Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা- ১৩৬, ১৩৭ ও ১৩৮

2020-09-09
     'দত্তা' উপন‍্যাসখানি (১৯১৮) সহজ ও নির্দোষ প্রেমের সর্বাঙ্গসুন্দর চিত্র। ইহার মধ‍্যে খুব জটিল বিশ্লেষণ বা কোনোরূপ কলুষ-আবিলতার স্পর্শ নাই অথচ নরেন-বিজয়ার ভালোবাসাটি খুব স্বাভাবিক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ‍্য দিয়া, একদিকে সরল হাস‍্য-কৌতুক ও অন‍্যদিকে শিশুসুলভ ক্রোধ, অভিমান ও বিস্ময়বিমূঢ়তার অন্তরালে ধীরে ধীরে স্ফুরিত হইয়া উঠিয়াছে। এই উপন‍্যাসে স্বতঃস্ফূর্ত, অপ্রতিরোধনীয় প্রেম ও অঙ্গীকার-বন্ধ কর্তব‍্য-পালন বা প্রতিশ্রুতিরক্ষার পার্থক‍্য-প্রদর্শনই প্রধান ফিষয়। বিলাস ও বিজয়ার মধ‍্যে যে বিশেষ বন্ধনে তাহার মূলসূত্র অনুসন্ধান করিতে গেলে উপন‍্যাসের পূর্ববর্তী উপাখ‍্যান আলোচনা করিতে হইবে। জগদীশ, রাসবিহারী ও বনমালীর বাল‍্যপ্রণয়ই বিলাসের বিশেষ দাবি-দাওয়ার মূল কারণ। বনমালী রাসবিহারীর পুত্র বিলাসের সহিত তাঁহার কন‍্যা বিজয়ার বিবাহ অঙ্গীকার করিয়া গিয়াছিলেন, এই বিশ্বাস রাসবিহারী বিজয়ার মনে বদ্ধমূল করিতে প্রাণপণ চেষ্টা পাইয়াছে, এবং বিজয়াও পিতার এই প্রতিজ্ঞার মর্যাদা রক্ষা করিবার জন‍্য স্বাধীন ইচ্ছাকে বিসর্জন দিতে প্রস্তুত হইয়াছে। কিন্তু পরে ক্রমে ক্রমে প্রকাশ পাইয়াছে যে, ইহাই বনমালীর মনোগত অভিপ্রায় ছিল না। তিনি স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া জগদীশের পুত্র নরেনের জন্মদিনে তাহার সহিত নিজ অজাতা কন‍্যার বিবাহ-প্রস্তাব করেন, নরেনকে নিজ খরচে বিলাত পাঠান ও আবিষ্কার করিয়াছে। রাসবিহারী তাহার স্বভাবসিদ্ধ ধূর্ততার সহিত সর্বপ্রথমে বিজয়া ও নরেনকে পরস্পর-বিচ্ছিন্ন, ও নরেনের সম্বন্ধে তাহার বন্ধুর আন্তরিক ইচ্ছাকে বিজয়ার নিকট গোপন রাখিতে চেষ্টা করিয়াছে এবং বিজয়ার সম্পত্তির উপর একটা কড়া অভিভাবকত্বের অধিকার দখল করিয়া বসিয়াছে। নরেনের বিরুদ্ধে বিজয়ার মনে একটা অবজ্ঞা ও বিদ্বেষের ভাব জাগাইয়া দেওয়া সত্ত্বেও বিজয়া ধীরে ধীরে তাহার উদার, ক্ষমাশীল, শিশুর ন‍্যায় সরল ও অসহায় প্রকৃতির প্রতি অনিবার্য বেগে আকৃষ্ট হইয়া পড়িয়াছে। পিতাপুত্রের নরেনের প্রতি অন‍্যায় ও ক্ষমালেশহীন বিরুদ্ধাচরণের দ্বারাই বিজয়ার সমবেদনা নিবিড়তা লাভ করিয়া প্রণয়ে রূপান্তরিত হইয়াছে। এক অণুবীক্ষণ যন্ত্রের ঘোরফের লইয়া প্রেম অনেকটা পরিণতি লাভ করিয়াছে--ইহার দ্বারা অন‍্য কোনো উদ্দেশ‍্য সিদ্ধ হউক বা না হউক, তাহার প্রণয়ের বীজাণু আবিষ্কৃত হইয়াছে। নরেনের প্রতি ব‍্যবহারের জন‍্যই বিজয়া তাহার ভবিষ‍্যত শ্বশুর ও স্বামীর প্রকৃত চরিত্র-সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা লাভ করিয়াছে, ও তাহাদের অত‍্যাচার ও স্বার্থপরতার বিরুদ্ধে তাহার ঘৃণা ও বিতৃষ্ণা নিবিড় হইয়া উঠিয়াছে। তথাপি কেবল লোকলজ্জার খাতিরে, ও তাহাদের অত‍্যাচার ও স্বার্থপরতার বিরুদ্ধে তাহার ঘৃণা ও বিতৃষ্ণা নিবিড় হইয়া উঠিয়াছে। তথাপি কেবল লোকলজ্জার খাতিরে ও অনুক্ষণ সংঘাতে পরিশ্রান্ত হইয়াই সে মনের ইচ্ছার অপেক্ষা মুখের কথাটাকেই প্রাধান‍্য দিতে প্রস্তুত ছিল --শেষ মুহূর্তে নলিনের আগ্রহাতিশয‍্যে সমস্ত ওলট-পালট হইয়া অস্বীকৃত প্রেমেরই জয় হইল।
     এই গ্রন্থ-মধ‍্যে রাসবিহারী ও বিলাসবিহারীর চরিত্র-সৃষ্টি উচ্চাঙ্গের হইয়াছে। ভণ্ডামির চিত্রে রাসবিহারীর স্থান সহজেই শীর্ষস্থানীয়। ধর্মপরায়ণতার আবরণে প্রচণ্ড স্বার্থপরতা, শান্ত, স্নেহশীল কথাবার্তার অন্তরালে ক্ষুরধার বিষয়বুদ্ধি ও অবিচলিত সংকল্প তাহার চরিত্রে অনন‍্যসাধারণ সজীবতা আনিয়াছে। বিলাসের ক্রোধোন্মত্ত অধৈর্য ও ইতর আম্ফালনকে সে বরাবরই প্রণয়ীসুলভ অভিমান বলিয়া লুকাইতে, পুত্রের সমস্ত অপরাধকে অনুকূল ব‍্যাখ‍্যা দ্বারা লঘু করিতে চেষ্টা করিয়াছে। তাহার ধৈর্য, আত্মসংযম, কার্যসিদ্ধির জন‍্য নূতন নূতন উদ্ভাবন-কৌশল-বিজয়ার বিদ্রোহকে ব‍্যর্থ করিবার জন‍্য অব‍্যর্থ পাকা চাল--সমস্তই আমাদের ভূয়সী প্রশংসার উদ্রেক করে। বিলাসের ইতর অসহিষ্ণুতা, ক্রোধদমনে একান্ত অক্ষমতা--তাহার সমস্ত বাহ‍্য ভদ্রতা ও চাকচিক‍্যের আবরণ ছিন্ন করিয়া আত্মপ্রকাশ করে। বিজয়ার ইচ্ছার উপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করিতে গিয়া সে তাহার বাবার সুকল্পিত উদ্দেশ‍্য সমস্তই নষ্ট করিয়া দিল। হিতৈষী পিতার সতর্কবাণী ও নিজের ঠাণ্ডা মেজাজের উপদেশ কিছুই তাহার অসংযমকে ঠেকাইয়া রাখিতে পারে নাই। তথাপি পিতা অপেক্ষা পুত্রের নৈতিক আদর্শ অধিকতর উচ্চ--বিজয়ার ধনের প্রতি তাহার লোভ থাকিতে পারে, কিন্তু নিঃস্বার্থ প্রণয়ের অঙ্কুরও তাহার মধ‍্যে ছিল। বিজয়ার প্রত‍্যাখ‍্যানের আসন্ন সম্ভাবনায় তাহার সমস্ত চরিত্র-গৌরব বাহির হইয়া আসিয়াছে, একটা স্তব্ধ-গম্ভীর, বিষণ্ণ পৌরুষ তাহার চরিত্রের ইতরতাকে আচ্ছাদান করিয়া মাথা তুলিয়া দাঁড়াইয়াছে। সেইজন‍্য শেষ পরাজয়ের দৃশ‍্যে তাহার জন‍্য আমাদের একটা সহানুভূতি-মিশ্রিত দীর্ঘশ্বাস পড়ে; পরাজয়ের গ্লানি পিতার মতো তাহার সর্বশরীরে এত গাঢ় কলঙ্ককালিমা লেপন করিয়া দেয় নাই।
     পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, সমাজ ও ধর্মব‍্যবস্থার অনুমোদিত, আমাদের সহজ নীতিজ্ঞান-সমর্থিত প্রেমের চিত্র শরৎচন্দ্রের অনেক উপন‍্যাসেই পাওয়া যায়--ইহাদের মধ‍্যে 'দত্তা'র স্থান নিঃসন্দেহে সর্বশ্রেষ্ঠ।
( ৫ )
নিষিদ্ধ সমাজ-বিরোধী প্রেম

এইবার নিষিদ্ধ, সমাজ-বিগর্হিত প্রেমের চিত্র যে উপন‍্যাসগুলিতে বেশ বিস্তৃত ও ব‍্যাপকভাবে বিশ্লেষিত হইয়াছে, তাহাদের আলোচনা করিতে হইবে। শরৎচন্দ্রের রচনার সহিত যে তুমুল আন্দোলন ও বিক্ষোভ সংশ্লিষ্ট হইয়াছিল, তাহার জন‍্য তাঁহার 'চরিত্রহীন', 'গৃহদাহ', ও 'শ্রীকান্ত'ই মূখ‍্যত দায়ী। এই তিনটি উপন‍্যাসে অবৈধ প্রেমের প্রতি লেখকের মনোভাব প্রায় একরূপই। সাধারণত এই শ্রেণীর ভালোবাসার উপর যেরূপ নির্বিচারে নিন্দা-গঞ্জনা বর্ষিত হয় সেই কঠোর ধর্মনীতিমূলক মনোভাবের সহিত লেখকের কোনো সহানুভূতি নাই। এই সমস্ত ক্ষেত্রে আমাদের সহজ বিচারবুদ্ধি ও ন‍্যায়ান‍্যায়বোধের আমরা কোনো ব‍্যবহারই করি না--এই সমাজবিধি-উল্লঙঘনের মূলে কোন মনোবৃত্তি আছে তাহা গণনার মধ‍্যেই আনি না--কেবল চক্ষু মুদিয়া সনাতন, চিরপ্রাগত দণ্ডবিধির ধারা প্রয়োগ করি মাত্র।

শরৎচন্দ্র তাঁহার উপন‍্যাসে এই মূঢ় অন্ধতা ও জড়, অচেতন সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে তাঁহার সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করিয়াছেন। আমাদের সংসারযাত্রার পথে অপ্রতিবিধেয় কারণে নর-নারীর মধ‍্যে এমন বিচিত্র সম্পর্কের সৃষ্টি হয় যাহার বিচার করিতে আমেদের সমস্ত তীক্ষ্ণ, অকুণ্ঠিত ধর্মবোধ ও ন‍্যায়নিষ্ঠার প্রয়োজন হয় ---যাহাকে সোজাসুজি ব‍্যভিচারের পর্যায়ে ফেলিয়া মনুসিংহিতার বিধির মধ‍্যে বিধান খুঁজিলে চলে না। এই প্রকার যান্ত্রিক বিচারে ধর্মের প্রকৃত মর্যাদা ও আদর্শ ক্ষোণ্ণ হয়। ধর্মরক্ষা ও অধর্মের প্রতিকারই শাস্ত্রনির্দিষ্ট দণ্ডের একমাত্র উদ্দেশ‍্য ও সার্থকতা, সুতরাং দণ্ডবিধানের দ্বারা যদি আমাদের আসল উদ্দেশ‍্য ব‍্যর্থ হয়, সমাজনৈতিক উন্নতির পথে না গিয়া অধোগতির দিকেই যদি অগ্রসর হয়, সমাজনেতারা অপরাধীর প্রকৃত সংশোধনের উদ্দেশ‍্যে অনুপ্রাণিত না হইয়া যদি নিজ নিজ স্বার্থসিদ্ধি, বা প্রতিহিংসাপ্রবৃত্তির চরিতার্থতার উপায় খোঁজেন, তবে দণ্ডবিধির যৌক্তিকতা সম্বন্ধে সংশয় জাগা স্বাভাবিক। যদি এই দণ্ডবিধানের দ্বারা আমাদের উচ্চতর গুণগুলি --মনুষ‍্যত্ব, ন‍্যায়পরতা, দয়া, সমবেদনা প্রভতি --নিষ্পোষিত হয় ও ঘৃণা, স্বার্থপরতা ও কাপুরুষতা প্রভৃতি নীচ প্রবৃত্তিগুলি মাথা তুলিয়া উঠে, তাহা হইলে সমস্ত দণ্ডবিধির ও বিচারনীতির আমূল সংস্কারই অবশ‍্যকর্তব‍্য। শরৎচন্দ্র, কী বিশেষ অবস্থার মধ‍্যে তাঁহার পাত্র-পাত্রীদের মধ‍্যে অবৈধ প্রণয়ের উদ্ভব হইয়াছে তাহা খুব নিপুণভাবে বিবৃত করিয়া প্রত‍্যেক ক্ষেত্রেই পাঠকের স্বাধীন বিচারের প্রার্থনা করেন। তাহাদের অপরাধটাই তাহাদের সম্বন্ধে একমাত্র আলোচ‍্য বিষয় মনে না করিয়া তাহাদের চরিত্রের অন‍্যান‍্য দিক দেখাইয়া মোটের উপর তাহারা নিন্দনীয় কী প্রশংসনীয়, এই বিষয়ে পাঠকের অভিমত স্থির করিতে বলেন। তাঁহার অচলা, সাবত্রী, অভয়া, রাজলক্ষ্মী এবং বোধ হয় কিরণময়ীও জন্ম-অপরাধী নহে, পাপের প্রতি একটা প্রবল ও অনিবার্য প্রবণতা তাহাদের অস্থি-মজ্জায় মিশিয়া নাই। সাবিত্রী ও রাজলক্ষ্মী সতীত্ব-ধর্মের মূল‍্য সম্বন্ধে এত সচেতন যে, তাহারা প্রথম বয়সের পদস্খলনের জন‍্য আজীবন প্রায়শ্চিত্ত করিয়াছে ও জীবনের সর্বোত্তম সার্থকতা হইতে নিজদিগকে স্বেচ্ছায় বঞ্চিত রাখিয়াছে। অচলা অবস্থার প্রতিকূলতা ও বাহ‍্য আত্মসম্ভম-রক্ষার জন‍্য সুরেশের নিকট আত্মসমর্পণ করিতে বাধ‍্য হইয়াছে; কিন্তু সুরেশের প্রতি তাহার মন কোনো দিনই অনুরাগরঞ্জিত হয় নাই। অভয়া নির্ভীকতিত্তে সতীত্বকে একটা আপেক্ষিক ধর্ম বলিয়া ঘোষণা করিয়াছে ও অবস্থা-বিশেষে তাহা যে অত‍্যাজ‍্য নহে তাহা নিজ ব‍্যবহারে প্রমাণ করিয়াছে; কিন্তু তাহারও সতীত্বের প্রতি নিষ্ঠার অভাব ছিল না, এবং সে যতদিন সম্ভব সতীত্বকে আঁকড়াইয়া ধরিতে চেষ্টা করিয়াছে। একমাত্র কিরণময়ীরই সতীত্বের প্রতি একটা প্রকৃত, নৈসর্গিক-আকর্ষণ ছিল না বলিয়া মনে হয়--প্রেমবর্জিত নিষ্ঠাকে সে বিশেষ মূল‍্য দিতে কখনোই রাজি হয় নাই। সুতরাং প্রত‍্যেকটি দৃষ্টান্ত যে কেবল অসতীত্বের সমর্থনের সাধারণ উদ্দেশ‍্যে অবতারিত হইয়াছে তাহা নহে; প্রত‍্যেকটিরই একটা অবস্থাঘটিত বিশেষত্ব আছে এবং ইহারই উপর লেখক জোর দিয়া পাঠকের স্বাধীন চিন্তাশক্তি ও সহানুভূতির উদ্রেক করিতে চেষ্টা করিয়াছেন।
     এই তিনটি উপন‍্যাসের বিস্তারিত আলোচনার পূর্বে এই জাতীয় কয়েকটি ছোটো গল্পে শরৎচন্দ্র তাঁহার ক্ষেত্র কীভাবে প্রস্তুত করিয়াছিলেন তাহার একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয় লইব। 'আঁধারে আলো' গল্পটিতে লেখক একজন সংসারানভিজ্ঞ তরুণ যুবক কেমন করিয়া এক পতিতা নারীর প্রকৃত পরিচয় না পাইয়া তাহার প্রতি আকৃষ্ট হয় তাহা বর্ণনা করিয়াছেন। বিজলী এই তরুণকে লইয়া কৌতুক করিবার উদ্দেশ‍্যে তাহার প্রতি ছলাকলা বিস্তার করে ও শেষে নিজের প্রকৃত পরিচয় দিয়া তাহার নির্বিুদ্ধিতার প্রতি বিদ্রূপ-কটাক্ষ করে। বিজলীর মনে কোনো কঠিন আঘাত দিবার ইচ্ছা ছিল না; সত‍্যেনের প্রতি তাহার সমস্ত আচরণই স্নেহকৌতুকমণ্ডিত। কিন্তু সত‍্যেনের সুপ্ত চরিত্র-গৌরব এই আঘাতে জাগিয়া উঠিল ও সে এক অকপট মর্যাদাময় স্বীকারোক্তির পরে তাহার ভ্রম সংশোধন করিল। সে বাড়ি ফিরিয়া বিবাহ করিল এবং বিজলীকে পাল্টা আঘাত দিবার উদ্দেশ‍্যে তাহার নবজাত পুত্রের অন্নপ্রাশনে তাহাকে নাচ-গানের বায়না দিল। কিন্তু একই আঘাতে সত‍্যেন্দ্র ও বিজলী উভয়েরই পুনর্জন্ম হইয়াছে। বিজলী সত‍্যেনের দৃঢ় চরিত্র-গৌরবে মুগ্ধ ও অনুতপ্ত হইয়া নিজ ঘৃণিত বৃত্তিকে পরিহার করিয়াছে ও সত‍্যেনের ধ‍্যানে আত্মমগ্ন হইয়াছে। সত‍্যেনের বাড়িতে তাহার স্ত্রীর সহিত তাহার পরিচয় হইয়াছে ও সে তাহাকে দিদি সম্বোধন করিয়া তাহার নিকট ঋণ স্বীকার করিয়াছে। সত‍্যেনের নির্মল দাম্পত‍্য প্রেম এই কলুষিত উৎস হইতে সঞ্জাত। বিষ হইতেই অমৃতের উদ্ভব হইয়াছে; বিষের জ্বালা বিজলী ভোগ করিয়াছে, কিন্তু অমৃতের আস্বাদনে সত‍্যেন্দ্র-পত্নীর জীবন ধন‍্য হইয়াছে। এইরূপে জীবনে যে কত অভাবিত সংযোগ ঘটে, কার্যকারণের কত বিচিত্র শৃঙ্খল রচিত হয়, পাপ-পুণ‍্যের কত আশ্চর্য মিলন সাধিত হয়, শরৎচন্দ্র এই ছোটো গল্পে তাহার রহস‍্যের উপর আলোকপাত করিয়াছেন।
     বিলাসী' (১৯২০) অসামাজিক প্রেমের রহস‍্য-উদঘাটনের আর একটি প্রচেষ্টা। ইহাতে যে অসবর্ণ বিবাহের কাহিনী বিধৃত হইয়াছে, তাহা নিছক পল্লীজীবনের প্রতিবেশ-উদ্ভূত। ব্রাহ্মণ-সন্তান মৃত‍্যুঞ্জয় বেদের মেয়ে বিলাসীর সহিত দাম্পত‍্য-সম্পর্কে আবদ্ধ হইয়াছে। এই মিলনে কোনো রোমান্সের অসাধারণত্ব বা হৃদয়াবেগের অসংবরণীয়তা নাই। ইহা সাংসারিক প্রয়োজনের পরিণতি, রোগশয‍্যার পার্শ্বে অনুষ্ঠিত সেবাধর্মের স্থায়ী মিলনে রূপান্তর। পল্লীসমাজের ক্ষুদ্র দম্ভ ও জাত‍্যভিমানের পটভূমিকায় লেখক ইহার আশ্চর্য সূক্ষ্ম ও অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ বিশ্লেষণ করিয়াছেন। মৃত‍্যুঞ্জয়ের সাংঘাতিক অসুখের সময় এই অন্ত‍্যজজাতীয়া নারী নিরলস সেবা-শুশ্রূষার দ্বারা তাহার অন্তর জয় করে ও উহার উপর একটা স্থায়ী অধিকার প্রতিষ্ঠিত করে। প্রথাবিড়ম্বিত হিন্দু-সমাজ এই স্বোপার্জিত প্রণয়াধিকারের কোনো মর্যাদা দিতে অভ‍্যস্ত নহে। কেননা উহার প্রণয়োন্মেষ কোনো দুরূহ সাধনার উপর নির্ভর করে না। ইহা সম্পূর্ণরূপে অভিভাবক-দত্ত, বিবাহ-বাজারে কেনা উপহার ও দৈবলব্ধ সম্পদ। কাজেই বিলাসীর অন্তরজয়ের ইতিহাস সমাজের নিকট সম্পূর্ণ অপরিজ্ঞাত ও মূল‍্যহীন। সমাজ বাড়ি চড়াও করিয়া একটা অসহায়া মেয়েকে মারিতে পারে--অবশ‍্য এই আক্রমণের পূর্বে তাহার রক্ষকের দরজায় শিকলি আঁটিয়া দিয়া নিজের শৌর্যপ্রকাশের অবাধ লীলাক্ষেত্র রচনা করিতে তাহার সতর্কত‍্যর ত্রটি নাই। আর মৃত‍্যুঞ্জয় যখন সাপের কামড়ে মারা গেল ও এই হীনবর্ণের স্ত্রীলোকটি সপ্তাহ-মধ‍্যে তাহার অনুগমন করিল, তখন সমাজনেতারা ইহার মধ‍্যে পাপের অবশ‍্যম্ভাবী

দণ্ডবিধানের নিশ্চিত প্রমাণ পাইয়া সমাজনীতির জয়গানে মুখর হইয়া উঠিয়াছে। এই গল্পটির মধ‍্যে লেখকের সূক্ষ্ম সমাজ-সমালোচনা ও ব‍্যঙ্গসরস, অথচ করুণার্দ্র মন্তব‍্য প্রকাশের উপভোগ‍্য পরিচয় মিলে। এই সমালোচনার বিশেষ উৎকর্ষ এই যে, ইহা কোনো বহিরাগতের উচ্চতর জীবনদর্শন-প্রসূত নহে, পল্লীগ্রামেরই আবহে লালিত একজন সাধারণ মানুষের আত্মসমীক্ষা ও নূতন অভিজ্ঞতা হইতে সঞ্চিত সংকোচময় নবমূল‍্যায়ন-প্রয়াস। এই নূতন দৃষ্টিভঙ্গি ও বিচারশীলতার সম্প্রসারিত, পরিণত রূপ আমরা শরৎচন্দ্রের নিম্নোদ্ধৃত উপন‍্যাসগুলিতে পাই।
     'চরিত্রহীন' (১৯১৭) উপন‍্যাসের নামকরণে শরৎচন্দ্র যেন আমাদের প্রচলিত সমাজনীতির আদর্শকে প্রকাশ‍্যভাবেই ব‍্যঙ্গ করিয়াছেন--সমাজ-বিচারের মানদণ্ডকে যেন স্পর্ধিত বিদ্রোহের সহিতই অতিক্রম করিয়াছেন। সতীশ-সাবিত্রীর অপরূপ প্রেমলীলাই গ্রন্থের প্রধান বিষয়--ইহারই চতুঃপার্শ্বে উপেন্দ্র-দিবাকর-কিরণময়ী আপন আপন দুশ্ছেদ‍্য জাল বয়ন করিয়া প্রেমের রহস‍্যময় জটিলতাকে আরও তরল হাস‍্যপরিহাস ও সস্নেহ তত্ত্বাবধানের মধ‍্যে যে, কীরূপে একেবারে অনিবার্য, অসংবরণীয় প্রেমের পর্যায়ে গিয়া দাঁড়াইল, প্রণয়-ইতিহাসের সেই চিরপুরাতন অথচ চিরহস‍্যমণ্ডিত কাহিনীটি এখানে অদ্ভুত সূক্ষ্মদর্শিতার সহিত বিবৃত হইয়াছে। প্রথম হইতেই এই সম্পর্কটি প্রভু-ভৃত‍্যের সাধারণ ব‍্যবহারের মাত্রা অনুসরণ করে নাই। সতীশের পরিহাস, উদ্দেশ‍্যে নির্দোষ হইলেও, সুরুচি-সংগত ছিল না; সাবিত্রীও সতীশের কল‍্যাণ-কামনায় তীব্র শ্লেষ ও নির্ভীক স্পষ্টবাদিত্বের দ্বারা প্রণয়িনীরই মর্যাদা দাবি করিত। সতীশের প্রণয়ীপক পরিহাসগুলি সে উপভোগই করিত; তাহাকে গোড়া হইতে সংযত করিবার কোনোই চেষ্টা সে করে নাই; মোটের উপর ব‍্যাপারটা একটা সাধারণ ইতর, কলঙ্কিত রূপমোহের মতোই দাঁড়াইতেছিল; ঠিক সেই সময়ে সাবিত্রীর অদ্ভুত আত্মসংযম ও প্রণয়াস্পদের আন্তরিক হিতৈষণা তাহাকে খুব উচ্চস্তরে উন্নীত করিয়া দিল। যেমন অস্পষ্ট ও শ্বাসরোধকারী ধূম্র-যবনিকার অন্তরাল হইতে কাঞ্চনবর্ণ অগ্নি ধীরে ধীরে নিজ জ‍্যোতির্ময় রূপ প্রকাশ করিয়া থাকে, সেইরূপ এই সমস্ত আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গেই সাবিত্রীর ব‍্যবহারের আশ্চর্য পরিবর্তন হইল। সে প্রাণপণ শক্তিতে নিজেকে সামলাইয়া লইল, ও সতীশের উদ্দাম, বাধাবন্ধহীন লালসাকে নিষ্ঠুর আঘাত দিয়া প্রতিরোধ করিতে চেষ্টা করিল। অপনার সম্বন্ধে একটা হীন কলঙ্ক প্রচার করিয়া নিজেকে সর্বপ্রযত্নে সতীশের সান্নিধ‍্য হইতে অপসারিত করিল, এবং রিক্ততা ও অপমানের সমস্ত বোঝা স্বেচ্ছায় মাথায় তুলিয়া লইয়া সুদীর্ঘ অজ্ঞাতবাসের মধ‍্যে আত্মগোপন করিল।
     সাবিত্রীর লাঞ্ছিত, মিথ‍্যা-কলঙ্ক-দুর্বহ জীবনের চরম সার্থকতা আসিল, যখন তাহার কঠোরতম বিচারক উপেন্দ্র তাহার গুণমুগ্ধ ভক্ত হইয়া দাঁড়াইল, ও তাহাকে নিজ রোগজর্জর শোকদীর্ণ শেষ জীবনের সঙ্গী করিয়া লইল। উপেন্দ্রের এই স্নেহাকর্ষণই তাহার সমাজের নির্মম অত‍্যাচারের একমাত্র প্রায়শ্চিত্ত। সাবিত্রীর চরিত্রের বিশেষত্ব এই যে, তাহার এই অমানুষিক আত্মসংযম ও চরিত্র-গৌরবের মধ‍্যে সর্বত্রই একটা বাস্তবতার সুর অসন্দিগ্ধভাবে বাজিয়া উঠিয়াছে। তাহাকে কোনো দিনই একজন পৌরাণিক শাপভ্রষ্টা দেবী বলিয়া আমাদের ভ্রম হয় না। সতীশ-সাবিত্রীর সম্পর্কের মধ‍্যে কেবল একস্থানেই একটু অবাস্তবতার স্পর্শ হইয়াছে বলিয়া মনে হয়। কলিকাতার মেসে যখন তাহাদের প্রণয়সম্পর্কটি ধীরে ধীরে গড়িয়া উঠিতে ছিল, তখন লেখক এই ক্রমবর্ধমান প্রেমের যৌবন-পরিণতির জন‍্য যে অনুকূল, বাধাবন্ধহীন অবসর রচনা করিয়াছেন তাহা বাস্তব-জীবনে মেলে না। বেহারী ও বামুনঠাকুর উভয়েই এই নবীন আবির্ভাবটিকে সশ্রদ্ধ সম্ভ্রম ও সহানুভূতির চক্ষে দেখিয়াছে, তাহার চারিদিকে ভক্তি অর্ঘ‍্য রচনা করিয়া ও আরতি-দীপ জ্বালাইয়া ইহার দেবত্ব স্বীকার করিয়া লইয়াছে। রাখালবাবুর ঈর্ষার কথা মধ‍্যে মধ‍্যে শোনা যায় বটে, কিন্তু সৌভাগ‍্যক্রমে এই ঈর্ষা-কলুষিত বাষ্প প্রেমের নির্মলতার উপর কোনো কলঙ্কের দাগ বসাইতে পারে নাই। সতীশ-সাবিত্রীর অনুপম প্রেমকাহিনীর কথা পড়িতে পড়িতে আমাদের কেবলই মনে হয়, ইহার মাধুর্য ও বিশুদ্ধি কত সূক্ষ্ম সূত্রের উপরেই দাঁড়াইয়া আছে। একটি কুৎসিত ইঙ্গিত, একটি ইতর বিদ্রূপ ইহার সমস্ত মাধুর্যকে নিঃশেষে শুকাইয়া ইহার অন্তর্নিহিত কদর্যতাকে অনাবৃত করিয়া দিতে পারিত। সমস্ত মেস যেন তাহার সংকীর্ণ সন্দেহ ও বিদ্বেষ-কলুষিত মনোবৃত্তি সংহরণ করিয়া নীরব সম্ভ্রমে এই প্রেম-মাধুরীকে নিরীক্ষণ করিয়াছে ও রুদ্ধ নিশ্বাসে একপার্শ্বে সরিয়া দাঁড়াইয়াছে। এইরূপ অনুকল অবসর আমাদের কাছে অস্বাভাবিক বলিয়াই ঠেকে--মনে হয় যেন বাস্তবতার ঠিক মর্মস্থলে অবাস্তবতার একটা সূক্ষ্মতর স্পর্শ দানা বাঁধিয়াছে।
     কিন্তু উপন‍্যাস-মধ‍্যে যে চরিত্রটি সর্বাপেক্ষা চমকপ্রদ, সে কিরণময়ী। কিরণময়ী শরৎচন্দ্রের অত‍্যুদ্ভূত সৃষ্টি। আমাদের বঙ্গদেশের সমাজ ও পরিবারে, বা উপন‍্যাসের পাতায় যত বিভিন্ন প্রকৃতির রমণীর দর্শন মিলে, তাহাদের সহিত কিরণময়ীর একেবারে কোনো মিল নাই। তাহার চরিত্রে অনন‍্যসাধারণ শক্তি, দৃপ্ত তেজস্বিতা, তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ-শক্তি ও বিচারবুদ্ধির সহিত একেবারে কুণ্ঠহীন, সংস্কার-প্রভাবমুক্ত, ধর্মজ্ঞানবর্জিত সুবিধাবাদের এক আশ্চর্য সংমিশ্রণ হইয়াছে।
     কিরণময়ীর সহিত প্রথম পরিচয়ের দৃশ‍্যই আমাদের মনে গভীর দাগ কাটিয়া বসে। জীর্ণ, ধ্বংসোন্মুখ গৃহে মুমূর্ষু স্বামীর সান্নিধ‍্যে তাহার দীপ্ত অশোভন, বিদ‍্যুৎরেখার ন‍্যায় রূপ, যত্ন-রচিত প্রসাধন ও সন্দেহের তীব্রজ্বালাময় বিষোদগার এক মোহূর্তেই একটা শ্বাসরোধকারী, অসহনীয় আবহাওয়ার সৃষ্টি করে। তারপর অনঙ্গ ডাক্তারের সহিত তাহার প্রায় প্রকাশ‍্য প্রেমাভিনয়, তাহার শাশুড়ির এই বীভৎস আচরণে প্রশ্রয়-দান ও স্বামীর নির্বিকার ঔদাসীন‍্য--সকলে মিলিয়া আমাদের বিতৃষ্ণাকে বিজাতীয়ভাবে তীব্র করিয়া তোলে। কিন্তু পর মুহূর্তেই দৃশ‍্যপটের অভাভনীয় পরিবর্তন। কিরণময়ী অত‍্যল্পকালের মধ‍্যেই উপেন্দ্রের মহত্ত্ব উপলব্ধি করিয়াছে, স্বীয় নীচ সন্দেহের জন‍্য অনুতপ্ত হইয়াছে ও নব-জাগ্রত নিষ্ঠার সহিত স্বামি-সেবা করিতে আরম্ভ করিয়াছে। বিশেষত্ব, সতীশের সহিত তাহার সম্বন্ধটি নিতান্ত