Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা- ৩১, ৩২ ও ৩৩

2020-06-05
অপরূপ হইয়া উঠিয়াছে | ঐশ্বযে্র চিত্রগুলি যেন একটা উজ্জল ছয়াবাজির মতো তাহার অধ্যবিকৃত মস্তিষ্কের ভিতর দিয়া দ্রুতসঞ্চরণ করিয়া গিয়াছে | জেলেখার ব্যথ্য-প্রেমের করুণ কাহিনী নরেন্দ্রের স্বপ্নাবিষ্ট, উদাসীন মনের মধ্যে দিয়া একটি ক্ষীণ প্রতিধ্বনির মতো অনুরণিত হওয়ায় ইহার রহস্যময় সৌন্দ্রয্টি গাঢ়তর হইয়াছে | বাস্তবিক জেলেখার প্রেমটি, ইহার বিপদসংকুল আরম্ভ হইতে বিষাদময় পরিণতি পয্যন্ত যেরূপ অভ্রান্তভাবে একটি সূক্ষ্ম যবনিকার অন্তরালে রাখা হইয়াছে, একটা আলো-আঁধারমেশা অস্পষ্টতার মধ্য দিয়া নীত হইয়াছে, তাহা খুব উচ্ছ অঙ্গের কলাকৌশলের পরিচায়ক | এই অস্পষ্ট সাংকেতিকতাই (suggestiveness ) এই প্রেমের রোমান্টিক সৌন্দয্টি বিবিড়তর করিয়া তুলিয়াছে |
     তাহা হইলে দেখা যাইতেছে যে, ইতিহাসের দিক দিয়া রমেশচন্দ্র 'মাধবীকঙ্কণ' -এ যথেষ্টে অগ্রসর হইয়াছেন, কিন্তু তাঁহার উন্নতি কেবল ঐতিহাসিক বিষয়েই সীমাবদ্ধ নহে | নরেন্দ্র-হেমলতার অন্তগূঢ়, প্রতিরুদ্ধ প্রণয়ের যে করুণ চিত্রটি দেওয়া হইয়াছে, তাহা উপন্যাস-সাহিত্যে বিরল | এই প্রেমের তীব্র জ্বালাময় আবেগ নরেন্দ্রকে গৃহছাড়া করিয়া তাহাকে কক্ষচ্যুত গ্রহের ন্যায় দেশ-দেশান্তরে ছুটাইয়াছে | ইহা হেমলতার মৌন, আত্মসংযমশীল হৃদয়ে বিষদিগ্ধ তীরের ন্যায় প্রবেশ করিয়া তাহার যৌবনের সরস সৌন্দয্, মুখের তরল হাসি শুকাইয়া তুলিয়াছে | বঙ্গ-উপন্যাস-সাহিত্যে সাধারণত যে সমস্ত প্রণয়চিত্র পাওয়া যায় তাহারা আমাদের সামাজিক বৈশিষ্ট্যের জন্য হয় বিশেষত্বহীন, নয় অস্বাভাবিক হইয়া পড়ে; হয় তাহারা অতিরিক্ত সমাজবন্ধনের জন্য নিজী্ব ও রসহীন হয়, নয় সমাজের বাস্তব অবাস্থাকে একেবারে উপেক্ষা করিয়া এক শূন্যগভ্য, অস্বাভাবিক আদশে্র দিকে উড়িয়া যায় | রমেশচন্দ্র অতি দক্ষতার সহিত তাঁহার প্রণয়চিত্রটিকে এই উভয়বিধ অতিরেক (excess) হইতে রক্ষা করিয়াছেন | ইহা একদিকে যেমন সম্পূণ্ স্বাভাবিক ও সমাজোপযোগী হইয়াছে, অপর দিকে সেইরূপ তীব্র আবেগময় ও উচ্ছসিত জীবনরসে পরিপূণ্য হইয়া উঠিয়াছে | উপন্যাসের প্রথম পরিচ্ছেদেই বালক-বালিকাদের শৌশব-ক্রীড়ার মধ্য দিয়া নরেন্দ্রের উগ্র রোষপ্রবণ, উদ্দাম প্রকৃতিটিতে তাহার ভবিষ্যত জীবনের প্রেমের ব্যথ্, বিষাদময় পরিণতির সুস্পষ্ট পূব্যাভাস পাওয়া যায় | এই প্রেমচিত্রটিততে সব্যত্রই একটা সূক্ষ্ম পয্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণশক্তি পরিস্ফুট হইয়াছে | নরেন্দ্র ও শ্রীশ উভয়ের সঙ্গে হেমের ব্যবহারের যে একটা সূক্ষ্ম প্রভেদ আছে তাহা লেখক অল্প কথায় কিন্তু অতি স্পষ্টভাবে ফুটাইয়া তুলিয়াছেন | নরেন্দ্রের উচ্ছ্বসিত, অদম্য-রোষাভিমান-ক্ষুব্ধ প্রণয় হেমের সমস্ত বাহ্য সংকোচ ও ছদ্ম-ঔদাসীন্যের আবরণ ভেদ করিয়া নিজ দুনি্বার বেগ তাহার হৃদয়ের গোপন স্তরে সঞ্চারিত করিয়াছে, নিজ মায়াময় স্পশে্ তাহার অন্তরে গভীর জাগাইয়াছে | বাহ্যত হেমের সমস্ত শ্রদ্ধা, ভক্তি, আনুগত্য অসংকোচে শ্রীশকে আশ্রয় করিয়াছে; কিন্তু তাহার বালিকাহৃদয়ের সমস্ত নীরব, স্ফুটনোম্মুখ প্রেম নরেন্দ্রের জন্য গোপনে সঞ্চিত রহিয়াছে | সেইজন্য তাহার পরিবারস্থ সকলেই, তাহার পিতা পয্ন্ত তাহার প্রকৃত মনোভাব সম্বন্ধে অগ্য রহিয়া গিয়াছেন, শ্রদ্ধাকে প্রেমের চিহ্ন বলিয়া ভুল করিয়াছেন | কেবল এক শৈবলিনীর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ও সহানুভূতিই তাহাকে এই গোপন রহস্যের সন্ধান দিয়াছে |
     আবার ত্রিংশ পরিচ্ছেদে হেমলতার বিবাহিত জীবনের, শ্রীশের সহিত দাম্পত্য-প্রেমের যে ছোটো ছবিটি দেওয়া হইয়াছে তাহার রেখাগুলি কত ক্ষীণ, কত বণ্য-বিরল | সন্ধ্যার ধূসর ছায়ার মতো একটা ম্লান, শান্ত-সংযত সৌন্দয্ তাহার উপর সঞ্চারিত হইয়াছে | ইহাতে প্রেমের উজ্জ্বল শক্তির, বিদ্যুদ্দীপ্তির কিছুই নাই | হেমের শুষ্ক মুখ ও যৌবনোচিত উচ্ছ্বাসের অভাবই তাহার অন্তরের গভীর দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সাক্ষ্য প্রদান করে |
     পক্ষান্তরে নরেন্দ্র ও হেমের মধ্যে যে দুইটি দৃশ্য অভিনীত হইয়াছে তাহারা যেন আগ্নেয় অক্ষরে লেখা | এরূপ কৃত্রিম উচ্ছাস ও শব্দাড়ম্বর-বজি্ত, অথচ স্বচ্ছ, সরল, তেজঃপূণ্য ভাষায় বাংলা উপন্যাসে আর কোথাও প্রেমের বাণী নিবেদিত বিদ্যুতগভ্য শক্তি, একটা অগ্নিস্ফুলিঙ্গের দীপ্তি ও দাহ দিয়াছে | প্রত্যেকটি কথার মধ্যেই একটা বজ্রকঠোর অথচ স্নেহসজল প্রত্যাখ্যানের সুর বাজিয়া উঠিয়াছে | আর উপন্যাসের শেষভাগে মাধবীকঙ্কণের যমুনায় বিসজ্নের দৃশ্য, উদ্ধত বিদ্রোহের পর শান্ত বিসজ্নের ও মৃদু সান্ত্বনার সংযত মাধুয্য আমাদের হৃদয়কে আর এক রকমে স্পশ্য করে | এই দৃশ্যে হেমলতার কথাগুলির মধ্যে মাঝে মাঝে অলংকারবাহুল্যের, নীতিকথার অযথা প্রভাবের পরিচয় পাই বটে, কিন্তু তথাপি মোটের উপর যে সুরটি শুনিতে পাই তাহা মানব-হৃদয়ের গভীরতম ভাবের উপযুক্ত প্রকাশ | শুষ্ক ছিন্ন মাধবীকঙ্কণটি নরেন্দ্র-হেমলতার আপাতব্যথ্য কিন্তু অক্ষুণ্ণ-প্রভাবশীল প্রেমের একটি জীবন্ত রূপকে ( symbol) রূপান্ততরিত হইয়াছে | এই দুইটি দৃশ্যে রমেশচন্দ্রের প্রতিভার পূণ্য পরিচয় দেদীপ্যমান |
     'মাধবীকঙ্কণ' -এর এই দৃশ্যগুলি স্বভাবতই বঙ্কিমচন্দ্রের সহিত তুলনার কথা স্মরণ করাইয়া দেয় | নরেন্দ্র-হেমলতার প্রেমের সহিত 'চন্দ্রশেখর' -এর প্রতাপ-শৈবলিনীর প্রেমের একটা প্রকৃতিগত সাদৃশ্য আছে | কিন্তু এই উভয় প্রেমচিত্রের তুলনামূলক সমালোচনা করিলেই রমেশচন্দ্রকেই শ্রেষ্ঠ আসন না দিয়া পারা যায় না | বঙ্কিম প্রতাপ-শৈবলিনীর প্রেমের মধ্যে একটা তীব্র আবেগ ভরিয়া দিয়া, তাহাকে এক বণ্যবহুল রোমান্সের আবেষ্টনে ফেলিয়া, এবং একটা আদশ্য প্রায়শ্চিত্তের মধ্যে তাহার অবসান ঘটাইয়া সমস্ত ব্যাপারটিকে বাস্তব-জগৎ হইতে অনেক উচ্চে, একটা সুদূর কল্পলোকের চন্দ্রালোকের মধ্যে উঠাইয়া লইয়াছেন | তিনি একজন ঐন্দ্রজালিকের ন্যায় নানা অদ্ভুত ও বিচিত্র ব্যাপারের সংযোগে, বিবিধ রূপরসের সংমিশ্রণে, বাস্তব-জীবনের প্রেমে কল্পলোকের আদশ্য সৌন্দয্য আরোপ করিয়াছেন | আদশ্যলোকের এই সমস্ত আলোকরশ্মির সমাবেশে বাস্তবতার ক্ষীণ ভিত্তিটি একেবারে ঢাকিয়া গিয়াছে | প্রথম যৌবনে যখন

আমাদের চক্ষু হইতে মোহের অঞ্জন সম্পূণ্যভাবে মুছিয়া যায় নাই, যখন একটা স্বপ্নময় আবেশ সুরভি নিশ্বাসের মতো আমাদের প্রাণের চারিদিকে ঘিরিয়া থাকে, তখন কল্পনার এই ইন্দ্রজাল, এই আকাশ-সৌধের বণ্য-সমাবেশকৌশল ও বিরাট সমন্বয়সৌন্দয্য আমাদিগকে একটা সুখের নেশার মতো পাইয়া বসে, একটা মদির বিহ্বলতায় আমাদের বিচারবুদ্ধির সতক্য দৃষ্টিকে ঝাপসা করিয়া দেয় | কিন্তু যখন অপেক্ষাকৃত পরিণত বয়সে আমাদের বিচারবুদ্ধি যৌবনের মোহ কাটাইয়া জাগিয়া উঠে ও সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের দ্বারা এই অপাথি্ব সৌন্দযে্র বাস্তব স্তরটি আঁকড়াইয়া ধরিতে চেষ্টা করে, তখনই আমরা দুঃখের সহিত স্বীকার করিতে বাধ্য হই যে, এই সৌন্দযে্র মধ্যে বাস্তবতার সংমিশ্রণ কত অল্প; এবং যে যাদুবিদ্যার দ্বারা লেখক আমাদের সাধারণ জীবনের চারিদিকে এত অবাস্তব সুষমা পুঞ্জীভূত করিয়াছেন, তাহার বৈধতা সম্বন্ধে সন্দিহান হই | কিন্তু মোহভঙ্গের এই দুঃসহ দুঃখের মধ্যেও আমরা লেখকের অসাধারণ কল্পনাশক্তির প্রশংসা না করিয়া থাকিতে পারি না | যে কল্পনার বলে তিনি এই স্বপ্নলোককে পৃথিবীর পরিচিত বেশে সাজাইয়াছেন, তাহা নিতান্ত সাধারণ শক্তি নহে | এই কল্পনাসৃষ্ট রোমান্স যে অপ্রাকৃত হয় নাই, ইহার মধ্যে যে একটা স্পষ্ট আভ্যন্তরীণ সংগতি ও বাস্তব-জীবনের সঙ্গে একটা গূঢ় সংযোগ আছে ইহাই বঙ্কিমচন্দ্রের চরম কৃতিত্ব |
     রমেশচন্দ্রের শক্তির প্রসার যে বঙ্কিম অপেক্ষা অনেক কম, এবং কল্পনার ইন্দ্রজালরচনা যে তাঁহার সত্যনিষ্ঠ প্রকৃতির সম্পূণ্য বিরোধী ইহা আমরা পূবে্ই দেখিয়াছি | কিন্তু তাঁহার এই সরল সত্যনিষ্ঠাই আমাদের পরিণত বিচারবুদ্ধির নিকট তাঁহার নরেন্দ্র-হেমলতার প্রেমচিত্রকে বঙ্কিমের প্রতাপ-শৈবলিনীর চিত্র অপেক্ষা অধিকতর মনোগ্যো ও রমণীয় করিয়া তুলিয়াছে | যেমন অনেক সময়ে সমস্ত সূক্ষ্ম কারুকায্য ও বণ্যপ্লাবন অপেক্ষা সরল, অকম্পিত হস্তের একটি সরল, বণ্যবিরল রেখা আেটের দিক দিয়া অধিক আদরণীয় হয়, সেইরূপ রমেশচন্দ্রের এই বাস্তব প্রেমের সহজ অকৃত্রিম চিত্র বঙ্কিমের সমস্ত উচ্ছ্বাস ও উন্মাদনা অপেক্ষা আমাদের হৃদয়কে অধিক গভীরভাবে স্পশ্য করিয়াছে | ঐন্দ্রজালিক যে অল্প সময়ের মধ্যে বীজ হইতে ফল উৎপাদন করে, তাহা নিশ্চয়ই সমধিক বিস্ময়কর; কিন্তু মোটের উপর গাছের ফলই বেশি রসযুক্ত ও মিষ্ট | এক্ষেত্রে প্রকৃত ও গভীর রসের দিক দিয়া রমেশচন্দ্রের শ্রেষ্ঠত্বই প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে |
( ২ )

রমেশচন্দ্রের অপর দুইখানি উপন্যাস -- 'জীবন-প্রভাত' (১৮৭৮) ও 'জীবন-সন্ধ্যা' (১৮৭৯) --প্রায় সম্পূণ্যরূপেই ঐতিহাসিক; সাধারণ মানবের জীবনের কথা তাহাদের মধ্যে খুব অল্প স্থান অধিকার করে | অবশ্য ইতিহাসের উদ্দীপনা, বিপুল ঘটনাপুঞ্জের পরস্পর সংঘাতের যে আকষ্যণ তাহা ইহাদের মধ্যে যথেষ্টই আছে; কিন্তু ইতিহাসের বিপুল বেগের সহিত সমতা রক্ষা করিয়া ক্ষুদ্র গাহ্স্থ্য-জীবনকে নিয়মিত করিবার কোনো চেষ্টা করা হয় নাই | এক কথায়, এই উপন্যাস দুইখ্যানির মধ্যে আমরা উপন্যাসের একটি অতি প্রয়োজনীয় উপাদানের অভাব অনুভব করি |
     অবশ্য ইতিহাসের ক্ষেত্রেও মানব-প্রকৃতির স্ফুরণ ও মানব-হৃদয়ের বিশ্লেষণের যথেষ্ট অবসর আছে | আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎক্ষেপেও যেমন, আমাদের নিভৃত গৃহকোণস্থিত, স্তিমিত দীপশিখাতেও তেমনি, একই উপাদান, একইরূপ স্ফিুলিঙ্গ বিদ্যমান আছে | সাধারণ জীবনের মুক্ত প্রান্তর ও সমতল ভূমি দিয়া যে নদী ধীর, শান্ত প্রবাহে বহিয়া যায়, ইতিহাসের উপলসংকুল, বাধাবিঘ্ননভূয়িষ্ঠ ক্ষেত্রে তাহাই ফেনিল ও দুনি্বার হইয়া উঠে | ইতিহাসের বিপুল ঝঞ্ঝাবতে্র মধ্যে পড়িয়া আমাদের এই ক্ষীণ জীবনস্পন্দন উগ্র ও প্রচণ্ড হইয়া উঠে, একটা হিংস্র, তীব্র ভীষণতা লাভ করে, এবং নানা বিচিত্র ও বিস্ময়কর বিকাশের মধ্যে ফুটিয়া বাহির হয় | রমেশচন্দ্রের ঐতিহাসিক উপন্যাসে এইরূপ কোনো চিত্র নাই | রাজপুত বীরের ইতিহাসবিশ্রুত আত্মবিসজ্নের ও রাজপুতরমণীর চিতানলে স্বেচ্ছামৃত্যুবরণের যে দৃশ্য আমরা 'জীবন-সন্ধ্যা'তে পাই, তাহার একটা চিত্রসৌন্দয্য (picturesqueness) আছে সন্দেহ নাই, কিন্তু এই মনস্তত্ত্বমূলক উচ্চতর সৌন্দয্য নাই |
     রমেশচন্দ্রের উপন্যাস দুইখানিতে ঐতিহাসিক সংঘাতের অবসরে যে দুই-একটি কোমলতর বৃত্তির চিত্র দেওয়া হইয়াছে, তাহা নিতান্ত অস্পষ্ট ও মলিন | তাঁহার নায়কেরা কেহ কেহ যুদ্ধ-কোলাহলের অবসরে প্রেমের তান ধরিয়াছেন বটে, বম্য খুলিয়া রাখিয়া প্রেমিকের পুষ্পমাল্য পরিয়াছেন বটে, কিন্তু তাঁহাদের প্রেম মোটেই জীবন্ত ও রসপূণ্য হইয়া উঠে নাই | 'জীবন-প্রভাত' -এ রঘুনাথ ও সরযূবালার প্রেম নিতান্তই নিজী্ব ও বিশেষত্বহীন; সংকটকালের যে একটা দুনি্বার বেগ, একটা হ্রস্ব, সংক্ষিপ্ত, বাহুল্য-বজি্ত ভাব 'রাজসিংহ' -এর প্রেমচিত্রে সঞ্চারিত হইয়াছে, তাহার কিছুই এখানে দেখিতে পাই না | লক্ষ্মীবাঈয়ের শান্ত, গভীর একনিষ্ঠ প্রেম অনুভব করা যায় বটে, কিন্তু তাহা বিশ্লেষণের দ্বারা সুস্পষ্ট হয় নাই | 'জীবন-সন্ধ্যা'য় তেজসিংহ-পুষ্পকুমারীর প্রেমেও কতকটা অভিমান এবং অলীকসন্দেহজাত জটিলতা থাকিলেও, জীবনস্পন্দনের চিহ্ন বিশেষ স্ফুট নহে | তবে এখানে বিপদের কালো মেঘ প্রণয়াবেশের উপর যে একটা নিবিড় ছায়া ফেলিয়াছে, তাহার ক্ষীণ আভাস মাঝে মাঝে ভাসিয়া উঠে; বিশেষত, ভীলবালিকার গোপন ঈষ্যা ও বালিকাসুলভ দুষ্টামি ইহার মধ্যে কতকটা বৈচিত্র্যের সঞ্চার করিয়াছে | কিন্তু মোটের উপর এখানে ইতিহাসেরই একাধিপত্য; রণঢক্কার নিনাদে ক্ষুদ্র পারিবারিক জীবনের ক্ষীণ, করুণ, রস-বিচিত্র সুরটি ঢাকিয়া গিয়াছে | ইতিহাসমহাবৃক্ষের ছায়ায় আমাদের সাংসারিক ফুলগাছটি বাড়িয়া উঠিতে পারে নাই |
     তবে কেবল ইতিহাসের দিক দিয়া এই উপন্যাসদ্বয়ের নিতান্ত অল্প প্রশংসা প্রাপ্য নহে | মহারাষ্ট্রের উত্থান ও রাজপুতের পতন ভারতেতিহাসের দুইটি কীতি্ভাস্বর পৃষ্ঠা; এই দুইটি পৃষ্ঠাতে যত অনুপম বীরত্ব, যত উচ্চ ও পবিত্র হৃদয়াবেগ, যত গৌরবময় অনুভূতি

ঘনীভূত হইয়া ইতিহাসের তুষারশীতল পাষাণফলকে নিশ্চল হইয়াছিল, রমেশচন্দ্র সেগুলিকে কল্পনার শিখায় দ্রবীভূত করিয়া মানব-মনের সজীব ভাবপ্রবাহের সহিত তাহাদের পুনমি্লন সাধন করিয়া দিয়াছেন | এইটিই তাঁহার প্রধান গৌরব | তিনি ইতিহাসের মধ্য দিয়া মানব-মনের বিস্ময়কর বিকাশ, ইহার বিস্ফোরক শক্তি ফুটাইয়া তুলিতে পারেন নাই বটে, কিন্তু মানুষের আদিম প্রবৃত্তিগুলির একটা সুস্পষ্ট ধারণা দিয়াছেন; ইতিহাসের চিত্র-সৌন্দয্য ফুটাইয়া তুলিতে পারেন নাই বটে, কিন্তু মানুষের আদিম প্রবৃত্তিগুলির একটা সুস্পষ্ট ধারণা দিয়াছেন; ইতিহাসের চিত্র-সৌন্দয্য ফুটাইয়া তুলিয়াছেন; যুগে যুগে যে কয়েকটি শক্তিশালী পুরুষ নিজ ইচ্ছাশক্তি, উচ্চাভিলাষ, প্রভৃতির সংঘাতের দ্বারা ইতিহাস রচনা করেন, তাঁহাদিগকে জীবন্ত করিয়া তুলিয়াছেন |
     যাঁহার হৃদয়বিশ্লেষণকে উপন্যাসের প্রধান কত্যব্য বলিয়া মনে করেন, যাঁহারা প্রত্যেক মানুষকে শ্রেণীবিশেষের আবেষ্টনে ও বাহ্য সংঘাতের অনুচিত প্রভাব হইতে মুক্ত করিয়া তাহার নিজ স্বাতন্ত্র্যবিকাশকে খুব সূক্ষ্মভাবে, যেন অনুবীক্ষণের মধ্য দিয়া, পরীক্ষা করিতে চাহেন, তাঁহার অবশ্য রমেশচন্দ্রের রচনায় চিত্র সৌন্দযে্ বা ঐতিহাসিক চরিত্রগুলির একটা সাধারণ বিকাশে সন্তষ্ট হইতে পারিবেন না | বাস্তবিক সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের দিক হইতে রমেশচন্দ্র খুব উচ্চ প্রসংসার অধিকারী নহেন | স্কটের মতো তাঁহারও মনস্তত্ত্বগ্যান নিতান্ত প্রাথমিক (elementary) রকমের; বাহ্য ঘটনার সংঘাত ফুটাইয়া তুলিতে তিনি এত ব্যস্ত, ইতিহাসের বৃহত্তর বিকাশগুলিতেই তিনি এত নিবিষ্টচিত্ত যে, অন্তজ্গতের দ্বন্দ্ব বিপ্লব বিশেষভাবে ব্যাখ্যা করিতে তাঁহার অবলর হয় নাই | তিনি যে যুগের ঔপন্যাসিক, তখন আধুনিক উপন্যাসের বিশ্লেষণমূলক আদশ্য এতটা প্রাধান্য লাভ করে নাই | মানব-চিত্তের উপর বহিজ্গতের প্রভাবের আপেক্ষিক গুরুত্ব সম্বন্ধে আধুনিক ও পূব্যতন উপন্যাসের মধ্যে একটা মৌলিক প্রভেদ আছে | রমেশচন্দ্র যে সমস্ত ঔপন্যাসিকের আদশে্ অনুপ্রাণিত, তাঁহারা মানুষকে একটা বিশাল বাহ্যসংঘাতের মধ্যে স্থাপন করিয়া সেই সংকটকালে তাহার মানসিক অবস্থা ও ব্যবহার লক্ষ্য করিতে ভালোবাসিতেন | বিক্ষুব্ধ রাজনৈতিক জগৎ হইতে একটা প্রকাণ্ড তরঙ্গ আসিয়া মানুষকে ভাসাইয়া লইয়া যাইতে উদ্যত; যে তরঙ্গ তাহার গৃহদ্বারে উপস্থিত, তাহাতে ঝাঁপাইয়া পড়িতে হইবে | সুতরাং ঘটনাবহুল ঐতিহাসিক উপন্যাসে খুব সূক্ষ্ম ও বিস্তারিত বিশ্লেষণের স্থান নাই | এমন কি তাহার চিন্তাধারার মধ্যেও বহিজ্গতের প্রভাব অত্যন্ত অধিক | বাহ্য ঘটনার গতিবেগের সহিত তাল রাখিয়াই তাহাকে নিজের চিন্তা নিয়মিত করিতে হইবে | দুই বিরুদ্ধে পক্ষের মধ্যে কোন পক্ষ অবলম্বন করিব, রাজনৈতিক কত্যব্যের সহিত পারিবারিক কত্যব্যের বিরোধ হইলে কাহার শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করিব, দ্রুত পরিবত্যনশীল ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে নিজ ব্যবহারের সুসংগতি ও সামঞ্জস্য কীরূপে রক্ষা করিব, জীবন-মরণের সন্ধিস্থলে দাঁড়াইয়া দুই পরস্পর-বিরোধী নীতির মধ্যে কাহাকে বরণ করিয়া লইব ---ঐতিহাসিক উপন্যাসের চরিত্রদের মনের মধ্য দিয়া এইরূপ চিন্তাধারা প্রবাহিত হইতে থাকে, এবং উহাদের উপরে বহিজ্গতের প্রভাব নিতান্ত সুস্পষ্ট | কাজে কাজেই ইহার নায়কেরা প্রায়ই অস্পষ্ট ও ছায়াময় হইয়া থাকে; তরঙ্গে ঝাঁপাইয়া পড়িবার পূবে্ তীরে দাঁড়াইয়া তাহারা যে মুহূত্যমাত্র চিন্তার অবসর পায়, তাহাতেই তাহাদের অন্তঃপ্রকৃতির স্বরূপটি, চিত্তবিপ্লবের চিত্রটি যাহা-কিছু ফুটিয়া উঠে | তাহার পরই যখন তাহারা আকন্ঠ নিমগ্ন হইয়া তরঙ্গের সহিত ভাসিয়া যায়, তখন আর তাহাদের ব্যাক্তিত্বটি খুব স্বতন্ত্র ও সুস্পষ্ট থাকে না; কেবল তাহাদের মস্তকের উপর যশঃকিরীট সূয্যরশ্মিতে ঝলমল করিতে থাকে মাত্র | সুতরাং স্কট ও রমেশচন্দ্রের নায়কেরা প্রায়ই ইতিহাসের বিশাল ক্ষেত্রে অস্পষ্ট জ্যোতিমণ্ডলের মধ্যে আত্মগোপন করিয়া থাকেন; তাঁহাদের আসল ব্যক্তিত্বটি নিজ অনিন্দনীয় চরিত্রের অন্তরালে চাপা পড়িয়া যায় | আমাদের রঘুনাথজী হাবিলদার ও তেজসিংহ অনেকটা এই দুরবস্থার ভাগী হইয়াছেন | তাঁহার আদশ্য বীরত্বের মূত্য বিকাশ হইয়াছেন মাত্র, একটা সুস্পষ্ট ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য লাভ করিতে পারেন নাই |
     আধুনিক উপন্যাসে বাহ্যসংঘাতের প্রসার অনেকটা খব্য করিয়া মানব-চিত্তের স্বাধীনতা বৃদ্ধি করা হইয়াছে, তাহার চিন্তা ও আত্মবিশ্লেষণের অবসর দীঘ্যতর করিয়া দেওয়া হইয়াছে | অবশ্য বহিজ্গতের সহিত একেবারে সম্পক্যচ্ছেদ সম্ভবপর নহে, কেননা মানব-মনের অধিকাংশ প্রবল প্রেরণাগুলিও এই বাহিরের জগৎ হইতেই আসে | তবেই এই বাহিরের ক্ষমতার একটা সীমা-নিদে্শ আবশ্যক, যাহাতে ইহা অন্তরের স্বাভাবিক বিকাশকে অযথা অভিভূত না করে |
     ঐতিহাসিক উপন্যাসে ঘটনাবাহুল্যের মধ্যে মানুষ একপাশে সসংকোচে দাঁড়াইয়া আছে | আধুনিক উপন্যাসে ঘটনার ভিড় যতদূর সম্ভব কমাইয়া মানুষকে প্রধান আসন দেওয়া হইয়াছে, এবং তাহার মানসিক বিক্ষোভের চিত্রটি অতি সূক্ষ্ম ও ব্যাপকভাবে আলোচিত হইয়াছে | ঐতিহাসিক উপন্যাস বাহ্য ঘটনা অনেকটা দুদা্ন্ত দস্যুর মতো আসিয়া পড়িয়া মানুষের কন্ঠনালী চাপিয়া ধরিতেছে এবং তাহাকে অধিক চিন্তার অবসর না দিয়া তাহার মুখ হইতে তৎক্ষণাৎ একটা জবাব আদায় করিয়া লইতেছে | সেই মুহূত্য হইতে তাহার মানসিক প্রতাপ অনেকটা ক্ষুণ্ন হইয়াছে | যে সমস্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সাধারণ ঘটনা মানুষের উপর জাল বিস্তার করে এবং ধীরে ধীরে তাহাকে শতবন্ধনের নাগপাশে জড়াইয়া ফেলে, তাহারা তাহার চিত্তকে অভিভূত না করিয়া আত্মবিশ্লেষণের যথেষ্ট অবসর দেয়; প্রত্যেক পাকটি কেমন করিয়া জড়াইয়া আসিতেছে এবং মানুষের মম্যস্থানে অল্পে অল্পে কাটিয়া বসিতেছে, ঔপন্যাসিক আমাদিগকে তাহা দেখাইবার সুযোগ পান | এইজন্যই আধুনিক উপন্যাসে বিশ্লেষণের প্রাধান্য এরূপ সুপ্রতিষ্ঠিত | যাঁহারা এই গুণের অভাবের জন্য ঐতিহাসিক উপন্যাসের সহিত বিবাদ করিতে চাহেন, তাঁহারা উহার উদ্দেশ্য ও সুবিধা-অসুবিধার কথা বিশেষরূপে বিবেচনা করেন না |
     কিন্তু ঐতিহাসিক উপন্যাস বিশ্লেষণের অভাব অন্য দিক দিয়া পুরণ করে | ঘটনা বৈচিত্র্যে, একটা সমগ্র যুগের ব্যাপক বন্যনায়, উচ্চভাব ও আদশ্যের বিকাশে ও বীরত্ব-কাহিনীর প্রাচুযে্ ইহা মানুষকে এমন একটি তৃপ্তি দেয়, এমন একটি বণ্যবহুল সৌন্দযে্র দ্বার