Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা- ১১৮, ১১৯ ও ১২০

2020-08-06
তাহার মাতা তাহার ষড়যন্ত্র ব‍্যর্থ হইবার সঙ্গে সঙ্গেই উপন‍্যাস হইতে চির-নির্বাসিত হইয়াছে। কান্তিচন্দ্রের কঠোরতাও উপন‍্যাসের মধ‍্যে বিশেষ কোনো জটিলতার সৃষ্টি না করিয়াই পুত্র-স্নেহে দ্রবীভূত হইয়াছে -- নবগোপালের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ স্বাধীনচিত্ততাও বিবাহের পর কোনো নূতন কৃতিত্ব-প্রদর্শনের সুযোগ হইতে বঞ্চিত হইয়া নিষ্কিয়ত্বের জন‍্য নিষ্প্রভ হইয়া পড়িয়াছে। মোট কথা, বিবাহের পর উপন‍্যাসটি নিজ অস্তিত্ব হারাইয়া ভ্রমণকাহিনীতে পর্যবসিত হইয়াছে--কাশ্মীরভ্রমণের সৌন্দর্যবর্ণনার মধ‍্যে উপন‍্যাসের নিজস্ব রস তলাইয়া গিয়াছে।
     'নবীন সন্ন‍্যাসী' উপন‍্যাসে(১৩১৬) সর্বাপেক্ষা জীবন্ত চরিত্র গদাই পালের--অপেক্ষাকৃত উচ্ছ শ্রেণীর চরিত্রগুলি তাহার সহিত তুলনায় নির্জীব ও রক্তহীন বলিয়া মনে হয়। আমাদের অর্থনৈতিক জীবনের জটিল ব‍্যবস্থার মধ‍্যে নায়েব-গোমস্তা-জাতীয় একপ্রকার জীবের উদ্বভ হইয়াছে--ঔপন‍্যাসিক ইহাদের মধ‍্যে নিজ আর্টের যথেষ্ট মৌলিক উপাদান আবিষ্কার করিতে পারেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় প্রায় কোনো ঔপন‍্যাসিক এই জাতীয় চরিত্রের বিশেষত্ব ও মূল‍্য সম্বন্ধে সেরূপ সচেতন না হইয়া কেবল মামুলী-নায়িকার চরিত্রের চর্বিত-চর্বণ করিতেছেন। এক দীনেন্দ্রকুমার রায় নীলকুঠির নায়েবের কার্যকলাপ ও নৈতিক বিশেষত্ব লিপিবদ্ধ করিয়া উপন‍্যাসের মধ‍্যে কতকটা নূতন রসের সঞ্চার করিয়াছেন। ইহাদের অদ্ভুত ষড়যন্ত্রকৌশল, ক্ষুরধার বুদ্ধি, জালজুয়াচুরি, দাঙ্গা-হাঙ্গামা প্রভৃতি সর্বপ্রকার পাপাচরণের প্রতি অতিশয় প্রবণতা, অথচ একপ্রকারের বিকৃত প্রভুভক্তি ও বিশ্বস্ততা, মিথ‍্যাচারে আকণ্ঠ মগ্ন থাকিয়াও ধর্মের বাহ‍্যানুষ্ঠানের প্রতি একান্ত ভক্তি, স্বাভাবিক নেতৃত্বশক্তি ও লোকবশীকরণের আশ্চর্য ক্ষমতা -- এই সমস্ত ভালো-মন্দ মিশাইয়া ইহাদের চরিত্রে এমন একটা বৈশিষ্ট‍্য ও জটিলতা আনিয়া দিয়াছে যাহা ঔপন‍্যাসিকের পক্ষে অত‍্যন্ত স্পৃহণীয়। আমাদের পল্লীজীবনে ইহাদেরই প্রভাব সর্বাপেক্ষা প্রবল---ইহারাই পল্লীজীবনের কাপুরুষতা, নৈতেক জড়তা, হেয় দাসত্ব-প্রবণতা ও কপট মিথ‍‍্যাচারের জন‍্য সর্বাপেক্ষা দায়ী। পল্লীজীবনের বিষজর্জর ও লাঞ্ছনা-মূর্ছিত যে মূর্তি আমাদের অতি-পরিচিত, ইহারাই তাহার শীল্পী ও স্রষ্টা। মোট কথা, আমাদের মৃতপ্রায় নিষ্ক্রিয় সমাজে এই জাতীয় লোকের মধ‍্যেই কিছু প্রাণস্পন্দন, কিছু বিপথগামী উদ‍্যমশীলতা ও কর্মশক্তি, কিয়ৎ-পরিমাণে বিকৃত রাছনীতি ও কূটকৌশল, স্রোতোহীন শুষ্কপ্রায় জলাশয়ে দূষিত জলের মতো সঞ্চিত ছিল।
     গদাই পাল এই শ্রেণীর লোকের অতি চমৎকার প্রতিনিধি। তাহার চরিত্রটি উচ্ছাঙ্গের সৃষ্টি-কৌশলের নিদর্শন। সাধারণত প্রভাতকুমারের চরিত্রস‍ৃষ্টি অত‍্যন্ত অগভীর, কিন্তু গদাই-এর চরিত্রের সমস্ত অলিগলি, তাহার মনের প্রণালীতে প্রবহমান। হরিদাসীর সহিত তাহার প্রেমাভিনয়, জমিদার গোপীকান্তবাবুর রহস‍্যোদ্ভেদ, রমণ ঘোষের প্রতি বৈর-নির্যাতনের জন‍্য তাহার কৌশ-জাল-বিস্তার --সমস্তই অনন‍্যসাধারণ ব‍্যক্তিত্বের পরিচয়। গদাই পাল মাথার চুল হইতে পায়ের নখ পর্যন্ত সর্বাঙ্গে প্রাণের তরিৎ-শক্তিতে পূর্ণ --তাহার প্রত‍্যেক ইঙ্গিত, প্রতি অঙ্গভঙ্গি হইতে প্রাণের উজ্জ্বল দীপ্তি বিচ্ছুরিত হইতেছে। তাহার প্রখর ঔজ্জ্বল‍্যে অন‍্যান‍্য সমস্ত চরিত্র নিষ্প্রভ হইয়া পড়িয়াছে। গ্রন্থের নায়ক মোহিত ও নায়িকা চিনির ক্ষীণ ব‍্যক্তিত্ব আমাদের দৃষ্টিকে আকর্ষণ করিতে পারে না। মোহিতের সন্ন‍্যাস-গ্রহণে আন্তরিকতার অভাব নাই, অভাব আছে আত্মজ্ঞানের, নিজ শক্তির সীমা-নির্ধারণের --লেখক তাহার এই কৃচ্ছ্রসাধনের উপর একপ্রকার স্নিগ্ধ, কৌতুকমণ্ডিত বিদ্রূপ-কটাক্ষপাত করিয়াছেন। গ্রন্থের মধ‍্যে মাঝে মাঝে বিচ্ছিন্ন পরিচ্ছেদ উহার গঠনগত ঐক‍্যের অভাব প্রচার করিতেছে। মোটের উপর 'নবীন সন্ন‍্যাসী' উপন‍্যাসটি সুখপাঠ‍্য ও চিত্তাকর্ষক --গদাই পালের চরিত্র ইহাকে উৎকর্ষের উচ্চতর স্তরে লইয়া গিয়াছে।
     প্রভাতকুমারের বৃহৎ উপন‍্যাসের মধ‍্যে 'রত্নদীপ' ও 'সিন্দূরকৌটা' এই দুইটিকে সর্বোচ্চ স্থান দেওয়া যাইতে পারে। 'রত্নদীপ' উপন‍্যাসটি যদিও ঘটনাবৈচিত্র‍্যের উপর প্রতিষ্ঠিত, তথাপি মোটের উপর চরিত্রমাধুর্য আমাদের মনে গভীরতর রেখাপাত করে। রাখালের অপ্রত‍্যাশিত সৌভাগ‍্যকে ছাড়াইয়া তাহার চরিত্রসংযম ও আত্মবিসর্জনকারী প্রণয়সঞ্চারই আমাদিগকে অধিকতর অভিভূত করে। বৌরানীর চরিত্রে কোমল, বিষাদমণ্ডিত মাধুর্যের সহিত অবিচলিত পাতিব্রত‍্যের সুন্দর সমন্বয় হইয়াছে। এই উপন‍্যাসে প্রভাতকুমার নিজ স্বভাবসিদ্ধ বিশ্লেষণ-গভীরতার অভাবকে অতিক্রম করিয়াছেন---বৌরানীর জীবনের করুণ ব‍্যর্থতার সূক্ষ্ম উপলব্ধি ও সুন্দর চিত্র আমাদের মনকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। নিজ স্বামিজ্ঞানে রাখালের প্রতি তাঁহার যে ভাবপ্রবাহ তরঙ্গিত হইয়াছিল, ভুল-ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই সেই উচ্ছ্বসিত হৃদয়াবেগ সংহরণ করা মনস্তত্ত্বসম্ভব কি না, আলোচনার দিক দিয়া এ বিষয়ে সন্দেহ হইতে পারে। কিন্তু যাহাদের অশান্ত প্রবৃত্তি চিরজীবনব‍্যাপী কঠোর আত্মদমন দ্বারা বশীকৃত হইয়াছে, এক মুহূর্তের মধ‍্যে চিরাভ‍্যস্ত সংযম-শাসন মানিয়া লওয়ার মধ‍্যে তাহাদের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিকতা কিছুই নাই। প্রবৃত্তির উচ্ছৃঙ্খলতাও যেমন মৌলিক সত‍্য, সংযমের অনুল্লঙঘনীয় অনুশাসনও সেইরূপ আর একটি অবিসংবাদিত সত‍্য। অন‍্যান‍্য চরিত্রের মধ‍্যে খগেন খুব জীবন্ত হইয়াছে---তাহার বুদ্ধিকৌশল ও রহস‍্যভেদে অসীম নিপুণতা আমাদিগকে গদাই পালের কথা স্মরণ করাইয়া দেয়। অথচ খগেনকে একেবারে অবিমিশ্র পাষণ্ডরূপে দেখানো হয় নাই--তাহার চরিত্রের প্রতিও লেখকের সহানুভূতি অনুভব করা যায়। অথচ খগেনকে একেবারে অবিমিশ্র পাষণ্ডরূপে দেখানো হয় নাই--তাহার চরিত্রের প্রতিও লেখকের সহানুভূতি অনুভব করা যায়; কনক ও সুরবালার চরিত্রও বেশ ফুটিয়াছে, ঘটনার চাপে প্রাণস্পন্দন মন্দীভূত হয় নাই। মোট কথা 'রত্নদীপ' প্রভাতকুমারের সৃষ্টিশক্তির মধ‍্যে যে একটা উচ্ছতম সম্ভাবনা ছিল তাহার পরিচয় দেয়।
     'সিন্দূরকৌটা' উপন‍্যাসটি প্রকৃতপক্ষে ভ্রমণকাহিনী। ইহার একমাত্র ঔপন‍্যাসিক অংশ সুশীর সহিত বিজয়ের প্রণয়সঞ্চার-কাহিনী। স্বামী-পরিত‍্যক্তা সুশীর প্রতি বিজয়ের মনোভাব, সহানুভূতি, আশ্রয়দান, প্রভৃতি পর্যায়ের ভিতর দিয়া কীরূপে প্রণয়ে পৌঁছিল তাহার বর্ণনাটি বেশ মনোজ্ঞ, মনস্তত্ত্ব-বিশ্লেষণের দিক দিয়া খুব গভীর না হইলেও নিখুঁত। তবে এই দ্বিতীয়-স্ত্রী-পরিগ্রহের পূর্বে বিজয়ের মনে দ্বন্দ্বসংঘাতের মধ‍্যে সেরূপ কোনো প্রবণতা নাই। প্রথম স্ত্রীর সে অল্প একটু ইতস্তত করিয়াছে মাত্র, কিন্তু মন স্থির করিতে তাহার

মায়াবলে অপসারিত হয়। অথচ ইহারা আমাদের বাস্তব-জীবনেই নিখুঁত ছবি; দৈবানুকল‍্য ও লেখকের স্নেহপ্রীতিপূর্ণ ব‍্যবস্থার দক্ষিণা-বাতাসে এই ঊষর ভূমিখণ্ডই এরূপ শ‍্যামশ্রীমণ্ডিত হইয়া উঠিয়াছে।
     প্রভাতকুমারের ছোটো গল্পগুলির বিস্তৃত সমালোচনা অল্প পরিসরের মধ‍্যে অসম্ভব। তাঁহার অধিকাংশ গল্পই হাস‍্যরসপ্রধান। এই হাস‍্যরস কেবল ঘটনামূলক অসংগতির সহিত নহে চরিত্রবৈশিষ্ট‍্যের সহিতও সম্পর্কান্বিত। সুপ্রসিদ্ধ 'বলবান জামাতা' গল্পটির আকর্ষণ কেবল যে শ্বশুরবাড়ি-বিষয়ক হাস‍্যকর ভ্রান্তির জন‍্য তাহা নহে, নলিনীর নিজ রমণীসুলভ কমনীয়তার কলঙ্কক্ষালনের জন‍্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞাও তাহার অন‍্যতম কারণ। প্রায় সমস্ত গল্পেই অপ্রত‍্যাশিত ঘটনার সুনিপুণ বিন‍্যাস হাস‍্যরসকে উচ্ছ্বসিত করিয়া তোলে। 'রসময়ীর রসিকতা' গল্পে এক রণরঙ্গিণী স্ত্রীর মৃত‍্যুর পর পর্যন্ত স্বামী বেচারার উপর নিজ দাম্পত‍্য অধিকার অক্ষুণ্ন রাখার কৌশল-উদ্ভাবন বড়োই কৌতুককর পরিণতির হেতু হইয়াছে। অভ্রান্ত পূর্ব-অনুমান বলে সে স্বামীর সম্ভাবিত দ্বিতীয় বিবাহের ভিন্ন ভিন্ন স্তরের উপযোগী এক-একখানি পত্র নিজ বর্ণাশুদ্ধিচিহ্নিত, সুপরিচিত হস্তাক্ষরে লিখিয়া রাখিয়া মৃত‍্যুর পরে তাহাদের স্বামীর নিকটে পৌঁছাইবার ব‍্যবস্থা করিয়া রাখিয়াছে। এই অদ্ভুত ভৌতিক পত্রাবলী লইয়া থিওজফিস্ট মহলে যে বাদানুবাদের সৃষ্টি হইয়াছে তাহা গল্পের উপভোগ‍্যতাকে আরও বাড়াইয়াছে। 'বায়ুপরিবর্তন' গল্পে সামান‍্য দু-একটি রেখাপাতের দ্বারাই হরিধনের পরশ্রীকাতরতা, ঈর্ষাপ্রবণতা ও নীচাশয়তার সুস্পষ্ট চিত্র ফুটিয়া উঠিয়াছে, তথাপি তাহার দ্বারা প্রতারিত তাহার ভাবী শ্বশুর যে ঔদার্যে অনুপ্রাণিত হইয়া তাহাকে গাড়িভাড়া বাবদ পাঁচ টাকা দান করিয়াছেন, তাহাতে তিনি যেন ঔপন‍্যাসিকেরই স্থলাভিষিক্ত ও প্রতিনিধির ন‍্যায় ব‍্যবহার করিয়াছেন।
     এই জাতীয় কতকগুলি গল্পে parody বা বিদ্রূপাত্মক অনুকরণের দ্বারা হাস‍্যরস উদ্রিক্ত হইয়াছে। বঙ্কিমচন্দ্রের 'বিষবৃক্ষ' -এর ঘনপত্রান্তরালে যে একটি হাস‍্যকর সম্ভাবনার ফুল আত্মগোপন করিয়াছিল, প্রভাতকুমারের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিকে তাহা কয়েকটি নাটক-নভেল-পড়া, উত্তেজিত-মস্তিষ্ক, তরলমতি যুবকের মনে একটা উদ্ভট খেয়ালের সৃষ্টি করিয়া নির্দোষ প্রাণখোলা হাসির ফোয়ারা ছুটাইয়াছে। 'পোস্টমাস্টার' গল্পটি রবীন্দ্রনাথের ঐ নামের গল্পের ঠিক বিদ্রূপাত্মক অনুকরণ না হইলেও উভয়ের রীতি-পার্থক‍্যের সুন্দর উদাহরণ। রবীন্দ্রনাথের পোস্টমাস্টার বর্ষাঘন নির্জন সন্ধ‍্যায় এক অনাথা বালিকার সহিত নিজের একটা অবিচ্ছেদ‍্য প্রীতিসম্পর্ক রচনা করিয়াছিল; প্রভাতকুমারের পোস্টমাস্টার অপরের প্রেমপত্র চুরি করিয়া পড়িয়া বিকৃত রোমান্স-প্রবণতার চরিতার্থতা সম্পাদন করে; চোরাই পত্রের সংকেতানুযায়ী প্রেমাভিসার তাহার পক্ষে কতকটা হাস‍্যকর, কতকটা শোকাবহ পরিণতির সৃষ্টি করিয়াছে --কিন্তু শেষ পর্যন্ত লেখকের স্নিগ্ধ সহানুভূতি তাহার কৃতকর্মের পুরস্কাররূপে তাহার পদোন্নতি-বিধানই করিয়াছে; অপরের চিঠি ও সরকারি টাকা চুরি করিয়াও স্বদেশি ডাকাতির অজুহাতে সে ইনস্পেক্টর-পদে উন্নীত হইয়াছে।
     কয়েকটি গল্পে মানুষের অসম্ভব প্রতিজ্ঞা ও উদ্ভট কল্পনা বাস্তবতার সংঘাতে ধূলিশায়ী হইয়া হাস‍্যরসের সৃষ্টি করিয়াছে। 'প্রতিজ্ঞা-পূরণ' গল্পে কলেজের নব‍্য যুবক ভবতোষ হঠাৎ আধ‍্যাত্মিকভাবে অনুপ্রাণিত হইয়া কুৎসিত স্ত্রী বিবাহ করিবে বলিয়া দুর্জয় প্রতিজ্ঞা করিয়াছে, এবং কন‍্যা-নির্বাচন পর্যন্ত তাঁহার এই দারুণ সংকল্প অক্ষুণ্ন রাখিয়াছে। কিন্তু বিবাহের দিন যতই নিকটবর্তী হইয়া আসিয়াছে, ততই তাহার সংকল্প শিথিল হইয়া পড়িয়াছে---শেষে যখন সে জানিতে পারিয়াছে যে, জুয়াচুরি করিয়া তাহাকে সুন্দরীর পরিবর্তে কুদর্শনা মেয়ে দেখানো হইয়াছিল তখন সে কয়েক-দিবসব‍্যাপী দুশ্চিন্তার হাত হইতে নিষ্কৃতি পাইয়া স্বস্তির নিশ্বাস ফেলিয়াছে। সেইরূপ 'নিষিদ্ধ ফল' গল্পে সমাজ-সংস্কারক পিতা ষোলো বৎসরের পূর্বে পুত্রবধূর সহিত পুত্রের মিলন কিছুতেই ঘটিতে দিবেন না বলিয়া বদ্ধপরিকর হইয়াছেন। কিন্তু প্রকৃতির আকর্ষণ তাঁহার নিষেধাজ্ঞা অপেক্ষা শতগুণ বলবান --শেষ পর্যন্ত ইহাই প্রমাণিত হইয়াছে; এবং প্রকৃতির ছন্দে মিল রাখিয়া তাঁহাকে তাঁহার বই সংশোধন করিয়া 'ষোলোর' স্থানে 'চৌদ্দ' লিখিতে হইয়াছে। 'বউচুরি' গল্পেও এইরূপেই প্রকৃতির নিকট আত্মসমর্পণের কাহিনী বর্ণিত হইয়াছে--স্বাভাবিক প্রবৃত্তির নিরোধচেষ্টা ব‍্যর্থ কৃচ্ছ্রসাধনের উপহাস‍্যতা লাভ করিয়াছে।
     কতকগুলি গল্পে আমাদের অতিপ্রাকৃতে অন্ধবিশ্বাস হাস‍্যকর অবস্থাসংকটের হেতু হইয়াছে। 'বোকার কাণ্ড'-এ গোঁড়া ব্রাহ্ম হরসুন্দরবাবুর হিন্দু কুসংস্কারাচ্ছপন্ন পত্নী স্বামীর আরোগ‍্যার্থ শিবপূজা করিতে গিয়াছেন --ইতিমধ‍্যে স্বামীর সঙ্গে তাঁহার আকস্মিক সাক্ষাৎ। খোকার পিতৃসম্বোধন পত্নীর অবগুণ্ঠনের অন্তরালে আত্মগোপনচেষ্টা ব‍্যর্থ করিয়া দিয়াছে। 'যজ্ঞ-ভঙ্গ'-এ জ‍্যেষ্ঠ ভ্রাতা কনিষ্ঠের প্রাণনাশের জন‍্য এক ভণ্ড সন্ন‍্যাসীর সাহায‍্যে মারণ-যজ্ঞের অনুষ্ঠান আরম্ভ করিয়াছে; কনিষ্ঠ ভ্রাতা কোনো আত্মীয়-প্রমুখাৎ এই ব‍্যাপারের সন্ধান পাইয়া দাদার তান্ত্রিক প্রতিক্রিয়ায় অন্ধ্রবিশ্বাস ভাঙিবার জন‍্য নির্দোষ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হইয়াছে। এখানে কৌতুকরসের অবতারণা খুব স্বাভাবিক সয় নাই, তবে কনিষ্ঠের সৌকুমার্য ও উদারতায চিত্রটি দুই-এক কথায় বেশ ফুুটিয়াছে। 'সারদার কীর্তি'তে পূর্বজন্মের মাতার পাদোদক-প্রার্থী পুত্রের তস্করবৃত্তি বেশ স্বাভাবিক হাস‍্যরসের সঞ্চার করিয়াছে। 'খুড়া মহাশয়' -এ খুড়ার ভূতের ভয়ের সুযোগে একটা ঘোর সাংসারিক অবিচারের প্রতিকার হইয়াছে।
     দুই-একটি গল্পে অবৈধ-প্রণয়মূলক জটিলতার অবতারণা হইয়াছে, তবে প্রভাতকুমারের স্বাভাবিক সংযম ও সুরুচি এই প্রণয়-বর্ণনাকে পঙ্কের মধ‍্যে অবতরণ করিতে দেয় নাই। 'লেডী ডাক্তার' -এ এক ইতর-প্রকৃতি স্ত্রীলোক একজন তরুণ-বয়স্ক ডেপুটিকে অবাধ মেলা-মেশায় প্রশ্রয় দিয়া জালে জড়াইবার চেষ্টা করিয়াছে। ডেপুটিবাবু এতদূর অগ্রসর হইয়াছেন যে, হিতৈষীদের সতর্কবাণীতেও তাঁহার চৈতন‍্য হয় নাই। ইতিমধ‍্যে খুব স্বাভাবিক উপায়েই স্ত্রীলোকটির স্বরূপ আবিষ্কৃত হইয়া যাওয়ার ব‍্যাপারটির কল‍্যাণকর উপসংহার হইয়াছে। 'সচ্চরিত্র' গল্পে প্রভাতকুমারের সহিত আধুনিক বাস্তববাদী ঔপন‍্যাসিকদের ব‍্যবধান সুপরিস্ফুট হইয়াছে। আধুনিক ঔপন‍্যাসিক যে অবস্থার উচ্ছাঙ্গের আর্টের ও সমাজনীতি-সমালোচনার অবসর পাইতেন, প্রভাতকুমার সেই অবস্থায় তাঁহার নায়ককে সমস্ত নায়কোচিত