Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা- ২৮ ,২৯ ও ৩০

2020-06-01
ইতিহাস কোনো দিনই আমাদের সাধারণ সামাজিক জীবনের উপর গভীর প্রভাব বিস্তার করিতে পারে নাই; গুরুতর রাজনৈতিক পরিবত্যন ও রাষ্ট্রবিপ্লবের মধ্যেও আমাদের দৈনন্দিন জীবন নিজ শান্ত, অপরিবতি্ত প্রবাহ রক্ষা করিয়াছিল |
     ২.  দ্বিতীয় শ্রেণীর উপন্যাসে ইতিহাস কল্পনার বণে্ রঞ্জিত হইয়া নিজ সত্যরূপ বিসজ্ন দিয়াছে, ভাবপ্রাবল্য সত্যনিষ্ঠাকে ভাসাইয়া লইয়া গিয়াছে | 'আনন্দমঠ' এই শ্রেণীর একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত |
     ৩.   তৃতীয় শ্রেণীর উপন্যাসে ইতিহাস নিতান্তই ক্ষীণ ও অসম্পূণ্যভাবে মূল আখ্যায়িকার মধ্যে গ্রথিত হইয়াছে | এই শ্রেণীর উপন্যাসে ইতিহাস কেবল ঘটনাবৈচিত্র্যের কারণমাত্রে পয্যবসিত হইয়াছে, কোনো উচ্ছতর কলাকুশলতার প্রয়োজনে নিযুক্ত হয় নাই | 'মৃণালিনী'তে ঐতিহাসিক অংশ---মুসলমান কতৃক বঙ্গবিজয়---চরিত্রসৃষ্টির উপর বিশেষ কোনো প্রভাব বিস্তার করে না | মৃণালিনী-হেমচন্দ্রের প্রেম, মনোরমার রহস্যময় দ্বৈত-ভাব কোনো বিশেষ কালের সৃষ্টি বলিয়া মনে হয় না; ইহারা সব্যকাল-সাধারণ | 'চন্দ্রশেখর'-এ লরেন্স ফস্টরের সহিত শৈবলিনীর গৃহত্যাগ, এবং মীরকাসিম ও ইংরেজদের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধজালে দলনী বেগম ও শৈবলিনীর জড়িত হওয়া ইতিহাসের সহিত পারিবারিক জীবনের যোগের প্রমাণ | অবশ্য শৈবলিনী-প্রতাপের ভিন্নাভিমুখী প্রেম, এবং শৈবলিনীর চিত্তবিকার ও প্রায়শ্চিত্ত ---ইহাদের সহিত রাজনৈতিক ঘটনাগুলির ঘনিষ্ঠ সম্পক্ নাই; দুইটি সূত্রকে পৃথক করা সম্ভব |স্কট বা থ্যাকারের ঐতিহাসিক উপন্যাসে ইতিহাস ও পারিবারিক জীবনের মধ্যে এরূপ বিচ্ছেদসাধন সম্ভবপর নহে | গাহ্স্থ্য-জীবন যেন ইতিহাস-বৃন্তে ফুলের ন্যায় ফুটিয়া উঠিয়াছে, যুগের বিশেষ রাজনৈতিক অবস্থা হইতে নিজ রস ও বণ্য গ্রহণ করিয়াছে, ছোটো-বড়ো শত বন্ধনের নাগপাশে ইতিহাসের সহিত বিজড়িত হইয়াছে | এই প্রভেদের কারণ বোধ হয় এই যে, আমাদের দেশে ইতিহাস-ধারার গতি ও প্রবাহ ইউরোপ হইতে বিভিন্ন | ইতিহাস কখনও কখনও আমাদের সামাজিক জীবনকে বজ্রমুষ্টিতে চাপিয়া ধরিলেও ইহার সুকুমার বিকাশগুলিকে চূণ্-বিচূণ্ করিলেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইহার মুষ্টি অতি শিথিল | সাধারণ লোক অতি গুরুতর রাজনৈতিক বিপ্লবকেও নিজ প্রাণের মধ্যে কখনও গ্রহণ করে নাই ---যতদিন সম্ভব ইহাকে অগ্রাহ্য করিয়া চলিয়াছে; যখন নিতান্তই ঘাড়ে আসিয়া পড়িয়াছে, তখন ইহার প্রচন্ড শক্তির তলে মাথা নত করিয়া দিয়াছে; কিন্তু কোনো দিনই ইহাকে অন্তরের বস্তু বলিয়া লইতে পারে নাই, ইহাকে হৃদয়ের আলোড়নের দ্বারা প্রাণবান করিয়া তুলিতে চাহে নাই | পাঠান গিয়াছে; মোগল আসিয়াছে; ঐতিহাসিক যুদ্ধক্ষেত্রগুলি রক্তরঞ্জিত হইয়া গিয়াছে; কিন্তু এই পরম নিশ্চেষ্ট, পারমাথি্ক জাতি তাহার ঔদাসীন্য ত্যাগ করিয়া এই রক্তপাতের সহিত নিজ হৃদয়-রক্তের গ্যাতিত্ব স্বীকার করে নাই, এই শোণিতোৎসবে নিজ প্রাণমন রাঙাইয়া দেয় নাই |
     ৪.   'সীতারাম' বা 'দেবী চৌধুরাণী" খাঁটি পারিবারিক উপন্যাস | ইহাদের সংযোগ নাই | সীতারাম ইতিহাসের পুরুষ হইলেও, প্রধানত তাঁহার নৈতিক ও গাহস্থ্য-জীবনের সমস্যাই আলোচিত হইয়াছে | 'দেবী চৌধুরাণী'তে ইতিহাস একেবারেই অনুপস্থিত; তবে ইতিহাস ও ধমে্র ক্ষেত্র হইতে নিঃসৃত একটি কাল্পনিক আদশে্র জ্যোতি ইহার সামাজিক জীবনের উপর বিচ্ছুরিত হইয়াছে | এই দুইটি উপন্যাসকে ঐতিহাসিক আখ্যা না দিয়া, বা অতীতের সমাজচিত্র বলিয়া মনে না করিয়া, কেবল ব্যক্তিবিশেষের জীবন-সমস্যা-হিসাবে আলোচনা করিলেই ভালো হয় |
     'কপালকুণ্ডলাতে'তেও রোমান্সের অপরূপ মায়ার পাশ্বে্ ইতিহাস নিতান্তই ক্ষীণ ও বিশেষত্ব-বজি্ত বলিয়াই বোধ হয়; ঐতিহাসিক অংশটুকু যেন মায়াময় সৌন্দযে্র রাজ্যে অনধিকার-প্রবেশ করিয়াছে | কপালকুণ্ডলার অনুপম, সমাজবন্ধনমুক্ত চরিত্রমাধুযে্র সঙ্গে চক্রান্তকুটিল রাজনৈতিক ইতিহাসের সংযোগ বেশ স্বাভাবিক হইয়াছে বলিয়া মনে হয় না | এখানেও ইতিহাসের উপযোগিতা সম্বন্ধে সন্দেহের অবসর আছে |
     এতক্ষষণ যাহা বলা হইয়াছে, তাহা হইতে বুঝা যাইবে যে, ইউরোপীয় ঔপন্যাসিকেরা ইতিহাসের যেরূপ ব্যবহার করিয়াছেন, দৈনিক জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে ভাবে ঐতিহাসিক ঘটনার প্রভাব বিস্তার করিয়াছেন, বঙ্কিম তাহা পারেন নাই | তবে বঙ্কিমের সপক্ষে ইহা বলা যাইতে পারে যে, ইউরোপীয় আদশ্য অনুসরণ করা তাঁহার পক্ষে অসম্ভব ছিল, এবং স্বাভাবিক বাধা সত্ত্বেও তিনি যতটা সম্পন্ন করিতে পারিয়াছেন, তাহা তাঁহার প্রতিভারই পরিচয় | স্থানে স্থানে তিনি কেবল প্রতিভাবলেই কোনো অতীত যুগের ঠিক প্রাণস্পন্দনটি ধরিয়াছেন, বা কোনো ইতিহাস-বিখ্যাত পুরুষের আসল ব্যক্তিত্বটুকু ফুটাইয়া তুলিতে পারিয়াছেন, ইহা প্রমাণের অভাব-সত্ত্বেও অনুভব করা যায় | 'চন্দ্রশেখর' -এ জনসন্ ও গলস্টন্ প্রতাপের গৃহদ্বারের রুদ্ধ কপাটে যে পদাঘাত করিয়াছিল, সেই পদাঘাতই ভারতে প্রথম যুগের ইংরেজদের বলদৃপ্ত, মদগবি্ত আত্মাভিমানের যেন মূত্ বিকাশ --এই এক পদাঘাতই শত শত লিখিত প্রমাণ অপেক্ষা সুস্পষ্টতরভাবে তাহাদের প্রকৃতির আসল রহস্যটি আমাদের নিকট প্রকাশ করে | 'মৃণালিনী'তে মুসলমান বিপ্লবের পর ব্যক্তিয়ার খিলিজির সম্মুখে প্রভুদ্রোহী, বিশ্বাসঘাতক পশুপতির যে বিবেকভীরু, কত্যব্যবিমূঢ়, অধ্য-অনুশোচনা-অধ্য-আত্মপ্রসাদমিশ্রিত ভাব তাহা ঠিক ঐতিহাসিক সত্য না হউক, উচ্ছাঙ্গের ঐতিহাসিক কল্পনার (historical imagination ) পরিচয় দেয় | 'রাজসিংহ'-এ আরংজেবের যে কুটিল, ভাবগোপনদক্ষ, হাসির আবরণের মধ্যে বজ্রকঠিন প্রকৃতিটির পরিচয় দেওয়া হইয়াছে, তাহা আধুনিক ঐতিহাসিকও সত্য বলিয়া মানিয়া লইতে কুন্ঠিত হইবেন না | এই সমস্ত ক্ষেত্রে বঙ্কিমচন্দ্র একটি প্রমাণনিরপেক্ষ সহজ সংস্কারের ইতিহাসের একেবারে মম্যস্থানে গিয়া হাত দিয়াছেন, সমস্ত জটিল ঘটনা-বিন্যাসের মধ্যে যুগ-বিশেষের বা ব্যক্তি-বিশেষের আসল স্বরূপটি টানিয়া বাহির করিয়াছেন |
     বঙ্কিমের ঐতিহাসিকতা-সম্বন্ধে আলোচনা শেষ হইল | পরে যখন এই সমস্ত উপন্যাস আলোচিত হইবে, তখন কেবল তাহাদের কলাকৌশলের দিকটাই লক্ষ্য করিতে হইবে, ঐতিহাসিক অংশ সম্বন্ধে অভিমতের পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন হইবে না |

পঞ্চম অধ্যায়

রমেশচন্দ্র

ক.  ঐতিহাসিক উপন্যাস

( ১ )

পূব্যবতী্ অধ্যায়ে বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের ঐতিহাসিকতা-সম্বন্ধে আলোচনা করা হইয়াছে | এখন রমেশচন্দ্রের ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলির আলোচনা করিলেই বঙ্গসাহিত্যের উপন্যাসের একটি বিভাগ সম্পূণ্য হয় |
     পূবে্ই বলা হইয়াছে যে, অবিমিশ্য ঐতিহাসিক উপন্যাসের নিদশ্যন বঙ্গসাহিত্যে এক রমেশচন্দ্রের উপন্যাসেই পাওয়া যায় | বঙ্কিমের সহিত তুলনায় কল্পনাকুশলতা তাঁহার অনেক কম | এই কল্পনাকুশলতার অভাবই সাধারণত তাঁহার ভাবদৈন্যের কারণ ও জীবন-সমস্যার গভীর আলোচনার পক্ষে অন্তরায় হইলেও, অধিকতর সত্যনিষ্ঠার হেতু হইয়াছে | রমেশচন্দ্র কল্পনার আতিশয্য বা আদশ্যবাদের দ্বারা ইতিহাসকে রূপান্তরিত করিতে চাহেন নাই, পরন্তু যথাসাধ্য সত্যচিত্রণেরই প্রয়াসী হইয়াছেন | বঙ্গসাহিত্যের প্রতিকূল আকাশ-বাতাসের মধ্যে ঐতিহাসিক উপন্যাসের যতদূর বৃদ্ধি ও পরিণতি হওয়া সম্ভব রমেষচন্দ্রের উপন্যাসে তাহারই পরিচয় পাওয়া যায় |
     রমেশচন্দ্রের চারিখানি ঐতিহাসিক উপন্যাসকে স্থূলত দুইটি শ্রেণীতে ভাগ করা যাইতে পারে | প্রথম উপন্যাসদ্বয় --- 'বঙ্গগবিজেতা' ও 'মাধবীকঙ্কণ' ---এক শ্রেণীর অন্তগ্যত; শেষের দুইখানি উপন্যাস---'জীবন-প্রভাব' ও 'জীবন-সন্ধ্যা' -কে অপর শ্রেণীতে ফেলা যাইতে পারে | এই দুই শ্রেণীর মধ্যে প্রভেদ এই যে, প্রথম শ্রেণীতে কল্পনার আধিপত্য; দ্বিতীয় শ্রেণীতে সত্যনিষ্ঠার অধিক প্রাদুভা্ব --কল্পনা ঐতিহাসিক সত্যের অনুগামী হইয়াছে | প্রথম দুইখানি উপন্যাসের বণ্যনীয় বস্তু ও মুথ্য চরিত্রগুলি প্রধানত কাল্পনিক; কেবল ঐতিহাসিক আবেষ্টনের মধ্যে সন্নিবিষ্ট হইয়াছে বলিয়াই তাহারা ঐতিহাসিক উপন্যাসের পয্যায়ভুক্ত হইয়াছে | পরবতী্ উপন্যাসদ্বয় প্রধানত ইতিহাসের সংশয়হীন ভিত্তির উপরই প্রতিষ্ঠিত; তাহাদের মধ্যে যে সমস্ত কাল্পনিক বিষয়ের সমাবেশ হইয়াছে, তাহারা কেবল বৃহত্তর ঐতিহাসিক ঘটনাগুলির মধ্যে যোগসূত্র রচনা করিতেছে; তাহাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে শূন্য স্থানটুকু আছে, তাহাদিগকে রসে ও বণ্যে ভরিয়া তুলিয়াছে | অবিসংবাদিত ঐতিহাসিক সত্যের চারিদিকেও কল্পনা-শক্তির ক্রীড়ার যথেষ্ট অবসর আছে | ইতিহাসের শুষ্ক অস্থির মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করিতে হইলে, ঐতিহাসিক বাহ্য ঘটনাকে মানুষের প্রকৃত জীবনের ও হৃদয়াবেগের সহিত, ইতিহাসকে মানব-মনের নিগূঢ় রসলীলার সহিত সম্পকা্ন্বিত করিতে হইলে কল্পনার সাহায্য অপরিহায্য | রমেশচন্দ্রের শেষের দুইখানি উপন্যাসে যে কল্পপনার পরিচয় পাই, তাহা মুখ্যত এই জাতীয় | তাহা ঐতিহাসিক সত্যের বিরোধী নহে, অনুগামী; তাহা ইতিহাসকে বিকৃত করে না, কেবল বিস্মৃতি মলিন সত্যের রেখাগুলির উপর উজ্জ্বল আলোকপাত করিতে চেষ্টা করে মাত্র | সুতরাং ঐতিহাসিক উপন্যাসের ক্ষেত্রে রমেশচন্দ্রের গতি কাল্পনিকতা হইতে সত্যনিষ্ঠার দিকে; প্রথম উপন্যাসদ্বয়ে যে ইতিহাস অপ্রধান ছিল, শেষের উপন্যাস দুইখানিতে তাহা প্রধান হইয়াছে | ইহার কারণ বোধ হয় রমেশচন্দ্রের ঐতিহাসিক গ্যানের প্রসার এবং রাজপুত ও মহারাষ্ট্র ইতিহাসের বীরত্বকাহিনীতে একটা প্রবল, প্রচুর রসধারার আবিষ্কার |
     'বঙ্গবিজেতা' ( ১৮৭৩ খৃঃ অঃ ) রমেশচন্দ্রের প্রথম রচনা; একটা অপরিণত হস্তের চিহ্ন ইহার সব্ত্রই বিরাজমান | ইহার ঐতিহাসিক অংশ রমেশচন্দ্রের স্বাভাবসিদ্ধ সত্যনিষ্ঠার সহিত লিখিত হইয়াছে সন্দেহ নাই | কিন্তু ইহা একেবারে শুষ্ক, নীরস ও প্রাণহীন; কোনো স্কুলপাঠ্য ইতিহাস হইতে সংকলন বলিয়া বোধ হয় | জীবনের বেগবান স্পন্দন ইহার মধ্যে নাই; মানবের সাধারণ জীবন ও মানব-মনের গূঢ় রসধারার সহিত ইহার কোনো সম্পক্য স্থাপিত হয় নাই | এমন কি কোনো ইতিহাস-প্রসিদ্ধ পুরুষের পরিচিত মূতি্ হইতে একটা ক্ষীণ জীবন-স্পন্দনের অনুরণনও এই গ্রন্থ-বণি্ত যুগের উপর সংক্রামিত হয় নাই | অবশ্য রাজা টোডরমল্লকে এই যুগের কেন্দ্রস্থ পুরুষ বলিয়া চিত্রিত করা হইয়াছে; কিন্তু তিনিও বিশেষ জীবন্তভাবে চিত্রিত হন নাই এবং তাঁহার সমসাময়িক ইতিহাসধারার উপর কোনো বিশেষত্বের চিহ্ন অঙ্কিত করিতে পারেন নাই | গ্রন্থের শেষে টোডরমল্ল যখন ইচ্ছাপুরে আৃহূত হন, তখন হিন্দু রাজার সভাড়ম্বর ও অভ্যথ্নালবিধির একটি চিত্র দিবার চেষ্টা করা হইয়াছে; কিন্তু এ বণ্যনাও বিশেষত্ববিহীন বলিয়া আমাদের হৃদয় স্পশ্য করে না | পরবতী্ গ্রন্থসমূহে রাজপুত ও মহারাষ্টীয়দের জ্তীয়-জীবনের বৈশিষ্ট্যব্যঞ্জক যে সত্য ও জীবন চিত্র পাই, তাহার সহিত তুলনায় এই চিত্র নিতান্ত নিষ্প্রভ ও অস্পষ্ট বলিয়া বোধ হয় | এইখানেই আমরা বঙ্কিমের সঞ্জীবনী কল্পনাশিখার অভাব অনুভব করি; কল্পনা ও সত্যের মধ্যে সত্যই আদরণীয়, কিন্তু সত্য যেখানে প্রাণহীন, সেখানে কল্পনার রাজ্য হইতেও জীবনস্পন্দন-আনয়ন আটে্র পক্ষে অধিকতর কাম্য |

চরিত্রসৃষ্টির দিক দিয়াও এক বিরাট প্রাণহীনতা এই গ্রন্থের পাতাগুলি অধিকার করিয়া বসিয়াছে | ইন্দ্রনাথ, নগেন্দ্ররনাথ, সতীশচন্দ্র, বিমলা, প্রভৃতি সমস্ত চরিত্র conventional, বিশেষত্ব-বজি্ত | তাহাদের সকলের মধ্যেই একটা অস্পষ্টতা, বা ক্ষীণতা ও জীবনী-শক্তির অভাব প্রকট হইয়া উঠিয়াছে; তাহাদের কথাবাতা্ ও আচার-ব্যবহারে জীবনের গোপন রহস্যটি প্রকাশিত হয় নাই, সে সম্পূণ্য conventional | মহাশ্বেতার জিঘাংসাপূণ্য হৃদয়ে বাস্তবতার ক্ষীণ স্পন্দন কতকটা অনুভব করা যায় | গ্রন্থের ছায়াময় অস্পষ্টতার মধ্যে কেবল সরলা ও অমলার সখিত্বটুকুই কতকটা বাস্তবের সুস্পষ্ট রেখায় অঙ্কিত হইয়াছে ও সহজেই অন্যান্য চিত্র হইতে পৃথক হইয়া উঠিয়াছে | প্রেমের চিত্রগুলির সম্বন্ধেও ঠিক একই কথা বলা যাইতে পারে; বিশেষত উপেন্দ্রনাথ ও কমলা গ্রন্থ- মধ্যে বাস্তব-অবাস্তবের ভিতর যে ক্ষীণ ভেদ-রেখা আছে, তাহা অতিক্রম করিয়া একেবারে স্বপ্নের রাজ্যে পদাপ্যণ করিয়াছে | এখানেও রমেশচন্দ্র অপেক্ষা বঙ্কিমের শ্রেষ্ঠত্ব অনায়াসেই অনুভব করা যায় | ইন্দ্রনাথের প্রতি বিমলার গোপন আকষ্যণ জগৎসিংহের প্রতি আয়েষার ব্যথ্য-প্রমের একটা অক্ষম অনুকরণ মাত্র | বঙ্কিম নিজ প্রতিভার বলে এই সাধারণ প্রেমের চিত্রটিকে একটি dramatic climax, নাটকোচিত চরম পরিণতিতে লইয়া গিয়াছেন; এবং উহার মধ্যে মানব-মনের গূঢ় মাধুয্য ও বেদনা ঢালিয়া দিয়া উহাকে আটে্র উচ্ছস্তরে উঠাইয়া লইয়াছেন | রমেশচন্দ্য কল্পনাদৈন্যবশত ইহার মধ্যে রসধারা প্রবাহিত করিতে পারেন নাই, কেবল একটা শুষ্ক ঘটনা লিপিবদ্ধ করিয়াছেন মাত্র |
     'বঙ্গবিজেতা'তে রমেশচন্দ্র তাঁহার ভবিষ্যৎ পরিণতির বিশেষ কিছু পরিচয় দেন নাই | কেবল ভবিষ্যতের আলোকে দুইটি দিক দিয়া তাঁহার ক্রমোন্নতির ক্ষীণ সম্ভাবনা লক্ষ্য করা যায় | প্রথমত, যুদ্ধবিগ্রহ-বণ্যনায় প্রথম হইতেই তাঁহার কতকটা সিদ্ধহস্ততার পরিচয় পাওয়া যায়; তাঁহার প্রথম রচনার সমস্ত অপরিপক্কতা ও অস্পষ্টতার মধ্যে এই এক যুদ্ধবণ্যনার মধ্যে তাঁহার যৎকিঞ্চিৎ বাস্তবপ্রিয়তা ও একটা প্রকৃত আবেগ দেখা যায় | তাঁহার রক্তের মধ্যে কোথাও একটা রণোম্মাদ, একটা যুদ্ধ-সংগীতের ঝংকার সুপ্ত ছিল; তাঁহার পরবতী্ উপন্যাসসমূহে এই যুদ্ধ-সংগীত মুখরিত হইয়া উঠিয়াছে এবং একটা গীতিকাব্যোচিত উম্মাদনায় আত্মপ্রকাশ করিয়াছে |
     আর দ্বিতীয়ত, প্রকৃতি-বণ্যনায়ও তাঁহার কতকটা সজীবতা ও দক্ষতার চিহ্ন পাওয়া যায় | প্রকৃতির শীন্ততস্তব্ধ গাম্ভীয্য যেন তিনি হৃদয় দিয়া অনুভব করিয়াছেন, এবং তাঁহার প্রকৃতি-বণ্যনায়ও এই গভীর ভাব, এই প্রত্যক্ষ অনুভূতি ফুটিয়া উঠিয়াছে | অবশ্য বঙ্কিমের কবিত্বময় প্রকৃতি-বণ্যনা বা রবীন্দ্রনাথের গূঢ় অন্তরঙ্গ স্পশ্যটি তাঁহার মধ্যে পাওয়া যায় না; কিন্তু প্রকৃতির শান্ত সৌন্দয্য-সম্বন্ধে তাঁহার একটা সহজ-সরল অনুভূতি, একটা জীবন্ত রসবোধ আছে | পরবতী্ উপন্যাসসমূহে এই গুণগুলি আরও বিকশিত হইয়াছে |
     'বঙ্গবিজতা'র তিন বৎসর পরে ( ১৮৭৬ খৃঃ অঃ ) রমেশচন্দ্রের দ্বিতীয় উপন্যাস 'মাধবীকঙ্কণ' প্রকাশিত হয় | এই তিন বৎসরের মধ্যে তিনি কলাকৌশল ও চরিত্রসৃষ্টিতে যে উন্নতি সাধন করিয়াছেন, তাহা বাস্তবিকই বিস্ময়কর | 'বঙ্গগবিজেতা' একজন অপরিপক্ক তরুণের রচনা; 'মাধবীকঙ্কন' একেবারে প্রথম শ্রেণীর ঔপন্যাসিকের রচনা | এই দুই-এর মধ্যে একটা প্রকাণ্ড ব্যবধান |
     'মাধবীকঙ্কণ' মূলত একটি পারিবারিক উপন্যাস; ইতিহাস ইহার অপ্রধান অংশ | উপন্যাসের নায়ক গৃহত্যাগী হইয়া রাজনৈতিক জালের মধ্যে জড়িত হইয়া পড়েন, এবং ভারত-ইতিহাসের রঙ্গমঞ্চে তখন যে রোমাঞ্চকর নাটকের অভিনয় হইতেছিল তাহাতে একটি নিতান্ত সামান্য অংশ গ্রহণ করিতে বাধ্য হন | কাজে কাজেই ইতিহাস গল্পের একটা অবশ্য প্রয়োজনীয় অঙ্গ নহে; কিন্তু নায়কের ভাগ্য-বিপয্য়ের সহিত ইহা একটি অচ্ছেদ্য যোগসূত্রে আবদ্ধ হইয়াছে | বিশেষত, ঐতিহাসিক ঘটনাগুলির এমন একটা বাস্তব, তথ্যপরিপূণ্য, জীবন্ত চিত্র দেওয়া হইয়াছে যে, আমরা একটা আকষ্যণ এই যে, উহারা আমাদিগকে এই নীরস, যন্ত্রবদ্ধ, বণিগধমী্-জীবন হইতে অতীতের এক বীরত্বপূণ্য, গৌরবমণ্ডিত যুগে লইয়া যায়, সেখানে আমরা একটি মুক্ততর, বিশালতর জীবনের আস্বাদ পাই, যেখানে জীবন দুইটি পরস্পর-বিরোধী মহান আদশে্র দ্বন্দ্বক্ষেত্র, যেখানে কেবল বাঁচিয়া থাকিবারই প্রবল চেষ্টায় মানুষের সমস্ত জীবনী-শক্তি ব্যয়িত হইত না | রমেশচন্দ্রের ঐতিহাসিক উপন্যাসেও আমরা এই বিপদসংকুল, গৌরবময়, বীরত্বকাহিনীপূণ্ অতীত যুগে নীত হই | এই হিসাবে রমেষচন্দ্র স্কটের পাশ্বে্ স্থান পাইবার যোগ্য | 'মাধবীকঙ্কণ' -এ এই অতীত যুগের যে খণ্ড চিত্রগুলি দেওয়া হইয়াছে তাহারাও স্বতই আমাদের বিশ্বাস উৎপাদন করিতে সমথ্য হয়, বিশেষ প্রমাণের অভাব সত্ত্বেও তাহাদের সাধারণ সত্যতা মানিয়া লইতে কুন্ঠিত হই না | রাজমহলে সুজার দরবারের যে চিত্র দেওয়া হইয়াছে, তাহাতে তৎকালীন মোগলসম্রাটদের যথেচ্ছাচারিতা ও তোষামোদপ্রিয়তা, মোগল আমলাতন্ত্রের কুটিলচক্রান্তজালে সত্য কীরূপে লুপ্ত হইত, রামের বিষয় শ্যামের নিকট হস্তান্তরিত হইত, আজিকার জমিদার কাল পথের ভিখারিতে পরিণত হইতেন, এই সমস্ত বিষয়ের একটি সুস্পষ্ট পরিচয় পাই | নম্যদাযুদ্ধে পরাজয়ের পর যশোবন্ত সিংহের মাড়ওয়ার প্রত্যাবত্যনকালে তাঁহার মেওয়ারি ও মাড়োয়ারি সৈন্যদলের মধ্যে যে একটা লঘু হাস্য-পরিহাসের, একটা জাতিবিরোধমূলক কৃত্রিম কলহের ছোটো ইঙ্গিত পাওয়া যায় তাহা ইতিহাসের বিশাল ঘটনার অন্তরালে মানুষের সংকীণ্য সামাজিক জীবনের বাস্তব ছবি বলিয়া বিশেষ উপভোগ্য হইয়াছে |
     তারপর বারাণসীর, ও নরেন্দ্রের বন্দি হওয়ার পর দিল্লিনগরের, যে জনবহুল, সুখসমৃদ্ধিপূণ্য চিত্র ও মোগলরাজ-অন্তঃপুরের যে চমৎকার সৌন্দয্য-বণ্যনা পাই তাহা কবিত্ব-হিসাবে বঙ্কিমের 'রাজসিংহ' -এর উচ্ছসিত বণ্যনা হইতে নিকৃষ্ট হইতে পারে, কিন্তু তাহার মধ্যে সত্যের সুরটি প্রকটতর হইয়া উঠিয়াছে | লেখকের আর একটি বিশেষ কলাকৌশল এই যে, মোগল-প্রাসাদের এই ঐন্দ্রজালিক সৌন্দয্য নরেন্দ্রের বিস্ময়াবিষ্ট, বিপদবিমূঢ় মনের মধ্যে প্রতিফলিত হইয়া, অনিশ্চিত ও সন্দেহের বাষ্পের মধ্যে দেখা দিয়া, আরও