঐতিহ‍্যস্মৃতিপ্রসূত উদভ্রান্তি ও শূন‍্যতাবোধের দীর্ঘশ্বাস মুহুর্মুহু উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠে। আমাদের সমস্ত জীবন যে অস্থির ও বেগবান পরিবর্তনচক্রে পাক খাইয়া মরিতেছে তাহা যেন এক নূতন স্থিরতার বৃত্তে সংহত হইবার লক্ষণ দেখাইতেছে। অগ্রগতির উন্মত্ত বেগ যেন প্রত‍্যাশিত সিদ্ধি হইতে বঞ্চিত হইয়া, আশাভঙ্গের অদৃশ‍্য বাধায় প্রতিহত হইয়া, আত্মসমীক্ষার বিপরীত আকর্ষণের আবর্তচক্রে বিঘূর্ণিত হইয়াছে ও অর্জিত নূতন সম্পদ ও বর্জিত উত্তরাধিকারের হিসাব-নিকাশ মিলাইয়া একটা সামঞ্জস‍্য-প্রয়াসের দিকে ঝোঁক দিয়াছে। এই তরঙ্গরেখা স্ত্রীপুরুষ-নির্বিশেষে সমস্ত আধুনিক ঔপন‍্যাসিকেই লক্ষণীয়। তবে নারীজাতির অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল ও অন্তর্মুখী প্রকৃতির জন‍্য ইহা তাঁহাদের রচনাতেই অধিকতর পরিস্ফুট। উপন‍্যাস-সাহিত‍্য আজ এই পরিবর্তনের তরঙ্গশীর্ষে দাঁড়াইয়াই আপনার ভবিষ‍্যৎ গতিপথ-নির্ধারণে প্রতীক্ষমান।
( ২ )

আশালতা সিংহের উপন‍্যাস 'সমর্পণ' ও ছোটো গল্পের সমষ্টি 'অন্তর্য‍্যামী'র মধ‍্যে সাহিত‍্যিক স্থায়িত্বের উপাদান আছে। তাঁহার উপন‍্যাসের প্রধান গুণ ---একটা সূক্ষ্ম, সুকুমার অনুভূতি-প্রাধান‍্য। প্রকৃতির শান্ত, প্রাণহিল্লোলে ঈষৎ কম্পমান সৌন্দর্য তাঁহার উপন‍্যাসের চরিত্রদিগকে নিগূঢ়ভাবে প্রভাবিত করিয়াছে। আধুনিক যুগের অতি-বাস্তবতার নগ্ন বীভৎসতা তাঁহার সৌন্দর্য ও পরিমিতিবোধকে পীড়িত করিয়াছে, এবং এই সংযম ও সুরুচির দিক দিয়া তিনি বঙ্গসাহিত‍্যের এই নব পরিণতির বিরুদ্ধে নিজ প্রতিবাদ ঘোষণা করিয়াছেন। 'সমর্পণ' উপন‍্যাসে তাহার নায়িকা সুরমা এই প্রতিক্রিয়ার মুখপাত্র। তাহার স্বভাবসিদ্ধ সৌন্দর্যবোধ ও সুরুচিজ্ঞান সনাতন ও আধুনিক এই উভয়বিধ জীবনাদর্শনের আতিশয‍্যের বিরুদ্ধে নীরব দৃঢ়তার সহিত দাঁড়াইয়াছে। "একান্নবর্তী পরিবারের একান্ন খোঁপে" যে ঈর্ষা, বিদ্বেষ, পরনিন্দা, পরশ্রীকাতরতা পারাবতকূজনের ন‍্যায় অহর্নিশি মুখরিত হইয়া উঠে তাহা, আর অতি-আধুনিকার অশান্ত চিত্তবিক্ষেপ, স্বাধীনতার নামে স্বৈরাচার ও প্রেমের নামে ঐশ্বর্যতৃষ্ণা, এই উভয়ই তাহাকে তুল‍্যরূপে পীড়িত করিয়াছে। তাহার বাল‍্যজীবনের সংকুচিত, সর্ববিধ ইতরতার সংস্পর্শ-বিমুখ সৌকুমার্য, তাহার কৈশোরের আত্মসমাহিত, স্তব্ধ তন্ময়তা সুন্দরভাবে বর্ণিত হইয়াছে। কিন্তু বাস্তব-জীবনের রূঢ় কলকোলাহল ও বিক্ষোভের মধ‍্যে তাহার চরিত্রের সুক্ষ্ম, সুকুমার সৌন্দর্য যেন অনেকটা ম্লান ও নিষ্প্রভ হইয়া গিয়াছে। তাহার প্রথম প্রণয়ী হরলালকেও আধুনিক বাস্তবতায় খুব চিত্তাকর্ষক প্রতীক বলিয়া মনে করার কোনো কারণ নাই। সুরমার মতো মেয়ের চিত্ত জয় করিতে তাহার বিশেষ কোনো যোগ‍্যতা নাই। তাহার সহিত সুরমার কথোপকথন নিছক তার্কিকতায় পরিণয় হইয়াছে ---তাহাদের মধ‍্যে সম্পর্ক দুই বিরুদ্ধ মতের সংঘর্ষ মাত্র। হরলালের প্রত‍্যাখ‍্যানের পর সে যাহার নিকট আত্মসমর্পণ করিয়াছে, প্রেমিক হিসাবে তাহারও যে খুব একটা উচ্চ অঙ্গের উপযোগিতা আছে তাহা মনে হয় না। হরলালের অতিরিক্ত আগ্রহও যেমন, সুপ্রকাশের ঔদাসীন‍্য ও অনাগ্রহও তেমনি, ঠিক প্রেমিকের আদর্শের সঙ্গে মিলে না। সুপ্রকাশের সহিত বিবাহের মধ‍্যে এমন কোনো গভীর মিলন ও নিগূঢ় ভাববিনিময়ের পরিচয় নাই, যাহা সুরমার মতো এরূপ সূক্ষ্ম-সৌন্দর্যবোধবিশিষ্ট, সুকুমার-অনুভূতিশীল নারীর উপযুক্ত। মোট কথা, গ্রন্থের পরিসমাপ্তি ইহার পরিকল্পনার উপযোগী হয় নাই।
     'অন্তর্য‍্যামী' গল্পসমষ্টির মধ‍্যে 'রমা' গল্পটি বিষয়বস্তুর দিক দিয়া মৌলিকতার দাবি করিতে পারে। ইহাতে সস্নেহ অনুযোগের দ্বারা একটি কিশোরীর মনের উপর হইতে জড়বুদ্ধি ও কুশ্রীতার স্থূল যবনিকা সরিয়া গিয়া উহার মধ‍্যে সৌন্দর্যবোধ ও আত্মপ্রত‍্যয় কীরূপে ধীরে ধীরে সঞ্চারিত হইয়াছে তাহার চমৎকার বর্ণনা। অন‍্যান‍্য গল্পগুলির মধ‍্যে পরিকল্পনার মৌলিকতা ও সূক্ষ্মদর্শিতার পরিচয় থাকিলেও মোটের উপর তাহাদের অন্তর্নিহিত আখ‍্যায়িকা রসটি বেশ ভালো জমাট বাঁধে নাই।

     জ‍্যোতির্ময়ী দেবীর 'ছায়াপথ' উপন‍্যাসটি উল্লেখযোগ‍্য। ইহার বিষয় অসাধারণত্ব কিছু নাই---প্রথম প্রণয়ীর দ্বারা প্রত‍্যাখ‍্যাত নারীর পুরুষজাতির প্রতি বিমুখতা ও স্বাধীনতা-সংকল্পই ইহার আলোচ‍্য বিষয়। এই প্রত‍্যাখ‍্যানকারী প্রণয়ী অজিতের প্রেম সম্বন্ধে মৌলিক মতবাদ একেবারে শূন‍্যগর্ভ ভাববিলাস ---বাস্তব-জীবনের প্রথম অভিঘাতেই ইহার অসারতা বাহির হইয়া পড়িয়াছে। উপন‍্যাসের আসল সমস‍্যা হইল সুপ্রিয়ার বিবাহবিমুখ চিত্তে ধীরে ধীরে প্রণয়ের মোহসঞ্চার ---বিভাসের প্রতি তাহার আকর্ষণের কাহিনী। পুরুষের প্রতি সুপ্রিয়ার নিগূঢ় অভিমানে কোনো উদ্ধত বিদ্রোহ, জ্বালাময় চিত্তদাহ বা উচ্চকণ্ঠ স্বাতন্ত্র-ঘোষণা নাই, আছে একদিকে নীরব দৃঢ়সংকল্প ও কুণ্ঠিত অনাগ্রহ, অন‍্যদিকে নারীর অর্ধজড়, পুরুষের তীক্ষ্ণপ্রভাবে অভিভূত, রাহুগ্রস্ত জীবনের স্বাধীন স্ফুরণের সাধনা। তাহার ধূসর মনে প্রেমের শান্ত রশ্মিচ্ছটার বিকিরণ, ও ইহার অপরূপত্বের আবিষ্কার সুন্দরভাবে ও সূক্ষ্মদর্শিতার সহিত বর্ণিত হইয়াছে। এই উপন‍্যাসের একটা বিশেষত্ব এই যে, ইহাতে বিবাহের সঙ্গে সঙ্গেই সমস্ত সমস‍্যার অবসান হয় নাই---সুপ্রিয়ার স্বাতন্ত্রবাদ বিবাহোত্তর জীবনেও সংক্রামিত হইয়া দাম্পত‍্য-জীবনে একটা বিপরীতগামী আবর্তের সৃষ্টি করিয়াছে। অবশ‍্য এই জটিলতা বেশি দিন স্থায়ী হয় নাই। রজতোজ্জ্বল চন্দ্রকিরণ যেমন তাহার চতুষ্পার্শ্ববর্তী লঘুশুভ্র মেঘখণ্ডগুলির ধীরে ধীরে গলাইয়া আপনার মধ‍্যে সংহরণ