Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা - ৪৯, ৫০ ও ৫১

2020-06-20
বঙ্কিমের এই কালনিবা্চনের প্রধান হেতু এই যে, এই যুগে ইতিহাসের সহিত সাধারণ জীবনের সংযোগ ফুটাইয়া তোলা তাঁহার পক্ষে অধিক কষ্টসাধ্য ছিল না | 'দুগে্শনন্দিনী' বা 'মৃণালিনী'তে যে সুদূর অতীতের চিত্র তাঁহাকে আঁকিতে হইয়াছে, তাহাতে তথ্যের অতি ক্ষীণ সন্নিবেশ কল্পপনাসমৃদ্ধির দ্বারা পুরাইয়া লইতে হইয়াছে | কিন্তু 'চন্দ্রশেখর', 'আনন্দমঠ' বা 'দেবী চৌধুরাণী'তে তিনি যে সমাজচিত্র দিয়াছেন, তাহা প্রায় আধুনিক যুগের; সুতরাং তাহাদের মধ্যে তথ্যের অপেক্ষাকৃত ঘন সন্নিবেশ হইয়াছে ও সাধারণ জীবনের উপর ঐতিহাসিক প্রতিবেশের প্রভাব অনেকটা স্পষ্টভাবেই ফুটিয়া উঠিয়াছে | দ্বিতীয়ত, এই দুইখানি উপন্যাসেই রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতার রন্ধপথ দিয়াই আমাদের সাধারণ জীবনের উপর রোমান্সের অলৌকিকত্ব আসিয়া পড়িয়াছে | তৃতীয়ত, উভয় ক্ষেত্রেই বঙ্কিম এমন দুইটি ঐতিহাসিক আন্দোলনের সৃষ্টি করিয়াছেন যাহা সেই যুগের পক্ষে অভাবনীয় ছিল; 'আনন্দমঠ' -এর সত্যানন্দ ও 'দেবী চৌধুরাণী'র ভবানী পাঠক উভয়েই এমন এক বিরাট, আদশ্য দ্বারা অনুপ্রাণিত হইয়াছেন, যাহা সে যুগের সামগ্রী বলিয়া আমরা কোনো মতেই স্বীকার করিতে পারি না | যে দেশভক্তি ও রাজনৈতিক আদশ্য ইংরেজ রাজত্বে শতবষ্যব্যাপী সাধনার ফল, তাহা বঙ্কিম অনায়াসে মুসলমান শাসনের শেষ যুগের বিকাশ বলিয়া চালাইতে চেষ্টা করিয়াছেন; ইহার ফলে দুইখানি উপন্যাসই অল্পবিস্তর অবাস্তবতা-দুষ্ট হইয়া পড়িয়াছে | ইহাদের মধ্যে যে ঐতিহাসিক বিক্ষোভের, যে রাজনৈতিক আদশে্র বণ্যনা করা হইয়াছে, তাহার সহিত আমাদের প্রকৃত সমাজ-জীবনের কোনও যোগসূত্র দেখিতে পাই না | এই অবাস্তবতার ছায়া প্রায় সকল সমালোচকের চোখেই পড়িয়াছে: এই হানি হইয়াছে, এ সম্বন্ধে মতভেদ আছে | সুতরাং এই বিষয়েরই বিচার করিলে 'আনন্দমঠ' ও 'দেবী চৌধুরাণী'র উপন্যাস-হিসাবে উৎকষ্য স্থির করার সুবিধা হয় |
     সাধারণ জীবনের উপর রোমান্সের অলৌকিকত্ব আসিয়া পড়িয়াছে | তৃতীয়ত, উভয় ক্ষেত্রেই বঙ্কিম এমন দুইটি ঐতিহাসিক আন্দোলনের সৃষ্টি করিয়াছেন যাহা সেই যুগের পক্ষে অভাবনীয় ছিল; 'আনন্দমঠ' -এর সত্যানন্দ ও 'দেবী চৌধুরাণী'র ভবানী পাঠক উভয়েই এমন এক বিরাট, আদশ্য দ্বারা অনুপ্রাণিত হইয়াছেন, যাহা সে যুগের সামগ্রী বলিয়া আমরা কোনো মতেই স্বীকার করিতে পারি না | যে দেশভক্তি ও রাজনৈতিক আদশ্য ইংরেজ রাজত্বে শতবষ্যব্যাপী সাধনার ফল, তাহা বঙ্কিম অনায়াসে মুসলমান শাসনের শেষ যুগের বিকাশ বলিয়া চালাইতে চেষ্টা করিয়াছেন; ইহার ফলে দুইখানি উপন্যাসই অল্পবিস্তর অবাস্তবতা-দুষ্ট হইয়া পড়িয়াছে | ইহাদের মধ্যে যে ঐতিহাসিক বিক্ষোভের, যে রাজনৈতিক আদশে্র বণ্যনা করা হইয়াছে, তাহার সহিত আমাদের প্রকৃত সমাজ-জীবনের কোনও যোগসূত্র দেখিতে পাই না | এই অবাস্তবতার ছায়া প্রায় সকল সমালোচকের চোখেই পড়িয়াছে: এই হানি হইয়াছে, এ সম্বন্ধে মতভেদ আছে | সুতরাং এই বিষয়েরই বিচার করিলে 'আনন্দমঠ' ও 'দেবী চৌধুরাণী'র উপন্যাস-হিসাবে উৎকষ্য স্থির করার সুবিধা হয় |
     এই উপন্যাসের পাঠকের মনে যে সন্দেহ সবা্পেক্ষা প্রবল হইয়া দেখা দেয়, তাহা এই--সত্যানন্দ ও ভবানী পাঠক যেরূপ জ্বলন্ত দেশভক্তি, রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি ও প্রতিষ্ঠান-গঠন-কুশলতা দেখাইয়াছেন, তাহা সে যুগের কোনো বাঙালির পক্ষে সম্ভব ছিল কি না এবং কোনো ব্যক্তিবিশেষের এরূপ আশ্চয্য কল্পনা-প্রসার থাকিলেও তাহাকে একটা বাস্তব প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার শক্তি রাজনীতি-শিক্ষাহীন, দেশাত্মবোধবজি্ত বাঙালিজাতির ছিল কি না | বত্যমান অভিগ্যতার আলোকে এই সন্দেহ আরও জটিল হইয়া উঠিয়াছে; এই শত-ব্যবধান-খণ্ডিত, বিচ্ছিন্ন জাতিকে একতাবন্ধনে বাঁধা, একই আদশে্ অনুপ্রাণিত করা কত সুকঠিন, তাহার সাক্ষ্য আমাদের আজিকার রাজনৈতিক প্রচেষ্টার প্রতি পৃষ্ঠায় লিখিত হইতেছে | বঙ্কিমের যুগে এই দুরূহতা উপলব্ধ হইয়াছিল কি না সন্দেহ | প্রত্যক্ষ অভিগ্যতার প্রতিকূল সাক্ষ্য তখনও লিপিবদ্ধ হয় নাই; আদশ্য ও বাস্তব, কল্পনা ও কাযে্র মধ্যে যে প্রকাণ্ড ব্যবধান তাহার পরিমাপ লওয়া হয় নাই | তখন কল্পনার একটা প্রথম সতেজ স্ফূতি্, একটা অবাধ সাহস ছিল | সেই অবাধ কল্পনার বলে বঙ্কিম মুসলমান রাজত্বের ধ্বংসের সময়ে যে একটা বিরাট রাজনৈতিক আদশে্র চিত্র আঁকিয়াছেন, তাহার দুঃসাহস আমাদিগকে স্তম্ভিত করিয়া ফেলে | কিন্তু মনে হয় যে, বঙ্কিমের বিরুদ্ধে এই অবাস্তবতার অভিযোগ অন্তত কতক পরিমাণে অতিরঞ্জিত হইয়াছে | তাঁহার স্বপক্ষেও কতকগুলি কথা বলিবার আছে; অন্তত এই অবাস্তবতার মধ্যে কতকগুলি প্রকৃত ভাবের প্রেরণা ও বাস্তবসূত্র আছে | সম্পূণ্য বিচার করিবার পূবে্এই বাস্তব সূত্রগুলির পরিচয় লওয়া আমাদের উচিত |
     অরাজকতা বলিলে কী বুঝায়, আমাদের সাধারণ, প্রাত্যহিক জীবনের উপরে ইহার কীরূপ প্রভাব, উহা আমাদের মনের কোন্ গোপন, অপরীক্ষিত গুণগুলিকে টানিয়া বাহির করিবে, আমাদের যে চিন্তাধারা এখন শান্ত জীবন-যাত্রা-নিবা্হের চেষ্টাতেই ব্যাপৃত আছে তাহাকে কোন্ নূতন, অপরিচিত প্রণালীতে প্রবাহিত করিবে, তাহার কোনো স্পষ্ট ধারণা না করিতে পারিলে বঙ্কিমের বিরুদ্ধে অবাস্তবতার অভিযোগ আনা অসংগত | মুসলমান রাজত্ব-ধ্বংসের সময় কেবল অরাজকতা নহে, একটা বিরাট শূন্যতার যুগ | একটা পুরাতন সাম্রাজ্য ভাঙিয়া পড়িয়াছে, মুসলমান রাজকম্যচারিবৃন্দ কেন্দ্রশক্তির অধীনতা পরিত্যাগ করিয়া, তাহাদের হাতে যে রাজশক্তি ন্যস্ত ছিল তাহা স্বাথ্যসিদ্ধি ও দুব্যলের প্রতি অত্যাচারের কাজে অপব্যবহার করিতেছে | দেশের আকাশ-বাতাস একটা অবিশ্রান্ত কোলাহল ও কাতর আত্যনাদে মুখরিত হইয়া উঠিয়াছে; অথচ এই ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে কোথাও কোনো নূতন শক্তি গড়িয়া উঠার চিহ্নমাত্র দেখা যাইতেছে না | আবার ইহার উপর, এই ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়া ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের প্রলয়ঝটিকা বহিয়া গিয়াছে, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা যেটুকু বাকি রাখিয়াছিল, ইহা তাহাকে একেবারে নিঃশেষ করিয়াছে | অরাজকতার যুগেও মানুষের কতকগুলি প্রতিষ্ঠান অক্ষ্ন্ন থাকে; সামাজিক বন্ধন, পারিবারিক আকষ্যণ একতা-সূত্রে গাঁথিয়া রাখিতে চেষ্টা করে, তাহাকে সমস্ত বৃহত্তর সত্তা হইতে বাহির করিয়া একেবারে আত্মসব্যস্ব হইতে দেয় না | কিন্তু ছিয়াত্তরের মন্বন্তর বাংলাদেশের সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে চূণ্য করিয়া, মানুষকে সমাজ ও পরিবারের আশ্রয় হইতে টানিয়া বাহির করিয়া, তাহার সমস্ত বৃহত্তর ঐক্যের বন্ধন ছিন্ন করিয়া, তাহার বিচ্ছিন্ন-অণু-পরমাণুগুলিকে ধুলির সহিত মিশাইয়াছে, চারিদিকের বাতাসে উড়াইয়া দিয়াছে |
     এই সব্যব্যাপী ধ্বংসের সময়ে জীবনের যে সমস্ত আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত বিকাশ-সম্ভব, তাহাদিগকে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের আদশে্ বিচার করিলে ঠিক হইবে না | যখন পুরাতন সমস্ত বন্ধন ছিন্ন হইয়াছে, যখন দুভি্ক্ষদানবের তাড়নায় মানুষ চিরকালের সামাজিক ও পারিবারিক গণ্ডি হইতে বাহির হইয়া পড়িয়াছে, তখন যে তাহাদের মনে অভিনব ভাবের শিখা জ্বলিয়া উঠিবে, তাহারা যে নানাপ্রকার অভাবনীয় মিলনে সংঘবদ্ধ হইবে, ভাবিয়া দেখিলে তাহাতে খুব বেশি বিস্ময়ের কারণ নাই | যাঁহারা সমাজের সহজ নেতা, যাঁহাদের হাতে সমাজের বিচ্ছিন্ন শক্তির কিয়দংশ এখনও রহিয়া গিয়াছে, সেইরূপ ক্ষুদ্র জমিদার বা প্রভাবশালী ব্যক্তি যে এই সময়ে

সব্যব্যাপী অত্যাচার ও অরাজকতার স্রোত প্রতিরুদ্ধ করিতে উদযোগী হইবেন, তাহাও স্বাভাবিক; প্রথমত হয়তো তাঁহাদের চেষ্টা কেবল আত্মরক্ষাপ্রবৃত্তি হইতে উদ্ভূত হইবে; পরে ধীরে ধীরে যেমন তাঁহাদের শক্তি-সঞ্চয় হইবে, যেমন তাহারা বিরুদ্ধ শক্তির প্রকৃত বলনিণ্যয়ে সমথ্য হইবেন, তেমনি তাঁহাদের আশা ও আকাঙ্খার ক্রমশ উচ্চতর পযা্য়ে পৌছিবে | তাঁহারা দেশের উপরে নিজ আধিপত্য-বিস্তারে মনোযোগী হইবেন; বিশৃঙ্খল উপাদানগুলিকে আবার নিয়ন্ত্রিত করিয়া একটি নূতন রাজ্যস্থাপনের কল্পনা রহিয়া রহিয়া তাঁহাদের মনের মধ্যে বিদ্যুৎশিখার মতো খেলিয়া যাইবে | এই প্রণালীতেই প্রত্যেক রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার যুগে নূতন রাজ্য গড়িয়া উঠে; শিবজী হইতে প্রতাপাদিত্য, সীতারামের রাজ্যস্থাপনের এই একই প্রক্রিয়া | সুতরাং এই সব্যদেশ-সাধারণ প্রণালীর দ্বারা, আনন্দমঠের সন্তান-সম্প্রদায় কীভাবে গড়িয়া উঠিল, তাহার একরূপ সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় | কিন্তু তাহার পরেই যে বাধা মাথা তুলিয়া উঠে, তাহা দুরতিক্রমণীয় | সন্তান-সম্প্রদায়-গঠনের মূলে যে আশ্চয্য দেশপ্রীতি উন্নত আদশ্যবাদ, রাজনৈতিক দূরদশি্তা ও প্রলোভনজয়ী নিঃস্বাথ্যতার পরিচয় পাওয়া যায়, তাহা সেকালের কেন, একালের আদশ্যকেও অনেক দূর ছাড়াইয়া গিয়াছে | এইখানে 'আনন্দমঠ' উপন্যাসোচিত বাস্তবতাকে অতিক্রম করিয়া আদশ্যলোকের রাজ্যে উঠিয়াছে | তারপর সন্তান-সম্প্রদায়ের কায্যকলাপ, উদযোগ-আয়োজন, প্রভৃতি বণ্যনা করিতে গিয়াও বঙ্কিম বাস্তবতার ময়া্দা রক্ষা করিতে পারেন নাই | সন্তানদের আনন্দ-কাননের ভৌগোলিক অবস্থান সম্বন্ধে লেখক কোনো কথাই বলেন নাই; তাহার অনতিদূরে মুসলমান শক্তির আশ্রয়স্থলস্বরূপ যে 'নগরের' কথা উল্লিখিত হইয়াছে, তাহাও একটা নামধানহীন ছায়ার মতে অশরীরী হইয়াছে | নগরের এত নিকীটে একটা এত বড়ো বিরাট প্রতিষ্ঠান কী করিয়া গড়িয়া উঠিল, রাজ-শক্তির অগোচরে কীরূপে পুষ্টিলাভ ও শক্তি-সঞ্চয় করিল, ইতিহাসের দিক হইতে স্বাভাবিক এই সমস্ত প্রশ্নের কোনো সদুত্তর পাই না | একটা অসাধারণ আদশে্র জ্যোতিতে আমাদের চক্ষু ঝলসিয়া যায়; খুব নিকট হইতে সূক্ষ্মভাবে ইহাকে দেখিতে আমাদের প্রবৃত্তি হয় না |
     বঙ্কিম কিন্তু এই সন্তান-সম্প্রদায়ের সহিত আরও কতকগুলি বাস্তব সূত্র জড়াইয়া ত্রুটি কতকটা সারিয়া লইয়াছেন | কেন্দ্রস্থ সন্তান-সম্প্রদায় কী প্রকারে প্রতিষ্ঠিত হইল তাহার কোনও ব্যাখ্যা দেন নাই বটে, কিন্তু তাহাদের সহিত দুভি্ক্ষপীড়িত জনসাধারণের কীরূপে সম্মিলন হইল, কীরূপ সহজে এই বুভুক্ষদের দ্বারা তাহাদের দলপুষ্টি হইল, তাহা বেশ স্পষ্ট করিয়া দেখাইয়াছেন | যদি দীক্ষীত সন্তান-সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব স্বীকার করিয়া লওয়া যায়, তাহা হইলে অদীক্ষিত জনসাধারণ কী করিয়া আসিয়া তাহাদের সহিত মিলিল তাহা আমরা সহজেই বুঝিতে পারি | এই সমস্ত সাধারণ সৈনিকের যুদ্ধ-বিগ্রহ যে লুঠতরাজেরই নামান্তর, তাহারা যে নায়কদের আদশ্যবাদের বা গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয় নাই, কেবল লুঠের লোভে বা এতটা সুলভ আস্ফালন-প্রবৃত্তির চরিতাথ্যতার জন্যই সন্তানদের সহিত মিশিয়াছেন, ইহা বঙ্কিমের বিবরণ হইতে আমরা বুঝিতে পারি | বঙ্কিম এতটুকু পয্যন্ত বাস্তবতার মযা্দা রক্ষা করিয়াছেন | যখন কাপ্তেন টমাসের বিরুদ্ধে প্রথম ষুদ্ধজয়ের পর বিজয়ী সেনাপতিরা সত্যানন্দকে রাজধানী অধিকার ও বিজিত প্রদেশের শাসনের সুব্যবস্থা করিতে উপদেশ দিলেন, তখন ধীরানন্দ দেখাইলেন যে, রাজ্যজয়ের জন্য কোনো সৈনিক পাওয়া যাইবে না, সকলেই লুঠের জন্য বাহির হইয়া গিয়াছে, এবং এই লুঠই তাহাদের সন্তান-সম্প্রদায়ের সহিত যোগ দেওয়ার প্রধান উদ্দেশ্য | এই উপলক্ষে বঙ্কিম সন্তানদের প্রকৃত দুব্যলতার প্রতি ইঙ্গিত করিয়াছেন, কী অসার ভিত্তির উপরে সন্তান-ধম্যের আদশ্যবাদের সৌধ নিমি্ত হইয়াছে তাহার উপর একটা চকিতের জন্য আলোকপাত করিয়াছেন | এই সমস্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রায়ই অলক্ষিত ইঙ্গিতের দ্বারা লেখক বাস্তবতার দাবি রক্ষা করিতে ও প্রকৃত অবস্থার ধারণা দিতে একটা ক্ষণস্থায়ী চেষ্টা করিয়াছেন বলিয়া মনে হয় |
     এই কল্পনাপ্রসূত সৌন্দয্যলোকের পশ্চাতে, একস্থান নগ্ন বাস্তবতার কঙ্কাল তাহার গাঢ়-কৃষ্ণ, করাল ছায়াপাত করিয়া়ছে | উপন্যাসের প্রথম তিনটি পরিচ্ছেদে দুভি্ক্ষক্লিষ্ট মানবের যে দানবোচিত বিকাশ দেখিতে পাই, তাহাই সে যুগের আসল স্বরূপটি প্রকাশ করিতেছে | তাহার উপর কোনো কল্পনার বণো্চ্ছ্বাস, কোনো মহান আদশে্র জ্যোতি পড়িয়া তাহার সহজ বীভৎসতাটিকে আবৃত করিতে চেষ্টা করে নাই | বাস্তবতার দিক দিয়া এই কয়েকটি অধ্যায় উপন্যাসের অন্যান্য সমস্ত অংশ হইতে বিভিন্ন; এখানে বঙ্কিমের আখ্যায়িকা আশ্চয্য দ্রুত গতিতে ছুটিয়া চলিয়া গিয়াছে; ভাষার মধ্যে একটা অসাধারণ শুষ্ক, কঠোর ব্যঞ্জনা-শক্তি, একটা অব্যক্ত ভীতি-সঞ্চারের ক্ষমতা আসিয়া পড়িয়াছে | সন্তান-ধমে্র জ্যোতিম্যয় আদশ্যবাদের পশ্চাতে এই ভাষণ বাস্তব-জগতের ঈষৎ-প্রকাশ বঙ্কিমের শক্তির অন্য দিকেরও পরিচয় দান করে |
     সন্তান-ধম্যের প্রতিষ্ঠা ছাড়াও সন্তানদের কায্যকলাপ ও যুদ্ধ-বিগ্রহের মধ্যেও সন্দেহ ও অবিশ্বাসের কারণ আছে | শিক্ষাহীন, উপকরণহীন, সৈনাপত্য-বজি্ত কতকগুলি বাঙালি চাষার দল যে ইংরেজ-সেনাপতিচালিত দুইদল সিপাহিকে পরাজ্ত করিল, ইহা অনেকেই অশ্রদ্ধেয় মনে করেন | তাঁহাদের মতে ইহা কেবল একটা যুক্তিহীন স্বজাতিপ্রীতির উচ্ছ্বাস মাত্র; বাস্তব-জগতে আমাদের হীনতা---পরাজয়ের একটা সুলভ কলঙ্ক-ক্ষালন মাত্র | সময়ে সময়ে বঙ্কিমের ঘটনা-বিন্যাস এরূপ সন্দেহ হইতে মুক্ত নয় | শান্তিকে দিয়া তিনি দুইবার দুইজন ইংরেজ সৈনিকের পরাজয় ঘটাইয়াছেন; একবার শান্তি গুলি করিতে উদ্যত কাপ্তেন টমাসের নিকট হইতে বন্দুক কাড়িয়া লইয়াছে, আর একবার লিন্ডলেকে অশ্ব হইতে ফেলিয়া দিয়া ইংরেজদের গোপন অভিসন্ধি সত্যানন্দকে যথাসময়ে জানাইয়া তাহাদের উদ্দেশ্য ব্যথ্য করিয়াছে | এই দুইঁটি উদাহরণই কেবল একটা অযথা জাত্যভিমানপ্রসূত বলিয়া মনে হয়; ইহারা ইংরেজদিগকে বোকা বানাইয়া সন্তানদের বুদ্ধি ও কৌশলের শ্রেষ্ঠত্ব-প্রমাণের একটা নিতান্ত সুলভ উপায়স্বরূপই ব্যবহৃত হইয়াছে | তারপর আধুনিক যুদ্ধপ্রথায় শিক্ষিত ও আধুনিক যুদ্ধোপকরণসমন্বিত ইংরেজের বিরুদ্ধে শিক্ষা-দীক্ষাহীন সন্তান-সৈন্যকে জয়ী দেখাইয়া যে তিনি একটা প্রবল অবিশ্বাসের অবসর দিয়াছেন, তাহা স্থানে স্থানে তাঁহাকেও স্বীকার করিতে হইয়াছে | সময়ে সময়ে সত্যের অনুরোধে তাঁহাকে

কামান-বন্দুকের কাছে লাঠি-বল্লমধারী সন্তান-সৈন্যের পরাজয়ের কথা লিখিত হইয়াছে | তবে এখানেও বঙ্কিমের অপরাধ যত গুরুতর বলিয়া মনে হয়, বোধ হয় ইহা ঠিক ততটা নয় | তাঁহার প্রতি সন্দেহের মধ্যে আমাদের দাসসুলভ মনোবৃত্তি যেন অল্প উঁকি মারিতেছে | মনে করুন, সন্তানদের এই বিজয় যদি ইংরেজের বিরুদ্ধে না হইয়া মুসলমানদের বিরুদ্ধে হইত, তাহা হইলে বোধ হয় আমাদের অবিশ্বাসের মাত্রা এতদূর হইত না | বঙ্কিমের পক্ষে বলিবার প্রধান কথা এই যে, ঐ দুইঁটি দয়ই ঐতিহাসিক; ইংরেজ ঐতিহাসিকেরাই এই সন্নাসীদের এই দুইটি জয়ের কথা এবং দুইজন ইংরেজ সেনাপতির প্রাণনাশের কথা স্বীকার করিয়াছেন | তবে অবশ্য যুদ্ধের বিস্তৃত বণ্যনাগুলি--- আগ্নেয়াস্ত্রের বিরুদ্ধে সন্তান-সৈন্যের অবিচলিতভাবে দাঁড়ানো, ভবানন্দ-জীবানন্দের প্রশংসনীয় সৈনাপতত্য-কৌশল প্রভৃতি--সম্পূণ্য কাল্পনিক | কিন্তু তাহা হইলেও এই বিষয়ের সম্ভাবনীয়তার বিচার করিতে হইলে আমাদের তৎকালীন ইংরেজদের সম্বন্ধে দুই-একটি কথা মনে রাখিতে হইবে | অনতিকাল পূবে্ ইংরেজশাসনাধীন প্রায় দুই শতাব্দী বাস করার পর ইংরেজের বিরুদ্ধে সম্মুখ সংগ্রামে দাঁড়ানো যেমন কল্পনাশক্তিরও অগোচর হইয়া দাঁড়াইয়াছে, ইংরেজের সহিত প্রথম পরিচয়ের সময়ে অবশ্য তাহা হয় নাই | তখন ইংরেজ আধিপত্যের জন্য যুদ্ধ করিতেছিল, সান্রাজ্যস্থাপনের কল্পনা বোধ হয় তখনও তাহার মনে উদিত হয় নাই | তখনও দেশব্যাপী ইংরেজের সহিত খণ্ডযুদ্ধ করিতে একেবারে সংকুচিত ছিল না; আর ইতিহাসেই লিখিতেছে যে, একটা তুচ্ছ সন্ন্যাসীর দলও ইংরেজের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করিতে দ্বিধা করে নাই | সে সময়ে ইংরেজ জাতির অসাধারণ শৌয্য ও গৌরবময় ইতিহাস বাঙালির প্রায় সম্পূণ্যভাবে অগ্যাত ছিল | তখনও সে নেপোলিয়ন বা জামা্ন-বিজয়ীর যশোমুকুট পরিয়া আমাদের সম্মুখে আবিভূ্ত হয় নাই; তখনও তাহার নামের মহিমা আমাদের শারীরিক ও মানসিক তেজকে একেবারে অসাড় করিয়া দেয় নাই | মোট কথা এখন যাহা আমাদের কল্পনা করিতেও ভয় হয়, তখন তাহা কাযে্ পরিণত করার দুঃসাহসেরও অভাব ছিল না | সুতরাং এ বিষয়ে বঙ্কিমের অপরাধের গুরুত্ব অপেক্ষাকৃত কম বলিয়াই মনে হয়; এবং যদি এ সম্বন্ধে আমাদের অবিশ্বাস উপন্যাসের রসোপভোগে বাধা দেয়, তাহা হইলে তাহার সম্পূণ্য দোষ লেখকের নহে |
     'আনন্দমঠ' -এর বিরুদ্ধে যে প্রধান অভিযোগ---ইহার আখ্যান-বস্তুর সহিত বঙ্গের প্রকৃত জীবনের কোনো বাস্তব যোগ নাই--তাহার যৌক্তিকতা-সম্বন্ধেই এতক্ষণ আলোচনা হইল | এই অভিযোগের সাধারণ সত্যতা স্বীকার করিয়া, কোথায় কোথায় বাংলার বাস্তব-জীবনের সহিত উপন্যাসের যোগসূত্র আছে, তাহার আলোচনা করিতে চেষ্টা করা গিয়াছে | 'দেবী চৌধীরাণী'তেও এই অভিযোগের কারণ কতকটা বত্যমান আছে, কিন্তু 'আনন্দমঠ'-এর সহিত তুলনায় আমাদের অবিশ্বাসের হেতু অনেক কম | প্রথমত, ভবানী পাঠকের মধ্যে সত্যানন্দের ন্যায় একেবারে অবিমিশ্র আদশ্যবাদ নাই; একটা বিশাল রাজ্যস্থাপনের কল্পনা তাঁহার মনে সেরূপ বদ্ধমূল হয় নাই | তাঁহার মধ্যে দস্যু-দলপতির চিহ্ন অনেকটা স্ফুটতর; সন্নাসীর গৈরিক বসন বা সংস্কারকের আদশে্র জ্যোতি সেই চিহ্নকে একেবারে ঢাকিতে পারে নাই | সত্যানন্দের সহিত তুলনায় ভবানী পাঠকের উচ্চাভিলাষ অনেকটা সীমাবদ্ধ | সত্যানন্দের উদ্দেশ্য একটা নূতন ধম্যপ্রবত্যন, ও এই নবধমে্র ভিত্তির উপরে একটা নূতন রাজ্য-গঠন; ভবানীর উদ্দেশ্য একটি স্ত্রীলোকের চরিত্রগঠন দ্বারা তাহাকে দস্যুদলের নেত্রীপদের উপযুক্ত করিয়া তোলা | জনসাধারণের ভক্তি-উদ্রেক ও কল্পনাকে মুগ্ধ করিবার জন্য প্রত্যেক সংঘেরই এরূপ একটি রাজা বা রাণীর প্রয়োজন হয়; দেবী চৌধুরাণীর সৃষ্টি যেন একপ্রকার নূতন রকমের পৌত্তলিকতার প্রবত্যন | সত্যানন্দ-ভবানী পাঠকের মধ্যে আর একটা মৌলিক প্রভেদ আছে; সত্যানন্দ তাঁহার সমস্ত ধমা্বরণের মধ্যে প্রধানত একজন রাজনীতিগ্য--politician : ভবানী তাঁহার সমস্ত দস্যুতা ও পরহিতব্রতের মধ্যে বাস্তবিক একজন শিক্ষক, গীতোক্ত নিষ্কাম ধম্যকে বাস্তব-জীবনে ফুটাইয়া তোলার উদযোগী | 'আনন্দমঠ' -এ দেশপ্রীতিই মুখ্য বস্তু, ধম্য অপ্রধান; 'দেবী চৌধুরাণী'তে ধম্ই প্রধান, দেশসেবা বা অত্যাচারের প্রতিরোধ একটা নামমাত্র উদ্দেশ্য | সুতরাং 'দেবী চৌধুরাণী'তে বাস্তবতার অংশ 'আনন্দমঠ' অপেক্ষা অনেক বেশি; বাংলার বাস্তব-জীবনের আবেষ্টনের মধ্যে উপন্যাসের অসাধারণ ঘটনাগুলির প্রবেশ করাইতে আমাদের বিশেষ কষ্ট হয় না | 'আনন্দমঠ' -এ সত্যানন্দের গরীয়ান আদশ্যটি বাদ দিলে আর কিছুই থাকে না; 'দেবী চৌধুরাণী'তে প্রফুল্লের নিষ্কামধমে্ দীক্ষার অংশ একেবারে বাদ দিলেও উপন্যাসের বিশেষ অঙ্গহানি হয় না |
     এইবার 'আনন্দমঠ' ও 'দেবী চৌধুরাণী'র অন্যান্য দিক আলোচনা করা যাইতে পারে | 'আনন্দমঠ' সম্বন্ধে পূবে্ যাহা বলা হইয়াছে, তাহা হইতে সহজেই অনুমান হইবে যে, ইহা উপন্যাস অপেক্ষা বরং মহাকাব্যের লক্ষণান্বিত | বঙ্কিম এখানে কেবল উপন্যাসের বাহ্য আকৃতির ব্যবহার করিয়াছেন মাত্র; উপন্যাসের ছাঁচে তাঁহার উচ্ছ্বসিত দেশভক্তি, তাঁহার বিরাট রাজনৈতিক কল্পনাকে ঢালিয়াছেন | বাস্তবিক 'আনন্দমঠ'-এর উপন্যাসোচিত গুণ যে খুব বেশি আছে তাহা বলা যায় না | অতীতের চিত্র আঁকিবার ছলে বঙ্কিম ভবিষ্যতের দিকে অথ্যপূণ্য অঙ্গুলি-সংকেত করিয়াছেন | 'আনন্দমঠ' -এর চরিত্রগুলি সম্পূণ্য বাস্তব নহে, তাহাদের এক পদ বাস্তবলোকে ও অপর পদ আদশ্যলোকে স্থাপিত রহিয়াছে | বাস্তব ও রোমান্স ---এই উভয়রূপ উপাদানের সংমিশ্রণে তাহারা গঠিত | ডিকেন্সের কতকগুলি চরিত্রের মতো ইহারা একটা মধ্যলোকের অধিবাসী; আদশ্যলোকের কল্পনা বাঙালির নাম ধরিয়া, বাঙালির সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের মধ্যে মূতি্ পরিগ্রহ করিলে যতটুকু বাস্তবতার দাবি করিতে পারে, ইহারা ততটুকু বাস্তব | সত্যানন্দ, ভবানন্দ, জীবানন্দ---সকলেরই ব্যক্তিত্ব একটা কুহেলিকা-মণ্ডিত | ভবানন্দ ও জীবান্দের প্রলোভন, ব্রতভঙ্গ ও প্রায়শ্চিত্ত বাস্তব-জীবনের সংঘাতের মতো আমাদের মনের গভীর দেশে আঘাত করে না | বরং ভবানন্দের প্রলোভন ও আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব কতকটা অন্তদৃষ্টি ও ক্ষমতার সহিত চিত্তিত হইয়াছে কেননা এখানে অন্তত একপক্ষ---কল্যাণী---বাস্তব জগতের জীব | বাহিরের জগৎ হইতে যে তিনটি প্রাণী---মহেন্দ্র, কল্যাণী ও শান্তি---