Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা- ২২, ২৩ ও ২৪

2020-05-26


তৃতীয় অধ্যায়

প্রথম যুগের ঐতিহাসিক উপন্যাস


( ১ )

পূব্য অধ্যায়ে বলা হইয়াছে যে, 'আলালের ঘরের দুলাল' ও পরবতী্ স্তরের উপন্যাসের ( বঙ্কিম ও রমেশচন্দ্রের ) মধ্যে একটা প্রকান্ড ব্যবধ্যান | কালহিসাবে প্যারীচাঁদ, বঙ্কিম ও রমেশচন্দ্রের প্রায় সমসাময়িক | তাঁহার 'আধ্যাত্মিকা' (১৮৮০ খৃষ্টাব্দে ) রমেশচন্দ্রের 'বঙ্গ- বিজেতা ' ( ১৮৭৫ ), 'জীবন-প্রভাত' ( ১৮৭৮ ) ও 'জীবন-সন্ধ্যা' (১৮৭৯ ) , এবং বঙ্কিমচন্দ্রের 'চন্দ্রশেখর' ( ১৮৭৫ ), 'কমলাকান্তের দপ্তর' ( ১৮৭৬ ), 'ইন্দিরা', 'যুগলাঙ্গুরীয়' , 'রাধারাণী' (১৮৭৭ ) ও 'কৃষ্ণকান্তের উইল' ( ১৮৭৮ ) , প্রভৃতির পরে--প্রকাশিত হয় | সুতরাং দেখা যাইতেছে যে, উপন্যাসের পুরাতন ও নূতন আদশ্ উভয়ই একসঙ্গে বত্যমান ছিল ; সময়ের দিক দিয়া ইহাদের মধ্যে বিশেষ ব্যবধান ছিল না | উপন্যাস-সাহিত্যে উচ্ছতর আদশে্র এই অতকি্ত আবিভা্ব সাহিত্যের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় ঘটনা | সুতরাং এই পরিবত্যনের গভীরতা ও প্রকৃত রূপটি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য |
     এই নূতন উপন্যাসে আমরা প্রধানত দুইটি পরিবত্যন লক্ষ্য করি : ১. উচ্ছাঙ্গের ঐতিহাসিক উপন্যাসের প্রথম সূচনা ও পরিণতি; ২. বাস্তবতা-প্রধান সামাজিক ও পারিবারিক উপন্যাসের মধ্যে এক নূতন গভীরতা ও ভাবসমৃদ্ধির সঞ্চার | যেমন একবিন্দু শিশিরে বিশাল সূযে্র পরিধি প্রতিবিম্বিত হয়, সেইরূপ আমাদের তুচ্ছ দৈনন্দিন জীবনের মধ্যে গভীর ভাবের ঘাত-প্রতিঘাতের দ্বারা মানব-জীবনের বিপুলতা ও বৈচিত্র্য প্রতিফলিত হইয়াছে | আমরা 'আলালের ঘরের দুলাল' -এর আলোচনার সময়ে, ইহার সমস্ত গুণ ও সাধারণ ধম্যনীতির প্রাদুভাব দেখা যায়; জীবনের আবেগ ও উচ্ছাস, ইহার বিশালতা ও রহস্যময়তার কোনো পরিচয় পাওয়া যায় না | 'আলালের ঘরের দুলাল' পড়িয়া আমরা জীবন-সমস্যর জটিলতা, জীবনের ভাব-সমৃদ্ধি ও উদারতা সন্বন্ধে কোনো ধারণা করিতে পারি না | ইহাতে কতকগুলি বাস্তব চরিত্রের, কতকগুলি রক্ত-মাংসের মানুষের সমাবেশ হইয়াছে সত্য; কিন্তু এই সমাবেশের দ্বারা লেখক জীবন সন্বন্ধে কোনো বৃহৎ, ব্যাপক সত্য ফুটাইয়া তুলিতে পারেন নাই | নূতন যুগের শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলিতে এই অভাব বিশেষভাবে পূণ্ হইয়াছে |
     ঐতিহাসিক উপন্যাসের প্রথম আবিভা্ব ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের 'ঐতিহাসিক উপন্যাস' (১৮৫৭ ) দ্বারা নিশ্চিতভাবে সূচিত হইয়াছে | 'ঐতিহাসিক উপন্যাস' -এর মধ্যে 'সফল স্বপ্ন' ও 'অঙ্গুরীয়-বিনিময়' এই দুইটি আখ্যান সন্নিবিষ্ট | উহাদের মধ্যে দ্বিতীয়টি ঐতিহাসিক উপন্যাস-জাতীয় রচনার সাধারণ আঙ্গিক ও মূল সুর প্রবত্যনের কৃতিত্বের অধিকারী তাহা বিঃসন্দেহে দাবি করা যাইতে পারে |
     'অঙ্গুরীয়-বিনিময়' -এ ঐতিহাসিক চরিত্রসমূহকে কিছুটা কাল্পনিক ও কিছুটা ঐতিহাসিক আবেষ্টনে বিন্যস্ত করিয়া তাহাদের ইতিহাসের অঙ্গাত মানস ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও চমকপ্রদ ঘটনা-পরিণতি দেখানো হইয়াছে | শিবজী, আরংজেব, শাহজাহান, রোসিনারা, জয়সিংহ, রামদাস স্বামী ইহারা সকলেই ইতিহাস-প্রসিদ্ধ চরিত্র; এবং উপন্যাসে বণি্ত তাহাদের পারস্পরিক সম্পক্ও সাধারণভাবে সত্যানুগামী | কিন্তু এই সাধারণ সত্য কাঠামোর ফাঁকে ফাঁকে এমনভাবে কিছু কাল্পনিক বিষয়ের অবতারণা করা হইয়াছে যাহাতে ইতিহাসের সত্যনিষ্ঠা ও কল্পনারসের সিদ্ধি যুগপৎ সম্পাদিত হইয়াছে | আরংজেব দাক্ষিণাত্য আক্রমণ করিয়াছিলেন ও এই অভিযানে শিবজীর সহিত তাঁহার সংঘষ্য বাধিয়াছিল ইহা সত্য ঘটনা | শিবজীর রণনীতি, তাঁহার সন্ধি-বিগ্রহের পিছনে কোনো নীতিগত আদশে্র পরিবত্যে আত্মশক্তিবৃদ্ধির একনিষ্ঠ প্রেরণা, জয়সিংহের নিকট তাঁহার সাময়িক পরাভব , দিল্লীশ্বরের বশ্যতা স্বীকার ও দিল্লীতে আরংজেবের কপট ব্যবহারে তাঁহার আনুগত্য-বজ্যন--এ সমস্তই ইতিহাস-সমথি্ত যথাথ্য ব্যাপার | কিন্তু গ্রহের কেন্দ্রস্থ আকষ্যণ --রোসিনারার গিরিসংকটে অপহরণ, শিবজী-রোসিনারার প্রণয়সঞ্চার, দিল্লীতে বন্দি অবস্থায় অবস্থান-কালে শিবজীর তাঁহার নিকট বিবাহ-প্রস্তাব ও রোসিনারার মহৎ আত্মবিসজ্যনের প্রেরণায় এই প্রেমের প্রত্যাখ্যান---এই সমস্ত আবেগপ্রবণ ও গৌরবময় দৃশ্য লেখকের কল্পনা-উদ্ভাবিত | ঐতিহাসিক প্রতিবেশ সৃষ্টি ও চরিত্র-চিত্রণ এবং গাহ্স্থ্য-জীবনের তথ্যবন্ধন-মুক্ত অথচ ভাবসত্য-নিয়মিত, রসসিক্ত ও মানবিক-আবেদন-সমৃদ্ধ, সংযোজক ঘটনাবলীর সুষ্ঠু বিন্যাস ও সমন্বয়েই ঐতিহাসিক উপন্যাসের সাথ্যকতা |
     ভূদেব ঐতিহাসিক উপন্যাসের এই প্রাণরহস্যটি নিজ সহজ ঔচিত্যবোধ ও ইতিহাস-ঞ্জানের সাহায্যেই আয়ত্ত করিয়াছিলেন |
মহারাষ্টীয় সৈন্য-বিন্যাস-পদ্ধতি, পাব্যত্যযুদ্ধ-পরিচালনা, শিবজীর শাসন-ব্যবস্থা, আরংজেবের কূটনীতি, জয়সিংহের প্রতি তাঁহার বিষ-প্রয়োগের নিদে্শ, ও তাঁহার পুত্রের নিকট কপট পত্রপ্রেরণ প্রভৃতির ইতিহাস-তথ্য তিনি যথাথ্যভাবেই অনুধাবন করিয়াছেন | কিন্তু এই ইতিহাস-তথ্য-পরিবেশনের শিথিল গ্রন্থনের মধ্যে তিনি যে মানব-চরিত্র-গ্যান ও জীবনসত্যের দৃঢ়তর গ্রন্থি সংযোজনা করিয়া আকষ্মিক ঘটনাকে মনস্তত্ত্বের নিয়ম-শৃঙ্খলার অধীন করিয়াছেন ইহাতেই তাঁহার কৃতিত্ব ও মৌলিকতা | শিবজীর চরিত্র, সৈনিকদের মধ্যে তাঁহার পুরস্কার-বিতরণের নীতি, জাতির অভ্যুদয়কালে দেশদ্রোহীর মধ্যেও দেশাত্মবোধ ও চরিত্র-মহিমার লুপ্তাবশেষের অস্তিত্ব, স্ত্রীজাতির নৈসগি্ক সেবাপরায়ণতা ও আতে্র প্রতি মমতাবোধ অপরাধী সেনাটিকে রাজদন্ডে দন্ডিত না করিয়া তাহার সহিত দ্বৈরথ যুদ্ধে রত হওয়ার মধ্যে শিবজীর নিগূঢ় অভিপ্রায়, জয়সিংহের প্রতি শিবজীর উদারনৈতিক আবেদন, শাহজাহানের খেদপূণ্য আত্মচিন্তন, আরংজেবের অন্তর-রহস্য-উদঘাটক স্বগতোক্তি---এই সবই তাঁহার মনস্তত্ত্বঙ্গানের পরিচয় |
     ভূদেবের প্রভাব বঙ্কিমচন্দ্রের উপর যতটা হউক বা না হউক, রমেশচন্দ্রের উপর উহা অত্যন্ত সুস্পষ্ট | শিবজীর পাব্যত্য-যুদ্ধ-বণ্যনা ও জয়সিংহের নিকট তাঁহার উচ্ছ্বসিত স্বদেশপ্রেমাত্মক আবেদন রমেশচন্দ্রের 'জীবন-প্রভাত' উপন্যাসটিকে গভীরভাবে, সময় সময় আক্ষরিকভাবেও প্রভাবিত করিয়াছে | যে সরস মন্তব্য ও পাঠকের সরাসরি সম্বোধন বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসে লেখক ও পাঠকের মধ্যে একটি অন্তরঙ্গ সম্বন্ধ-স্থাপনের হেতু হইয়াছে ও পাঠককে এই নূতন ধরনের সাহিত্যের রসগ্রহণে সহায়তা করিয়াছে তাহারও প্রথম সূচনা ভূদেবে দেখা যায় |
     তবে ভূদেবের ঐতিহাসিক উপন্যাসে অনভ্যস্ত রচনার আড়ষ্টতা লেখকের স্বচ্ছন্দ গতির অন্তরায় হইয়াছে | বণ্যনাপ্রথা ও মন্তব্য-যোজনা বহুস্থলেই গুরুভাব গাম্ভীয্ ও নীরস তথ্য-বহুলতার দ্বারা অভিভূত ও মন্থরগতি | বণ্যনায়ও সরসতার অভাব অনুভূত হয় | কোনো দৃশ্যই নাটকীয় তীব্রতা লাভ করিয়া পাঠকের মনে গভীর রেখায় অঙ্কিত হয় নাই | কী বিবৃতি, কী বণ্যনায়, কী ঘটনা-বিন্যাসে সব্যত্রই একটা স্তিমিত কল্পনা, একটা কুন্ঠিত অনুভূতি, একটা তথ্যভার-জজ্যর মানস মন্থরতার ছাপ পড়িয়াছে | ভূদেব এই নূতন সাহিত্যের সমিধ সংগ্রহ করিয়াছেন, যঞ্জশালা নিমা্ণ করিয়াছেন, দুই-এক কণা অগ্নিস্ফুলিঙ্গও নিঃসারিত করিয়াছেন | কিন্তু তাঁহার রচনায় প্রতিভার হোমানলশিখা কোথায়ও পূণ্যতেজে দীপ্ত হইয়া উঠে নাই |
     ক্রমপরিণতির দিক দিয়া বোধ হয় ঐতিহাসিক উপন্যাসই সামাজিক উপন্যাসের পূব্যবতী্ | আমাদের বাস্তব-পয্যবেক্ষণশক্তি উপন্যাস-ক্ষেত্রে সম্পূণ্য বিকশিত হইবার পূবে্ই আমরা ইতিহাসের কল্পনায়, অনেকটা অবাস্তব রাজ্যে স্বচ্ছন্দগতিতে বিচরণ করিতেছিলাম | উপন্যাস-রচনার প্রাথমিক যুগে সামাজিক অপেক্ষা ঐতিহাসিক উপন্যাসই যে অধিকসংখ্যায় রচিত হইয়াছিল, তাহাতে সন্দেহ নাই | এই ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলি সত্য ও কল্পনার, সাধারণ ও অসাধারণের, এমন কি প্রাকৃত ও অপ্রাকৃতের একটি অদ্ভুত সংমিশ্রণ; বাস্তব জীবনের সহিত ইহাদের যোগসূত্র নিতান্ত ক্ষীণ, অদৃশ্যপ্রয় ছিল | উচ্ছাঙ্গের ঐতিহাসিক উপন্যাসের যে আদশ্য, ইহাদের মধ্যে তাহার একান্ত অভাব ছিল | বাস্তবিক, ঐতিহাসিক উপন্যাসের প্রকৃত আদশ্য দুরধিগম্য; ইতিহাসের বিশাল সংঘটনের ছায়াতলে আমাদের ক্ষুদ্র পারিবারিক জীবনের চিত্র আঁকিতে হইবে ; দৈনন্দিন জীবনের ঘটনার সহিত ঐতিহাসিক ঘটনার যোগসূত্রগুলির মধ্যে সম্পকটি সুস্পষ্ট করিয়া তুলিতে হইবে | একদিকে ইতিহাসের বিপুলতা, ঘটনাবৈচিত্র্য ও বণ্য-সম্পদ ক্ষুদ্র প্রাত্যহিক জীবনে প্রতিফলিত করিতে হইবে, অন্যদিকে আমাদের বাস্তব-জীবনের কঠিন নিয়ম-শৃঙ্খল, সত্যের কঠোর বন্ধনের দ্বারা ইতিহাসের অস্পষ্টতা ও অংশত অনুমান-সিদ্ধ কল্পনা-প্রবণতা নিয়ন্ত্রিত করিতে হইবে; এবং সবো্পরি, উভয়ের মধ্যে মিলনটি সম্পূণ্ ও অন্তরঙ্গ করিয়া তুলিতে হইবে---যেন সমস্ত উপন্যাসটির আকাশ-বাতাসের মধ্যে একটা নিগূঢ় ঐক্য আনিতে পারা যায় |
     আমাদের প্রথম যুগের ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলির কুহেলিকাময়, সত্য-কল্পনাজড়িত আকাশ-বাতাসের মধ্যে এই নিগূঢ় ঐক্যের সন্ধান একেবারেই মিলে না | ইহাদের ঐতিহাসিক উপাদানগুলি অত্যন্ত অস্পষ্ট ও অবাস্তব রকমের; ইতিহাস কেবল বাস্তবের কঠিন সত্য হইতে মুক্তিলাভের একটা উপায়স্বরূপ ব্যবহৃত হইয়াছে; কেবল অপ্রাসঙ্গিক বণ্যনা-বাহুল্যের অবসর দিয়াছে মাত্র | ইহারা প্রকৃত ইতিহাসও নয়, প্রকৃত উপন্যাসও নয় | আমাদের দেশে প্রকৃত ইতিহাস-রচনা কোনো কালে ছিল না, অতীত যুগের সম্বন্ধে আমাদের গ্যান নিতান্তই অস্পষ্ট ও অসংলগ্ন | অতীত যুগের মানুষের চিন্তাধারার বৈশিষ্ট্য, আমাদের সঙ্গে তাহার আচার-ব্যবহার, আমোদ-প্রমোদের প্রভেদ, ইত্যাদি বিষয়ে কোনোপ্রকার সুস্পষ্ট ধারণা আমাদের ঐতিহাসিকদেরই নাই, ঔপন্যাসিকদের তো কথাই নাই | অতীতের মানুষ যে আমাদের মতো রক্ত-মাংসের জীব, আমাদের মতো তাহাদেরও আশা-আকাঙক্ষাজড়িত বাস্তব-জীবন ছিল, তাহারা যে কেবল আধ্যাত্মিক তত্ত্বে নিমগ্ন থাকিয়া স্বপ্নময় জীবন অতিবাহিত করিত না, আমাদেরই মতো তাহাদের জীবনে দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও বিরোধী ভাবের আলোড়ন ছিল, তাহা আমরা স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করিতে পারি নাই | সুতরাং অতীতের দিকে যাত্রা আমাদের পক্ষে একটা নিতান্ত স্বপ্নপ্রয়াণ বা অন্ধকারের মধ্যে লম্ফপ্রদানের মতোই হইয়াছে | ইতিহাসের সহিত বাস্তব-জীবনের একটা অন্তরঙ্গ মিলনের সংঘটন করাও ঔপন্যাসিকদিকের কলাকুশলতার অতীত ছিল | সুতরাং সব দিক দিয়াই ভূদেবের রচনা ব্যতীত এই প্রথম যুগের অন্যান্য ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলিকে নিতান্তই ব্যথ্ প্রয়াসের নিদশ্যন বলিয়া ধরিতে হইবে |
( ২ )

এই সমস্ত তথা-কথিত ঐতিহাসিক উপন্যাসের বিষয়-বস্তু কীরূপ ছিল, তাহা জানিবার জন্য আমাদের স্বভাবতই আগ্রহ হইতে পারে | বেঙ্গল লাইব্রেরির গ্রন্থতালিকা অনুসন্ধান করিয়া দেখিতে পাই যে, ১৮৭৫ হইতে ১৮৮২/৮৩ খৃষ্টাব্দ পয্ন্ত এই জাতীয় অনেকগুলি


উপন্যাসের বিবরণ লিপিবদ্ধ হইয়াছে | তাহাদের বিষয়-বস্তুর পযা্লোচনা করিলেই তাহাদের অবাস্তবতা ও অনৈতিহাসিকতার প্রচুর প্রমাণ পাওয়া যাইবে | এই ঐতিহাসিক বিষয় লইয়া কাব্য ও উপন্যাস দুই-ই রচিত হইয়াছে; এবং ইহাদের মধ্যে ভেদ-রেখা নিতান্তই সূক্ষ্ম বলিয়া বোধ হয় | মোট কথা, উপন্যাসের স্বাতন্ত্র্য বা বিশেষত্ব সম্বন্ধে লেখকদের কোনো পরিষ্কার ধারণা ছিল না; ইহা কাব্যেরহ একটা শাখা বলিয়া বিবেচিত হইত, এবং কাব্যসুলভ কল্পনা-প্রবণতা ও অবাস্তবতা উপন্যাসের ক্ষেত্রেও প্রযুক্ত হইত |
     এই শ্রেণীর উপন্যাসের দুই-একটি উদাহরণ দিলেই তাহাদের স্বরূপ বুঝা যাইবে | বিনোদবিহারী গোস্মামী প্রণীত 'পূণ্যশশী' ( ১৮৭৫ ) কাশ্মীরের রাজপুত্রের সহিত উদাসিনী রাজকন্যার বিবাহের আখ্যান | ললিতমোহন ঘোষ প্রণীত 'অচলবাসিনী' ( ১৮৭৫ ) একজন হিন্দু দুগা্ধ্যক্ষের সহিত একটি মুসলমান মহিলার বিবাহ-বণ্যনা | হারাণচন্দ্র রাহা প্রণীত 'রণচন্ডী' ( ১৮৭৬ ) কাছাড়ের ইতিহাস-মূলক গল্প, নবদ্বীপের রাজা কতৃক কাছাড় আক্রমণ ও তৎপরবতী্ ঘটনাসমূহের বিবরণ | 'চন্দ্রকেতু' ( ১৮৭৭ ) কেদারনাথ চক্রবতী্ প্রণীত---ইহার ঐতিহাসিকতা অপেক্ষাকৃত বেশি বলিয়া মনে হয়; যে জাতি তাহার অতীত ইতিহাস সম্বন্ধে অগ্য তাহার উন্নতি অসম্ভব---অধ্যাপক ম্যাক্সমুলারের এই উক্তির উপর ইহা প্রতিষ্ঠিত; ইহার উপাখ্যানভাগ বক্তিয়ার খিলিজি কতৃক বঙ্গবিজয় ও লক্ষণসেনের রাজ্যচ্যুতির পর গোরাচাঁদ নামক একজন ছদ্মবেশী মুসলমান ফকির কতৃ্ক বঙ্গের কিয়দংশের পুনরুদ্ধার | রাখালদাস গাঙ্গুলির 'পাষাণময়ী' ( ১৮৭৯ ) আলিবদী্র রাজত্বকালে বঙ্গে বগী্ আক্রমনের বণ্যনার সহিত মিশ্রিত প্রেম-কাহিনী | আনন্দচন্দ্র মিত্র প্রণীত 'রাজকুমারী' ( ১৮৮০ ) বিক্রমপুরের একজন হিন্দু রাজার সহিত মেঘনা ও ব্রম্ভপুত্রের পূব্তীরবাসী একজন অনায্য রাজার যুদ্ধ-কাহিনী | হেমচন্দ্র বসু প্রণীত 'মিলন-কানন' (১৮৮২ ) সম্রাট জাহাঙ্গীরের একটি প্রেমাভিনয়ের বণ্যনা---জাহাঙ্গীর বুন্দির রাজকন্যার প্রেমপ্রাথী্ ছিলেন; এই রাজকন্যা রাজ্যের প্রধান সেনাপতির প্রতি প্রণয়াসক্তা ছিলেন; অবশেষে নূরজাহানের প্রভাবে জাহাঙ্গীরের বিরতি ও প্রেমিকযুগলের মিলন---ইহাই 'মিলন-কাননের' বণ্যনীয় বস্তু | নীলরতন রায়চৌধুরীর 'যাবনিক পরাক্রম' (১৮৮১ ) পেশোয়ার দেশে হিন্দু-মুসলমান-সম্পকি্ত প্রেমের বিবরণ | তারকনাথ বিশ্বাসের 'সুহাসিনী' ( ১৮৮২ ) মূলত একটি পারিবারিক উপন্যাস | সুহাসিনী ও তাহার সখী নীরজা উভয়েই একটি যুবকের প্রেমাকাঙিক্ষণী; নীরজা যুগকের প্রেমলাভে ব্যথ্-মনোরথ হইয়া সুহাসিনীর সহিত তাহার বিচ্ছেদ ঘটাইতে চেষ্টা করে | কিন্তু এই পারিবারিক উপন্যাসের মধ্যে সিরাজদ্দৌলাকে আনিয়া লেখক ইহাকে একটি ঐতিহাসিক বণ্য দিবার চেষ্টা করিয়াছেন | সিপাহি বিদ্রোহের সময়েরও একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস ঐ গ্রন্থতালিকার মধ্যে খুঁজিয়া পাওয়া যায় |
( ৩ )

এই উপন্যাসগুলি বিশ্লেষণ করিলেই ইহাদের ঐতিহাসিকতার দাবি কতদূর সমথ্যনযোগ্য তাহা জানা যাইবে | ইহাদের কতকগুলি কেবল ইতিহাসের উপাখ্যানের উপরই প্রতিষ্ঠিত, অথা্ৎ ঐতিহাসিক ঘটনার সহিত সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কোনো সংযোগ ইহাদের মধ্যে নাই | ইহারা যুদ্ধ, ধম্যবিরোধ ও রাজনৈতিক ঘটনা লইয়াই ব্যস্ত | এই সমস্ত প্রবল বিক্ষোভ সাধারণ মানুষের জীবনের উপর কীরূপ প্রভাব বিস্তার করে, তাহার ক্ষুদ্র প্রাত্যহিক জীবনে কীরূপ বিপ্লব আনয়ন করে, কীরূপ প্রবল বন্যার বেগে তাহার সাংসারিক সুঃখ-দুঃখের উপর বহিয়া যায়, তাহার কোনোই নিদশ্যন নাই | সুতরাং প্রকৃত ঐতিহাসিক উপন্যাসের যে একটি প্রধান গুণ তাহা ইহাদের মধ্যে একেবারেই দুল্যভ | তারপর ইহাদের ঐতিহাসিক উপাখ্যানগুলিও প্রায় সম্পূণ্য কাল্পনিক ও অবাস্ততব; ইহাদের ইতিহাসের মধ্যেও যথেষ্ট মায়া ইন্দ্রজালের অবসর আছে | কাশ্মীরের রাজপুত্রের সহিত উদাসিনী রাজকন্যার বিবাহ; একজন ছদ্মবেশী মুসলমান ফকির কতৃক বঙ্গদেশ-জয়---এই সমস্ত গল্প যেন রূপকথার অফুরন্ত ভান্ডার হইতে সংগৃহীত বলিয়া মনে হয় | ইতিহাসের কঠোর দিবালোক অপেক্ষা কল্পলোকের রঙিন আলোই যেন রূপকথার অফুরন্ত ভান্ডার হইতে সংগৃহীত বলিয়া মনে হয় | ইতিহাসের কঠোর দিবালোক অপেক্ষা কল্পলোকের রঙিন আলোই যেন ইহাদের প্রকৃতির অধিকতর অনুগামী |
     অপর কয়েকটি উপাখ্যান প্রকৃতি ইতিহাস নহে, সম্ভাবিত ইতিহাসের কাল্পনিক রাজ্য হইতে গৃহীত, অথ্যাৎ যে সমস্ত ঘটনা প্রকৃতপক্ষে ঘটিয়াছিল, তাহা নহে,--যাহা ঘটিতে পারিত, যাহা অসম্ভব ছিল না, তাহার উপর প্রতিষ্টিত; নবদ্বীপের রাজার কাছাড়-আক্রমণ বা বিক্রমপুরের রাজার সহিত পূব্যদেশবাসী কোনো অনায্ রাজার যুদ্ধ এই অনিশ্চিত, কাল্পনিক বা অঙ্গাত ইতিহাসের পযা্য়ভুক্ত | এই বিষয়েও প্রকৃত ঐতিহাসিক উপন্যাসের সহিত ইহাদের প্রভেদ বেশ সুনিদি্ষ্ট | স্কট বা অন্যান্য ইউরোপীয় ঔপন্যাসিকের ঐতিহাসিক উপাদানসমূহ সন্পূণ্য ভিন্ন-প্রকৃতির | তাঁহার সব্যজন -বিদিত, সুপরিচিত ঐতিহাসিক আখ্যানগুলিকেই আপনাদের উপন্যাসের অঙ্গীভূত করিয়াছেন | ক্রুসেড, স্যাক্সন ও নমা্নদের পরস্পর দ্বেষ ও জাতিবিরোধ; রাজপক্ষ ও পালি্য়ামেন্ট-পক্ষীয়দের দ্বন্দ্ব-কাহিনী; বগা্ন্ডির ডিউক চালসের সহিত ফ্রান্সের রাজা একাদশ লুই-এর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রভৃতি ইতিহাস-বিশ্রুত ঘটনাসমূহই তাঁহাদের উপন্যাসে বণি্ত হইয়াছে | অবশ্য প্রাচীন বা মধ্যযুগের বিবরণে তাঁহারা ইহাদের প্রকৃত স্বরূপটি, প্রাণের আসল স্পন্দনটি ধরিতে পারিয়াছেন কি না সে সম্বন্ধে মতভেদ আছে, কিন্তু তাঁহাদের বণি্ত উপাখ্যানগুলির ঐতিহাসিকতা অবিসংবাদিত | এই বিষয়ে কিন্তু আমাদের ঔপন্যাসিকেরা যেন প্রাচীন পুরাণকার বা সংস্কৃত লেখকদের পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়াছেন | যেমন, 'রামায়ণ-মহাভারত'- এ বা 'হিতোপদেশ' , 'দশকুমার-চরিত' ও 'কাদম্বরী' -প্রমুখ সংস্কৃত গদ্যসাহিত্যে আমরা সুপরিচিত স্থানসমূহের নাম ---কাশী, কাঞ্চী, দাক্ষিণাত্য, গুজ্যর, কাশ্মীর, প্রভৃতি দেশের---উল্লেখ পাইয়া থাকি, অথচ এই নামগুলিই তাহাদের বাস্তব জগতের সহিত একমাত্র যোগ-সূত্র; সেইরূপ এই সমস্ত আধুনিক উপন্যাসে বাস্তবতা কেবল ঐতিহাসিক স্থানোল্লেখেই পয্যবসিত হইয়াছে---কাছাড়, কাশ্মীর, বিক্রমপুর, প্রভৃতি সুপরিচিত নামই তাহাদের বাস্তবতার একমাত্র চিহ্ন | কিন্তু প্রকৃত ইতিহাসের লক্ষণ ইহাদের মধ্যে একেবারেই নাই | কাশ্মীররাজ কাছাড়রাজ হইতে একেবারেহ