Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা- ২৫, ২৬ ও ২৭

2020-05-28
অভিন্ন, বিক্রমপুররাজের সৈন্যের সহিত মেঘনাতীরবতী্ অনায্য রাজার সৈন্যের কোনোই প্রভেদ দেখা যায় না | নামগুলি সম্পূণ্য আকস্মিকভাবে, নিতান্তই যদৃচ্ছাক্রমে নিবা্চিত হইয়াছে | এমন কি হিন্দু-মুসলমানের মধ্যেও ভেদ-রেখা নিতান্তই অস্পষ্ট; বড়ো জোর হিন্দু অত্যাচারিত ও মুসলমান অত্যাচারী, পরস্পর পরস্পরের ধম্য ও আচারদ্বেষী---এই পয্ন্ত পাথ্ক্য দেখানো হইয়াছে; কোথাও হিন্দু ও মুসলমানকে কেবল বিরোধী জাতির প্রতিনিধিভাবে না দেখিয়া, ব্যক্তিগতভাবে দেখা হয় নাই, এবং তাহাদের ব্যক্তিত্বসূচক গুণের কোনোই বিশ্লেষণ হয় নাই | সুতরাং এই সমস্ত তথাকথিত ঐতিহাসিক উপন্যাসের ঐতিহাসিকতা যে বিশেষ মূল্যবান নহে তাহা সহজেই হৃদয়ঙ্গম হয় |
     এই ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলির মধ্যে একটি তৃতীয় শ্রেণী পৃথক করা যায় | ইহারা ঐতিহাসিক ঘটনার সহিত গাহস্থ্য-জীবনের একটা সংযোগ ও সমন্বয় করিতে চেষ্টা করিয়াছে | বিপুল ঐতিহাসিক ঘটনার অন্তরালে যে আমাদের সাধারণ পারিবারিক জীবনের ক্ষীণস্রোত অবিচ্ছিন্নভাবে প্রবাহিত হইতে থাকে, এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রের প্রবল প্রবাহ এই ক্ষীণস্রোতে সঞ্চারিত হইয়া ইহার গতিবেগ-বৃদ্ধি ও ইহাতে ঘূণ্যাবত্য সৃজন করে তাহার কথঞ্চিত গ্যানের পরিচয় ইহাদের মধ্যে পাওয়া যায় | অবশ্য এই তৃতীয় শ্রেণীর উপন্যাসে আমরা যেটুকু গাহস্থ্য বা পারিবারিক চিত্র অঙ্কিত দেখি তাহা প্রধানত প্রেমবিষয়ক | এই প্রেম-কাহিনী নিতান্তই বিশেষত্ব-বজি্ত ও প্রাণহীন; কেবল কতকগুলি প্রথাবদ্ধ আসংকারিক শব্দবিন্যাস ও নিতান্ত অথ্যহীন উচ্ছ্বাসমাত্র | উহার মধ্যে মানব-চরিত্রের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের বা প্রণয়ের উদ্দাম বেগের কোনো পরিচয় পাওয়া যায় না | সুতরাং প্রেম-কাহিনী হিসাবে এই সমস্ত উপন্যাসের কোনো মূল্য নাই | ঐতিহাসিক ঘটনার সহিত এই প্রেম-কাহিনীর সমন্বয়সাধনেরও লেখকেরা বিশেষ কোনো কৌশল দেখাইতে পারেন নাই | হয়তো কোনো প্রবল-প্রতাপান্বিত সম্রাট কোনো গৃহস্থ-ঘরের সুন্দরীর রূপমুগ্ধ হইয়া তাহাকে নিজ স্নেহচ্ছায়ামন্ডিত গৃহকোণ হইতে তাহার প্রণয়ভাজন পুরুষের নিকট হইতে ছিনাইয়া লইতে চেষ্টা করিয়া তাহার শান্তিময় জীবনে একটি বিষাদময় জটিলতার প্রবত্যন করিয়াছেন | এরূপ স্থলে পরিণাম প্রায়ই হয় সম্রাটের আত্মমসংবরণ ও অনুতাপ; না হয় নায়ক-নায়িকার আত্মহত্যা | অথবা কোনও কোনও স্থলে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে প্রণয়মিলন দেখাইয়া লেখক নিজ উপন্যাসের মধ্যে একটু নূতনত্ব আনিতে চেষ্টা করিয়াছেন---প্রয়ই কোনো উচ্ছপদস্থ মুসলমান মহিলা হিন্দুবীরের বীরত্বে মুগ্ধ হইয়া তাহার পায়ে নিজ জাত্যভিমান ও ধম্যগৌরব বিসজ্ন দিয়াছেন | এইরূপ আকারেই ইতিহাস সাধারণ গাহ্স্থ্য-জীবনের উপর নিজ প্রভাব বিস্তার করিয়াছে; সুতরাং সহজেই বুঝা যায় যে, এ সমস্ত ক্ষেত্রে ইতিহাসের সহিত প্রাত্যহিক জীবনের যোগসূত্র ক্ষীণ | স্কটের উপন্যাসে যেমন ইতিহাস ও গাহ্স্থ্য-জীবনের মধ্যে একটা নিগূঢ়, অন্তরঙ্গ ঐক্য, একটা প্রাণের যোগ আছে, গাহ্স্থ্য-জীবন ইতিহাসের ক্ষেত্র হইতে যেমন আপন রসমাধুয্য ও আকার-বৈচিত্র্য টানিয়া লইয়াছে, এখানে তাহার ছায়াপাত মাত্র হয় নাই | এখানে ইতিহাস একটা দুরন্ত দানবের মতো গাহ্স্থ্য-জীবনে প্রবেশ করিয়া তাহার সুখশান্তি ছিন্নভিন্ন করিয়া দিতেছে মাত্র; তাহার সহিত কোনো জীবন্ত সম্বন্ধ বা প্রাণের যোগ প্রতিষ্ঠিত করিতে পারিতেছে না |
     রমেশচন্দ্র ও বঙ্কিমচন্দ্রের সমসাময়িকদিগের রচিত এই সমস্ত ঐতিহাসিক উপন্যাসের একটু সবিস্তার আলোচনা করা গেল; কেন না এই সমস্ত ব্যথ্য-প্রয়াসের মধ্য দিয়াই আমরা ঐতিহাসিক উপন্যাসের আদশে্র গুরুত্ব সহজে উপলব্ধি করিতে পারিব | রমেশচন্দ্র ও বঙ্কিমচন্দ্রের সহিত ইহাদের তুলনা বিশেষ শিক্ষাপ্রদ হইবে | আমরা এই দুই মনীষীর গ্রন্থ-সমালোচনার সময়ে দেখিতে পাইব যে, ইহারা, বিশেষত বঙ্কিমচন্দ্র, অনেকটা পূব্যবণি্তরূপ বিষয়ের মধ্যেও কীরূপে আপনাদের উচ্ছতর কলাকৌশল ফুটাইয়া তুলিয়াছেন ও গাহ্স্থ্য-জীবনের সহিত ইতিহাসের বৃহত্তর ব্যাপারগুলিকে নিপুণ হস্তে গাঁথিয়াছেন | বিষয়-নিবা্চন-সম্বন্ধে বঙ্কিমচন্দ্রের সহিত এই সমস্ত লেখকের বিশেষ কোনো প্রভেদ ছিল না | গৃহস্থ-সুন্দরীর প্রতি প্রবল অত্যাচারীর রূপমোহ অনেকটা 'চন্দ্রশেখর'-এর বিষয়-বস্তু; মুসলমানির হিন্দু-বীরের সহিত প্রেম 'দুগে্শনন্দিনী'র আখ্যায়িকার সারাংশ-সংকলন বলিয়া মনে হইতে পারে | কিন্তু এই সমস্ত অতি সাধারণ, নিতান্ত বিশেষত্ব-বজি্ত বিষয়ও বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতিভার দ্বারা কীরূপ আশ্চয্ভাবে রূপান্তরিত হইয়াছে, জীবনের জটিলতা ও প্রেমের বিপুল আবেগ ইহাদের মধ্যে কীরূপ স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হইয়াছে, তাহা তুলনার দ্বারা আরও পরিষ্কাররূপে হৃদয়ঙ্গম হইবে | সাধারণ মনুষ্যের সহিত তুলনাই প্রতিভাবানের গৌরব স্ফুটতর করিয়া তোলে |


চতুথ্য অধ্যায়

বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের ঐতিহাসিকতা

( ১ )

পূব্যবতী্ অধ্যায়ে বঙ্গসাহিত্যে ঐতিহাসিক উপন্যাসের সূত্রপাত ও সাধারণ লেখকের হস্তে ইহার দোষ-ত্রুটি-সম্বন্ধে আলোচনা করা হইয়াছে | এক্ষেণে রমেশচন্দ্র ও বঙ্কিমচন্দ্রের হস্তে ঐতিহাসিক উপন্যাসের যে উৎকষ্ সাধিত হইয়াছিল, তাহার আলোচনা করিতে হইবে | পূব্য ইতিহাস-সম্বন্ধে অগ্যতাবশত বঙ্গসাহিত্যে ঐতিহাসিক উপন্যাসের পরিপুষ্টির যে দিকে গুরুতর বাধা বঘ্ন ছিল, তাহা আমরা দেখিয়াছি | এই সমস্ত বাধা-বিঘ্ন-সত্ত্বেও রমেশচন্দ্র ও বঙ্কিমচন্দ্র যে উচ্ছাঙ্গের ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখিতে পারিয়াছেন, তাহা তাঁহাদের সহজ প্রতিভার জন্য |
     পূবে্ই উল্লেখ করা হইয়াছে যে, সাহিত্যিক রচনা-সম্বন্ধে বঙ্কিম ও রমেশ প্রায় সমসাময়িক | বঙ্কিমের 'দুগে্শনন্দিনী'ই প্রথম উচ্ছাঙ্গের ঐতিহাসিক উপন্যাস; বঙ্কিমের ও সম্ভবত ভূদেবের দৃষ্টান্তই ইংরেজি-সাহিত্যপুষ্ট রমেশচন্দ্রকে বঙ্গসাহিত্যের দিকে আকষ্যণ করে | সুতরাং প্রথম সাথ্ক প্রবত্কের যে সাথ্ক গৌরব তাহা বঙ্কিমচন্দ্রের ও ভূদেবের প্রাপ্য | ক্রমবিকাশের দিক হইতে রমেশচন্দ্রের উপন্যাসগুলিই খাঁটি, অবিমিশ্র ঐতিহাসিক উপন্যাসের উদাহরণ |বঙ্কিমের ঐতিহাসিক উপান্যাসগুলি অপেক্ষাকৃত জটিল ও মিশ্র ধরনের; তাহাদিগের মধ্যে ইতিহাস অনেকাংশে কল্পনারঞ্জিত ও রূপান্তরিত হইয়া দেখা দিয়াছে | বঙ্কিমের আদশ্যবাদ, জাতির ভবিষ্যৎ - সম্বন্ধে তাঁহার প্রবল আশা-আকঙক্ষা, তাঁহার উচ্ছসিত দেশভক্তি ঐতিহাসিক উপাদানগুলিকে বিশষভাবে অনুরঞ্জুত করিয়া তাঁহার ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলির উপর কোথাও-বা মহাকাব্যের বিশালতা, কোথাও-বা গীতিকাব্যের উন্মাদনা আনিয়া দিয়াছে | ঐতিহাসিক উপন্যাসের সত্যনিষ্ঠা-সম্বন্ধে যে কঠোর দায়িত্ব, তাহা তিনি সব্ত্র স্বীকার করিয়া লইয়াছেন বলিয়া মনে হয় না | 'আনন্দমঠ'-এ একটা অবিখ্যাত সন্নাসী-বিদ্রোহের মধ্যে তিনি নিজের উদ্দীপ্ত স্বদেশপ্রেম ও জ্বলন্ত বিশ্বাস সঞ্চার করিয়া, তাহাকে একটা ভাবপূত, গ্যান-গৌরব-মন্ডিত, মহিমান্বিত আদশ্রের আকার দান করিয়াছেন, একটা সূদূরপ্রসারী রাষ্টনৈতিক ও ধম্যনৈতিক বিপ্লবের গৌরব আরোপ করিয়াছেন; অতীত ইতিহাসের চিত্রপটের উপর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার উজ্জ্বল বণ্য বিন্যস্ত করিয়াছেন | অতীতকালের স্বরূপটিকে অনাবৃত করিয়া দেখাইতে তাঁর বিন্দুমাত্র আগ্রহ নাই | প্রেমিক যেমন সমগ্র বাস্তব-জগৎকে নিজ আদশ্য স্বপ্নের সাদৃশ্যে রূপান্তরিত করে, কবি ও স্বদেশপ্রেমিক বঙ্কিমচন্দ্রও অতীত ইতিহাসকে দেশভক্তির প্রবল শিখায় গলাইয়া, কল্পনার উজ্জ্বলবণ্যে রঞ্জিত করিয়া, তাহার উপর নিজ বিশাল, রাজোচিত মনের প্রভাব মুদ্রিত করিয়া দিয়াছেন | ইহা আর যাহাই হউক, ঠিক ঐতিহাসিক উপন্যাস নহে, এবং ঐতিহাসিক উপন্যাসের আদশ্যে ইহার বিচার ও রসগ্রহণ চলিতে পারে না |
     'দুগে্শনন্দিনী' ও 'রাজসিংহ' এবং কতকটা 'চন্দ্রশেখর' ছাড়া বঙ্কিমচন্দ্রের অন্যান্য ঐতিহাসিক উপন্যাস-সম্বন্ধে অনেকটা এই কথা বলা যাইতে পারে | 'মৃণালিনী'তে ঐতিহাসিক অংশ অতিশয় ক্ষীণ ও আনুমানিক বলিয়াই মনে হয় | হেমচন্দ্র-সম্বন্ধে অনেকটা এই কথা বলা যাইতে পারে | 'মৃণালিনী'তে ঐতিহাসিক অংশ অতিশয় ক্ষীণ ও আনুমানিক বলিয়াই মনে হয় | হেমচন্দ্র-মৃণালিনীর প্রেম যে-কোনো আধুনিক যুগে ঘটিতে পারিত; তাৎকালিক সমাজ ও ইতিহাসের বিশেষ চিহ্ন উহার উপর মুদ্রিত | বঙ্কিমের প্রধান শক্তি ঐতিহাসিক আবেষ্টন-সংগঠনের বা ইতিহাসের শুষ্ক অস্থির মধ্যে প্রাণসঞ্চারের কাযে্ নিয়জিত হয় নাই, পরন্তু মনোরমার প্রহেলিকাময় চরিত্রের বিশ্লেষণেই আত্মপ্রকাশ করিয়াছে | 'দেবী চৌধুরাণী'তে দাশ্যনিক তত্ত্বপ্রিয়তা ইতিহাসকে অভিভূত করিয়াছে; ভবানী পাঠক সন্তান ব্রত গ্রহণ করিলেই অনায়াসে আনন্দমঠে স্থান পাইতে পারিত | তবে 'দেবী চৌধুরাণী' মূলত পারিবারিক উপন্যাস, ঐতিহাসিক নহে; সুতরাং ইহার ঐতিহাসিক আংশকে সেরূপ প্রাধান্য দেওয়া হয় নাই | 'সীতারাম' ও মূলত চরিত্র-বিশ্লেষণের উপন্যাস; সীতারামের নৈতিক পদস্খলনের চিত্রটি ফুটাইয়া তোলাই ইহার বিশেষ উদ্দেশ্য; ইতিহাস ইহার অপ্রধান অংশ মাত্র | বিশেষত সীতারামের ঐতিহাসিক অংশ ক্ষীণ হইলেও যথেষ্ট সত্যনিষ্ঠার সহিত চিত্রিত হইয়াছে, আদশ্যবাদের দ্বারা রূপান্তরিত হয় নাই | সীতারামকে প্রথম প্রথম একজন আদশ্য, দূরদশী্ হিন্দুরাজ্য-প্রতিষ্ঠাতা বলিয়া চিত্রিত করা হইলেও, তাঁহাকে কোনো অসম্ভব অকালোচিত বাষ্পময় ভাবের দ্বারা ক্ষীণ করা হয় নাই, একজন সাধারণ অত্যাচার-পীড়িত, স্বাধীনতাকামী বিদ্রোহীরূপেই দেখানো হইয়াছে | সুতরাং এখানে আদশ্যবাদের দ্বারা ইতিহাস ক্ষুণ্ন ও বিকৃত হয় নাই | সইরূপ 'চন্দ্রশেখর' -এও যে ঐতিহাসিক অংশটুকু আছে তাহাও আখ্যায়িকার মূল বস্তু নহে| তথাপি এখানে ইতিহাস কেবল পশ্চাৎপট মাত্র নহে, আখ্যায়িকার মধ্যে গভীরভাবে অনুপ্রবিষ্ঠ | বাংলায় ইংরেজের প্রাদুভা্ব কেবল রাজনৈতিক সংঘটন নহে, ইহা শৈবলিনীর গাহ্স্থ্য-জীবনের উপরও প্রভাব বিস্তার করিয়াছে | ইতিহাসের নিগূঢ় উদ্দেশ্যের বাহন ইংরেজ, নবাব

মীরকাসিম ও দরিদ্র ব্রাম্ভন চন্দ্রশেখর উভয়েরই দুগ্যতির হেতু |দলনী ও শৈবলিনী উভয়েই নিয়তির মম্যান্তিক ব্যাঙ্গে ইতিহাস-প্রসারিত একই নাগপাশে জড়িত হইয়া পড়িয়াছে---দুইটি আখ্যায়িকা একই সূত্রে অতি নিপুণভাবে গ্রথিত হইয়াছে | শৈবলিনীর প্রায়শ্চিত্তেতর সঙ্গে দলনীর আত্মোৎসগ্য ও বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবের গৌরবময় ব্যথ্ প্রচেষ্টা ভাবের একই সুরে বাঁধা | সুতরাং 'চন্দ্রশেখর' -এ ইতিহাসের সহিত ব্যক্তিগত জীবনের একটা সন্তোষজনক সমন্বয় হইয়াছে বলা যাইতে পারে | খুব সন্নীহিত অতীতের কাহিনী বলিয়া ইহার প্রতিবেশচিত্রও সুপরিচিত ও অপেক্ষাকৃত তথ্যবহুল |
     'দুগে্শনন্দিনী' ও 'রাজসিংহ' এই দুইঁটি উপন্যাসের ঐতিহাসিকতা অন্যান্য উপন্যাস হইতে একটু ভিন্ন স্তরের---ইহারা মূলত ঐতিহাসিক উপন্যাস; ঐতিহাসিক ব্যাক্তিই ইহাদের নায়ক এবং তাহাদের ভাগ্য-বিপয্য়ই ইহাদের আখ্যান-বস্তু | অবশ্য ঐতিহাসিক উপাখ্যানে ইতিহাস-খ্যাত পুরুষই যে নায়ক হইবে, তাহার কোনো প্রয়োজন নাই | বরঞ্চ স্কটের উপন্যাসে ঐতিহাসিক ব্যক্তিরা নায়কপদে উন্নীত না হইয়া অপ্রধান অংশই অধিকার করিয়াছেন | Ivanhoe তে Richard I, Quentin Durward-এ Louis XI,Kenilworth- এ Elizabeth ও Leicester, Peveril of the Peak -এ James I, Woodstock-এ Charles II ও Cromwell, প্রভৃতি ঐতিহাসিক চরিত্রগুলিই ঐ সমস্ত উপন্যাসে অপ্রধান অংশ অধিকার করে; এবং কাল্পনিক ব্যক্তিরাই নায়কের পদে অধিষ্ঠিত হইয়াছে | ইহার দুইটি কারণ আছে----প্রথমত, ঐতিহাসিক চরিত্রগুলি পাঠকের বিশেষ পরিচিতি বলিয়া, তাহাদিগকে কল্পনার সাহায্যে রূপান্তরিত করার পক্ষে বিশেষ বাধা আছে; ঔপন্যাসিকের রুচি ও আদশ্য অনুযায়ী তাহাদিগকে পরিবতি্ত করা চলে না | সুতরাং লেখক যে সমস্ত বিপ্লব- অভিঘাত দেখাইতে চাহেন, সমসাময়িক যে সমস্ত বিরোধের ধারা পরিস্ফুট করিতে ইচ্ছা করেন, তাহা কাল্পনিক চরিত্রের ভিতর দিয়াই ফুটাইয়া তোলা তাঁহার পক্ষে সহজ হয় | দ্বিতীয়ত, প্রত্যেক যুগেরই সাধারণ জীবন, রীতি-নীতি ও আচার-ব্যবহার সম্বন্ধে স্কট-এর গ্যান এতই ব্যাপক ও গভীর ছিল, প্রত্যেক শতাব্দীরই বিশেষ প্রাস্পন্দন তিনি এতই সূক্ষ্ম সহানুভূতির সহিত ধরিতে পারিতেন যে, সমাজচিত্রের কেন্দ্রস্থলে রাজাকে স্থাপন করা তাঁহার প্রয়োজন হইত না | সুতরাং তাঁহার উপন্যাসে ঐতিহাসিক চরিত্রগুলি বাস্তবতার একমাত্র নিদশ্যন বলিয়া প্রবতি্ত হয় নাই | রাজাদিগকে আখ্যায়িকার মধ্যে না আনিলেও উহাদের বাস্তবতার কোনো হানি হইত না; রাজাদের প্রবত্যনের জন্য উহাদের বাস্তবতার গৌরব আরও বাড়িয়াছে মাত্র; আরও সংশয়হীন ভিত্তির উপর স্থাপিত হইয়াছে মাত্র | এই সমস্ত কারণের জন্য স্কট তাঁহার ঐতিহাসিক চরিত্রগুলিকে আখ্যায়িকার অপ্রধান অংশে নিয়োজিত করিতে সাহসী হইয়াছেন |
     কিন্তু আমাদের অবস্থা সম্পূণ্য বিভিন্ন | বিভিন্ন যুগের সামাজিক অবস্থা সম্বন্ধে আমরা এতই অগ্য যে, আমাদের নিকট এক যুগ হইতে অপরের ভেদ-রেখা অতি ক্ষীণ ও অসষ্ট | সূদূর হিন্দু অতীতের কথা ছাড়িয়া দিলেও, এমন কি মুসলমান অধিকারের পরেও কোনো শতাব্দীরই বিশেষ রূপ-সম্বন্ধে, সামাজিক জীবনের বৈশিষ্ট্য-সম্বন্ধে আমাদের বেশ স্পষ্ট ধারণা নাই | চতুদ্শ, পঞ্চদশ, ষোড়শ, সপ্তদশ--- সমস্ত শতাব্দীই আমাদের চক্ষে একাকার, বিস্মৃতির বৈচিত্র্যহীন ধূসর বণ্যে পরিব্যাপ্ত; এই অন্ধকারের মধ্যে রাজাগণের নাম ও উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ঘটনাই যাহা-কিছু ক্ষীণ আলোকরেখাপাত করিতেছে | আমাদের অতীত ইতিহাসের কোনো অধ্যায়কে মনশ্চক্ষুর সম্মুখে স্পষ্টরূপে প্রতিভাত করিবার একমাত্র উপায় তৎকালীন রাজার নামের দিকে দৃষ্টিপাত করা : উপন্যাস-বণি্ত ঘটনা কোন্ যুগে ঘটিয়াছিল তাহার সম্বন্ধে ধারণা করার একমাত্র উপায় সেই সময়ের শাসনকতা্র কাল-নিধা্রণ ---সে সময়ে রাজা কে ছিল, ---আকবর, জাহাঙ্গীর , আরংজেব, সিরাজদ্দৌলা, মীরকাসিম এই প্রশ্নজিগ্যাসা; আভ্যন্তরীণ প্রমাণের দ্বারা কিছুই জানিবার উপায় নাই | এইজন্যই বঙ্গসাহিত্যে যাঁহারা প্রকৃত ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখিবার ভার গ্রহণ করিয়াছেন, এবং সেই কাযে্র কঠোর দায়িত্ব উপলব্ধি করিয়াছেন, তাঁহারা অধিকাংশ স্থলেই, রাজা ও সম্রাট-জাতীয় পুরুষকে কেন্দ্র করিয়া তাঁহাদের কল্পনার জাল বুনিয়াছেন | অপেক্ষাকৃত সত্যনিষ্ঠ রমেষচন্দ্র রাজপুত ও মহারাষ্ট্র ইতিহাসের রোমান্সের অপেক্ষা বিস্ময়কর, অথচ অবিসংবাদিত সত্যের উপর নিজ উপন্যাস-সৌধ নিমা্ণ করিয়াছেন | কল্পনাকুশল বঙ্কিমচন্দ্র অধিকাংশ উপন্যাসেই ঐতিহাসিক উপাদানের রূপান্তর সাধন করিয়া ইতিহাসের মযা্দা লঙঘন করিতে সংকুচিত হন নাই | দুই-একটিতে ইতিহাসের সংকীণ্য সীমার মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখিয়া ঐতিহাসিক চরিত্র ও ঘটনাবিন্যাসেই নিজ শক্তি নিয়োজিত করিয়াছেন |
( ২ )

ঐতিহাসিকতার দিক দিয়া বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসগুলির মধ্যে মোটামুটি চারিটি শ্রেণীবিভাব করা যায় | ১. যে সমস্ত উপন্যাসে ঐতিহাসিক সত্যনিষ্ঠা ও দায়িত্বগ্যানের চিহ্ন অধিকতর সুস্পষ্ট--'দুগে্শনন্দিনী' , 'চন্দ্রশেখর' ও 'রাজসিংহ' এই তিনখানি উপন্যাস এই পযা্য়য়ভুক্ত বলিয়া মনে করা যাইতে পারে | 'দুগে্শশনন্দিনী'র ঐতিহাসিকতা ক্ষীণ বীটে, সামাজিক চিত্রাঙ্কনের দিক দিয়া ইহার মধ্যে বাস্তবপ্রিয়তা বা সত্যনিষ্ঠা বিশেষ উল্লেখযোগ্য নহে | তথাপি ইহার নায়ক একজন ঐতিহাসিক পুরুষ, এবং ইহাতে যে ঐতিহাসিক চিত্র দেওয়া হইয়াছে তাহা অন্তত কল্পনার আতিশয্য দ্বারা বিকৃত ও রূপান্তরিত হয় নাই | বিশেষত ইহার ঐতিহাসিকতা ইহার মূল অংশ, 'মৃণালিনী'র মতো অবান্তর বিষয় নহে; ইহার ঐতিগাসিক অংশ বাদ দিলে আখ্যায়িকার মূল বিষয়ই নষ্ট হইয়া যায় | 'রাজসিংহ' -এ ঐতিহাসিক উপন্যাসের আদশ্য অনেকটা রক্ষিত হইয়াছে; ইহা একটি প্রকৃত ইতিহাস-বণি্ত ব্যাপারেরই বিবৃতি | রাজসিংহের প্রতি চঞ্চলকুমারীর অনুরাগ এই ঐতিহাসিক যুদ্ধবিগ্রহের মধ্যে রোমান্সের অনুরঞ্জন আনিয়া দিতেছে, এবং তাহাদের পশ্চাতে নূতন শক্তির যোগ করিয়া তাহাদের গতিবেগ বধি্ত করিতেছে | অবশ্য ইতিহাসের বিশাল ঘটনার সহিত সাধারণ জীবনের যে অন্তরঙ্গ যোগ আমরা ঐতিহাসিক উপন্যাসের লক্ষণ বলিয়া নিদে্শ করিয়াছি, তাহা বঙ্কিমচন্দ্রের কোনো উপন্যাসেই পূণ্যভাবে প্রতিফলিত হয় নাই | ইহার কারণ বোধ হয় এই যে,