Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা- ১৯০, ১৯১ ও ১৯২

2021-01-07
প্রাণকেন্দ্র সংসারযন্ত্রের বৃথা চক্রাবর্তনে বিন্দুমাত্র প্রভাবিত হয় নাই। লোকমোহন তাহার একজিদে প্রকৃতি ও অটল সংকল্পের জন‍্য তাহার উদ্ভট অসাধারণত্ব সত্ত্বেও প্রাণবন্ত হইয়াছে। সে শ্রাবণীর উপর তাহার ব্রজকঠিন ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করিতে গিয়া শেষ পর্যন্ত উহার শ্রেষ্ঠতর মনোবল ও নীতিনিষ্ঠার নিকট পরাজয় স্বীকার করিয়াছে। শ্রাবণী চরিত্রও খুব গভীরভাবে পরিকল্পিত না হইলেও মোটামুটি তাহার স্বাতন্ত্রের জন‍্য স্মরণীয় হইয়াছে।
     আশাপূর্ণা দেবীর পারিবারিক উপন‍্যাসের মধ‍্যে 'আংশিক' ও 'ছাড়পত্র' 'উন্মোচন' - এর সহিত শ্রেষ্ঠ স্থান অধিকার করে। 'আংশিক'-এ সংসার-জীবনের নাগপাশে আষ্টেপৃষ্ঠে বদ্ধ সত্তার পূর্ণবিকাশের জন‍্য একান্তভাবে আগ্রহশীল, মুক্তিকামী নারীর খাঁচার লৌহশলাকার বিরুদ্ধে রক্তাক্ত সংগ্রাম ও উহাতে আংশিক বিজয়ের ইতিহাস লিপিবদ্ধ হইয়াছে। যেমন, গলস্ওয়ার্দির ফরসাইট পরিবারের ইতিহাসে প্রতিটি ব‍্যক্তির ব‍্যক্তিপরিচয়ের অতিরিক্ত একটা সাংকেতিক সত্তা ব‍্যঞ্জিত হইয়াছে, এখানেও তেমনি ক্ষুদ্রতর পরিধিতে সুবর্ণলতার আমৃত‍্যু সংগ্রামে একটি ব‍্যক্তিনিরপেক্ষ সাংকেতিক তাৎপর্যমহিমা আভাসিত। লেখিকার সমস্ত রচনার মধ‍্যে যে পুঞ্জীভূত তথ‍্য-সন্নিবেশ হইয়াছে, যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আঘাত-সংঘাত শ্বাসরোধী ধূম্রজাল বিকীর্ণ করিয়াছে তাহা এই উপন‍্যাসে একটি কেন্দ্রসংহত ব‍্যঞ্জনায়, মানবাত্মার এক সার্বভৌম প্রকাশে দীপ্ত হইয়া উঠিয়াছে। সংসার-পিঞ্জরে আবদ্ধ নারী-বিহঙ্গীর সন্ত্রস্ত অশান্ত ডানার ঝটপটানি, সমস্ত রক্তস্রাবী মুক্তিব‍্যকুলতা সুবর্ণলতার ক্ষুদ্র, ঘটনা-বিরল জীবনে যেন একটি অধ‍্যাত্ম সাধনার মহিমা অর্জন করিয়াছে। পটভূমিকা-বিন‍্যাস চিরপ্রথাগত ধারারই অনুবর্তন করিয়াছে। সেই একই যান্ত্রিক মূঢ়তায় নির্মম গৃহকর্ত্রী মুক্তকেশী, সেই মাতার অতিবাধ‍্য সুবোধ ছয় সহোদর, সেই পাঁচ বধূর অন্তঃসলিলা ফল্গুর ন‍্যায় গোপন ঈর্ষা ও হিংসাপ্রবাহ, ছেলেপিলের সেই স্থূল, বিরক্তিকর জনতা। এই পরিচিত পরিবেশে অগ্নিগর্ভ আগ্নেয়গিরির ন‍্যায় রুদ্ধ রোষে কম্পিত, অন্ধ আবেগে দুর্বোধ‍্য, অবিচলিত সংকল্পে সমস্ত পৃথিবীর বিরোধিতার সম্মুখীন সুবর্ণলতা শুধু কলিকাতার মধ‍্যবিত্ত পরিবারের এক অখ‍্যাত গৃহস্থবধূ নহে, সে এক শাশ্বত মানব-আকৃতির প্রতিনিধি। তাহার প্রতি অঙ্গভঙ্গিতে দৃপ্ত স্বাতন্ত‍্যবোধ ক্ষরিত, প্রতিবাক‍্যে বিদ্রোহের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বিকীর্ণ। শাশুড়ি, স্বামী, ভাশুর, মাতা-পিতা যাহারই নিকট হইতে নিজ সত্তার স্বচ্ছন্দবিকাশবিরোধী, আত্মমর্যাদাহানিকর কোনো আচরণ আসিয়াছে তাহারই বিরুদ্ধে সে আপসহীন সংগ্রাম চালাইয়াছে। সে সমস্ত সেকেলে প্রথাকে লঙঘন করিয়া বই পড়িয়াছে, এমন কি আত্মজীবনীও লিখিয়াছে। দর্জিপাড়ার সংকীর্ণ, নিরানন্দ গলিতে, যৌথ পরিবারের লৌহ নিয়মের পেষণের মধ‍্যে, প্রচলিত সামাজিক প্রথার মূঢ়তার বিরুদ্ধে তাহার মুক্তিসাধনায় একাগ্র আত্মা আপনার অদম‍্য প্রাণশক্তিকে আরও তেজস্ক্রিয় করিয়াছে।