Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা- ৩৪, ৩৫ ও ৩৬

2020-06-08
উদঘাটিত করে, যাহা সাহিত্যের অন্য কোনও শাখা আমাদিগকে দিতে পারে না | অন্য সাহিত্যের পক্ষে যাহা হউক, লঙ্গসাহিত্য সম্বন্ধে ইহা একটি অবিসংবাদিত সত্য যে, ঐতিহাসিক উপন্যাস বাস্তব-জীলনের শূন্যতা পূণ্য করিয়া আমাদিগকে এক বিচিত্র রসের আস্বাদ দেয়; এবং রনেশচন্দ্র এই রস আমাদিগকে প্রচুর পরিমাণেই দিয়াছেন | তিনি বঙ্গসাহিত্যের একটি বিশেষ অভাব মোচন করিয়াছেন, এক শূন্য পৃষ্ঠা পূণ্য করিয়াছেন | আমাদের ক্ষীণ ও বৈচিত্র্যহীন জীবনে যে-জাতীয় অভিগ্যতার একান্ত অভাব, তাহা তাঁহার উপন্যাসে আমরা যথেষ্ট পরিমাণে পাই | ইতিহাস-প্রসিদ্ধ, জাতীয় ভাগ্যবিধাতা বীরপুরুষদের জীবন্ত-চিত্র, গুরুতর রাজনৈতিক সংঘষে্র বিবরণ, যুদ্ধধবিগ্রহের রোমাঞ্চকর, উদ্দীপনাপূণ্য বণ্যনা --এই সমস্তই রমেশচন্দ্রের আখ্যান-বস্তু | দূতের ছদ্মবেশধারী শিবজীর মোগল-শিবিরে গমন, তাঁহার দুঃসাহসিক নিশীথ-অভিযানে, রুদ্রমণ্ডল দুগ্য-জয়ের জ্বলন্ত বণ্যনা, দিল্লি হইতে বিপদসংকুল গোপন পলায়ন, বিশ্বাসঘাতক চন্দ্ররাও-এর বিচারকালে শিবজীর দীপ্ত তেজ ও বজ্রকঠোর দৃঢ়প্রতিগ্যা, আহেরিয়ার মৃগয়া, রাঠোর-চন্দাবতের বংশপরম্পরাগত চির-বৈরিতা, রাজপুত-বীরের অসাধারণ স্বাধীনতাপ্রিয়তা ও রাজপুতরমণীর ভয়ংকর আত্মাহুতি---এই সমস্ত দৃশ্য আমাদের মনের গভীরতম স্তরে মুদ্রিত হয় | ভারত-ইতিহাসে চাণক্যের পর আর কোনো চতুর রাজনীতিগ্য আমাদের নিকট সুপরিচিত নহেন এবং চাণক্যের রাজনীতিতেও দক্ষিণ হস্ত অপেক্ষা বাম হস্তেরই, সরল অপেক্ষা কুটিল গতিরই সমধিক প্রভাব লক্ষিত হয় | বিশেষত, এই রাজনীতির উপর একটা মহান আদশে্র গৌরব কোনো জ্যোতিরেখা-পাত করে না | সুতরাং শিবজীর রাজনীতিকুশলতা, যশোবন্ত সিংহের সহিত সাক্ষাৎকালে তাঁহার উচ্ছ্বসিত বাগ্মিতা, লোকচরিত্রে অসাধারণ অভিগ্যতা, আবার তাঁহার কঠোর অলঙ্ঘনীয় শাসনপ্রথা, বিদ্রোহীর প্রতি ব্যাঘ্রবৎ হিংস্র ভয়ংকরমূতি্, দক্ষতর চাতুযে্র দ্বারা আরংজেবের শঠনীতির প্রতিরোধ---আমাদের মনে একটা নূতন রকমের কৌতূহল সৃষ্টি করে | 'জীবন-সন্ধ্যা'য় তেজসিংহ-দুজ্য়সিংহের মধ্যে একটা বংশগত চির-বিরোধ, প্রতাপসিংহের অদম্য উৎসাহ ও দৃঢ়প্রতিগ্যতা, ও তাঁহার সামন্তগণের অবিচলিত প্রভুভক্তি ইউরোপের মধ্যযুগের feudalism- এর সহিত ভারতের বীরযুগের একটা গভীর ভাবগত ঐক্যের সাক্ষ্য প্রদান করে | বিশেষত, দেশব্যাপী প্রলয়ের মধ্যে রাঠোর-চন্দাবতের বিরোধ একটি বিশালতর অগ্নিবেষ্টনের মাঝখানে এক অনিবা্ণ, ক্ষুদ্র অথচ আকাশস্পশী্ হোমানলশিখার ন্যায় জ্বলে | চতুদি্কে অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে এই স্থির, অকম্পিত অনলজিহ্বাটি ক্ষমাহীন প্রতিহিংসার মতো, ক্রূর দৈবের ঊধ্বো্ৎক্ষিপ্ত, নিশ্চল অঙ্গুলির মতো আরও তীব্র ও ভীষণ দেখায় | 'রাজসিংহ' -এ ইতিহাসের মহাকোলাহলের মধ্যে জেবউন্নিসার দীণ্য, রিক্ত হৃদয়ের আকুল ক্রন্দন যেরূপ করুণতর সুরে আমাদের কণ্যে প্রবেশ করে, এখানেও এই পূব্যপুরুষের রক্তরঞ্জিত গ্যাতিবিরোধ, বিদেশীয় আক্রমণকারীর প্রতি সাধারণ বিদ্বেষ ও সাধারণ দেশানুরাগের উচ্চসুর ছড়াইয়া আরও উচ্চতর, তীব্রতর সুরে আত্মপ্রকাশ করে | ইহাই এই উপন্যাসগুলিকে ইতিহাসের সমতলভূমি হইতে কাব্যের উন্নত, বন্ধুর স্তরে উঠাইয়া লইয়া গিয়াছে |
     চরিত্রসৃষ্টির দিক দিয়া রমেশচন্দ্র যে খুব উচ্চ কৃতিত্ব দেখাইতে পারেন নাই তাই পূবে্ই বলিয়াছি এবং ইহার জন্য ঐতিহাসিক উপন্যাসের প্রকৃতিই অনেকাংশে দায়ী | তথাপি, তাঁহার শিবজী একটি সম্পূণ্য রক্ততমাংসের মানুষ হইয়া উঠিয়াছেন | ইহার কারণ এই যে, শিবজী একটা অবিমিশ্র বীরত্বের বা নীতিগ্যানের মূত্য বিকাশ মাত্র নহেন; তাঁহার একটি সুস্পষ্ট রকমের ব্যক্তিত্ব আছে | তাঁহার চতুরতা, তাঁহার সাময়িক ভুলভ্রান্তি, তাঁহার অসংযত রোষোচ্ছ্বাস ও পরুষতা -- এইগুলিই তাঁহাকে সাধারণ উপন্যাসের আদশ্য-চরিত্র, প্রেমপ্রবণ, কিন্তু প্রাণহীন বীরের দল হউতে পৃথক করিয়া দিয়াছে | শিবজী বিশ্বাসঘাতকতাপূব্যক আফজল খাঁকে হত্যা করিয়াছিলেন কি না, সেবিষয়ে আধুনিক ঐতিহাসিকেরা বিশেষ নিবিষ্টচিত্তে বিচারবিতক্য আরম্ভ করিয়া দিয়াছেন ---অনেক যুক্তি-তক্য, প্রমাণ-প্রয়োগের দ্বারা শিবজীর চলিত্র হইতে এই কলঙ্ককালিয়া মুছিয়া ফেলিতে বদ্ধপরিকর হইয়াছেন | কিন্তু সাহিত্য-সমালোচকের পক্ষে ঐ বিতাণ্ডা নিতান্তই নিরথ্যক --বরঞ্চ সাহিত্যের দিক হইতে এই কলঙ্কের জন্যই শিবজীর চরিত্রে একটা অনন্যসুলভ বৈশিষ্ট্য, একটা সতেজ প্রাণস্পন্দনের পরিচয় পাওয়া যায় | যদি শিবজীর চরিত্র হইতে কলঙ্করেখা নিঃশেষে মুছিয়া যায়, তাহা হইলে আমাদের দেশপ্রীতি প্রসন্ন হইবে সন্দেহ নাই; কিন্তু শিবজী কলাবিদের হস্তচ্যুত হইয়া, যে অস্পষ্ট-জ্যোতিম্যণ্ডলবেষ্টিত আদশ্য রাজগণ প্রেতের ন্যায় ইতিহাসের মরুভূমিতে বিচরণ করিয়া বেড়ান, তাঁহাদের দলবৃদ্ধি করিবেন মাত্র |
     এই উপন্যাস দুইখানির মধ্যে আর একটি চরিত্রও বেশ সজীব হইয়া উঠিয়াছে ---তাহা মোগল সম্রাট আরংজেবের | আরংজেবের চরিত্র তাহার অসাধারণ জটিলতা ও গভীরতার জন্য প্রায়শই বঙ্গসাহিত্যের ঔপন্যাসিক ও নাট্যকারের দৃষ্টি আকষ্যণ করিয়াছে | রমেশচন্দ্র আরংজেবের সম্পূণ্য চিত্র দেন নাই, শিবজীর আখ্যায়িকার সহিত তাঁহার ষতটুকু সংস্রব ছিল, তাহাতেই আপনাকে সীমাবদ্ধ করিয়াছেন | আরংজেবের রাজ্যপ্রাপ্তির সময়ে ধম্যান্ধতা ও উচ্ছাভিলাষ মিশ্রিত হইয়া তাঁহার অন্তঃকরণে যে তুমুল কোলাহল তুলিয়াছিল এবং স্বাভাবিক ধম্যগ্যান ও স্নেহ-মমতার সহিত যে ভীষণ সংঘষ্য উপস্থিত করিয়াছিল, তাহার চিত্র রমেশচন্দ্রের সীমার বাহিরে পড়িয়াছে | কিন্তু তিনি আরংজেবের পরিণত বয়সের কুটিল চক্রান্ত ও সন্দেহদিগ্ধ রাজনীতির যে চমৎকার চিত্রটি দিয়াছেন, তাহার সত্যতা ও কলাসৌন্দয্য আমরা স্বতই অনুভব করি | দানেশন্দ ও রামসিংহের সহিত কথোপকথনের ভিতর দিয়া রমেশচন্দ্র প্রকৃত ঐতিহাসিক অন্তদৃষ্টির সহিত আরংজেবের আসল স্বরূপটি প্রকাশ করিয়াছেন, সমস্ত বাহ্যদৃশ্যের আবরণ ভেদ করিয়া একেবারে তাহার মম্যস্থলে গিয়া হাত দিয়াছেন | অল্প পরিসরের মধ্যে এবং বিশ্লেষণের সাহায্য ব্যাতিরেকেও আরংজেবের চরিত্রটি সুন্দর ফুটিয়া উঠিয়াছে | ইহাদের অনুরূপ কোনো চরিত্র 'জীবন-সন্ধ্যা'তে পাওয়া যায় না এবং এই হিসাবে 'জীবন-প্রভাত'ই শ্রেষ্ঠতর উপন্যাস|
     কিন্তু যদিও চরিত্র-সৃজনের দিক দিয়া 'জীবন-সন্ধ্যা' অপেক্ষা 'জীবন-প্রভাত' শ্রেষ্ঠতর, তথাপি অন্য একটি বিষয়ে প্রথমোক্ত উপন্যাসখানি আপন শ্রেষ্ঠতার পরিচয় দিয়াছে | রমেশচন্দ্র প্রতাপসিংহের জীবনব্যাপী স্বাধীনতাসংগ্রামের সমস্ত ভীষণতা যেন মম্যে

মম্যে অনুভব করিয়াছেন, সমগ্র দেশের উপর যে বিপদরাশি কৃষ্ণ-মেঘের ন্যায় ঘনীভূত হইয়াছে, তাহা যেন তাঁহার কল্পনাকে এক বৈদ্যুতিক শক্তিতে অনুপ্রাণিত করিয়াছে | এই ভীষণ সংকল্পের সমস্ত দুঃখক্লেশ, সমস্ত আত্ম্যত্যাগ যেন তাঁহার প্রাণের তারে ঘা দিয়া তাঁহার মুখ হইতে এক সুদীঘ্য সংগীতোচ্ছ্বাস বাহির করিয়াছে | এই সূক্ষ্ম ও গভীর অনুূভূতি তাঁহার কল্পনাকে উত্তেজিত করিয়া সেই অতীত heroic age -এর আশা-আকাঙ্খা, বিশ্বাস ও সাধারণ চিত্তবৃত্তি সম্বন্ধে তাঁহার দৃষ্টিকে অত্যন্ত পরিষ্কার করিয়া দিয়াছে | উপন্যাসখানির সব্যত্রই যে একটা গীতিকাব্যোচিত উন্মাদনার পরিচয় পাই, তাহা তাঁহাকে এমন কি নূতন চারণ-সংগীত রচনা করিতেও প্রণোদিত করিয়াছে | উপন্যাসের কথোপকথনের মধ্য দিয়াও একটা বাহুল্য-বজি্ত, পুরষোচিত ছন্দ বহিয়া গিয়াছে | এই সহজ, সরস, তেজস্বী ভাষার মধ্যে দৃঢ়পেশিবদ্ধ, কম্যঠ শরীরের ন্যায় একটা সতেজ সৌন্দয্য আছে | আমাদের বঙ্গসাহিত্যে এই বীরোচিত, ওজস্বী, অতি-নাটকীয়ত্ব-বজি্ত ভাষার প্রথম প্রবত্যনের গৌরব রমেশচন্দ্রের প্রাপ্য | এই গভীর ভাবগত ঐক্য 'জীবন-সন্ধ্যা'তে যেরূপ স্পষ্টভাবে অনুভব করা যায় 'জীবন-প্রভাত' -এ ততদূর নহে; এবং ইহাই 'জীবন-সন্ধ্যা'র অন্যান্য অভাব পূরণ করিয়া ইহাকে 'জীবন-প্রভাত' -এর সমকক্ষ স্থান দেয় | 'জীবন-প্রভাত' ও 'জীবন-সন্ধ্যা' বঙ্গসাহিত্যে দুইখানি চমৎকার ঐতিহাসিক উপন্যাস; বঙ্গসাহিত্যে তাহারা চিরস্মরণীয় হইয়া থাকিবে |
খ.  সামাজিক উপন্যাস

(৩)

রমেশচন্দ্র ঐতিহাসিক উপন্যাস ছাড়া দুইখানি সামাজিক উপন্যাস---'সংসার' (১৮৮৬) ও 'সমাজ' (১৮৯৩ ) লিখিয়াছেন | এখন এই দুইখানি উপন্যাসের আলোচনা করিলেই রমেশচন্দ্রের প্রতিভার প্রসার ও প্রকৃতি সম্বন্ধে একটা সম্পূণ্য ধারণা জন্মিবে |
     'সংসার' ও 'সমাজ' -এ রমেশচন্দ্র ইতিহাসের কোলাহল হইতে শান্ত পল্লীর সৌন্দযে্র মধ্যে, আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষুদ্র-দুঃখের কথায় ফিরিয়া আসিয়াছেন | এই দুইখানি উপন্যাসে তিনি নূতন শক্তির পরিচয় দিয়াছেন | তাঁহার কল্পনা এতদিন ইতিহাসের সুবিশাল ক্ষেত্রে স্মরণীয় ঘটনাসমূহের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল; সমাজ ও পরিবারের ক্ষুদ্র ব্যাপার লক্ষ্য করিতে তিনি অবসর পান নাই | কিন্তু তাঁহার শেষ উপন্যাসদ্বয়ে তিনি নিঃসন্দেহে প্রমাণ করিয়াছেন যে, ইতিহাসের বিশাল ও সমাজের সংকীণ্য, এই উভয় ক্ষেত্রেই তাঁহার তুল্য অধিকার ও সমান শক্তি আছে |
     'সংসার' ও 'সমাজ' -এ তিনি পল্লীগ্রামের পারিবারিক জীবনের এমন একটি সুন্দর, রসপূণ্য সহানুভূতিমূলক চিত্র দিয়াছেন, যাহা বঙ্গসাহিত্যে নিতান্ত সুলভ নহে | প্রথম দৃষ্টিতে ইহার মধ্যে কিছু বিশেষত্ব দেখা যায় না, কোনোরূপ উচ্চাঙ্গের সৃজনীশক্তি, উচ্চস্তরের সমালোচনা লক্ষ্য হয় না; মনে হয় যেন সমস্তই কেবল বাস্তব বণ্যনা, পল্লীসমাজের নিখুঁত ফটোগ্রাফ মাত্র | ইংরেজ ঔপন্যাসিকদের মধ্যে Jane Austen পড়িতে পড়িতে অনেকটা এইরূপ ভাবের উদয় হয় | লেখিকা এমন সহজ, সরলভাবে ঘটনাবিরল, প্রাত্যহিক জীবনের চিত্র দিয়া যান, এতই সাবধানে বিশ্লষণ-বাহুল্য ও গভীরতা বজ্যন করেন যে, আনরা মনে করি যে, ইহার মধ্যে বিশেষ কিছু কলাকৌশল নাই এবং কেবল সূক্ষ্ম পয্যবেক্ষণশক্তির অধিকারী হইলেই আমরাও ঐরূপ লিখিতে পারিতাম | কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ইহার অপেক্ষা ভ্রান্ত ধারণা আর কিছুই নাই; খুব উচ্চ রকমের কলাকৌশল না থাকিলে নিতান্ত সাধারণ উপাদান হইতে এত সুন্দর মম্যস্পশী্ উপন্যাস রচনা করা যায় না | যে আট্ আত্মগোপন করিতে পারে, নিজের সমস্ত বাহ্য লক্ষণ প্রচ্ছন্ন রাখিতে পারে তাহাই উচ্চতম আট্ |
     আধুনিক উপন্যাসে যে বিশ্লেষণ ও মন্তব্যের আতিশয্য দেখা যায়, তাহাকে কোনো মতেই অবিমিশ্র গুণ বলিয়া মনে করা যাইতে পারে না | বক্তব্যের সহিত মন্তব্যের, বণ্যনার সহিত বিশ্লেষণের একটা স্বাভাবিক সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন; বিশ্লেষণের অতিশয্যের দ্বারা সেই সামঞ্জস্য নষ্ট হইলে আটে্র ক্ষতি হয় | বক্তব্য বিষয়টি বেশ গভীররসাত্মক না হইলে, মানব-মনের নিগূঢ় লীলার পরিচায়ক না হইলে, তাহা অতিরিক্ত বিশ্লেষণের ভার সহ্য করিতে পারে না; নিতান্ত সাধারণ বা শূন্যগভ্য ব্যাপারকে চিরিয়া দেখাইয়া কোনো লাভ নাই | বিশেষত, যে বিশ্লেষণ দুই-এক কথার সারা যায়, সংকেত বা ইঙ্গিতের দ্বারা ফুটাইয়া তোলা যায়, তাহাকে আধুনিক ঔপন্যাসিকেরা পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা টানিয়া বুনিয়া পাঠকের ধৈয্যচ্যুতি ঘটান ও সমস্ত বিষয়টিকে নিতান্ত তিক্ত ও নীরস করিয়া ফেলেন | যাহা পাঠকের সহজ বুদ্ধি স্বাভাবিক সহৃদয়তা বা কল্পনাশক্তির উপরে অনায়াসে ছাড়িয়া দেওয়া যাইতে পারে, তাহাকেও সুদীঘ্য বিশ্লেষণের সঙ্গে জুড়িয়া দিয়া লেখক প্রকারান্তরে পাঠকের বুদ্ধির অপমানই করেন | এই হইল একদিক; আর একদিকে আমরা উপন্যাস-সাহিত্যের প্রারম্ভে ---'আলালের ঘরের দুলাল' -এর মতো উপন্যাস দেখিতে পাই | এখানে মন্তব্য ও সমালোচনার একান্ত অভাব; লেখক কতকগুলি শুষ্ক ঘটনা লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন মাত্র, বিশ্লেষণের দ্বারা তাহার অন্তনিহিত অথ্যটি বাহির করিতে কোনো চেষ্টা করেন নাই; তাহার নিজের মন্তব্যের দ্বারা সেই ঘটনার কঙ্কালরাশি হইতে কোনো প্রাণের রস নিষ্কাশিত করেন নাই, মানব-জীবন সম্বন্ধে কোনো দভীর ও ব্যাপক ধারণা ফুটাইয়া তোলেন নাই | এইখানেই বিশ্লেষণের উপকারিতা | বিশ্লেষণ একেবারে বাদ দিলে উপন্যাস আটে্র গৌরব ও গভীরতা হারায়; আবার বিশ্লেষণে অযথা ভারাক্রান্ত হইলে উপন্যাসের স্বচ্ছন্দগতি নষ্ট হয় এবং উহা নিজী্ব ও রসহীন হইয়া পড়ে |
     রমেশচন্দ্রের এই দুইখানি উপন্যাসে বণ্যনার অনুপাতে বিশ্লেষণ অনেকটা অপ্রচুরই বলিতে হইবে | তিনি মানব-হৃদয়ের গভীরতম তলদেশে, তাহার নিগূঢ় রহস্যের জন্মস্থানে প্রায়ই অবতরণ করেন নাই | তিনি জীবনের প্রাথমিক ভাবগুলি লইয়াই আলোচনা করিয়াছেন | তিনি যে সমস্ত চরিত্র সৃষ্টি করিয়াছেন, তাহাদের মধ্যে বিশেষ গভীরতা বা জটিলতা নাই, খুব গুরুতর অন্তবিপ্লবেরও কোনো চিহ্ন পাওয়া যায় না | বঙ্কিমচন্দ্রের নগেন্দ্রনাথ বা গোবিন্দলালের মতো তাঁহার চরিত্রগুলির আভ্যন্ততরীণ বিকাশ ও প্রবল অনুশোচনা তিনি

ফুটাইয়া তুলিতে পারেন নাই | 'সংসার' -এ শরৎ ও সুধার প্রেম-বিকাশ ও অন্তদ্বন্দের চিত্র নিতান্ত সাধারণ ও বিশেষত্বহীন হইয়াছে; কোনো প্রবল আবেগ বা দুদ্যমনীয় মনোবৃত্তির বৈদ্যুতিক শক্তি তাহাদের মধ্যে খেলিয়া যায় নাই | এই সমস্ত বিষয়ে রমেশচন্দ্রের স্বাভাবিক পারদশি্তা ছিল বলিয়া মনে হয় না | ইতিহাসের ক্ষেত্রে তাঁহার কল্পনা উত্তেজিত হইলে ইহা সময়ে সময়ে একটা গীতিকাব্যেচিত উন্মাদনায় আত্মপ্রকাশ করিয়াছে; কিন্তু সামাজিক জীবনের শান্ত, ক্ষীণ প্রবাহের মধ্যে ইহা কেবল সূক্ষ্ম পয্যবেক্ষণশক্তিতে পয্যবসিত হইয়াছে, কোনোরূপে উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠে নাই | রমেশচন্দ্র জীবনের শান্ত প্রবাহ শান্তভাবে অনুসরণ করিয়াছেন, ইহার গভীর আবত্য ও সমস্যাসংকুল জটিলতার মধ্যে প্রবেশ করেন নাই |
     কিন্তু এই অপেক্ষাকৃত নিম্নস্তরে তিনি যে সুন্দর, সজীব চরিত্রগুলি সৃষ্টি করিয়াছেন, তাহারা বঙ্গসাহিত্যে অতুলনীয় | 'সংসার' -এর ষষ্ঠ পরিচ্ছেদে তারিণীবাবু ও হেমচন্দ্রের কথোপকথনের দ্বারা বিষয়বুদ্ধিশালী তারিণীবাবুর চরিত্রটি কেমন সুন্দর ফুটিয়া উঠিয়াছে | অবশ্য তারিণীবাবুর মধ্যে বিশেষ কোনও গভীরতা নাই; কিন্তু তাঁহার উপর বাস্তবতার ছাপটি একেবারে অবিসংবাদিত; বাস্তব পল্লীজীবনে তাঁহার সহিত আমাদের প্রায়ই সাক্ষাৎ হইয়া থাকে | আবার অল্প কয়েকটি রেখার দ্বারা বিন্দু, কালী ও উমার মধ্যে চরিত্রগত ও অবস্থাগত প্রভেদটিও অতি সন্দরভাবে ব্যক্ত করা হইয়াছে; উমার হাস্যোজ্জ্বল, ঐশ্বয্যমণ্ডিত তরুণ জীবনে ভবিষ্যৎ দুঃখের ক্ষুদ্র বীজটি ও তাহার ক্রমপরিণতি লেখক খুব সুকৌশলেই দেখাইয়াছেন | এমন কি কালীতারার তিনটি খুড়িশাশুড়িও দুই-একটি কথার মধ্যেই খুব সজীব ও পরস্পর হইতে পৃথকভাবেই ফুটিয়া উঠিয়াছেন | রমেশচন্দ্রের চরিত্রসৃজন খুব গভীর না হইলেও সম্পূণ্য বাস্তব ও স্বাভাবিক হইয়াছে এবং এই গভীরতার অভাবই চরিত্রগুলির স্বাভাবিকতার অন্যতম কারণ | রমেশচন্দ্রের উপন্যাসের পাতায় আমরা যে সমস্ত নর-নারীর দশ্যন পাই, বাস্তব সামাজিক জীবনে তাহারা আমাদের চিরসহচর ---কেননা, আমাদের সমাজের সাধারণ জীবনে গভীর জটিল ভাবের লোক প্রায়ই আমাদের নয়নগোচর হয় না |
     সরল, দরিদ্র পল্লীবাসীর প্রতি করুণ ও গভীর সহানুভূতি এই বাস্তব কাহিনীকে একটা ভাবগত ঐক্য দিয়াছে এবং আটে্র উচ্চস্তরে উঠাইয়া লইয়াছে | ধন ও বংশগৌরব অপেক্ষা হৃদয়ের মিলন যে জীবনে অধিক সুখের আকর ---এই সত্যই রমেশচন্দ্র দাশ্যনিকের যুক্তির দ্বারা নহে, আটি্স্টের রসবোধের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত করিয়াছেন | 'সংসার' উপন্যাসে তাঁহার সমাজ-সংস্কারের উৎসাহ তাঁহার কলাকৌশলকে ছাড়াইয়া যায় নাই; যদিও বিধবাবিবাহের বৈধতা প্রমাণ করা তাঁহার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল, তথাপি বত্যমান উপন্যাসে এই উদ্দেশ্য উদ্দাম হইয়া উঠিয়া আটে্র সীমা লঙ্ঘন করে নাই | শরৎ ও সুধার জীবন-কাহিনী ও প্রীতির সম্পক্যটি এমন করুণ সহানুভূতির সহিত চিত্রিত হইয়াছে যে, তাহাদের বিবাহকে আমরা আটে্র অনুমোদিত ও সম্পূণ্য স্বাভাবিক পরিণতি বলিয়াই গ্রহণ করি; সৌভাগ্যক্রমে সংস্কারকের উদ্দেশ্য প্রচ্ছন্নই থাকিয়া যায় |
     কিন্তু পরবতী্ উপন্যাসে সমাজ-সংস্কারের এই উৎসাহ একেবারে উদবেল হইয়া উঠিয়া আঁটকে বহু পশ্চাতে ফেলিয়া গিয়াছে | 'সমাজ' উপন্যাসখানিকে বেশ সহজেই দুই ভাগে লিভক্ত করা যায়----প্রথম অংশের ঘটনাস্থলে 'তালপুকুর' ও প্রধান উদ্দেশ্য বাস্তব-চিত্রণ; দ্বিতীয় অংশে গল্পটি এক সম্পূণ্য নূতন ধারায় প্রবাহিত হইয়াছে এবং একটা নূতন পরিবারের ইতিহাস ও ভাগ্যের সহিত জড়িত হইয়া পড়িয়াছে | এই অংশের ঘটনাস্থল প্রধানত তালপুকুরের নিকটবতী্ সনাতনবাটী গ্রাম; ইহার নায়ক সনাতনবাটীর জমিদার-বংশ এবং ইহার সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য জাতিভেদের বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণা | এই দুই অংশের মধ্যে যোগসূত্র খুব সহজ ও স্বাভাবিক হয় নাই | প্রথম অংশের প্রধান রস আমাদের পূব্য-পরিচিত তারিণীবাবুর বৃদ্ধবয়সে পুনবি্বাহের ব্যাপার লইয়া; ইহাতে হাস্যরস ও ব্যঙ্গেরই প্রাধান্য; তবে পদদলিতা প্রথম স্ত্রীর কাহিনীটি এক স্বল্পভাষী করুণায় অভিষিক্ত হইয়া উঠিয়াছে | কিন্তু ইহার যে দৃশ্যটি সবা্পেক্ষা বিচিত্র ও বৈশিষ্ট্যপূণ্য তাহা চতুথ্য পরিচ্ছেদে তারিণীবাবু ও গোকুলচন্দ্রের বিবাহবিষয়ক আলোচনা | এ যেন একেবারে শেয়ানে শেয়ানে কোলাকুলি | আমাদের পারিবারিক জীবনে এরূপ রাজনীতিসুলভ কূটবুদ্ধির, বিনয়-সৌজন্যের আবরণে এরূপ ক্ষুরধার চাতুযে্র এমন সুন্দর, বাস্তবরসপূণ্য দৃশ্য বঙ্গসাহিত্যে আর কোথাও পাই না | নববধূ বালিকা গোপবালার বিষয়বুদ্ধি ও উচ্চাভিলাষের যে সংকেত পাওয়া যায়, তাহাই আমাদিগকে তাহার গৃহণীপদে প্রতিষ্ঠার পরের কূটবুদ্ধি ও নিম্যমতার জন্য প্রস্তুত রাখে | আবার, 'ঠাকুমা' ও 'দাদামহশয়ের' ভিন্ন ভিন্ন দিক হইতে দাম্পত্যনীতির সরল ব্যাখ্যার অম্ল-মধুর স্বাদটি আদশ্য-ক্লিষ্ট রুচিকে সজীব করিয়া তোলে | দ্বিতীয় অংশে, বাস্তব বণ্যনার অভাব না থাকিলেও, লেখকের উদ্দেশ্য ও সংস্কার-প্রবৃত্তিই অত্যন্ত প্রবল হইয়া উঠিয়াছে | রমাপ্রসাদ সরস্বতী যেন একটি মূতি্মান শাস্ত্রগ্যান; হিন্দু-সমাজের বিকৃত আচার-অনুষ্ঠানগুলির উচ্ছেদ-সাধনই তাঁহার জীবনের প্রধান ব্রত | যোগমায়ার প্রতি প্রেম ও তাহার সহিত পুনমি্লনই তাঁহার প্রাণের একমাত্র সজীব অংশ, এইখানেই সাধারণ মানুষের সহিত তাঁহার কথঞ্চিত যোগ দেখা যায় | সুশীলার সহিত দেবীপ্রসাদের বিবাহ ঘটাইয়া রমেশচন্দ্র তাঁহার সংস্কারোচিত উৎসাহকে একেবারে নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা দিয়াছেন, আমাদের সমাজের বাস্তব অবস্থাকে একেবারে সম্পূণ্য উপেক্ষা করিয়াছেন | শরৎ-সুধার বিবাহকে যেমন আমরা তাহাদের পূব্যজীবনের একটা স্বাভাবিক পরিণতিরূপেই দেখি, সুশীলা ও দেবীপ্রসাদের ক্ষেত্রে সেইরূপ কোনো সমথ্নযোগ্য কারণ পাই না; এ বিবাহ সংস্কারকের অত্যুৎসাহের দ্বারাই সম্পাদিত হইয়াছে, আটে্র কোনো ধার ধারে নাই | বিশেষত, রমেশচন্দ্র তাঁহার উৎসাহাধিক্যে অন্ধ হইয়া বিধবা-বিবাহ ও অসবণ্য-বিবাহের যে আসল সমস্যা তাহার সম্মুখীন হন নাই; বিবাহের পর যখন সমাজে সমস্যাটি জটিল হইয়া উঠিবার কথা তখনই নিতান্ত সুবিধাজনকভাবে তাহার উপর যবনিকাপাত করিয়াছেন | প্রত্যেক অভিগ্য পাঠকই ভালোরূপ জানেন যে, জনসাধারণের যে জয়নাদের মধ্যে উপন্যাসের পরিসমাপ্তি হইয়াছে, বাস্তব-জীবনে সেইরূপ ঘটিবার কোনো সম্ভাবনা নাই; সেখানে জনসাধারণের