Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা- ৪৩, ৪৪ ও ৪৫

2020-06-16
কৃতসংকল্প হইল, তখন লেখক কয়েকটি মাত্র বঙক্তিতে তাহার এই অসাধারণ সংকল্পের মূলিভূত কারণগুলি বিশ্লেষণ করিয়া দেখাইয়াছেন  :
     "কপালকুণ্ডলা বিশেষ বিগ্য ছিলেন না --- সুতরাং বিগ্যের ন্যায় সিদ্ধান্ত করিলেন না | কৌতূহলপরবশ রমণীর ন্যায় সিদ্ধান্ত করিলেন, ভবানী ভক্তিভাববিমোহিতার ন্যায় সিদ্ধান্ত করিলেন, জ্বলন্ত বহ্নিশিখার পতনোন্মুখ পতঙ্গের ন্যায় সিদ্ধান্ত করিলেন |"
(চতুথ্য খণ্ড, চতুথ্য পরিচ্ছেদ)
অল্পকথায় গভীর বিশ্লেষণের আর একটি উদাহরণ পাই, কপালকুণ্ডলার প্রতি নবকুমারের প্রথম প্রণয়-প্রকাশের বণ্যনায় :
     "যখন নবকুমার দেখিলেন যে, কপালকুণ্ডলা তাঁহার গৃহমধ্যে সাদরে গৃহীতা হইলেন, তখন তাঁহার আনন্দসাগর উছলিয়া উঠিল | অনাদরের ভয়ে কপালকুণ্ডলা লাভ করিয়াও কিছুমাত্র আহ্লাদ বা প্রণয়লক্ষণ প্রকাশ করেন নাই | ....এই আশঙ্কাতেই তিনি কপালকুণ্ডলার পাণিগ্রহণ-প্রস্তাবে অকস্মাৎ সম্মত হয়েন নাই; এই আশঙ্কাতেই পাণিগ্রহণ করিয়াও গৃহাগমন পয্ন্ত বারেকমাত্র কপালকুণ্ডলার সহিত প্রণয়সম্ভাষণ করেন নাই | পরিপ্লবোন্মুখ অনুরাগ-সিন্ধুতে বীচিমাত্র বিক্ষিপ্ত হইতে দেন নাই | কিন্তু সে আশঙ্কা দূর হইল |...এই প্রেমাবিভা্ব সব্যদা কথায় ব্যক্ত হইত না, কিন্তু নবকুমার কপালকুণ্ডলাকে দেখিলেই যেরূপ সজললোচনে তাঁহার প্রতি অনিমিষ চাহিয়া থাকিতেন, তাহাতেই প্রকাশ পাইত; যেরূপ নিষ্প্রয়োজনে, প্রয়োজন কল্পনা করিয়া কপালকুণ্ডলার কাছে আসিতেন, তাহাতে প্রকাশ পাইত; যেরূপ বিনাপ্রসঙ্গে কপালকুণ্ডলার প্রসঙ্গ উত্থাপনের চেষ্টা পাইতেন, তাহাতে প্রকাশ পাইত; যেরূপ দিবানিশি কপালকুণ্ডলার সুখস্বচ্ছন্দতার অন্মেষণ করিতেন, তাহাতে প্রকাশ পাইত | সব্যদা অন্যমনস্কতাসূচক পদবিক্ষেপেও প্রকাশ পাইত |"
     কপালকুণ্ডলার আর একটি গুণ সমালোচকের বিস্ময়মিশ্রিত শ্রদ্ধা আকষ্যণ করে, তাহা উপন্যাসটির অনবদ্য গঠনকৌশল | উপন্যাসখানি ঠিক একটি গ্রিক ট্রাজেডির মতো সরল রেখায়, অবিসপি্ত গতিতে, সব্যপ্রকার বাহুল্য-বজি্ত হইয়া অবশ্যম্ভাবী বিষাদময় পরিণতির দিকে অনিবায্যবেগে ছুঁটিয়া চলিয়াছে | প্রত্যেক অধ্যায় এক নিগূঢ়-কলাকৌশল-নিয়ন্ত্রিত হইয়া কেন্দ্রাভিমুখী হইয়াছে | এমন কি সুদূর মোগল রাজধানীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও অন্তঃপুরিকাদের ও ঈষা্দ্বন্দ্ব পয্ন্ত বনবাসিনী কপালকুণ্ডলার নিয়তির উপর ঝুঁকিয়া পড়িয়াছে, যে অগ্নিতে সে আত্মবিসজ্ন করিয়াছে তাহার ইন্ধন যোগাইয়াছে | চারিদিকের সমস্ত শক্তি যেন দৈববলে সংহত হইয়া কপালকুণ্ডলার অদৃষ্ট-রথকে এক অন্তহীন অতলের দিকে টানিয়া লইয়া গিয়াছে ---তাহার সংসারানাসক্তি, স্বামিপ্রণয়বঞ্চিতা শ্যামার প্রতি সমবেদনা, কাপালিকের অতন্দ্র প্রতিহিংসা, নবকুমারের আশঙ্কা-দুব্যল, গভীর প্রেম, পদ্মাবতীর পাষাণ প্রাণে প্রেমমন্দাকিনী-ধারার অতকি্ত আবিভাব, সবো্পরি এক ক্রুদ্ধ দৈবশক্তির সুস্পষ্ট অঙ্গুলিসংকেত ---এই সমস্ত শক্তি, মানুষ এবং দৈব, সৎ ও অসৎ --একসঙ্গে ভিড় করিয়া যেন রথ-রজ্জুর আকষ্যণে হাত দিয়াছে | একটি ক্ষুদ্র জীবনের বিরুদ্ধে এতগুলি প্রচণ্ড শক্তির সমাবেশ ---আমাদের মনকে এক গভীর, সমাধানহীন রহস্যের বেদনায় ব্যথিত করে, নিয়তির দুগ্যেয় লীলার একটা বিস্ময়কর বিকাশের ন্যায় আমাদিগকে অভিভূত করিয়া ফেলে |
     'কপালকুণ্ডলা'র তিন বৎসর পরে 'মৃণালিনী' প্রকাশিত হয় (১৮৬৯) | 'মৃণালিনী'তে বঙ্কিম আবার ইতিহাস ও প্রেমের ক্ষেত্র হইতে রস ও বণ্য সংগ্রহ করিতে চেষ্টা করিয়াছেন | 'কপালকুণ্ডলা'র রোমান্সে যে একটা সবা্ঙ্গসুন্দর মাধুয্য ও সুসংগতি আছে, 'মৃণালিনী'তে অবশ্য তাহা নাই; তথাপি 'দুগে্শনন্দিনী'র সঙ্গে তুলনা করিলে বঙ্কিম উন্নতির পথে যে কতদূর অগ্রসর হইয়াছেন তাহা সহজে়ই প্রতীয়মান হইবে | চরিত্র-চিত্রণ এবং ঘটনাবিন্যাস উভয় দিকেই বঙ্কিম 'দুগে্শনন্দিনী'র সীমা ছাড়াইয়া গিয়াছেন | জগৎসিংহ, ওসমান, তিলোত্তমা, প্রভৃতি চরিত্রে বাস্তবতার ভাগ অল্প; বিচিত্র ঘটনা স্রোতে তাহাদের ব্যক্তিত্ব খুব ভালো করিয়া ফুটিয়া উঠিতে পারে নাই | 'মৃণালিনী'র চরিত্রগুলিতে বাস্তবতার চিহ্ন প্রকেটতর হইয়া উঠিয়াছে | হেমচন্দ্র জগৎসিংহের মতো কেবল একটা বীরোচিত আদশে্র ম্লান ছায়ামাত্র নহে, তাহার ব্যক্তিত্ব আরও সুস্পষ্ট | হেমচন্দ্রের দুজ্য় ক্রোধ ও অভিমান, তাহার চিত্তচাঞ্চল্য, পরিবত্যনশীল ও অন্যায় হঠকারিতাই তাহাকে জগৎসিংহ অপেক্ষা স্ফুটতর বৈশিষ্ট্য দিয়াছে ও আদশ্য লোক হইতে নামাইয়া ভ্রান্তি-প্রমাদসংকুল রক্তমাংসের মানুষের মধ্যে স্থান দিয়ছে | জগৎসিংহ-তিলেত্তমার প্রেমের সহিত তুলনায় হেমচন্দ্র-মৃণালিনীর প্রেম আরও একটু জটিলতর, বাস্তবতার আরও একটু গভীরতর স্তর স্পশ্য করে | মৃণালিনী নিতান্ত শান্তপ্রকৃতি ও ক্ষমাশীলা হইলেও তিলোত্তমার অপেক্ষা অধিকতর বাস্তব; দুঃখের অভিগ্যতা ও বিপদে তেজস্বিতা তাগাকে একেবারে মোমের পুতুল হইতে দেয় নাই | গিরিজায়া বিমলার একটি অধিকতর স্বাভাবিক সংস্করণ; একজন পৌরমহিলার মুখে যে ব্যবহার অশোভন ও অসংযত বলিয়া বোধ হয়, তাহা ভিখারিণীর পক্ষে সুসংগত ও উপযুক্ত হইয়াছে | বিশেষত, মনোরমার চরিত্রকল্পনায় বঙ্কিম যে মৌলিকতা ও সাহসের পরিচয় দিয়াছেন, তাহার কোনো চিহ্ন 'দুগে্শনন্দিনী'তে পাই না; ইহার অনুরূপ কোনো চরিত্র পূব্যবতী্ উপন্যাসে নাই | বঙ্কিমচন্দ্রের কয়েকখানি উপন্যাসে যে কয়েকটি অবাস্তব, কবি-কল্পনানুযায়ী স্ত্রী-চরিত্র পাই, মনোরমা তাহাদের অগ্রবতি্নী | 'দেবী চৌধুরাণী'তে দিবা, নিশা ও 'সীতারাম' -এ জয়ন্তী এই জাতীয় চরিত্র --বাস্তব-বন্ধনহীন কাল্পনিক, আমাদের সামাজিক অবস্থার সহিত সম্পক্যরহিত, যেন লেখকের কতকগুলি প্রিয় theory র মূত্য বিকাশ মাত্র | কেবল অসাধারণ বাক্পটুতা ও রসিকতার গুণেই তাহারা আমাদের নিকট জীবন্ত মানুষ বলিয়া প্রতিভাত হয়; তাহাদের বাক্যের সরসতা তাহাদের ব্যবহারের অবাস্তবতাকে অনেকখানি ঢাকিয়া দেয় | মনোরমা ইহাদের মতো এতটা কাল্পনিক নহে; তাহার রহস্যময় দ্বৈতভাবের কোনো মনস্তত্ত্বমূলক ব্যাখ্যা দেওয়া হয় নাই বটে, এই অদ্ভুত প্রকৃতি-বৈষম্যের উদ্ভব কখন এবং কী প্রকার হইল, সে সম্বন্ধে লেখক আমাদের কৌতূহল চরিতাথ্য করেন নাই বটে, কিন্তু যেরূপ আশ্চয্য দক্ষতা ও সুসংগতির সহিত তাহার

কাযে্ ও ব্যবহারে এই দ্বৈতভাবটি ফুটাইয়া তুলিয়াছেন, তাহাতে আমাদের অবিশ্বাস আর মাথা তুলিয়া উঠিতে পারে না | বিশেষত পশুপতির সহিত তাহার প্রেমের অসাধারণত্ব, বাহ্য বিরোধ ও ঔদাসীন্যের মধ্যে গোপন আকষ্যণ---হেমচন্দ্র-মৃণালিনীর সাধারণ উচ্ছ্বসিত প্রেমের সহিত একটি সুন্দর বৈপরীত্যের (contrast) হেতু হইয়াছে |
     কিন্তু 'মৃণালিনী'র প্রকৃত ত্রুটি হইতেছে ইহার ঐতিহাসিক আবেষ্টনে ও ইতিহাসের সহিত প্রেমকাহিনীর সামঞ্জস্য-স্থাপনে | বঙ্কিম মুসলমান কতৃক বঙ্গজয়ের যে চিত্র দিয়াছেন তাহা ততদূর ইতিহাস-সম্মত তাহা বলিতে পারি না; তবে তাহাকে উচ্চ অঙ্গের ঐতিহাসিক কল্পনাপ্রসূত বলিয়া মনে করিতে আমাদের বিশেষ দ্বিধা হয় না | সপ্তদশ অশ্বারোহী কতৃক বঙ্গজয়ের যে একটা প্রবাদ মুসলমান ঐতিহাসিকগণ কতৃক প্রচারিত হইয়া আসিতেছে, তাহা সত্য বলিয়া বিশ্বাসঘাতকতা ও গৌঢ়-রাজের অন্ধ ধম্য-বিশ্বাসের বণ্যনা দ্বারা এই বিরাট বিপয্য়ের একটা সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে চেষ্টা করিয়াছেন, ও প্রকৃত ইতিহাসগ্যানের পরিচয় দিয়াছেন | তবে ঐতিহাসিক উপাদান ও প্রকৃত তথ্যের অভাববশত এই ব্যাখ্যা নিতান্ত কাল্পনিক, ফাঁকা ফাঁকা রকমের ঠেকে | তথ্যের যে পরিমাণ ঘনসন্নিবেশ হইলে একটা বৃহত ঐতিহাসিক ব্যাপার আমাদের চক্ষে সত্য ও জীবন্ত হইয়া উঠে, তাহা বঙ্কিমের পক্ষে দেওয়া অসম্ভব ছিল; সেইজন্য তিনি তথ্যের অভাব কল্পনার বাষ্পস্ফীতিদ্বারা পূণ্য করিতে চেষ্টা করিয়াছেন | হেমচন্দ্র, মাধবাচায্য, পশুপতি, লক্ষণসেন, শান্তশীল---একটা বিশাল রাজনৈতিক সংকটের সন্ধিস্থলে এই সমস্ত অশরীরী প্রেতমূতি্ই জাতির ভাগ্যনিয়ন্তা, ইহা ভাবিতে মন একটা ক্ষুব্ধ অতৃপ্তি ও অবিশ্বাসের ভারে পীড়িত হইতে থাকে --তাহারা বিশাল মুসলমান-প্লাবন-তরঙ্গের উপর ক্ষণস্থায়ী বুদবুদের মতোই প্রতীয়মান হয় | এক জপসাধনারত ব্রাম্ভ্রণ ও এক রাজ্যচ্যুত, প্রণয়োন্মত্ত রাজপুত্র --- যাহাদের পিছনে অথ্য ও লোকবলের কোনোই পরিচয় পাই নাই---ইহারাই মুসলমান সাম্রাজ্য-ধ্বংসের প্রধান ও একমাত্র উদযোগী, ইহা মনে করিলে ডন্ কুইক্সোট ও সাঙ্কোপাঞ্জার কথাই মনে পড়ে | বিশেষত, যে হেমচন্দ্রের উপর মাধবাচায্ এত গভীর আস্থা স্থাপন করিয়াছেন, যাহাকে মুসলমান-জয়ের একমাত্র উপায় বলিয়া সমস্ত প্রণয়বিলাস হইতে দূরে রাখিতে চাহিয়াছেন, তাহার কায্যকলাপ আলোচনা করিলে এই গুরু দায়িত্বের জন্য তাহার অনুপযুক্ততার কথাই আমাদের মনে জাগিয়া উঠে | আবার পশুপতির প্রায় অননুমেয় নিবু্দ্ধিতা, সম্পূণ্য উদযোগহীন অবস্থা়য় আপনাকে এবং দেশকে শত্রুহস্তে সঁপিয়া দেওয়া, আমাদের অবিশ্বাসকে একেবারে কাণায় কাণায় ভরিয়া তোলে | লেখক নিজেও এই ত্রুটি, এই অবিশ্বাস্যতার বিষ়য়ে বেশ সচেতন ছিলেন এবং পাঠকের বিদ্রোহ পূব্য হইতে অনুমান করিয়া একটা যেমন-তেমন রকমের কৈফিয়ত দিতে চেষ্টা করিয়াছেন---'উণ্যনাভ জাল পাতে, যুদ্ধ করে না |' বস্তুত রাজনৈতিক সমস্ত ব্যাপারটির উপরেই একটা অভিনয়োচিত অবাস্তবতা, একটা তীব্রশ্লেষাত্মক (ironic) অসংগতি ছায়াপাত করিয়াছে |
     পক্ষান্তরে, অবিশ্বাসের চরম সীমা অতিক্রমের পরে আমাদের মনে একটা বিশ্বাসের প্রতিক্রিয়া আরম্ভ হয় | ভাবিয়া দেখিলে আমরা স্বীকার করিতে বাধ্য হই, আমাদের দেশে ইতিহাসের ধারাই কয়েকটি ব্যক্তিবিশেষকে আশ্রয় করিয়া প্রবাহিত হইয়াছে, কোনো যুগের রাজনৈতিক ইতিহাস সমসাময়িক কয়েকটি প্রধান ব্যাক্তির কায্যাবলীর সমষ্টি মাত্র | জনসাধারণ নামে যে ব্যক্তিটি ইউরোপীয় ইতিহাসে তাহার প্রভাব প্রতি পদক্ষেপেই ব্যক্ত করিয়াছে, সে আমাদের দেশের ইতিহাস-ক্ষেত্র হইতে একেবারে নিশ্চিহ্নভাবেই বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে | সুতরাং আমাদের অতীতযুগের কোনো গুরুতর রাজনৈতিক ঘটনার আলোচনা করিতে গেলেই কয়েকটি ব্যক্তির অপেক্ষাকৃত বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টাই আমাদের দষ্টিতে পড়ে এবং ইহা লইয়াই আমাদিগকে সন্তুষ্ট থাকিতে হইবে | যে জনসাধারণের জাগ্রত, সচেষ্ট মনোভাব এই বিক্ষিপ্ত প্রচেষ্টাগুলিকে ঐক্যসূত্রে গাঁথিতে পারিত, তাহারা তাহাদের সমস্ত জীবনটাই এক অবিচ্ছিন্ন নিদ্রাঘোরে কাটাইয়া দিয়াছে; বিনীতভাবে আগ্যা প্রতিপালন করিয়াছে, নিশ্চেষ্টভাবে মার খাইয়াছে, কিন্তু কোনও প্রকারে নিজেদের ইচ্ছাশক্তি ফুটাইয়া তুলিতে চেষ্টা করে নাই | আবার কবি-কল্পনা যখন ইতিহাসকেই অনুসরণ করিয়া চলে, তখন কাল্পনিক চরিত্রগুলিকে ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের অপেক্ষা সজীবতর দেখিতে কীরূপ আশা করিতে পারি ? ঐতিহাসিক সত্যের উপরে প্রতিষ্ঠিত লক্ষণসেনই যখন এত ক্ষীণজীবী, কেবল কুসংস্কার ও অক্ষমতার একটা মাংসপিণ্ড মাত্র , তখন কাল্পনিক চরিত্রগুলির মধ্যে দ্রুততর জীবনস্পন্দন ও গভীরতর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য আশা করা অনুচিত বলিয়াই মনে হয় | সুতরাং ঐতিহাসিক চিত্রের যে অসম্পূণ্যতা আমাদের অসন্তোষ উৎপাদন করে, তাহার জন্য বঙ্কিম অপেক্ষা আমাদের ইতিহাসধারার বিশিষ্টতাই দায়ী |
     কেবল কল্পনা-শক্তির দ্বারা গুরুতর ঐতিহাসিক সংঘটনের যতদূর মমো্দ্ঘাটন করা যায়, তাহাতে বঙ্কিম কৃতকায্য হইয়াছেন | মহম্মদ আলির সহিত পশুপতির গুপ্ত পরামশ্য ও ব্যক্তিয়ার খিলিজির শাঠ্য প্রকৃত ঐতিহাসিক অন্তদৃষ্টি দ্বারা অনুপ্রাণীত | 'যবনবিপ্লব' নামক অধ্যায়টি (চতুথ্য খণ্ড, সপ্তম পরিচ্ছেদ) উচ্ছাঙ্গের বণ্যনাশক্তির পরিচয় দেয় | কিন্তু বঙ্কিমের কল্পনা-শক্তির চরম বিকাশ, মানসিক বিপ্লব ও অগ্ন্যুৎক্ষেপ ফুটাইয়া তুলিবার অতুলনীয় ক্ষমতার পরিচয়স্থল---'ধাতুমূত্তির বিসজ্জ্ন' নামক অধ্যায়টি (চতুথ্য খণ্ড, চতুদ্শ পরিচ্ছেদ) | এই অধ্যায়টি জীবন্ত বণ্যনাশক্তিতে ও জ্বালাময় শব্দপ্রয়োগ Dickens- এর বণ্যনার সহিত তুলনীয় | 'মৃণালিনী'তে বঙ্কিমের কলাকৌশল ও চরিত্রাঙ্কন-ক্ষমতা 'দুগে্শনন্দিনী' অপেক্ষা অনেক দূর অগ্রসর হইয়াছে |

২.   রোমান্সের আতিশয্য---'চন্দ্রশেখর' , 'আনন্দমঠ', 'দেবী চৌধুরাণী', 'সীতারাম'

'মৃণালিনী'র পাঁচ ও ছয় বৎসর পরে বঙ্কিমচন্দ্রের দুইখানি ক্ষুদ্র উপন্যাস --'যুগলাঙ্গুরীয়' (১৮৭৪) ও 'রাধারাণী' (১৮৭৫) প্রকাশিত হয় | এই দুইখানি আখ্যান অনেকটা আধুনিক ছোটো গল্পের অনুরূপ--উপন্যাসের বিস্তৃতি ও প্রগাঢ়তা ইহাদের নাই | বিশেষত, ইহাদের প্রধান আকষ্যন ঘটনা-বৈচিত্য, চরিত্র-চিত্রণে নহে | আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে যেমন অনেক সময়ে অনেক অসাধারণ, অপ্রত্যাশিত ঘটনার আবিভা্ব হয়, সৌভাগ্যলক্ষীর অযাচিত অনুগ্রহ লাভ হয়, এই উপন্যাস দুইখানিও সেইরূপ আশাতীত শুভাদৃষ্টের, বিস্ময়কর মিলের (coincidence) কাহিনী | 'যুগলাঙ্গুরীয়' ও 'রাধারাণী' ঠিক একই জাতীয় উপন্যাস; প্রভেদের মধ্যে এই যে, প্রথমখানি অতীত যুগের কাহিনী, ও দ্বিতীয়টি ঘটনাকাল সন্বন্ধে সম্পূণ্য আধুনিক | কিন্তু এই প্রভেদ কেবল নামমাত্র | 'যুগলাঙ্গুরীয়'কে ঐতিহাসিক উপন্যাস মনে করিবার কোনো কারণ নাই; কোনোরূপ ঐতিহাসিকতার ক্ষীণ আভাসমাত্র ইহাতে নাই | তবে উপন্যাসের নায়ক-নায়িকাকে অতীতযুগের শ্রেষ্ঠী বণিক-সম্প্রদায়ভুক্ত করিয়া বঙ্কিম তাহাদের প্রেম-কাহিনীকে কতকটা স্বাভাবিকতা দিতে ও আধুনিক যুগের সন্দেহ-প্রবণতা ও অবিশ্বাস হইতে রক্ষা করিতে চেষ্টা করিয়াছেন | হিরণ্ময়ী-পুরন্দরের প্রেমে যা-কিছু অসামাজিকতা বা অসাধারণত্ব আছে, তাহা সুদূর অতীতের আশ্রয়লাভে আমাদের চক্ষু এড়াইতে অনেকটা সমথ্য হইয়াছে |
     'রাধারাণী'তে এই সন্দেহ ও অবিশ্বাসের মাত্রা পূণ্যভাবেই অনুভব করা যায় | 'রাধারাণী'র প্রেম সম্পূণ্য আধুনিক যুগের বলিয়া, ইহার স্বাভাবিকতা ও সুসংগতি রক্ষা করিতে লেখককে অনেকখানি বেগ পাইতে হইয়াছে | রাধারাণীর সহিত রুক্সিণীকুমারের বোঝা-পড়া দীঘ্য চারি অধ্যায় ধরিয়া চালাইতে হইয়াছে, এবং এই চারি অধ্যায়ের মধ্যে লেখক পদে পদে একটা অস্বাভাবিক বাধা অনুভব করিয়াছেন ও নানাবিধ কৈফিয়তের দ্বারা তাহা অতিক্রম করিতে চেষ্টা করিয়াছেন | তথাপি বঙ্কিমের সহজ প্রতিভা এই সমস্ত বাধা-বিঘ্নের দ্বারা প্রতিহত হইয়াও তাহাদের উপর আংশিক বিজয় লাভ করিতে পারিয়াছে | বঙ্কিমের ক্ষমতার প্রধান পরিচয় এই যে, তিনি এই একটা ছেলেমানুষি গল্পের মধ্যে দিয়াও---যেখানে গভীর চরিত্র-চিত্রণের কোনো অবসর নাই সেখানেও --একটা মধুর ও গভীর রস সঞ্চার করিতে পারিয়াছেন এবং বণ্যনায় বিষয়ের সমস্ত অসংগতি কাটাইয়াও যে সমাধানে উপনীত হইয়াছেন তাহা আমাদের চক্ষে বিসদৃশ ঠেকে না |
     'চন্দ্রশেখর' (১৮৭৫) বঙ্কিমের শ্রেষ্ঠ উপন্যাসসমূহের মধ্যে অন্যতম | ইহাতে আমাদের পারিবারিক জীবনের সহিত বৃহত্তম রাজনৈতিক জগতের সম্মিলন প্রায় স্বাভাবিকভাবেই সংসাধিত হইয়াছে | যদি কখনও রাজনৈতিক জগতের প্রবল প্রবাহ আমাদের গৃহপ্রাঙ্গণে উপস্থিত হইয়া থাকে ও আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে একটা বিক্ষোভ সৃষ্টি করিয়া থাকে, তবে তাহা অরাজকতা ও জাতীয় ভাগ্যবিপয্য়ের যুগগুলিতে | 'চন্দ্রশেখর'-এ এইরূপ একটা যুগ-পরিবত্যনের কাহিনী বিবৃত হইয়াছে | তখন বঙ্গে মুসলমান রাজত্ব ধ্বংসোন্মুখ ও ইংরেজ বণিকগণ অথ্য-উপাজ্নের মোহে মুগ্ধ হইয়া সাম্রাজ্র-স্থাপন অপেক্ষা প্রজা শোষণের দিকেই অধিকতর মনোযোগী ছিল | এই আধুনিক যুগের ইতিহাস 'দুগে্শনন্দিনী' বা 'মৃণালিনী'র ঐতিহাসিক অংশের মতো একেবারে শূন্যগভে্ ও কল্পনাষব্যস্ব হয় নাই | ইংরেজ সাম্রাজ্যের প্রথম পত্তন এই সে দিনের কথা; বঙ্কিমচন্দ্রের নিজের যুগের সহিত তাহার মাত্র শতবষ্য ব্যবধান | খুব নিকট অতীতের ব্যাপার বলিয়া যে যুগের স্মৃতি বাঙালির মনে উজ্জ্বল হইয়াই জাগরূক ছিল; বিশেষত, ইংরেজ তাহার ইতিহাস লিপিবদ্ধ করিয়া, তাহার মুখ্য ঘটনাগুলিকে বিস্মৃতির গভে্ বিলীন হইয়া যাইতে দেয় নাই | সুতরাং 'চন্দ্রশেখর'-এর ঐতিহাসিক চিত্রগুলিতে তথ্যের অপেক্ষাকৃত ঘনসন্নিবেশ হইয়াছে; সেই যুগের একটা মোটামুটি ব্যাপক ধারণা করিতে আমাদের বিশেষ কষ্ট হয় না | নবাগত ইংরেজ শাসকদের দৃঢ়প্রতিগ্যতা, দুঃসাহসিকতা ও সব্যপ্রকার নৈতিক সংকোচহীনতার চিত্রটি উপন্যাসে বেশ ফুটিয়া উঠিয়াছে | বিশেষত, দেশবাসীদের সহিত তাহাদের সম্পকটি একটা অপরিচয়ের রহস্যে মণ্ডিত হইয়া এক বিচিত্র রোমান্সের বিষয়ীভূত হইয়াছে |
     'চন্দ্রশেখর' -এর রোমান্স প্রধানত এই সব্যব্যাপী অরাজকতা ও কেন্দ্র-শক্তির শিথিলতা হইতে উদ্ভূত | অরাজকতা, প্রবল বৈদেশিক শক্তির অভিভব অনেক সময় আমাদের শান্ত স্রোতোহীন পারিবারিক জীবনের উপর অতকি্ত দৈববিপ্লবের মতো আসিয়া পড়ে এলং ইহাতে একটা অননুভূতপূব্য গতিবেগ ও বৈচিত্য সঞ্চার করে; আমাদের অন্তঃপুরের ব্রীড়াসংকুচিত ফুলটিকে বাহিরের প্রবল ও পঙ্কিল বন্যায় ভাসাইয়া লইয়া যায় কিন্তু এই জাতীয় রোমান্স প্রায় বিশেষ গাঢ় ও গভীর হয় না | বৈদেশিক শত্রুর অভিভবে আমাদের গাহস্থ্য-জীবনে যে বিক্ষোভ জাগিয়া ওঠে, তাহাতে অন্তবিপ্লবের কোনো গূঢ় সৌন্দয্য থাকে না, কেবল একটা বাহ্য ঘটনাবৈচিত্র্য থাকে মাত্র | আর অত্যাচারী ও অত্যাচারিতের সংঘষ়্, যেখানে একপক্ষ কেবল পাইবার লোভে আক্রমণ করিতেছে এবং অপর পক্ষ, ব্যাকুল, দুব্যলভাবে অপ্রতিবিধেয় শক্তির বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার বৃথা চেষ্টা করিতেছে, সেখানে আমাদের মনে বিচিত্র সৌন্দয্যবোধ অপেক্ষা করুণরসেরই সমধিক উদ্রেক হইয়া থাকে; সমবেদনার অশ্রুজলে রোমান্সের সৌন্দয্য কোথায় ভাসিয়া চলিয়া যায় | বঙ্কিমচন্দ্রের সমসাময়িক অনেক লেখকই এই শ্রেণীর কাহিনীকে তাঁহাদের উপন্যাসের বিষয় করিয়াছেন; কিন্তু তাঁহারা কেহই ইহার স্বাভাবিক করুণরস-প্রবণতাকে অতিক্রম করিয়া ইহার মধ্যে রোমান্সের বিচিত্র সৌন্দয্যসৃষ্টি করিতে পারেন নাই | তাঁহার কেহই বঙ্কিমের কল্পনাসম্পদ, গূঢ় কলাকৌশল ও মানব-মনের সহিত গভীর পরিচয়ের অধিকারী ছিলেন না | বঙ্কিম তাঁহার সমসাময়িক লেখকদের অপেক্ষা কত শ্রেষ্ঠ, 'চন্দ্রশেখর'-এর সহিত শ্রীশচন্দ্র মজুমদারের 'ফুলজানি' উপন্যাসের তুলনা করিলেই, তাহার পরিচয় পাওয়া যায় | রথচক্রতলে নিষ্পেশিত একটি ক্ষুদ্র সুন্দর প্রজাপতি দেখিলে আমাদের মনে যে ভাব হয়, শ্রীশচন্দ্রের উপন্যসখানিও অনেকটা সেইরূপ ভাবেরই