Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা- ১৪২, ১৪৩ ও ১৪৪

2020-09-20
হইয়াছে। কিন্তু উপন‍্যাসে আমরা মৃণালের যে চিত্র পাই তাহা তাহার বিবাহিত জীবন সম্বন্ধে নহে। তাহার শান্ত, আত্মসমাহিত, নিস্তরঙ্গ জীবন প্রেমের নহে, সেবাধর্মের প্রতীক। বাস্তবিক আমাদের সমাজ ও সাহিত‍্যে যে প্রেমের আদর্শ গৃহীত ও প্রশংসিত হইয়াছে তাহা একটা জীবনব‍্যাপী, নিঃস্বার্থ সেবাপরায়ণতারই নামান্তর মাত্র। আকাশের বিদ‍্যুতের ন‍্যায় হৃদয়-বাহিত বিদ‍্যুৎ ও তুলসী-পাঙ্গণের স্নিগ্ধ দীপালোকে রূপান্তরিত হইয়াছে। ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের মতো মৃণালকেও আমরা চিকিৎসালয়েই দেখি, প্রমোদকুঞ্জে প্রণয়িনীরূপে কল্পনা করিতে পারি না। উপন‍্যাসে ঘোষাল মহাশয়ের সহিত মৃণালের জীবনের ছবির একটা সামান‍্য ইঙ্গিত মাত্র পাই, কিন্তু পূর্ণতর বিবরণ থাকিলে হয়তো দোখতে পাইতাম যে, উহা কেদারবাবুর সম্পর্কের সহিত মূলত অভিন্ন--চা এবং গরম মুড়ির সহিত একটা স্নেহশীতল প্রলেপের পরিবেশনই উহার শ্রেষ্ঠতম অঙ্গ হইত। লেখক ম‍ৃণালের আদর্শের শ্রেষ্ঠত্ব একদিক দিয়া অবিসংবাদিতভাবে প্রমাণ করিয়াছেন--যে লৌকিক সম্ভ্রমের দুর্বল মোহ অচলাকে এক রাত্রির জন‍্য সুরেশের শয‍্যা-সঙ্গিনী করিয়াছিল তাহা মৃণালের সতীত্বকে এক মুহূর্তের জন‍্যও অভিভূত করিতে পারিত না; সে কখনোই সম্ভ্রমের খোলসের জন‍্য তাহার শাঁসকে বিসর্জন দিত না। কিন্তু মোটের উপর মৃণালের আদর্শ যুক্তি-তর্কের সাহায‍্যে খাড়া করা হইয়াছে, তাহা অচলার মতো প্রত‍্যক্ষ বর্ণনা ও বিশ্লেষণের বিষয় হয় নাই, সুতরাং উভয়ের মধ‍্যে তুলনা চলে না।
     উপন‍্যাসের সমস্ত চরিত্রই চমৎকার ফুটিয়াছে। সুরেশের উত্তেজনাপ্রবণ, সহজেই উচ্ছ্বসিত প্রকৃতি ব‍্যবহারের এক চরম সীমা হইতে অপর চরম সীমা পর্যন্ত প্রসারিত হইয়াছে। তাহার ব‍্যবহারের একদিকে যেমন উচ্ছ্বসিত ভালোবাসা ও উদার আত্মোৎসর্গ-প্রবৃত্তি, তেমনি কোনো বাধায় প্রতিহত হইলেই তাহা একটা হিংস্র তীব্রতা ও অসংযত ইতরতার নিম্নতম সোপান নামিয়া যায়। কেদারবাবুর চরিত্রেও এইরূপ একটা বিপরীত ভাবের সমন্বয় দেখা যায়। একদিকে প্রবল অর্থলোভ ও অর্থের লোভে বিবাহের সম্বন্ধ ভাঙিতে তাহার কোনো দ্বিধা নাই --অপরদিকে অচলার বিবাহের পর অচলা ও সুরেশের পরস্পর সম্পর্কের প্রতি তাহার সন্দেহের অন্ত নাই, এবং সুরেশের ঋণ-মুক্তির প্রস্তাবে তাহার অন্তঃসঞ্চিত ক্রোধ একেবারে দপ করিয়া জ্বলিয়া উঠিয়াছে। গ্রন্থের শেষ দিকে মৃণালের স্নেহশীতল স্পর্শে তাহার অন্তরের সমস্ত রুদ্ধ জ্বালা ও অনুদার সংকীর্ণতা আশ্চর্যরূপে প্রশমিত হইয়াছে, ও যে কাল্পনিক অপরাধের জন‍্য অচলার কোনো মার্জনা ছিল না, তাহার সেই চরম দুষ্কিৃতিও সে স্নেহমণডিত ক্ষমার চক্ষে দেখিতে সমর্থ হইয়াছে। কেবল মহিমের চরিত্র-সম্পর্কেই একটু সংশয় থাকিয়া যায়। তাহার অসাধারণ সহিষ্ণুতা ও আত্মসংযমের দৃষ্টান্ত তো সমস্ত উপন‍্যাসজোড়া; কিন্তু অন্তরের সম্পদ হৃদয় জয় করিবার জন‍্য যেটুকু বহিঃপ্রকাশের অপেক্ষা রাখে তাহাও তাহার ক্ষেত্রে একান্ত দুর্লভ। সুরেশের বন্ধুত্ব ও অচলার প্রেম সে যে কী গুণে অর্জন করিল তাহার ভবিষ‍্যৎ ব‍্যবহারে আমরা তাহার কোনো ইঙ্গিত পাই না। সুরেশের উচ্ছ্বসিত বন্ধুপ্রীতি বার বার তাহার মৌন, প্রতিদানহীন হৃদয়তট হইতে প্রতিহত হইয়া ফিরিয়া আসিয়াছে। অচলার চিত্ত জয় করিতে তাহার শান্ত, নির্বাক সহিষ্ণুতা ও অবিচলিত আত্মনির্ভরতা ছাড়া অন‍্য কোমলতর গুণেরও নিশ্চয় দরকার হইয়াছিল, কিন্তু উপন‍্যাসে তাহার চরিত্রের মাধুর্যের দিকটা একেবারে অপ্রকাশিত --মহিম আমাদের নিকট কতকটা প্রহেলিকাই থাকিয়া যায়। মোটের উপর 'গৃহদাহ' শরৎচন্দ্রের সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ উপন‍্যাসগুলির মধ‍্যে অন‍্যতম--মহৎ-চিত্তে অনিচ্ছাকৃত পাপের প্রতিক্রিয়া যে কী ভয়ানক তাহা ইহাতে সুনিপুণ বিশ্লেষণের সহিত প্রদর্শিত হইয়াছে। আর লেখকের বিরুদ্ধে যে প্রধান অভিযোগ --যে তিনি পাপের চিত্র খুব চিত্তাকর্ষক করিয়া আঁকেন--তাহা এই উপন‍্যাসে কোনো মতেই প্রযোজ‍্য নহে।
(৫)

একদিক দিয়া দেখিতে গেলে 'শ্রীকান্ত' ( ১ম পর্ব--১৯১৭; ২য় পর্ব--১৯১৮; ৩য় পর্ব--১৯২৭; ৪র্থ পর্ব--১৯৩৩) শরৎচন্দ্রের সর্বশ্রেষ্ঠ উপন‍্যাস। ইহাকে ঠিক উপন‍্যাস বলা চলে কি না, তাহা একটু বিবেচনার বিষয়। উপন‍্যাসের নিবিড়, অবিচ্ছিন্ন ঐক‍্য ইহার নাই; ইহা কতকগুলি ভিন্ন ভিন্ন সময়ের বিচ্ছিন্ন পরিচ্ছেদের সমষ্টি। কিন্তু ইহার গ্রন্থন-সূত্রটা যতই শিথিল হউক না কেন, গ্রথিত পরিচ্ছেদগুলি এক-একটি মহামূল‍্য রত্ন। যাহাদের জীবন চিরদিন একটা অভ‍্যস্ত গণ্ডির মধ‍্যে কাটিয়াছে, যাহারা জীবিকার্জনের ও সংসার-প্রতিপালনের প্রচণ্ড নেশায় অনেকটা অর্ধচেতনভাবে জীবনটা অতিবাহিত করিয়াছে, তাহারা 'শ্রীকান্ত' -এর দৃশ‍্যগুলির অসাধারণ বৈচিত‍্যে ও অভিনবত্বে একেবারে অভিভূত হইয়া পড়িবে। আমাদের স্কুল-কলেজ-অফিসের লৌহ-নিগড়-বদ্ধ, রোগ-শোক-জর্জরিত, দলাদলি-বিরোধ-কন‍্যাদায়-বিড়ম্বিত বাঙালি-জীবনের প্রান্তসীমায় যে বিচিত্র রসভোগের এত প্রচুর অবসর আছে, দুঃসাহসিকতার এত ব‍্যাকুল, প্রবল আকর্ষণ আছে, সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ও সমালোচনার এরূপ বিশাল, অব‍্যবহৃত ক্ষেত্র পড়িয়া আছে, চক্ষুর ও হৃদয়ের এত অপর্যাপ্ত রসদ মজুত আছে তাহা আমাদের কল্পনাতেও আসে না। এই কল্পনাতীত বিচিত্র সৌন্দর্য 'শ্রীকান্ত' আমাদের অভিজ্ঞতা লাভ হইয়াছে তাহা শরৎচন্দ্রের অন‍্যান‍্য উপন‍্যাসে মানসিক উদারতা ও সূক্ষ্ম নীতিজ্ঞানের মূল; যে আলোক তাঁহার অন‍্যান‍্য উপন‍্যাসে ছড়াইয়া পড়িয়াছে 'শ্রীকান্ত' -এই তাহার আদি উৎস।
     শ্রীকান্তের বাল‍্য-জীবনে যে পথ দিয়া তাহার জীবনে নূতন অভিজ্ঞতা ও দুঃসাহসিকতার উন্মত্ত স্রোতোবেগ প্রবেশ-লাভ করিয়াছে তাহা ইন্দ্রনাথের সাহচর্য। বর্ণ-পরিচয়ের রাখাল হইতে আরম্ভ করিয়া অনেক দুষ্ট, লেখা-পড়ায় অমনোযোগী বালকের কাহিনী সাহিত‍্যে বা ইতিবৃত্তে লিপিবদ্ধ আছে। কিন্তু সমস্ত বাংলা-সাহিত‍্য-ইতিহাস তন্ন করিয়া খিঁজিয়াও ইন্দ্রনাথের জোড়া মিলে না। তাহার নিশীথ

অভিযান সমস্ত দিক দিয়া একেবারে অনন‍্যসাধারণ। আমাদের সাহিত‍্যে নৌযাত্রা-বর্ণনার অভাব নাই--বঙ্কিমচন্দ্রের উপন‍্যাসে ও রবীন্দ্রনাথের ছোটো গল্পে এই বিষয়ে অনেক কবিত্বপূর্ণ, সূক্ষ্ম অনুভূতিময় বিবরণ আছে। কিন্তু শরৎচন্দ্রের বর্ণনা সম্পূর্ণ ভিন্নজাতীয়। ইহার মধ‍্যে কবিত্বের অভাব নাই, কিন্তু কবিত্ব ইহার সম্বন্ধে প্রধান কথা নহে। ইহার মধ‍্যে যে অকুণ্ঠিত বাস্তবতা, যে প্রত‍্যক্ষ অভিজ্ঞতার সুর পাওয়া যায় তাহা কবিত্বকে অতিক্রম করিয়া অনেক ঊর্ধ্বে উঠিয়াছে। ইহার বর্ণনায় যে তীব্রতা আছে তাহা দুইটি দুঃসাহসিক বালকের উত্তেজিত কল্পনায় আবির্ভূত হইয়া ঊর্ধ্বোৎক্ষিপ্ত হইয়াছে। তারপর তাহার দ্বিতীয় সৌভাগ‍্য অন্নদাদিদির সহিত পরিচয়। ইংরাজি সাহিত‍্যিক একজন লিখিয়াছিলেন : "To know her was itself a liberal education" এই বাক‍্যটি সম্পূর্ণরূপেই অন্নদাদিদি-সম্বন্ধে প্রযোজ‍্য। বাল‍্যকালে যখন সংস্কারের সংকীর্ণতা অস্থিমজ্জার সহিত মিশিয়া যায় নাই, বিধি-নিষেধের ফাঁস নিশ্বাস-বায়ুকে রোধ করে নাই, সেই নব-আহরণের যুগে মুসলমান বেদে পরিবারের মধ‍্যে শ্রদ্ধা ও ভক্তির পাত্র আবিষ্কার করার যে সৌভাগ‍্য তাহার মূল‍্য নির্ণয় কে করিবে? এই এক পরিচয়ে সমস্ত জীবনের গতি ফিরিয়া যায়। এক একজন লোক আছে যাহারা সর্বদা রাস্তায় জিনিস কুড়াইয়া পায়। শ্রীকান্ত তাহার জীবনযাত্রার প্রারম্ভেই অতি অবজ্ঞাত আবেষ্টনের মধ‍্যে যে রত্ন কুড়াইয়া পাইয়াছে তাহা তাহার ভবিষ‍্যৎ জীবনের পাথেয় হইয়াছে। বেদের জীবন ও সাপুড়ের ঘরকান্নার যে চিত্র গ্রন্থ-মধ‍্যে পাওয়া যায় তাহা আমাদের স্মরণ করাইয়া দেয় যে, আমাদের বাঙালি-জীবনে রোমান্সের একান্ত অভাব-সম্পর্কে যে সাধারণ অভিযোগ তাহা কতই নিরর্থক। 'রয়াল বেঙ্গল টাইগার'র 'নূতন দা'র দুইটি দৃশ‍্য শরৎচন্দ্রের রচনার মধ‍্যে বিশুদ্ধ হাস‍্যরসপ্রাচুর্যের সুন্দর পরিচয়।
     এই পর্যন্ত শ্রীকান্তের বাল‍্যশিক্ষা সমাপ্ত। তারপর কয়েক বৎসর পরে পুনরায় যবনিকা তোলা হইয়াছে। এই সময়ে একটা কুমারের শিকার-পার্টিতে যোগ দেওয়ার অত‍্যন্ত অতর্কিতভাবে তাহার জীবনের সন্ধিক্ষণ উপনীত হইয়াছে। ইন্দ্রনাথের কাছে সে যে মন্ত্র শিক্ষা পাইয়াছিল, পিয়ারী বাইজীর ক্ষেত্রে সেই শিক্ষার পরীক্ষার সুযোগ মিলিয়াছে। বাইজীর ওড়না ও পেশোয়াজের অন্তরালে তাহার প্রণয়িনী বাল‍্যসখীর দর্শন মিলিয়াছে। এই নূতন সম্বন্ধের সহিত সামঞ্জস‍্য-স্থাপনের চেষ্টায় তাহার বাকি জীবন কাটিয়াছে। এই সম্বন্ধের অশেষ রকম ঘোর-ফের, প্রবল অনুরাগের সহিত কঠোর কর্তব‍্য ও সমাজনিষ্ঠার অবিরাম সংগ্রামে শ্রীকান্তের ভাবী জীবন বিক্ষুব্ধ হইয়াছে। 'শ্রীকান্ত'-এর এই অংশে নিশীথ শ্মশানের ভয়াবহ বর্ণনা ও ভাঙা বাঁধাঘাটে বসিয়া মানব-জীবন সম্বন্ধে পর্যালোচনা শরৎচন্দ্রের বর্ণনাশক্তি ও মননশক্তির অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় দেয়। রাজলক্ষ্মীর সহিত প্রথম পরিচয়ের পর সামাজিক সম্মানের বাধা উভয়ের মধ‍্যে একটা ব‍্যবধান রচনা করিল। শ্রীকান্ত তারপর হঠাৎ সন্ন‍্যাসীর চেলাগিরিতে ভর্তি হইয়া যাযাবর জীবনের সুখ ও নিরক্ষর লোকের ভক্তি উপভোগ করিতে লাগিয়া গেল। কিন্তু সন্ন‍্যাসীর ছদ্মবেশ তাহার রত্ন-আবিষ্কারক চক্ষুকে প্রতারিত করিতে পারিল না। গৌরী তেওয়ারীর প্রবাসী কন‍্যার অসীম নিঃসঙ্গ ব‍্যথা এবং রামবাবু ও তৎপত্নীর কল্পনাতীত কৃতঘ্নতা যুগপৎ তাহার চোখের সম্মুখে পড়িয়া গেল। এই কৃতঘ্নতার ফলে শ্রীকান্তকে প্রথমবার রাজলক্ষ্মীর প্রণয়কে পরীক্ষা করিতে হইল। প্রণয়ের তো পরীক্ষা হইয়া গেল, কিন্তু তাহাদের মিলনের পথে তাহাদের নিজেরই মন সূক্ষ্মতন্তু-নির্মিত বাধা রচনা করিল। বাস্তবিক তাহাদের অনুভূতি এত তীক্ষ্ণ, আত্মসম্মানজ্ঞান এত সতর্ক, ব‍্যবহারের বিচারবোধ এত অভ্রান্ত যে, সাধারণ লোক যেখানে পরিপূর্ণ মিলনের নিবিড় আনন্দ উপভোগ করিত, সেখানে তাহারা একটি দ্বিধাসংকোচজড়িত সূক্ষ্ম অতৃপ্তির অন্তরাল সৃষ্টি করিয়াছে। এই প্রথম উপলক্ষে বাধা আসিয়াছে শ্রীকান্তের দিক হইতে--রাজলক্ষ্মীর মিলনোৎসুক হৃদয়ের উচ্ছ্বাসের উপর সে নৈতিক সতর্কতা ও সাংসারিক বুদ্ধির শীতল জল প্রক্ষেপ করিয়াছে। রাজলক্ষ্মীর সূক্ষ্ম অনুভূতি এই সতর্কতার ইঙ্গিত তৎক্ষণাৎ গ্রহণ করিয়া নিজ উৎসুক মনকে প্রতিনিবৃত্ত করিয়াছে, এবং বর্ষণোন্মুখ মেঘের ন‍্যায় একটা স্তব্ধ-গম্ভীর বিষাদের মধ‍্যে তাহাদের এই প্রথম মিলন-চেষ্টা আপন ব‍্যর্থতা নীরবে স্বীকার করিয়া লইয়াছে।
     এইবার 'শ্রীকান্ত'- এর দ্বিতীয় পর্ব আরম্ভ। বাড়ি আসিয়া কিছুদিন বাসের পর অপরের কন‍্যাদায় ও নিজের বিবাহদায় হইতে মুক্তি পাইবার জন‍্য শ্রীকান্ত দ্বিতীয়বার রাজলক্ষ্মীর নিকট যাইতে বাধ‍্য হইয়াছে। এই দ্বিতীয় দফায় ঔদাসীন‍্যের ছদ্মবেশে মান-অভিমান প্রণয়ের পালাকে ঘোরালো করিয়াছে। রাজলক্ষ্মী আবার বাইজী-জীবনে অবতরণ করিয়াছে। এমন সময় হঠাৎ শ্রীকান্তের আবির্ভাব। ক্ষণস্থায়ী অভিমানের পর পূর্বের বাধাটা যেন মুহূর্তের জন‍্য সরিয়া গেল। প্রতিরোধপীড়িত প্রেম সহজ উচ্ছ্বাস ও স্বীকারোক্তিতে মুক্তি পাইল। রাজলক্ষ্মী আবার শ্রীকান্তের সহিত বর্মায় যাইতে চাহিল; শ্রীকান্ত পূর্বের ন‍্যায় এবারও সে প্রস্তাবে অস্বীকার জ্ঞাপন করিল। কিন্তু পরস্পরের মধ‍্যে সম্বন্ধটি সহজ ও পরিষ্কার হইয়া গেল। এবার বিদায়ের পালা স্তব্ধ নীরবতার মধ‍্যে নহে, অপ্রতিরোধনীয় অশ্রুজলের মধ‍্যে সারা হইল।
     তারপর বর্মা-যাত্রা। এই যাত্রা যেন শরৎচন্দ্রের কল্পনা ও বর্ণনাশক্তির নূতন বিজয়-অভিযান। সমুদ্রযাত্রার বর্ণনায় একাধারে কবিত্ব, জীবন-সমালোচনা, সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ প্রভৃতি সর্বপ্রকার মানসিক শক্তিরই সার্থকতা হইয়াছে। জাহাজের উপরে নানাবিধ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ‍্যে ও পরিচয়ের স্বপ্ল অবসরেও শরৎচন্দ্রের দিব‍্যদৃষ্টি আবার নূতন আবিষ্কার সমর্থ হইয়াছে। সমাজের পাকা বাঁধনে যেখানেই একটু ছিন্নসূত্র পাকাইয়া লেখকের শ‍্যেনচক্ষু ঠিক তাহার উপরেই গিয়া পড়ে। নন্দ-টগরের বিংশবর্ষব‍্যাপী দাম্পত‍্য-সম্বন্ধের মধ‍্যেও টগরের জাত‍্যভিমান হাস‍্যকর অসংগতি সহিত নিজ স্বাতত‍্য-রক্ষার একটা গৌরব অনুভব করিয়াছে ---আচারের শাঁস বর্জন করিয়া তাহার খোলসটি সযত্নে অঞ্চলাগ্রে বাঁধিয়াছে। আবার পক্ষান্তরে এমন একটি স্তীলোকের দর্শন মিলিয়াছে যে, অন্তত লজ্জা-সংকোচের জড়পিণ্ড, ও যাহার সম্বন্ধে 'পথি নারী বিবর্জিতা' এই প্রবাদবাক‍্য কোনোমতেই সুপ্রযুক্ত নহে। এই অভয়া নিতান্ত অসংকোচেই যেমন রোহিণীকে ঠিক তেমনই শ্রীকান্তকে নিজের কাজে ভিড়াইয়া লইল এবং উহাদিগকে মাঝে রাখিয়া প্রায় সম্পূর্ণ নিজ চেষ্টাতেই কোয়ারান্টাইনের নরককুণ্ড অবলীলাক্রমে উত্তীর্ণ হইল।

     রেঙুনে পৌঁছিয়া শ্রীকান্ত আপাতত রোহিণী-অভয়ার সহিত বিচ্ছিন্ন নূতন দেশের অশেষ বৈচিত‍্যের মধ‍্যে নিজ চিন্তীশীলতা ও পর্যবেক্ষণ-শক্তির অনুশীলন করিতে লাগিয়া গেল। ব্রহ্মদেশের স্ত্রী-স্বাধীনতা, দা-ঠাকুরের হোটেলে জাতিভেদ-সংস্কারের অনিত‍্যতা, অভয়ার স্বামীর পত্নী-বাৎসল‍্য ও সমগ্র বাঙালি-সমাজের কলঙ্ক, কাপুরুষ বিশ্বাসঘাতক স্বামী কর্তৃক নিরপরাধ ব্রহ্মস্ত্রীর পরিত‍্যাগ--ইহার প্রত‍্যেকটি দৃশ‍্য তাহার পূর্ব-সংস্কারের বন্ধনের উপর তীক্ষ্ণ ছুরিকাঘাতের ন‍্যায়ই পড়িল, এবং তাহার যে মন ইন্দ্রনাথ ও অন্নদাদিদির প্রভাবে ও রাজলক্ষ্মীর প্রেমে অসাধারণ উদারতা ও প্রসার লাভ করিয়াছিল তাহাকে চির-স্বাধীনতার সনদ দান করিল।
     কিন্তু যে বন্ধন এই সমস্ত অভিনব অভিজ্ঞতার বিন্দু বিন্দু এসিড-পাতে ধীরে ধীরে ক্ষয় হইতেছিল তাহা অভয়ার বিদ্রোহরূপ বিস্ফোরকে একেবারে জ্বলিয়া ছাই হইয়া গেল। অভয়ার পাতিব্রত‍্য-ব‍্যাখ‍্যা অকাট‍্য ন‍্যায়নিষ্ঠা ও অকুণ্ঠিত স্বাধীনচিন্তার জয়পতাকা। ইহার নৈতিক আদর্শ সাধারণের জন‍্য নহে ---মূঢ় বিদ্রোহ অপেক্ষা অন্ধ অনুবর্তিতা বোধ হয় সমাজের পক্ষে কম অনিষ্টকর। কিন্তু সামাজিক নিয়মের ব‍্যতিক্রম থাকা অবশ‍্য প্রয়োজনীয় --ব‍্যক্তিগত জীবনের স্বাভাবিক প্রয়োজনের সহিত সমাজ-ব‍্যবস্থার যত অধিক ব‍্যবধান, ততই তাহা অসুবিধা ও অত‍্যাচারের হেতু হইয়া থাকে। এই আদর্শে সামাজিক বিধি-নিষেধ ও ধর্মসংস্কারগুলির পুনর্বিচারের প্রয়োজন। অভয়ার বিচারের বিষয় এই যে, সতীত্বের মূল কথাটা পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি-ভালোবাসা, না কঠোর আত্মসংযম ও আত্মনিগ্রহ? হিন্দুসমাজ সব সময়েই এই আত্মনিগ্রহকেই উচ্চতর নৈতিক জীবন বলিয়া ধরিয়া লইয়াছে ---ইহার জন‍্য গভীর লাঞ্ছনা, পরমুখাপেক্ষিতা, আত্মাবমাননা, জীবনের একান্ত রিক্ততা সমস্তই নিঃসংকোচ স্বীকার করিয়াছে। শরৎচন্দ্র দেখাইতে চাহিয়াছেন যে, ক্ষেত্রবীশেষে এই আত্মবলিদান একটা প্রকাণ্ড জুয়াচুরি ও নিতান্ত ব‍্যর্থ অপব‍্যয়। অবশ‍্য ইহা নিশ্চিত যে, ধৈর্য ও সংযমের বাঁধ একবার ভাঙিলে সংযমের ইচ্ছা পর্যন্ত লোপ পাইতে পারে, সুদীর্ঘ সাধনার ফলে দুরন্ত প্রবৃত্তির দমনে আমরা যতটুকু অগ্রসর হইয়াছি তাহা সমস্তই নষ্ট হইতে পারে। কিন্তু জীবন্ত, বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন সমাজের কর্তব‍্য ব‍্যক্তিগত প্রয়োজন-অনুসারে ব‍্যবস্থা নিয়মিত করা। যে সমাজ কেবল সাধারণ অবস্থার জন‍্যই ব‍্যবস্থা প্রণয়ন করে অসাধারণ ব‍্যতিক্রমের অস্তিত্ব পর্যন্ত স্বীকার করে না, তাহা আত্মঘাতী; সে তাহার সর্বাপেক্ষা মূল‍্যবান উপাদানগুলিকেই পিষ্ট, দলিত করিয়া তাহার নৈতিক জীবনকে সংকুচিত, অবনত করিয়া আনে। যে সমাজে পীড়নের নিষ্ঠুর অধিকার আছে, কিন্তু রক্ষণের দায়িত্ব নাই, তাহার অভিভাবকত্বের দাবি অনিষ্টকর ও অপমানজনক। শরৎচন্দ্রের সমাজ-বিশ্লেষণ এইরূপ গভীর ও বহুমুখী চিন্তাধারার পথ উন্মুক্ত করিয়া দেয়।
     শরৎচন্দ্রের গ্রন্থ-মধ‍্যে সমাজ ও ধর্মসংস্কারের হীন দাসত্বের বিরুদ্ধে যে ব‍্যাপক বিদ্রোহ চলিয়াছে অভয়া তাহার নেতৃবৃন্দের মধ‍্যে পুরোবর্তিনী। যে মুক্তিকামনা, যে অসন্তোষ-অতৃপ্তি অনেকের মনে ধূমায়িত হইয়াছে তাহা অভয়ার নির্ভীক বিদ্রোহে, সুস্পষ্ট স্বাধীনতা-ঘোষণায় একেবারে প্রদীপ্ত অগ্নিশিখায় জ্বলিয়া উঠিয়াছে। যে কুণ্ঠিত লজ্জা, যে অপ্রসুপ্ত সংস্কার রাজলক্ষ্মী-সাবিত্রীর ভালোবাসার ধারাকে পদে পদে প্রতিহত করিয়া তাহাদের মনে একটা ক্ষুব্ধ আবর্তের সৃষ্টি করিয়াছে, অভয়া সবলে, নিঃসংকোচে তাহার গ্লানিকে ঝাড়িয়া ফেলিয়াছে। কিরণময়ীর তীক্ষ্ণাগ্র, ক্ষুরধার বুদ্ধিও যেখানে মলিন‍্যগ্রস্ত, সেখানেও অভয়ার প্রবল, অকুণ্ঠিত ন‍্যায়বোধ জয়ী হইয়াছে। অবশ‍্য প্রত‍্যেক ক্ষেত্রেই অবস্থাভেদে কর্তব‍্যনির্ধারণের তারতম‍্য ঘটিয়াছে। রাজলক্ষ্মী-কিরণময়ীর সমস‍্যা অভয়ার সহিত এক নহে। রাজলক্ষ্মী তাহার ভালোবাসাকে সার্থক করিতে একাগ্রভাব চাহে না --সে ইহাকে তাহার ঘৃণিত ভূতপূর্ব গণিকা-জীবন হইতে উদ্ধারের ও ধর্মজীবনে উন্নতির উপায়স্বরূপ ব‍্যবহার করিতে চাহে। অভয়া যে নির্মল জল আকণ্ঠ পান করিবার জন‍্য উন্মুখ, রাজলক্ষ্মী প্রধানত তাহাকেই পূর্বজীবনের কালিমা ধুইবার কাজে লাগাইতে চাহে, সুতরাং অভয়ার ইচ্ছার একাগ্র প্রবলতা তাহার নাই। আর কিরণময়ী তাহা তাহার পক্ষে অপেয় জানিয়া তাহাতে প্রতিহিংসার এসিড ঢালিয়া তাহার প্রেমাস্পদকে ক্ষত-বিক্ষত করিতে চাহে--সুতরাং ইহাদের মধ‍্যে প্রভেদ থাকিবেই। এক সাবিত্রীর সহিত তাহার অবস্থার কতকটা সাম‍্য আছে---কিন্তু সাবিত্রীর প্রবল ধর্মসংস্কার ও নিজ হীনতা-সম্বন্ধে কুণ্ঠিত ধারণা তাহার প্রেমকে সার্থক করিয়া তুলিবার পথে অন্তরায় হইয়াছে।
     অভয়ার বিদ্রোহ যে ভোগাসক্তিমূলক নয় তাহা সে প্লেগ-মহামারীর মধ‍্যে শ্রীকান্তকে নিজ নূতন-পাতা সংসারে আশ্রয় দিয়া প্রমাণ করিয়াছে। প্লেগ হইতে উঠিয়া এই তৃতীয়বার শ্রীকান্তের রাজলক্ষ্মীকে প্রয়োজন হইয়াছে। অভয়ার দৃষ্টান্ত রাজলক্ষ্মীর মনে খুব গভীর আলোড়ন জাগাইয়াছে; কিন্তু আর একটা নূতন উপসর্গ জুটিয়া তাহার ভালোবাসার উপর বৈরাগ‍্যের রং ফলাইয়া দিয়াছে। তাহার সপত্নী-পুত্র বঙ্কুর উপস্থিতি তাহার মনে মাতৃত্বের মর্যাদাবোধ জাগাইয়া তুলিয়াছে; তাহার উপর আবার ধর্মের নেশা নূতন করিয়া তাহাকে পাইয়া বসিয়াছে। তথাপি সে অভয়ার দৃষ্টান্তে অনুপ্রাণিত হইয়া সমস্ত তর্কসংশয়জাল ছিন্ন করিয়া শ্রীকান্তের সহিত অবাধ মিলন আকাঙ্ক্ষা করিয়াছে; কিন্তু আবার শ্রীকান্তের সম্ভ্রমবোধ পিছাইয়া আসিয়াছে। এবার যে ছাড়াছাড়ি হইয়াছে তাহার মধ‍্যে মোহ-ভঙ্গের বিস্বাদ ও একটা শেষ সংকল্পের সুর বাজিয়াছে। কিন্তু কিছুদিন যাইতে না যাইতে পুনরায় শ্রীকান্তের পল্লীগৃহে তাহার রুগ্ন শয‍্যার পার্শ্বে রাজলক্ষ্মীর ডাক পড়িয়াছে। এবার যেন দ্বিধাদ্বন্দ্বের অবসান হইয়াছে বলিয়া মনে হয়। অনেকটা ঘটনাচক্রে বাধ‍্য হইয়া শ্রীকান্ত তাহার চিরন্তন সমাজ ও পরিবার-সমক্ষে রাজলক্ষ্মীর সহিত সম্পর্ক স্বীকার করিয়াছে, এবং আপাতত এই সুদীর্ঘ, সূক্ষ্ম আকর্ষণ-বিকর্ষণলীলার উপর যবনিকা-পাত হইয়াছে।
     কিন্তু যে কুণ্ঠা বাহিরের সমাজের নিকট প্রকাশ‍্যভাবে বিসর্জিত হইয়াছে তাহাই রাজলক্ষ্মীর মনের ভিতর নবজন্ম পরিগ্রহ করিয়া আবার তাহাদের মিলনকে পীড়িত করিয়া তুলিয়াছে। এবার সমস্ত বাধা আসিয়াছে রাজলক্ষ্মীর দিক হইতে। কিছুদিন হইতেই রাজলক্ষ্মীর যে একটা কঠোর আচারনিষ্ঠা ও কৃচ্ছ্রসাধনের দিকে ঝোঁক পড়িয়াছিল তাহা গঙ্গামাটির নির্জনতায় ও সুনন্দার প্রভাবে অত‍্যন্ত প্রবল হইয়া ভালোবাসাকে অতিক্রম করিয়া গেল। রাজলক্ষ্মীর প্রত‍্যেক কথাতে, প্রত‍্যেক ব‍্যবহারে একটা সুদূর ঔদাসীন‍্য ও নির্লিপ্ততার ভাব