Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা- ১৩৯, ১৪০ ও ১৪১

2020-09-13
সহজ মাধুর্যে ভরিয়া উঠিয়াছে, ও সতীশের মুখে উপেন্দ্রের অতুলনীয় পত্নী-প্রেমের কাহিনী শুনিয়াই তাহার নিজের পুনর্জন্ম হইয়াছে। এই নবীন প্রেমানুভূতির ফল অনঙ্গ ডাক্তারকে প্রত‍্যাখ‍্যান ও ঐকান্তিক, অক্লান্ত স্বামি-সেবা তারপর দিবাকরের সহিত শাস্ত্রলোচনার সময়ে তাহার চরিত্রের আর একটা অপ্রত‍্যাশিত দিক উদঘাটিত হইয়াছে--তাহার বিচারশক্তির আশ্চর্য স্বাধীনতা, তীক্ষ্ণ বিশ্লৃষণ-নৈপুণ‍্য ও শাস্ত্রানুশাসনের যুক্তিহীন জোরজবরদস্তির বিরুদ্ধে ক্রুদ্ধ প্রতিবাদ তাহার চরিত্রভিত্তির উপর বিস্ময়কর আলোকপাত করে। এই অসামান‍্য শক্তির পরিচয় দিবার পরেই আবার একটা সাধারণ রমণীসুলভ ভাবোচ্ছ্বাস আসিয়া এই আশ্চর্য নারীর চরিত্র-জটিলতার সাক্ষ‍্য দান করে। সুরবালার নিঃসংশয় বিশ্বাসপ্রবণতার ইতিহাসে তাহার মনে ঈর্ষার এক অদম‍্য উচ্ছ্বাস ঠেলিয়া উঠিয়াছে, ও এই অতিপ্রশংসিতা রমণীকে যাচাই করিয়া লইবার প্রবল ইচ্ছা তাহাকে সুরবালার সহিত পরিচিত হইবার দিকে অনিবার্যবেগে আকর্ষণ করিয়াছে। এখানেও সুরবালার যুক্তিহীন বিশ্বাসের নিকট কিরণময়ীর সমস্ত তর্কশক্তি পরাজিত হইয়া নীরব হইয়াছে। সুরবালার নিকট পরাভব স্বীকার করিয়া প্রত‍্যাবর্তনের পর উপেন্দ্রের সহিত তাহার যে বোঝাপড়া হইয়াছে, তাহার অসংকোচ, অনাবৃত প্রকাশ‍্যতার দুঃসাহস আমদিগকে স্তম্ভিত দেয়। নারীর মুখে এরূপ স্বচ্ছ-সরল স্বীকারোক্তি, এরূপ অনবগুণ্ঠিত আত্মপরিচয়, এরূপ নির্ভীক, অকুণ্ঠিত প্রেম-নিবেদন বঙ্গসাহিত‍্যের উপন‍্যাস-ক্ষেত্রে অশ্রুতপুর্ব। নারীর প্রেম-রহস‍্য-উদঘাটনের একটি নিখুঁত অনবদ‍্য চিত্র-হিসাবে এই দৃশ‍্যটি চিরস্মরণীয় হইয়া থাকিবে। সুরবালার প্রতি অসংবরণীয় ঈর্ষার বাষ্পই যেন তাহার সম্ভ্রম-সংকোচের সমস্ত ব‍্যবধান উড়াইয়া দিয়া তাহার অন্তরের উষ্ণ গৈরিকস্রাবকে বাহিরের দিকে উৎক্ষিপ্ত করিয়া দিয়াছে। উপেন্দ্র তাহার স্ফটিক-স্বচ্ছ পবিত্রতা-সত্ত্বেও এই মহিমময় প্রেম-নিবেদনের অর্ঘ‍্য মাথায় উঠাইয়া লইয়াছে, ও তাহাদের অস্বীকৃত সম্বন্ধের প্রতিভূস্বরূপ দিবাকরকে কিরণময়ীর স্নেহ-হস্তে ন‍্যস্ত করিয়া আপাতত তাহার নিকট বিদায় গ্রহণ করিয়াছে।
     তারপর দিবাকরের সস্নেহ অভিভাবকত্বের ভার লইয়া কিরণময়ীর জীবনের প্রচেষ্টাকে সরস বিদ্রূপবাণে বিদ্ধ করিয়া তাহার তাহার দিনগুলি কাটিতেছিল। দিবাকরের সহিত সাহিত‍্য-আলোচনার প্রসঙ্গে লেখক কিরণময়ীর মুখে রোমান্টিক উপন‍্যাসে বর্ণিত প্রণয়চিত্রের উপর নিজেরই মতামত লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। এই প্রণয়ের মূলে কোনো প্রত‍্যক্ষ অভিজ্ঞতা বা নিবিড় উপলব্ধি নাই, কেবল অন্তঃসারশূন‍্য কথার কারুকার্য --বৃশ্চিক ও বজ্রমাত্র সম্বল করিয়া এই ব‍্যবসায়ে নামার কোনো বাধা নাই। মন্তব‍্যগুলি অধিকাংশ স্থলেই সত‍্য এবং কঠোর সত‍্য--যদিও রোমান্টিক ঔপন‍্যাসিকের পক্ষে বলা যায় যে, প্রেমকাহিনী তাঁহাদের মুখ‍্য বর্ণনীয় বস্তু নহে, বীরত্বপূর্ণ দুঃসাহসিক আখ‍্যায়িকাগুলিকে গ্রথিত করিবার ঐক‍্যসূত্র হিসাবেই ইহার ব‍্যবহার বেশি। দিবাকরের সহিত কিরণময়ীর কথোপকথনে লেখকের যে উচ্চ মননশক্তির পরিচয় পাওয়া যায়, তাহা সত‍্যই অতুলনীয় ---প্রেমের প্রকৃতি ও দুর্বার শক্তি, চিত্তজয়ের দুরূহতা ও পদস্খলনের বিচার-বিষয়ে যে সূক্ষ্মচিন্তাপূর্ণ গভীর আলোচনা কিরণময়ীর মুখে দেওয়া হইয়াছে, তাহা শুধু বঙ্গসাহিত‍্যে নয়, সর্ব-সাহিত‍্যের শ্রেষ্ঠ চিন্তার সহিত সমকক্ষতার স্পর্ধা করিতে পারে।
     কিরণময়ীর চরিত্র-আলোচনায় প্রত‍্যাবর্তন করিয়া আমরা দেখি যে, প্রেমতত্ত্বের এই সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের সঙ্গে সঙ্গে দিবাকরের সহিত তাহার এমন একটা লঘু-তরল হাস‍্য-পরিহাসের পালা চলিতেছে, যাহার মধ‍্যে গোপন আসক্তির বীজ নিহিত থাকার খুবই সম্ভাবনা। এই রসালাপের মধ‍্যে কিরণময়ীর নিজের চিত্তবিকার থাকুক বা নাই থাকুক দিবাকরের মনে যথেষ্ট দাহ‍্য পদার্থ সঞ্চিত হইয়া উঠিতেছিল। ইতিমধ‍্যে একদিন উপেন হঠাৎ আসিয়া পড়িয়া দিবাকর ও কিরণময়ীর সম্পর্কের অনুচিত ঘনিষ্ঠতা লক্ষ‍্য করিয়া ফেলিল এবং কিরণময়ীকে কঠোর তিরস্কার করিয়া দিবাকরকে সেখানে হইতে স্থানান্তরিত করিবার কড়া হুকুম জারি করিয়া গেল। এই অন‍্যায় ও অসহনীয় আঘাতে কিরণময়ীর ভিতরের পিপাচী তাহার সমস্ত শিক্ষা-দীক্ষা, তাহার তীক্ষ্ণ ও মার্জিত বুদ্ধিকে ঠেলিয়া দিয়া মাথা তুলিয়া উঠিল, এবং সেই ক্রোধোন্মত্তা রমণী উপেনের উপর প্রতিহিংসা লইবার জন‍্য তাহার পরম স্নেহের পাত্র দিবাকরকে কুক্ষিগত করিয়া আরাকান-যাত্রার জন‍্য পা বাড়াইল।
     সমুদ্রযাত্রার মধ‍্যে দিবাকর ও কিরণময়ীর সম্পর্কটা অনেক ক্ষণস্থায়ী, সূক্ষ্ম পরিবর্তনের মধ‍্যে পাক খাইয়া আবার প্রায় পূর্ব স্থানটিতেই স্থির হইল। এই সূক্ষ্ম পরিবর্তনের তরঙ্গগুলি শরৎচন্দ্র আশ্চর্য অন্তর্দৃষ্টির সহিত লক্ষ‍্য ও প্রকাশ করিয়াছেন। উপেন্দ্রের অননুমেয় প্রবল প্রভাবই এই দুইটি হৃদয়ের বেগবান বীচিবিক্ষেপগুলি নিয়ন্ত্রিত করিয়াছে। কিরণময়ী উপেন্দ্রের মাথা হেঁট করিবার উদ্দেশ‍্যেই দিবাকরের অধ্ঃপতনের জন‍্য সমস্ত মায়াজাল বিস্তার করিয়াছে; উপেন্দ্রের স্মৃতিতে মুহ‍্যমান দিবাকর তাহার বেদনাতুর চিত্তের বিহ্বলতার জন‍্যই অজ্ঞাতসার এই মায়াবন্ধন উপেক্ষা করিয়াছে। তারপর উপেন্দ্রের আলোচনায় উভয়েরই চিত্তমালিন‍্য কাটিয়া গিয়া মন আবার কতকটা প্রসন্ন-নির্মল হইয়া উঠিয়াছে। কিরণণয়ী দিবাকরের সহিত তাহার ভবিষ‍্যৎ সম্পর্ক স্থির করিয়া লইয়া তাহার মায়াজাল সংবরণ করিয়াছে ও পুনরায়, স্নেহশীলা জ‍্যেষ্ঠা ভগিনীর আসন অধিকার করিয়াছে। দিবাকর ভবিষ‍্যৎ-সম্বন্ধে ততটা নিঃসংশয় না হইয়াও কিরণময়ীর এই পরিবর্তনে একটা মুক্তির নিশ্বাস ফেলিয়াছে--কিন্তু রূপমোহ তাহার মনের একটা কোণে বাসা লইয়া ভবিষ‍্যতের জন‍্য উষ্ণ, উগ্র কামনার নিশ্বাস-সঞ্চয় শুরু করিয়াছে। জাহাজের মধ‍্যে সমাজ ও ব‍্যক্তির অধিকার লইয়া উভয়ের মধ‍্যে যে আলোচনা হইয়াছে, তাহাও লেখকের গভীর চিন্তাশীলতার পরিচয় দেয়।
     সর্বশেষে আরাকানে খামিনী বাড়িউলির বাড়িতে কুৎসিত আবেষ্টনের মধ‍্যে দিবাকর-কিরণময়ীর সম্পর্ক উহার সমস্ত মাধুর্য হারাইয়া চরম অধঃপতনের মধ‍্যে ধূলিশায়ী হইয়াছে। কিরণময়ীর এখনও কতকটা সংযম ও শালীনতা অবশিষ্ট আছে; বিশেষত, দিবাকরের প্রতি তাহার প্রেম না থাকায় সে সেদিকে আপনাকে সম্পূর্ণ স্থির ও অবিচলিত রাখিয়াছিল। কিন্তু দিবাকর প্রচণ্ড লালসার

সহিত যুদ্ধে ক্ষত-বিক্ষত হইয়া ইতরতা ও নির্লজ্জতার শেষ সীমায় আসিয়া পৌঁছিয়াছে। এই অধঃপতনের কদর্ঘ শ্রীহীন চিত্রটি নির্মম বাস্তবতার সহিত চিত্রিত হইয়াছে--ইহা শরৎচন্দ্রের বাস্তবাঙ্কন-ক্ষমতার সর্বোৎকৃষ্ট নিদর্শন।
     এই চরম দুর্দশার মাঝে পূর্বজীবনের গৌরবময় স্মৃতি ও মুক্তির আশ্বাস লইয়া আসিয়া পড়িল সতীশ। সতীশের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে কিরণময়ীর মুখ হইতে জীর্ণ ও কদর্য মুখোশ খসিয়া পড়িল, আত্মসম্ভ্রম ও গৌরবের আলোক আবার তাহাকে বেষ্টন করিল। উপেন্দ্রের মৃতপ্রায় অবস্থার কথা শুনিয়া তাহার মূর্ছাই তাহার মনোভাবের প্রকৃত সংবাদ সকলের গোচর করিয়া দিল। সে ও দিবাকর সতীশের ক্ষমাশীল অভিভাবকত্বে কলিকাতায় প্রত‍্যাবর্তনের জন‍্য জাহাজে চড়িয়া বসিল।
     এইখানেই কিরণময়ীর বিচিত্র ও বুদ্ধিপ্রদীপ্ত চরিত্রটি একটা মূঢ় বিহ্বলতা ও মনোবিকারের মধ‍্যে আপনাকে নিঃশেষে তলাইয়া দিল। যে তীক্ষ্ণ মননশক্তি অসংকোচে বেদ-উপনিষদের সমালোচনা করিয়াছিল, প্রেম ও সমাজতত্ত্ব-সম্বন্ধে অদ্ভুত মৌলিকতাপূর্ণ বিশ্লেষণে প্রোজ্জ্বল হইয়া উঠিয়াছিল, তাহা প্রেমাস্পদের আসন্ন মৃত‍্যুর দুঃসহ আঘাতে একেবারে অসংলগ্ন পাগলামির দুই-একটা সূত্রহীন, ভাঙা-চোরা উক্তিতে পর্যবসিত হইল। ধর্মবোধহীন, হৃদয়-সম্পর্করহিত বুদ্ধির কী অভাবনীয় পরিণতি।
     কিরণময়ীর চরিত্রটি আগাগোড়া পর্যালোচনা করিলে উহার স্বাভাবিকতা ও সংগতি-সম্বন্ধে সন্দেহ জাগিয়া উঠে। উহার ব‍্যবহারের সর্বাপেক্ষা বিপরীতমুখী বিন্দুগুলির একই জীবনে সামঞ্জস‍্য করা যায় কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া দুরূহ। তাহার ক্রুদ্ধ ও ইতর সংশয় ও গভীর সহানুভূতিপূর্ণ স্বচ্ছ অন্তর্দৃষ্টি, তাহার অনঙ্গ ডাক্তারের সহিত প্রেমাভিনয় ও অক্লান্ত স্বামি-সেবা, উপেন্দ্রের প্রতি গভীর একনিষ্ঠ প্রেম ও দিবাকরের সহিত পলায়ন, তাহার বেদ-বেদান্তের আলোচনা ও অসংলগ্ন প্রলাপ--এ সমস্তের মধ‍্যে বিচ্ছেদ ও অসংগতি এতই গভীর যে, একই জীবনবৃন্তে এতগুলি বিচিত্র বিকাশের সম্ভাবনীয়তা-সম্বন্ধে আমাদের বিশ্বাস পীড়িত হইতে থাকে। এই অবিশ্বাস সত্ত্বেও স্বীকার করিতে হইবে যে, এই সমস্ত পরস্পর-বিরোধী বিকাশগুলির মধ‍্যে গ্রন্থিবন্ধন যতটা দূর হওয়া সম্ভব, তাহা হইয়াছে। এই সমস্ত সূক্ষ্ম ও পুনঃপুনঃ পরিবর্তনের যতটা সংগত ও সন্তোষজনক কারণ দেওয়া যায়, তাহার অভাব হয় নাই। কিরণময়ীর জীবনের মোখবন্ধটা--তাহার প্রথম যৌবনের প্রেমহীন নীরস স্বামিসাহচর্য ও ধর্মসংস্কারের একান্ত অভাব--ধরিয়া লইলে পরবর্তী পরিণতিগুলি অচ্ছেদ‍্য কারণ-সূত্রে গ্রথিত হইয়া নিতান্ত অনিবার্যভাবেই আসিয়া পড়ে। এক একবার মনে হয়, যাহার বিচারবুদ্ধি এত গভীর ও অন্তর্দৃষ্টির আলোকে উজ্জ্বল তাহার ব‍্যবহারিক জীবনে এরূপ কদর্য অভিব‍্যক্তি সম্ভব কি না, --স্বচ্ছ ও উদার বুদ্ধি উদগ্র কামনার ধূমে এমন সম্পূর্ণভাবে আচ্ছন্ন হইতে পারে কি না। কিন্তু বুদ্ধি ও প্রবৃত্তির মধ‍্যে যে গভীর অনৈক‍্য --তাহাই মানব-জীবনের একটা অমীমাংসিত রহস‍্য; এবং এই জ্ঞানের আলোকে আমরা কিরণময়ী-চরিত্রের অসংগতিগুলিকে অসম্ভব বলিয়া উড়াইয়া দিতে পারি না। কেবল সর্বশেষে তাহার মস্তিষ্ক-বিকারের চিত্রটি অতি আকস্মিক হইয়াছে--উপেন্দ্রের আসন্ন মৃত‍্যুর সংবাদে যে মূর্ছা তাহার প্রেমের গোপন কথাটি সুবিদিত করিয়া দিল, তাহার ঘোর যে তাহার বুদ্ধিকে চিরকালের জন‍্য আচ্ছন্ন ও অভিভূত করিবে তাহার প্রেমের গোপন কথাটি সুবিদিত করিয়া দিল, তাহার ঘোর যে তাহার বুদ্ধিকে চিরকালের জন‍্য আচ্ছন্ন ও অভিভূত করিবে তাহার ইঙ্গিত সেরূপ সুস্পষ্ট হয় নাই। মোটের উপর কিরণময়ী-চরিত্রের অসাধারণ জটিলতা ও দিগন্তব‍্যাপী প্রসার উপন‍্যাস-সাহিত‍্যে অতুলনীয় এবং ইহার আলোচনা আমাদের মনকে শ্রদ্ধামিশ্রিত বিস্ময়ে অভিভূত করিয়া ফেলে।
     এই সমস্ত ঘাত-প্রতিঘাত-জটিল প্রতিরুদ্ধ কামনার গোপন-ক্লেদ-পিচ্ছিল, উত্তাপক্লিষ্ট দৃশ‍্য হইতে সতীশ-সরোজিনীর প্রেম-কাহিনীর মুক্ত ও শীতল বাতাসে পলায়ন করিয়া আমরা যেন হাঁপ চাড়িয়া বাঁচি। সাবিত্রীতে প্রেমের যে দীন, চীরপরিহিত ভিক্ষুকমূর্তি ও কিরণময়ীতে তাহার যে ভ্রূকুটি-কুটিল, নরকাগ্নিবেষ্টিত, ঈর্ষাবিকৃত ছদ্মবেশে আমাদিগকে ভিতরে ভিতরে পীড়িত করিতেছিল, সরোজিনী-চরিত্রে এই সমস্ত দুঃস্বপ্নের ঘোর কাটিয়া গিয়া সেই প্রেমের চিরপরিচিত, প্রসন্ন-নির্মল রাজবেশ আমাদের চক্ষুর উপর উদ্ভাসিত হইয়া উঠিয়াছে। এখানে তাহার কোনো বিকৃতি নাই, কোনো বহ্নিজ্বালাময় অস্বাভাবিক উত্তাপ নাই, অবিরাম সংঘর্ষের ও কণ্ঠরোধের উষ্ণ দীর্ঘশ্বাস নাই। সতীশ-সরোজিনীর প্রেম অনেকটা স্বাভাবিক পথে, মৃদুমন্দ গতিতে প্রবাহিত হইয়াছে; তাহার প্রবাহ-মধ‍্যে দুই-একটি যে বাধা দেখা গিয়াছে, তাহারা যাত্রাপথে একটু করুণ উচ্ছ্বাস তুলিয়াছে মাত্র, আর কোনো ভয়াবহ পরিণতির সৃষ্টি করে নাই। এই সরল ও স্বাভাবিক ভালোবাসার অবতারণা শরৎচন্দ্রের প্রেম-কল্পনার বৈচিত্র‍্য ও প্রসারের নিদর্শন।
     সুরবালা ও কিরণময়ী প্রেম-জগতের উত্তর ও দক্ষিণ মেরু। আমাদের সনাতন পাতিব্রত‍্য, তাহার সমস্ত অখণ্ড বিশ্বাস ও অবিচলিত ধর্মসংস্কার লইয়া, যুগ-যুগব‍্যাপী সাধনা ও অনুশীলনের ফল লইয়া, সুরবালাতে মূর্তিমান হইয়াছে। গ্রন্থ-মধ‍্যে তাহার আবির্ভাব স্বল্পসংখ‍্যক স্থলে; কিন্তু তাহার প্রভাব একদিকে উপেন্দ্রের ও অপরদিকে কিরণময়ীর উপর স্থায়িভাবে বিস্তৃত হইয়াছে। সে উপেন্দ্রের হৃদয় এমন অবিসংবাদিতভাবে অধিকার করিয়াছে যে, কিরণময়ীর জন‍্য সেখানে সূচ‍্যগ্রপরিমিত স্থানও নাই--কোনো ছলে, দয়া-সমবেদনার ছদ্মবেশেও পরস্ত্রী-প্রেম সেখানে উঁকিঝুঁকি মারিতে সাহস করে নাই। আবার সে-ই কিরণময়ীকে ভালোবাসা শিক্ষা দিয়াছে--কিরণময়ীর হৃদয়ের যে দ্বারটা চিররুদ্ধ ছিল, তাহা তাহারই ইন্দ্রজালস্পর্শে মুক্ত হইয়াছে। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, এই দুইটি সম্পূর্ণ ভিন্নপ্রকৃতির রমণী দুই উপগ্রহের মতো এক উপেন্দ্রেরই কক্ষপথে আবর্তিত হইয়াছে। সুরবালা-চরিত্রের অধিক বিশ্লেষণ নাই; কিন্তু সে ও তাহার মনোরাজ‍্য আমাদের এত পরিচিত যে, তাহাকে চিনাইতে পরিচয়-পত্র অনাবশ‍্যক। 'চরিত্রহীন'- এ সুরবালা ও 'গৃহদাহ'- এ মৃণাল প্রভৃতি প্রমাণ করে যে, শরৎচন্দ্রের দৃষ্টি বা সহানুভূতি কেবল নিষিদ্ধ প্রেমের মধ‍্যে সীমাবদ্ধ নহে--পুরাতনের রসও তিনি নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করিয়াছেন।
     গ্রন্থ-মধ‍্যে পুরুষ-চরিত্রগুলি বিশেষ উল্লেখযোগ‍্য। উপেন্দ্র, সতীশ, দিবাকর সকলেই খুব সূক্ষ্ম ও জীবন্তভাবে চিত্রিত হইয়াছে। প্রত‍্যেকেরই কথাবার্তা, চিত্ত-বিশ্লেষণ ও প্রকৃতির তারতম‍্য নিপুণভাবে স্বতন্ত্র করা হইয়াছে। বিশেষত, গ্রন্থের নায়ক সতীশের চরিত্র

চমৎকার ফুটিয়াছে। তাহার সমস্ত ত্রুটি-দুর্বলতা সত্ত্বও তাহার মধ‍্যে যে উদারতা ও মহত্ত্ব, যে স্নেহশীল, ক্ষমাপরায়ণ হৃদয় আছে তাহার মাধুর্য আমাদিগকে অনিবার্যভাবে আকর্ষণ করে। সাবিত্রীর প্রতি তাহার দুর্জয় আকর্ষণ ও সরোজিনীর প্রতি ধীর, লজ্জা-কুণ্ঠিত ভালোবাসা---এই উভয়ের মধ‍্যে পার্থক‍্য সুন্দরভাবে চিত্রিত হইয়াছে। 'চরিত্রহীন' বঙ্গ-উপন‍্যাস-সাহিত‍্যের একটি শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ--ইহার পাতায় পাতায় জীবন-সমস‍্যার যে আলোচনা, যে গভীর অভিজ্ঞতা, যে স্নিগ্ধ, উদার সহানুভূতি ছড়ানো রহিয়াছে, তাহা আমাদের নৈতিক ও সামাজিক বিচারবুদ্ধির একটা চিরন্তন পরিবর্তন সাধন করে।
     'গৃহদাহ' উপন‍্যাসটির নামকরণ বোধ হয় রবীন্দ্রনাথের 'নষ্টনীড়'- এর ন‍্যায় মহিমের পারিবারিক সুখ-শান্তি-ধ্বংসেরই প্রতি ইঙ্গিত করে। নতুবা বাহ‍্য ঘটনা-হিসাবে ইহাকে উপন‍্যাসের কেন্দ্রস্থ সংঘটন মনে করা যায় না। এই গৃহদাহের জন‍্য সুরেশের দায়িত্ব সত‍্যসত‍্যই আছে কি না তাহা লেখক স্পষ্টত নির্দেশ করেন নাই। একবার মাত্র অচলা সুরেশকে এই অপরাধের জন‍্য অভিযুক্ত করিয়াছে বটে, কিন্তু তখন সে সর্বনাশের সন্ধিক্ষণে দাঁড়াইয়া, সুতরাং ইহাই যে তাহার আন্তরিক বিশ্বাস তাহা ঠিক বলা যায় না। সুরেশকে এই ব‍্যাপারে দোষী মনে করিতে গেলে তাহার চরিত্রে একটা অপরিসীম নীচতার আরোপ করা হয়। বোধ হয় লেখকের সেরূপ উদ্দেশ‍্য ছিল না--সুরেশকে একটা হীনবর্ণে চিত্রিত করিতে গেলে তাহার সমস্ত অধঃপতনের মধ‍্যেও তাহার যে একটা চরিত্রগত উদারতা ও মহত্ত্ব অবশিষ্ট থাকে তাহার হানি করা হয়। গৃহদাহটা যে মহিমের গ্রামবাসীদের তীব্র সমাজ-সংরক্ষণ-প্রীতি ও ধর্মজ্ঞানের ফল, সেরূপ ইঙ্গিতও গ্রন্থ-মধ‍্যে দুর্লভ নহে--সুতরাং যে কেন্দ্রস্থ ব‍্যাপারটির জন‍্য উপন‍্যাসের নামকরণ সম্বন্ধে পাঠকের সংশয় দূর হয় না।
     সে যাহাই হউক, মনস্তত্ত্ব-বিশ্লেষণের দিক দিয়া গ্রন্থ-মধ‍্যে সর্বাপেক্ষা আলোচ‍্য বিষয় মহিম ও সুরেশের প্রতি অচলার দোলাচল চিত্তবৃত্তি। দিগদর্শন-যন্ত্রের কাঁটার মতো স্ত্রীর মন সর্বদা অবিচলিত নিষ্ঠার সহিত স্বামীর দিকেই ফিরিয়া থাকে, ইহা আমরা পুরাণ-কাহীনী বা রোমান্সে পাইয়া থাকি। কিন্তু বাস্তব-জীবনে যে এই নিষ্ঠার এতটুকু নড়-চড় হয় না, চিত্ত মুহূর্তের জন‍্যও সন্দেহ-দোলায় দোলায়িত হয় না, ইহা জোর করিয়া বলা যায় না। দুই প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বীর আকর্ষণে অচলার মনে এইরূপ একটা দ্বিধা অনিশ্চয়ের ভাব যে জাগিয়াছে তাহা নিশ্চিত। এক দিকে মহিমের শান্ত, একান্ত ভাবাবেগহীন, প্রস্তর-কঠিন আবেদন--অপরদিকে সুরেশের ব‍্যগ্র ব‍্যাকুল, উন্মত্ত আবেগ--এই দুই বিরুদ্ধ শক্তির মাঝে অচলার হৃদয় দ্বিধা-বিভক্ত হইয়াছে। পিতার সুরেশের প্রতি প্রকাশ‍্য পক্ষপাত ও মহিমের প্রতি সুস্পষ্ট অবজ্ঞা বোধ হয় তাহার দৃঢ়সংকল্পকে কতকটা নাড়া দিয়াছিল, কিন্তু এই অপমানকর দোটানার হাত হইতে সে পরিত্রাণ পাইল নিজের প্রবল ইচ্ছাশক্তির দ্বারাই। সে সুরেশের প্রেম-নিবেদনকে জোর করিয়া ঝাড়িয়া ফেলিয়া মহিমের হাতেই নিজেকে সমর্পণ করিয়া দিল--তাহার প্রেম প্রলোভনকে জয় করিল। কিন্তু বিবাহের পর হইতেই তাহার প্রেমের প্রকৃত পরীক্ষা আরম্ভ হইল। পল্লীগ্রামের নির্বাসন-দুঃখ, পল্লীসমাজের নিরানন্দ প্রতিবেশ, মৃণাল ও তাহার স্বামীর সম্বন্ধে তাহার কদর্য সন্দেহ, সর্বোপরি মহিমের নিঃস্নেহ, কঠোর কর্তব‍্যপরায়ণতামূলক ব‍্যবহার তাহার মনে প্রবল প্রতিক্রিয়া জাগাইয়া তুলিল এবং সে মহিমকে ভালোবাসে না, এইরূপ একটা ক্ষণস্থায়ী প্রতীতি তাহাকে অধিকার করিল। মহিমের পল্লীভবনে সুরেশের অনাহূত আগমনে স্বামী-স্ত্রীর এই বিরোধ সাংঘাতিক তীব্রতা লাভ করিল--তাহার অবস্থানের কয়েকদিন ধরিয়া তাহাদের অহোরাত্র ঘাত-প্রতিঘাতে সুরেশের ধারণা জন্মিল যে, অচলা বাস্তবিকই মহিমের প্রতি অনুরক্ত নহে। এই প্রতীতিই তাহার মনকে চরম বিশ্বাসঘাতকতার জন‍্য প্রস্তুত করিল--ইহারাই বলে সে রুগ্ন, অসহায় মহিমের নিকট হইতে অচলাকে ছিনাইয়া লইবার দঃসাহস সঞ্চয় করিল। কিন্তু ইহার পূর্বে মহিমের সাংঘাতিক পীড়ার সময় সে আর একবার কঠোর চিত্তদমনের পরিচয় দিয়াছিল--শেষ মুহূর্তে অচলার একটা সস্নেহ উদ্বেগ-প্রকাশ ও প্রবাসে তাহার সঙ্গী হইবার নিমন্ত্রণ তাহার সুপ্ত প্রবৃত্তিকে আবার দুর্জয় বেগে উত্তেজিত করিয়া তুলিল। এ কাজ করিয়াই সুরেশ তাহার ভুল বুঝিতে পারিল। অচলাকে সে হাতের মুঠোর মধ‍্যে পাইয়াছে, কিন্তু তাহার মন তাহার অধিকারসীমার শত যোজন বাহিরে। ভিহরী প্রবাসের দিন কয়েকটির উপর সমস্ত ভোগ-বিলাসের আয়োজন, সতৃষ্ণ প্রেমের সমস্ত উন্মুখতার উপর একটা গুরুভার অবসাদ, একটা সর্বরিক্ত বৈরাগ‍্যের বর্ণলেশহীন ধূসরতা চাপিয়া বসিয়াছে। মাঝে মাঝে এই জমাট তুষারের মতো কঠিন, পক্ষাঘাতগ্রস্ত জীবনের মধ‍্য দিয়া দুই-একটি অসতর্ক স্নেহের উচ্ছ্বাস, দুই-একটা অদম‍্য, অশ্রুজল-প্রতিরুদ্ধ নির্ভরের বাণী এই গভীর নিঃসঙ্গতাকে, এই সুদূর নির্লিপ্ততাকে আরও অসহনীয় করিয়া তুলিয়াছে। প্রেমের এই মূর্ছাহত, জীবন্মৃতের ন‍্যায় অবস্থার সহিত তুলনায় সুরেশের মৃত‍্যুও বোধ হয় তত ভয়াবহ নহে --এই চিত্রটিই সমস্ত উপন‍্যাসের মধ‍্যে কলাকৌশলের দিক দিয়া উচ্চতম স্থান অধিকার করে।
     উপন‍্যাসের অন্তর্নিহিত প্রশ্নটি যথাসম্ভব সুস্পষ্টভাবে জিজ্ঞাসা করা হইয়াছে ও তাহার উত্তরটিও খুব পরিষ্কার ও উচ্চাঙ্গের মননশক্তির পরিচায়ক। এই অবস্থা-সংকটে পতিত ও দৈহিক পবিত্রতাবিচ‍্যুত অচলা সতী কি না? তাহার সম্বন্ধে পাঠকের অভিমত কী রামবাবুর সহিত অভিন্ন? কুলটা বলিলেই কী তাহার সমস্ত পরিচয় নিঃশেষ হইয়া যায়? তাহার সতীত্ব-নির্ণয় সম্বন্ধে অন্তরের অনির্বাণ জ্বালা ও শান্তিহীন বিক্ষোভ দৈহিক বিচ‍্যুতি অপেক্ষা কী অধিকতর মূল‍্যবান সাক্ষ‍্য নহে? সুরেশের যে প্রবল আকর্ষণে সে কক্ষচ‍্যুত গ্রহের ন‍্যায় নিজ সহজ স্থান হইতে ভ্রষ্ট হইয়াছে তাহা একেবারে বহিঃশক্তির অভিভব নহে --সেই বিপুল শক্তির প্রচণ্ড গতিবেগ কতকটা তাহার নিজ গোপন অনুরাগের বৈদ‍্যুতী হইতেই সংগৃহীত হইয়াছে। কিন্তু ইহাও তাহার সতীত্বের বিরোধী নহে। আমাদের মগ্নচৈতন‍্যের কতকটা অংশ আমাদের নিজের কাছেও অস্পষ্ট থাকিয়া যায়--সেই ছায়াময়, সুপ্তিগহন রাজ‍্যে সুরেশের ও মহিমের প্রতি তাহার গোপন অনুরাগ এক শয‍্যায়ই শুইয়াছিল। কিন্তু যখনই এই প্রতিদ্বন্দ্বী ভালোবাসার মধ‍্যে স্বেচ্ছাকৃত নির্বাচনের প্রয়োজন হইয়াছে, তখনই তাহার সজ্ঞান ইচ্ছাশক্তির বিচারে মহিমই জয়ী হইয়াছে। সতীত্বের লৌকিক আদর্শ ইহা অপেক্ষা বেশি আর কী দাবি করিতে পারে? অবশ‍্য মৃণালের আদর্শ ইহা অপেক্ষা উচ্চতর--তাহার পাতিব্রত‍্য যুক্তি-তর্কের অতীত একটা আধ‍্যাত্মিক সহজ-সংস্কারে পরিণত