Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা- ৪০, ৪১ ও ৪২

2020-06-11
প্রথম উপন্যাসে, কতকটা ঐতিহাসিক ঘটনা-বাহুল্যের জন্য, ও কতকটা রোমান্সসুলভ অপ্রত্যাশিত পরিণতির অবতারণার দ্বারা গল্পাংশের আকষ্যণ বৃদ্ধি করিবার জন্য | তিনি এরূপ মনস্তত্ত্বমূলক বিশ্লেষণে হস্তক্ষেপ করেন নাই | মনস্তত্ত্ব-আলোচনার দিক হইতে ইহাকে একটি ত্রুটি বলিয়াই মনে করিতে হইবে |
     চরিত্র-সৃজনের দিক দিয়াও বঙ্কিম এই উপন্যাসে খুব উচ্চাঙ্গের কৃতিত্ব দেখাইতে পারেন নাই; চরিত্র ফুটাইয়া তোলা এখানে তাঁহার বিশেষ লক্ষ্য ছিল না | ঘটনার প্রবল প্রবাহের মধ্যে তিনি কোথাও অধিকক্ষণ স্থির হইয়া দাঁড়াইতে পারেন নাই; ঐতিহাসিক স্রোতের মধ্যে গভীর চরিত্র-বিশ্লেষণের অবসর পান নাই | কিন্তু ইহা সত্ত্বেও অনেকগুলি চরিত্র অল্প দুই-একটি রেখার বেশ জীবন্ত হইয়া উঠিয়াছে | দুই-তিনটি দৃশ্যের মধ্যেই বীরেন্দ্রসিংহের চরিত্রের অসীম দাঢ্য ও অহংকার ফুটিয়া উঠিয়াছে | ওসমানের হৃদয়ে অনিবা্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও তীব্র হিংসার বিকাশ দেখাইয়া বঙ্কিম তাহাকে একটি বাস্তবমূতি্ করিয়া তুলিয়াছেন, একটা বিশেষত্বহীন আদশ্যমাত্রে পয্যবসিত হইতে দেন নাই | এই হিতাহিতগ্যানশূন্য ক্রোধই তাহাকে একটি বিশেষ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, দেশকালোচিত উপযোগিতা আনিয়া দিয়াছে | স্ত্রীচরিত্রগুলির মধ্যে, তিলোত্তমা, বিমলা ও আয়েষার রূপ ও প্রকৃতির বিভিন্নতা বঙ্কিম কেবল অদ্ভুত শব্দসম্পদের দ্বারাই ফুটাইয়াছেন | তিলোত্তমা ও আয়েষা প্রায়ই নীরব, নিতান্ত স্বল্পভাষিণী; অথচ কেবল নিপুণ শব্দচয়নের দ্বারা লেখক তাঁহাদের প্রকৃতিগত প্রভেদটি কবিত্বপূণ্যভাবে প্রকাশ করিয়াছেন | তিলোত্তমার বালিকাসুলভ, ব্রীড়াবনত প্রেম-বিহ্বলতা , ও আয়েষার মহীয়ান গাম্ভীয্য ও গভীর আত্মসংযম ---ইহাদের মধ্যে এরূপ স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করিয়াছে যে, তাহাদের পরস্পরের সম্বন্ধে ভুল করিবার আমাদের কোনও অবসর থাকে না |
     'দুগে্শনন্দিনী' উপন্যাসে ঘটনাবৈচিত্য ও গল্পাংশের আকষ্যণই প্রধান; বিশ্লেষণ ও কথোপকথনের দ্বারা চরিত্র-চিত্রণের তাদৃশ চেষ্টা হয় নাই | তথাপি দুই-একটি স্থলে কথপকথনেও বঙ্কিম বেশ দক্ষতা ও কৌশলের পরিচয় দিয়াছেন | শৈলেশ্বর-মন্দিরে বিমলা ও জগৎসিংহের যে দুইবার কথোপকথন হইয়াছে, তাহার মধ্যে লেখকের শক্তির পরিচয় পাওয়া যায় |
     কেবল গল্প-রচনার দিক দিয়াও নবীন লেখকের যে দুই-একটি ত্রুটি-বিচ্যুতি পাওয়া যায় না, এমন নহে | বিমলা ও বীরন্দ্রসিংহের মধ্যে সম্বন্ধটি অনাবশ্যক জীটিলতা ও রহস্যে আবৃত করা হইয়াছে; এবং বিমলা দীঘ্য আত্মপরিচয়পত্রে কতকগুলি ব্যাপারের অসাম্ভাব্যতা পাঠকের অবিশ্বাস জাগাইয়া তোলে | দিগগজ-উপাখ্যানের সমস্তটাই, স্থানে স্থানে প্রকৃত রসিকতা থাকা সত্বেও, মোটের উপর আতিশয্য ও অতিরঞ্জনের দ্বারা বিকৃত হইয়া উঠিয়াছে | বঙ্কিমচন্দ্র প্রত্যেক উপন্যাসেই যে সন্নাসী-জাতীয় একটা চরিত্র আনয়ন করিয়া অতিপ্রাকৃতের অবতারণা করিবার পথটি খুলিয়া রাখেন, তাহার প্রথম নিদশ্যন আমরা অভিরাম স্বামীতে পাইয়া থাকি | অভিরাম স্বামীর আখ্যায়িকার মধ্যে বিশেষ কোনো কায্য নাই; তিনি কেবল বিমলা-বীরেন্দ্রসিংহের গোপন সম্বন্ধের একট জীবন্ত নিদশ্যন-স্বরূপেই উপন্যাস-মধ্যে স্থান লাভ করিয়াছেন; আর বীরেন্দ্ররসিংহকে মোগল-পক্ষ-অবলম্বনের প্রবৃত্তি দিয়া গল্পের tragedy কে আসন্নতর করিয়া দিয়াছেন | তবে বঙ্কিম এই প্রথম উপন্যাসে তাঁহার সন্নাসীকে একেবারে রামানন্দ স্বামী বা সত্যানন্দের মতো আদশ্যলোকের কুহেলিকার মধ্যে লইয়া যান নাই | তাহাকে এক জ্যোতিষগ্যান ছাড়া আর কোনো অতিমানবোচিত গুণের অধিকারী করিয়া দেখান নাই; এমন কি তাঁহার যৌবনের পদস্খখলনের পরিচয় দিয়া তাঁহাকে সাধারণ লোকের সমশ্রেণীভুক্ত করিয়াছেন |
     বঙ্কিমচন্দ্রের আটে্র আর একটি লক্ষণও 'দুগে্শনন্দিনী'তে সূচিত হইয়াছে | বঙ্কিম তাঁহার প্রায় প্রত্যেক উপন্যাসেই বাস্তব-বণ্যনার মধ্যে অতিপ্রাকৃতের ছায়াপাত করিতে চেষ্টা করিয়াছেন | কোনো কোনো উপন্যাসে এই অতিপ্রাকৃতের ছায়া সম্ভব-অসম্ভবের সীমারেখা অতিক্রম করিয়া যায় না, মানুষের মানসিক অবস্থার সহিত একটি গূঢ় সাংকেতিকতার সম্বন্ধে আবদ্ধ থাকে | ইউরোপের নিতান্ত আধুনিক গল্প-নাটকে যে symbolism, রহস্যের যে ইঙ্গিত দেখিতে পাওয়া যায়, ইহা অনেকটা তাহারাই অনুরূপ | ইহা প্রায়ই স্বপ্ন বা অন্য কোনো গুরুতর মানসিক বিকারের রূপে আত্মপ্রকাশ করিয়া থাকে, এবং কোনো কোনো স্থলে ইহার একটি সন্তোষজনক, মনস্তত্ত্বমূলক ব্যাখ্যা দেওয়া যাইতে পারে | উদাহরণস্বরূপ 'বিষবৃক্ষ'-এ কুন্দনন্দিনীর ও 'রজনী'তে শচীন্দ্রের স্বপ্ন উল্লেখ করা যাইতে পারে; শৈবলিনীর বিকারগ্রস্ত মস্তিষ্কের উপর নরক-বিভিষিকার প্রতিচ্ছায়া ইহার চরম দৃষ্টান্ত | যোগবলের দ্বারা শৈবলিনীর অমানষিক শক্তিলাভ ও 'চন্দ্রশেখর' -এ স্থান পাইয়াছে; 'আনন্দমঠ' -এ গ্রন্থশেষে যে মহাপুরুষের সাক্ষাৎ পাই, তিনি অতিমানবেরও অনেক ঊধ্বে্ | অবশ্য উপন্যাসের বাস্তবতার দিক দিয়া ইহাদের মধ্যে অনেকগুলিই অগ্রাহ্য ও সম্পূণ্য অবিশ্বাস্য; বাস্তব-জগতের শেষ সীমা বা চরম সম্ভাবনার মধ্যেও আমরা তাহাদিগকে স্থান দিতে পারি না | কিন্তু সম্ভব হউক, অসম্ভব হউক, উপন্যালসের পক্ষে উপযুক্ত হউক, অনুপযুক্ত হউক, এই আলো-ছায়া-মিশ্র, রহস্যসংকেতপূণ্য বাস্তব-অবাস্তবের সীমান্ত-প্রদেশের প্রতি বঙ্কিমচন্দ্রের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা ও গূঢ় আকষ্যণ ছিল | তাঁহার সমস্ত অবাস্তব ব্যাপারের মধ্যেও এমন একটা গূঢ় সংযম ও সংগতি, এমন একটা আন্তরিকতা ও অভ্রান্ত কল্পনা-সমৃদ্ধির পরিচয় পাই, যাহাতে সেগুলিকে উচ্চ সৃজনী-শক্তির ফল বলিয়া গ্রহণ করিতে আমরা বাধ্য হই | তাহারা যে কেবল কল্পনার বিলাস-বিভ্রম নহে, পরন্তু লেখকের অন্তঃকরণের গভীর স্তরে যে তাহাদের মূল আছে, আমাদের স্বতই এইরূপ প্রতীতি জন্মে | বঙ্কিমের মধ্যে যে সুপ্ত কবিটি কবিতার অক্ষরে আত্মপ্রকাশ করিতে পারেন নাই, তিনিই যেন প্রতিশোধ লইবার জন্য ঔপন্যাসিকের বাস্তব চিত্রগুলির উপর কল্পলোকের এক অসম্ভব আলোক নিক্ষেপ করিয়াছেন | 'দুগে্শনন্দিনী'তে আরোগ্যলাভের পর তিলোত্তমা তাঁহার রোগশয্যার যে স্বপ্নবিবরণটি জগৎসিংহের নিকট বলিয়াছেন, তাহা এই নিগূঢ় সৌন্দযে্র আলোকে প্লাবিত হইয়া উঠিয়াছে, অথচ উপন্যাসোচিত বাস্তবতার সীমাও লঙ্ঘন করে নাই, এই একটি ক্ষুদ্র বণ্যনাতেই তাঁহার কল্পনা-শক্তির ভবিষ্যত বিকাশের বীজীটি পাওয়া যায় |
     অনেক লেখক আছেন , যাঁহাদের প্রতিভা বেশ ধীরে ধীরে বিকশিত হইয়া ক্রমশ চরম পরিণতি প্রাপ্ত হয়, তাঁহাদের ক্রমোন্নতির

রেখাটি বেশ স্পষ্টভাবেই টানা যায় | তাঁহাদের রচনা-সম্বন্ধে কালানুক্রমিক আলোচনাই প্রশস্ত; কালানুক্রমিক আলোচনার দ্বারাই তাঁহাদের প্রতিভার ক্রমবিকাশটি বেশ সুস্পষ্ট হইয়া উঠে | কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র-সম্বন্ধে বোধ হয় এই প্রণালী তাদৃশ কায্যকরী হইবে না; কেননা তাঁহার প্রতিভা সময়ানুবতী্ হইয়া ধীরে ধীরে বিকাশপ্রাপ্ত হয় নাই, প্রায় প্রথম হইতেই একটা সবা্ঙ্গসুন্দর পূণ্যতা লাভ করিয়াছে | কেবল এক 'দুগে্শনন্দিনী' কেই তাঁহার অপরিপক্ক হস্তের রচনা বলা যাইতে পারে; শুধু ইহার মধ্যেই কতকটা ক্ষীণতা ও অস্পষ্টতা, কতকটা গভীর অভিগ্যতার অভাব, কতকটা যৌবন-স্বপ্নাবেশের ছায়া অনুভব করা যায় | নবীন লেখক যে তাঁহার বাস্তব-গ্যানের অসম্পূণ্যতাকে শব্দসম্পদ ও কল্পনারাগের দ্বারা ঢাকিতে চেষ্টা করিয়াছেন তাহা বেশ বুঝিতে পারি |
    'দুগে্শনন্দিনী'র প্রায় দুই বৎসর পরেই 'কপালকুণ্ডলা' (১৮৬৬) প্রকাশিত হয় | 'কপালকুণ্ডলা'তে বঙ্কিম-প্রতিভা তাহার সমস্ত ধূম্রাবরণ ত্যাগ করিয়া একটি প্রদীপ্ত অনলশিখায় জ্বলিয়া উঠিয়াছে; 'দুগে্শনন্দিনী'র সমস্ত অনিশ্চয়, সমস্ত সংকোচ, পুরাতন প্রথার সশঙ্ক অনুবত্যন বঙ্কিম সবলে কাটাইয়া উঠিয়াছেন | 'কপালকুণ্ডলা'র যে গুণটি খুব তীব্রভাবে আমাদের দৃষ্টি আকষ্যণ করে, তাহা উহার অন্তনি্হিত ভাবটির অসামান্য মৌলিকতা | এখানে বঙ্কিমের প্রতিভা নিজ স্বরূপের পরিচয় পাইয়াছে, এবং সমস্ত অনুকরণ ত্যাগ করিয়া নিজের জন্য একটি সম্পূণ্য নূতন পথ বাহির করিয়া লইয়াছে | অবশ্য এখন হইতে বঙ্কিমের প্রতিভা যে একেবারে নিদো্ষ ও প্রমাদশূন্য হইয়াছে, তাহা বলিতেছি না; কিন্তু এ সময়ের ভুল-ভ্রান্তি একটু নূতন রকমের; অতিসাহসের ফল, ভীরুতার নহে | সময়ে সময়ে বঙ্কিম আপন প্রতিভার উপর উপযুক্ত অতিরিক্ত আস্থা স্থাপন করিয়া তাহাকে গুরুভারপীড়িত তরিয়া তুলিয়াছেন; উপন্যাসের মধ্যে এমন সমস্ত প্রকৃতি-বিরুদ্ধ উপাদানের সমাবেশ করিয়াছেন, যাহা তাঁহার প্রতিভাও সম্পূণ্যভাবে গলাইয়া মিশাইতে পারে নাই | সময়ে সময়ে উপন্যাসকে তিনি নিজ আদশ্যবাদের ছাঁচে ঢালিতে গিয়া উহার মৌলিক প্রকৃতিটি রক্ষা করিতে পারেন নাই | কল্পনার মুক্তপক্ষে উড়িয়া নীল আকাশের এমন সুদূরদেশে পৌছিয়াছেন, যেখানে আমাদের সহজ বুদ্ধি ও বিশ্বাস পায়ে হঁটিয়া তাঁহাকে অনুসরণ করিতে পারে নাই | কিন্তু এই সমস্ত ত্রুটি-বিচ্যুতি দুঃসাহসের ফল, অক্ষমতার নহে; সুতরাং ইহারা 'দুগে্শনন্দিনী'র ত্রুটি-বিচ্যুতি হইতে সম্পূণ্য ভিন্ন প্রকৃতির | এইজন্যই বলা যায় যে, বঙ্কিমের প্রতিভা 'দুগে্শনন্দিনী'র পরেই একেবারে পূণ্য পরিণতি লাভ করিয়াছে, ক্রমবিকাশের মন্থর পথে অগ্রসর হয় নাই |
     'দুগে্শনন্দিনী'তে যে রোমান্স ঐতিহাসিক যুদ্ধ-বিগ্রহ ও সাহিত্যসুলভ প্রেমের আশ্রয়ে ধীরে ধীরে দানা বাঁধিয়া উঠিতেছিল, তাহা 'কপালকুণ্ডলা'তে একেবারে সমস্ত বাহ্য অবলম্বন ত্যাগ করিয়া নিজ অন্তনিহি্ত রসের দ্বারাই পূণ্যবিকশিত হইয়া উঠিয়াছে | 'দুগে্শনন্দিনী'তে গতানুগতিকতার যে একটা জড়তা ছিল, তাহা 'কপালকুণ্ডলা'তে কল্পনা-শক্তির অসামান্য সাহসিকতায় সতেজ ও লীলাচঞ্চল হইয়া উঠিয়াছে | সাগরতীরবাসিবী, কাপালিক-প্রতিপালিতা, চির-সন্ন্যাসিনী কপালকুণ্ডলার মূতি্-কল্পনায় বঙ্কিম যে অসামান্য প্রতিভার পরিচয় দিয়াছেন, তাহা একজন বাঙালি ঔপন্যাসিকের পক্ষে বাস্তবিকই বিস্ময়কর| আমাদের রুদ্ধ-দ্বার, সংকীণ্য-পরিসর বাস্তব-জীবনের রোমান্সের উদার আলোক ও মুক্ত বায়ু নিতান্তই বিরল-প্রবেশ | সময়ে সময়ে আমরা বৈদেশিক সাহিত্যের অনুকরণ করিয়া বিদেশ-প্রচলিত প্রণালীর দ্বারা আমাদের বাস্তব-জীবনের রোমান্সের উচ্ছ্বসিত প্রবাহ বহাইতে চাহি; কিন্তু বাস্তব-জীবনের সহিত অসামাঞ্জস্যের জন্য এই চেষ্টা সাথ্ক ও শোভন হইয়া উঠে না | যেমন প্রত্যেক দেশের মাটিতে এক এক বিশেষ রকম ফুল রঙিন হইয়া উঠে, সেইরূপ প্রত্যেক দেশেই রোমান্স তথাকার বাস্তব-জীবনের সহিত এক নিগূঢ় ও অবিচ্ছেদ্য সম্পকে্ আবদ্ধ, সেই বাস্তব-জীবনেরই একটা উচ্চতর বিকাশ | যেমন যে রস আমরা পারিবারিক জীবনে ঘরকন্নার প্রাত্যহিক কাজের মধ্যে মনপ্রাণ দিয়া খুঁজি, তাহাই সাহিত্যে গানের সুর হইয়া বাজিয়া উঠে, সেইরূপ রোমান্সের স্বপ্নও আমাদের বাস্তব-জীবন-বৃন্তের রঙিন ফুল মাত্র | ইউরোপীয় সাহিত্যে সাধারণত ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতের বাস্তবচিত্র, বিরোধ-জটিল প্রেমের অপ্রত্যাশিত বিকাশের মধ্য দিয়া রোমান্সের অনুসন্ধান হয় | ইউরোপীয় সভ্যতার এই স্বাভাবিক বিকাশের পথেই রোমান্স জীবনে প্রবেশ লাভ করে | কিন্তু ইতিহাস বা প্রেমের মধ্যে যে রোমান্সকে পাওয়া যায়, তাহা আমাদের উপন্যাসে ঠিক স্বাভাবিক হয় না, বাস্তব-জীবনের ঠিক অনুবত্যন করে না | কেননা পূবে্ই দেখিয়াছি যে, ইউরোপের মতো আমাদের দেশে ইতিহাস বা রাজনৈতিক সংঘষ্য সাধারণ জীবনের উপর তাদৃশ প্রভাব বিস্তার করে নাই | প্রেমের চিরন্তন লীলা আমাদের সাহিত্যে বা জীবনে ছিল না, ইহা বলিলে অপলাপ করা হইবে; কিন্তু ইউরোপীয় সমাজে প্রেমের বিচিত্র ধারা যেরূপ নূতন নূতন বিস্ময়কর উন্মেষ লাভ না করিয়া, অন্তমুখী, গভীর ও একনিষ্ঠ হইবার দিকে চলিয়াছে | অবশ্য আমাদের অতীত যুগের সামাজিক অবস্থা যে ঠিক বত্যমানের মতো নীরস ও বৈচিত্র্যহীন ছিল তাহা নহে | আমাদেরও একটা বীরত্বমণ্ডিত, গৌরবময় যুগ ছিল, আমাদেরও জীবন এককালে দুঃসাহসিকতার রুদ্রতালে আবতি্ত হইতে, আমাদেরও প্রেম হয়তো একটা গভীর ও প্রবল আবেগে উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিত | কিন্তু আজকাল আমাদের জীবনের ধারা এরূপ পরিবতি্ত হইয়া পড়িয়াছে, পুরাতন প্রণালী হইতে এতদূর সরিয়া গিয়াছে যে, সাহিত্যের ক্ষেত্রে কবিকল্পনা-দ্বারাও সেই পুরাতন দিনের জীবনযাত্রা পুনজী্বিত করা অসম্ভব হইয়া দাঁড়াইয়াছে; সেই পুরাতন আবেগ কোন্ চিরবিস্মৃতির মরুভূমে একেবারে লুপ্ত হইয়া গিয়াছে | তাই উপন্যাসে আমাদের অতীত যুগের কাহিনী নিশীথ-স্বপ্নের কুহেলিকাজড়িত বলিয়া মনে হয়; আমাদের রাজনৈতিক প্রচেষ্টা একটা ইন্দ্রজালরচিত আকাশসৌধের ন্যায় বাস্তবসংস্পশ্যশূন্য হইয়া পড়ে | আমাদের

যুদ্ধজয় একটা মত্ত আস্ফালন ও অথ্যহীন কোলাহলে পরিণত হয়; আমাদের প্রেমাভিব্যক্তি একটা বহু পুরাতন মন্ত্রের প্রাণহীন আবৃত্তির মতোই শুনায় | 'আনন্দমঠ', 'মৃণালিনী', 'চন্দ্রশেখর' , ইত্যাদি উপন্যাসে বঙ্কিমের প্রতিভা এই কেন্দ্রস্থ ও অপরিহায্য দুব্যলতার বিরুদ্ধে নিষ্ফল সংগ্রামে নিজেকে ব্যথিত করিয়াছে, অসাধারণ সৌন্দয্যসৃষ্টির মধ্যেও একটি গূঢ় ব্যথ্যতার বীজ রাখিয়া গিয়াছে |
     'কপালকুণ্ডলা'র রোমান্টিক আবেষ্টন-রচনার বঙ্কিম অদ্ভুত প্রতিভার পরিচয় দিয়াছেন | তিনি ইতিহাস ও প্রেমকে যতদূর সম্ভব পশ্চাতে রাখিয়া রোমান্সের এমন একটি উৎস আবিষ্কার করিয়াছেন, যাহা আমাদের বাস্তব-জীবনের কঠিন মৃত্তিকা হইতে স্বতই উৎসারিত হইতে পারে | আমাদের শান্ত, ধম্যাবিভূত জীবনের উপর যদি কখনও কল্পলোকের আলেকপাত সম্ভব হয়, তবে তাহা প্রবল ধমো্ন্মাদের দিক হইতেই পড়িয়াছে, তাহা তান্ত্রিকপ্রথার ভীষণতা ও সহজ ধম্যপ্রবণতা হইতে উদ্ভূত বলিয়া আমাদের বাস্তব-জীবনের সহিত একটা সুসংগতি ও সামঞ্জস্য রক্ষা করে | আবার এই উপন্যাসের রোমান্টিক উপাদানগুলি --বিজন সমুদ্রতীরের অতুলনীয় মহিমা, কাপালিকের নিম্যম ধম্য-সাধনা ---কেবল একটা বাহ্যবৈচিত্র্যের উপায়মাত্রে পয্যবসিত হয় নাই; ইহারা কপালকুণ্ডলার চরিত্রের উপর একটি গভীর , অনপনের প্রভাব অঙ্কিত করিয়া অসাধারণ সাথ্যকতায় ভসরিয়া উঠিয়াছে | কেননা ইহার সমস্ত রোমান্সের সার, এই সৌন্দয্য-জগতের মধ্যমণি হইতেছে কপালকুণ্ডলার চরিত্র | সুকোমল মাধুযে্র চারিদিকে একটা অনমনীয় দৃঢ় প্রতিগ্যার বেড়া, গাহস্থ্য সু়খভোগের মধ্যে একটা অক্ষুণ্ণ উদাসীনতার সংযম, সামাজিক বিধি-নিষেধের মাঝখানে একটা শান্ত অথচ অদম্য স্বাধীনতা; অথচ কোথাও পুরুষোচিত কঠোরতা বা পুরুষতার লেশমাত্র নাই, সব্যত্রই রমণীয় কোমলতা; শিক্ষা-দীক্ষায় বিভিন্ন কিন্তু অন্তরে একটি চিরন্তনী স্ত্রীমূতি্ (eternal feminine) -এরূপ অতুলনীয় চরিত্র-কল্পনা শুধু বঙ্গসাহিত্যে কেন, ইউরোপীয় সাহিত্যেও বিরল |
     সামাজিক জীবনে প্রবেশের পরেও বাল্যকালের রোমান্টিক প্রতিবেশ কপালকুণ্ডলাকে বেষ্টন করিতে ছাড়ে নাই | পারিবারিক জীবনের নিয়ম-শৃঙ্খল, স্বামীর অপরিমিত ভালোবাসাও তাহার নয়নের অপাথি্ব স্বপ্নঘোর ঘুচাইতে পারে নাই | সমুদ্রতীরের বন্যলতাটি গৃহস্থের গৃহপ্রাঙ্গণে রোপিত ও অজস্রস্নেহধারাসিক্ত হইয়াও নূতন স্থানে বদ্ধমূল হইতে পারে নাই, খুব আলগা হইয়াই লাগিয়া ছিল; পুরাতন জীবন হইতে একটি তরঙ্গ আসিয়াই তাহাকে একেবারে উন্মূলিত করিয়া লইয়া গেল | তাহার অন্তর-মধ্যে যে একটি চির-উদাসিনী আলুলায়িতকুম্ভলা অতীত স্বাধীনতার দিকে চাহিয়া দীঘ্যনিশ্বাস ফেলিতেছিল, তাহাকে সংসার শত আদর-প্রলোভনেও পোষ মানাইতে পারিল না | অথচ তাহার মধ্যে একটা অসামাজিক বন্যতা বা রমণীসুলভ কোমলতার অভাব কিছুই নাই | বঙ্গসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের 'অতিথি' নামক গল্পের নায়ক 'তারাপদ'ই কপালকুণ্ডলার একমাত্র তুলনাস্থল; অথচ আবেষ্টনের অসাধারণত্বে ও প্রকৃতি-বৈশিষ্ট্যে উহাদের মধ্যে কত প্রভেদ | তারাপদর ঔদাসীন্য একটি চিরচঞ্চল, ক্রীড়াশীল হরিণশিশুর বন্ধন-ভীরুত্বের ন্যায়, দিগন্তরেখাস্থিত নীল-মায়ার প্রতি একটা নামহীন, রহস্যময় আকষ্যণ মাত্র | কিন্তু কপালকুণ্ডলায় সংসারবিরক্তির পশ্চাতে আমরা একটি বিশেষ ধম্যসাধনার, একটি অভ্যস্ত জীবনযাত্রার সমস্ত দুনি্বার শক্তি অনুভব করি | তাহা ছাড়া, তারাপদ কপালকুণ্ডলার একটা অপেক্ষাকৃত শান্ত ও বাস্তব সংস্করণ; পল্লীর সাধারণ জীবনযাত্রার সহিত তাহার মুক্ত, বন্ধনহীন জীবন একটা ক্ষণিক অথচ নিগূঢ় একাত্মতা লাভ করিয়াছে | কপালকুণ্ডলার নিঃসঙ্গতা আরও প্রগাঢ়তর; এক দয়া ও সমবেদনা ছাড়া সাধারণ সামাজিক জীবনের সহিত তাহার আর কোনো যোগসূত্র নাই | সাধারণত উপন্যাসে সমস্ত যে অলৌকিক ঘটনা, স্বপ্নদশ্যন ইত্যাদি অবতারণা করা হয়, তাহারা প্রায় বাহ্যবৈচিত্র্যবৃদ্ধির উপায়রূপে ব্যবহৃত হয়; কদাচিৎ খুব বড়ো কলাবিদের হাতে তাহাদের মধ্যে একটা গূঢ় সাংকেতিকতা থাকে | কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র এই উপন্যাসে যে সমস্ত অলৌকিক দৃশ্যের অবতারণা করিয়াছেন, তাহারা কবিকল্পনার ন্যায় সৌন্দয্যমাত্রাত্মক নহে; পরন্তু কপালকুণ্ডলার চরিত্রের সহিত একটি নিগূঢ়-ও-সুসংগতসম্বন্ধবিশিষ্ট | নবকুমারের সহিত আগমনকালে ভবিষ্যৎ শুভাশুভ জানিবার জন্য দেবী-পদে বিল্বপত্রাপ্যণ কেবল একটা পূজার বাহ্য অনুষ্ঠান মাত্র নহে; ইহা কপালকুণ্ডলার ভক্তিপ্রবণ হৃদয়ে একটি অগ্যাত আশঙ্কার ছায়া ফেলিয়া তাহার নূতন জীবনের প্রতি অনাসক্তি বাডা়ইয়া তুলিয়াছে ও ভবিষ্যৎ বিপদৎপাতের ক্ষেত্র-প্রস্তুতকরণে সাহায্য করিয়াছে | দ্বিতীয় খণ্ডের ষষ্ঠ পরিচ্ছেদে শ্যামাসুন্দরী ও কপালকুণ্ডলার কথোপকথনের মধ্যে এই আপাত-তুচ্ছ ব্যাপারটি ধম্যপ্রাণ কপালকুণ্ডলার অন্তজ্গতে কীরূপ একটি বিপ্লবের সৃষ্টি করিয়াছে, তাহা ব্যক্ত হইয়াছে | অবার চতুথ্য খণ্ডের অষ্টম পরিচ্ছেদে কপালকুণ্ডলা যে আকাশপট-লিখিতা নীল-নীরদ-নিমি্তা ভৈরবীমূতি্কে মরণের পথে নীরব অঙ্গুলিসংকেত করিতে প্রত্যক্ষ করিয়াছিল, তাহাও অদ্ভুত মনস্তত্ত্ববিশ্লেষণের সাহায্যে তাহার স্বাভাবিক ধম্যমোহের সহিত একাঙ্গীভূত হইয়াছে | এই কুশল মনস্তত্ত্ববিশ্লেষণের সঙ্গে অসাধারণত্বের গভীর সামঞ্জস্যসাধনেই 'কপালকুণ্ডলা'র বিশেষত্ব |
     এই চরিত্রবিশ্লেষণ স্বল্প অথচ গভীরাথ্যক কয়েকটি কথার দ্বারা সুনিপুণভাবে সম্পাদিত হইয়াছে | কোনো বাস্তবতা-প্রধান লেখকের হাতে পড়িলে এই অথ্যপূণ্য মিতভাষিতা পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠাব্যাপী, সুদীঘ্য বাগবিন্যাসে পরিণত হইত সন্দেহ নাই | বঙ্কিমচন্দ্রের এই ক্ষমতার দুই-একটি মাত্র উদাহরণ দিব | যখন কপালকুণ্ডলা সাংসারিক হিতাহিতের প্রতি দৃক্পাত না করিয়া ব্রাম্ভ্রণবেশীর সহিত সাক্ষাৎ করিতে