Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা - ৮২, ৮৩ ও ৮৪

2020-07-10
নিবেদন সম্মত করিয়াছে সত‍্য, কিন্তু এই সম্মতির মধ‍্যে একফোঁটা প্রেম নাই, আছে শুধু যে সামাজিক ও নৈতিক শাসন বিহারীর মধ‍্যে মূর্তি পরিগ্রহ করিয়া তাহাক‍ে তিরস্কারের স্পর্ধা দেখাইয়াছিল, সেই স্পর্ধিত তিরস্কারের প্রতি ক্রুদ্ধ উপেক্ষা ও প্রকাশ‍্য বিদ্রোহ-ষোষণা।
     ইহার পর মহেন্দ্র-বিনোদিনীর সম্পর্কের মধ‍্যে অপ্রত‍্যাশিতত্বের স্পর্শ মিলাইয়া গিয়াছে। আরও দুই-এক অধ‍্যায়ে বিনোদিনী মহেন্দ্রের অসংবৃত, লজ্জাসংকোচহীন প্রণয়-নিবেদন সহ‍্য করিয়াছে সত‍্য, কিন্তু তাহার হৃদয় ইহাতে কোনো সাড়াই দেয় নাই। মহেন্দ্রের সহিত সাক্ষাতের সময় সে রাজলক্ষ্মীকে শরীর-রক্ষীরূপে সঙ্গে লইয়াছে, মহেন্দ্রের উন্মত্ত আবেগকে নির্জনতার কোনো অবসর দান করে নাই। এখন হইতে সে মহেন্দ্রকে সম্পূর্ণরূপেই বিহারী-লাভের উপায় মাত্ররূপে ব‍্যবহার করিয়াছে, তাহাকে শর্করা-ভারবাহী গর্দভের দুরবস্থা অনুভব করাইয়াছে। লোক-নিন্দা, সমাজ-গঞ্জনা সে স্পর্ধিত প্রকাশ‍্যতার সহিত বরণ করিয়াছে, কিন্তু বেচারা মহেন্দ্র লোকচক্ষে অপরাধী হইলেও তাহার প্রকৃত প্রণয়ভাজনের সংবাদ বহির্জগতের নিকট সম্পূর্ণ অজ্ঞাত রহিয়া গিয়াছে। বিহারী-কতৃক দ্বিতীয়বার প্রত‍্যাখ‍্যান তাহার প্রেমকে রক্ত-মাংসের স্থূল বাস্তবতা হইতে এক উদভ্রান্ত-বিহ্বল, ধ‍্যানগম‍্য আদর্শলোকে লইয়া গিয়াছে। মহেন্দ্র কায়িক অনুবর্তনের ছদ্মবেশে তাহার মন বিহারীর অভিমুখে প্রণয়-অভিসারের অতীন্দ্রিয় পথ ধরিয়া উধাও হইয়াছে। এই যাত্রাপথের চরমতীর্থ-প্রাপ্তি বর্ণিত হইয়াছে এলাহাবাদের যমুনাতীরস্থ কুঞ্জবনে। এই গঙ্গা-যমুনার সঙ্গম-স্থলে মহেন্দ্র ও বিহারীর সহিত বিনোদিনীর মুহুর্মুহু পরিবর্তনশীল, অনূরাগ-বিরাগ-পঙ্কিল, ঘাত-প্রতিঘাত-নিষ্ঠুর, প্রত‍্যাখ‍্যান-নিবেদনের বিপরীত স্রোতে ঘূর্ণাবর্ত-সংকুল সম্বন্ধের একটা শেষ মীমাংসা ও সমাধান সংঘটিত হইয়াছে। মহেন্দ্র তাহার সুদীর্ঘ মোহনিদ্রা অবসানে গায়ের ধূলা ঝাড়িয়া ক্ষমা-স্নিগ্ধ মাতৃদৃষ্টির তলে আশার পার্শ্বে নিজ সংকুচিত স্থান গ্রহণ করিয়াছে; বিনোদিনী নিজ উদ্দীপ্ত কামনার উপর বৈরাগ‍্যের ধূসর ছাই ছড়াইয়াছে ও রোমান্সের নায়িকার ন‍্যায় প্রেমের সহস্রঝাড় রঙিন বাতি নিবাইয়া সেবার ম্লান-স্তিমিত ঘৃত-প্রদীপ হস্তে, এক চিরগোধূলিচ্ছায়াচ্ছন্ন রোগকক্ষের অভিমুখে ধীর পদে অগ্রসর হইয়া আমাদের দৃষ্টিপথের অতীত হইয়া গিয়াছে।
     চরিত্র-সৃষ্টির দিক দিয়া মহেন্দ্রই সর্বাপেক্ষা জীবন্ত ও পূর্ণাঙ্গভাবে চিত্রিত হইয়‍াছে। তাহার চরিত্রের সমস্ত পরিবর্তন এক আতিশয‍্য ও অসংযমের ঐক‍্য-বন্ধনে গাঁথা। তাহার অপরিমিত মাতৃভক্তি ও পত্নীপ্রেম, বিনোদিনীর সহিত সম্পর্কে তাহার নির্লজ্জ আতিশয‍্যেরই পূর্বসূচনা। তাহার পত্নীপ্রেম ও পরনারী আসক্তি--উভয়েরই মূলে আছে এক প্রবল আত্মাভিমান। ঈর্ষা বৈধ ও অবৈধ উভয়বিধ প্রণয়েই তাহাকে উত্তেজিত করিয়াছে। আশার ব‍্যাপারে বিহারীকে এত সহজে হঠাইতে পারিয়াছিল বলিয়াই বিনোদিনীর হৃদয়-আকর্ষণ-চেষ্টায় তাহার অবলম্বিত উপায় এত ভ্রান্তি সংকুল ও শেষ পর্যন্ত ব‍্যর্থতায় পর্যবসিত হইয়াছে। বন্ধুত্বের মর্যাদা-রক্ষাই তাহার প্রেমের সিংহাসন-লাভের সোপান হইত, কিন্তু মূঢ় মহেন্দ্র নিজ উদ্দেশ‍্য-সিদ্ধির প্রকৃষ্ট পথ ধরিতে পারে নাই। ঈর্ষার দমকা বাতাস বারবার তাহার প্রণয়-দীপটিকে কাঁপাইয়া গিয়াছে, তথাপি সে আপনাকে সংবরণ করিতে পারে নাই। বিনোদিনীর সহিত পরিচয়ের পূর্ব পর্যন্ত সমস্ত হৃদয়ঘটিত ব‍্যাপারে মহেন্দ্র চাহিবামাত্র পাইয়াছে---একমাত্র বিনোদিনীর ব‍্যাপারেই তাহাকে যোগ‍্যতার পরিচয় দিতে হইয়াছে এবং এই পরীক্ষায় সে সম্পূর্ণরূপেই অকৃতকার্য হইয়াছে। সে যে সত‍্য সত‍্যই আন্তরিকতার সহিত চিত্তজয়ের চেষ্টা না করিয়াছে তাহা নহে এবং বিনোদিনী যে অনিবার্য বেগের সহিত তাহাক‍ে আকর্ষণ করিয়াছিল তাহাও ঠিক নয়,---কিন্তু বিহারীর প্রতি বিনোদিনীর অনুরাগের সম্ভাবনামাত্রই তাহার সমস্ত আত্মদমন-চেষ্টাকে ছিন্ন-ভিন্ন করিয়া উড়াইয়া দিয়াছে। 'আত্মাভিমান-মূঢ়তা' কথাটি মহেন্দ্রের সমস্ত চরিত্র ও ব‍্যবহারের উপর বড়ো-বড়ো অক্ষরে মুদ্রিত হইয়াছে।
     বিনোদিনীর চরিত্রে স্থূল বাস্তবতা ও উচ্চ আদর্শবাদ--এই দুইটি বীপরীত ধারার সংযোগ হইয়াছে। অবশ‍্য এই সংযোগ আর্টের অনুমোদিত সমন্বয় কি না, সে বিষয়ে সন্দেহের অবসর আছে। পিপাচী হইতে দেবীতে অতর্কিত পরিবর্তন রোমান্টিক উপন‍্যাসে অতি সাধারণ ব‍্যাপার। এখানে বিনোদিনীর পরিবর্তন খুব অতর্কিত হয় নাই, মহেন্দ্রের প্রতি বিরাগ ও বিহারীর প্রতি উন্মুখতা তাহার চরিত্রে ধীরে ধীরে, অথচ নিতান্ত অনিবার্যভাবেই বিকাশলাভ করিয়াছে। একটা প্রচণ্ড জ্বালাময় ঈর্ষা তাহাকে মহেন্দ্রের সহিত প্রেমাভিনয় করিতে উত্তেজিত করিয়াছিল। তাহার সেবাকুশলতা মহেন্দ্রের ঔদাসীন‍্যকে পরাজয় করিবার অস্ত্রমাত্র; মহেন্দ্রের প্রতি তাহার হিতেচ্ছা-প্রণোদিত কঠোর শাসন প্রেমের বাজার-দর উঁচু রাখিবার কৌশলময় প্রয়াস। তথাপি যদি সে মহেন্দ্রের চরিত্রে তাহার একান্ত-প্রার্থিত অটল নির্ভর ও বিশ্বস্ততা পাইত, তাহা হইলে তাহার চিত্তদুর্গে জয়-পতাকা উড়াইয়াই সে সন্তুষ্ট থাকিতে, বিজয়িনীর গর্ব প্রণয়িনীর কৃতঘ্নতা ও অস্থিরমতিত্বের পরিচয় পাইয়া তাহার মন মহেন্দ্রের উপর ক্ষণস্থায়ী বিজয়ের আশা পরিত‍্যাগ করিয়া বিহারীর শত-ঝঞ্ঝাবাতে অক্ষুব্ধ হৃদয়ের দিকেই আকৃষ্ট হইয়াছে। বিহারীকে আহরণ-যোগ‍্য মণি বলিয়া চিনিতে পারিয়া সে মহেন্দ্রকে খেলার পুতুলের মতো ত‍্যাগ করিয়াছে। অবশ‍্য তাহার এই আভ‍্যন্তরীণ পরিবর্তনের কাহিনী বাস্তব বিশ্লেষণ অপেক্ষা কবি-কল্পনামূলক সহানুভূতির দ্বারাই পাঠকের মনে প্রবেশ করানো হইয়াছে। গ্রন্থের শেষ দিক দিয়া বিনোদিনী কল্পলোকের অধিবাসিনী--সে বাস্তব বিশ্লেষণের পরিধি ছাড়াইয়া উদার অসীম ভাবরাজ‍্যে মুক্তপক্ষ বিহঙ্গিনীর ন‍্যায় আহোরণ করিয়াছে। তাহার জীবনের শেষ সংকল্প রোমান্সের রঙিন বাতাসে অঙ্কুরিত হইয়াছে।
     'বিষবৃক্ষ'-এ নগেন্দ্র-কুন্দনন্দিনীর প্রেমের সহিত মহেন্দ্র-বিনোদিনীর প্রেমের তুলনা করিলেই রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্কিমচন্দ্রের মনোভাব ও বিশ্লেষণ-প্রণালীর পার্থক‍্য অনুভূত হইবে। কুন্দের প্রেম অতি সলজ্জ ও সংকোচ-জড়িত; প্রণয়ের আবির্ভাব-অনভিজ্ঞ হৃদয়ের মুগ্ধ, আত্মবিস্মৃত সরলতাই ইহার প্রধান উপাদান। ইহার বর্ণনাও গীতিকাব‍্যোচিত উচ্ছ্বসিত ভাববেগপূর্ণ; ইহার দৈনন্দিন ইতিহাস ও পরিণতি বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ হয় নাই। বিনোদিনীর প্রেম সম্পূর্ণ বিভিন্ন, প্রকৃতির--ইহা অতি সুচতুর, কৌশলজালাময় মায়া-

বিস্তার। কুন্দ অনেকটা অজ্ঞাতসারে অগাধজলে ঝাঁপ দিয়াছে--বিনোদিনীর প্রত‍্যেক পদক্ষেপ সুচিন্তিত ও সুনিয়ন্ত্রিত। কুন্দের অন্ধ, মূঢ় আবেগের সহিত বিনোদিনীর সূক্ষ্ম পরিমাণবোধ ও ক্ষুদ্রতম ইঙ্গিতেরও ফলাফল সম্বন্ধে অতি পরিষ্কার, আবেশজড়িমারহিত অনুভূতি তুলনীয়। বঙ্কিমচন্দ্র বালবিধবার প্রথম প্রণয় সঞ্চার কবিত্বময় আবেষ্টনীর মধ‍্য দিয়া, নববধূর লজ্জারক্তিম আভায় চিত্রিত করিয়াছেন; রবীন্দ্রনাথ পূর্ণবয়স্কা যুবতীর ঈর্ষাদিগ্ধ লোলুপতার, তাহার যত্ন-রচিত মায়া-নাগপাশের প্রত‍্যেকটি গ্রন্থির, প্রত‍্যেকটি ফাঁসের সবিস্তার বর্ণনা করিয়াছেন। 'চোখের বালি'র পর হইতে বিধবা প্রেমের এক নূতন অভিনয়ে ব্রতী হইয়াছে। বিনোদিনী হীরা ও রোহিণীর মনোরাজ‍্য-বহিভূত এক উচ্চতর, বিচিত্রতর মঞ্চ অধিকার করিয়াছে; সে অভয়া, কিরণময়ী ও কমলের পূর্ববর্তিনী ও পথপ্রদর্শিকা।
     বিহারীর ব‍্যক্তি-স্বাতন্ত্র‍্য ফুটিয়াছে অত‍্যন্ত বিলম্বে। গ্রন্থের প্রথম হইতে সে কেবল মহেন্দ্রের অনুচর ও উপগ্রহরূপে চিত্রিত হইয়াছে। তাহার বন্ধুপ্রীতি এত প্রবল যে, তাহার খাতিরে সে তাহার বাগদত্তা বধূ পর্যন্ত বন্ধুকে তুলিয়া দিয়াছে। তাহার চরিত্র ও ব‍্যবহারের সর্বত্রই প্রাই বিয়োগ-চিহ্নাঙ্কিত (negative)। মহেন্দ্রের ত্রুটি-অপূর্ণতা ভালো করিয়া ফুটাইয়া তুলিবার জন‍্য বিহারীর চরিত্রে তদ্বিপরীত গুণগুলি আরোপিত হইয়াছে। এইরূপ রাহুগ্রস্ত জীবন প্রায়ই ব‍্যক্তিত্ববিকাশের পক্ষে অনুকূল হয় না। কেবল বিনোদিনীই বিহারীকে মহেন্দ্র হইতে ভিন্ন করিয়া দেখিয়াছে, তাহার নিজস্ব ব‍্যক্তিত্ব আকর্ষণের দ্বারা বাহিরে আনিয়াছে। বিনোদিনী-সম্পর্কেও বিহারী নিজ হৃদয়-ভাবকে আমল দেয় নাই, মহেন্দ্রের হিতৈষী বন্ধু হিসাবেই তাহার কার্যাবলীর বিচার করিয়াছে। কেবল তাহার নির্জন কক্ষ-মধ‍্যে বিনোদিনীর নীশীথ-অভিসারই তাহার প্রসুপ্ত যৌবনকে জাগরিত করিয়াছে; সে মহেন্দ্রের আনুচর্য অস্বীকার করিয়া স্বাধীন করিয়া তাহার রক্তকে উতলা ও মাতাল করিয়া তুলিয়াছে। এই অতর্কিত যৌবনোন্মেষই তাহার স্বাধীন ব‍্যক্তিত্বের স্ফুরণ--বিনোদিনীকে বিবাহ করিবার প্রস্তাব তাহার স্বাধীন সত্তার একমাত্র কার্য। তাহার চিরপ্রবীণ কর্তব‍্যনিষ্ঠা ও সদ‍্যোজাগ্রত তারুণ‍্যের মধ‍্যে যে বিরোধ তাহার সমাধান নিতান্ত আকস্মিকভাবেই সম্পন্ন হইয়াছে। বিহারীর অর্ধোন্মেষিত ব‍্যক্তিত্ব ও হৃদয়-সমস‍্যার সুলভ ও আকস্মিক সমাধান তাহাকে শেষ পর্যন্ত কতকটা অস্পষ্ট ও ছায়াময় করিয়া রাখিয়াছে।
     আশার সম্বন্ধেও অনেকটা এই মন্তব‍্যই প্রযোজ‍্য। মহেন্দ্রের দুর্জয় বন‍্যা-প্লাবনের ন‍্যায় অসংযত হৃদয়াবেগ ও বানোদিনীর চক্ষুজ্বালাকারী, তীব্র রূপশিখার সম্মুখীন হইয়া সে অনেকটা ম্লান ও নিষ্কিয় হইয়া গিয়াছে।
     মহেন্দ্র-বিহারীর সম্পর্ক আমাদের একটি কথা স্মরণ করাইয়া দেয় যে, আমাদের সংকীর্ণ পারিবারিক জগতে স্ত্রী-পুরুষের প্রণয় অপেক্ষা বন্ধুত্বই সাধারণত অধিকতর জটিলতর সৃষ্টি করে। আমাদের রুদ্ধদ্বারগবাক্ষ সামাজিক ব‍্যবস্থার মধ‍্যে এক বন্ধুত্বের ছিদ্রপথ দিয়া বাহ‍্য বিপ্লব বাঙালি-পরিবারে প্রবেশলাভ করিতে পারে। এক বন্ধুত্ব বা সহপাঠিত্বের দাবিতেই আমরা পরের অন্তঃপুরের অন্তঃপুরের অন্তর্গণ্ডি লঙঘন করিয়া ভিন্ন পরিবারের সহিত ঘনিষ্ঠ হইতে পারি। এখানে স্ত্রী-পুরুষ অসংকোচ মেলা-ম‍েশার সুযোগ যতই সংকীর্ণ, বন্ধুত্বের প্রসার ও সম্ভাবনা ততই সুপ্রচুর। সেইজন‍্য বাংলা উপন‍্যাসে বন্ধুত্বের প্রাদুর্ভাব অত‍্যধিক--অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জটিলতা বন্ধুত্বের স্নেহ-শীতল অথচ প্রতিযোগিতা-তীব্র ঘাত-প্রতিঘাত হইতেই উদ্ভূত। 'গোরা'তে গোরা ও বিনয়, 'ঘরে-বাইরে'-তে নিখিলেশ ও সন্দীপ, 'গৃহদাহ'-এ মহিম ও সুরেশ, 'দিদি'তে অমর ও দেবেন---এই উদাহরণ কয়েকটিই বাংলা উপন‍্যাসে বন্ধুত্বের উচ্চ দাবি প্রতিষ্ঠিত করিবার পক্ষে যথেষ্ট।
     'চোখের বালি'কে উপন‍্যস-সাহিত‍্যে নব-যুগের প্রবর্তক বলা যাইতে পারে। অতি-আধুনিক উপ‍ন‍্যাসে বাস্তবতা যে বিশেষ অর্থে ব‍্যবহৃত হইয়া থাকে, এখানেই তাহার সূত্রপাত। নৈতিক বিচার অপেক্ষা তথ‍্যানুসন্ধা ও মনস্তত্ত্ব-বিশ্লেষণই ইহাতে প্রধান লক্ষ‍্য। ইহাতে যে প্রেম বর্ণিত হইয়াছে তাহা সমাজনীতির দিক হইতে বিগর্হিত--কিন্তু এই প্রেমের বিচার কোনো নীতিকথার আড়ম্বর নাই, আছে কেবল ইহার ক্রমপরিণতির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ। এই পেম বাধাপ্রাপ্ত হইয়াছে কোনো নৈতিক অনুশাসনে নয়, নিজের অন্তর্নিহিত শোভনতাবোধ ও আত্মোপলব্ধির দ্বারা। আবার বিরারী-বিনোদিনীর প্রেম প্রেমের সনাতন সৌন্দর্য ও মহিমা সগৌরবে বিঘোষিত হইয়াছে। লেখক প্রেমের প্রতি পুরাতন মনোভাব একেবারে বর্জন না করিয়া নূতন মনোভাবের স্পষ্ট আভাস দিয়াছেন। 'চোখের বালি' এই নূতন-পুরাতনের সন্ধিস্থলে দাঁড়াইয়া এক হাতে বঙ্কিমচন্দ্র ও অপর হাতে শরৎচন্দ্রের যুগকে নিবিড় ঐক‍্য-বন্ধনে বাঁধিয়াছে।
( ৪ )

'গোরা' (১৯০৯) রবীন্দ্রনাথের উপন‍্যাসবলীর মধ‍্যে একটি বিশিষ্ট ও অনন‍্যাসাধারণ স্থান অধিকার করে। ইহার প্রসার ও পরিধি সাধারণ উপন‍্যাস অপেক্ষা অনেক বেশি। ইহার মধ‍্যে অনেকটা মহাকাব‍্যের বিশালতা ও বিস্তৃতি আছে। ইহার পাত্র-পাত্রীগণের যে কেবল ব‍্যক্তিগত জীবন আছে তাহা নহে, আন্দোলন-বিশেষ বা ধর্মগত সংঘর্ষ-বিশেষের প্রতিনিধি হিসাবে তাহাদের একটি বিরাট বৃহত্তর সত্তা আছে। বঙ্গদেশের একটা যুগ-সন্ধিক্ষণের সমস্ত বিক্ষোভ-আলোড়ন, আমাদের দেশাত্মবোধের প্রথম স্ফুরণের সমস্ত চাঞ্চল‍্য, আমাদের ধর্ম-বিপ্লবের সমস্ত একাগ্রতা ও উদ্দীপনা এই উপন‍্যাসে স্থান লাভ করিয়াছে। উপন‍্যাসের চরিত্রগুলির মুখ দিয়া ধর্ম-বিষয়ে সনাতনপন্থী ও নব‍্যপন্থী, রক্ষণশীল ও সংস্কারক--এই উভয় সম্প্রদায়ের যুক্তি-তর্ক ও আধ‍্যাত্মিক অনুভূতির সমস্ত ক্ষেত্র নিঃশেষভাবে অধিকৃত হইয়াছে। গোরা, বীনয়, পরেশবাবু, হারাণ, সুচরতা, ললিতা, আনন্দময়ী---সকলেরই প্রধান আগ্রহ একটা মতমাদ-প্রতিষ্ঠায়, ধর্ম ও ব‍্যবহারগত জীবনে একটা বিশেষ পথ বা চিন্তাধারার সমর্থনে। কাহারও কাহারও ক্ষেত্রে এই যুক্তি-তর্কগত জীবন, এই মতবাদের প্রতিনিধিত্ব এতই প্রবল হইয়া উঠিয়াছে যে, ইহার দ্বারা তাহাদের ব‍্যক্তিগত জীবন অনেকটা প্রতিহত ও অভিভূত

হইয়াছে। তর্কের উদ্দাম কোলাহলে তাহাদের জীবনের সূক্ষ্ম রাগিণী, নিগূঢ় মর্মস্পন্দন যেন আচ্ছন্ন হইয়া গিয়াছে। গোরাকে একটা জীবন্ত মানুষ অপেক্ষা ভারতবর্ষের আত্মবোধের প্রকাশ বলিয়াই বেশি মনে হয়। সমস্ত উপন‍্যাসটির বেরুদ্ধেই অনেকটা এই প্রকারের অভিযোগ আনা হয়। ইহার চরিত্র-চিত্রণ যথেষ্ট গভীর ও ব‍্যক্তিত্বদ‍্যোতক নহে, ইহার চরিত্রগুলির ব‍্যক্তিত্ব-উন্মেষ যথেষ্ট উজ্জ্বল ও দীপ্তিমান নহে। উপন‍্যাসখানি সম্বন্ধে অন‍্যান‍্য আলোচনার পূর্বে এই অভিযোগের বিচারই প্রথমে কর্তব‍্য।
     সমালোচনার মূলসূত্র ধরিয়া বিচার করিলে এই অভিযোগের একটা সাধারণ সারবত্তা অস্বীকার করা যায় না। যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিকের মতো তর্কযুদ্ধে নিবিষ্টচিত্ত ব‍্যক্তির যে স্বরূপ প্রকাশ পায় তাহাই তাহার সম্পূর্ণ ও অন্তরঙ্গ পরিচয় বলিয়া মনে করা যায় না। রণক্ষেত্রে বর্ম-কিরীট-পরিহিত সেনাপতির মুখায়ব যেমন অস্পষ্ট থাকিয়া যায়, সেইরূপ মতবাদের সংঘর্ষে যে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ জ্বলিয়া উঠে তাহাতে চরিত্রের সমগ্র অংশটি আলোকিত হইয়া উঠে না। তর্কের উত্তেজনার মধ‍্যে আমাদের যে সমস্ত তীক্ষ্ণ বুদ্ধিবৃত্তি ক্ষুরধার তরবারির মতো ঝকমক করিয়া উঠে, আক্রমণ-আত্মরক্ষার নিষ্ঠুর প্রয়োজনে যে যুধ‍্যমান গুণগুলির স্ফূর্তি হয়, তাহাদের অন্তরালে আমাদের গভীর-গুহা-শায়ী আসল মানুষটি অনেক সময়েই চাপা পড়িয়া যায়। বিশেষত যখন কোনো বিশেষ মতবাদের পোষকতা কোনো ব‍্যক্তির প্রধান পরিচয় হইয়া দাঁড়ায়, তখন সে পরিচয় যে অত‍্যন্ত সংকীর্ণ ও সীমাবদ্ধ হয় তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। যখনই গোরা আমাদের সম্মুখে আবির্ভূত হয়, তখনই সে যুদ্ধসাজ-পরা, তখনই আমরা পূর্ব হইতে অনুমান করিতে পারি যে, তাহার যুক্তি-তর্ক, তাহার চিন্তাধারা কোন্ প্রণালীতে প্রবাহিত হইবে। সুতরাং জীবনের যে প্রধান রহস‍্য --তাহার বিস্ময়কর অতর্কিততা, তাহার নিগূঢ় আকস্মিকতা, তাহা তাহার ক্ষেত্রে কোনো কোনো স্থলে অপ্রকাশিত থাকিয়া যায়। পরেশবাবুরও অভ্রান্ত ও অবিচলিত সত‍্যানুসরণ, তাঁহার ধর্মবুদ্ধির অবিমিশ্র উৎকর্ষ তাঁহার ব‍্যক্তিগত চরিত্রকে অনেকটা নিষ্প্রভ ও বৈচিত্র‍্যহীন করায়াছে। সুতরাং এই দিক দিয়া যে-সমস্ত চরিত্র মতবাদের সহিত সম্পূর্ণ একাত্ম হইয়া যায় নাই, মতবাদ- সমর্থনে দ্বিধা বা দুর্বলচিত্ততার পরিচয় দিয়াছে, অথবা যুক্তি-তর্ক-আলোচনার মধ‍্যে দিয়া যাহাদের জীবনে নিগূঢ় পরিবর্তন আসিয়াছে তাহারা প্রাণরসে অধিকতর সমৃদ্ধ হইয়া উঠিয়াছে। এই হিসাবে দ্বিধাগ্রস্তচিত্ত বিনয়, অভাবনীয়রূপে পরিবর্তিতা সুচরিতা ও সম্প্রদায়গত সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ-পরায়ণা ললিতা আমাদের নিকট অধিকতর জীবন্ত বলিয়া অনুভূত হয়।
     অবশ‍্য যুক্তি-তর্কোত্থিত ধূলিজালের মধ‍্য দিয়া যে হৃদয়ের গভীরতাকে স্পর্শ করা যায় না, এরূপ বদ্ধমূল ধারণাও একটা কুসংস্কার। হৃদয়ের গভীর স্তরে অবতরণ করিবার পথ একটি নহে, অনেকগুলি। আমাদের পারিবারিক জীবনের রসধারসিক্ত, ছায়াশীতল গ্রাম‍্য পথ দিয়াও যেমন, সেইরূপ যুক্তি-তর্কের স্বল্পালোকিত সুড়ঙ্গপথ দিয়াও অন্তরের অন্তস্তলে পৌছানো যাইতে পারে। মতবাদ প্রতিষ্ঠার জন‍্য বাকবিতণ্ডা যদি কেবল যুদ্ধাস্ত্ররূপে ব‍্যবহৃত না হইয়া অন্তরের আলোড়নে গভীরতা লাভ করে, তবে তাহার ভিতর দিয়াও আমরা আসল মানুষটির পরিচয় লাভ করিতে পারি। এই বুদ্ধি-সংঘর্ষের ফলে যদি প্রেমের সোনার প্রদীপ জ্বলিয়া উঠে, তবে তাহার স্বচ্ছ, সর্বব‍্যাপী আলোকে সমস্ত অন্তঃপ্রকৃতিটি উদ্ভাসিত হইয়া উঠিতে বাকি থাকে না। গোরার তর্ক কেবল বুদ্ধির সুলভ আস্ফালন, কেবল নিপুণ তরবারি-সঞ্চালনের কৃতিত্ব নহে। তাহা এক দিকে তাহার অন্তরের গভীরতম উৎসটি হইতে উৎসারিত, অপর দিকে তাহার হৃদয়ের নিগূঢ় সম্পর্কগুলির উপর প্রভাবান্বিত। তাহার মাতৃভক্তি, তাহার বন্ধুপ্রীতি পদে পদে তাহার মতবাদের দ্বারা খণ্ডিত, প্রতিহত, পরিবর্তিত হইতেছে। আনন্দময়ীর সূক্ষ্ম অথচ প্রকাশরহিত বেদনাবোধ, বিনয়ের আসন্ন অথচ অপ্রতিবিধেয় বিচ্ছেদ-ব‍্যথা গোরার শুষ্ক মতবাদকে কোমল-করুণরসে, নিগূঢ় প্রাণস্পন্দনে সঞ্জীবিত করিয়া তুলিতেছে। শেষ পর্যন্ত ইহা তাহাকে সুচরিতার সম্মুখীন করিয়া তাহাকে প্রেমের গভীর উপলব্ধির দিকে অনিবার্য বেগে ঠেলিয়া লইয়া গিয়াছে। সাংসারিকতার সহজ-মসৃণ পথে গোরার সহিত সুচরিতার পরিচয়ের কোনো সম্ভাবনা ছিল না; দেখাশোনার কোনো উপায় থাকিলেও সাধারণ শিষ্ট-সম্ভাষণ-বিনিময়ের দ্বারা তাহাদের মধ‍্যে প্রণয়াকর্ষণ কোনোমতেই জন্মিতে পারিত না। মত-বিরোধের তীব্র সংঘর্ষই তাহাদিগকে পরস্পরের একান্ত সন্নিকটবর্তী করিয়াছে; এই তীব্র মন্থনের ফলেই তাহাদের হৃদয়-সমুদ্র হইতে প্রণয়-লক্ষ্মী সুধাভাণ্ড-হস্তে আবির্ভূতা হইয়াছেন। সুচরিতাকে স্বমতানুবর্তী করিবার জন‍্য গোরা বজ্র-নির্ঘোষে যে-সমস্ত যুক্তি-পরম্পরা সাজাইয়াছে তাহার মধ‍্যে দিয়া অস্বীকৃত প্রেমের বিদ‍্যুচ্চমক দীপ্ত সইয়াছে; তাহার প্রবল আগ্রহ, তাহার বলিষ্ঠ প্রকৃতির সম্পূর্ণ শক্তি-প্রয়োগের পিছনে প্রেমের বিদ‍্যুৎগর্ভ, সুবিপুল বেগ ঠেলা দিয়াছে। সুচরিতার সহিত প্রথম পরিচয়ের পর নির্জন গঙ্গা-তটে তাহার কঠোর তপস‍্যা-রত, ভাব-মগ্ন চিত্তের এক অসতর্ক ফাঁক দিয়া যে মুগ্ধ প্রণয়াবেশের সঞ্চার হইয়াছে, তাহাই তাহাকে দেশাত্মবোধের প্রতিনিধিত্ব হইতে অভিঘাত-চঞ্চল, উষ্ণরক্ত-সঞ্চরণশীল ব‍্যাক্তিগত জীবনে উন্নীত করিয়াছে। যে মুহূর্তে প্রেম আসিয়া দেশপ্রীতির হাত হইতে রশ্মি কাড়িয়া লইয়াছে, সেই মুহূর্ত যে গোরার জীবন-রথ ব‍্যক্তিত্বের অসাধারণ পথ বাহিয়া চলিয়াছে সে বিষয়ে আমাদের কোনো সন্দেহ থাকে না।
     আসল কথা, ব‍্যক্তিগত জীবনের জীবনের প্রসার ও সীমা সম্বন্ধে আমাদের একটা মোটামুটি সাধারণ ধারণা আছে। যখনই কোনো ব‍্যক্তির জীবন এই সুনির্দিষ্ট সীমা লঙ্ঘন করিতে উদ‍্যত হয়, তখনই আমরা তাহার ব‍্যক্তিত্বের গভীরতা-সম্বন্ধে সন্দিহান হইয়া পড়ি। প্রসার যত বেশি হয়, গভীরতা তত কমে, ইহাই আমাদের সাধারণ বিশ্বাস। সেইজন‍্য যখন কাব‍্যের বা উপন‍্যাসের চরিত্র একটা জাতির সমগ্র আশা-আকাঙক্ষা বা কোনো ধর্ম বা সভ‍্যতার বিশেষত্বের সহিত সম্পূর্ণ একাঙ্গীভূত হয়, তখন তাহার ব‍্যক্তি-স্বাতন্ত্র‍্য এই অসাধারণ প্রসারের জন‍্য খর্ব হইয়া পড়ে বলিয়া আমরা অনুভব করি। শতকণ্ঠের বাণী যদি একের মুখে ধ্বনিত হয় তখন তাহার সেই উক্তির মধ‍্যে তাহার নিজস্ব সুরটি খুব স্পষ্ট থাকে না। সেইজন‍্য গোরা বা 'অপরাজিত' উপন‍্যাসে অপূর্বর জীবন ব‍্যক্তিগত গণ্ডিকে বহুদূর ছাড়াইয়া সমগ্র দেশের সংস্কৃতি বা ধর্মবিশ্বাসকে আশ্রয় করে, অথবা দেশ-কাল-নির্বিশেষে এক রহস‍্যময় অসীমতার দিকে পক্ষ বিস্তার করে