Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা- ১৩০, ১৩১ ও ১৩২

2020-09-05
     এই ক্ষুদ্র কাহিনীটির মধ‍্যে কোনো গভীর জীবন-সত‍্য, মানব-চরিত্রের কোনো স্মরণীয় বিকাশ লক্ষ‍্য করা যায় না। শৈলেশের দুর্বল প্রথানুগত‍্য ও আচরণের দুই বিপরীত প্রান্তের মধ‍্যে দোলায়িত অস্থিরতা সুন্দরভাবে ফুটিয়াছে। বিভা ও ক্ষেত্রমোহনের একবিন্দুসংলগ্ন প্রকৃতি ও তাহাদের দাম্পত‍্য-সম্পর্কের বাহ‍্য নিস্তরঙ্গতার মধ‍্যে গভীর আন্তর বৈষম‍্যটি সুষ্ঠু বর্ণনা ও ইঙ্গিতে পরিস্ফুট হইয়াছে। কিন্তু ঊষার অন্তর-রহস‍্যটি তাহার গৃহিণীপনা ও নীরব আত্মদমনের অন্তরালে অপ্রকাশিতই রহিয়াছে। বাস্তবিকপক্ষে শৈলেশের সহিত তাহার ভালোবাসা কতটা তাহার স্নেহের আন্তরিকতা ও চিত্তজয়নিপুণতার দ্বারা স্ফুরিত, কতটাই-বা মাতৃহীন বালকের স্নেহবঞ্চিত হৃদয়ের সহজ প্রবণতার আকর্ষণের ফল সে বিষয়ে আমরা নিঃসংশয় হইতে পারি না। ম্লেচ্ছ আচারের অপবিত্রতায় যে ঘর ছাড়িয়াছিল, বৈষ্ণব আচারের সুপবিত্র আতিশয‍্যে সে কেন ঘরে ফিরিল সে রহস‍্য ভেদ হয় নাই। প্রথম প্রকারের আবর্জনা দূর করিতে সে স্বামীর চিরাচরিত সংস্কারের বিরোধিতার সম্মুখীন হইয়াছিল; কিন্তু দ্বিতীয় প্রকার জঞ্জাল সাফ করিতে সে স্বামীর সহযোগিতাই পাইবে ইহা সে যথার্থ অনুমান করিয়াছিল। সে যাহাই হউক, ঊষা সম্বন্ধে কোনো চূড়ান্ত অভিমত-প্রকাশে আমরা ক্ষেত্রমোহনের ন‍্যায়ই সংশয়-পীড়িত হই। প্রাচীন প্রথার অবগুণ্ঠনে শুধু তাহার মুখ নয়, অন্তঃপ্রকৃতিও অনেকটা ঢাকা পড়িয়াছে।
     'বিরাজবৌ'--এই পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ গল্প। ইহাতে দাম্পত‍্য-প্রেমের নিবিড় একাত্ম মিলন হইতে উহার দারুণ বিপর্যয় অগাধ প্রীতি হইতে ঈর্ষা ও অভিমানজাত সন্দেহ-বিকার, আকস্মিক সংঘটনের সহিত চারিত্রিক প্রতিক্রিয়ার জটিল যোগাযোগ এক ট্রাজেডি-করুণ পরিণতিতে পৌঁছিয়াছে। বঙ্কিমের 'বিষবৃক্ষ' ও 'কৃষ্ণকান্তের উইল' -এও দাম্পত‍্য-সম্পর্কের অনাবিল প্রীতির দৈবাহত উচ্ছেদ ও উন্মূলন লেখকের কবি-কল্পনা ও জীবনের রহস‍্যবোধকে জাগ্রত করিয়াছে। বঙ্কিমের যুগে পতি-পত্নীর সুখময় মিলনই ছিল সাধারণ নিয়ম; বিচ্ছেদ ও মনোমালিন‍্যই ছিল ব‍্যতিক্রম। আধুনিক যুগে দাম্পত‍্য-সম্পর্কের মধ‍্যে বিরোধের বীজ ওতপ্রোতভাবেই উপ্ত দেখানো হয়; দ্বন্দ-সংঘর্ষই যেন উহার অন্তর্নিহিত প্রাণশক্তি। স্থায়ী বন্ধন মাত্রেই আনে অতৃপ্তি ও বন্ধনচ্ছেদের দুর্নিবার আকাঙক্ষা---দাম্পত‍্য শান্তি ঝটিকার ক্ষণবিরতি মাত্র, এক অনিশ্চিত ও কৃচ্ছ্রসাধ‍্য ভারসাম‍্যের উপরই নির্ভরশীল। শরৎচন্দ্র নীলাম্বর ও বিরাজের আদর্শ ও ঐকান্তিক প্রণয়মূলক দাম্পত‍্য-জীবনের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়া বঙ্কিমের ধারাই অনুসরণ করিয়াছেন। দারিদ্রের অনির্বাণ জ্বালা তাহাদের সম্পর্ক-মাধুর্যকে ঝলসাইয়া দিয়া উহার মধ‍্যে তিক্ততা মিশাইয়াছে। কিন্তু এই তিক্ত বাগবিতণ্ডা ও সংঘর্ষের মধ‍্যেও এক অতি-সতর্ক, প্রণয়াস্পদের দুঃখ-কষ্টে সদা-বিক্ষুব্ধ হিতৈষণার অস্বস্তি অনুভব করা যায়। বিরাজ স্বামীর খাওয়া-পরার কষ্টেই অত‍্যন্ত পীড়িত হইয়া তাহাকে কটুকথা শুনাইয়াছে; নীলাম্বরও স্ত্রীর প্রতি কর্তব‍্যপালনের অক্ষমতাজনিত মনোবেদনাতেই বিচারবুদ্ধি হারাইয়া তাহার সতীত্বের প্রতি সন্দেহ পোষণ করিয়াছে। প্রেমের আতিশয‍্য বিকারই তাহাদের সংঘর্ষের মূল প্রেরণা যোগাইয়াছে। ইহার এই কাহিনীর অসাধারণত্ব।
     কিন্তু দারিদ্রের ঘর্ষণ অন্তরে যে সুখশান্তিধ্বংসী আগুন জ্বালাইয়াছে তাহা চরিত্রবৈশিষ্ট‍্যের প্রবল ফুৎকারেই পুষ্ট ও ঊধ্বশিখ হইয়াছে। বিরাজের ভালোবাসা সাধারণ দাম্পত‍্য-প্রেমের পর্যায়ভুক্ত নহে, ইহার মধ‍্যে অসপত্ন অধিকারবোধ ও প্রবল আত্মভিমান প্রধান উপাদান। প্রেমের দাবিতে সে স্বামীকে নিজ ক্রীড়াপুত্তলির মতো ব‍্যবহার করিতে অভ‍্যস্ত--তাহার ভালোবাসা মাতৃজাতীয়, প্রিয়াজাতীয় নহে। তাহার অক্লান্ত স্বামিসেবায় তপশ্চর্যা যেন তাহাকে এক অধ‍্যাত্ম তেজে অধৃষ‍্য, মহিমান্বিত করিয়াছে। তাহার সম্বন্ধে কুৎসিত সন্দেহ-পোষণ শুধু দাম্পত‍্য-প্রেমের অবমাননা নহে, ঐকান্তিক সাধনার নির্মল পবিত্রতায় কলঙ্ক-লেপন। কাজেই বিরাজের রোগজীর্ণ, পরিচর্যাক্লান্ত, আত্মনিপীড়নে বিপর্যস্ত মনে একটা অস্বাভাবিক, অকল্পনীয় সংকল্প মনস্তত্ত্বের দিক দিয়া খুবই সম্ভব। এখন মুহূর্তের রোষান্ধতায় আত্মহত‍্যার প্রেরণা অতর্কিতভাবে অকৃতজ্ঞ স্বামীর প্রতি সমুচিত দণ্ডবিধানের সিদ্ধান্তে রূপান্তরিত সইয়াছে। এখন মুহূর্তের রোষান্ধতায় আত্মহত‍্যার প্রেরণা অতর্কিতভাবে অকৃতজ্ঞ স্বামীর প্রতি সমুচিত দণ্ডবিধানের সিদ্ধান্তে রূপান্তরিত হইয়াছে। আজীবন পুণ‍্যাচরণকারী ব‍্যক্তি যেমন ভগবানের অন‍্যায়-অবিচারের আঘাতে হিতাহিতজ্ঞান হারাইয়া তাঁহার প্রতি দারুণ অভিমানে পাপের মধ‍্যে ঝাঁপাইয়া পড়ে, বিরাজের আচরণও যেন সেইরূপ। ইহার সংগীত ও স্বাভাবিকতা কেবল বিরাজের অতীত দাম্পত‍্য-জীবনের পটভূমিকায়ই বোধগম‍্য হইতে পারে। নীলাম্বর পত্নীগতপ্রাণ হইলেও নেশাখোর ও অব‍্যবস্থিতচিত্ত ছিল---দীর্ঘ অভাব-ভোগের নিদারুণ প্রতিক্রিয়া তাহারও সাময়িক মস্তিষ্কবিকার ঘটাইয়াছিল। কাজেই তাহার দিক হইতেও কোনো সংযত, বিচার-বিবেচনা-পরিশুদ্ধ ব‍্যবহার প্রত‍্যাশা করা যায় না। সুতরাং যাহা ঘটিয়াছে তাহা অনিবার্যভাবেই ঘটিয়াছে। বিরাজের অম্লান সতীত্ব মুহূর্তের চিত্তবিভ্রমে এক বিন্দু কলঙ্কলাঞ্ছনা চিহ্নিত হইয়া মানুষের অন্তর্দৃষ্টি ও ভগবানের অন্তর্যামিত্বের নিকট বিচারপ্রার্থী হইয়াছে। শরৎচন্দ্রের মানব-চরিত্রজ্ঞান ও কাহিনী গ্রন্থন-কৌশল এক অতি-নাটকীয় পরিস্থিতিকে নাটকীয় সুসংগতি ও চরিত্রানুবর্তিতা দান করিয়াছে। এখানে ক্ষণিক পদস্খলনের উপর সনাতন দাম্পত‍্য-নীতিরই জয় ঘোষিত হইয়াছে।
     'পথনির্দেশ' (১৯১৪) --ধর্মমতের পার্থক‍্যের জন‍্য দুই তরুণ, প্রণয়োন্মুখ হৃদয়ের আত্মদমনের নিবিড় দুঃখের বর্ণনা। হেমনলিনীর দরিদ্র মাতা সুলোচনা উদার-হৃদয় ব্রাহ্মযুবক গুণিনের গৃহে হইয়াছে। এই সম্পর্ক এক অনিবার্য প্রণয়-আকর্ষণের দিকেই ঝুঁকিয়াছে। কিন্তু সুলোচনার হিন্দুত্ব-সংস্কার এই মিলনের পথে অন্তরায় হইয়াছে। সংযম-হৃদয় গুণী সুলোচনার ইচ্ছানুসারে হেমের অন‍্যত্র বিবাহ দিয়াছে, কিন্তু হেমের পরবশ চিত্ত স্বামীর অনুরাগী হইতে পারে নাই। অল্পদিনের মধ‍্যে সে বিধবা হইয়া গুণীর সংসারে ফিরিয়াছে। সুলোচনার মৃত‍্যুর পর এই দুইটি তরুণ-তরুণী অহরহ এক আত্মদমনমূলক অন্তর্দ্বন্দ্বে ক্ষত-বিক্ষত হইয়াছে। গুণী আত্মনিরোধে অটল আছে, কিন্তু হেমনলিনী একবার গুণীকে রূঢ়ভাবে প্রত‍্যাখ‍্যান করিয়া, আর একবার তাহার আকর্ষণ গভীরভাবে অনুভব করিয়া চূড়ান্ত অস্থিরমতিত্বের পরিচয় দিয়াছে। শেষ পর্যন্ত গুণিনের মৃত‍্যুশয‍্যাপার্শ্বে হেমনলিনী দ্বিধাহীন আত্মনিবেদনের আবেগে ভাঙিয়া পড়িয়াছে, কিন্তু মৃত‍্যুপথযাত্রী

গুণী হেমের আবেগতপ্ত ললাটে একটি স্নিগ্ধ চুম্বনের দ্বারা এই পরম উপহারটিকে স্বীকৃতি জানাইয়াছে। উপন‍্যাসটিতে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের নূতন নূতন উপলক্ষ সৃষ্টি করিবার কৌশল ও করুণরসের সার্থক উদ্ধোধন-শক্তি সুন্দরভাবে উদাহৃত হইয়াছে। ইহার ঘটনা-পরিস্থিতির সহিত একদিকে 'আলো ও ছায়া'- র অন‍্যদিকে 'পরিণীতা'-য় ললিতা-শেখরের অদ্ভুত-অধিকার-বোধমূলক বিচিত্র সম্পর্কের সাদৃশ‍্য আছে।
     'ছবি' (১৯২০) --ব্রহ্মদেশের পরিবার পরিবেশে স্থানান্তরিত 'দত্তা'--উপন‍্যাস-পরিস্থিতির প্রতিরূপ। অবশ‍্য গল্পটি কথাশিল্পের দিক দিয়া খুব উন্নত নহে। বা-থিন ও মা-শোয়ের মধ‍্যে একটা বাগ্দানমূলক বিবাহ-সম্পর্কের লঘু পূর্ববন্ধন ছিল। বা-থিন শিল্পী ও মা-শোয়ের প্রেমনিবেদনের প্রতি উদাসীন। সে মা-শোয়ের পিতার নিকট নিজ পিতৃঋণ পরিশোধোপযোগী অর্থসংগ্রহের জন‍্য ছবি আঁকিতে নিবিষ্টচিত্ত; প্রেমের কথা তাহার অন‍্যমনস্ক হৃদয়ে স্থান পায় না। এই ক্রমাগত উপেক্ষার জন‍্য মা-শোয়ে তাহার প্রতি বিরক্ত ও বিমুখ; অপর প্রণয়ীর স্তাবকতা তাহার মনকে মাঝে বিক্ষিপ্ত করে। সে ঋণশোধের চাপ দিয়া উদাসীন প্রেমিককে করতলগত করার ফন্দি করিল। বা-থিন সমস্ত সম্পত্তি বিক্রয় করিয়া ঋণ-পরিশোধের অর্থ সংগ্রহ করিল। যে ছবির উপর সে তাহার অর্থ-সংগ্রহের আশা ন‍্যস্ত করিয়াছিল তাহা গৌতম-বধূ গোপার ছবি না হইয়া তাহার প্রণয়িনী মা-শোয়ের প্রতিকৃতি হওয়ায় খরিদ্দার কর্তৃক প্রত‍্যাখ‍্যাত হইয়াছে। ইহাতেই তাহার ঔদাসীন‍্য যে প্রকৃতপক্ষে ছদ্মবেশী প্রণয়বিভোরতা তাহা প্রমাণিত হইয়াছে। যাহা হউক এই চরম মুহূর্তে মা-শোয়ে শরৎচন্দ্রের অন‍্যান‍্য নায়িকার ন‍্যায় দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি ও স্নেহপূর্ণ সেবাপরায়ণতার পরিচয় দিয়া পলাতক প্রেমিককে নিজ জীবনসঙ্গী করিয়া লইয়াছে। সামাজিক রীতি-নীতি ও প্রণয়-প্রকাশ-পদ্ধতির পার্থক‍্য সত্ত্বেও ব্রহ্মদেশের রমণী যে বাঙালিনীর সহোদরা, প্রেমরহস‍্যের এই সার্বভৌম পরিচয়টিই কাহিনীর মধ‍্যে মুদ্রিত হইয়াছে। 'অনুরাধা' (১৯৩৪) --একটি অপেক্ষাকৃত পরিণত বয়সের রচনা। গল্পটি বিবাহান্থিক হইলেও পেমনির্ভর নহে। ইহাতে পূর্বরাগের বা হৃদয়াবেশের গাঢ় রং কোথাও নাই--আগাগোড়া সাংসারিক হিসাবি মনোভাব, সেব‍্য-সেবকের একদিকে অধিকার-প্রয়োগে ঋজু ও অপরদিকে শ্রদ্ধাকুণ্ঠিত সম্পর্ক ইহার মধ‍্যে প্রতিফলিত। ইহার মধ‍্যে হৃদয়াবেগের যে ক্ষীণ স্পন্দন অনুভত হয় তাহা মাতৃহীন, স্নেহবুভুক্ষু বালক কুমারের প্রতি মমতা ও তজ্জনিত কৃতজ্ঞতাবোধের সঙ্গে জড়িত। বিলাত-ফেরত, নিজ পদমর্যাদা সম্বন্ধে উগ্রভাবে সচেতন, কেতাদুরস্ত চালচলনে অভ‍্যস্ত, যৌবনের প্রান্তসীমায় উপনীত জমিদারপুত্র ও তাহারই ফেরারি কর্মচারীর সহায়সম্পদহীনা, রূপলাবণ‍্যবঞ্চিতা, অধিকবয়স্কা ভগ্নীর মধ‍্যে রোমান্টিক প্রণয়াবেশের কোনোই অবসর নাই। অবস্থা-বিপর্যয়ে অনুরাধা নিজের বিবাহের ঘটকালি করিতে বাধ‍্য হইয়াছে--ইহাতেই সে নায়িকার চির-ঐতিহ‍্য-নির্ধারিত মর্যাদা হারাইয়াছে। এই বিবাহে প্রকৃত দৌত‍্যকার্য করিয়াছে বিজয়ের বালক পুত্র কুমার--ইহা বিজয়ের পত্নীনির্বাচন নহে, বালকের মাতৃনির্বাচন। অবশ‍্য বিজয়ের বাড়ির মেয়েদের আত্মকেন্দ্রিক জীবন-নীতি, শিক্ষিতা মহিলার সংসাবধর্মে ঔদাসীন‍্য ও স্নেহমায়ামমতার বিরল প্রকাশ তাহাকে গরিবের মেয়ে বিবাহ করিতে প্রণোদিত করিয়াছে। অনুরাধার চরিত্রে স্বাভাবিক বিনয় ও অনুগ্রহ-প্রার্থনায় কুণ্ঠার সহিত উগ্রতাহীন আত্মমর্যাদাবোধের সুন্দর সমন্বয় হইয়াছে। তাহার কথাবার্তা ও আচরণের মধ‍্যে একটি শালীনতা, সংযম, অন্তঃপুরচারিণীর মৃদু ও সংবৃত আত্মপ্রকাশ অভ্রান্ত সংগতির সহিত রক্ষিত হইয়াছে। শরৎচন্দ্রের নারীসমাজের একটি অন‍্যতম প্রধান বৈশিষ্ট‍্য---ইচ্ছাশক্তির প্রবলতা, সেবা করার প্রচণ্ড জিদ, স্বাধীনচিত্ততার আতিশয‍্যে পুরুষের সহিত সমকক্ষতার স্পর্ধা, সত‍্যভাষণের দৃপ্ত সাহসিকতা --অনুরাধার চরিত্রে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। কোনো তীক্ষ্ণ-বৈশিষ্ট‍্য-চিহ্নিত না হইয়াও যে সাধারণ গৃহস্থের মেয়ে চরিত্র-স্বাতন্ত্র অর্জন করিতে পারে এই উপন‍্যাসটিতে তাহারই প্রমাণ মিলে।
     'সতী'-তে (১৯৩৪) হিন্দুসমাজে অতি-প্রচলিত 'সতী' প্রশস্তির বিপরীত দিকটা দেখানো হইয়াছে প্রজ্বলিত করিত। অর্থাৎ সতীদাহ কথাটা ব‍্যাকরণের উভয় বাচ‍্যেই লওয়া যাইতে পারে। এখানে হরিশের স্ত্রী নির্মলা যেমন নিজ সতীত্ব-মহিমায় অকুণ্ঠিত আস্থার ফলে স্বামীকে নিশ্চিত মৃত‍্যু হইতে ফিরাইয়া আনিয়াছিল, সেইরূপ স্বামীর প্রতি অবিরত সন্দেহপরায়ণতায়, তাহার প্রতিটি পদক্ষেপের উপর নিষ্পলক দৃষ্টি রাখিয়া ও নিশ্ছিদ্র খবরদারি করিয়া, তাহার প্রতিটি আচরণের ইতর, কদর্যতাপূর্ণ ব‍্যাখ‍্যা করিয়া, তাহাকে অনবরত কটু শ্লেষে বিদ্ধ করিয়া, তাহার জীবন দুর্বহ করিয়া তুলিয়াছিল। এখানে সতীত্ব-চন্দ্রের জ‍্যোৎস্নাময় ও কলঙ্কলাঞ্ছিত উভয় দিককেই উদঘাটিত করা হইয়াছে। লেখকের কৃতিত্ব এইখানেই যে, এই দুই বিপরীতমুখী আচরণই নির্মলা-চরিত্রে সমভাবেই প্রযোজ‍্য। বিরহিণীর পক্ষে চন্দ্রকিরণের ন‍্যায় উহার সতীত্ব-স্নিগ্ধতা বেচারা স্বামীর ক্ষেত্রে দাহ জ্বালাময় হইয়াছে। আরও মুশকিলের কথা এই যে, সমাজের সহানুভূতি সমস্ত নির্মলার পক্ষে। সতীত্বের চোখ-ঝলসানো জ‍্যোতিতে তাহার সব ক্ষুদ্রতা, নীচতা, নূতন যন্ত্রণার উদ্ভাবনে অসাধারণ দক্ষতা নিশ্চিহ্ন হইয়াছে। এই অদ্ভুত নির্যাতনের অভিজ্ঞতায় স্বামী রাধার মাথুর বিরহের এক নূতন ব‍্যাখ‍্যা আবিষ্কার করিয়াছে--শ্রীকৃষ্ণ প্রণয়িনীর নির্বন্ধাতিশয‍্যপূর্ণ, অতন্দ্র প্রেমানুসরণ হইতে নিষ্কৃতি-লাভের জন‍্যই মথুরায় পলায়ন করিয়া বাঁচিয়াছেন। মনে হয় যেন এ বিষয়ে শরৎচন্দ্রের কিছু প্রত‍্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছিল --স্নেহের কঠিন বন্ধন যে কখনও শ্বাসরোধী হইয়া উঠে তাহার প্রমাণ তিনি রাজলক্ষ্মী-কমললতার ভিন্নধর্মী প্রেমের মধ‍্যে উপস্থাপিত করিয়াছেন।
     এ পর্যন্ত শরৎচন্দ্রের যে সমস্ত গল্পের আলোচনা হইল, তাহাতে সামাজিক বিদ্রোহের সুর সেরূপ সুপরিস্ফুট নহে। সুতরাং তাঁহার যে বিশেষত্বের জন‍্য তিনি বঙ্গসাহিত‍্যে সুপরিচিত, যে নূতন সমাজনীতি ও প্রেমের আদর্শ তিনি প্রচার ও প্রতিষ্ঠিত করিয়াছেন তাহার উদাহরণ ইহাদের মধ‍্যে ততটা মেলে না। তথাপি ইহাদের আর একটি বিশেষত্ব অতি সহজেই আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে --ইহাদের মধ‍্যে অঙ্কিত নারীচরিত্র। প্রেমের বিশ্লেষণের ন‍্যায় নারীচরিত্র-সৃষ্টিতে শরৎচন্দ্রের অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় পাওয়া যায়। আমাদের

সমাজে নারীজাতির যে একটা অখ‍্যাত, লজ্জা-সংকোচ-আত্মগোপনের অন্তরালস্থিত স্থান আছে, তাহাই উপন‍্যাস-ক্ষেত্রে তাহাদের ব‍্যক্তিত্ব-বিকাশের পক্ষে প্রতিকূল হইয়াছে। সমাজেও যেমন, উপন‍্যাসেও তেমনি নারীর কর্মক্ষেত্র অতি সংকীর্ণ; কয়েকটি অতি সুনির্দিষ্ট, অল্প-পরিসর কর্তব‍্যের গণ্ডির মধ‍্যে তাহাদের গতিবিধি, কার্যকলাপ, হৃদয়ের ঘাত-প্রতিঘাত আবদ্ধ হইয়াছে। সাধারণত স্ত্রী চরিত্রের সামান‍্য কয়েকটি দিক মাত্র আমাদের উপন‍্যাসে প্রতিফলিত হইয়াছে। অতি-অভিমান বা প্রেমের অন্ধ আতিশয‍্যের জন‍্য স্বামীর সহিত বিচ্ছেদ বা নীচ স্বার্থপরতার জন‍্য গৃহবিরোধের সৃষ্টি--মুখ‍্যত নারী বাংলা-উপন‍্যাসে এই দুইটি উদ্দেশ‍্য-সাধনের হেতুরূপেহ ব‍্যবহৃত হইয়াছে। তারপর অবরোধ-প্রথার জন‍্য হিন্দুসমাজে স্ত্রী-পুরুষের মিলনের ও পরিচয়ের পথ প্রায় সম্পূর্ণরূপেই বন্ধ ছিল; সুতরাং স্ত্রী-চরিত্র সম্বন্ধে ঔপন‍্যাসিকের প্রত‍্যক্ষ জ্ঞানের অভাব বাংলা উপন‍্যাসে একটা প্রকাণ্ড ত্রুটি। স্ত্রী-চরিত্রের যে একটা জটিলতা বা পরস্পর-বিরোধী ভাবের একত্রাবস্থান সম্ভব ঔপন‍্যাসিক তাহা মুখে স্বীকার করিলেও কার্যত ফুটাইতে নারেন নাই। সেইজন‍্য বঙ্গ-সাহিত‍্যে নারীচরিত্রগুলি সাধারণত কতকগুলি সুপরিচিত শ্রেণীর মধ‍্যেই স্থান লাভ করিয়াছে। ব‍্যক্তিত্বব‍্যঞ্জক গুণের অপেক্ষা শ্রেণীর বিশেষ গুণগুলিই তাহাদের মধ‍্যে স্ফুটতর হইয়াছে। বঙ্কিমচন্দ্রের স্ত্রী-চরিত্রগুলির নাম স্মরণ করিলেই এই মন্তব‍্যের যথার্থতার উপলব্ধি হইবে। তাঁহার ভ্রমর, সূর্যমুখী, প্রফুল্ল, প্রভৃতি মূলত শ্রেণীবিশেষেরই প্রতিনিধি, অবস্থাভেদে স্বামীর প্রতি পতিব্রতা স্ত্রী মনোভাবের যে অল্পবিস্তর পরিবর্তন হইতে পারে তাহারই উদাহরণ। ইহাদের ব‍্যক্তিগত জীবনের যে সমস‍্যা তাহা শ্রেণীর সমস‍্যা হইতে অভিন্ন, কেন-না বাঙালি পরিবারে নারীর ব‍্যক্তিগত জীবনের কোনো অবসর নাই বা কিছুদিন পর্যন্ত ছিল না। সমাজ তাহাকে পারিবারিক জীবনে যে বিশিষ্ট আসনে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছে, তাহাই জীবননাট‍্যের রঙ্গমঞ্চ; সেই আসনচ‍্যুত হইলে তাহার আর কিছু বলিবার থাকে না। রবীন্দ্রনাথের প্রথম বয়সের উপন‍্যাস 'নৌকাডুবি' ও 'চোখের বালি'তে কমলা, এমন কি বিনোদিনীরও যে সমস‍্যা তাহা এই সমাজ-দত্ত আসনখানি আঁকড়াইয়া ধরিবার চেষ্টা হইতেই প্রসূত। তাঁহার পরবর্তী উপন‍্যাসগুলিতে সুচরিতা, ললিতা ও 'ঘরে বাইরে'র বিমলা-চরিত্রে নারী-জীবনে ব‍্যক্তিত্ব স্ফুরণের প্রথম চেষ্টা হইয়াছে; ইহারা এক নূতন জগতের অধিবাসী; সমাজের সনাতন আসনখানি অধিকার করাই ইহাদের মুখ‍্য উদ্দেশ‍্য নয়। ইহাদের হৃদয়-তন্ত্রীকে নূতন রকমের আশা-আকাঙক্ষা, নূতন উদ্দেশ‍্যের ও আদর্শের প্রেরণা ঝংকৃত হইয়া উঠিতেছে; ইহারা প্রথম আপনাদিগকে সামাজিক কর্তব‍্য হইতে পৃথক করিয়া দেখিতে শিখিতেছে। শরৎচন্দ্রের উপন‍্যাসে স্ত্রীচরিত্রে এই সমাজনিরপেক্ষ, স্বাধীন জীবনের আরও সুস্পষ্ট স্ফুরণ হইয়াছে। এমন কি তাঁহার প্রথম যুগের উপন‍্যাসগুলিতেও, যেখানে সমাজ-বিদ্রোহের সুর সেরূপ তীব্র নয় ও পারিবারিক কর্তব‍্যপালনই স্ত্রীলোকের প্রধান কার্য, সেখানেও, তাহাদের দৈনিক সমাজনির্দিষ্ট কার্য-গণ্ডির অভ‍্যন্তরেও তাহাদেরও মধ‍্যে একটা নূতন সতেজ প্রকাশ-ভঙ্গি, একটা দৃপ্ত, মহিমান্বিত তেজস্বিতার পরিচয় পাওয়া যায়। শরৎচন্দ্রের উপন‍্যাসে পারিবারিক জীবনে নারীর প্রভাব খুব active, এমন কি, aggressive ধরনের। ইহা অন্তরালবর্তিনীর নীরব কর্মনিষ্ঠা নহে --ইহা কেবল পিছনে থাকিয়া সনাতন আদর্শের পথে সংসার-রথকে ঠেলা দেয় না। ইহা নূতন আদর্শের প্রবর্তনের দ্বারা সংসার-যাত্রাকে অভিনব পথে পরিচালিত করিতে চেষ্টা করে; স্নেহ-প্রেম-ধারাকে নূতন প্রণালীতে প্রবাহিত করিয়া পারিবারিক জীবনের ভারকেন্দ্রটি সারাইয়া দেয়। বিন্দু, নারায়ণী, বিরাজ-বৌ, শৈলজা, পার্বতী, ললিতা--ইহাদের মধ‍্যে নারীসুলভ কোমলতা ও স্নেহশীলতার সঙ্গে সঙ্গে চঞ্চল বিদ‍্যুৎরেখার মতো একটা তীব্র, তীক্ষ্ণ দীপ্তি আছে। ইহারা কেবল ঘর সাজাইবার উপকরণ বা মোমের পুতুল নহে, এমন কি নিশ্চেষ্ট নিয়মানুবর্তিতা বা নীরব সহিষ্ণুতাও ইহাদের চরম প্রশংসা নহে। ইহারা যেখানে সমাজের অনুবর্তন করে, সেখানে চোখ বুজিয়া নহে, সেখানেও স্বাধীনচিন্তা ইহাদিগকে অন্ধ গতানুগতিকতা হইতে রক্ষা করে। পার্বতী তাহার বাল‍্যপ্রেমকে অস্বিকার না করিয়া, ললিতা-শেখরের সঙ্গে তাহার বরণ করিয়া এই স্বাধীনচিত্ততার পরিচয় দিয়াছে; তাহাদের সামাজিক আদর্শের অনুবর্তনে কতকটা স্বাধীনতা আছে। বিন্দু, শৈলজা প্রভৃতি একান্নবর্তী গৃহস্থ পরিবারের বধূ; কিন্তু পারিবারিক কর্তব‍্যের নিষ্পেষণে তাহারা তাহাদের ব‍্যক্তিত্বকে অবলুপ্ত হইতে দেয় নাই। নারী-চরিত্রের দৃপ্ত মহিমা তাহাদের প্রত‍্যেক বাক‍্য ও কার্য হইতে ক্ষরিয়া পড়িতেছে। তাহাদের বিদ্রোহ সামাজিক ব‍্যবস্থার বিরুদ্ধে নহে, তাহাদের স্নেহ-প্রেমের কণ্ঠরোধের বিরুদ্ধে। এইরূপে শরৎসাহিত‍্যে আমাদের গৃহস্থ পরিবারের নারীর বৈশিষ্ট‍্য রক্ষিত হইয়াছে।
( ৩ )
সমাজ-সমালোচনামূলক উপন‍্যাস

'অরক্ষণীয়া', 'বামুনের মেয়ে' ও 'পল্লীসমাজ' এই তিনটি উপন‍্যাসে সামাজিক অত‍্যাচার ও উৎপীড়নের বিরুদ্ধ প্রতিবাদই লেখকের প্রধান উদ্দেশ‍্য। ইহাদের মধ‍্যে যে সামান‍্য রকমের প্রণয়-চিত্র আছে, সমাজের হৃদয়হীন নিষ্ঠুরতাকে ফুটাইয়া তুলিবার উদ্দেশ‍্যেই তাহাদের অবতারণা হইয়াছে। সুতরাং এইগুলিকে প্রধানত সমাজ-ব‍্যবস্থার সমালোচনা-হিসাবে বিচার করিতে হইবে। এই সমাজ-সমালোচনা বঙ্গসাহিত‍্যের উপন‍্যাসে নূতন নহে, বরং ইহার সহিত উপন‍্যাসের উৎপত্তির নিতান্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। রবীন্দ্রনাথের প্রায় সমস্ত উপন‍্যাসেই হিন্দু সমাজের সংকীর্ণতা ও কুসংস্কার-প্রবণতার বিরুদ্ধে শ্লেষ ও ইঙ্গিত বিদ‍্যমান। অন‍্যান‍্য অপেক্ষাকৃত নিম্নস্তরের ঔপন‍্যাসিকদের ইহাই প্রধান উপজীব‍্য বিষয়। তাহা হইলে শরৎচন্দ্রের সমাজ-সমালোচনার বিশেষত্ব কী? রবীন্দ্রনাথের সহিত তুলনায় তাঁহার বিশেষত্ব এই যে, রবীন্দ্রনাথ সাধারণত এই বিষয়ের খুব ব‍্যাপক ও গভীর বিশ্লেষণ করেন না, প্রসঙ্গক্রমে সামাজিক দুর্নীতিগুলির প্রতি কটাক্ষপাত বা অঙ্গুলিসংকেত করেন --ব‍্যক্তিগত জীবনের সমস‍্যালোচনাই তাঁহার প্রধান বিষয়। 'গোরা'তে তিনি সমস্ত সমাজ-