Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা- ৫২, ৫৩ ও ৫৪

2020-06-20
সন্তান-ধমে্র অপাথি্ব রাজ্যে প্রবেশ করিয়াছে, তাহার মধ্যে মহেন্দ্র-কল্যাণী এই দুইজনই তাহাদের বাস্তবতা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য রক্ষা করিয়াছে | ইহাদের সহিত সন্তান-জগতের সম্পক্য ও পরিচয় খুব অল্প দিনের; ইহারা বাহির হইতে যে প্রকৃত লইয়া এই জগতে পদাপ্যণ করিয়াছিল, সে প্রকৃতি বিশেষ রূপান্তরিত হয় নাই | চারিবৎসরব্যাপী একটা উজ্জল স্বপ্ন ও অলৌকিক অনুভূতি হইতে জাগিয়া তাহারা আবার সেই পুরাতন, চিরপরিচিত বাস্তব-জগতে প্রত্যাবত্যন করিয়াছে | শান্তিকে সন্তান-রাজ্যের আকাশ-বাতাসের সহিত একাত্ম করিবার জন্য তাহার সমস্ত পূব্য জীবনকে বিকৃত ও একটা অপ্রকৃত বণে্ রঞ্জিত করিতে হইয়াছে | তবে বঙ্কিমের কৃতিত্ব এই যে, কোনো চরিত্রই একেবারে অস্বাভাবিক বা অবিশ্বাস্য হয় নাই; তাহাদের বাক্যে ও ব্যবহারে ও পরস্পরের সহিত সম্পকে্ একটা সুন্দর ঐক্য ও সুসংগতি রক্ষিত হইয়াছে | লেখক যে আকাশ-বাতাস সৃষ্টি করিয়াছেন, তাহা সম্পূণ্য বাস্তব না হউক, কোনোরূপ আভ্যন্তরীণ অসংগতিদুষ্ট হয় নাই, ইহা নিশ্চিত |
     পূবে্ই বলা হইয়াছে যে, 'আনন্দমঠ' -এর মধ্যে দুই একটি বাস্তব স্তরও আছে; উপন্যাসের সাধারণ অবাস্তবতা হইতে এই দৃশ্যগুলিকে সহজেই পখক করা যায় | প্রথম চারিটি অধ্যায় একটি ভীষণ বাস্তব চিত্র; আর নিমির চরিত্রেও এই খাঁটি বাস্তবতার সুরটি পাওয়া যায় | কিন্তু 'আনন্দমঠ' -এর প্রকৃত গৌরব বাস্তব উপন্যাস হিসাবে নহে; বাংলার পাঠকসমাজের উপর ইহা যে বদ্ধমূল আধিপত্য বিস্তার করিয়াছে, তাহা এক ধম্যগ্রন্থ ছাড়া অন্য কোনো প্রকার সাহিত্যের ভাগ্যে ঘটে নাই | বলিলে অত্যুক্তি হইবে না যে, 'আনন্দমঠ' আধুনিক বাংলার জন্মদান করিয়াছে, আধুনিক বাঙালির হৃদয় ও মনোবৃত্তি গঠিত করিয়াছে | যে দেশাত্মবোধ আজ প্রত্যেক শিক্ষিত বাঙালির সাধারণ মানসম্পত্তি, বঙ্কিমই তাহার প্রথম অঙ্কুর রোপণ করিয়াছেন; ইউরোপের দেশপ্রীতি, বাঙালির বিশেষ অবস্থার মধ্যে বাঙালির বিশেষ পুজোপকরণের সাহাজ্যে, বাঙালি-হৃদয়ের ভক্তি-চন্দন-চচি্ত করিয়া বঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছেন | বত্যমান যুগের এমন কোনো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান নাই, যাহার প্রথম প্রেরণা এই 'আনন্দমঠ' হইতে আসে নাই; বাঙালির রাজনীতিচচা্র বৈশিষ্ট্য, রাজনৈতিক বক্তৃতার ভাষা পয্ন্ত বঙ্কিমের কল্পনার বণে্ রঞ্জিত হইয়াছে | বঙ্কিম পৌত্তলিক বাঙালির মানসস্বগে্ এক নূতন দেবী-প্রতিমা সৃষ্টি করিয়া স্থাপিত করিয়াছেন; বাঙালির হৃদয়ের ভক্তিকে এক নূতন পথে চালিত করিয়াছেন | পৃথিবীর যে কয়েকখানি যুগান্তকারী গ্রন্থ আছে, 'আনন্দমঠ' তাহাদের মধ্যে একটি প্রধান স্থান অধিকার করে | "বন্দে মাতরম্" আধুনিক বাঙালির বেদমন্ত্র | সেইজন্যই 'আনন্দমঠ' কে কেবল সাহিত্য হিসাবে বিচার করিলে ইহার সম্পূণ্য মহিমা ও প্রভাব বুঝা যাইবে না | ইহার স্থান সাধারণ সাহিত্য-লোকের অনেক ঊধ্বে্ |
     'দেবী চৌধুরাণী' 'আনন্দমঠ' -এর দুই বৎসর পরে (১৮৮৪) প্রকাশিত হয়; এবং 'আনন্দমঠ' -এর ন্যায় ইহাতেও একদল doctrinaire বা উচ্চ-আদশ্য-অনুপ্রাণিত দস্যুর অবতারণা হইয়াছে | কিন্তু 'দেবী চৌধুরাণী'র উপাখ্যানের মধ্যে অসাধারণত্বের ঈষৎ স্পশ্য থাকিলেও ইহাতে বাস্তবতারই প্রাধান্য; ইহার মধ্যে অলৌকিক উপাদান যাহা আছে, তাহা আমাদের বা্স্তব-জীবনের সহিত সহজেই মিলিতে পারে, আমাদের অভিগ্যতার বা দেশের বাস্তব অবস্থার বিরোধী নহে | ভবানী পাঠক সত্যানন্দের ন্যায় অতিমানব মহাপুরুষের স্তরে উন্নীত হন নাই, প্রফুল্লের নিষ্কামধম্য-শিক্ষার মধ্যে যাহা-কিছু অবাস্তবতা আছে, তাহা সমগ্র উপন্যাসটির উপরে ছায়াপাত করিতে পারে নাই, এবং ইহার বাস্তবতার সুরটি ঢাকিয়া ফেলে নাই | আমাদের সামাজিক জীবনের সহজপ্রীতিপূণ্য, অখচ ক্ষুদ্র-বিরোধ-বিড়ম্বিত চিত্রটিই ইহার অধিকাংশ ব্যাপিয়া আছে | গ্রন্থশেষে কঠোর বৈরাগ্য ও দেশহিতব্রতের উপর গাহ্স্থ্যধমে্রই জয় বিঘোষিত হইয়াছে | দেবী চৌধুরাণী তাহার সমস্ত রাণীগিরির ঐশ্বয্য ও দেশের ভাগ্যনিয়ন্ত্রীর উচ্চ পদ ত্যাগ করিয়া আবার গৃহধম্যপালনের জন্য হরবল্লভের সংকীণ্য অন্তঃপুরমধ্যে প্রবেশ করিয়াছে; তাহার নিষ্কাম ধমে্র শিক্ষা-দীক্ষা এই নূতন ক্ষেত্রে নিয়োজিত করিয়া তাহাকে পরমস্বাথ্কতায় মণ্ডিত করিয়া তুলিয়াছে | বৈকুণ্ঠেশ্বর ও ব্রজেশ্বরের মধ্যে যে দ্বন্দ্বযুদ্ধ চলিতেছিল , তাহাতে ব্রজেশ্বরই জয়লাভ করিল; বৈকুণ্ঠেশ্বর তাঁহার বিরাট সত্তা সংকুচিত করিয়া ব্রজেশ্বরের পশ্চতে আত্মগোপন করিলেন, এবং ইহার পুরস্কারস্বরূপ রমণীহৃদয়ের যে দেবদুল্যভ প্রেম ও ভক্তি উপহার পাইলেন, তাহাতে বোধ করি তাঁহার ক্ষোভের কোনো কারণ থাকিল না |
     'দেবী চৌধুরাণী'র আরম্ভ একেবারে সম্পূণ্য বাস্তব; সামাজিক কারণে নিরপরাধ স্ত্রীর পরিত্যাগ, আধুনিক বাস্তবতা-প্রধান লেখক--লেখিকাদের নিতান্ত সাধারণ বিষয় | কিন্তু ইহারা যেমন এই বিষয়ের মধ্য দিয়া সামাজিক অবিচার-অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পতাকা তুলিয়া ধরেন, বঙ্কিম তাহা করেন নাই; তিনি সমস্ত বিষয়টিকে একটি গোপন প্রেম ও নিগূঢ় সহানুভূতির ধারায় অভিষিক্ত করিয়াছেন | আমাদের হিন্দু-সমাজে একটি স্বাভাবিক সংযম, ভক্তিশীলতা ও নিয়মানুবতি্তার জন্য বিদ্রোহের খুব তীব্র আত্মপ্রকাশ বড়ো একটা হইতে পায় না --তাহা একটা গোপন ক্ষোভের মতোই বক্ষতলে নিরুদ্ধ থাকে | অবশ্য এই প্রতিরুদ্ধ ভাবের প্রভাব আমাদের জীবনের পক্ষে যে সব্যদা হিতকর বা প্রকৃত পৌরুষ-বিকাশের পক্ষে অনুকূল, তাহা বলা যায় না | অনেক সময় দুই পরস্পর-বিরোধী কত্যব্যের মধ্যে যেটি আমরা বাছিয়া লই, তাহা কাপুরুষোচিত নিবা্চনই হইয়া দাঁড়ায়; প্রচলিত মতের বিরুদ্ধে দাঁডা়ইবার মতো সাহস ও মনের বল আমাদের থাকে না বলিয়াই আমরা সহজে বাঁধা রাস্তাটাই অবলম্বন করিয়া ফেলি | এই চরিত্রগুলি আটে্র দিক দিয়াও খুব সাথ্ক হইয়া উঠে না; সামাজিক ব্যবস্থার দাস-সুলভ অনুবতি্তা তাহাদিগকে আটে্র দিক দিয়াও ব্যক্তিত্ব-বজি্ত বণ্যলেশশূন্য করিয়া ফেলে |
     বঙ্কিম ব্রজেশ্বরের চরিত্রে এই সমস্ত দুব্যলতা পরিহার করিয়াছেন, তাহার মধ্যে প্রেম ও পিতৃভক্তির একটি উপন্যাসসমূহের প্রায় সমস্তগুলিতেই নায়কের চরিত্র নীরস ও বিশেষত্বহীন হইয়া পড়িয়াছে; স্কট তাহাকে সব্যগুণপেত করিয়া দেখাইবার চেষ্টায় তাহার মধ্যে প্রাণের ধারা মন্দীভূত করিয়া ফেলিয়াছেন | বঙ্কিমের কৃতিত্ব এই যে, তিনি ব্রজেশ্বরকে সব্যগুণসম্পন্ন করিয়াও তাহাকে ব্যক্তিত্বহীন

করিয়া ফেলেন নাই | ইহার কারণ বিশ্লেষণ করিলে দেখা যায় যে, আমাদের বাঙালি সমাজের কতকগুলি বিশেষত্বই ব্রজেশ্বরের চরিত্রকে একটা বৈশিষ্ট্য দিয়াছে, ও তাহাকে স্কটের নায়ক হইতে পৃথক করিয়াছে | প্রথমত, তাহার বহুপত্নীকত্ব---সাগর বৌ, নয়ান বৌ, প্রফুল্লের সহিত তাহার ব্যবহারের বিভিন্নতা, ও তাহার দ্ম্পত্য-ব্যাপার-সম্বন্ধে ব্রম্ভ্রঠাকুরাণীর সহিত সরস কথোপকথন ও পরিহাসকুশলতা তাহাকে আদশ্য নায়কের রক্তমাংসহীন, অশরীরী অবস্থা হইতে রক্ষা করিয়াছে | যাহাকে একাধিক স্ত্রী লইয়া ঘর করিতে হয়, এবং সে বিষয় লইয়া ঠানদিদির সহিত ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ-পূণ্ আলোচনা চালাইতে হয়, তাহার চারিদিক়ে একটা লঘু-তরল হাস্যরসের আবেষ্টন সৃষ্ট হয়; এবং সেইজন্যই আদশ্য নায়কের অবাস্তবতার ছায়া তাহার গায়ে লাগিতে পায় না | প্রফুল্লের সহিত ব্যবহারের মধ্যেও তাহার একটা সংযত অথচ গভীর প্রেমের পরিচয় পাওয়া যায়, যাহা সব্যপ্রকারের নাটকীয় উচ্ছ্বাস ও আতিশয্য-বজি্ত | এই বিষয়ে তাহার সহজ, সরল কথাবাতা্ স্কটের নায়কদের গুরুগম্ভীর, সাডম্বর বাক্যবিন্যাসের অপেক্ষা গভীর ভাবপ্রকাশের পক্ষে অধিক উপযোগী | আবার দশ বৎসর বিচ্ছেদের পর প্রফুল্লকে চিনিবার পর তাহার দস্যুবৃত্তির প্রতি ঘৃণা ও তাহার প্রতি উদ্বেল প্রেমের মধ্যে ক্ষণস্থায়ী দ্বন্দ্বটুকু তাহার বাস্তবতা বাড়াইয়া দিয়াছে | ব্রজেশ্বরের শ্বশুরবাডি হইতে রাগ করিয়া চলিয়া আসা, ও সাগরের প্রতি দুজ্য় অভিমান; বজরাতে ডাকাতির সময় তাহার নিভী্ক, সপ্রতভ ভাব, ও দেবী চৌধুরাণীর বজরাতে বন্দিভাবে নীত হইবার পর দেবীর সহচরীদের হাতে তাহার দুরবস্থা --এই সমস্তই তাহাকে আদশ্যলোক হইতে নামাইয়া বাস্তব-জগতের আসনে দৃৃঢ়তর করিয়া বসাইয়াছে, ও তাহার সহিত পাঠকের একটা মধুর-প্রীতিপূণ্য সখ্যভাব স্থাপন করিয়াছে | আবার প্রবল, অপ্রতিরোধনীয় প্রেমের মধ্যে পিতৃৃৃভক্তির অক্ষুণ্ণ মযা্দা-রক্ষা, প্রফুল্লকে পাইবার লোভেও পিতার সহিত জুয়াচুরি করিতে অস্বীকার করা, তাহার চরিত্রের উপরে একটা দৃপ্ত পৌরুষের উজ্জ্বল আলোকপাত করিয়াছে | মোটের উপর, ব্রজেশ্বর উপন্যাস-জগতের চরিত্রের মধ্যে একটি বিশেষ সজীব সৃষ্টি | ব্রজেশ্বর আমাদের বাস্তব-জগতের প্রতিবেশী, দুই-একটি অসাধারণ ঘটনার সম্মুখীন হইয়াও তাহার বাস্তবতার কোনো হানি হয় নাই |
     অবশ্য গ্রন্থের কেন্দ্রস্থ দুব্যলতা ব্রজেশ্বরকে লইয়া নয়, প্রফুল্লকে লইয়া; মাহাত্ম্য-বিগ্যাপনের কোনো প্রয়োজন ছিল না | এই সমস্ত সমালোচনার মধ্যে যে কতক পরিমাণে সত্য আছে তাহা স্বীকায্য | এই দিক দিয়া দেখিতে গেলে উপন্যাসটির মধ্যে পব্যতের মূষিক-প্রসবের ন্যায় একটি হাস্যজনক অসংগতি আছে | কিন্তু আর এক দিক দিয়া বিবেচনা করিলে বঙ্কিমের অপরাধ তত গুরুতর বলিয়া মনে হইবে না | প্রফুল্লের শিক্ষা-দীক্ষার ব্যাপারটি গ্রন্থের উপরে ধম্যতত্ত্বের একটা বাহ্য-প্রলেপ মাত্র, ইহার প্রভাব কেন্দ্র-স্তরে পয্ন্ত ভেদ করিতে পারে নাই | এই নিষ্কামধম্য প্রফুল্লের প্রকৃত চরিত্রকে অভিভূত করিতে পারে নাই, তাহার প্রেমোন্মুখ, সুকোমল নারীহৃদয়ের উপর কোনো বদ্ধমূল আধিপত্য বিস্তার করে নাই | ইহার প্রবল আক্রমণের মধ্যেও তাহার রমণীসুলভ মাধুয্য ও উদ্বেল স্বামীভক্তি অক্ষুণ্ণ ছিল---শিক্ষাকালের মধ্যে একাদশীতে মাছ খাওয়ার নিষেধের প্রতি অবাধ্যতার দ্বারা গ্রন্থকার এই অনিবায্য প্রেম-প্রাবল্যের একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত দিয়াছেন | প্রফুল্লের প্রকৃতি কোথাও এই গুরুভার দীক্ষার চাপে বাঁকিয়া-চুরিয়া যায় নাই, শারদাকাশে লঘু মেঘখণ্ডের ন্যায় ইহাকে অবলীলাক্রমে বহন করিয়াছে | তাহার চরিত্র কোথাও পৌরুষ-বা-স্পধা্-যুক্ত হয় নাই; মধ্যে মধ্যে এক একটা দাশ্যনিক সূত্রের বিচার সত্ত্বেও কোথাও পাণ্ডিত্যবিড়ম্বিত হয় নাই | গ্রন্থাকার গ্রন্থশেষে তাহাকে আদশ্যবাদের সবো্চ্চ স্তরে, ভগবানের অবতারপদে উন্নীত করিলেও, পাঠকের কল্পনা ও সহানুভূতি এইরূপ ভীতিজনক পরিণতিতে কখনও সায় দিতে চাহে না | প্রফুল্লকে আমরা বরাবরই স্বামী-প্রেমে-বিহ্বলা, আদশ্য গৃহলক্ষীর মতোই দেখি, ইহা অপেক্ষা উচ্চতর কোনো আদশে্র সহিত তাহার সম্বন্ধে আমাদের রসানুভূতিকে নিবিড়ভাবে স্পশ্য করে না | সুতরাং যদিও প্রথম দৃষ্টিতে, ঔপন্যাসিক ধম্যতত্ত্ববিদের নিকীটে আত্মসমপ্যণ করিয়াছেন বলিয়া মনে হইতে পারে, তথাপি প্রকৃতপক্ষে এই দ্বন্দ্বে ঔপন্যাসিকেরই জয় হইয়াছে; কলাকৌশলের দিক দিয়া ঔপন্যাসিকের সৃষ্টি ধম্যতত্ত্বের দ্বারা অভিভূত হইতে পারে নাই |
     প্রফুল্ল-চরিত্রের আর একটি বিশেষত্ব এই যে; তাহার নিষ্কামধমে্র দীক্ষা তাহাকে কখনও সন্ন্যাসের দিকে, গাহ্স্থ্যধম্যের বিরুদ্ধে প্রবতি্ত করে নাই | এই বিষয়ে 'সীতারাম' --এর শ্রী-চরিত্রের সহিত তাহার প্রভেদ | স্বামীর সহিত বিচ্ছেদের পরে শ্রীর চরিত্র যেমন জয়ন্তীর প্রভাবে রমণীসুলভ মাধুয্য হারাইয়া এক শুষ্ক, কঠোর আসক্তি-লেশশূন্য নিষ্কামধম্যের মরু-বালুকার মধ্যে নিজ স্নেহ-প্রেমের শীতল ধারাকে প্রোথিত করিয়া দিয়াছেন, নিষ্কামধম্য-দীক্ষিতা প্রফুল্লের চরিত্রে নিশির সাহচয্য-ফলেও তাহা হইতে পায় নাই | জয়ন্তীর মধ্যে যেমন একটা শিক্ষায়িত্রীর পুরুষভাব ও আত্ম-প্রাধান্য-মূলক গবে্র রেশ আছে, নিশি-চরিত্রে অনুরূপ কিছুই নাই; নিশির মধ্যে ধম্যপ্রচারকের সংকীণ্যতা কিছু দেখিতে পাই না | সখীর সমবেদনা তাহাকে প্রফুল্লের সুখ-দুঃখভাগিনী করিয়া তুলিয়াছে | সে প্রথম হইতেই প্রফুল্লের অক্ষুণ্ণ স্বামিপ্রেম দেখিয়া তাহার সহিত একটা সন্ধি স্থাপন করিয়া লইয়াছে, প্রেমের প্রাকার-মূলে বেদান্তের dynamite লাগাইবার কোনো চেষ্টা করে নাই | বরঞ্চ নিজেকে বেদান্ত-বমে্ আচ্ছাদিত করিয়া অনসূয়া-প্রিয়ংবদার মতোই সবা্ন্তকরণে সখীর প্রেমের দৌত্য-কাযে্ আপনাক নিয়োজিত করিয়াছে | এইজন্যই বোধ হয় নিশি জয়ন্তী অপেক্ষা গ্রন্থকারের অধিক স্নেহভাজন হইয়াছে | জয়ন্তীর গুরুগিরির জন্যই তিনি তাহার বিরুদ্ধে একটা গূঢ় প্রতিশোধ লইতে ছাড়েন নাই; সন্ন্যাসিনীর গৈরিক-বস্ত্রের নীচে একটি

স্বভাবদুব্যল, লজ্জাসংকুচিত নারীহৃদয় প্রকাশ করিয়া তাহাকে বেশ যথেষ্ট রকমই অপ্রতিভ করিয়াছেন | আর নিশি-দিবার নিকট যে চেলাকাঠের উপঢৌকন দিয়া বিদায় লইয়াছেন, তাহার অন্তরালে তাঁহার সহজ স্নেহ ও কৌতুকমণ্ডিত প্রীতিরই পরিচয় পাই |
     গ্রন্থের অন্যান্য চরিত্রগুলি বিশেষ আলোচনা-যোগ্য নহে | নিশি-চরিত্রের আংশিক অবাস্তবতা-সম্বন্ধে পূবে্ই আলোচনা করা হইয়াছে | ব্রম্ভ্রঠাকুরাণী, সাগর বৌ, ব্রজেশ্বরের মাতা সকলেই সজীব চরিত্র, দুই-একটি স্বল্প-রেখাতেই তাহাদের বৈশিষ্ট্য বেশ ফুটিয়া উঠিয়াছে | ভবানী পাঠক, আদশ্যবাদের বাষ্পে আচ্ছন্ন হইয়াও, বাস্তবতা হারায় নাই | উপন্যাসটির মধ্যে সবো্পেক্ষা সুপরিচিত চরিত্র হরবল্লভের | হরবল্লভের কঠোর বৈষয়িকতা ও নিম্যম সমাজানুবতি্তা, মিথ্যাপবাদকলঙ্কিতা পুত্রবধূর নিদ্য় প্রত্যাখ্যান ও তাহার করুণ অনুরোধের হৃদয়হীন উত্তর---আমাদের বাঙালি পরিবারের একটি সিপরিচিত শ্রেণীর (type) কথা মনে করাইয়া দেয়; কিন্তু দেবী চৌধুরাণীর প্রতি তাহার অমানুষিক বিশ্বাসঘাতকতা, ও দেবীর নিকট বন্দি হইবার পর তাহার নিতান্ত হেয় কাপুরুষতা তাহাকে সাধারণ সংকীণ্যমনা বাঙালি গৃহকতা্র শ্রেণী হইতে বিভিন্ন করিয়া চরম দুবৃত্ততার গহ্বরে নামাইয়া দিয়াছে ও ব্রজেশ্বরের পিতৃভক্তিকে আরও কঠোর অগ্নিপরীক্ষায় নিক্ষেপ করিয়াছে | অথচ এই হরবল্লভের উপরে গ্রন্থকারের যথেষ্ট অবগ্যার সহিত অনেকটা অনুকম্পার ভাবও মিশ্রিত হইয়াছে; তাহার আত্মবমাননার গভীরতাই তাহাকে আমাদের ঘৃণা হইতে রক্ষা করিয়া শুধু ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের বিষয় করিয়া তুলিয়াছে |
     প্রকৃতি-বণ্যনাতেও বঙ্কিম নিজ কবিজনোচিত অনুভূতির পরিচয় দিয়াছেন | চন্দ্রালোক বষা্স্ফীতা ত্রিস্রোতার চিত্র খুব উচ্চ অঙ্গে বণ্যনাশক্তির নিদশ্যন | কিন্তু ইহা কেবল বণ্যনাশক্তির পরিচয় দেয় না; ইহাতে মানব-মনের সহিত বহিঃপ্রকৃতির একটা গূঢ়, অন্তরঙ্গ সহানুভূতির ইঙ্গিতও দেওয়া হইয়াছে | দেবীর উদ্বেল, প্রেমোন্মুখ হৃদয়ের সহিত এই অন্ধকারমিশ্র চন্দ্রালোকের তলে প্রবাহিতা বেগবতী্ নদীর একটি সুন্দর সুসংগতি ও নিগূঢ় ভাবগত যোগ রহিয়াছে | বঙ্কিমের প্রকৃতিবণ্যনা কেবল বহিঃসৌন্দযে্র নিপুণ সমাবেশমাত্রে পয্যবসিত হয় নাই; বহিঃসৌন্দযে্র পশ্চাতে যে ভাবের ব্যঞ্জনা রসগ্রাহী দশ্যকের মনের সহিত একটা গূঢ় ঐক্যস্থাপন করিতে সব্যদা প্রস্তুত আছে, বঙ্কিম তাহাকে প্রকৃত কবির ন্যায় ফুটাইয়া তুলিয়াছেন |
     অবশ্য গ্রন্থের অসাধারণ ঘটনাগুলি যে সম্ভাবনীয়তার দিক হইতে সব্ত্র প্রমাদশূন্য হইয়াছে, তাহা বলা যায় না | প্রফুল্লের অতকি্ত অন্তধ্যান যে ভাবে তাহার মৃত্যুসংবাদে রূপান্তরিত হইয়া চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িল, তাহা একটু অবিশ্বাস্য বলিয়াই মনে হয়; এবং রূপান্তরের প্রকৃতিও সাধারণ হইতে সন্পূণ্য বিপরীত গতিরই অনুসরণ করিয়াছে | সাধারণ রোগে মৃত্যু অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের দ্বারা ভৌতিক ঘটনাতে রূপান্তরিত হইতে পারে; কিন্তু ভৌতিক ঘটনা যে লোকমুখে প্রচারিত হইতে হইতে অতিপ্রাকৃত অংশ বজ্যন করিয়া স্বাভাবিক মৃত্যুতে রূপান্তরিত হইবে | তাহা মোটেই বিশ্বাসযোগ্য বলিয়া মনে হয় না | বিশেষত যেখানে দুল্যভচন্দ্র ও ফুলমণির নিকটে প্রফুল্লের প্রকৃত অবস্থা অবিদিত নাই, সেইখানে যে তাহার অলীক মৃত্যুসংবাদ একেবারে নিঃসন্দিগ্ধভাবে তাহার স্বগ্রামে ও শ্বশুরালয়ে প্রতিষ্ঠিত হইবে, তাহা আমাদের বিশ্বাস করিতে প্রবৃত্তি হয় না; অথচ এই অসন্দিগ্ধ বিশ্বাসের উপরেই উপন্যাসটি প্রতিষ্ঠিত; এই মৃত্যুসংবাদের উপরেই ব্রজেশ্বরের গভীর প্রেম স্থিতিলাভ করিয়াছে | প্রফুল্ল ডাকাইতের দ্বারা অপহৃত হইয়াছে, এই সংবাদ পাইলে ব্রজেশ্বরের হৃদয়ে এত গভীর দাগ পড়িত কি না সন্দেহ | আর ইংরাজ পল্টনের হাত হইতে প্রফুল্লের অনুকূল দৈববশে উদ্ধারলাভেও আকস্কিকতার মাত্রা যেন একটু অধিক; বিশেষত তাহার উদ্ধারের জন্য প্রাকৃতিক আনুকূল্যের উপরে একান্ত নিভ্যর ও বিপৎকালে নিষ্কাম ধম্যশিক্ষার পরিচয়-দান একটু আতিশয্যদুষ্ট হইয়াছে | তবে এখানেও প্রফুল্লের সমস্ত তেজস্বিতা ও নিষ্কামধম্যাচরণের মধ্যে তাহার রমণীসুলভ কোমলতা ও চরিত্রের অবণ্যনীর মাধুয্য অক্ষুণ্ণ রহিয়াছে | মোটের উপর 'দেবী চৌধুরাণী' উপন্যাসটি অসাধারণ ঘটনাভারাক্রান্ত ও ধম্যভাবগ্রস্ত হইলেও একটি বাস্তব-জীবন-চিত্র বলিয়াই আমাদিগকে আকষ্যণ করে |
     'সীতারাম' (১৮৮৭), 'আনন্দমঠ' ও 'দেবী চৌধুরাণী'র সহিত একশ্রেণীভুক্ত বলিয়া বিবেচিত হইয়াছে--তিনখানি উপন্যাসেই ধম্যতত্ত্বব্যাখ্যা ঔপন্যাসিক চরিত্র-চিত্রণের উপরে প্রভাব বিস্তার করিয়াছে | 'আনন্দমঠ' -এ আদশ্যবাদ উপন্যাসের বাস্তব স্তরকে প্রায় ঢাকিয়া ফেলিয়াছে, 'দেবী চৌধুরাণী'তে ধম্যতত্ত্ববিশ্লেষণ অত্যন্ত প্রবল হইয়াও বাস্তব চরিত্র-চিত্রণকে অভিভূত করিতে পারে নাই | 'সীতারাম' -এও একটা ধম্যতত্ত্বের সমস্যাই উপন্যাসের প্রতিপাদ্য বিষয়, কিন্তু এখানেও ধম্যতত্ত্বের প্রাধান্য ঔপন্যাসিকের অন্তদৃষ্টিকে ক্ষীণ করিতে পারে নাই, পরন্তু চরিত্রের সূক্ষ্ম পরিবত্যন-সংঘটনে ও তাহার কারণ-বিশ্লেষণে গ্রন্থকার আশ্চয্য নিপুণতাই দেখাইয়াছেন |
     এখানে বঙ্কিমের ধম্যতত্ত্বালোচনার প্রকৃতি ও উপন্যাসের উপর উহার প্রভাব সম্বন্ধে আমাদের ধারণা পরিষ্কার করিয়া লওয়া প্রয়োজন | ইংরেজি উপন্যাসে ধম্যতত্ত্বালোচনার প্রভাব এতই কম, এমন কি উদ্দেশ্যমূলক উপন্যাসের বিরুদ্ধে এমন একটা বদ্ধমূল সংস্কার আছে যে, আমাদের ইংরেজি-সাহিত্যপুষ্ট রুচি সহজেই উপন্যাসের সহিত ধম্যতত্ত্বের সম্পক্য অস্বাভাবিক ও কলা-নৈপুণ্যের দিক হইতে ক্ষতিকর, এইরূপ একটা ধারণা করিয়া বসে | অবশ্য এইরূপ ধারণা করার জন্য যে যথেষ্ট হেতু নাই, তাহা বলিতেছি না, অধিকাংশ স্থানেই দেখা যায় যে, লেখক তাঁহার প্রতিপাদ্য ধম্যতত্ত্ব ব্যাখ্যা করিতেই এত নিবিষ্টচিত্ত হইয়া পড়েন যে, তিনি তাঁহার সৃষ্ট চরিত্রগুলিকে সজীব করিয়া তুলিতে ভুলিয়া যান, এবং তাহাদের স্বাভাবিক পরিবত্যন ও পরিণতি তাঁহার মৌলিক উদ্দেশ্যের দ্বারা অযথারূপ নিয়ন্ত্রিত করেন--তাঁহার চরিত্রগুলি অনেকটা নৈতিক গুণের মূত্য বিকাশ হইয়া পড়িতে চাহে | সুতরাং এই শ্রেণীর উপন্যাসের বিরুদ্ধে আমাদের একটা সন্দেহ থাকা স্বাভাবিক | কিন্তু এই স্বাভাবিক সন্দেহ যদি অযৌক্তিক সংস্কারে পরিণত হইয়া প্রতিভাবান লেখকের রাসাস্বাদনের পক্ষে বাধা উপস্থিত করে, তাহা হইলে সমালোচনার উদ্দেশ্য ও আদশ্য ক্ষুণ্ন হয় | 'সীতারাম'--এ সেরূপ কোনো বাধা উপস্থিত হইয়াছে কি না তাহাও আমাদিগকে ধীরভাবে আলোচনা করিতে হইবে |