Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা- ৪৬, ৪৭ ও ৪৮

2020-06-18
উদ্রেক করে, পাঠকের মনকে একটি অবিমিশ্র কারুণ্য-রসে ভরিয়া তোলে; কিন্তু তাহার মধ্যে অন্য কোনো উচ্চতর কলা-কৌশলের নিদশ্যন পাই না | 'ফুলজানি' উপন্যাসের সরলা স্নেহময়ী নায়িকার উপর যে কেন একটা এরূপ নিম্যম বজ্র ভাঙিয়া পড়িল, তাহার এক ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা ছাড়া অপর কোনোরূপ ব্যাখ্যা আমরা খুঁজিয়া পাই না | তাহার নিজ চরিত্রে অরূপ ভীষণ পরিণামের কোনো বীজ লুকাইয়া ছিল বলিয়া লেখক আমাদিগকে দেখান নাই | প্রতিকূল-দৈব-পীড়িতা নায়িকা বাণ-বিদ্ধা হরিণীর মতো নিতান্ত অকারণেই আমাদের সম্মুখে মৃত্যুর কোলে ঢালিয়া পড়ে |
     বঙ্কিমের প্রণালী সম্পূণ্য বিভিন্ন | তিনি শৈবলিনীকে চক্রপিষ্ট পতঙ্গের মতো কেবল বাহ্যশক্তি-নিপীড়িত করিয়াই দেখান নাই | যে প্রবল ঝটিকা তাহাকে তাহার শান্ত গৃহকোণ ও সুরক্ষিত সমাজ-জীবন হইতে টানিয়া বাহির করিয়াছে, তাহার প্রকৃত জন্ম তাহার নিজ অশান্ত হৃদয়তলে | লরেন্স ফস্টরের সহিত তাহার সম্পক্য অত্যাচারিত অত্যাচারীর সম্পকে্র ন্যায় নহে | বিদ্যুৎ-শিখা যেমন মেঘের আশ্রয়ে থাকিয়া আত্মপ্রকাশ করে, সে়ইরূপ শৈবলিনীর অন্তগূঢ় জ্বালাময়ী প্রবৃত্তি ফস্টরের রূপমোহ ও দুঃসাহসিকতাকে অবলম্বন করিয়া বাহিরে আসিয়াছে ও দীপ্ত হইয়া উঠিয়াছে | ঘটনাচক্রের যে পরিণতি হইয়াছে তাহাতে উভয়েরই দায়িত্ব আছে; যে অগ্নি জ্বলিয়াছে, তাহাতে উভয়েই ইন্ধন যোগাইয়াছে | শৈবলিনীর মনে গূঢ় পাপের অঙ্কুর না থাকিলে শুধু ফস্টরের পাপ ইচ্ছা ও প্রবল আগ্রহ তাহাকে গৃহাশ্রয় হইতে আকষ্যণ করিতে পারিত না; আবার ফস্টরের দুঃসাহসিকতার অপ্রত্যাশিত আশ্রয় না পাইলে শৈবলিনীর মনের গোপন পাপ অন্তরেই চাপা থাকিত, প্রকাশ্য বিদ্রোহের অগ্নিশিখায় জ্বলিয়া উঠিত না | সুতরাং সূক্ষ্ম ও গভীরভাবে আলোচিত হইয়াছে | আর বিশেষত শৈবলিনী ও ফস্টরের মধ্যে কে যে অত্যাচারী ও কে যে অত্যাচারিত তাহা বলা কঠিন | ফস্টর বলপ্রয়োগ করিয়া শৈবলিনীকে লইয়া গেলেও শৈবলিনীর ইচ্ছাশক্তি ফস্টরের উপর জয়লাভ করিয়াছে; এমন কি সে ফস্টরকে নিজ গূঢ়তর অভিসন্ধি পূণ্য করিবার উপায়-রূপে ব্যলহার করিতে চাহিয়াছে; এবং এক অপ্রত্যাশিত দিক হইতে বাধা না আসিলে শৈবলিনী যে তাহার দ্বারা নিজ মনোরথ-সিদ্ধির পথ পরিষ্কার করিয়া লইত, তাহাতে সন্দেহ নাই |
     আরও অনেক দিক দিয়া 'চন্দ্রশেখর' সাধারণ ঔপন্যাসিকের অত্যাচার-কাহিনী হইতে বিভিন্ন | যেমন শৈবলিনীর বিপদ তাহার অন্তরস্থ দুব্যলতার ফল, সেইরূপ ইহার পরিণতিও একটা গুরুতর অন্তবিপ্লব ও প্রায়শ্চিত্তের উপর প্রতিষ্ঠিত | অন্যান্য উপন্যাসে মৃত্যু যে সুলভ সমাধানের পথ দেখাইয়া দেয়, বঙ্কিমের প্রতিভা তাহা গ্রহণ করে নাই| শৈবলিনীর উৎকট প্রায়শ্চিত্তের যে চিত্ত দেওয়া হইয়াছে, সাধারণ মনস্তত্ব-বিশ্লেষণের দিক দিয়া তাহার মূল্য কত বলা সুকঠিন | সাধারণ মনস্তত্ত্বমূলক ব্যাখ্যা এ ক্ষেত্রে পযা্প্ত হইবে কি না তাহাও বলা দুরূহ | এত বড়ো একটা যুগান্তরকারী, বিপ্লবপূণ্য অনুভূতির জন্য শৈবলিনীর চিত্তক্ষেত্র ঠিক প্রস্তুত ছিল কি না তাহাও সন্দেহের বিষয় | বঙ্কিম যেরূপ অচিন্তনীয় দ্রুত গতিতে ও অসাধারণ আবেষ্টনের মধ্যে এই মানসিক পরিবত্যন ঘটাইয়াছেন, তাহা হয়তো মানব-হৃদয়ের ধীর, বিগ্যান-সম্মত আলোচনা অপেক্ষা যাদুবিদ্যারই অধিক অনুরূপ | কিন্তু সমস্ত দৃশ্যটির মধ্যে যে অপরূপ কল্পনাসমৃদ্ধির ও আশ্চয্য কবিজনোচিত অন্ত্যদৃষ্টির (poetic vision) পরিচয় পাই, তাহা গদ্যসাহিত্যে তুলনারহিত | তাহা মিলটন ও দান্তের নরকবণ্যনার সহিত প্রতিযোগিতার স্পধ্যা করিতে পারে | বঙ্কিম এখানে কবির বিশেষ অধিকার দাবি করিয়া, ঔপন্যাসিকের যে কত্যব্য-মন্থর পয্যবেক্ষণ ও তত্ত্ব-বিশ্লেষণে, অবিচলিত ধৈযে্র সহিত কায্যকারণের শৃঙ্খলা-রচনা--তাহা হইতে নিজেকে অব্যাহতি দিয়াছেন; এবং প্রতিভার বিদ্যুৎশিখার সম্মুখে সমালোচকের চক্ষুও তাহার বিচারবুদ্ধি পরিচালনা করিতে, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অসংগতির ত্রুটি ধরিতে সংকুচিত হইয়া পড়ে |
     'চন্দ্রশেখর ' -এর রোমান্স মুখ্যুত মনস্তত্তমূলক হইলেও ইহার মধ্যে চমকপ্রদ সংঘটনের অভাব নাই | ফস্টরের নৌকা আক্রমণ ও ইংরেজদের মৃত্যুভয়হীন বীরত্বের প্রকাশ --এই সমস্ত বিবরণের গল্প-হিসাবে আকষ্যণী শক্তি বড়ো কম নহে | মোটের উপর বঙ্কিম এই সমস্ত যুদ্ধ-বিগ্রহের বণ্যনায় ও রাজনৈতিক জটিলতাজালের বিবৃতিতে বেশ দক্ষতাই দেখাইয়াছেন, কোথাও অবা্চীন-সুলভ অনভিগ্যতা প্রকাশ করেন নাই---যুদ্ধের প্রত্যক্ষগ্যানরহিত বাঙালি লেখকের পক্ষে ইহা অল্প প্রশংসার বিষয় নহে | অবশ্য এ বিষয়ে বঙ্কিম যে একেবারে ভ্রমপ্রমাদশূন্য, তাহা বলা যায় না ; বিশেষত, শৈবলিনীর দ্বারা প্রতাপের উদ্ধার-ব্যাপার যে সম্পূণ্য সম্ভব, পাঠকের মনে সে বিশ্বাস নাও হইতে পারে | প্রতাপের দ্বারা শৈবলিনীর উদ্ধার, প্রথম ঘটনা বলিয়া এবং ইংরেজদের পক্ষে সম্পূণ্য অপ্রত্যাশিত বলিয়া বরং বিশ্বাসযোগ্য, কিন্তু অল্প কয়েকদিনের মধ্যে একই চাতুরীর পুনরাবৃত্তি আমাদের বিশ্বাস-প্রবণতায় একটু রূঢ় রকমেরই আঘাত দেয় | বিশেষত, ইংরেজ-নৌকার পশ্চাদ্ধাবনের আসন্ন সম্ভাবনার মধ্যে প্রতাপ-শৈবলিনীর গঙ্গা-বক্ষে স্বচ্ছন্দ-বিহার ও তাহাদের জীবনের প্রধান সমস্যার সমাধানচেষ্টা একটু অসামরিক বলিয়াই বোধ হয় | আবার উপন্যাসের মধ্যে রমানন্দ স্বামীর ন্যায় অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন মহাপুরুষের অবতারণা এবং শৈবলিনীর সম্বন্ধে তাঁহার সদা-সতক্য দৃষ্টি ও অভ্রান্ত ব্যবস্থা আমাদের বিশ্বাসকে বিদ্রোহোন্মুখ করিয়া তোলে | কিন্তু এই বাস্তবতা-প্রিয় যুগের কঠোর পরীক্ষার বঙ্কিম সম্পূণ্য উত্তীণ্য হইতে না পারিলেও মোটের উপর তাঁহার ঘটনাসমাবেশ-কৌশল যে খুব উচ্চ প্রশংসার যোগ্য, তাহাতে সন্দেহ নাই |
     বঙ্কিমের ঘটনাসমাবেশ-কৌশলের চরম বিকাশ শৈবলিনী-কাহিনীর সহিত দলনী-উপাখ্যানের গ্রন্থনে | এই দুইটি করুণ, বিষাদময় কাহিনী একসূত্রে গাঁথিয়া বঙ্কিম যে কী আশ্চয্য গঠন-কৌশলের পরিচয় দিয়াছেন, উপন্যাসখানির ভাবগৌরব ও সাথ্যকতা কতখানি বাড়াইয়া তুলিয়াছেন, তাহা ভাবিতে গেলে বিস্ময়মগ্ন হইতে হয় | যে রাজনৈতিক ঝটিকা দরিদ্র গৃহস্থগৃহের পূব্য হইতে শিথিলিত-মূল

লতাটিকে সহজেই উড়াইয়া আনিয়াছে, তাহা নবাবের অন্তঃপুরে প্রবেশ করিয়া তাঁহার প্রেয়সী মহিষীকে সমস্ত সম্ভ্রম--গৌরবের মাঝখান হইতে টানিয়া আনিয়া একেবারে সব্যনাশের অতল গহ্বরের শিরোদেশে উপস্থাপিত করিয়াছে | শৈবলিনীর ন্যায় দলনীয় প্রথমে ভ্রান্তি দ্বারা বাহিরের সব্যনাশকে নিমন্ত্রণ করিয়া আনিয়াছে, অসাবধান মক্ষিকার ন্যায় রাজনৈতিক ঊণ্যনাভজালের সহস্র বন্ধনে আপনাকে জড়াইয়া ফেলিয়াছে | দলনী-জীবনের ট্রাজেডি ও ইহার অপ্রতিবিধেয় নিম্যম শক্তি ত্রুর দৈবের নিষ্ঠুর পরিহাসের মতোই আমাদিগকে একটা গভীর ভয় ও বিস্ময়ে অভিভূত করিয়া ফেলে | ইহা আমাদিগকে স্বতই মেটারলিংকের "Luck" নামক প্রবন্ধের কথা স্মরণ করাইয়া দেয় এবং ঐ প্রবন্ধে তিনি নিরীহ, নিদো্ষ ব্যক্তির উপর ক্রদ্ধ নিয়তির অত্যাচারের যে সমস্ত রোমাঞ্চকর দৃষ্টান্ত দিয়াছেন, তাহাদের মধ্যে একটা প্রধান স্থান লাভ করে | দলনী স্বামীর অমঙ্গল-সম্ভাবনার ভীত হইয়া একবার দুগে্র বাহিরে পা দিয়াই প্রতিকূল দৈবরূপ যে দুরন্ত দানবকে জাগাইয়া তুলিল, তাহার ক্ষমাহীন হিংসা তাহাকে মৃত্যু পয্যন্ত অনুসরণ করিয়া | সে বিপদ হইতে আপনাকে উদ্ধার করিতে যতই চেষ্টা করিয়াছে, ততই সাংঘাতিকভাবে নিয়তির দুশ্ছেদ্য জালে জড়িত হইয়া পড়িয়াছে | যে-কেহ তাহার আনুকূল্য করিতে চেষ্টা করিয়াছে, সে-ই তাহার হিতৈষণা দ্বারা তাহাকে সব্যনাশের অতল পঙ্কে আরও গভীরভাবেই ডুবাইয়া দিয়াছে | যে কালো নিশীথে গুরগন খাঁর বিশ্বাসঘাতকতায় দলনীর দুগ্যপ্রবেশপথ রুদ্ধ হইল, সেই রাত্রে সন্নাসীবেশী চন্দ্রশেখর তাহার সহায়তা ককিতে গিয়া তাহাকে সব্যনাশের পথে আর এক পদ অগ্রসরই করিয়া দিলেন | আশ্রয়ব্যপদেশে তাহাকে সমস্ত রাজধানীর মধ্যে এমন একটি বাটীতে লইয়া গেলেন, যেখানে সব্যনাশ তাহার কৃষ্ণ চিহ্ন অঙ্কিত করিয়া দিয়া গিয়াছে, যেখানে বিপদ নূতন জাল পাতিয়া তাহার প্রতীক্ষাতেই বসিয়া আছে | সেই রাত্রেরই শেষ ভাগে একটা সম্পূণ্য স্বাভাবিক ভ্রান্তির বশে দলনী অতল গহ্বরের দিকে আর এক ধাপ নীচে নামিয়া গেল, শৈবলিনীভ্রমে ইংরেজ তাহাকে বন্দি করিয়া লইয়া গেল এবং নবাবের আগতপ্রায় ক্ষমার সীমার বাহিরে, আসন্ন উদ্ধারের স্পশ্য হইতে দূরে ফেলিয়া দিল | মহম্মদ তকির অনবধানতা ও দলনীর বিরুদ্ধে তাহার মিথ্যা-অভিযোগ-সৃষ্টি, দলনীর নিব্ন্ধাতিশয্যে ফস্টর কতৃক তাহার পরিত্যাগ, কুলসমের সহিত বিচ্ছেদ, ব্রম্ভ্রচারীর নিষেধসত্ত্বেও মুঙ্গেরযাত্রার কৃতসংকল্পতা ---ঘটনার প্রত্যেক পদক্ষেপই দলনীর গলদেশে নিয়তির যে রজ্জু ঝুলিতেছিল তাহার বন্ধন দৃঢ়তর করিয়া দিয়াছে | শেষে নিয়তি যে বিষপাত্র পূণ্য করিয়া তাহার ওষ্ঠে তুলিয়া দিল তাহাতে অপূব্য মাধুয্যরসের অমৃত সঞ্চার করিয়া দলনী তাহা পান করিল এবং অদৃষ্টের অবিচ্ছন্ন পীড়ন হইতে অব্যাহতি লাভ করিল |
     এই অসাধারণ অদৃষ্ট-মন্থনে একদিকে যেমন বিপদের হলাহল ফেনাইয়া উঠিয়াছে, তেমনি আর একদিকে অন্তরের আলোড়নে ভাবের অমৃত বিষকে ছাপাইয়া বাহিরে আসিয়াছে | বাহিরের বিপদসংঘাতের সঙ্গে সঙ্গে অন্তরেও একটা গভীর আলোড়ন চলিয়াছে এবং হৃদয়ের গভীর বৃত্তি ও ভাবসমূহ আশ্চয্য সমৃদ্ধির সহিত অভিব্যক্তি লাভ করিয়াছে | বিশেষত, যে অধ্যায়ে (ষষ্ঠ খণ্ড, তৃতীয় পরিচ্ছেদ) কুলসমের তিক্ত, তীব্র সত্য-ভাসণে নবাবের দলনী-বিষয়ে ভ্রান্তির নিরসন হইল, তাহাতে মীরকাসেমের অসহ্য মনঃপীড়া ও নিষ্ফল অনুতাপ গৈরিক অগ্নিস্রাবের ন্যায়ই আমাদিগকে দগ্ধ করে | অন্যান্য তীব্রভাবপূণ্য দৃশ্যের মধ্যে সুষপ্তা শৈবলিনীর সম্মুখে বসিয়া চন্দ্রশেখরের খেদপূণ্য চিন্তা, ইংরেজ-হস্ত হইতে উদ্ধারের পর শৈবলিনীর সহিত প্রতাপের অপ্রত্যাশিত সাক্ষাৎ, শৈবলিনী ও প্রতাপের গঙ্গা-সন্তরণ, দলনীর বিষপান, মৃত্যুকালে প্রতাপের আজীবন-রুদ্ধ প্রেমের জ্বালাময় অভিব্যক্তি এবং সবো্পরি বিরাট কল্পনার দ্বারা মহিমান্বিত শৈবলিনীর উৎকট প্রায়শ্চিত্তের বিবরণ আমাদের মনের মধ্যে সুগভীর রেখায় কাটিয়া বসে এবং বিচিত্র-ভাব-নিলয় এই মানব-হৃদয় ও গূঢ়-রহস্যাবৃত এই মানব-জীবনের প্রতি একটা শ্রদ্ধামিশ্রিত বিস্ময়ে আমাদ্গকে অভিভূত করিয়া ফেলে |
     অবশ্য ভাষাগত উপযোগিতার দিক দিয়া সমস্ত দৃশ্য যে সব্যাঙ্গসুন্দর হয় নাই, তাহার আভাস পূবে্ই দেওয়া হইয়াছে | কথোপকথনের সময়ে, একটা আলংকারিক শব্দাড়ম্বর সময়ে সময়ে বাস্তবতার স্তরটিকে ঢাকিয়া ফেলে, পুষ্পাভরণপ্রাচুযে্ মৃত্তিকার রস ও গন্ধ অন্তরালে পড়িয়া যায় | বঙ্কিমের যুগে বাস্তব-জীবনের ভাষা সাহিত্য-ক্ষেত্রে প্রবেশ লাভ করে নাই; করিলেও আমাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনের ভাষা ভাবের এত উচ্চগ্রামে বাঁধা চলিত কি না সন্দেহ | সে যাহাই হউক, মোটের উপর, কতকগুলি দৃশ্য কতকটা ভাষাগত অতিরঞ্জনের জন্য, আদশ্য সৌন্দয্য হইতে কিঞ্চিন্মাত্র ভ্রষ্ট হইয়াছে | কিন্তু কথোপকথনের দিক দিয়া যাহা হউক, বণ্যনা ও ব্যঞ্জনায় এই ভাব-সমৃদ্ধ, অথ্যগৌরবপূণ্য ভাষা একটা সবা্ঙ্গসুন্দর সাথ্যকতার ভরিয়া উঠিয়াছে | নিদ্রিতা শৈবলিনীর সৌন্দয্য-বণ্যনা, প্রতারণাশীল প্রভাত বায়ুর বিপদগভ্য ক্রীড়াশীলতা, শৈবলিনীর পব্যতারোহণের পর প্রকৃতির ভয়ানক বিপ্লব ও মানুষের সুখে-দুঃখে তাহার নিম্যম উদাসীনতার বণ্যনা এবং প্রায়শ্চিত্তের দৃশ্যগুলি বঙ্কিমের ভাষার চরম গৌরবস্থল |
     চরিত্রাঙ্কনের দিক দিয়া এক শৈবলিনীর চরিত্রেই অনেকটা জটিলতা আছে; তাহারই অন্তরের গভীর তলদেশ পয্ন্ত বঙ্কিম আপনার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি চালাইয়াছেন | অন্যান্য সমস্ত চরিত্রই অপেক্ষাকৃত সরল; তাহারা সম্পূণ্য বাস্কব ও জীবন্ত হইলেও, তাহাদের মধ্যে অধিক গভীরতা নাই, দুই-একটি প্রাথমিক প্রবৃত্তি বা গুণেরই প্রাধান্য আছে | বঙ্কিম অতি সুকৌশলে শৈবলিনীর অধঃপতনের ক্রমবিকাশটি চিত্রিত করিয়াছেন | প্রথম যৌবনে প্রতাপ-শৈবলিনীর মধ্যে যে ব্যথ্য প্রণয়জ্বালা-নিবারণের জন্য ডুবিয়া মরিবার পরানশ্য হয়, তাহাতেই শৈবলিনীর স্বাথ্যপরতা ও চরিত্র-দৌব্যল্যের প্রথম অঙ্কুর দেখা যায় | প্রতাপ নিজ প্রতিগ্যানুসারে ডুবিয়াছিল, কিন্তু শৈবলিনী শেষ পয্যন্ত ঠিক থাকিতে পারিল না, প্রাণের মায়া তাহার প্রণয়াবেগকে হঠাইয়া দিল | এই অন্তনিহি্ত দুব্যলতার বীজটিই তাহার ভবিষ্যৎ জীবনে ক্রমবধি্ত হইয়া তাহাকে এক গুরুতর পদস্খলনের দিকে লইয়া গিয়াছে | তাহার পরই চন্দ্রশেখরের সহিত ববাহ | বিবাহের আট বৎসর পরে ভীমা পুষ্করিণীর জলমধ্যে এই অমঙ্গলের বীজে আবার বারি-সিঞ্চন হইল, অন্তরস্থ পাপ প্রবল ও সতেজ হইয়া উঠিল | শৈবলিনীব বিবাহিত জীবনের এই আট বৎসরের ইতিহাস আনরা প্রত্যক্ষভাবে পাই না--তবে চন্দ্রশেখরের আক্ষেপোক্তিতে তাহার একটি সহানুভূতিপূণ্য

চিত্রের আভাস পাই | চন্দ্রশেখরের বিষয়-বিমুখ, পাঠনিরত চিত্ততবৃত্তিতে শৈবলিনী তাহার প্রণয়তৃষ্ণা-নিবারণের বিশেষ সুযোগ পায় নাই | তারপর শৈবলিনীর মানস পাপ বাহিরে প্রকাশ পাইল---ফস্টর ডাকাইতি করিয়া তাহাকে সমাজ-বক্ষ ও গাহ্স্থ্য-জীবন হইতে ছিনাইয়া লইয়া গেল | এইখানে বঙ্কিম একটি অভিনব প্রথা অবলম্বন করিয়াছেন--তিনি শৈবলিনীর গোপন অভিপ্রায় সম্বন্ধে আমাদের নিকট কোনো স্পষ্ট উক্তি করেন নাই, তাহার পাপের কাহিনীটি ধীরে ধীরে যবনিকার অন্তরাল হইতে টানিয়া বাহির করিয়াছেন | যেমন বাস্তব-জীবনে ধীরে ধীরে পাপের আবিষ্কার হয়, অনুমান, সন্দেহ ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আভাস শেষে নিশ্চিন্ত বিশ্বাসে পরিণত হয়, তারপর শৈবলিনীর মানস পাপ বাহিরে প্রকাশ পাইল---ফস্টর ডাকাইতি করিয়া তাহাকে সমাজ-বক্ষ ও গাহ্স্থ্য-জীবন হইতে ছিনাইয়া লইয়া গেল | এইখানে বঙ্কিম একটি অভিনব প্রথা অবলম্বন করিয়াছেন --তিনি শৈবলিনীর গোপন অভিপ্রায় সম্বন্ধে আমাদের নিকট কোনো স্পষ্ট উক্তি করেন নাই, তাহার পাপের কাহিনীটি ধীরে ধীরে পাপের আবিষ্কার হয়, অনুমান, সন্দেহ ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আভাস শেষে নিশ্চিন্ত বিশ্বাসে পরিণত হয়, শৈবলিনীর ক্ষেত্রে ঠিক তাহাই হইয়াছে | সুন্দরীর সহিত বাড়ি ফিরিতে অস্বীকারকরণে তাহার পাপের প্রথম সন্দেহ পাঠকের মনে উদিত হয়; পরে প্রতাপের নিকটে শৈবলিনীর স্পষ্ট স্বীকারোক্তিতে আমাদের সন্দেহ দৃঢ় প্রতীতিতে পরিণত হয় | কিন্তু শৈবলিনীর যুক্তিধারাটি ঠিক আমাদের মনে লাগে না ---ফস্টরের সহিত কুলত্যাগ করিয়া গেলে প্রতাপের প্রণয়লাভ যে কী প্রকারে সুলভ হইবে, তাহা দুবো্ধ্য বলিয়াই মনে হয় | পুরন্দরপুরের কুঠির বাতায়নে জাল পাতিয়া প্রতাপ-পক্ষীকে ধরার বিশেষ কী সুবিধা ছিল জানি না, কুন্তু এখানে শৈবলিনী প্রতাপের চরিত্র সম্বন্ধে যে একটা প্রকাণ্ড হিসাব-ভুল করিয়াছিল তাহা সুনিশ্চিত | বোধ হয় সেই প্রণয়মূঢ়া ভাবিয়াছিল যে, সামাজিক ব্যবধানই তাহার প্রতাপ-লাভের পথে প্রধান অন্তরায় | প্রতাপের ইংরেজ-হস্তে বন্দি হইবার পরও এই ভ্রমের নেশা তাহাকে ছাড়ে নাই---সে নবাবের নিকট দরবার করিয়া রূপসীর বিরুদ্ধে প্রতাপ-লাভের ডিক্রি পাইবার অসম্ভব আশাও মনে মনে পোষণ করিতেছিল | মজ্জমান ব্যক্তির তৃণখৃণ্ড ধরিয়া ভাসিবার চেষ্টার মতো শৈবলিনীর প্রতাপ-লাভের এই অসম্ভব আশার মধ্যে একটা pathos --করুণ দিক--আছে | প্রতাপের উদ্ধারের জন্য তাহার যে সমস্ত দুঃসাহসিক চেষ্টা, তাহাও তাহার প্রণয়াকষ্যণের তীব্রতার পরিচয় দেয় | তারপর সব শেষ --দীঘ্যকালসঞ্চিত সুখস্বপ্ন এক মুহূতে্ ভাঙিয়া গেল, নিদারুণ বজ্রাঘাতে আশারচিত প্রণয়সৌধ ধূলিসাৎ হইয়া গেল | এই পয্ন্ত শৈবলিনী-চরিত্রের বিশ্লেষণ চলে | তাহার পর সে মত্যলোকের অনেক ঊধ্বে্, এক অভিনব অনুভূতির রাজ্যে বিশ্লেষণের সীমা অতিক্রম করিয়া চলিয়া গিয়াছে | এই সমস্ত প্রচণ্ড অনুভূতির ফলে ও ক্ষণস্থায়ী উন্মত্ততার অন্তরালে শৈবলিনীর মনের রাজ্যের একটা যুগান্তর সংঘটিত হইয়া গেল --তাহার মম্যস্থান হইতে প্রতাপের প্রতি অনুরাগের মূল পয্ন্ত উৎপাটিত হইল এবং শৈবলিনী প্রকৃতপক্ষে নবজীবন লাভ করিল | কিন্তু এই শেষের দিকের শৈবলিনী আর সমালোচকের বিশ্লেষণের বস্তু নহে; খুব উচ্চাঙ্গের কবি-কল্পনার অনুভূতির বিষয় |
     'চন্দ্রশেখর'-এ বঙ্কিম যে নূতন কৃতিত্ব ও ক্ষমতার পরিচয় দিয়াছেন তাহাতে সন্দেহ নাই | গাহ্স্স্য-জীবনের উপর রাজনৈতিক ঘটনার প্রভাব এখানে সুন্দরভাবে দেখানো হইয়াছে | লেখক শৈবলিনীতে একটি জটিল স্ত্রীচরিত্রের সৃষ্টি ও বিশ্লেষণ করিয়াছেন | তাঁহার পুব্য পূব্য উপন্যাসের মধ্যে এক 'মৃণালিনী'তে মনোরমার চরিত্র অনেকটা জটিল ও রহস্যময়, কিন্তু মনোরমা মুখ্যত কল্পনা-রাজ্যের জীব; শৈবলিনী একেবারে আমাদের বাস্তব-জগতের প্রতিবেশী | সকলের শেষে বঙ্কিম রোমান্সের বণো্চ্ছাস গাঢ়তর করিয়া দিয়া অপেক্ষাকৃত বিরলবণ্য জগৎকে একেবারে লুপ্ত করিয়া দিয়াছেন | কবি আসিয়া ঔপন্যাসিকের হস্ত হইতে লেখনী কাড়িয়া লইয়াছে | 'চন্দ্রশেখর'-এর কল্পনাশক্তির সমৃদ্ধি ও সুসংগতি আমরা উপভোগ করি, ইহার কলা-সৌন্দয্য আমাদিগকে একেবারে মুগ্ধ করিয়া দেয়; কিন্তু উপন্যাস-ক্ষেত্রে কবিত্বের এই অনধিকারপ্রবেশে যে ভবিষ্যৎ বিপদের বীজ নিহিত আছে ইহাও অনুভব করি | 'চন্দ্রশেখর', 'আনন্দমঠ'-এর বাস্তব-সম্পক্হীন আদশ্যবাদের ও 'দেবী চৌধুরাণী'র অনুশীলন-তত্ত্ব-প্রিয়তার অগ্রদূত |
     'চন্দ্রশেখর' -এর পরের উপন্যাসগুলির সম্বন্ধে কালানুক্রমিক পারম্পয্য লইয়া কতকটা সন্দেহ রহিয়া গিয়াছে | শচীশবাবুর তালিকায় 'চন্দ্রশেখর'-এর অব্যবহিত পরেই 'রাজসিংহ' (১৮৮২) ও তাহার পর ক্রমান্বয়ে 'আনন্দমঠ (ডিসেম্বর, ১৮৮২), 'দেবী চৌধুরাণী' (১৮৮৪) ও 'সীতারাম' (১৮৮৭) প্রকাশিত হয় | কিন্তু আমাদের আলোচনায় এই অন্বয় ঠিক অনুসরণ করার পক্ষে কিছু বাধা আছে | প্রথমত, 'রাজসিংহ'-এর প্রথম সংস্করণের সহিত বত্যমান সংস্করণের (১৮৯৩) একেবারে মৌলিক ও গুরুতর প্রভেদ আছে | দ্বিতীয়ত, ঐতিহাসিকতা সন্বন্ধেও বত্যমান সংস্করণের 'রাজসিংহ' অন্যান্য ঐতিহাসিক উপন্যাস হইতে অনেকটা বিভিন্ন; 'রাজসিংহ' -এর চতুথ্য সংস্করণের প্রারম্ভে যে বিগ্যাপন আছে, তাহাতে এই পাথ্যক্যের প্রকৃতি বুঝা যায় | ঐতিহাসিক উপন্যাসের স্বরূপ সন্বন্ধে বঙ্কিমের নিজ অভিমত এই বিগ্যাপনে ব্যক্ত হইয়াছে | ঐতিহাসিক উপন্যাসের সহিত কাল্পনিকের সংমিশ্রণ সম্বন্ধে লেখকের মতামত বিশেষভাবেই আমাদের দৃষ্টি আকষ্যণ করে | এখন বঙ্কিমের নিজের মতে 'রাজস্ংহ'ই তাঁহার একমাত্র ঐতিহাসিক উপন্যাস; তিনি লিখিয়াছেন, "পরিশেষে বক্তব্য যে আমি পূবে্ কখনও ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখি নাই | 'দুগে্শনন্দিনী' বা 'চন্দ্রশেখর' বা 'সীতারাম'কে ঐতিহাসিক উপন্যাস বলা যাইতে পারে না | এই প্রথম ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখিলাম | এ পয্যন্ত ঐতিহাসিক (?) উপন্যাস-প্রণয়নে কোন লেখকই সম্পূণ্যরূপে কৃতকায্য হইতে পারেন নাই | আমি যে পারি নাই, তাহা বলা বাহুল্য |" সুতরাং 'রাজসিংহ'কে বঙ্কিমের ঐতিহাসিক উপন্যাসের চরমোৎকষে্র উদাহারণ বলিয়া মনে করিলে, ইহাকে 'আনন্দমঠ' ও 'সীতারাম' -এর পর আলোচনা করাই যুক্তিসংগত | সেইজন্য আপাতত 'রাজস্ংহ'কে বাদ দিয়া 'আনন্দমঠ', 'দেবী চৌধুরাণী' ও 'সীতারাম' -এর আলোচনা আরম্ভ করাই সমীচীন হইবে |
     পূবে্ই বলা হইয়াছে যে, 'চন্দ্রশেখর' -এ যে কল্পনাতিশয্যের সূত্রপাত, তাহা 'আনন্দমঠ' ও 'দেবী চৌধুরাণী'তে প্রকটতর হইয়াছে এবং বঙ্কিমকে অল্পবিস্তর ঔপন্যাসিক আদশ্য হইতে স্খলিত করিয়াছে | বিশেষত, 'আনন্দমঠ' -এ এই কল্পনা-বিলাস বাস্তবতাকে একেবারে ঢাকিয়া ফেলিয়াছে | 'আনন্দমঠ' ও 'দেবী চৌধুরাণী'র বিস্তারিত পৃথক আলোচনার পূবে্ তাহার কতকগুলি সাধারণ বৈশিষ্ট্য ও সৌসাদৃশ্য লক্ষ্য করিলে ভালো হয় | উভয়েরই ঘটনা-কাল প্রায় এক ---ইংরেজ-রাজত্বের প্রথম পত্তনের সময়; 'দেবী চৌধুরাণী'র আখ্যায়িকা 'আনন্দমঠ' -এর কয়েক বৎসর পরে মাত্র |বঙ্কিমের অধিকাংশ রোমান্সের কাল এই ইংরেজ রাজত্বের প্রথম সূচনার সময় |