Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা - ৬৪, ৬৫ ও ৬৬

2020-07-01
 "আমরা তখন হীরালালের চরিত্রের কথা সবিশেষ শুনি নাই, পশ্চাৎ শুনিয়াছি" (প্রথম খণ্ড, পঞ্চম পরিচ্ছেদ) | এই পরবত্যী গ্যানলাভ যে কখন হইল, হীরালালের জীবনের সহিত বিস্তৃত পরিচয় যে কীরূপে সম্ভব হইল---যদি গঙ্গাতীরে বিসজ্নই রজনীর জীবনের শেষ মুহূত্য বলিয়া মনে করি, তাহা হইলে এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দেওয়া যায় না | অবশ্য এই ঘটনার পূব্যে হীরালালের অসচ্চরিত্র সম্বন্ধে রজনীর প্রত্যক্ষ গ্যানলাভ হইয়াছিল, এই কথা বলিলে কোনো দোষ হইত না | কিন্তু "পশ্চাৎ শুনিয়াছি" এই কথা স্বীকার করিলেও হীরালালের অতীত জীবনের বিস্মৃত কাহিনী সংগ্রহ করিতে হইলে বত্যমানের সীমা-রেখা অতিক্রম করিতে হয়, এবং যে ভবিষ্যৎকে সম্পূণ্য বজ্যন করিতে যাওয়া হইয়াছিল, তাহারই আশ্রয় লইতে হয় | সেইরূপ প্রথম খণ্ড অষ্টম পরিচ্ছেদে "কিন্তু এ যন্ত্রণাময় জীবন-নাই | আবার রজনীর নিজ অন্ধত্ব-সম্বন্ধে যে খোদোক্তি, আলোকের ধারণা পয্যন্ত করিতে তাহার অক্ষমতাও সম্পূণ্যভাবে বত্যমানেই সীমাবদ্ধ করিতে হইবে; নচেৎ তাহার ভবিষ্যৎ দৃষ্টিলাভের সহিত এ অংশের সমন্বয় করা কঠিন হইবে | যদিও অন্ধের আত্মবিশ্লেষণ কলা-কৌশল ও কল্পনা-সমৃদ্ধির দিক হইতে প্রায় নিভূ্ল হইয়াছে, তথাপি একটি ক্ষুদ্র চ্যুতি বঙ্কিমের সূক্ষ্ম দৃষ্টিকেও অতিক্রম করিয়া গিয়াছে--যথা হীরালাল-সম্বন্ধে রজনীর উক্তি : "হীরালাল তৎকালে ভগ্ন-মনোরথ হইয়া আত্মবিস্মৃতি ঘটিয়াছিল |
     অমরনাথের উক্তির প্রারম্ভেই তাহার অতীত জীবনের যে একমাত্র গুরুতর পদস্খলন তাহার উল্লেখ আছে, এবং এই পদস্খলনের পরে তাহার মানসিক পরিবত্যনের, জীবনের উদ্দেশ্য ও আদশ্য সম্বন্ধে নূতন ধারণার বিস্তৃত বিবরণ আছে; তাহার প্রকৃতির বিশেষত্বটুকু নিদে্শ করিবার জন্য এই আখ্যায়িকা-বহিভূ্ত অতীত ঘটনার উল্লেখের প্রয়োজন | কিন্তু তাহার উক্তির সময়ে অমরনাথ সম্পূণ্যরূপে বত্যমানেই বদ্ধলক্ষ্য | ভবিষ্যৎ পরিণতির দিকে লক্ষ্য না রাখিয়া সে প্রতিদিনকার ঘটনা, দৈনন্দিন আশা-নৈরাশ্যের ঘাত-প্রতিঘাত বণ্যনা করিয়া গিয়াছে | রজনীকে পত্নীরূপে পাইবার সম্ভাবনায় তাহার মনে যে অভাবনীয় পুলকসঞ্চার হইয়াছে, এবং ইহার পরেই যে অপ্রত্যাশিত নৈরাশ্য আসিয়া তাহার হৃদয়কে গাঢ়তর অন্ধকারে আচ্ছন্ন করিয়াছে, এই উভয় দৃশ্যই খুব বিশদ ও জীবন্তভাবে বণি্ত হইয়াছে | শচীন্দ্রের উক্তি-মধ্যে কেবল একস্থানে ভবিষ্যতের পূব্যগ্যান সূচিত হইয়াছে ---"দ্বিতীয়তঃ, যে অন্ধ, সে কি প্রণয়াসক্ত হইতে পারে? মনে করিলাম, কদাচ না | কেহ হাসিও না, আমার মত গণ্ডমূখ্য অনেক আছে" (তৃতীয় খণ্ড, প্রথম পরিচ্ছেদ) | কিন্তু অন্য সব্যত্রই কেবল বত্যমানের ঘটনা-স্রোতই বণি্ত হইয়াছে; বিশেষত রজনীর প্রতি তাহার প্রথম দয়া ও সহানুভূতি, তাহার প্রেমে ঔদাসীন্য ও এমন কি বিরক্তির ভাবও যথাযথ প্রকাশিত হইয়াছে; ভবিষ্যৎ প্রেমের ছায়া পড়িয়া ইহার তীব্রতাকে হ্রাস করিয়া দেয় নাই | তাহার পীড়িতাবস্থায় উদ্ভ্ভ্রান্ত চিত্তের মধ্যে রজনীর প্রতি প্রেম কীরূপে বদ্ধমূল হইল তাহার একটি সুন্দর উচ্ছ্বাসময় বণ্যনা বঙ্কিম শচীন্দ্রের মুখে দিয়াছেন; এবং এই পরিবত্যনের যতটুকু মনস্তত্ত্বমূলক ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব, তাহা দুই-এক পরিচ্ছেদ পরেই সন্ন্যাসীর নিকট পাওয়া যাইতেছে | অবশ্য ইহা ঠিক যে, শচীন্দ্রের মনোভাব-পরিবত্যনের যাহা মূল কারণ, তাহা অতিপ্রাকৃতের রাজ্য হইতে আসিয়াছে, বাস্তব জগতের বিশ্লেষণ-প্রণালী তাহার উপর প্রযোজ্য নহে | উপন্যাসের দিক হইতে ইহাকে গ্রন্থের একটি অপরিহায্য ত্রুটি বলিয়াই ধরিতে হইবে | বঙ্কিম রোমান্টিক যুগের লেখক, তাঁহার সময়ে বাস্তব প্রণালী উপন্যাস-ক্ষেত্রে তখনও নিজ আধিপত্য বিস্তার করে নাই | সুতরাং তিনি রোমান্সের সমস্ত convention. সমস্ত সংস্কার ও ধারণাগুলি অবলীলাক্রমে, অসংকুচিতভাবে উপন্যাসে প্রয়োগ করিয়া গিয়াছেন | ইহাতে একদিকে ক্ষতি হইয়াছে সন্দেহ নাই; কিন্তু অন্যদিকে যে লাভ হইয়াছে তাহাও সামান্য নহে | রোমান্সের আবেগ ও উচ্ছ্বাস, দীপ্তি ও গৌরব আমাদের সাহিত্যে এত সুপ্রচুর নহে যে, উপন্যাস-ক্ষেত্র হইতে উহাকে একেবারে বিসজ্যন দিতে পারি | তবে গ্রন্থশেষে রজনীর দৃষ্টিশক্তি-লাভের কাহিনীটি রোমান্সের অভাবনীয় বৈচিত্র্যের নিকটে ঔপন্যাসিক বঙ্কিমের সম্পূণ্য ও অনুচিত আত্মসমপ্যণ ইহা স্বীকার করিতেই হইবে |
     উপন্যাসের ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের মধ্যে আখ্যায়িকা-বণ্যনের ভার বাঁটিয়া দেওয়ায়, আর একটি অসুবিধা আছে ---উপন্যাসের গতি পদে পদে প্রতিহত ও মন্থর হইয়া থাকে | একই ঘটনা বিভিন্ন লোকের চক্ষু দিয়া দৃষ্ট হয়; একই ব্যাপার-সম্বন্ধে অনেকের মত লিপিবদ্ধ করিতে হয় | সুতরাং পুনরুক্তিদোষ অপরিহায্য হইয়া পড়ে | বঙ্কিম তাঁহার ঘটনাবিন্যাসের কৌশলে এই দোষ অনেকটা খণ্ডিত করিয়াছেন | তিনি এমনই সুকৌশলে বক্তাদিগের ক্রমনিদ্যেশ করিয়া দিয়াছেন যে, গল্পের অগ্রগতি কোথাও নিশ্চল হয় নাই | যে যে অংশের প্রধান নায়ক তাহারই মুখে সেই অংশ বিবৃত করার ভার অপি্ত হইয়াছে | রজনীর গঙ্গা-গভ্যে নিমজ্জনের পর ঠিক তাহার উদ্ধারকত্যা অমরনাথের উক্তি আরম্ভ; আবার অমরনাথের দ্বারা রজনীর বিষয়-উদ্ধারের উপায় স্থিরীকৃত হইবার অব্যবহিত পরেই শচীন্দ্রকে বক্তা করা হইয়াছে | রজনীকে পুনবা্র পাওয়ার পর শচীন্দ্রের সহিত তাহার মাতা-পিতার পরিবত্যিত আচরণ ও তাহার সম্পত্তি-উদ্ধারের কাহিনী শচীন্দ্রের দ্বারাই বণ্যিত হইয়াছে | তারপর শচীন্দ্রের অনিচ্ছাসত্ত্বেও রজনীকে বধূ করিতে কৃতসংকল্পা লবঙ্গলতার উক্তি আরম্ভ ও রজনীকে লইয়া অমরনাথের সহিত তাহার চাতুয্য-প্রতিযোগিতা | এইখানে নাটকীয় ভাব খুব ঘনীভূত হইয়া আসিয়াছে এবং সেইজন্য প্রায় প্রতি দৃশ্যের বক্তার পরিবত্যন আবশ্যক হইয়াছে | এই চাতুয্যযুদ্ধে অমরনাথের মহানুভবতার নিকটে লবঙ্গলতার পরাজয় ঘটিয়াছে | এখানে আবার শচীন্দ্র রজনীর প্রতি বদ্ধমূল অনুরাগের নিদশ্যন দেখাইয়া ব্যাপারটিকে জটিলতর করিয়া কুলিয়াছে | রজনী এখন কেবল একটা যুদ্ধ-জয়ের উপভোগ্য ফল মাত্র নহে; শচীন্দ্রের জীবনরক্ষার জন্য সে এখন অবশ্য-প্রয়োজনীয় | উপন্যাসে তাহার মূল্য এখন অনেক বাড়িয়া গিয়াছে | এইখানে রজনীও প্রেমাস্পদের অবস্থা-দশ্যনে অত্যন্ত কাতর হইয়া তাহার সংযম ও আত্মদমন-শক্তি হারাইয়া ফেলিয়াছে, ও অমরনাথের নিকট পূব্যভ্রম-স্বীকারের সঙ্গে সঙ্গে শচীন্দ্রের প্রতি নিজ প্রবল অনুরাগের কথা প্রকাশ করিয়াছে | রজনীর এই

স্বীকাররোক্তিই উপন্যাসের সমস্যার সমাধান করিয়াছে; লবঙ্গের আবেদনের সহিত মিশ্রিত হইয়া ইহা অমরনাথের মহানুভব হৃদয়ের উপর সম্পূণ্য বিজয় লাভ করিয়াছে | লবঙ্গ চাতুরী ও ভয়-প্রদশ্যনে যাহা পারে নাই, তাহা নায়িকার অশ্রুজলে, কাতরতায় ও প্রমাভিব্যক্তিতে সহজেই সিদ্ধ হইয়াছে | এইরূপে আমরা দেখিতে পাই যে, বিভিন্ন পাত্র-পাত্রীর উক্তি দিয়া উপন্যাসটি বেশ সহজ, অপ্রতিহত গতিতে পরিণতির দিকে চলিয়াছে, এবং প্রত্যেক নূতন চরিত্রের আত্মবিশ্লেষণের জন্য দুই-একটি পরিচ্ছেদ ঘটনাস্রোতে বাধা প্রদান করিলেও মোটের উপর উপন্যাসের অগ্রগতি ব্যাহত হয় নাই | গঠন-কৌশলের দিক দিয়া 'রজনী'তে বঙ্কিমের কৃতিত্ব সামান্য নহে |
     'বিষবৃক্ষ' ও 'কৃষ্ণকান্তের উইল'--এই দুইখানিই বঙ্কিমের প্রকৃত পূণ্যাবয়ব সামাজিক উপন্যাস; এই দুইখানি উপন্যাসই গভীররসাত্মক, ও উভয়েরই পরিণতি বিষাদময় | উভয় উপন্যাসেই বিপৎপাতের মূল কারণ--অনিবায্য রূপতৃষ্ণা, রমণীরূপ-মুগ্ধ পুরুষের প্রবৃত্তিদমনে অক্ষমতা | উভয়ত্রই বঙ্কিম এই অন্তবি্রোধের চিত্র খুব সূক্ষ্মদশি্তার সহিত, গভীর অথচ সংযত ভাব-প্রাবল্যের সহিত চিত্রিত করিয়াছেন | ঘটনাবহুল, রসবৈচিত্রপূণ্য নাটকের দৃশ্যের ন্যায় এই আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে উৎপত্তি, বিবৃদ্ধি ও পরিণতির ক্রমপযা্য় আমরা রুদ্ধ নিশ্বাসে অনুসরণ করি; যে সমস্ত দুনি্বার শক্তি আমাদের এই আপাত-নিশ্চল জীবনকে চালিত করিতেছে, তাহাদের প্রতণ্ড গতিবেগ অনুভব করি | বঙ্কিমের অন্যান্য উপন্যাসে একটি ক্রীড়াশীল, পরিহাসময় চিত্তবৃত্তির পরিচয় পাই, যাহা বসন্ত-পবনের মতো মানবের উপরিভাগের বৈচিত্র্য স্পশ্য করিয়া যায়, হৃদয়মূলে যে অতল-গভীর জলাশয় আছে তাহার উপরে একটা ক্ষণস্থায়ী চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে, এবং অনুকূল দৈবের ন্যায় হঠাৎ এক মূহূত্যে জীবনসূত্রের গ্রন্থিসংকুলতাকে টানিয়া সরল করে; শেষমুহূত্যে বিরোধ শান্তি করিয়া, দুভ্যাগ্যের মেঘপুঞ্জকে এক ফুৎকারে উড়াইয়া দিয়া প্রেমিক-প্রেমিকার মিলন ঘটায়; বা যেখানে বিষাদময় পরিণতি অপরিহায্য, সেখানেও একটা আদশ্য, কল্পনাসুলভ জ্যোতিমণ্ডলের মধ্যে মৃত্যু-শয্যা বিছাইয়া দেয় | এই দুইখানি উপন্যাসে আমরা সেই ভাব-বিলাসের অনেকটা সংকুচিত অবস্থাই দেখিতে পাই | এখানে বঙ্কিম মানব-হৃদয়ের গভীর স্তরে অবতরণ করিয়াছেন, সত্যের নগ্নমূত্যির সম্মুখে দাঁড়াইয়াছেন; দুগ্যেয় ভাগ্যবিধাতা মানবের মম্যের মধ্য দিয়া যে গভীরকৃষ্ণ অথচ রক্তরঞ্জিত নিয়তির রেখাটি টানিয়া দেন, তাহার গতি-রহস্যটি খুব সূক্ষ্মভাবে অনুসরণ করিতে চেষ্টা করিয়াছেন | অবশ্য অখানেও বঙ্কিমের প্রকৃতি-সুলভ হাস্যপরিহাসের ও লঘুস্পশ্যের অভাব নাই; বিষাদময় ট্রাজেডির মধ্যেও মানব-মনের লঘু-তরল বিকাশগুলির চিত্র দিতে তিনি ক্ষান্ত হন নাই | তিনি জীবনকে একটা অবিচ্ছিন্ন ধূসর বা গাঢ় কৃষ্ণবণ্যে চিত্রিত করেন নাই, তাহার মধ্যে আলো-ছায়ার যথাযথ বিন্যাস করিয়াছেন | কিন্তু এই দুইখানি উপন্যাসে বঙ্কিম-প্রকৃতির লঘুতর উপাদানগুলি অনেকটা সংযত ও সংকুচিত হইয়াই এই মেঘাচ্ছন্ন আকাশতলে নিজ ন্যায্য স্থান অধিকার করিয়াছে |
     'বিষবৃক্ষ'ও সম্পূণ্যরূপে অতিপ্রাকৃতের স্পশ্যশূন্য নহে; কুন্দের দুইবার স্বপ্নদশ্যন বাস্তব উপন্যাসের মধ্যে অতিপ্রাকৃতের প্রতি অনুরাগের চিহ্নস্বরূপ বিদ্যমান | কিন্তু ইহা গ্রন্থের কেন্দ্রগত বিষয় নহে | গ্রন্থের কেন্দ্রগত বিষয় হইতেছে আত্মসংযমে অক্ষম নগেন্দ্রনাথের রূপমোহ, এই অসংযত প্রবৃত্তির ফলে নগেন্দ্র, কুন্দনন্দিনী ও সূয্যমুখী তিনটি জীবনে একটা দারুণ আলোড়ন-সৃষ্টি, তিনটি জীবন-সমুদ্র-মন্থনে হলাহলোৎপত্তি | নগেন্দ্রনাথের পাপ-প্রলোভনের ক্রমপরিণতির চিত্রটি বঙ্কিম সুকৌশলে অঙ্কন করিয়াছেন, কিন্তু আধুনিক বাস্তবতা-প্রধান ঔপন্যাসিকদের অতিরিক্ত-তথ্যভারাক্রান্ত পদ্ধতি অনুসরণ করেন নাই | স্বল্প কয়েকটি রেখাপাতে, অথ্যপূণ্য ইঙ্গিত ও আভাসের দ্বারা, আখ্যায়িকার মধ্য দিয়াই চিত্ত বিক্ষোভের চিত্রটি ফুটাইয়া তুলিয়াছেন, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ব্যাপারের দীঘ্য বিশ্লেষণের দ্বারা বণ্যনাকে ভারাক্রন্ত করিয়া তুলেন নাই | কমলমণির প্রতি সূয্যমুখীর পত্রে এই চিত্ত বিকারের প্রথম উল্লেখ পাই; তখনও নগেন্দ্র প্রাণপণে প্রলোভনের সঙ্গে যুদ্ধ করিতেছেন, অন্তরের গভীর স্তরে তাহাকে চাপিয়া রাখিয়াছেন, বাহ্য ব্যবহারে প্রস্ফুট হইতে দেন নাই; কেবল এক স্নেহময়ী পত্নীর অসাধারণ তীক্ষ্ণদৃষ্টিই এই নূতন ভারপরিবত্যনের ঈষৎ আভাস পাইয়াছে | সূয্যমুখীর পত্রে এই বিকারের প্রথম পরিচয় দিয়া বঙ্কিম তাঁহার চিত্রকে কলাকৌশলের দিক হইতে এক অপূব্য সংগতি ও শোভনত্ব দিয়াছেন | পর-পরিচ্ছেদে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তিনটি ঘটনার দ্বারা নগেন্দ্রের চিত্তবিকারের প্রথম বাহ্য বিকাশগুলি অতি সুন্দররূপে ও অদ্ভুত কলা-সংযমের সহিত তিত্রিত হইয়াছে | এদিকে কমলমণির সহানুভূতি-মিশ্র সূক্ষ্মদশ্যিতা কুন্দনন্দিনীর গোপন প্রেমের রহস্যটি আবিষ্কার করিয়া ফেলিয়াছে | তারপর ষোড়শ পরিচ্ছেদে প্রেম-ক্লিষ্টা অপরিমিত প্রেমোচ্ছ্বাসের কাহিনী বণ্যিত হইয়াছে | এই সাক্ষাতের ফলে , কুন্দনন্দিনীর সলজ্জ প্রত্যাখান সত্ত্বেও উভয়েরই মনোভাব যে আরও প্রবল ও দুদ্যমনীয় হইয়া উঠিয়াছে তাহাতে সন্দেহ নাই | ইহার পরবত্যী ঘটনা --হীরা কতৃক হরিদাসী বৈষ্ণবীর স্বরূপ-আবিষ্কার; তাহার ফলে কুন্দের চরিত্রে সন্দেহ, সূয্যমুখীর তিরস্কার ও অভিমানিনী কুন্দনন্দিনীর গৃহত্যাগ | এই গৃহত্যাগের ফলে উভয়েরই প্রণয় আরও উচ্ছ্বসিত ও অপ্রতিরোধনীয় হইয়া উঠিল | অষ্টাদশ পরিচ্ছেদে বঙ্কিম উচ্ছ্বাসময়, কবিত্বপূণ্য ভাষাতে কুন্দের অনিবায্য প্রেমপিপাসা বিশ্লেষণ করিয়াছেন | এদিকে নগেন্দ্র যখন হীরার মুখে সূয্যমুখীর তিরস্কারের জন্য কুন্দের গৃহত্যাগের সংবাদ পাইলেন, তখন তাঁহার কষ্ট-সংযত প্রেম সকল বাধা-বন্ধন ছিন্ন করিয়া একেবারে অসংবৃতভাবে আত্মপ্রকাশ করিয়া বসিল; এই কঠোর আঘাতে সূয্যমুখী-নগেন্দ্রের মধ্যে যে সংযম-সংকোচের একটা সূক্ষ্ম পদ্যার ব্যবধান ছিল, তাহা ছিঁড়িয়া গেল | নগেন্দ্র অতি কঠোর নীরসভাবে, নিতান্ত হৃদয়হীনের ন্যায়, সূয্যমুখীর নিকট নিজ বহ্নিজ্বালাময় বাসনার কথা প্রকাশ করিলেন, এবং কুন্দনন্দিনীর সম্বন্ধে তাঁহার শেষ ইচ্ছা গ্যাপন করিলেন | এই বিরহ-কালের অবসান হইল কুন্দের অনিবায্য প্রণয়-প্রণোদিত প্রত্যাবত্যনে; সূয্যমুখী প্রত্যাগতা পলাতকাকে সাদরে গ্রহণ করিলেন ও স্বামীর সহিত তাহার বিবাহের উদযোগ করিয়া শুভকায্য সম্পন্ন করাইলেন | এইখানে বিষবৃক্ষের একপব্য শেষ হইল;

উদ্দাম বাসনা সমস্ত বাধা অতিক্রম আপনাকে প্রতিষ্ঠিত করিল। এইবার ধীরে সুস্থে ফলভোগের পালা আরম্ভ হইল। প্রবল ক্রিয়ার স্বাভাবিক ফলই প্রবল প্রতিক্রিয়া।
     এই প্রজ্বলিত হুতাশনে প্রথম আত্মবিসর্জন দিল সূর্যমুখী; কমলমণির আগমনের পর সূর্যমুখী সূর্যমুখী কমলমণির নিকটে স্বামীর ব‍্যবহারে নিজ গভীর মনোবেদনার পরিচয় দিলেন, ও প্রত‍্যাখ‍্যানের অসহ‍্য দুঃখবশে গৃহত‍্যাগ করিয়া গেলেন। সূর্যমুখীর গৃহত‍্যাগেই নগেন্দ্রের ক্ষণস্থায়ী সুখ-স্বপ্ন ভঙ্গ হইল; কুন্দনন্দিনীর প্রতি অগাধ, অপরিমিত প্রেম এক মুহূর্তেই তীব্র বিরক্তি ও বিতৃষ্ণাতে বিস্বাদ হইয়া গেল। কুন্দের মৌনভাব, সরস বাকপটুতার অভাব, নিরুদ্ধপ্রকাশ প্রেম নগেন্দ্রের বুভুক্ষিত হৃদয়কে পরিতৃপ্তি দিতে পারিল না; কুন্দের নিজের আশাতীত আনন্দের মধ‍্যেও অনুশোচনার বৃশ্চিক-দংশন অনুভূত হইতে লাগিল। বিষব‍ৃক্ষের ফলাস্বাদনের পর প্রথম অনুভূতি হইল যে, সকল সুখেরই সীমা আছে। তারপর নগেন্দ্র-হরদেব ঘোষালের পত্রে কুন্দের প্রতি নগেন্দ্রের প্রেম বিশ্লেষেত হইয়া একটা বিরাট ভ্রান্তি, একটা অধম রূপজ মোহের পর্যায়ে সন্নিবিষ্ট হইয়াছে। আদর মিষ্ট কথার পরিবর্তে র্ভৎসনা ও তিরস্কারই কুন্দের নিত‍্য-ভোগ‍্য হইয়া দাঁড়ইয়াছে। মুহূর্তের জন‍্য মেঘাবৃত সূর্যমুখীর প্রতি প্রেম আবার দ্বিগুণ তেজে জ্বলিয়া উঠিয়াছে। মাত্র পনেরো দিনের মধ‍্যেই এই অদ্ভুত পরিবর্তন সংসাধিত হইয়াছে ---যে প্রেমসিন্ধু উদ্বেল ও কূলাপ্লাবী হইয়া সমাজ, ধর্ম, কর্তব‍্যজ্ঞান সকলকে ভাসাইয়া লইয়া গিয়াছিল, তাহা প্রবলতর বিরুদ্ধ শক্তির আকর্ষণে নিমেষে শুকাইয়া গেল; সূর্যমুখীর প্রতি প্রেমের শুষ্ক খাতে পুনরায় প্রথম জোয়ারের উচ্ছ্বসিত তরঙ্গ আসিয়া পড়িল। বঙ্কিমচন্দ্র দ্বাত্রিংশ পরিচ্ছেদের শেষ ভাগে কয়েকটি অসাধারণ সৌন্দর্যপূর্ণ মহাকাব‍্যোচিত তুলনার দ্বারা পাঠকের মনে এই শোকপূর্ণ পরিবর্তনের চিত্রটি গভীরভাবে মুদ্রিত করিয়া দিয়াছেন।      নগেন্দ্র কুন্দনন্দিনীকে ত‍্যাগ করিয়া বিদেশে ভ্রমণ করিয়া বেড়াইতে লাগিলেন; এদিকে সূর্যমুখী নগেন্দ্রের নিকটে প্রত‍্যাগমনের পথে সংকটাপন্ন রোগে পীড়িত হইয়া মৃত‍্যুশয‍্যায় শয়ন করিলেন এবং শ্রীঘ্রই তাঁহার মৃত‍্যু-সংবাদ নগেন্দ্রের নিকটে পৌঁছিল। এই মৃত‍্যু-সংবাদে নগেন্দ্রের মনে যে অনুতাপানল জ্বলিতে লাগিল, তাহাতেই তাঁহার পূর্বপাপের প্রায়শ্চিত্ত হইল। বঙ্কিম অসাধারণ শব্দাচাতুর্য ও কবিজনোচিত সূক্ষ্মদৃষ্টির সহিত নগেন্দ্রের এই অনুতাপ ও আত্মগ্লানি চিত্রিত করিয়াছেন। নগেন্দ্র তাঁহার বিষয়-সম্পত্তির শেষ ব‍্যবস্থা করিবার ও গার্হস্থ‍্য-জীবনের নিকট চির-বিদায় লইবার জন‍্য নিজগ্রামে ফিরিবার ঠিক পূর্বেই এক পরিচ্ছেদে গ্রন্থকার আমাদিগকে অভাগিনী, স্বামী-পরিত‍্যক্তা কুন্দনন্দিনীর অন্তরের নীরব যন্ত্রণার, নৈরাশ‍্যপূর্ণ ব‍্যথার একটি ক্ষুদ্র চিত্র দিয়াছেন। বিষবৃক্ষের ফল কুন্দকেও যথেষ্ট ভোগ করিতে হইয়াছে। তারপর নগেন্দ্রের গৃহ-প্রত‍্যাবর্তনের পর 'স্তিমিত প্রদীপে', নামক পরিচ্ছেদে লেখক নগেন্দ্র-সূর্যমুখীর পূর্ব-প্রণয়ের যে উচ্ছ্বসিত, আবেগময় কাহিনী বিবৃত করিয়াছেন, যে দুই-তিনটি সুনির্বাচিত আখ‍্যানের দ্বারা তাহাদের প্রেমের গাঢ়তা ও সর্বাঙ্গীণ একাত্মতা প্রতিপন্ন করিয়াছেন, তাহা কলাকৌশল ও কবিত্বশক্তির দিক হইতে সাহিত‍্য-ক্ষেত্রে অতুলনীয়। এই করুণ পূর্বস্মৃতি-পর্যালোচনার মধ‍্যে এই তীব্র আত্মগ্লানির বৃশ্চিক-দংশনের মধ‍্যে বঙ্কিম পুনর্জীবিত সূর্যমুখীকে আনিয়া দিয়া ও নগেন্দ্রের সহিত তাঁহার পুনর্মিলন ঘটাইয়া একটি আনন্দপূর্ণ, অথচ সম্পূর্ণ কলাকৌশলসম্মত অপ্রত‍্যাশিত বিস্ময়ের (surprise) সংঘটন করিয়াছেন।
     কিন্তু ট্রাজেডির অধিষ্ঠাত্রী দেবী এই আনন্দের সুরে আখ‍্যায়িকাটি শেষ হইতে দিলেন না। তাঁহার নির্মম বিচারে একটি বলিদানের প্রয়োজন হইল, এবং চির-উপেক্ষিতা, অভাগিনী কুন্দনন্দিনীই এই বলির জন‍্য নির্বাচিত হইল। বিষবৃক্ষের ফল এতদিনে সত‍্যসত‍্যই ফলিল এবং নিয়তির অলঙঘ‍্য বিধানের ন‍্যায় গ্রন্থকারের কার্য-কারণ-শৃঙ্খলার অমোঘ গ্রন্থিবন্ধনে এই গরল কুন্দনন্দিনীরই উদরস্থ হইল। কিন্তু যে তরঙ্গ আসিয়া কুন্দকে মৃত‍্যুর অতল গহ্বরে ভাসাইয়া লইয়া-শৃঙ্খলার অমোঘ গ্রন্থিবন্ধনে এই গরল কুন্দনন্দিনীরই উদরস্থ হইল। কিন্তু যে তরঙ্গ আসিয়া কুন্দকে মৃত‍্যুর অতল গহ্বরে ভাসাইয়া লইয়া গেল, তাহা তাহার কোমল, লজ্জাসংকুচিত হৃদয়ের নিজ প্রেরণা হইতে আসে নাই, তাহা নিকটবর্তী একটি পঙ্কিল আবর্ত হইতে ঈর্ষা-ফেনিল প্রচণ্ড জলোচ্ছ্বাসের রূপেই তাহার উপরে আপতিত হইল। বাস্তবিকই বঙ্কিম সুনিপুণ মালাকারের ন‍্যায়, অসাধারণ কৌশলের সহিত কুন্দ-নগেন্দ্র-সূর্যমুখীর অপেক্ষাকৃত উন্নত ও গভীর প্রেমের ভাগ‍্য-বিপর্যয়ের সঙ্গে আর একটি কলঙ্কিত, অথচ মনোবৃত্তির নিগূঢ়-লীলা-বিচিত্র প্রণয়-কাহিনী একই সূত্রে গাঁথিয়াছেন, এবং এই দুইটি স্বতন্ত্র ব‍্যাপারের মধ‍্যে একটি ঘনিষ্ঠ ও জীবন্ত সম্পর্ক রক্ষা করিয়াছেন। হীরা উপন‍্যাসের villain; গ্রন্থের প্রধান পাত্র-পাত্রীদের মধ‍্যে যেখানে হৃদয়ের অসংযত, উদ্দাম প্রবৃত্তির জন‍্য অগ্নি জ্বলিয়াছে, সেইখানেই হীরা বাহির হইতে সেই অগ্নিবিস্তারের সহায়তা করিয়াছে, অগ্নিতে ইন্ধন যোগাইয়াছে। সে-ই সূর্যমুখী-নগেন্দ্রের মধ‍্যে শেষ বিচ্ছেদ ঘটাইয়াছে; সে-ই মর্মপীড়িতা কুন্দনন্দিনীর নিকট আত্মহত‍্যার মন্ত্রণা ও অস্ত্র পৌছাইয়া দিয়া ট্রাজেডির শেষ দৃশ‍্যের জন‍্য আপনাকে দায়ী করিয়াছে। প্রাকৃত জগতেও এইরূপ অন্তরস্থ ও বাহ‍্য শক্তির সন্মিলনেই আমাদের মনোরাজ‍্যে গুরুতর পরিবর্তন সাধিত হয়, হৃদয়-কন্দরে যে বহ্নি প্রধূমিত হইতে থাকে, বাহিরের ফুৎকারেই তাহা প্রবল ও প্রোজ্জ্বল হইয়া উঠে। কিন্তু হীরা কেবল পরের অগ্নিতে ইন্ধন যোগাইয়া আসে নাই, তাহা হইলে সে উপন‍্যাসের মধ‍্যে একটা অপ্রয়োজনীয়, বাহিরের জীবমাত্র হইত। তাহার নিজের হৃদয়ে যে আগুন জ্বলিয়াছে, তাহা হইতেই একটা প্রজ্বলিত শলাকা লইয়া সে অন‍্যের ঘরে আগুন দিয়াছে; নিজের অন্তরস্থ বহ্নিপ্রাচুর্য হইতেই তাহার চতুর্দিকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছড়াইয়াছে। ইহার আর্টিস্টের কৃতিত্ব; তিনি হীরাকে একটা secondary বা গৌণ চরিত্রের পর্যায়ে ফেলেন নাই, নগেন্দ্র-সুর্যমুখী-সৌর-জগতের দূরপ্রান্তস্থিত একটা ক্ষীণ-প্রভ উপগ্রহমাত্র করেন নাই; তাহার উপর ধূমকেতুর প্রচণ্ড গতিবেগ ও করাল দীপ্তি আনিয়া দিয়াছেন। হীরা-দেবেন্দ্রের কলঙ্ক-লাঞ্ছিত, ইন্দ্রিয়সুখপ্রধান প্রণয়-কাহিনীটিও বঙ্কিম তাঁহার অত‍্যন্ত সংযম ও মিতভাষিতার সহিত, কয়েকটি অর্থপূর্ণ আভাস ও সুদূরপ্রসারী ইঙ্গিতের দ্বারাই ফুটাইয়া তুলিয়াছেন।
     পাপ-সম্বন্ধে বঙ্কিমের একটা সহজ সংকোচ, একটা স্বাভাবিক বিমুখতা ছিল; সুতরাং কোথাও তিনি ইহার সবিস্তার বর্ণনা করেন নাই, আধুনিক বাস্তব লেখকদের ন‍্যায় প্রতিদিনকার গ্লানি ও কলঙ্কচিহ্ন পুঞ্জীভূত করিয়া চিত্রকে মসীময় করিয়া তোলেন নাই, সর্ববিধ