Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা - ৮৫, ৮৬ ও ৮৭

2020-07-11
বলিয়া ঔপন‍্যাসিকের দিক হইতে তাহাদের ব‍্যক্তিত্ব কিঞ্চিৎ ফিকে বা বর্ণবিরল বলিয়া মনে হয়। গোরা যেখানে নিছক তার্কিকতার প্রশ্রয় দিয়াছে, যেখানে সে ঘোষচরপুরের প্রজাদের প্রতি অত‍্যাচার-নিবারণ-জন‍্য বদ্ধপরিকর হইয়া দাঁড়াইয়াছে বা দেশের অবস্থা সম্বন্ধে প্রত‍্যক্ষ অভিজ্ঞতা লাভের জন‍্য গ্রান্ডটাঙ্ক রোড ধরিয়া হাঁটিয়াছে, সেখানে জাতীয়তার প্রবল অভিভবে তাহার ব‍্যক্তিত্ব ক্লিষ্ট, নিষ্পেষিত হইয়াছে। কিন্তু যেখানে সে তর্কের সূত্র ধরিয়া আনন্দময়ীকে বেদনা দিয়াছে বা বিনয়ের সহিত বোঝা-পড়া করিবার জন‍্য তাহার অন্তঃকরণের তলদেশে নিজ তীক্ষ্ণ বুদ্ধিবৃত্তির আলোকপাত করিয়াছে, সর্বোপরি যেখানে সে সুচরিতার সহিত নিগূঢ় হৃদয়-বন্ধনে আবদ্ধ হইয়াছে যেখানে সে প্রতিনিধিত্বের ছায়ামণ্ডলমুক্ত, ব‍্যক্তি-স্বাতন্ত্র‍্যের আলোকে ভাস্বর পুরুষ।
     গোরার জন্ম-রহস‍্য তাহার সম্বন্ধে আর একটি উল্লেখযোগ‍্য বিষয়। গোরাকে আইরিশ-ম‍্যান প্রতিপন্ন করায় লেখকের কী উদ্দেশ‍্য তাহাও কৌতূহলপূর্ণ জিজ্ঞাসার বিষয়ীভূত হইয়াছে। গ্রন্থের শেষে এই জন্ম-রহস‍্য-প্রকাশ অতর্কিত বজ্রপাতের মতোই গোরার উপর আসিয়া পড়িয়াছে। অবশ‍্য ইহাতে তাহার দেশভক্তির কোনো হ্রাস হয় নাই--কিন্তু এই দেশভক্তি যে বিশেষ সাধনার পথ ধরিয়া চলিতেছিল উহা তাহাকে একেবারে বিলুপ্ত করিয়া দিয়াছে। হিন্দুধর্মের যে কঠোর নিয়ম-সংযম, যে অবিচলিত আচার-নিষ্ঠা গোরার জীবনের মহত্তম ব্রত ছিল, এক মুহূর্তেই প্রমাণ হইয়াছে যে, সে সেই ব্রতপালনের অধিকারী নহে। দেশানুরাগ ও ধর্মের বাহ‍্যানুষ্ঠানের মধ‍্যে যে অচ্ছেদ‍্য নিত‍্যসম্বন্ধ সে বরাবর কল্পনা করিয়াছিল, নিয়তির নির্মম ছুরিকাঘাতে মুহূর্তমধ‍্যে সে যোগসূত্র ছিন্ন হইয়া গেল। যে শুষ্ক, নির্মম আচার-পালন তাহার হৃদয়ের স্বাভাবিক সুকুমার বৃত্তির উপর জগদ্দল পাথরের মতো চাপিয়া ছিল তাহা নিমেষ-মধ‍্যে বাষ্পাকারে শূন‍্যে মিশাইয়া গেল। নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে যে হিন্দুধর্মের সর্বাপেক্ষা ভক্তিমান, একনিষ্ঠ ও গভীর অন্তদৃষ্টিশীল সাধক ছিল সে অহেন্দু বলিয়া প্রমাণিত। এই আকষ্কিম বজ্রাঘাত গভীর বেদনার সঙ্গে একটা বিপুল মুক্তির আনন্দ জড়িত হইয়াছে। গোরার পূর্বজীবনের প্রচেষ্টা, তাহার ব‍্যাকুল ও একাগ্র সাধনা তাহার পশ্চাতে ভস্মীভূত হইয়াছে; নিজের অতীত জীবনের দিকে তাকাইয়া সে এক বিরাট ধ্বংসস্তূপ ও শূন‍্যতা নিরীক্ষণ করিয়াছে। কিন্তু এখন হইতে তাহার দেশপ্রীতির ধারা অতি স্বচ্ছন্দে ও বাধাশূন‍্যভাবে প্রবাহিত করে নাই। বিনয়ের সহযোগিতায় ও সুচরিতার প্রেমে এক মুক্ততর, পূর্ণতর জীবনের অধিকারী হইয়া, প্রতিবেশের সহিত ব‍্যর্থ সংগ্রামে অযথা শক্তিক্ষয়ের দুর্ভাগ‍্য হইতে অব‍্যাহিত লাভ করিয়া, সত‍্যের মেঘাবরণমুক্ত, প্রসন্ন আলোকে, সে পূর্ণ উৎসাহে নূতন পথে ছুটিয়া চলিয়াছে। উপন‍্যাসের যেখানে যবনিকাপাত, জীবনে সেইখানে কর্মের আরম্ভ। এই নব-দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন, নববলে বলীয়ান গোরার জীবন-চরিত কোনো ভবিষ‍্যৎ উপন‍্যাসের বিষয়ীভূত হইবে কি না, কে বলিতে পারে।
     বিনয় তাহার দ্বিধাসংকোচপূর্ণ, সুকুমার হৃদয়টি লইয়া আমাদের সাধারণ স্তরের মানুষ---একদিকে গোরার অনমনীয় মতবাদের প্রতি, অপর দিকে তাহার কোমল সামাজিক স্নেহবন্ধনের প্রতি, উন্মুখ হৃদয়ের বিশ্বস্ততার দাবি--একদিকে গোরার অনমনীয় মতবাদের প্রতি, অপর দিকে তাহার কোমল সামাজিক স্নেহবন্ধনের প্রতি, উন্মুখ হৃদয়ের বিশ্বস্ততার দাবি--এক দুই-এর মধ‍্যে সতত বিরোধে সে উভয়-সংকটে পড়িয়াছে। তাহার যুক্তি-তর্ক, মতবাদ হৃদয়াবেগের নিকট মাথা হেঁট করিয়াছে। গোরার সহিত সমস্ত বাক্-বিতণ্ডায় উপেক্ষিত হৃদয়-বৃত্তিরই সে পক্ষ সমর্থন করিয়াছে। একবার মনে হইয়াছে বুঝি গোরার সহিত তাহার একটা আপস-নিষ্পত্তি হইবে। পরেশবাবুর পরিবারের সহিত প্রথম পরিচয়ের পর যখন বিনয় উচ্ছ্বসিত, আবেগময় ভাষায় গোরার সমক্ষে তাহার হৃদয়ে প্রেমের অপরূপ প্রথম আবির্ভাবের বর্ণনা করিয়াছিল ও গোরা এই দুর্জয় শক্তির, এই নব-লব্ধ অভিজ্ঞতার স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষা করিবে, তাহাকে যতদূর সম্ভবপর আপনার স্বেচ্ছা-নির্বাচিত পথে চলিতে দিবে। কিন্তু কার্যত দেখা গেল যে, সে বিনয়ের নবোন্মেষিত প্রণয়াবেগকে এক তিল স্বাধীনতা দিতেও প্রস্তুত নহে। সুতরাং গোরার পরবর্তী ব‍্যবহার এই দৃশ‍্যের বিরুদ্ধতাচরণ করে।
     বিনয়ের সহিত ললিতার প্রেমের উদ্ভব ও পরিণতি খুব নিপুণভাবে চিত্রিত হইয়াছে। একটা প্রবল বিরুদ্ধতা, এমন কি তীব্র অবজ্ঞা প্রকাশের ছদ্মবেশে প্রেম কীরূপে ইন্দ্রজাল বিস্তার করে, প্রেমের সেই চিররহস‍্যময় প্রকৃতিরই উদ্ঘাটন বিনয়-ললিতার সম্পর্কটিকে মনোজ্ঞ করিয়া তুলিয়াছে। প্রথম সাক্ষাতেই ললিতা বিনয়ের প্রতি একটা অপূর্ব আকর্ষণ, তাহার উপর নিজ অধিকার জারি করার একটা প্রবল প্রেরণা অনুভব করিয়াছে। তাই সুচরিতার সহিত বিনয়ের প্রণয়-সম্ভাবনায় তাহার মন একটা ক্ষণস্থায়ী, তীব্র ঈর্ষা-দ্বারা অভিভূত হইয়াছে। সে সন্দেহ হইতে মুক্তি পাইয়া সে গোরার বিরুদ্ধে এক প্রচণ্ড প্রতিযোগিতার দ্বারা অনুপ্রাণিত হইয়াছে। কঠোর আঘাত ও নির্মম ব‍্যঙ্গ দ্বারা সে বিনয়কে গোরার প্রভাব হইতে ছিনাইয়া লইতে চাহিয়াছে, তাহাকে গোরার উপগ্রহত্ব পদ হইতে বিচ‍্যুত করিয়া নিজের কক্ষপথে আবর্তিত করিতে প্রয়াস পাইয়াছে। বিনয়ের উপর গোরার প্রভাব যে একটু অস্বাভাবিকত্ব, একটু অনুচিত আতিশয‍্য আছে, বিনয়ের প্রকৃতিতে যে একটা অবরুদ্ধ বিদ্রোহোন্মুখতা আছে, প্রণয়ের স্বভাবসিদ্ধ তীক্ষ্ণদর্শিতার সহিত ললিতা প্রথম সাক্ষাতেই তাহা আবিষ্কার করিয়াছে ও দাঁড়ি-পাল্লার অপরদিকে তাহার প্রভাবের সমস্ত গুরুভার নিক্ষেপ করিয়াছে। তাহার অবিরাম আকর্ষণে বিনয় অনেকটা বিচলিত হইয়াছে ও গোরার মতের বিরুদ্ধে অভিনয়ে যোগ দিতে রাজি হইয়াছে। এই অভিনয়ের জন‍্য প্রস্তুত হইবার সময় ললিতা নিজ ব‍্যবহারে প্রেমের আকস্মিক ভাব-পরিবর্তন ও অস্থিরমতিত্বের পূর্ণমাত্রা প্রকাশ করিয়াছে। স্টিমার-যাত্রার কালে বিনয়ের প্রতি একান্ত নির্ভরেই ললিতার প্রেমের অকুণ্ঠিত, অনবগুণ্ঠিত প্রকাশ। কিন্তু এই অনিবার্য আত্মপরিচয়ের পরেও প্রেমের পথ ঠিক সরল রেখার অনুবর্তন করে নাই। শেষে ব্রাহ্মসমাজের নীচ আক্রমণ ও কাপুরুষোচিত ইতর ব‍্যঙ্গ-বিদ্রূপই এই ইষৎ অম্লস্বাদ প্রেমের ফলে পরিপূর্ণ পক্কতার রং মাখাইয়া দিল। ললিতার দৃপ্ত তেজস্বিতা তাহার প্রেমের সহায়তায় অগ্রসর হইয়া তাহাকে সংকোচহীন ও মুক্তকণ্ঠ করিয়া তুলিল ও বিনয়েরও বীরু, দ্বিধা-দুর্বল চিত্তে তাহার কতকটা উত্তাপ সংক্রামিত করিল। তাহাদের মিলনের পথে যে

সমস্ত কৃত্রিম সমাজ ও ধর্মমতমূলক বাধা মাথা তুলিয়াছিল, ললিতার প্রচণ্ড ইচ্ছা-শক্তি তাহাদিগকে ভাসাইয়া লইয়া গেল। বিবাহ ব্রাহ্মমতে হইবে কী হিন্দুমতে হইবে---এই আপত্তি প্রায় তিন অধ‍্যায় ধরিয়া পল্লবিত হইয়াছে এবং এই সমস‍্যার শেষ পর্যন্ত যে সমাধান হইয়াছে তাহাও মোটেই সন্তোষজনক ও চূড়ান্ত নহে। শেষ পর্যন্ত ললিতার নির্বন্ধাতিশয‍্যে স্থির হইল যে, শালগ্রামশিলা বাদ দিয়া বিবাহ হিন্দুমতেই হইবে, কেননা বিবাহের জন‍্য ব্রাহ্মসমাজভুক্ত হওয়া বিনয়ের পক্ষে অপমানজনক হইবে। এই আপত্তি ললিতার সম্বন্ধেও সমানভাবে প্রযোজ‍্য। এই সমস‍্যার আসল মীমাংসা হইত উভয়-সম্প্রদায়গত আনুষ্ঠানিক ব‍্যাপারের সম্পূর্ণ বর্জনের দ্বারা। গ্রন্থের এই অংশটি তার্কিকতার দ্বারা অযথা ভারাক্রান্ত বলিয়া মনে হয়। এক সামাজিক মূঢ়তা ও গোঁড়ামির চিত্র প্রদর্শন ছাড়া এই সমস্ত নূতন নূতন বাধা প্রবর্তনের জন‍্য কোনো উপযোগিতা নাই।
     ললিতার সহিত সুচরিতার ভাবগত ঐক‍্য, অথচ চরিত্রগত পার্থক‍্য খুব চমৎকারভাবে দেখানো হইয়াছে। ললিতার নির্ভীক বিদ্রোহ-ঘোষণার পাশে সুচরিতার শান্ত-ধীরে, বিনয়-নম্র নূতন জ্ঞান-আহরণের জন‍্য উন্মুখ, ভক্তিপূর্ণ শিক্ষার্থীর ন‍্যায় প্রকৃতিটি একটি সুন্দর বৈপীরত‍্য-বিকাশের হেতু হইয়াছে। পরেশবাবুর সহিত তাহার সম্বন্ধটি ভক্তির সুরভি-অর্ঘ‍্যে, উদবিগ্ন স্নেহ-ব‍্যাকুলতায়, সর্বোপরি একটি গভীর অধ‍্যাত্ম-মিলনে, পিতা-পুত্রীর পরস্পর সম্পর্কের আদর্শস্থানীয় হইয়াছে অথচ ইহার মধ‍্যে আদর্শলোকের ছায়াময় অস্পষ্টতা কোথাও নাই। সুচরিতার ন‍্যায় আত্মসুখে উদাসীন, আত্মবিসর্জনোম্মুখ প্রকৃতি যে হারাণকে প্রত‍্যাখ‍্যান করিতে উত্তেজিত হইয়াছে, তাহার কতকটা কারণ পরেশবাবুর প্রতি ভক্তি ও গোরার প্রতি নবজাত অনুরাগ; কিন্তু এই বিচ্ছেদ-সংঘটনের প্রধান কৃতিত্ব হারাণেরই। তাহার আধ‍্যাত্মিক অহংকার, তীব্র অসহিষ্ণুতা এবং সহানুভূতি ও কল্পনাশক্তির একান্ত অভাবই সুচরিতার মতো মিষ্টস্বভাবকে তিক্ত করিয়া তুলিয়াছে। ব্রাহ্মসমাজের ন‍্যায় নিজ আধ‍্যাত্মিক জাগরণ-সম্বন্ধে অত‍্যন্ত প্রবলভাবে সচেতন, নবোৎসাহের মাদকতায় প্রচণ্ডভাবে উগ্র, নবীন ধর্মসম্প্রদায়ের মধ‍্যেই হারাণের মতো চরিত্রের আবির্ভাব সম্ভব। জড়, নিদ্রালস ও গভীর ঔদাস‍্যপূর্ণ হিন্দু-সমাজে সামাজিক অত‍্যাচারের আকৃতি অন‍্যবিধ। হিন্দুধর্মের অত‍্যাচার অনেকটা চেতনাহীন মূঢ় যান্ত্রিকতার অত‍্যাচার; হৃদয়হীন নির্বিকারতাই ইহার উৎপীড়নের প্রধান অস্ত্র; ইহার মধ‍্যে নির্মম ব‍্যূহরচনা, ক্রূর সৈনাপত‍্য-কৌশলের বিশেষ প্রাদুর্ভাব নাই। মোটের উপর চাণক‍্যনীতির অস্ত্রশালা হইতে ইহার অস্ত্রশস্ত্র সংগৃহীত হয় না বলা যাইতে পারে। কিন্তু ব্রাহ্মসমাজের উৎপীড়নের মধ‍্যে আধ‍্যাত্মিক দম্ভের সমস্ত অসহনীয় বিষজ্বালা বর্তমান; ইহার সমস্ত ক্ষুদ্রতা, সমস্ত ঈর্ষাপরায়ণতা, সমস্ত নীচ প্রবৃত্তি, আধ‍্যাত্মিকতার পাগড়ি বাঁধিয়া, ভগবানের নিজ-হাতে দেওয়া সনন্দকে জয়পতাকার মতো আস্ফলন করিয়া ইহার হতভাগ‍্য অত‍্যাচার-পাত্রের জীবনকে বিষজর্জর করিয়া তোলে। আধুনিক যুদ্ধিপ্রণালীর সমস্ত অস্ত্র ইহার করায়ত্ত ও নিজ আধ‍্যাত্মিক উৎকর্ষ-সম্বন্ধে অভ্রান্ত বিশ্বাস ইহার অস্ত্রক্ষেপকে আরও নিদারুণ ও দুর্বিষহ করে। নদীর জোয়ারে যেমন প্রচুর উর্বরতা-শক্তিসহ কচুরিপানা প্রভূতি অনিষ্টকর উদ্ভিদ ভাসিয়া আসে, সেইরূপ ব্রাহ্মধর্মের জোয়ারে আধ‍্যাত্মিক নবজাগরণের সঙ্গে সঙ্গে হারাণবাবুর মতো বিরক্তিকর জীবও ভাসিয়া আসিয়াছ
     সুচরিতার হৃদয়ে প্রেম নিতান্ত নিঃশব্দ পদসঞ্চারে ম্লান সন্ধ‍্যালোকের মতো অগোচরে আবির্ভূত হইয়াছে। ললিতার মতো তাহার তীব্র বিদ্রোহ ও অসহ‍্য অন্তর্জ্বালা নাই, আছে একপ্রকার শান্ত, মৃদু, বিষণ্ন বিস্ময়। গোরার উপেক্ষাতে একটা অনির্দেশ‍্য বেদনাবোধই তাহার প্রেমের প্রথম সূচনা। তারপর গোরার দুর্জয় ইচ্ছাশক্তি, তাহার প্রবল আবেদন, তাহার স্বদেশ-প্রীতির উচ্ছ্বসিত আন্তরিকতা, সুচরিতার সমস্ত বদ্ধমূল পূর্ব-সংস্কারকে সবলে উন্মূলিত করিয়া দুর্নিবার বেগে তাহাকে গোরার দিকে আকর্ষণ করিয়াছে। গোরার অলঙঘ‍্য আকর্ষণী শক্তির স্পষ্টতম নিদর্শন এই যে, সুচরিতার হৃদয়ে তাহার জীবনের মূল পর্যন্ত বিস্তৃত পরেশবাবুর প্রভাবও তাহার দ্বারা অভিভূত হইয়াছে। তাহার একনিষ্ঠ, ভক্তিপ্রবণ মনে ধর্মবিপ্লবের আঘাতের গভীরতা খুব নিপুণভাবে বর্ণিত হইয়াছে। প্রত‍্যেক আঘাতেই সে পরেশবাবুর আদর্শ ও শিক্ষাকে আরও ব‍্যাকুলভাবে আঁকড়াইয়া ধরিতে চাহিয়াছে; পুরাতনের সহিত দুর্জয় নবোপলব্ধির একটা সমন্বয়-সাধন করিতে চাহিয়াছে। প্রেমের গোপন সুড়ঙ্গ-পথ দিয়া গোরার নূতন আদর্শ তাহার অন্তরের গভীরতম পুরে প্রবেশ করিয়া তথাকার বদ্ধমূল ধর্মসংস্কারগুলিকে বিস্ফোরকের মতো তেজে উড়াইয়া দিতে চাহিয়াছে এবং শেষে সমস্ত বিরুদ্ধতাকে অতিক্রম করিয়া সে নিজেকে হিন্দু-নামে পরিচিত করিয়াছে। হরিমোহিনীর সমস্ত মূঢ় বিপক্ষতাচরণ তাহাকে অন্তরে অন্তরে ক্ষুব্ধ, পীড়িত করিয়াছে, কিন্তু তাহার স্বাভাবিক নম্র ও আদেশ-পালন-তৎপর প্রকৃতিটিকে প্রকাশ‍্য বিদ্রোহে উত্তেজিত করিতে পারে নাই। শেষে এক মুহূর্তে নিতান্ত অপ্রত‍্যাশিতভাবে তাহার সমস্ত সমস‍্যার সমিধান সইয়াছে। গোরার জন্ম-রহস‍্য-প্রকাশ নিতান্ত দ্বন্দ্বহীনভাবে সুচরিতার পূর্ব-সংস্কারের পুরাতন মঞ্চের উপরই তাহাকে পাশাপাশি দাঁড় করাইয়া দিয়াছে। সুচরিতার আত্মজিজ্ঞাসাশীল হৃদয় অতীতের সহিত চিরাবিচ্ছেদ স্বীকার না করিয়াই প্রেমের সহিত সমস্ত নবীন আদর্শকে এক বৃহৎ সমন্বয়ের ক্ষেত্রে বরণ করিয়া লইয়াছে। সুচরিতার প্রেমই যেন তাহার বৈদ‍্যুতিক আকর্ষণের তেজ গোরার অন্তর্নিহিত সারাংশটিকে বাহ‍্যসংস্কারের কঠিন বহিরাবরণ হইতে মুক্তি দিয়া নিবিড় আলিঙ্গনে তাহাকে একাত্ম করিয়া লইয়াছে। তাহাদের বিবাহ দুই প্রজ্বলিত মানবাত্মার একান্ত মিলন।
     সুচরিতার চরিত্রের বিশেষত্বই এই যে, আধ‍্যাত্মিক আত্মজিজ্ঞাসার পথ দিয়াই ইহার পূর্ণ বিকাশ। তাহার সমস্ত যুক্তি-তর্ক, তাহার সমস্ত দ্বিধা-দ্বন্দ্বের ধূমাবরণের মধ‍্য দিয়াই তাহার ব‍্যক্তিত্ব ক্রমোজ্জ্বল দীপশিখার ন‍্যায় ভাস্বর হইয়াছে। সাংসারিক কর্তব‍্যের চাপে এ প্রকৃতি ফুটিত না, উচ্চকণ্ঠ বিদ্রোহ-ঘোষণায় ইহা স্বাধীনতা পাইত না, প্রেমের নিরঙ্কুশ অধিকারের দোহাই দিয়া ইহার সার্থকতালাভ হইত না। তর্কমূলক বিশ্লেষণ দ্বারা গভীর জীবন-রহস‍্য ধরা যায় না--এই সাধারণ বিশ্বাস সুচরিতার চরিত্রের দ্বারাই খণ্ডিত হইয়াছে।
     হরিমোহিনীর চরিত্রের মধ‍্যে একটু অভিনবত্ব আছে। গ্রন্থের প্রথমাংশে সে একজন খাঁটি হিন্দু ঘরের বিধবা---তেমনি কুণ্ঠিত, তেমনি পরমুখাপেক্ষী, তেমনি সর্বংসহা। কিন্তু অল্পদিনের মধ‍্যেই তাহার অভাবনীয় পরিবর্তন সাধিত হইয়াছে। সুচরিতার উপর নিজ

অধিকার অক্ষুণ্ন রাখিবার জন‍্য তাহার দৃঢ় সংকল্প ও নূতন উপায়-উদ্ভাবন-কৌশল বাস্তবিকই বিস্ময়কর। সুচরিতার শান্ত, নম্র প্রকৃতিকে দাবাইয়া রাখা তো সহজ, কিন্তু মরণোন্মুখের চরম সাহসের সহিত সে গোরারও সম্মুখীন হইয়াছে ও একমাত্র সেই গোরার প্রবল, অনমনীয় ইচ্ছাশক্তিকে অভিভূত করিয়া তাহাকে সংকোচের দ্বিধাভাব ও পরাজয়ের গ্লানি, অনুভব করাইয়াছে। তাহার পূর্বজীবনের ইতিহাসে আমরা জানিতে পারি যে, তাহার দেবরেরা ফাঁকি দিয়া তাহার সম্পত্তিতে অধিকার-ত‍্যাগের সহি করাইয়া লইয়াছিল কিন্তু সুচরিতার সম্বন্ধে এরূপ ফাঁকি যে চলিবে না, তাহা নিঃসন্দেহ। সম্পত্তি-সম্বন্ধে হরিমোহিণী যতই বিষয়জ্ঞানশূন‍্য হউক না কেন, সুচরিতার উপর স্বত্বরক্ষা বিষয়ে তাহার পাকা জমিদারি চালের অভাব নাই। তাহার বিষয়-বুদ্ধি সারাজীবন সুপ্ত থাকিয়া হঠাৎ শেষ বয়সে মাথা তুলিয়া উঠিয়াছে ও স্নেহাতিশয‍্য তাহাকে অসামান‍্য তীক্ষ্ণতা ও দূরদর্শিতা দিয়াছে। এই অবস্থাসংকটই হরিমোহিনীকে সাধারণ হিন্দু বিধবা হইতে পৃথক করিয়া তাহার উপর কিয়ৎ পরিমাণে অসামান‍্যতার আরোপ করিয়াছে।
     আনন্দময়ী ও পরেশবাবু সেই পিঙ্গল ও অবাস্তবতা-দোষে দুষ্ট হইয়া থাকে। আধুনিক যুগে বাস্তব-জীবনে এইরূপ আদর্শচরিত্রে বিশ্বাস ক্রমশই অন্তর্হিত হইতেছে, কেননা ঔপন‍্যাসিক প্রায়ই এই আদর্শলাভের ক্রমবিকাশ দেখাইতে পারেন না। যে আগুনে আমাদের খাদ-মিশানো, ভালো-মন্দে-মাখা প্রকৃতিটি একেবারে অনবদ‍্য বিশুদ্ধ ও নিষ্কলঙ্ক উজ্জ্বলতা লাভ করিতে পারে, প্রাত‍্যহিকতার ফুৎকারে সে আগুন প্রজ্বলিত হয় না। এরূপ আদর্শ চরিত্র দেখিলেই তাহাদের পূর্বজীবনী ও পরিণতির প্রক্রিয়া-সম্বন্ধে আমাদের কৌতূহল জাগে এবং উপযুক্ত কারণ-নির্দেশের দ্বারা সে কৌতূহল নিবারণ করিতে না পারিলে আমাদের অবিশ্বাস পরাজয় স্বীকার করে না। এখানে আনন্দময়ী ও পরেশবাবুর মধ‍্যে আনন্দময়ীকে আমরা অধিকতর সহজভাবে গ্রহণ করিতে পারি। তাঁহার পূর্ব-ইতিহাস তাঁহার চরিত্রের উপর অনেকটা সন্তোষজনক আলোকপাত করে। তাঁহার চরিত্রের বিশেষত্ব---সর্বপ্রকার আচার-বিচারগত সংস্কার-নিরপেক্ষতা, সর্ববিধ সংকীর্ণতা হইতে মুক্তি, স্বচ্ছ অন্তদৃষ্টি, পরকে আপন করিবার ও সমস্ত বিষয়ের ভালো দিক লক্ষ‍্য করিবার অসামান‍্য ক্ষমতা, নীরব, নিরভিযোগ সহিষ্ণুতা ও করুণ সমবেদনা--গোরাকে পুত্ররূপে স্বীকার করা হইতেই সমুদ্ভূত। আনন্দময়ীর ব‍্যবহার ও কথাবার্তায় যে গভীর অভিজ্ঞতা ও তীক্ষ্ণ বিচারবুদ্ধির পরিচয় পাওয়া যায়, তাহার মধ‍্যে কোনো পাণ্ডিত‍্য বা তার্কিকতার পরুষতা নাই, কোনো অধীত বিদ‍্যার উগ্র গন্ধ নাই, তাহার প্রবাহ নিতান্ত স্বচ্ছ ও স্বাভাবিক, করুণায় ও সহানুভূতিতে শীতল। বিনয় ও গোরার প্রত‍্যেক ভাব-পরিবর্তন, মনোজগতের প্রত‍্যেক তরঙ্গলীলা তাঁহার নখদর্পণে--এক প্রকার সহজ সংস্কারের বলে যেন তিনি তাহাদের অন্তরের অন্তস্তল পর্যন্ত দেখিয়াছেন। যেখানে তাহাদের আচরণ অনুচিত বলিয়া তাঁহার মনে হইয়াছে, সেখানেও উচ্চমঞ্চ সইতে উপদেশের আড়ম্বর নাই, আছে সস্নেহ অনুনয়। আনন্দময়ীর চরিত্রের খুব বিস্তৃত বিশ্লেষণ না থাকিলেও তাঁহার আশ্চর্য উদারতা ও অনাবিল করুণার্দ্র বিচার-বুদ্ধি কোন্ মূল উৎস হইতে প্রবাহিত তাহার একটা সাধারণ ধারণা আমরা করিতে পারি। আনন্দময়ী নিজ পূর্ব-ইতিহাস বিবৃত-প্রসঙ্গে একস্থানে বলিয়াছেন যে, তাঁহার স্বামীর চাকরির সময় তাঁহার পূর্বসংস্কারগুলিকে একটি একটি করিয়া সবলে উৎপাটিত করা হইয়াছে এবং তাহাই তাঁহার সংস্কার-মুক্তির অন‍্যতম কারণ। কিন্তু এই কারণ-নির্দেশ আমরা সন্তুষ্ট হইতে পারি না। তাঁহার মুক্তি এইরূপ জোর করিয়া বেড়ি ভাঙার ফল নহে, কেননা বেড়ি ভাঙিলেও তাহার কলঙ্ক দেহ-মনকে স্পর্শ করিয়া থাকে। তাঁহার মুক্তি অন‍্যপথে আসিয়াছে --যে রহস‍্যময় পথে শীতারম্ভের দমকা হাওয়া আসিয়া পুরাতন জীর্ণ পত্রগুলিকে ঝরাইয়া উড়াইয়া দেয়, যে অজ্ঞাত উপায়ে সন্তানের জন্ম-মুহূর্তে মাতৃস্তনে ক্ষীরধারার সঞ্চার হয়, সেই মুহূর্ত-মাত্র-স্থায়ী আকস্মিক বিপ্লবে গোরাকে কোলে লইবার পর তাঁহার সমস্ত পূর্বসংস্কার জীর্ণ বস্তের ন‍্যায় তাঁহার মন হইতে খসিয়া পড়িয়াছে।
     পরেশবাবুর প্রহেলিকা আরও দুরধিগম‍্য। 'বৃন্তহীন পুষ্পসম আপনাতে আপনি বিকশি' কবে ও উপায়ে যে তিনি তাঁহার আশ্চর্য আধ‍্যাত্মিক পরিণতি লাভ করিলেন পাঠককে তাহার কোনো আভাস দেওয়া হয় নাই। তাঁহার উক্তিগুলির মধ‍্যেও পাণ্ডিত‍্যের গুরুভার বা অপরকে নিয়ন্ত্রণের অহংকার যথাসম্ভব বর্জিত হইয়াছে, তাহাদের মধ‍্যে গভীর অনুভূতির সুরও পাওয়া যায়। কিন্তু তথাপি আনন্দময়ীর ন‍্যায় তাঁহার জ্ঞান একেবারে সহজ সংস্কারের কথা নহে; ইহা যুক্তি-তর্কের উপর প্রতিষ্ঠিত ও গভীর তত্ত্বান্বেষণের ঘোর- পাকে আবর্তিত। সুতরাং আনন্দময়ীর অবিমিশ্র স্বাভাবিকতা তাঁহাতে নাই। তাঁহার অতীত ইতিহাসের অনেক প্রয়োজনীয় উধ‍্যায়ই অপ্রকাশিত রহিয়াছে। বরদাসুন্দরীর মতো সংকীর্ণমনা, সাম্প্রদায়িক মনোব‍ৃত্তিসম্পন্ন স্ত্রীলোকের সহিত তাঁহার বিবাহ কীরূপে হইল, ব্রাহ্মসমাজের দলে তিনি একদিন কীরূপে নিজেকে মিশাইয়াছিলেন, যে বিরোধের ফলে তিনি সমাজ ও পরিবার ত‍্যাগ করিয়া নিজ ব‍্যক্তিগত স্বাধীনতা ও আধ‍্যাত্মিক মুক্তির পথে বাহির হইয়া পড়িলেন, সেই বিরোধের কারণ তাঁহার পূর্বজীবনে ঘটিয়াছিল কি না---এই সমস্ত অত‍্যন্ত স্বাভাবিক প্রশ্নের কোনো উত্তর পাওয়া যায় না। আসল কথা পরেশবাবুর ধর্মসমস‍্যার গ্রন্থিচ্ছেদনের উপযোগী শাণিত অস্ত্রের মতো করিয়া চিত্রিত করা হইয়াছে, কিন্তু কোন্ অস্ত্রশালায় তাহাকে শান দেওয়া হইয়াছে তাহার কোনো পরিচয় নাই। আবার পরেশবাবুর আধ‍্যাত্মিক প্রভাব, ম‍্যাথু আর্নল্ডের culture-এর মতো অনেকটা শীর্ণ ও অভাবাত্মক-প্রকৃতিবিশিষ্ট (negative)--ইহা ধ‍্যানকক্ষের নির্জনতায় নিজেকে পূর্ণতা ও পরিণতি দান করিতে পারে, কিন্তু সংসারের জনাকীর্ণ, বিরোধ-মুখরিত পথ দিয়া অপরকে সার্থকতার দিকে লইয়া যাইবার মতো শক্তি ইহার নাই। সমস্ত পরিবারের মধ‍্যে কেবল সুচরিতা ও ললিতাই তাঁহার দ্বারা প্রভাবান্বিত হইয়াছে, এমন কি ললিতার উপরও তাঁহারও প্রভাব বিশেষ লক্ষণীয় নহে। মোট কথা, পরেশবাবু খুব জীবন্ত বলিয়া আমাদের উপন‍্যাসে একজন করিয়া অলৌকিক-শক্তিসম্পন্ন, দিব‍্যদৃষ্টি মহাপুরুষের স্থান নির্দিষ্ট আছে--রবীন্দ্রনাথও বোধ হয় অজ্ঞাতসারেই সেই