Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা- ১৯, ২০ ও ২১

2020-05-26
শতসহস্র ধারায় বহিয়া চলিয়াছে, আপনাকে শোধিত, সংস্কৃত ও উচ্ছতর আটে্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত করিবার কোনো চেষ্টাই করে নাই |অবশ্য ইহা যে একটি অবিমিশ্র গুণ তাহা বলিতেছি না,কিন্তু এই বাস্তব-প্রবণতা বঙ্গগসাহিত্যে এতই দুল্যভ সামগ্রী যে, ইহা স্বতই আমাদের বিষ্ময় ও প্রশংসা আকষ্যণ করে |
     নূতন ও পুরাতনের যে বিরোধের চিত্র সমসাময়িক উপন্যাসে প্রতিফলিত হইয়াছে, সেই বিরোধের আলোচনার প্যারীচাঁদ মিত্র আশ্চয্য অপক্ষপাত বিচারবুদ্ধি দেখাইয়াছেন | নব্যযুগের নূতন সভ্যতার প্রতি তিনি যথেষ্ট সুবিচার করিয়াছেন; তাঁহার সমসাময়িক অন্যান্য ঔপন্যাসিকের ন্যায় ইহাকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্বেষ ও সন্দেহের চক্ষে দেখেন নাই | সেইরূপ পুরাতন প্রথা ও আচার-ব্যবহারের মধ্যে যাহা-কিছু শোভন, সুযুক্তিপূণ্য ও গ্রহণীয় তাহাকেও তিনি বিশেষ উৎসাহের সহিতই বরণ করিয়া লইয়াছেন | আবার ইংরাজি শিক্ষার প্রবল বন্যায় মদ্যপান, নাস্তিকতা, গুরুজনে অভিক্তি প্রভৃতি যে সমস্ত আবজ্নারাশি ও পঙ্কিলতা আমাদের সমাজে প্রবেশ করিতেছিল, তাহাদের উপরেও তিনি বিশেষ সতক্য দৃষ্টি রাখিয়াছিলেন | কিন্তু তিনি সব্যাপেক্ষা বেশি খড়গহস্ত ছিলেন পুরাতন দলের ভন্ডামি ও সংকীণ্যতার উপর---ইহাদিগকেই তিনি সব্যাপেক্ষা অমাজ্যনীয় অপরাধ মনে করিতেন, এবং ইহাদেরই উপর তাঁহার তীক্ষ্ণতম বিদ্রূপাস্ত্র বষি্ত হইয়াছে | হিন্দুজাতির সনাতন নীতিঙ্গান তাঁহার মধ্যে যথেষ্ট প্রবল ছিল, এবং সময়ে সময়ে তাহা একটু অশোভন তীব্রতার সহিতই আত্মপ্রকাশ করিত | তাঁহার 'আলালের ঘরের দুলাল' ও অন্যান্য খন্ড-উপন্যাসে এই নীতিঙ্গান, এই ধম্য ও সুরুচির পক্ষপাতিত্ব, কলাকুশলতার দিক হইতে সমথ্নযোগ্য না হইলেও, ধম্যভাবের দিক হইতে বিশেষ প্রশংসনীয় | অবশ্য এই নীতিঞ্জানপূণ্য মন্তব্যসমূহ যে উপন্যাসের উৎকষ্য বধ্যন করে তাহা নহে, তবে তাহারা লেখকের ধম্যপ্রবণ ও তত্ত্বান্বেষী চিত্তের একটি সম্পূণ্ চিত্র প্রদান করে |
     সুতরাং 'আলালের ঘরের দুলাল' -এ আমরা লেখকের মনশীলতার পরিচয় পাই ---ইংরেজি সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতি ন্যায়নিষ্ঠ, অপক্ষপাত মনোভাবে, ইহার কুফলের প্রতি অন্ধ না হইয়া ইহার সুফলের প্রতি সচেতনতায়, লেখকের সমন্বয়কারী, চিন্তাশীল দৃষ্টি-ভঙ্গিতে | রামলাল ও বরদাবাবু এই নূতন শিক্ষা-পদ্ধতির শ্লাঘ্যতম ফল; তাহাদের উদার ক্ষামাশীলতা পরদুঃখকাতরতা ও উন্নত নৈতিক আদশ্য অবশ্য সনাতন ধম্যসংস্কৃতির বিরোধী নহে; তথাপি এই সমস্ত সদগুণ ও সুকুমার বৃত্তি, যে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবে সমাজে শিথিলতা ও উচ্ছৃঙ্খলতার প্রচুরতর সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি হইতেছিল, তাহার সহিতই প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট |
     এতদব্যতীত প্যারীচাঁদ মিত্র ভাষা-সংস্কারের মধ্যে দিয়াও নিজ তীক্ষ্ণ মননশক্তি ও স্বাধীনচিত্ততার পরিচয় দিয়াছেন| বিদ্যাসাগর ও অক্ষয়কুমার দত্তের সংস্কৃতবহুল গুরুগম্ভীর ভাষার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াস্বরূপ সরল ও সতেজ কথ্যভাষা সাহিত্যে প্রথম প্রবত্যনের কৃতিত্ব তাঁহারই | উপন্যাস-রচনার জন্য যত মাইল দীর্ঘটা না হউক, ভাষা-সংস্কার-প্রচেষ্টার জন্যই বিশেষভাবে তিনি বঙ্গসাহিত্যের ইতিহাসে স্মরণীয়তা অজ্ন করিয়াছেন | বিষয়ের উপযোগিতা অনুসারে এই কথ্যভাষায় মাত্রাভেদ ও তারতম্য নিধ্যারণ করিবার মতো সচেতন মন তাঁহার ছিল |
     উপন্যাস-হিসাবে 'আলালের ঘরের দুলাল' প্রথম পূণ্যাবয়ব উপন্যাস এবং বাস্তবরসে বিশেষ সমৃদ্ধ ও পরিপুষ্ট সন্দেহ নাই; কিন্তু ইহাকে খুব উচ্ছ শ্রেণীর উপন্যাসের মধ্যে স্থান দিতে পারা যায় না | কেবল বাস্তব চিত্রাঙ্কন, বা জীবন-পয্যবেক্ষণই উচ্ছ অঙ্গের উপন্যাসের একমাত্র গুণ নহে | বাস্তব উপাদানগুলিকে এরূপভাবে সাজাইতে হইবে, যেন তাহাদের কায্কারণ-পরম্পরার মধ্যে দিয়া জীবনের জটিলতা ও মহত্ত্ব সম্বন্ধে একটা গভীর ও ব্যাপক ধারণা পাঠকের সম্মুখে ফুটিয়া উঠে, মানব-হৃদয়ের গভীর সনাতন ভাবগুলি যেন তাহাদের মধ্যে দিয়া প্রবাহিত হইয়া অতি তুচ্ছ ও অকিঞ্চিৎকর বাহ্যঘটনার উপরেও একটা অচিন্তিত-পূব্য গৌরব-মুকুট পরাইয়া দিতে পারে | উচ্ছ অঙ্গের উপন্যাসের ইহাই কৃতিত্ব | যে উপন্যাস কেবল বাস্তববণ্যনাতেই পয্যবসিত, যাহা দৈনিক তুচ্ছতার উপর কল্পলোকের রঙিন আলোক ফেলিতে পারে না, যাহা আমাদের সাধারণ জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঐশ্বয্যপূণ্য অনুভুতির নিগূঢ় লীলা দেখাইতে পারে না, তাহার স্থান অপেক্ষাকৃত নীচে | এই কারণে ' আলালের ঘরের দুলাল' প্রথম শ্রেণীর উপন্যাসের সহিত একাসনে স্থান পাইবার অনুপযুক্ত | আরও একটি কারণ ইহার উৎকষে্র বিরোধী | প্রত্যেক উচ্ছ অঙ্গের উপন্যাসে motive অথবা উপন্যাস-বণি্ত ঘটনার মৌলিক কারণটি সূক্ষ্ম ও গভীর হওয়া চাই; কেবল বাহ্যঘটনার ঘাত-পতিঘাতে উচ্ছ অঙ্গের উপন্যাস সৃষ্ট হইতে পারে না | যে কারণে Goldsmith-এর 'Vicar of Wakefield' প্রথম শ্রেণীর উপন্যাস বলিয়া বিবেচিত হইতে পারে না ---কেননা ইহা একটি অচল, অটল ধম্যপরায়ণতার প্রতিমূতি্র বিরুদ্ধে বাহ্য বিপদরাশির নিষ্ফল আক্রমন মাত্র ---সে কারণেই ' আলালের ঘরের দুলাল' উপন্যাস-জগতে খুব উচ্ছ আসন অধিকার করিতে পারে না | ইহাতে যে সংঘাটিত ফুটিয়া উঠিয়াছে তাহা বাহিরের জিনিস---অন্তজ্গতের গভীরতর সংঘাতের কোনো চিহ্ন ইহাতে পাওয়া যায় না | কুসঙ্গের জন্য আদুরে ছেলর পদস্খলন, এবং বিপদের ও সৎসঙ্গের ফলে তাহার নৈতিক পুনরুদ্ধার ইহার বণ্যনীয় বস্তু, ইহাতে অন্তবিপ্লবের কোনো পরিচয় দিবার সুযোগ নাই | মতিলালের অনুশোচনা ও সংশোধন বহিঘ্টনার চাপে, অন্তরের প্রেরণায় নহে | পরবতী্ যুগে বঙ্কিমচন্দ্রের 'সীতারাম' বা 'গোবিন্দলাল ' -এর চরিত্রে যে অন্তবিপ্লবের চিত্র অঙ্কিত হইয়াছে এখানে তাহার আভাস মাত্র নাই | সুতরাং 'আলালের ঘরের দুলাল' বাংলা উপন্যাসের পথ-প্রদশক মাত্র, ইহার শ্রেষ্ঠতম বিকাশ হইবার স্পধা্ রাখে না | 'নববাবু-বিলাস' হইতে মাত্র ৩৫ বৎসরের ব্যবধানে ' আলালের ঘরের দুলাল' --এ প্রথম

সম্পূণা্বয়ব উপন্যাসের বিবত্যন বহুদিনের প্রত্যাশিত সম্ভাবনাকে সাথ্ক রূপ দিয়াছে | 'আলালের ঘরের দুলাল' উপন্যাস-সাহিত্যের কৈশোোর-যৌবনের সন্ধিস্থলে দাঁডা়ইয়া প্রথম অনিশ্চয়াত্মক যুগের অবসান ও আসন্ন পূণ্যপরিণতির ঘোষণা করে | ইহার মাত্র ৮ বৎসর পরে বঙ্কিমচন্দ্রের 'দুগে্শনন্দিনী' হইতে উপন্যাসের মহিমান্বিত, প্রাণশক্তিতে উজ্জ্বল যৌবনের আরম্ভ |
( ৫ )

'আলালের ঘরের দুলাল' -এ ইংরেজি শিক্ষা ও সভ্যতার প্রভাবের যে স্তর চিত্রিত হইয়াছে তাহা অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ পাদ হইতে ঊনবিংশের প্রথম পাদ (১৭৭৫-১৮২৫ ) ---এই অধ্শতাব্দীর সত্য প্রতিচ্ছবি | প্যারীচাঁদ মিত্রের নিজের যুগে এই প্রভাব সমাজ-জীবনে অরও ব্যাপক, বদ্ধমূল ও সূক্ষ্মভাবে ক্রিয়াশীল হইয়াছিল | বঙ্কিমচন্দ্র ও রমেশচন্দ্রের আবিভাবে্র অব্যবহিত পূবে্ পাশ্চাত্য নিগূঢ় উন্মাদনা সমাজের মম্যস্থল পয্ন্ত প্রসারিত হইয়া ইহার গভীরতর রূপান্তর-সাধনে ব্যাপৃত ছিল | পরবতী্ যুগের উপন্যাসে সমাজের এই নব-জীবনস্পন্দন, এই নবীন আদশে্র অনুপ্রেরণা সাহিত্যিক প্রতিভার উদবোধন করিয়াছে | ইংরেজি সাহিত্য ও উপন্যাসের সহিত যখন আমাদের পরিচয় ঘনিষ্ঠ হইয়া উঠিল, তখন আমাদের মধ্যে স্বভাবতই অনুকরণস্পৃহা প্রবল হইল ও আমাদের নিজের সমাজ ও পরিবারের মধ্যে উপন্যাসের উপযোগী উপাদান আমরা খুঁজিয়া বেডা়ইতে লাগিলাম | তখন সমাজের প্রতি দৃষ্টিপাত করিলে যাহা আমাদের দৃষ্টি সবা্পেক্ষা বেশি আকষ্যণ করিল, তাহা ইংরেজি সভ্যতার সহিত সংস্পশ্য-জনিত আমাদের সমাজ ও পরিবারের মধ্যে একটা তুমুল বিক্ষোভ ও আন্দোলন | এই বিক্ষোভ ও আন্দোলনই আমাদের নব-উপন্যাস-সাহিত্যের প্রথম এবং প্রধান উপাদান হইয়া দাঁডা়ইল | ইংরেজি সভ্যতার তীব্র মদিরা তখন নব্য-বঙ্গ-সমাজে একটা উৎকট উন্মাদনা জাগাইয়া তুলিয়াছে; লাবাঙালি যেন দীঘ্যকালব্যাপী জড়তা ও অবসাদের পর একটা নূতন জীবনস্পন্দন অনুভব করিয়াছে, ও একটা নূতন আদশে্র সন্ধান পাইয়া দিগবিদিগগ্যানশূন্য হইয়া তদভিমুখে ধাবিত হইয়াছে | সনাতন বন্ধনসকল শিথিল হইয়া পড়িয়াছে; পুরাতন নৈতিক ও সামাজিক বিধিনিষেধগুলি তাহাদের পূব্যপ্রভাব হারাইয়াছে | পরিবারে পরিবারে একদিকে বিদ্রোহের উৎকট অভিব্যক্তি, অন্যদিকে গুরুজন-অভিভাবকদের মধ্যে একটা বিস্ময়বিমূঢ়, হতবুদ্ধি ভাব; যেন পুরাণধম্যশাস্ত্রবণি্ত, অনাচারময় ম্লেচ্ছযুগ আসিয়া পড়িয়াছে, যেন তাঁহাদের সম্মুখে নরকের দ্বার সহসা উদ্ঘাটিত হইয়াছে | বিষ্ময়ের প্রথম মোহ কাটিয়া গেলে বয়স্কদের এই হতবুদ্ধি, কিংকত্যব্যবিমূঢ় ভাব একটা বিজাতীয় ঘৃণা ও বিদ্বেষে রূপান্তরিত হইল; এবং তরুণ বিদ্রোহীদের দাঢ্য্ ও অহংকার প্রাচীনদের এই বিদ্বেষ ও বদ্ধমূল কুসংস্কারের পাষাণপ্রাচীরে প্রতিহত হইয়া ঘরে ঘরে একটা তুমুল অশান্তি ও খন্ডবিপ্লব জাগাইয়া তুলিল | আমাদের বঙ্গসাহিত্যে যখন উপন্যাসের প্রথম আবিভা্বের সূচনা হইল, তখন সমাজ ভাবী ঔপন্যাসিকের সম্নুখে এই বিদ্রোহ ও বিপ্লবের চিত্রখানি তুলিয়া ধরিল, ---এবং আমাদের প্রথম যুগের উপন্যাসগুলি এই বিক্ষোভকেই নিজ বণ্যনার বিষয় করিয়া লইয়াছে |
     অবশ্য ইহা সত্য নহে যে, এই বিদ্রোহের উন্মাদনা ও আবেগ আমাদের প্রথম যুগের উপন্যাস-সাহিত্যে প্রতিফলিত হইয়াছে | যাহারা বিদ্রোহের পতাকা লইয়া সমাজ ও পরিবারের বন্ধন কাটিয়া বাহির হইয়াছিল, বঙ্গসাহিত্যের চচা্ করা বা নিজেদের অভিঙ্গতার বিষয় লইয়া উপন্যাস লেখা তাহাদের কল্পনাতেও আসে নাই | এই বিদ্রোহী তরুণদলের মধ্যে দুই--একজন ভবিষ্যৎ জীবনে দুঃখ-দারিদ্র্যের মধ্যে সাহিত্য-সেবাকে বরণ করিয়া লইয়াছিলেন বটে | মাইকেল মধূসুদন দত্ত বোধ হয় অনুকূল-দৈবপ্রেরিত হইয়াই তাঁহার সমস্ত বিজাতীয় আচার-ব্যবহারের মধ্যে তাঁহার মনঃকোকনদে দেশীয় সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ-মধু গোপনে সঞ্চয় করিতেছিলেন | রাজনারায়ণ বসুর ন্যায় কেহ কেহ বা পরিণত বয়সে আত্মজীবনকাহিনী লিখিয়া তাঁহাদের তরুণ-জীবনের উচ্ছৃঙ্খলতার প্রতি একটা স্নেহ-বিদ্রূপ-মন্ডিত কটাক্ষপাত করিয়াছিলেন | কিন্তু তাঁহাদের এই প্রবল ভাবাবেগ উপন্যাসে প্রতিফলিত করার কথা শিবনাথ শাস্ত্রীর পূবে্ কাহারও মনে হয় নাই | পক্ষান্তরে অভিভাবক-গুরুজনেরাও বিপথগামীদের সুমতির জন্য দেবতার দ্বারে মাথা ঠুকিয়া শান্তি-স্বস্ত্যয়ন করিয়াই নিশ্চিন্ত ছিলেন | তাঁহাদের মনের গভীর বেদনাকে উপন্যাসের মধ্যে অভিব্যক্ত করার কথা তাঁহারা ভাবিয়াছিলেন বলিয়া মনে হয় না |
     কিন্তু যুধ্যমান উভয়পক্ষের ঔদাসীন্য সত্ত্বেও এই বিরোধের কাহিনী ধীরে ধীরে উপন্যাসের বণ্যনীয় বস্তু হইয়া উঠিতেছিল | বিরোধের প্রথম উগ্রতা কাটিয়া গেলে, বাংলার ঔপন্যাসিকেরা ইহার উপন্যাসের বিষয়বস্তু হইবার উপযোগিতা ক্রমশ স্পষ্টরভাবে আবিষ্কার করিতে লাগিলেন | আমাদের একান্ত বৈচিত্র্যহীন ও বিধিবদ্ধ জীবনযাত্রার মধ্যে, নীরস দৈনন্দিন কাযে্র ঘন-সন্নিবেশের অবসরে যে-কোনো প্রকারের সতেজ জীবনস্পপন্দন, কোনো গভীর ভাবের গোপন প্রবাহ ধারা যাইতে পারে, ইহা আমাদের প্রথম যুগের ঔপন্যাসিকদের অঙ্গাত ছিল | কাজেই তাঁহারা আমাদের জীবনের মধ্যে একটা বাহ্য-ঘটনাবৈচিত্র্যের জন্য একেবারে উন্মুখ হইয়া ছিলেন | অন্তজগতে বাহ্যঘটনার একান্ত অভাবের মধ্যেও যে একটা নীরব ঘাত-প্রতিঘাত চলিতে পারে, একটা গভীর ভাবগত আলোড়নের সম্ভাবনা আছে, তাহা এই বত্যমান সময়ে মাত্র আমাদের কাছে স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে | সুতরাং ইংরেজি শিক্ষা ও সভ্যতার সংস্পশ্য আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে যে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা আনয়ন করিল, তাহা আমাদের জীবনের ঘটনাবৈচিত্র্যের অভাব কথঞ্চিৎ পূরণ করিয়া সহজেই ঔপন্যাসিকের দৃষ্টি আকষ্যণ করিল | বিশেষত, এই ইংরেজি শিক্ষা, যাহাদিগকে প্রকাশ্য বিদ্রোহে উত্তেজিত করিতে পারে নাই, তাহাদের মধ্যেও পারিবারিক বৈষম্য গভীরতর করিয়া তুলিয়া তাহাদের জীবনেও একটা বৈচিত্র্য ও জীটিলতার সঞ্চার করিয়াছিল | আমাদের দেশে পূবে্ সকল পরিবারেই যে রাম-লক্ষ্মণের আদশ্য সম্পূণ্যরূপে অনুসৃত হইত, বা একটা সাব্যজনীন সৌভ্রাত্র বিরাজিত ছিল, তাহা নহে; তবে আদশ্য ও জীবনযাত্রাপ্রণালীর ঐক্যের জন্য ভ্রাতৃবিরোধ তত প্রবল হইয়া ফুটিয়া উঠিতে

পারিত না | কিন্তু নূতন সভ্যতার প্রবত্যনের পরে পরিবারের মধ্যে অবস্থা-বৈষম্য বিশেষভাবে প্রকট হইয়া পারিবারিক বিচ্ছেদের পথ প্রশস্ত করিতে লাগিল | সেইজন্যও এই সমস্ত পারিবারিক বিচ্ছেদের কাহিনী বিশেষভাবে উপন্যাসের পৃষ্ঠাগুলি অধিকার করিতে লাগিল |
     আরও একটা কারণে এই সমস্ত বিষয় উপন্যাসের অঙ্গীভূত হইল | যে বিদ্রোহী দল প্রথম যৌবনের উন্মাদনায় সমাজ ও পরিবারের বন্ধন অস্বীকার করিয়াছিল, তাহারা অধিকাংশ স্থলেই সমাজের সন্মিলিত শক্তির বিরুদ্ধে শেষ পয্ন্ত যুদ্ধ চালাইতে পারে নাই | প্রথম উচ্ছ্বাসের মুখে সামাজিক ও পারিবারিক যে সমস্ত দাবি তাহারা উপেক্ষা করিয়াছিল, পরবতী্ অবসাদের সময়ে সেই সমস্ত দাবি প্রবলতরভাবে প্রত্যাবত্যন করিয়া তাহাদিগকে অভিভূত করিয়া ফেলিয়াছিল | সুতরাং এই স্বাধীনতা-প্রয়াসীরা হয় নিষ্ফল ক্ষোভে জীবন শেষ করিতে বাধ্য হইয়াছিল, অথবা সমাজের সহিত একটা আপস-সন্ধি করিয়া ঘরের ছেলে ঘরে ফিরিয়াছিল | এই প্রত্যাবত্যনের দৃশ্য, আমাদের হৃদয়ের মধ্যে মনু-পরাশয়ের দিন হইতে যে নীতিবিদ্ পুরুষটি জাগ্রত আছেন তাঁহার পক্ষে, আমাদের শাশ্বত, অতেন্দ্র নীতিঙ্গানের পক্ষে পরম তৃপ্তিকর হইয়াছিল | এই অনাচারীদের পরাজয়ে আমাদের ঔপন্যাসিকেরা সনাতন নীতি-লঙ্ঘনের অবশ্যম্ভাবী শাস্তি, পাপের অনিবায্য প্রায়শ্চিত্তই দেখিয়াছিলেন; সুতরাং তাঁহাদের নৈতিকঙ্গানের দিক দিয়াও এই বিরোধের চত্র বিশেষ আদরণীয় বোধ হইয়াছিল, সন্দেহ নাই| আমাদের বত্যমান উপন্যাসের মধ্যেও ইংরেজি সভ্যতার সম্পক্য-জনিত এই পারিবারিক বিপয্য়ের চিত্র একটা প্রধান স্থান অধিকার করিতেছে; 'স্বণ্যলতা' র সময় হইতে কিছুকাল পূব্য পয্ন্ত এই ধারা আমাদের উপন্যাস-ক্ষেত্রে সমান প্রবলভাবে প্রবাহিত হইয়াছে, এবং একেবারে সাম্প্রতিক কালে একান্নবতী্ পরিবার-জীবনের প্রায় সম্পূণ্য উৎসাদনের ফলে পারিবারিক বিরোধমূলক উপন্যাসের ধারা বিলুপ্তপ্রায় হইয়া আসিয়াছে |