Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা- ১৬, ১৭ এবং ১৮

2020-05-25
মতবাদের জন্য দুঃখবরণে প্রস্তুত, দৃঢ়চেতা যুবকসম্প্রদায়ের প্রভেদ | মতিলাল ও মাইকেল মধুসূদনের মুখে হয়তো একই রকমের বুলি, তাহাদের বিলাতি খানাপিনা ও সুরার দিকে সাধারণ প্রবণতা---কিন্তু মানস আদশে্র দিক দিয়া ইহারা সম্পূণ্য ভিন্নজাতীয়|
     আসল কথা, বাবু-সমাজের অমিতাচারের জন্য দায়ী ইংরেজি শিক্ষা বা নৈতিক আদশ্য নহে, ইংরেজি বাণিজ্যের প্রসার | এই যুগে বৈদেশিক বাণিজ্যের সহিত প্রথম সম্পক্-স্হাপনের ফলে দেশে অথ্নৈতিক সমৃদ্ধির একটা ক্ষণস্হায়ী জোয়ার আসিয়াছিল | বাঙালি বেনিয়ান এদেশে ইংরেজের পণ্যদ্রব্য প্রচলিত করিয়া ও ইংরেজের বাণিজ্য-বিস্তারের জন্য কাঁচামাল যোগাইয়া তাহাদের বিপুল লাভের কিছু কিছু অংশ পাইতেছিল | কেহ দালালি করিয়া, কেহ নিমক-মহালের ইজারা লইয়া, কেহ-বা ইংরাজের রাজস্ব-সংগ্রহ-ব্যবস্হার সহিত সংশ্লিষ্ট হইয়া ইংরাজের সৌভাগ্যলক্ষ্মী যে স্বণ্যপদ্মের উপর আসীনা হইয়াছিলেন, তাহার দুই-একটা পাপড়ি নিজ ধনভান্ডারে সঞ্চয় করিতেছিল | এই সময়ে কলিকাতার বনিয়াদি পরিবারবগে্র অভ্যুদয়ের প্রথম ভিত্তি স্হাপিত হইল | মহানগরী সমুদ্রগভো্থিতা ঐশ্বয্দেবীর ন্যায় আকাশস্পশী্ অট্টালিকাশ্রেণীতে নিজ সমৃদ্ধির দীপ্তি প্রতিফলিত করিয়া জন্মলাভ করিল | সমস্ত শহরের আকাশে-বাতাসে একটা আনন্দ ও উত্তেজনার তরঙ্গ প্রবাহিত হইল | উচ্ছ্বসিত প্রাণস্রোত, আমোদ-প্রমোদ ও বিলাস-ব্যসন ---বিজয়-অভিযানে নিগ্যত হইল | অখ্যাত ক্ষুদ্র পল্লীসমষ্টী রাজধানীতে রূপান্তরিত হইয়া রূপের উচ্ছলতায়, লক্ষ লক্ষ নবাগত জনসংঘের সন্মিলিত হৃৎস্পন্দনে, বিরাট ঐক্যের সচেতনতায় যেন নব যৌবনের দৃপ্ত শক্তিমত্ততায় চঞ্চল হইয়া উঠিল | এই আশা ও সীমাহীন সম্ভাবনার পুলকোৎফুল্ল প্রতিবেশে বাবুর উদ্ভব | সে যেন জীবনোৎসবের এই ফেনিল, মত্ত বিক্ষোভের প্রথম স্বল্পায়ু রঙিন বুদবুদ্ | আর পুঁচিশ বৎসরের মধ্যে এই উদ্দাম, অসংস্কৃত জীবন-প্রবাহের সঙ্গে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির উগ্র উন্মাদনা, বিদ্রোহী নীতিবোধ ও নিগূঢ় সৌন্দযানুভূতি যুক্ত হইয়া এক উচ্ছতর সৃষ্টির বীজ বপন করিবে ---বাবুর স্হূল ভোগবিলাস কবি ও সমাজ-সংস্কারকের সূক্ষ্মতর জীবনরসোপভোগে পরিবতি্ত হইবে | 'নববাবু-বিলাস' (১৮২৩), প্যারীচাঁদ মিত্রের 'আলালের ঘরের দুলাল' ( ১৮৫৮ ) ও কালীপ্রসন্ন সিংহের ' হুতোমপ্যাঁচার নক্সা' (১৮৬২ )--এই তিনখানি উপন্যাসে বাবু-চরিত্র ও বাবু-প্রসূতি সমাজ-জীবন আলোচিত হইয়াছে | 'নববাবু-বিলাসে'র কথা পূবে্ই উল্লিখিত হইয়াছে | 'হুতোমপ্যাঁচার নক্সা' ঠিক উপন্যাস নহে ---নবপ্রতিষ্ঠিত কলিকাতা নগরীর উচ্ছৃঙ্থল, অসংযত আমোদ-উৎসবের বিচ্ছিন্ন খন্ড-চিত্রের ও সরস ব্যঙ্গাত্মক বণ্যনার শিথিল-গ্রথিত সমষ্টি | ঐশ্বযে্র নূতন জোয়ারে নাগরিক জীবনযাত্রায় যে সমস্ত উদ্ভট অসংগতি ও রুচিবিকারের দৃষ্টান্ত, স্ফূতি্-ইয়াকি্র নূতন নূতন প্রকরণ, উপভোগের যে মত্ত আতিশয্য ভাসিয়া আসিয়াছে, লেখক তাহাদের উপর তীব্র-শ্লেষপূণ্য কশাঘাত করিয়া নিজ পয্যবেক্ষণের তীক্ষ্ণতা, প্রাণশক্তির প্রাচুয্য ও ভাঁড়ামির পযা্য়ভুক্ত অমাজি্ত রসিকতার পরিচয় দিয়াছেন | এই বিশৃঙ্খল, প্রাণবেগচঞ্চল দৃশ্যগুলির মধ্যে কোনো ব্যক্তিত্ব-সমন্বিত চরিত্র সৃষ্টি হয় নাই --- সুতরাং উপন্যাসের প্রধান লক্ষণ চরিত্র-চিত্রণেরই ইহাতে অভাব |
     সম্প্রতি পুনরাবিষ্কৃতি, ১৮৫২ খৃঃ অঃ শ্রীমতী হ্যানা ক্যাথারিন ম্যালেন্স কতৃক রচিত 'করুণা ও ফুলমণির বিবরণ' নামক গ্রন্থটি কালের দিক দিয়া 'আলালের ঘরের দুলাল' -এর অগ্ররবতী্ | এই কালগত অগ্রাধিকারের বলে প্রথম পূণা্ঙ্গ উপন্যাসের গৌরব ইহারই প্রাপ্য হইতেছে | এই উপন্যাসে শ্রীমতি ম্যালেন্স কয়েকটি খৃষ্টানধমা্ন্তরিত বাঙালি পরিবারের জীবনযাত্রার কাহিনী বিবৃত করিয়াছেন | তাঁহার ভাষা কেরীর 'কথোপকথন' ও বাইবেলের অনুবাদের যুগ্ম আদশে্ পরিকল্পিত | ইহাতে দেশীয় নিম্নশ্রেণীর লোকের কথ্যরীতির সুষ্ঠু প্রয়োগের সঙ্গে সঙ্গে খৃষ্টান ধম্যগ্রন্থের উৎকট বৈদেশিকপন্থী বাগধারার প্রচুর সংমিশ্রণ দেখা যায় | লেখিকা বাঙালি সমাজের আচরণ, সংসারযাত্রার সাধারণ ছন্দ ও সংলাপরীতির সহিত ঘনিষ্ঠ পরিচয় অজ্ন করিয়াছিলেন ও বাংলা ভাষার উপর তাঁহার অধিকার সীমাবদ্ধ হইলেও প্রসংসনীয় | ইহার আখ্যানসূত্রের মধ্যে কোনো ধারাবাহিকতা নাই; কয়েকটি পরিবারের সংসার-জীবনের কিছু খন্ডাংশের ইহা একটা যদৃচ্ছগ্রথিত সমষ্টি মাত্র | ঘটনাপ্রবাহের কোনো সুনিদি্ষ্ট কেন্দ্ররবিন্যযস্ত পরিণতিরও বিশেষ চিহ্ন ইহাতে পাওয়া যায় না | খৃষ্টধম্যের প্রভাব মানুষের নৈতিক উন্নতি ও সদাচার-নিয়ন্ত্রিত, প্ররলোভনজয়ী জীবনযাত্রা-নিবা্হের রুচিকর চিত্র অঙ্কিত করাই তাঁহার প্রধান কাম্য |
     ফুলমণি ও করুণার গাহ্স্থ্য-জীবনের বিপরীতমুখী চিত্র অঙ্কনের দ্বারাই তিনি তাঁহার এই উদ্দেশ্য সিদ্ধ করিতে চাহিয়াছেন | ফুলমণি মনে-প্রাণে খৃষ্টধম্যানুরাগী; তাহার গাহ্স্থ্য-জীবনও সেইজন্য সুশৃঙ্খল ও নীতিনিষ্ঠ | তাহার স্বামী ও ছেলে-মেয়েরাও অনিন্দদনীয় চরিত্রের অধিকারী ও তাহাদের পারস্পরিক সম্পক্ প্রীতিপূণ্য, সহৃদয় ও একই আদশে্র অনুগামী | পক্ষান্তরে করুণা খৃষ্টধমে্ দীক্ষিত হইলেও উহাতে আন্তরিক-আস্থাহীন | তাহার সংসার-জীবন সেইজন্য দারিদ্র্যক্লিষ্ট, শোভন-আচারহীন ও বিরোধ-কন্টকিত | তাহার স্বামী অন্যাসক্ত, মাতাল ও দায়িত্বহীন; তাহার দুই ছেলের মধ্যে এক ছেলে চোর, আর একজন কুপথগামী হইতে সৎসংসগে্র প্রভাবে পাপের কবলমুক্ত | করুণা নিজে অলস, আত্মসন্মানহীন, ইতরকলহপরায়ণ | শেষ পয্ন্ত লেখিকার আন্তরিক চেষ্টায়, খৃষ্টধমে্র জীবননীতির পৌনঃপুনিক প্রচারে ও তাহার জ্যেষ্ঠ পুত্রের শোচনীয় অপমৃত্যুতে তাহার মনে যে আত্মগ্লানির আগুন জ্বলিয়াছিল তাহার দ্রবীকরণশক্তির ফলে তাহার চরিত্রের সংশোধন হইয়াছে | তাহার দাম্পত্য-জীবনের বিচলিত ভারসাম্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা খৃষ্টধমে্রই জয়-ঘোষণা | আবার মধু ও প্যারীর মৃত্যুদৃশ্যের বৈপরীত্য ঐ একই উদ্দেশ্যসাধনের সহায়ক হইয়াছে| ধম্ ও নীতিভ্রষ্ট মধুর অন্তিমশয্যা অনুতাপকন্টকিত;

আর খৃষ্ট দৃঢ়বিশ্বাসী প্যারীর মরণ শান্তিপূণ্য ও ভগবানের নিশ্চিন্ত করুণার স্হির আশ্বাসে আনন্দ-সমুজ্জ্বল | সুন্দরী ও রাণীর বিবাহ-ব্যাপারেও খৃষ্টধমে্র আদশে্র নৈতিক সমুন্নতি পরিস্ফুট হইয়াছে |
     'ফুলমণি ও করুণা' গ্রন্থটির প্রধান কৃতিত্ব হইল যে, ইহা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের খিড়কি দরজা দিয়া উপন্যাসের উচ্চমঞ্চে প্রবেশ করে নাই | ইহা সব্প্রথম জীবনের গভীর সমস্যা, পারিবারিক জীবনের সুখশান্তি, জীবনের সুমিত নীতিনিয়ন্ত্রন, দুষ্প্রবৃত্তির উন্মূলন প্রভৃতি অবলম্বনে রচিত কাহিনী | বিদেশিনী লেখিকা সমকালীন সমাজচিত্রে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের উপাদান আবিষ্কার করিতে পারিবেন না ইহা স্বাভাবিক | এক খৃষ্টধমে্র মহৌষধে সমস্ত ভবরোগ আরোগ্য হইবে, সমস্ত সামাজিক দুনী্তি ও অনাচার ও পারিবারিক মনোমালিন্য দূরীভূত হইবে ইহা যাঁহার স্হির বিশ্বাস, তিনি নিজ মানসিক গঠন ও রুচির দিক দিয়াই তিয্ক কটাক্ষের ও লৌকিক নিন্দার পথ পরিহার করিবেন | জীবনের সহজ রূপই ঔপন্যাসিক-তাৎপয্মমন্ডিত হইয়া তাঁহার চোখে প্রতিভার হইয়াছিল---ইহা উপন্যাসের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে অভাবনীয়রূপে বৃদ্ধি করিয়াছিল | কিন্তু ইহাই তাঁহার প্রশংসার চরম প্রাপ্য | তিনি জীবনের সত্যরূপ দেখেন নাই, ধমা্ন্ধতার ঠুলি পরিয়া জীবনের ঝাপসা রূপকেই প্রত্যক্ষ করিয়াছেন | তাঁহার জীবনচিত্র সম্পূণ্যভাবে সাম্প্রদায়িক ধম্যবোধের সংকীণ্ গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ ও সুনিদিষ্ট-উদ্দেশ্যপরতন্ত্র | তিনি কয়েকটি খৃষ্টান পরিবারের আত্মকেন্দ্রিক জীবনযাত্রা লইয়া ব্যাপৃত; তাহাদের প্রতিবেশী বিরাট হিন্দু ও মুসলমান সমাজ তাঁহার মনোযোগের কণামাত্র আকষণ করিতে পারে নাই | সেখানে বিপুল তরঙ্গোচ্ছ্বাসক্ষুদ্ধ মহানদী তাঁহার সন্মুখে প্রসারিত, সেখানে তিনি উহার মধ্যবতী্ একটি ক্ষুদ্র দ্বীপখন্ডে নিজ দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়াছেন | এই খৃষ্টান সমাজ নিতান্ত প্রাণহীন, ধমে্র চাপে অভিভূত, বাইবেলের পাতা উলটাইয়া ও উক্তি আওড়াইয়া জীবনের দুরন্ত আবেগকে শৃঙ্খলিত করে | ইহাদের জীবন-কাহিনী-আলোচনার খৃষ্টধমে্র মহিমা ব্যক্ত হইতে পারে, কিন্তু উহার নিজস্ব গতিবেগ ও নিগূঢ় তাৎপয্ কিছুই নাই |
     তাঁহার চরিত্রাবলীও নিতান্ত নিজী্ব ও নিষ্প্রভ | ফুলমণি ও উহার পরিবার যেন বাইবেলের ধম্যযনিদে্শের গাহ্স্থ্য সংস্ককরণ---উহাদের সমস্ত জীবন-সমস্যা ধম্যযগ্ররন্থের পাতার মধ্যে নিঃশেষ সমাধান লাভ করিয়াছে | বরং করুণার চরিত্রে কিছুটা অনুতাপের দুঃখ, কিছুটা অন্তদ্ব্ন্দের ক্ষীণ প্ররতিচ্ছায়া, কিছুটা আত্মমসংযমের প্রয়াস তাহাকে প্রাণস্পন্দিত করিয়াছে | তাহার স্বামীর দুঃশীলতা পোষমানা সপে্র মতো বাইবেলের মন্তের নিকট ফণা নত করিয়াছে ও এই মন্ত্র তাহার পারিবারিক সমস্যার একটা সহজ মুক্তিপথ নিদে্শ করিয়াছে | অন্যান্য চরিত্রও নিতান্ত বাধ্যভাবে এই ধম্যপ্রধান নাটকে নিজ নিজ পূব্যনিদিষ্ট অংশ অভিনয় করিয়া গিয়াছে | খৃষ্টধম্-আন্দোলন বাংলার সমাজ-জীবনে ক্ষণিক আলোড়ন সৃষ্টি করিয়া বুদবুদের ন্যায় বিলীন হইয়াছে | সুতরাং শ্রীমতী ম্যালেন্সের কাহিনীটি বাংলা উপন্যাসের মূল বিবত্যন-ধারার সহিত নিঃসম্পক্ রহিয়া গিয়াছে | ইহার মূল্য ঐতিহাসিক দলিল হিসাবে, প্রাণরসোচ্ছল জীবন-কথারূপে নহে | 'আলালের ঘরের দুলাল' -এ যে আবিল অসংস্কৃত প্রাণপ্ররবাহ বহিয়া গিয়াছে, তাহাতে উহার গৌণচরিত্ররগুলিও অভিষিক্ত | সুতরাং উপন্যাসের আদি সূচনা 'করুণা ও ফুলমণি' তে* হইলেও, উহার সাথ্ক পরিণতি-সম্ভাবনাময় আরম্ভ 'আলাল' -এ |
( ৪ )
এই শ্রেণীর রচনার মধ্যে 'আলালের ঘরের দুলাল' ই সব্যশ্রেষ্ঠ ও সমধিক উপন্যাসের লক্ষণবিশিষ্ট | এই শ্রেষ্ঠত্ব---বাস্তব বণ্যনা, চরিত্র-চিত্রণ ও মননশীলতা---সমস্ত দিকেই পরিস্ফুট| ইহাতে যে বাস্তব প্রতিবেশের চিত্র দেওয়া হইয়াছে, তাহা 'নববাবু-বিলাস' ও 'হুতোম'-এর সঙ্গে তুলনায় গভীরতর স্তরের | প্রথমোক্ত দুইটি গ্রন্থে কেবল হালকা স্ফূতি্র উপযোগী পটভূমিকা---গাজনতলা, কবির আসর, রাস্তার জনপ্ররবাহ ও বেশ্যালয়---বণি্ত হইয়াছে | 'আলাল' -এর প্রতিবেশ আরও পূণা্ঙ্গ ও তথ্যবহুল, জীবনের নানামুখীনতাকে অবলম্বন করিয়া রচিত | ইহাতে কেবল রাস্তাঘাটের কম্যব্যযস্ততা ও সজীব চাঞ্চচল্য নাই, আছে পারিবারিক জীবনের শান্ত ও দৃঢ়মূল কেন্দ্রিকতা, আইন-আদালতের কৌতূহলপূণ্য কায্যপ্রণালী, নবপ্রতিষ্ঠিত ইংরেজশাসনের যে সুকল্পিত বহিব্যবস্হা ধীরে ধীরে ব্যক্তিজীবনের গতিচ্ছন্দকে নিয়ন্ত্রণ করিয়া আনিতেছে, তাহার সম্পূণ্ চিত্র | চরিত্রাঙ্কনে ইহার শ্রেষ্ঠত্ব আরও সুপ্রকট | মানুষ যে ঘটনা প্রবাহে ভাসমান খড়কুটামাত্র নয়, তাহার ব্যক্তিত্ব যে নদীতরঙ্গ-প্রহত পব্যতের ন্যায় কম্পিত হইলেও স্হানভ্রষ্ট হয় না---ইহাতে চরিত্র-চিত্রণের এই আদশ্ই অনুসৃত হইয়াছে | বাবুরাম বাবু নিজে, তাঁহার গৃহিণী ও কন্যাদ্বয়, মতিলাল ও তাহার দুষ্কিয়ার সহযোগিবৃন্দ--ইহারা সকলেই ঘটনা-তরঙ্গে গা ভাসাইলেও এই তরঙ্গোৎক্ষিপ্ত জলকণা মাত্র নহে ---ইহারা জীবন্ত, ব্যক্তিত্বসম্পপন্ন মানুষ 'বাবু'র ন্যায় চমে্র ক্ষীণ আবরণে ঢাকা কঙ্কাল, বা শ্রেণীর প্রতিনিধিমাত্র নহে | তাছাড়া, লেখকের পরিকল্পপনায় এমন একটা সাবলীল সজীবতা আছে, যাহাতে ঘটনার সহিত পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট মানুষগুলি আরও অধিক পরিমাণে প্রণবন্ত হইয়া উঠিয়াছে | ঠকচাচা উপন্যাসের মধ্যে সব্যাপেক্ষা জীবন্ত সৃষ্টি; উহার মধ্যে কূটকৌশল ও স্তোকবাক্যে মিথ্যা আশ্বাস দেওয়ার অসামান্য ক্ষমতার এমন চমৎকার সমন্ববয় হইয়াছে যে, পরবতী্ উন্নত শ্রেণীর উপন্যাসেও ঠিক এইরূপ সজীব চরিত্র মিলে না | বেচারাম, বেণী, বক্রেশ্বর, বাঞ্ছারাম প্রভৃতি চরিত্রেও----কেহ-বা অনুনাসিক উচ্ছারণে, কেহ-বা সংগীতপ্রিয়তায়, কেহ-বা কোনো বিশেষ বাক্য-ভঙ্গির পুরনাবৃত্তিতে ---স্বাতন্ত্র্য অজ্ন করিয়াছে | এই বাহ্য বৈশিষ্ট্যের উপর ঝোঁক ও ব্যঙ্গাত্মক অতিরঞ্জন-প্রবণতায় (caricature) প্যারীচাঁদ অনেকটা ডিকেন্সের প্রণালী অবলম্ববন করিয়াছেন |

কেবল রামলাল ও বরদাবাবু চরিত্র-স্বাতন্ত্র্যের দিক দিয়া ম্লান ও বিশেষত্ববজি্ত, কতকগুলি সদগুণের যান্ত্রিক সমষ্টিমাত্রে পয্যবসিত হইয়াছে |কৃত্রিম সাহিত্যরীতি-বজ্নে ও কথ্য ভাষার সরস ও তীক্ষ্ণাগ্র প্রয়োগে 'আলাল' -এর বণ্যনা ও চরিত্রাঙ্কন আরও বাস্তবরস সমৃদ্ধ হইয়াছে |
     'আলালের ঘরের দুলাল'ই বোধ হয় বঙ্গভাষায় প্রথম সম্পূণাবয়ব ও সবা্ঙ্গগসুন্দর উপন্যাস | প্যারীচাঁদের অন্যান্য পুস্তকগুলি --'মদ খাওয়া বড় দায়' , 'অভেদী' , 'আধ্যাত্মিকা' প্রভৃতি---অল্পবিস্তর উপন্যাসের লক্ষণাক্রান্ত; তাহারা সম্পূণ্য উপন্যাস নয়, কেবল উপন্যাসের কতকগুলি বিচ্ছিন্ন পরিচ্ছদের সমষ্টি মাত্র |
     ১. প্যারীচাঁদের দ্বিতীয় গ্রন্থ 'মদ খাওয়া বড় দায়, জাত থাকার কি উপায়' (১৮৫৯) উদ্ভট-কল্পনা-মিশ্র ব্যঙ্গ-নকশার পযা্য়ভুক্ত |চরিত্র-চিত্রণের লক্ষ্য-স্থিরতা এখানে কৌতুকরসের খন্ডচিত্রের সুলভ আকষ্যণে বিচলিত হইয়াছে| এই উপন্যাসে মদ্যপানের ক্রমপ্রসার, ভন্ড, গোপনে অনাচারী রক্ষণশীল সমাজের দ্বারা হিন্দুধম্যরক্ষার ব্যপদেশে ছোটোখাটো সমাজবিধি-উল্লঙ্ঘনের প্রতি কঠোর শাস্তি-বিধান, সমাজ-শৃঙ্খলারক্ষার হাস্যকর প্রচেষ্টা প্রভৃতি বিষয়ের সরস ও সময় সময় রূপকের আবরণে সংকেতিক ব্যঙ্গচিত্র সন্নিবিষ্ট হইয়াছে | এই জাতীয় ভন্ড ধম্যবাদীদের তিনি বেশ একটি কৌতুককর নামকরণ করিয়াছেন ---'বাহিরে গৌরাঙ্গ অন্তরেতে শ্যাম অবতার ' |
     প্যারীচাঁদ একদিকে যেমন গোঁড়া হিন্দুদের ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করিয়াছেন, অপরদিকে আবার বিধবাবিবাহ-প্রথাকে সেইরূপ ব্যঙ্গগবাণে বিদ্ধ করিয়াছেন | তাঁহার এই দ্বৈতনীতি সম্ভবত মধূসূদনের প্রায় সমকালে লিখিত প্রহসন দুইঁদুটির বিপরীতমুখী সমাজ-চেতনার প্রেরণা যোগাইয়াছিল |
     গ্রন্থের দ্বিতীয় খন্ডে আগড়ভম সেনের কৌতুকাবহ চরিত্র-চিত্রণই উহার ঔপন্যাসিক ধম্যের প্রধান ও একমাত্র নিদশ্যন | সে পক্ষিনামধারী উৎকট নেশাখোরদলের দলপতিরূপে 'পক্ষিরাজ' অভিধায় পরিচিত | তাহাদের নেশার ও নেশার ঝোঁকে উদভ্রান্ত স্ফূতি্ আমোদ ও সংগীত-চচা্র উপভোগ্য ব্যঙ্গচিত্র দেওয়া হইয়াছে | পক্ষিরাজ বিধবাবিবাহের আশায় উৎফুল্ল হইয়াছে, কিন্তু তাহার আশার মূলে ছাই পড়িয়াছে | এই চরিত্রের পরিকল্পনায় প্যারীচাঁদ ত্রৈলোক্যনাথের পূব্যযসূরিরূপে প্রতিভাত হইয়াছেন |
     প্যারীচাঁদের 'অভেদী' (১৮৭১) ও 'অধ্যাত্মিকা' ( ১৮৮০) নূতন ধরনের উপন্যাস | এই উপন্যাসদ্বয়ে লেখকের মনে যে অধ্যাত্ম চিন্তা ক্রমশ ঘনীভূত হইতেছিল, ঔপন্যাসিক ঘটনা-বিবৃতি ও চরিত্রসৃষ্টির বহিরবয়বের মধ্যে দিয়া তাহারই প্রতিপাদন ও প্রকাশ হইয়াছে | 'অভেদী'-র অন্মেষণচন্দ্র ও পতিভাবিনী আদশ্য দম্পতি ---তাহাদের রূপকাভিধানেই তাহাদের স্বরূপ-তাৎপয্য ব্যঞ্জিত | দীঘ্যবিচ্ছেদের ব্যবধানে সাধনার উচ্ছস্তরে আরূঢ় হইবার পর তাঁহাদের মিলন ঘটিয়াছে---এ মিলন সম্পূণ্য দেহাতীসারী ও আধ্যাত্মিক | সরোবরে স্নানরতা, সম্পূণ্য বস্ত্রহীনা যোগিনীদের দশ্যনেও অন্মেষণচন্দ্রের মনে কোনো বিকার হয় না | অধ্যাত্ম সাধনার সূক্ষ্ম ও অভ্রস্পশী্ বায়ুস্তরে বিচরণশীল এই উপন্যাসে বোধ হয় বৈপরীত্য-প্রদশনের উদ্দেশ্যেই জেঁকোবাবু, লালবুঝকড় প্রভৃতি কয়েকটি কৌতুকরসাভিষিক্ত মত্যচারী চরিত্রের অবতারণা করা হইয়াছে, কিন্তু এই উভয় প্রকার ভাবস্তরের মধ্যে সংগতি -বিধানের কোনো চেষ্টা নাই | ব্রাম্ভ্রসমাজের সমকালীন ইতিহাসে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কেশবচন্দ্র সেনের মধ্যে যে মতবিরোধ দেখা দিয়াছিল, উপন্যাসে তাহার একটু প্রাসঙ্গিক উল্লেখ আছে | নব্যদলের আতিশয্যের সহিত তুলনায় রক্ষণশীল ব্রাম্ভ্রণসম্প্রদায়ের সংযত ও প্রাচীন-আদশ্যানুযায়ী আচরণের প্রতিই প্যারীচাঁদের সহানুভূতি |
     'আধ্যাত্মিকা 'য় অধ্যাত্মতত্ত্বের প্রায় একাধিপত্য ও বিরল ব্যাতিক্রম ব্যাতিরেকে লৌকিক জীবনের চিহ্ন বিলুপ্তপ্রায় | যে স্বল্পসংখ্যক পাশ্বচরিত বাস্তব-জীবনের প্রতিনিধিরূপে এই উপন্যাসে প্রবেশলাভ করিয়াছে, তাহাদের সহিত উহার মুখ্য ঘটনা আবেদনের যোগসূত্র অতি ক্ষীণ | নায়িকা আধ্যাত্মিকা শৈশব হইতেই সংসারবিমুখা ও অধ্যাত্মসাধনারত | তাহাকে অবিবাহিতা রাখিয়া তাহার পিতার মৃত্যু তাহাকে বিন্দুমাত্র বিচলিত বা উদ্বিগ্ন করিতে পারে নাই | তাহার পাণিগ্রহণ-প্রয়াসী যুবক তাহার অধ্যাত্মভাবাবিষ্টতা লক্ষ্য করিয়া পশ্চাৎপদ হইয়াছে | আধ্যাত্মিকার লৌকিক বা সাংসারিক জীবন তাহার নিকট একেবারে মূল্যহীন এবং লেখক ইহার যে সামান্য উল্লেখ করিয়াছেন তাহা তাহার সংসার-নিস্পৃহতা ও আদশ্যযনিষ্ঠার নিদশ্যন-স্বরূপ |
     প্যারীচাঁদের রূপক বা আধ্যাত্মিক উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে একক ও অদ্বিতীয় --কোনো পরবতী্ ঔপন্যাসিক তাঁহার ধারার অনুবত্যন করেন নাই | তাঁহার মনোভাব যুগোচিত প্রগতিশীলতা ও সুপ্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতিনিষ্ঠতার এক আশ্চয্য সমন্বয় | তিনি আত্মার অমরতা ও পরলোকে পতি-পত্নীর মিলনে স্থির বিশ্বাস পোষণ করিতেন ---সঙ্গে সঙ্গে পাশ্চাত্য গ্যানবিগ্যান ও প্রগতিশীল চিন্তাধারার প্রতিও সশ্রদ্ধ আনুগত্য গ্যাপন করিতেন | প্রথমযুগের ঔপন্যাসিকদের মধ্যে তিনি ভাববৈচিত্র্য ও জীবনবোধের নানামুখীনতার জন্য একটি উল্লেখযোগ্য স্থান অধিকার করেন |
     প্যারীচাঁদের এই তত্ত্বপ্রবণতা সত্ত্বেও তাঁহার ভালো-মন্দ সমস্ত রচনার এই হিসাবে বঙ্গসাহিত্যে প্রকৃতই অতুলনীয় | দীনবন্ধু মিত্রের দুই-একটি নাটক ছাডা় বঙ্গসাহিত্যে আর কাহারও রচনায় বাস্তব-জীবনের খাঁটি অবিমিশ্র রসটি এত সুপ্রচুর ও অজস্র ধারায় প্রবাহিত হয় নাই | প্যারীচাঁদের রচনায় এই বাস্তবরস রোমান্সে রূপান্ততরিত হয় নাই, উচ্ছ আদশে্র ( idealisation ) কৃত্রিম প্রণালীতে সঞ্চারিত হইয়া ইহার স্রোতোবেগ মন্দীভূত হয় নাই, বিশ্লেষণের দ্বারা ইহা ক্ষুণ্ণ ও প্রতিহত হয় নাই | ইহা আপনার আদিম ও স্বাভাবিক উচ্ছ্বাসে