Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা- ১৩৩, ১৩৪ ও ১৩৫

2020-09-07
ক্ষেত্রের উপর দৃষ্টিপাত করিয়াছেন বটে, কিন্তু এখানেও তাঁহার সমালোচনা যুক্তি-তর্কের স্তর অতিক্রম করিয়া ভাবগভীরতার দিকে অগ্রসর হয় নাই। বিশেষত 'গোরা'তে যে সমস্ত সমাজ-ও-ধর্ম-সমস‍্যা আলোচিত হইয়াছে, যথা--সাকার-নিরাকার উপাসনা, বা জাতিভেদ, বা আচার-ব‍্যবহারে অত‍্যন্ত শুচিতা-সংরক্ষণ---সেগুলি বিচার-বিতর্কের কথা, ব‍্যবহারিক জীবনে তাহাদের প্রভাব বা প্রতিক্রিয়া খুব মারাত্মক নয়। পক্ষান্তর, শরৎচন্দ্র, যে সমস্ত দুষ্ট-ব্রণ প্রকৃতপক্ষে আমাদের সমাজদেহে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করিয়াছে, যাহাদের বিষ সমাজের অস্থিমজ্জায় ছড়াইয়া পড়িয়া তাহার স্বাস্থ‍্য ও শক্তির মূলোচ্ছেদ করিয়াছে, সেই সমস্ত দুরপনেয় কলঙ্কচিহ্নের প্রতি স্বীয় সমুদয় শক্তি প্রয়োগ করিয়াছেন। সমাজ-বিধির এই নিষ্ঠুর ঔদাসীন‍্য ও প্রতিকূলতা আমাদের আধিব‍্যাধিজর্জর, অভাবদৈন‍্যপীড়িত সংসারযাত্রাকে কত নিরর্থক দুর্বিষহ করিয়া তোলে, এই সমস্ত সমাজ-রচিত, শাস্ত্র-নির্দিষ্ট বাধার চারিদিকে কত অশ্রুজল উদ্বেলিত হইয়া উঠে, ব‍্যক্তিস্বাধীনতা ও পারিবারিক সুখ-শান্তিকে যে ইহারা কীরূপ দুশ্ছেদ‍্য নাগপাশের বন্ধনে বাঁধিয়াছে--শরৎচন্দ্রের উপন‍্যাসে আমাদের সামাজিক জীবনের এই করুণ, গভীর ব‍্যথাভরা দিকটার প্রতিই সর্বাপেক্ষা বেশি ঝোঁক দেওয়া হইয়াছে। হিন্দু-সমাজের বিবাহ-বিধিগুলি যৌক্তিক কী অযৌক্তিক, তাহার সপক্ষে ও বিপক্ষে কী কী যুক্তি-তর্ক তোলা যাইতে পারে তাহা লইয়া তিনি মাথা ঘামান নাই; এই বিবাহ-বিধিগুলি বর্তমান অবস্থার কত অনুপযোগী, আমাদের প্রতিদিনের পারিবারিক জীবনে যে ইহারা কত অস্বাচ্ছন্দ‍্য, নিষ্ঠুরতা ও নৈতিক হীনতার হেতু হয় ইহাই তাঁহার প্রতিপাদ‍্য বিষয়। 'পল্লীসমাজ'-এ আচারনিষ্ঠা ও সমাজ-রক্ষার অজুহাতে যে কতটা ক্রূরতা, নীচ স্বার্থপরতা ও হেয় কাপুরুষতা আমাদের সমর্থন লাভ করিয়াছে, আমাদের জীবন যে কী পরিমাণ পঙ্গু ও অক্ষম হইয়া পড়িতেছে--ইহাই তিনি চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়াছেন।
     অন‍্যান‍্য লেখকের সহিত তুলনায় শরৎচন্দ্রের উপন‍্যাসে এই অত‍্যাচার-কাহিনী আরও করুণরসপ্রধান ও মর্মস্পর্শী হইয়াছে। তাঁহার বিশ্লেষণ যেমন তীক্ষ্ণ ও অভ্রান্তলক্ষ‍্য, তাঁহার করুণরস সঞ্চার করিবার ক্ষমতাও সেই পরিমাণে অসাধারণ। সাধারণ ঔপন‍্যাসিক এই অত‍্যাচার কেবল একটা বহিঃশক্তির পীড়নরূপেই চিত্রিত করিয়া থাকেন--তাহাদের অত‍্যাচার-বণানাতে প্রায়ই একটা আতিশয‍্য-দোষ, অতিরঞ্জন-প্রবর্তনা লক্ষ‍্য করা যায়। শরৎচন্দ্রের বর্ণনার মধ‍্যে সর্বত্রই একটা মিতভাষিতা ও কলাসংযম পরিস্ফুট। তিনি জানেন যে, সামাজিক উৎপীড়নের তীক্ষ্ণতম খোঁচা আসে বাহির হইতে নয়, নিজ পরিবারস্থ ব‍্যক্তি বা সাধারণত স্নেহশীল অভিভাবকের নিকট হইতে। 'অরক্ষণীয়া'তে ( ১৯১৬ ) জ্ঞানদার অপমান অসহনীয়তার চরম সীমায় পৌছায় তখনই, যখন তাহার স্নেহশীল মাতা পর্যন্ত ভ্রান্ত ধর্মসংস্কারের নিকট নিজ স্বাভাবিক অপত‍্যস্নেহ বিসর্জন দিয়া বিশ্বব‍্যাপী উৎপীড়নের কেন্দ্রস্থলে গিয়া দণ্ডায়মান হন। সমাজের ক্রূরতম নির্যাতন সেইখানে যেখানে তাহার বিষাক্ত প্রভাবে মাতৃস্নেহ পর্যন্ত নিষ্ঠুর জিঘাংসাতে রূপান্তরিত হয়। স্বর্ণমঞ্জরীর অবিশ্রান্ত লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সে কোনও রকমের সহ‍্য করিতে পারিত, কিন্তু নরকভয়-ভীত দুর্গামণির কঠিন অনুযোগ ও কঠিনতর পদাঘাত ধৈর্যের বন্ধনকে নিঃশেষে ছিন্ন করে। সর্বাপেক্ষা সহনাতীত অপমান আসিয়াছে জ্ঞানদার নিজের হাত হইতে --বিবাহের পণ‍্যশালায় নিজেকে বিকাইবার জন‍্য তাহার স্বহস্তেরচিত ব‍্যর্থ সজ্জানুষ্ঠানই তাহার নারীত্বের হীনতম লাঞ্ছনা। এই চরম লজ্জার সহিত তুলনায় অতুলের প্রত‍্যাখ‍্যান ও কৃতঘ্নতা একটা অতিসাধারণ, উপেক্ষণীয় অপমান বলিয়াই মনে হয়। গ্রন্থকার শেষ পরিচ্ছেদে জ্ঞানদার মাতৃশ্মশানে তাহার সহিত অতুলের একটা পুনর্মিলন ঘটাইবার চেষ্টা করিয়াছেন --কিন্তু এই নিতান্ত ব‍্যর্থ প্রয়াস অপমানেরই একটা প্রকারভেদ বলিয়া আমাদের বুকে গিয়া আঘাত করে। এই দুর্ভাগিনী মেয়েটার এমনই অদৃষ্ট যে, তাহার সৃষ্টিকর্তাও সহানুভূতির ছদ্মবেশে তাহার বক্ষে আর একটা সুদুঃসহ অপমানের শেলাঘাত করিয়া বসিয়াছেন। 'বামুনের মেয়ে' (১৯২০) গল্পে এই অসহনীয় তীব্রতা নাই। কৌলীন‍্য-প্রথার কুফল ও কৌলীন‍্য-গর্বের অসংগতি ও অন্তঃসারশূন‍্যতা ইহার আলোচ‍্য বিষয়। এই ব‍্যাধির জীবাণু আমাদের সমাজদেহে আর সেরূপ সজীব ও ক্রিয়াশীল নাই, ইহা এখন একটা অতীতের স্মৃতি মাত্র। প্রায় অর্ধশতাব্দী পূর্বে বিদ‍্যাসাগর মহাশয়ের বহুবিবাহ-নিবারণ-বিষয়ক পুস্তিকা-সম্বন্ধে আলোচনা-প্রসঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্র এই মুমূর্ষু রাক্ষসের বিরুদ্ধে ধৃতাস্ত্র লেখককে ডন্ কুইক্সোটের সহিত তুলনা করিয়াছিলেন। তখন যে মুমূর্ষু ছিল, এখন সে নিশ্চয়ই মৃত। সুতরাং কৌলীন‍্য-প্রথার উপর শরৎচন্দ্রের আক্রমণকে নিতান্তই মরার উপর খাঁড়ার ঘায়ের পর্যায়ে ফেলা যাইতে পারে। অতএব এই উপন‍্যাসে আলোচিত সমস‍্যা আমাদিগকে সেরূপ গভীরভাবে স্পর্শ করে না। অরুণ ও সন্ধ‍্যার প্রেমও ম্লান ও মর্ণবিরল হইয়াছে। তবে উপন‍্যাসের অপ্রধান চরিত্রগুলি--রাসু বামনী, গোলক চাটুয‍্যে, জগদ্ধাত্রী ও প্রিয় মুখুজ‍্যে --বেশ ফুটিয়া উঠিয়াছে।
     সমাজ-সমালোচনার উপন‍্যাসগুলির মধ‍্যে 'পল্লীসমাজ'-এরই (১৯১৬) নিঃসন্দেহ প্রাধান‍্য। এই উপন‍্যাসে কোনো একটি বিশেষ বিশেষ সামাজিক কুপ্রথার প্রতি কটাক্ষপাত হয় নাই, কিন্তু হিন্দু সমাজের প্রকৃত আদর্শ ও মনোভাবের, ইহার সমগ্র জীবনযাত্রার একটা নিখুঁত প্রতিকৃতি দেওয়া হইয়াছে। অঙ্কনের বাস্তবতায়, বিশ্লেষণের তীক্ষ্ণতায় ও সহানুভূতির গাঢ়তায় ইহা অনুরূপ বিষয়ের সমস্ত উপন‍্যাস হইতে বহু উচ্চে স্থান গ্রহণ করিয়াছে। আমরা আমাদের সামাজিক বিধিব‍্যবস্থাগুলির সনাতনত্বের ও উৎকর্ষের বড়াই করি; শরৎচন্দ্র নির্মম বিশ্লেষণের দ্বারা দেখাইয়াছেন যে, আমাদের গর্বের এই প্রথাগুলি প্রকৃতপক্ষে আমাদিগকে কোন সর্বনাশের রসাতলে লইয়া গিয়াছে। শরৎচন্দ্রের উপন‍্যাসে বিদেশি সমালোচকের অবজ্ঞা-মিশ্রিত বিদ্রূপ বা সস্তা মুরুব্বিয়ানা নাই, আছে অভ্রান্ত বিশ্লেষণ ও গভীর আত্মগ্লানি। সামাজিক দলাদলির চিত্রগুলিতে লেখক যে অপরিসীম নীচতা, কাপুরুষতা ও কৃতঘ্নতার দৃশ‍্য উদঘাটিত করিয়াছেন তাহাতে আমাদের সমাজ-জীবনের মূল নৈতিক আদর্শগুলি-সম্বন্ধেই গভীর সন্দেহ জাগিয়া উঠে। এই সমস্ত মূলগত আদর্শও নিন্দনীয় ছিল না--ইহারা পশ্চিমের ব‍্যক্তিসর্বস্ব আত্মস্বাতন্ত‍্য অপেক্ষা উচ্ছতর-পর্যায়ভুক্ত; সমস্ত গ্রামের সুখ-দুঃখ, আচার-ব‍্যবহার, কর্ম-অবসরকে একটা সাধারণ আদর্শে নিয়ন্ত্রিত করা, সমাজস্থ প্রত‍্যেক ব‍্যক্তিকে তাহার যথাযোগ‍্য আসন দেওয়া কেবল অর্থমর্যাদার নিকট মস্তক

অবনত না করিয়া মদোদ্ধত ধনগর্বের উপর সমাজ-শাসনের প্রভুত্ব জারি করা, ছোটো-বড়ো, ইতর-ভদ্র, উচ্চ-নীচ সকলের মধ‍্যেই একটা স্নেহ-ভক্তি-আত্মীয়তার স্বর্ণসূত্র রচনা করা,-বোধ হয় ইহা অপেক্ষা উচ্চতর সামাজিক আদর্শ কল্পনা করা যায় না। কিন্তু এই অত‍্যন্ত সুচিন্তিত পাকা ব‍্যবস্থার মধ‍্যে একটা ছিদ্র রহিয়া গিয়াছিল--ব‍্যক্তিস্বাধীনতার অনুচিত সংকোচ ও উচ্ছবর্ণের উপর নিম্নবর্ণের একান্ত দ্বিধালেশহীন নির্ভর। যখন কালক্রমে আমাদের সুস্থ, সতেজ ধর্মজ্ঞান ও সামাজিক কর্তব‍্যবুদ্ধি বিকৃত ও জরাগ্রস্ত হইয়া পড়িল, তখন এই রন্ধপথে শনি প্রবেশ করিয়া আমাদের সমস্ত সামাজিক-জীবনকে ক্লিষ্ট ও ব‍্যাধিজর্জর করিয়া তুলিল। তখন সমাজ-নিয়ন্ত্রণের প্রত‍্যেক অনুষ্ঠানটিই অপ্রতিহত যথেচ্ছার, নির্লজ্জ স্বার্থসিদ্ধি ও হৃদয়হীন পৈশাচিক নিষ্ঠুরতার লীলাক্ষেত্র হইয়া দাঁড়াইল। সর্বাপেক্ষা পরিতাপের বিষয় এই যে, এই গ্লানিকর পরাধীনতার বিষ আমাদের অস্থিমজ্জাগত হইয়া আমাদের বিচারবুদ্ধি ও হিতাহিতজ্ঞানকে পর্যন্ত আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল। তাহারই ফলে আমরা আমাদের উপচিকীর্ষার পর্যন্ত গুণগ্রহণ করিতে ভুলিয়া গেলাম, আমাদের শ্রদ্ধাপুষ্পাঞ্জলি গিয়া পড়িল সেই সনাতন অত‍্যাচারীদের চরণপ্রান্তে, আর উপকারের প্রতিদান হইল চরম কৃতঘ্নতা। এই হেয়তম মনোবৃত্তির ফলে বেণী ও গোবিন্দ সমাজপতি আর রমেশ একঘরে। শরৎচন্দ্রের 'পল্লীসমাজ'-এর কৃতিত্ব এই যে, তিনি কয়েকটিমাত্র সুনির্বাচিত দৃশ‍্যের সাহায‍্যে এই জঘন‍্য মনোবৃত্তির উচিত প্রায়শ্চিত-স্বরূপ একটা প্রবল ঘৃণা ও ধিক্কারবোধ জাগাইয়া দিয়াছেন। বিদেশি ও বিধর্মীর অবিশ্রান্ত আক্রমণ যে পুঞ্জীভূত ঔদাসীন‍্য ও জড়তার গণ্ডারচর্ম স্পর্শ পর্যন্ত করিতে পারে নাই, এই প্রতিভাশালী স্বজাতীয় লেখকের হস্তনিক্ষিপ্ত একটিমাত্র তীর তাহার ঠিক মর্মস্থলে ভেদ করিয়াছে।
     'পল্লীসমাজ'- এ (১৯১৬) খাঁটি সমাজ-সমালোচনা ছাড়া আর যে বিষয় আছে তাহার কেন্দ্র বিশ্বেশ্বরী জ‍্যাঠাইমা ও রমা। নিছক বিশ্লেষণ ও সমালোচনা দ্বারা একটা তীব্রতা আসে বটে কিন্তু প্রকৃত ভাবগভীরতা লাভ করা যায় না। 'পল্লীসমাজ'- এ যে সামাজিক আদর্শের বিকৃতি দেখানো হইয়াছে তাহার সুস্থ সতেজ ভাবের প্রতীক বিশ্বেশ্বরী। তিনি একদিকে রমেশ ও এই পঙ্গু, নির্জীব ও ব‍্যাধিগ্রস্ত পল্লীসমাজের ঠিক মাঝখানে দাঁড়াইয়া উভয়ের মধ‍্যে মধ‍্যস্থতা করিতে, রমেশের উচ্চভাবপ্রধান আদর্শের সঙ্গে পল্লীজীবনের বাস্তব অবস্থার একটা সামঞ্জস‍্য সাধন করিতে চেষ্টা করিয়াছেন। সমাজের লোকদের দীন অসহায় ভাব ও আত্মঘাতী মূঢ়তার বিষয় স্মরণ করাইয়া দিয়া জ‍্যাঠাইমা রমেশের মনে তাহাদের বিরুদ্ধে ঘৃণার পরিবর্তে একটা অনুকম্পার ভাব জাগাইতে চাহিয়াছিলেন। কিন্তু তাঁহার চেষ্টা সফল হয় নাই এবং এই মধ‍্যস্থতার জন‍্য তাঁহার চরিত্রটি অনেকটা অবাস্তবতাগ্রস্ত হইয়া পড়িয়াছে। তাঁহার মুখ সইতে অনেক গভীর সহানুভূতিপূর্ণ ও জ্ঞানগর্ভ কথা শুনিতে পাই, কিন্তু তাহাদের উৎসমুখ যে কোথায় তাহার সন্ধান পাই না। পল্লীজীবনে তাঁহার উদারতা ও স্নেহশীল, ক্ষমাপরায়ণ হৃদয়ের কোনো প্রভাবও লক্ষ‍্য হয় না। নিজের ছেলে বেণীকে তো তিনি একটু সত‍্যকার দাবি ছিল সেই রমাকে পর্যন্ত প্রকৃত কার্যক্ষেত্রে তিনি একটুমাত্রও নিয়ন্ত্রণ করিতে পারেন নাই। রমেশের গৃহে শ্রদ্ধবাসরে তাঁহার অতর্কিত প্রকাশ‍্য আবির্ভাবের পরই তিনি আবার গৃহকোণের নরবতার মধ‍্যে আত্মগোপন করিলেন; কেবল রমেশ ও রমার সহিত মাঝে মাঝে কথোপকথন ও সস্নেহ উপদেশদান ছাড়া আর তাঁহার কর্মজীবনের কোনো নিদর্শন রহিল না। তাঁহার প্রগাঢ় সহানুভূতি ও তীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টির সহিত এই নিষ্ক্রিয় নিশ্চেষ্টতার ঠিক সামঞ্জস‍্য হয় না। তাঁহার চরিত্রের সঙ্গে 'গোরা'র আনন্দময়ীর সাদৃশ‍্য খুব সুস্পষ্ট। কিন্তু আনন্দময়ীর উদারতার ও লৌকিক আচারলঙ্ঘনের যেমন সুস্পষ্ট কারণ নির্দেশ হইয়াছে বিশ্বেশ্বরীর ক্ষেত্রে সেরূপ কিছু মিলে না।
 &nbs;   কিন্তু উপন‍্যাসের মধ‍্যে যাহা সর্বাপেক্ষা জটিল ও দুরধিগম‍্য তাহা রমেশ ও রমার পরস্পর সম্পর্ক লইয়া। তাহাদের মধ‍্যে যে প্রকাশ‍্য সামাজিক ওবৈষয়িক দ্বন্দ্ব, তাহাকে অতিক্রম করিয়া একটি অন্তর্গূঢ়, প্রাণপণ চেষ্টায় নিরুদ্ধগতি, প্রমের আকর্ষণলীলা বিফরীত স্রোতে চলিয়া যাইতেছে। এই প্রেমের বহিঃপ্রকাশ খুব অভিনব। ইহা প্রেমাস্পদকে কঠিন আঘাত করিতে এমন কি মিথ‍্যা সাক্ষ‍্য দিয়া জেলে পাঠাইতেও কুণ্ঠিত হয় নাই। কিন্তু প্রত‍্যেক আঘাতের পরই একটা প্রবলতর প্রতিঘাত, একটা তীব্র অনুশোচনা ইহার গোপন অস্তিত্বের পরিচয় দিয়াছে। যাহা হয়তো মূলত বিবেকের দংশন চরিত্র-গৌরবের প্রাপ‍্য মুগ্ধ প্রশংসা, তাহারই ভিতর দিয়া প্রেম নিজ তীব্রতর গরল ও প্রবলতর জীবনশক্তি ঢালিয়া দিয়াছে। রমেশের বিপক্ষতাচরণ করিতে রমার ইতস্তত ভাব, তাহার প্রতি সস্নেহ অনুযোগ বা হিতকামনায় সতর্কবাণী ---ইহাদের পশ্চাতে ছদ্মবেশী প্রেমের ত্রস্ত, গোপন পদক্ষেপ শুনা যায়। কেবল একবার মাত্র তারকেশ্বরের বাসাবাড়িতে একটি রাত্রির সেবা-যত্নের মধ‍্য দিয়া অর্ধচেতন প্রেম নিজের সহজ নিষ্ক্রমণপথ রচনা করিয়া লইয়াছিল। অপ্রকাশিত প্রেমের ক্ষীণ আভাস স্থূল স্বার্থ-সংঙাতের মধ‍্যে সূক্ষ্ম রসানুভূতির সঞ্চার করিয়াছে, বহির্দ্বন্দের কাহিনীর উপর আন্তর্বিক্ষোভের করুণ অর্থ-গৌরব আনিয়া দিয়াছে। বিষয়টির এই রূপান্তর -সাধনই শরৎচন্দ্রের শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয়।
( ৪ )
পূর্বরাগপুষ্ট মধুরান্তিক প্রেম

  'দেনা-পাওনা' (১৯২৩) উপন‍্যাসটি শরৎচন্দ্রের অন‍্যান‍্য গ্রন্থ হইতে অনেকটা ভিন্নজাতীয়। নিজ বিবাহিত পরিত‍্যক্ত স্ত্রী, অধুনা চণ্ডীগড়ের ভৈরবী ষোড়শীর সংস্পর্শে, অত‍্যাচারী, লম্পট, পাপপুণ‍্যজ্ঞানহীন জমিদার জীবানন্দের অভূতপূর্ব পরিবর্তন এই উপন‍্যাসটির মূল বিষয়। দারুণ কুক্রিয়াসক্ত, পাপপঙ্কে আকণ্ঠ-নিমগ্ন জীবানন্দের অন্তরে যে প্রণয়প্রবৃত্তি ও ভদ্রজীবনযাপনের স্পৃহা সুপ্ত ছিল তাহা ষোড়শী-সংসর্গের মায়াদণ্ডস্পর্শে অকস্মাৎ নবজীবন লাভ করিয়া ফুলে-ফলে মঞ্জরিত হইয়া উঠিল। ষোড়শীর চরিত্র-গৌরবের অসাধারণত্ব বুঝাইবার জন‍্য লেখক দেবীমন্দিরের ভৈরবীদের জীবনযাত্রা সম্বন্ধে আমাদের মধ‍্যে যে বিশেষ ধর্মসংস্কার প্রচলিত আছে, তাহার প্রতি

আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করিয়াছেন। এই ভৈরবীদের বাহ‍্য কৃচ্ছসাধন ও আত্মনিগ্রহের অন্তরালে একটা কুৎসিত ভোগলালসার উচ্ছৃঙ্খলতা প্রায় প্রকাশ‍্যভাবেই অভিনীত, ইহা, ভৈরবী-জীবনের একটা বিশেষত্ব। এই কদাচার শাস্ত্রবিধি অনুসারে গর্হিত হইলেও প্রকৃত প্রস্তাবে উপেক্ষিত হইয়া থাকে--ইহাদের চরিত্রভ্রংশ একটা অবশ‍্যম্ভাবী অপরাধের ন‍্যায় একটু বিদ্রূপ-মিশ্রিত উপেক্ষার চক্ষেই সকলে দেখিয়া থাকে। কিন্তু প্রয়োজন হইলে এই উপেক্ষিত অপরাধ হঠাৎ একটা অপ্রত‍্যাশিত গুরুত্ব লাভ করে ও আমাদের সামাজিক দলাদলির আগুন জ্বালাইতে ইন্ধনের কাজ করে। এখানে ষোড়শী সম্বন্ধে ঠিক তাহাই ঘটিয়াছে। তাহার কল্পিত অপরাধের দণ্ড প্রদান করিতে আমাদের সমাজপতিরা হঠাৎ অত‍্যন্ত ব‍্যস্ত হইয়া পড়িয়াছেন, তাহার দেবীর সেবাইত-পদের জন‍্য অযোগ‍্যতার বিষয়ে তাঁহাদের সুপ্ত বিবেকবুদ্ধি হঠাৎ অতিমাত্রায় জাগরিত হইয়া উঠিয়াছে--বিশেষত যখন এই ধর্মানুষ্ঠানের পুরস্কার, মন্দিরের সম্পত্তি ও দেবীর বহুকাল-সঞ্চিত অলংকারদির সদ‍্য-লাভ। ধর্মজ্ঞানের পশ্চাতে যখন বিষয়স্পৃহা ঠেলা দেয় তখন তাহার বেগ অনিবার্য হইয়া থাকে। সুতরাং এই ধর্মপ্রাণ সমাজের সমস্ত সম্মিলিত শক্তি যে অতি নির্মমভাবে একটি অসহায়া রমণীর উপর গিয়া পড়িবে তাহাতে আশ্চর্য হইবার কিছুই নাই। ষোড়শীর চরিত্রের প্রকৃত গৌরব এই যে, পাপপথে পদার্পণের জন‍্য পূর্ববর্তিনীদের নজির ও সমাজের প্রায় অবাধ সনন্দ দেওয়া থাকিলেও তাহার সহজ ধর্মবুদ্ধি তাহাকে সেই সনাতন পথে পা বাড়াইতে দেয় নাই।
     তাহার পর মন্দিরের সম্পত্তির অধিকারিণী বলিয়া ও পূজাসংক্রান্ত কার্যে সর্বদা পুরুষের সহিত সংস্রবের প্রয়োজন থাকায় ষোড়শীর চরিত্রে অনেক পুরুষোচিত গুণের বিকাশ হইয়াছে --বিপদে স্থিরবুদ্ধি, অচঞ্চল সাহস ও একান্ত আত্মনিভারশীল একটা দুর্ভেদ‍্য নিঃসঙ্গতার সহিত রমণীসুলভ কোমলতা মিশিয়া তাহার চরিত্রকে অপূর্ব মাধুর্যে ও গাম্ভীর্যে মণ্ডিত করিয়া তুলিয়াছে। এই অপূর্ব চরিত্রই জীবানন্দকে প্রবল বেগে আকর্ষণ করিয়া তাহার পাষাণ প্রাণকে দ্রবীভূত করিয়াছে ও তাহাকে প্রথম প্রণয়ের স্বাদ দিয়াছে। জীবানন্দের অসংকোচ পাপানুষ্ঠানের মধ‍্যে অন্তত লুকোচুরির হীন কাপুরুষতা ছিল না, এবং এই সত‍্যভাষণের পৌরুষ ও কপাটাচারের প্রতি অবজ্ঞাই তাহার চরিত্রে মহত্ত্বের বীজ; প্রেমের স্পর্শে ইহা একটি অকপট অনুতাপ ও সংশোধনের দৃঢ় সংকল্পরূপে আত্মপ্রকাশ করিল। তাহার মনে প্রেমের অলক্ষিত সঞ্চার, তাহার পক্ষে একান্ত অভিনব দ্বিধা-সংকোচ-জড়িত অন্তর্বন্দ্ব অতি সুন্দরভাবে চিত্রিত হইয়াছে। গ্রাম‍্য সমাজপতিদের চরিত্রও অল্প কয়েকটি কথায় বেশ ফুটিয়া উঠিয়াছে। তবে নির্মল-হৈমবতীর আখ‍্যান মূল গল্পের সহিত নিবিড় ঐক‍্য লাভ করে নাই। ফকির সাহেবেরও উপন‍্যাসে বিশেষ কোনো সার্থকতা নাই। তিনি বাস্তবতা-প্রধান যুগে আদর্শবাদপ্রিয়তার শেষ চিহ্নস্বরূপই প্রতীয়মান হন। ভৈরবী-জীবনের লৌকিক আচার-ব‍্যবহারগত বিশেষত্বই এই উপন‍্যাসের বৈচিত‍্যের হেতু হইয়াছে এবং এই ভিত্তির উপরই শরৎচন্দ্র ষোড়শী-জীবনের লৌকিক আচার-ব‍্যবহারগত বিশেষত্বই এই উপন‍্যাসের বৈচিত‍্যের হেতু হইয়াছে এবং এই ভিত্তির উপরই শযৎচন্দ্র ষোড়শী-চরিত‍্যের বৈশিষ্ট‍্য প্রতিষ্ঠিত করিয়াছেন।
     নির্মল ও হৈমর দাম্পত‍্য-জীবনের দৃষ্টান্ত ষোড়শীর মনে সংসার বাঁধিবার বাসনাকে উদ্রিক্ত করিয়া তাহার জীবনের ভবিষ‍্যৎ পরিণতির হেতুস্বরূপ হইয়াছে এবং উপন‍্যাস-মধ‍্যে এই খণ্ড-কাহিনীর প্রবর্তনের প্রকৃত উদ্দেশ‍্য ইহাই--এইরূপ অভিমত অনেক সমালোচক কতৃক গৃহীত হইয়াছে। হয়তো ষোড়শী যখন নবোন্মেষিত স্বামিপ্রেমে কিছুটা উন্মনা ও চলচ্চিত্ত হইয়া পড়িয়াছে, যখন তাহার ভৈরবী-জীবনের আদর্শ ও সংস্কার এই প্রণয়াকাঙক্ষার প্রাবল‍্যে কতকটা শিথিল হইয়াছে মনের সেই দোদুল অবস্থায় হৈমর দাম্পত‍্য-জীবনের নিরুদ্বেগ সুখ-শান্তি তাহাকে খানিকটা স্পর্শ করিয়া থাকিবে। বিশেষত সমাজের সম্মিলিত বিরুদ্ধতার মধ‍্যে একমাত্র হৈমর হিতৈষণা ও সমফেদনা তাহাকে হৈমর জীবনাদর্শের প্রতি কতকটা আকৃষ্ট করিয়া থাকিতে পারে। কিন্তু সমস্ত বিষয়টি অভিনিবেশ সহকারে আলোচনা করিলে এই অভিমতকে যাথার্থ বলিয়া মনে হয় না। প্রথমত, ষোড়শীর চিত্তে স্বামিপ্রেম-সঞ্চার হৈমর সহিত পরিচয়ের পূর্বেই ঘটিয়াছে। দ্বিতীয়ত, ষোড়শীর স্বচ্ছদৃষ্টির ও তীক্ষ্ণ অনুভূতির নিকট হৈমর তথাকথিত দাম্পত‍্য-প্রেম-সৌভাগ‍্যের অন্তঃসারশূন‍্যতা গোপন থাকে নাই। যে নির্মল তাহার প্রণয়ের লোভে ঘন ঘন তাহার সঙ্গে সাক্ষাতের অবসর খোঁজে, দয়া-দাক্ষিণ‍্যের প্রচুর আশ্বাসের বারিসেকে তাহার মনে প্রণয়ের বীজটি অঙ্কুরিত করিয়া তুলিতে চাহে, হৈমকে ফাঁকি দিয়া যে রঙিন আবেশটিকে ঘনীভূত করার স্বপ্ন দেখে সেই নির্মলকে অংশীদাররূপে লইয়া যে প্রেমের কারবার প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে তাহার বাহিরের বিজ্ঞাপনের চটক সত্ত্বেও অন্তরে যে তাহা দেউলিয়া এ সত‍্য ষোড়শীর নিকট নিশ্চয় দিবালোকের মতো স্বচ্ছ হইয়া উঠিয়াছে। সুতরাং হৈম-নির্মলের দাম্পত‍্য-জীবনে যে ষোড়শীর লোভ করিবার মতো বিশেষ কিছু ছিল ইহা বিশ্বাস করা কঠিন। তৃতীয়ত, ষোড়শীর আত্মনির্ভরশীল, বলিষ্ঠ প্রকৃতির উপর অপরের জীবনের প্রভাব যে তাহার দীর্ঘদিনরুদ্ধ প্রেমের কপাটটিকে যেন মন্ত্রবলে উন্মুক্ত করিয়াছে ইহাও তাহার অনন‍্যনির্ভর স্বাধীনচিত্ততারই নিদর্শন। এই নামমাধুর্যের অসাধ‍্যসাধনের কৃতিত্ব পরের নিকট ধার-করা প্রভাবের সাহায‍্য গ্রহণের দ্বারা নিশ্চয়ই খণ্ডিত ও ক্ষুণ্ণ হয় নাই। তাছাড়া, উপন‍্যাসের ঘটনাবিন‍্যাস আলোচনা করিলেও ইহা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, হৈমর প্রতি এতটা গুরুত্ব-আরোপ লেখকের অভিপ্রেত ছিল না-উহাকে উপন‍্যাসের একটি প্রধান নিয়ামক-শক্তিরূপে লেখক কল্পনা করেন নাই। হৈমর দৃষ্টান্তে যদি ষোড়শীর সংসার পাতিবার ইচ্ছা জাগ্রত হইয়া থাকে, তবে ফকির সাহেবের প্রভাবে তাহার মনে বৈরাগ‍্যের প্রেরণা প্রবলতর হইয়াছে ইহাও স্বীকার করিতে হইবে, কিন্তু তাহার ভৈরবীত্বই তাহার বৈরাগ‍্য-মন্ত্রে দীক্ষার মূল উৎস। আসল কথা, হৈমর দাম্পত‍্য-প্রেম ও ফকির সাহেবের সেবাধর্ম ও সংসার-বন্ধনহীন নির্লিপ্ততা এই দুই একই পর্যায়ের প্রভাব; ইহা হয়তো বাহির হইতে ষোড়শীর অন্তর্দ্বন্দ্বমথিত জীবনের দুই বিপরীতমুখী আবেগকে কতকটা সমর্থন করিয়াছে, কিন্তু তাহার অন্তরে প্রবেশ করিয়া তাহার প্রেরণার মূল রহস‍্যের সহিত একাঙ্গীভূত হয় নাই। যাহার অন্তরে ধ্রুবতারার অনির্বাণ জ‍্যোতি, তাহাকে পথিপার্শ্বস্থ গৃহপ্রদীপ যাত্রাপথে খানিকটা আলোক বিকিরণ করিতে পারে, কিন্তু ইহা তাহার পথনির্দেশের গৌরব দাবি করিতে পারে না।