Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা- ৩৭, ৩৮ ও ৩৯

2020-06-09
কোলাহ সম্পূণ্য বিভিন্ন আকারই ধারণ করিয়া থাকে | এইখানে রমেশচন্দ্র কলাকৌশলের সীমা অতিক্রম করিয়াছেন এবং তাঁহার নিকট অপ্রত্যাশিত এক বাস্তবভীরুতার পরিচয় দিয়াছেন |
     পূবে্ যাহা বলা হইয়াছে, এইবার তাহার একটি সংক্ষিপ্তসার দিয়া অধ্যায়ের উপসংহার করিব | রমেশচন্দ্র ঐতিহাসিক ও সামাজিক দুই প্রকার উপন্যাসেই নিজ ক্ষমতার পরীক্ষা করিয়াছেন |কোলাহ সম্পূণ্য বিভিন্ন আকারই ধারণ করিয়া থাকে | এইখানে রমেশচন্দ্র কলাকৌশলের সীমা অতিক্রম করিয়াছেন এবং তাঁহার নিকট অপ্রত্যাশিত এক বাস্তবভীরুতার পরিচয় দিয়াছেন |
     পূবে্ যাহা বলা হইয়াছে, এইবার তাহার একটি সংক্ষিপ্তসার দিয়া অধ্যায়ের উপসংহার করিব | রমেশচন্দ্র ঐতিহাসিক ও সামাজিক দুই প্রকার উপন্যাসেই নিজ ক্ষমতার পরীক্ষা করিয়াছেন | ঐতিহাসিক উপন্যাসে তিনি সমধিক কৃতিত্ব দেখাইয়াছেন --তাঁহার 'জীবন-প্রভাত' ও 'জীবন-প্রভাত' ও 'জীবন-সন্ধ্যা' বঙ্গসাহিত্যে খাঁটি ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলির শীষ্যস্থান অধিকার করিয়াছে | রমেশচন্দ্রের ঐতিহাসিক উপন্যাসের অনেকগুলি গুণ আছে---তিনি বণি্ত যুগের বিশেষত্বটুকু উপলব্ধি করেন, নিজ রক্তের মধ্যে বীরত্ব -কাহিনীর উন্মাদনা অনুভব করেন ও বণি্ত বিষয়ের মধ্যে একটা ভাবগত ঐক্য স্থাপন করিতে পারেন | অবশ্য ঐতিহাসিক উপন্যাসের আর একটি গুণ --সাধারণ সামাজিক জীবনের উপর ইতিহাসের বিশাল ঘটনাগুলির প্রভাব-চিত্রণ--তাঁহার রচনার নাই; কিন্তু ইতিহাস সম্বন্ধে গভীর গ্যানের অভাবই ইহার কারণ | সামাজিক উপন্যাসে রমেশচন্দ্রের বিশেষ গুণ তাঁহার সূক্ষ্ম পয্যবেক্ষণ-শক্তি ও পল্লীগ্রামের দুঃখ-দারিদ্র্যপূণ্য জীবনের প্রতি করুণ ও অকৃত্রিম সহানুভূতি | তাঁহার সামাজিক উপন্যাসে কোনো গভীর বিশ্লেষণ নাই, কেননা তিনি যে সমস্ত চরিত্র সৃষ্টি করিয়াছেন তাহাদের মধ্যে কোনো বিশ্লেষণযোগ্য জটিলতা নাই | শরৎচন্দ্র তাঁহার 'পল্লীসমাজ' -এ যে গভীর স্তরে অবতরণ করিয়াছেন, তাহা রমেশচন্দ্রের ক্ষমতার অতীত | কিন্তু ইহার একটি কারণ এই যে, শরৎচন্দ্র পল্লীসমাজের বিকারগুলিকে অতি সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করিয়াছেন; রমেশচন্দ্র তাহার স্বাভাবিক সুস্থ অবস্থারই বণ্যনা করিয়াছেন, বিকৃতির দিকটা কেবল উল্লেখ করিয়াই ক্ষান্ত হইয়াছেন, তাহাকে ফুটাইয়া তোলেন নাই | সুতরাং শরৎচন্দ্র সমাজদেহের ক্ষতপ্রদেশে যত গভীরভাবে ছুরিকা চালাইয়াছেন, রমেশচন্দ্র সমাজের সুস্থদেহে সেরূপ পারেন নাই | কিন্তু এই বিশ্লেষণ-শক্তির অপ্রাচুয্য সত্ত্বেও তাঁহার চরিত্রগুলি বেশ সজীব ও বাস্তব হইয়া উঠিয়াছে | অনেক সময় তাঁহার লঘু ও অন্তরঙ্গ স্পশ্যটি ইংরাজি সাহিত্যের মহিলা-ঔপন্যাসিকদের কথা স্মরণ করাইয়া দেয় | রমেশচন্দ্র আমাদের অনেক মহিলা-ঔপন্যাসিকের অপেক্ষা অধিক মাত্রায় স্ত্রীজাতিসুলভ সাহিত্যিক গুণের অধিকারী | সামাজিক উপন্যাসে তাঁহার প্রধান অপূণ্যতা একটা প্রবল আবেগের অভাব --মানব-জীবনের সংকট-মুহূত্যগুলি তাঁহার কল্পানাশক্তিকেঁ খুব গভীরভাবে আন্দোলিত করে নাই | এইখানেই লঙ্কিমচন্দ্রের সহিত তাঁহার প্রধান প্রভেদ | বঙ্কিমের আবেগ বা উন্মাদনা তাঁহার নাই; বঙ্কিমের ন্যায় জীবনের রহস্যময় দুগ্যেয়তা, জীবন-সমস্যার জটিলতা, জীবনের চরম মুহূত্যগুলির ভাবৈশ্বয্য তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করিতে পারেন নাই | পক্ষান্তরে বঙ্কিম অপেক্ষা তাঁহার সত্যনিষ্ঠা অধিক ছিল; তাঁহার উপন্যাসে বঙ্কিমের বিচিত্র রোমান্স ও ঐন্দ্রজালিক মোহ নাই | কিন্তু তাঁহার সকল সত্যনিষ্ঠাই কোনো কোনো সময়ে তাঁহার শ্রেষ্ঠত্বের কারণ হইয়াছে; 'মাধবীকঙ্কণ' -এ তিনি ব্যথ্যপ্রেমের যে অগ্নিজ্বালাময় চিত্র দিয়াছেন, বঙ্কিমের উপন্যাসের রত্নভাণ্ডারের মধ্যেও তাহার অনুরূপ দৃশ্য আমরা কোথাও খুঁজিয়া পাই না |

ষষ্ঠ অধ্যায়

বঙ্কিমচন্দ্র
১.  উপন্যাস ও রোমান্স

বঙ্কিমের উপন্যাসমূহের ঐতিহাসিকতা সম্বন্ধে আমাদের বক্তব্য শেষ হইয়াছে | এখন কেবল কলাকৌশলের দিক দিয়া তাঁহার উপন্যাসাবলীর কলানুক্রমিক বিচার করিতে হইবে |
     বঙ্কিমের হাতে বাংলা উপন্যাস পূণ্য যৌবনের শক্তি ও সৌন্দয্য লাভ করিয়াছে | রমেশচন্দ্রর উপন্যাসে যে ক্ষীণতা, কল্পনাদৈন্য ও ভাবগভীরতার অভাবের পরিচয় পাই, বঙ্কিমের উপন্যাস সেই সমস্ত ত্রুটি হইতে মুক্ত | তাঁহার সব কয়টি উপন্যাসের মধ্যেই একটা সতেজ ও সমৃদ্ধ ভাব খেলিয়া যাইতেছে, জীবনের গভীর রস ও বিকাশগুলি ফুটিয়া উঠিয়াছে এবং জীবনের মম্যস্থলে যে নিগূঢ় রহস্য আছে, তাহার উপর আলোকসম্পাত করা হইয়াছে | অবশ্য আধুনিক বাস্তব-প্রবণতার জন্য উপন্যাস সম্বন্ধে আমাদের রুচি ও আদশে্র অনেকটা পরিবত্যন হইয়াছে; উপন্যাসের ক্ষেত্রে আমরা যেরূপ নিখুঁত বাস্তবতার দাবি করি, রোমান্সের আকাশ-বাতাসে পরিবধি্ত বঙ্কিম ততখানি দাবি পূরণ করেন না | কিন্তু জীবন সম্বন্ধে একটা সাধারণ সত্য ধারণা দেওয়া যদি ঔপন্যাসিকের কৃতিত্ব হয় এবং বাস্তবতা যদি সেই সত্যলাভের অন্যতম উপায়মাত্র হয়, তাহা হইলে বাস্তবাতিশয্যের অভাব বঙ্কিমের গুরুতর দোষ বলিয়া বিবেচিত হইবে না; কেননা, তাঁহার সমস্ত উপন্যাসের উপরেই একটি বৃহত্তর সত্যের ছাপ বেশ সুস্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে | তথ্যের রন্ধগুলি তিনি কল্পনার দ্বারা পূরণ করিয়াছেন; কিন্তু মোটের উপর তাঁহার জীবন-চিত্রণ সত্যানুগামী হইয়া উঠিয়াছে | তিনি জীবনকে বিচিত্র রসে পূণ্য ও কল্পনার ইন্দ্রজালে বেষ্টন করিয়াছেন বটে, কিন্তু সত্যের সূযা্লোকের পথ অবরুদ্ধ করেন নাই | ইহাই তাঁহার চরম কৃতিত্ব; তিনি সত্যকে রসহীনতা ও নিজীবতার উপর প্রতিষ্ঠিত করেন নাই | জীবনের সত্য চিত্র দিতে গিয়া তাহাকে শুষ্ক করিয়া ফেলেন নাই, পরন্ত বিচিত্র রসের উচ্ছ্বাসের মধ্যেই ইন্দ্রধনুবণ্য-রঞ্জিত সত্যের সাক্ষাৎ পাইয়াছেন | এ সমস্ত বিষয়ের সাধারণ আলোচনা পরে হইবে | এখন আমরা বঙ্কিমের প্রত্যেক উপন্যাস বিশ্লেষণ করিয়া উহারা কতদূর পয্ন্ত মানব-হৃদয়ের গভীরস্তরে প্রবেশ করিয়াছে, ও জীবন সম্বন্ধে সত্য ধারণা ফুটাইয়া তুলি়য়াছে, তাহার আলোচনা করিতে চেষ্টা করিব |
     বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসগুলি স্থূলত দুইভাগে বিভক্ত ---এক শ্রেণী সম্পূণ্য বাস্তব, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের বণ্যনা ও ব্যাখ্যাই তাহাদের মুখ্য উদ্দেশ্য | দ্বিতীয় শ্রেণী ঐতিহাসিক বা অসাধারণ ঘটনাবলীর উপরে প্রতিষ্ঠিত | অথ্যাৎ উপন্যাসে 'novel' ও 'romance' বলিয়া যে দুইটি প্রধান বিভাগ আছে, বঙ্কিমের উপন্যাসেও সেই দুইটি বিভাগ বত্যমান |
     এখন 'novel' ও 'romance'-এর মধ্যে যে মৌলিক প্রভেদটুকু আছে, তাহা আমাদিগকে স্পষ্ট করিয়া বুঝিতে হইবে | প্রধানত উহাদের মধ্যে যে প্রভেদ তাহা বাস্তব-গুণের আপেক্ষিক প্রাধান্য লইয়া | 'Novel' অবিমিশ্রভাবেই বাস্তব, ইহার মধ্যে কল্পনার ইন্দ্রধনুরাগসমাবেশের অবসর অত্যন্ত অল্প | ইহার প্রধান কাজ সমসাময়িক সমাজ ও পারিবারিক জীবন-চিত্রণ; সত্য-পয্যবেক্ষণ ও সূক্ষ্ম বিশ্লেষণই ইহার প্রধান গুণ | যতদূর সম্ভব সমস্ত অসাধারণত্বই ইহার বজ্যনীয়, কেবল আমাদের জীবন-চিত্রণ; সত্য-পয্যবেক্ষণ ও সূক্ষ্ম বিশ্লেষণই ইহার প্রধান গুণ | যতদূর সম্ভব সমস্ত অসাধারণত্বই ইহার বজ্যনীয়, কেবল আমাদের জীবন-প্রবাহের মধ্যে যে সমস্ত দুদ্যমনীয় প্রবৃত্তি উচ্ছ্বসিত, যে সমস্ত সংঘাত বিক্ষুব্ধ ও মুখরিত হইয়া উঠে, সেই রহস্যমণ্ডিত সত্যগুলির দ্বারাই ইহা অসাধারণত্বের সাময়িক স্পশ্য লাভ করিতে পারে | Romance' -এর বাস্তবতা অপেক্ষাকৃত মিশ্র ধরনের; ইহা জীবনের সহজ প্রবাহ অপেক্ষা তাহার অসাধারণ উচ্ছ্বাস বা গৌরবময় মুহূত্যগুলির উপরেই অধিক নিভ্যর করে | অন্তরের বীরোচিত বিকাশগুলি, মনের উঁচুসুরে বাঁধা ঝংকারগুলি, জীবনের বণ্যবহুল শোভাযাত্রা-সমারোহ --ইহাই মুখ্যত রোমান্সের বিষয়বস্তু | সেইজন্য সূযা্লোক-দীপ্ত, অতিপরিচিত বত্যমান অপেক্ষা কুহেলিকাচ্ছন্ন, অপরিচিত অতীতের দিকেই ইহার স্বাভাবিক প্রবণতা | অতীতের বিচিত্র বেশ-ভূষা ও আচার-ব্যবহার, অতীতের আকাশ-বাতাসে লঘুমেঘখণ্ডের মতো যে সমস্ত অসাধারণত্বের মধ্যেও রোমান্স বাস্তব-জীবনের সহিত একটি নিগূঢ় ঐক্য হারায় না; জীবনের সহিত যোগসূত্র হারাইলেই ইহা একটি সম্পূণ্য অসম্ভব পরীর গল্পের মতো হইয়া পড়িবে | মধ্যযুগের রোমান্স এইরূপ সম্পূণ্য বাস্তব-সম্পক্যশূন্য ছিল বলিয়া তাহার উপন্যাস-শ্রেণী মধ্যে পরিগণিত হইবার স্পধা্ ছিল না; তাহার অন্তহীন, মায়াঘন অরণ্যানীর মধ্যে আমাদের বাস্কব-জীবনের প্রতিধ্বনি বড়ো একটা শুনা যাইত না | কিন্তু আধুনিক যুগের যে প্রবধ্যমান বাস্তব-প্রবণতার মধ্যে সামাজিক উপন্যাস জন্মগ্রহণ করিয়াছে, তাহা রোমান্সের উপরেও নিজ প্রভাব বিস্তার করিতে ছাড়ে নাই | আধুনিক রোমান্সও

বাস্তবতার মন্ত্রে অনুপ্রাণিত হইয়া সত্যের কঠোর সংযম স্বীকার করিয়া লইয়াছে | রোমান্সের জগতেও আর অতিপ্রাকৃত বা অবিশ্বাস্যের কোনো স্থান নাই | রোমান্স-লেখককেও এখন বাস্তব বা ঐতিহাসিক ভিত্তির উপর সৌধ নিমা্ণ করিতে হয়, মনস্ত্ববিশ্লেষণের দ্বারা কায্য-কারণ-সম্বন্ধ স্পষ্ট করিতে হয়, ইহার বাতাসে যে বিচিত্র বণে্র ফুল ফুটে, তাহাকে মৃত্তিকার সহিত সম্পকা্ন্বিত করিয়া দেখাইতে হয় | তবে সামাজিক উপন্যাসের সঙ্গে ইহার একমাত্র প্রভেদ যে, বাস্তবতার বন্ধন ইহাকে একেবারে নাগপাশের মতো সুদৃঢ়ভাবে জডা়ইয়া ধরে নাই, ইহার মধ্যে বিচিত্র ও অসাধারণ ব্যাপারের অপেক্ষাকৃত অধিক অবসর আছে | সাধারণ উপন্যাসের ন্যায় রোমান্সের ক্ষেত্রে বাস্তবতার দাবি এত প্রবল বা সব্যগ্রাসী নহে | বঙ্কিমচন্দ্রের রোমান্সগুলি আলোচনার সময়ে সামাজিক উপন্যাসের সহিত রোমান্সের এই মৌলিক প্রভেদটি আমাদের মনে রাখিতে হইবে |
     বঙ্কিমচন্দ্রের নিম্নলিখিত উপন্যাসগুলিকে রোমান্স-শ্রেণীভুক্ত করা যাইতে পারে : ১.  দুগে্শনন্দিনী (১৮৬৫ );  ২. কপালকু়ণ্ডলা (১৮৬৬);  ৩.  মৃণালিনী (১৮৬৯); ৪.  যুগলাঙ্গীুরীয় ( ১৮৭৪ );  ৫. চন্দ্রশেখর ( ১৮৭৫ );   ৬.  রাজসিংহ (১৮৮১ );   ৭.  আনন্দমঠ(১৮৮২); ৮. দেবী চৌধুরাণী (১৮৮৪ );৯. সীতারাম (১৮৮৭) | অবশ্য এই সমস্ত উপন্যাসে রোমান্সের উপাদান সমানভাবে ঘনসন্নিবিষ্ট নহে---কোথাও -বা রোমান্স উপন্যাসের আকাশ-বাতাসে সব্যত্র পরিব্যাপ্ত হইয়া পড়িয়াছে, কোথাও-বা সামাজিক জীবনের রন্ধপথে মেঘান্তরালবতী্ লিদ্যুৎশিখার ন্যায় একটা অনৈসগি্ক দীপ্তিতে আত্মপ্রকাশ করিয়াছে | আবার তাহাদের সাহিত্যিক সৌন্দয্যও সকল ক্ষেত্রে সমান হয় নাই; কোথাও-বা বাস্তবতার সহিত অসাধারণত্বের একটি চমৎকার সমন্বয় সাধিত হইয়া উপন্যাসখানি অনিন্দনীয় সৌন্দয্যমণ্ডিত হইয়া উঠিয়াছে; কোথাও-বা অসামঞ্জস্য প্রকট হইয়া উপন্যাসকে অবাস্তবতাদুষ্ট করিয়াছে ও আমাদের বিচারবুদ্ধি ও সৌন্দয্যবোধকে পীড়িত করিয়া তুলিয়াছে | এই সমস্ত দিক দিয়া আমাদিগকে উপন্যাসগুলির বিচার করিতে হইবে |
     দুগে্শনন্দিনী' বঙ্কিমের সব্যপ্রথম উপন্যাস | ইহা ১৮৬৫ খৃষ্টাব্দে প্রথম প্রকাশিত হয় | শচীশবাবু তাঁহার বঙ্কিম-জীবনীতে লিখিয়াছেন যে, বঙ্কিমের ভ্রাতারা দুগে্শনন্দিনী সম্বন্ধে বিশেষ অনুকূল মত প্রকাশ করেন নাই এবং অনেকটা তাঁহাদের প্রতিকূল মন্তব্যে নিরুৎসাহ হইয়াই বঙ্কিম উহার মুদ্রাঙ্কন কিছুদিন স্থগিত রাখেন | অবশ্য তাঁহাদের প্রতিকূল সমালোচনার হেতু কী ছিল, তাহা আমরা জানি না; কিন্তু সমসাময়িক সাহিত্যের প্রতি দৃষ্টিপাত করিলে এই বিরুদ্ধ মত আমাদের নিকট একটা নিতান্ত বিস্ময়কর ব্যাপার বলিয়াই মনে হয় | আজকাল যুগান্তর শব্দটি আমরা যখন-তখন ও নিতান্ত সামান্য কারণেই, অনেকটা ভাষাতে তীব্রতা যোজনার জন্যই ব্যবহার করিয়া থাকি; কিন্তু ইহা বলিলে বিন্দুমাত্র অত্যুক্তি হইবে না যে, 'দুগে্শনন্দিনী' বাস্তবিকই বঙ্গ-উপন্যাস-জগতে যুগান্তর আনয়ন করিয়াছিল | পূব্যবতী্ যুগের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস 'আলালের ঘরের দুলাল' -এর সঙ্গে ইহার ব্যবধান বিস্তর | 'আলালের ঘরের দুলাল' -এ পূণা্ঙ্গ উপন্যাস সম্পূণ্য দানা বাঁধিয়া উঠে নাই, উপন্যাসের উপাদানগুলি অনেকটা বিক্ষিপ্ত ও আকস্মিকভাবে উপস্থিত থাকিয়া একটি রসমূলক ও মনস্তত্ত্বমূলক যোগসূত্রের প্রতীক্ষা করিতেছিল | বিশেষত ইতিহাসের বিশাল ক্ষেত্র উপন্যাসের নিকট রুদ্ধ ছিল | বঙ্কিমচন্দ্র একমুহূতে্ ইতিহাসের রুদ্ধদ্বার খুলিয়া দিয়া উপন্যাসের সীমা, বিস্তার ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা আশ্চয্যভাবে বাড়াইয়া দিলেন | ইতিহাসের ঘটনাবহুল, উদ্দীপনাময় ক্ষেত্র হইতে বিচিত্র রস ও বণ্য সংগ্রহ করিয়া জীবনকে রঞ্জিত করিলেন, তাহার সাধারণ গতিবেগ বধি্ত করিলেন ও আমাদের হৃদয়স্পন্দনকে দ্রুততর করিয়া দিলেন | ইতিহাসের সংকটপূণ্য মুহূত্যগুলিতে জীবনে যে অসাধারণ আবেগ ও উচ্ছ্বাসের সঞ্চার হয়, আমাদের সাধারণ জীবনের শীণ্য নদীতে যে প্রবল স্রোতোবেগ প্রবাহিত হয়, তাহার পরি়চয় দিলেন | অতএব 'দুগে্শনন্দিনী' আমাদের উপন্যাস-সাহিত্যে একটি নূতন অধ্যায় খুলিয়া দিয়াছে | যে পথ দিয়া উহার অশ্বারোহী পুরুষটি অশ্বচালনা করিয়াছিলেন তাহা প্রকৃতপক্ষে রোমান্সের রাজপথ এবং বঙ্গ-উপন্যাসে প্রথম বঙ্কিমচন্দ্রই এই রাজপথের রেখাপাত করিয়াছিলেন |
     বঙ্কিমচন্দ্রের এই প্রথম রচনার অপরিণতির চিহ্ন অনেক | ইহার ঐতিহাসিক তথ্যসমষ্টির বিরল সন্নিবেশের বিষয় পূবে্ই আলোচিত হইয়াছে | মোগল-পাঠানের যুদ্ধবৃত্তান্ত নিতান্ত ক্ষীণ রেখায় অঙ্কিত হইয়াছে; ঐতিহাসিক পুরুষগুলির --মানসিংহ, কতলু খাঁ, প্রভৃতির ---চরিত্রও বিশেষ গভীরতা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের সহিত চিত্রিত হয় নাই | ঐতিহাসিক প্রতিবেশরচনা বঙ্কিমের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল না, বণি্ত যুগের বিশেষত্ব ফুটাইয়া তোলাতেও তাঁহার বিশেষ আগ্রহ দেখা যায় না | তবে ঐতিহাসিক বিপ্লব একজন সাধারণ দুগ্যস্বামীর ভাগ্যের উপর কীরূপ অতকি্ত বজ্রপাতের মতো আসিয়া পড়িয়াছে, তাহারই একটি চিত্র আমরা উপন্যাসটিতে পাই | কয়েকটি ক্ষুদ্র পরিচ্ছেদের মধ্যেই বঙ্কিম এই প্রলয়-ঝটিকার প্রথম আবিভা্ব হইতে শেষ পরিণতি পয্যন্ত দেখাইয়াছেন; উপন্যাসের ঘটনাধারা আশ্চয্ দ্রুতগতিতে প্রবাহিত হইয়াছে | পঞ্চদশ পরিচ্ছেদে দিগগজ-বিমলার সমস্ত লঘু হাস্য-পরিহাসের অবাস্তবতাকে ছাপাইয়া এক অগ্যাত অথচ আসন্ন বিপদের শঙ্কা ঘনাইয়া উঠিয়াছে | দুগ্যজয়ের বিবরণে, বীরেন্দ্রসিংহের বিচারের দৃশ্যে ও কতলু খাঁর হত্যাবণ্যনায় বঙ্কিমচন্দ্র উচ্চাঙ্গের বণ্যনা ও কবিত্বশক্তির পরিচয় দিয়াছেন | কারাগারে আয়েষার প্রেমাভি ব্যক্তির দৃশ্যটাই উপন্যাসের কেন্দ্রস্থল | এখানে বঙ্কিমের প্রণালী বাস্তব ঔপন্যাসিকের প্রণালী হইতে সম্পূণ্য বিভিন্ন; তিনি আয়েষার মনে প্রথম প্রণয়সঞ্চার ও উহার ক্রমবৃদ্ধির কোনো সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করেন নাই | তাহার সেবা ও সহানুভূতি যে কোন্ গোপন মুহূতে্ প্রণয়ে রূপান্তরিত হইল বা ওসমানের প্রতি স্নেহের সহিত এই নবজাত প্রেমের কোনো বিরোধ-সংঘষ্য হইয়াছিল কি না, তাহার কোনো পরিচয় তিনি দেন নাই; একেবারে অনিবায্য প্রেমের পূণ্য বিকাশ দেখাইয়া আমাদিগকে চমৎকৃত করিয়া দিয়াছেন | পারিবারিক বা সামাজিক উপন্যাসে আমরা এই সমস্ত ভাব-বিকাশের একটি সূক্ষতর বিশ্লেষণ, একটি প্রকৃতিমূলক ব্যাখ্যা আশা করিয়া থাকি; এবং বঙ্কিমচন্দ্রও বত্যমান উপন্যাসে তিলোত্তমার ক্ষেত্রে ও তাঁহার পরবতী্ দুই-একখানি উপন্যাসে ---'কৃষ্ণকান্তের উইল' ও 'বিষবৃক্ষ' -এ---এইরূপ বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করিয়াছেন | কিন্তু তাঁহার এই