Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা -৫৮, ৫৯ ও ৬০

2020-06-28
     সীতারাম' -এ অসাধারণ ও রোমান্টিক দৃশ্য-বণ্যনায় বঙ্কিমের কল্পনায় বিশাল প্রসার ও পরিধি প্রস্ফুট হইবার অবসর হইয়াছে | বিশাল, উদ্বেল, জনসমুদ্র-বণ্যনে বঙ্কিম যেরূপ শক্তির পরিচয় দিয়াছেন, তাহা বাঙালি লেখকের পক্ষে বিশেষ গৌরবের বিষয় | এইরূপ তিনটি দৃশ্য উত্তুঙ্গ গিরিশৃঙ্গের ন্যায় আমাদের দৃষ্টি আকষ্যণ করে--গঙ্গারামের উদ্ধার লইয়া হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা, রমা ও গঙ্গারামের বিচার, ও জয়ন্তীর বেত্রদণ্ডাগ্যা | এই তিনটি দৃশ্যে বিক্ষুব্ধ জনতার বিশেষ বিশেষ mood---কোথাও উত্তেজনা-ও-কোলাহল-ময়, কোথাও কৌতূহলী, কোথাও-বা রুষ্ট-গাম্ভীয্য-ভীষণ বা অগ্যাত বিপদের ছায়াপাত-শঙ্কিত--বঙ্কিম অতি দক্ষতার সহিত চিত্রিত করিয়াছেন |সীতারামের পুনরুদ্ধারের চিত্রের মহনীয়তার কথা পূবে্ই বলা হইয়াছে |
     কিন্তু রোমান্সের প্রাচুয্য সত্ত্বেও সীতারাম-এ বাস্তবতার কোনো অভাব অনুভূত হয় না | কী উপায়ে বাস্তবতার ধারণার সৃষ্টি করা হইয়াছে, তাহারও কতক বিচার করা হইয়াছে | সীতারামের চরিত্রে যে সংঘাত তাহা মূলত একটি বাস্তব দ্বন্দ্ব; রমা, নন্দা, গঙ্গারাম, প্রভৃতি বাস্তবচরিত্র উপন্যাসকে শ্রী-জয়ন্তী-ঘটিত অবাস্তবতার ছায়া হইতে উদ্ধার করিয়াছে | বিশেষত শ্রী ও জয়ন্তীর অলৌকিকত্ব সাধারণ লোকের মুখে-মুখে কীরূপ উদ্ভট আকার ধারণ করিতেছিল, তাহা আমরা রামচাঁদ-শ্যামচাঁদের কথোপকথনেই বুঝিতে পারি | এই জনসাধারণের সুরটি--মুরলার দৌত্য ও দুরবস্থা, যমুনার কৌতুকপ্রদ নীতিগ্যান, কবিরাজ-মণ্ডলীর চিকিৎসার নৈপুণ্য, এমন কি জয়ন্তীর বেত্রদণ্ডাগ্যা কায্যে পরিণত করিবার জন্য নিব্যাচিত চণ্ডাল ও মুসলমান কসাই প্রভৃতির সমবেত অবিভ্যাব--গ্রন্থ-মধ্যে সব্যদা জাগরূক রহিয়াছে, রোমান্সের শোভাযাত্রার কোলাহলের মধ্যে ডুবিয়া যায় নাই | মোটের উপর 'সীতারাম' বাস্তব ও অসাধারণের মধ্যে একটি সুন্দর সংমিশ্রণ ও সামঞ্জস্য; ইহার মধ্যে ধম্যতত্ত্বের প্রভাব ইহাকে উপন্যাসোচিত্র আদশ্য হইতে চ্যুত করিতে পারে নাই | ইহার চরিত্র-বিশ্লেষণ ও ঘটনা-পরিণতি কোথাও নীতিবিদের বা তত্ত্ব-ব্যাখ্যাতার সংকীণ্য দৃষ্টের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় নাই | পাপ-পুণ্যের তারতম্য-অনুসারে দণ্ড-পনরস্কার-বিতরণের যে ক্ষুদ্র প্রবৃত্তি (narrow poetic justice) তাহা উপন্যাসের বিশালতাকে সংকুচিত করে নাই | শেকসপিয়ারের উচ্চাঙ্গের ট্রাজেডিগুলির মতো 'সীতারাম' মানব-মনের দুগ্যেয়তার, উহার রহস্যময় প্রকৃতির উপরে একটি উজ্জ্বল আলোকরেখাপাত করে |
৩.   প্রকৃত ঐতিহাসিক উপন্যাস---রাজসিংহ

পূব্যে উল্লিখিত হইয়াছে যে, বঙ্কিমচন্দ্রের নিজের মতে 'রাজসিংহ'ই তাঁহার কী ধারণা ছিল তাহা 'রাজসিংহ' হইতে বুঝা যাইবে | 'রাজসিংহ'-এর চতুথ্য সংস্করণের বিগ্যাপনটি বিশ্লেষণ করিলে এ বিষয়ে অনেক প্রয়োজনীয় তথ্য সংকলন করা যাইতে পারে | বঙ্কিমের 'রাজসিংহ' উপন্যাসের প্রধান উদ্দেশ্য, হিন্দুদের যে বাহুবলের অভাব ছিল না, এই বিষয়ের প্রতিপাদন করা | এই বিষয়ে ঐতিহাসিক বিবরণের অভাবের ও ঐতিহাসিকদের পক্ষপাতিত্বদোষের জন্য বঙ্কিম উপন্যাসের আশ্রয় লইয়াছেন; কারণ যদিও সব্যত্র ইতিহাসের উদ্দেশ্য উপন্যাসের দ্বারা সুসিদ্ধ হয় না, তথাপি বত্যমান ক্ষেত্রে সেরূপ কোনো প্রতিবন্ধক নাই; "যখন বাহুবলমাত্র আমার প্রতিপাদ্য, তখন উপন্যাসের আশ্রয় লওয়া যাইতে পারে|"
     বঙ্কিমের এই উক্তির প্রকৃত তাৎপয্য গ্রহণ করা একটু দুরূহ | রাজপুতদের বাহুবল-প্রতিপাদন-বিষয়ে উপন্যাস কেন ইতিহাসের উদ্দেশ্যসাধনক্ষম, তাহা তিনি খুলিয়া বলেন নাই; বিশেষত এ সম্বন্ধে ঐতিহাসিক প্রমাণের পরস্পর-বিরোধিতার বিষয় বঙ্কিম নিজেই উল্লেখ করিয়াছেন, ও এই পরস্পর-বিরোধী প্রমাণসমূহের মধ্যে সত্যনিণ্যয়ের দুঃসাধ্যতাও স্বীকার করিয়াছেন | এই প্রকার বাধা-বিঘ্ন বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও ইতিহাসের পক্ষে যাহা দুঃসাধ্য তাহা উপন্যাসের পক্ষে কেন সহজসাধ্য হইবে, উপন্যাস এই সমস্ত ইতিহাসগ্রন্থিকে কীরূপে সরল করিবে, লেখক উহার কোনো বিশদ ব্যাখ্যা দেন নাই | ইতিহাসের উপরে উপন্যাসের একমাত্র শ্রেষ্ঠত্ব এই যে, ইহা কল্পনার আশ্রয় গ্রহণ করিতে পারে, ইহা সত্যের বন্ধন হইতে অপেক্ষাকৃত স্বাধীন | কিন্তু এই কল্পনাকে ইতিহাস-ক্ষেত্রে দুই প্রকারে প্রয়োগ করা যায়; ইহা লেখককে ঐতিহাসিক সত্য-নিণ্যয়ের অপ্রীতিকর দায়িত্ব হইতে অব্যহতিদানের উপায়স্বরূপে ব্যবহৃত হইতে পারে, অথবা ইহা একপ্রকার প্রত্যক্ষ অনুভূতির সাহায্যে ইতিহাসের পরস্পর-বিরোধী জটিল উক্তিসমূহ ভেদ করিয়া উহার মম্যগত সত্যে গিয়া হাত দিতে পারে | ঐতিহাসিক প্রমাণ না থাকে, তবে কল্পনার সাহায্যে তাহার প্রতিপাদন করিতে গেলে কল্পনার আশ্রয়ের পক্ষে কাল্পনিকতার প্রশ্রয়ে পরিণত হইবার সমূহ সম্ভাবনা আছে | বোধ হয় বঙ্কিমের উক্তির প্রকৃত মম্য এই যে, রাজপুতদের বাহুবল এতই সুপরিচিত ব্যাপার যে, এ ক্ষেত্রে কল্পনার আশ্রয় লওয়া তাদৃশ দূষণেয় নহে; কেননা এখানে অবিসংবাদিত প্রমাণ থাকুক বা না থাকুক, কল্পনা ও ঐতিহাসিক সত্যের মধ্যে ব্যবধান নিতান্ত অল্প হইবারই সম্ভাবনা |
     রাজপুতদের বাহুবল-প্রতিপাদন যদি 'রাজসিংহ' -এ বঙ্কিমের প্রকৃত উদ্দেশ্য হয়, তবে তাহা উপন্যাসের প্রকৃত ভিত্তি হইতে পারে কি না সে বিষয়েও সন্দেহের অবসর আছে, কেননা এরূপ একটা সংকীণ্য ও পক্ষপাতমূলক উদ্দেশ্য ঠিক উচ্চতম আটে্র পক্ষে অনুকূল নহে | অবশ্য এই উদ্দেশ্য বঙ্কিমের কবি-কল্পনাকে উত্তেজিত করিয়া তাঁহার যুদ্ধবণ্যনাগুলির উপরে একটা তীব্রতা ও কল্পনা-গৌরব আনিয়া দিয়াছে, কিন্তু সত্য-চিত্রণ, বিশেষত ঐতিহাসিক সত্য-নিধ্যারণ যে উপন্যাসের আদশ্য; তাহার সহিত এইরূপ সংকীণ্য উদ্দেশ্যের সুসংগতি হইতে পারে না | বোধ হয় এখানে বঙ্কিম নিজ প্রতভার প্রতি অবিচার করিয়াছেন | রাজপুতদের বাহুবল প্রতিদান করা সম্বন্ধে তাঁহার যতই প্রবল ইচ্ছা থাকুক, তিনি সে ইচ্ছাকে কলাকৌশলের দ্বারা নিয়মিত ও সংযত করিয়াছেন, কোথাও কলাসৌন্দয্যের ও সুসংগতির সীমা উল্লঙঘন করিতে দেন নাই |

     ঐতিহাসিক উপন্যাসে কল্পনার ক্রিয়া কতদূর প্রসারিত হইতে পারে, সে সম্বন্ধে বঙ্কিমের অভিমত আধুনিক সমালোচনার পরীক্ষা উত্তীণ্য হইতে পারিবে |এ বিষয়ে কল্পনার ক্রিয়ার সীমারেখা বঙ্কিম বেশ সুস্পষ্টভাবে নিধ্যারিত করিয়া দিয়াছেন | ঐতিহাসিক উপন্যাস ইতিহাসের মূল সত্যকে অবিকৃত রাখিতে বাধ্য; তবে অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র ব্যাপারে কল্পনা আপনার স্বাধীনতা দেখাইতে পারে | ইতিহাসের কায্যকারণ-পরম্পরা যেখানে যথেষ্ট পপিস্ফুট নহে, কল্পনা সেখানে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নূতন যোগসূত্রের সৃষ্টি করিয়া তাহাদের সম্বন্ধে স্ফুটতর করিয়া তুলিতে পারে | ইতিহাসের যে সমস্ত ঘটনা আকস্মিক, তাহাদিগকে মানব-চরিত্রের বৈশিষ্ট্যের সহিত সম্পকা্ন্বিত করিয়া দেখাইতে পারে; ইতিহাসকে dramatic বা নাটকীয়-গুণ-মণ্ডিত করিবার জন্য তাহার বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত রসকে ঘনীভূত করিয়া তুলিতে পারে | বঙ্কিম 'রাজসিংহ' -এ এই জাতীয় রূপান্তর-সাধনের উদাহরণ দিয়াছেন | যুদ্ধের ফলাদি স্থূল ঘটনা অবিকৃত রাখিয়াছেন, তবে তাহার নূতন প্রকরণ বা নূতন উদ্দেশ্য কল্পনার দ্বারা গড়িয়া দিয়াছেন | ঐতিহাসিক চরিত্রগুলি অবিকৃত রাখিয়াছেন, তবে ইহাদিগকে কাল্পনিক দৃশ্যের মধ্যে ফেলিয়া ইহাদের চরিত্র-বৈশিষ্ট্য স্ফুটতর করিয়াছেন | যেখানে একই ঘটনা-সম্বন্ধে দুই বা ততোধিক বিবরণ প্রচলিত আছে, সেখানে নাটকীয় উপযোগিতার হিসাবেই তাঁহার নিজের নিব্যাচন করিয়া লইয়াছেন | এ সমস্ত সম্পূণ্য ন্যায়সংগত স্বাধীনতা; ঐতিহাসিক উপন্যাসকার ইতিহাসের বৃহত্তর সাধারণ সত্য দেখাইতেই বাধ্য; ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যাপার সম্বন্ধে তাঁহাকে যথেষ্ট স্বাধীনতা না দিলে ইতিহাস ও ঐতিহাসিক উপন্যাসের মধ্যে কোনো ভেদ থাকিতে পারে না | বঙ্কিমের ঐতিহাসিক বিবেক (historical conscience) বা সত্যনিষ্ঠা যে ইউরোপীয় ঔপন্যাসিকদের অপেক্ষা কম, এরূপ মনে করিবার কোনো হেতু নাই; তবে ভারতবষ্যের ইতিহাসে প্রামাণিক সত্যের অংশ যে পরিমাণে কম, কল্পনার প্রসার ঠিক সেই পরিমাণেই বেশি হইতে বাধ্য, নচেৎ একটি পূণ্যাঙ্গ আখ্যায়িকা গড়িয়া উঠিতে পারে না | বঙ্কিম তাঁহার কাল্পনিক চিত্রের দ্বারা ইতিহাসের শূন্য রন্ধ পূরণ করিয়া যদি অতিসাহসের পরিচয় দিয়া থাকেন, তবে তাহা আমাদের দেশের ইতিহাস-সম্বন্ধে অপরিহায্য |
     'রাজসিংহ' ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসাবে 'দুগ্যেশনন্দিনী', 'চন্দ্রশেখর' বা 'সীতারাম' হইতে মূলত ভিন্ন | বঙ্কিমের অন্যান্য উপন্যাসে ইতিহাস কেবল একটা প্রতিবেশরচনায় সহায়তা করিয়াছিল মাত্র; তাহাদ়র মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল ব্যক্তিগত জীবনের সমস্যার আলোচনা | ঐতিহাসিক বিপ্লব আসিয়া এই ব্যাক্তিগত সমস্যাকে জটিলতর করিয়া তুলিয়াছে | সত্য, তথাপি মোটের উপর এই সমস্ত উপন্যাসে ইতিহাস অপ্রধান অংশ অধিকার করে | 'দুগ্যেশনন্দিনী'তে ঐতিহাসিক প্রতিবেশ উপন্যাসের অনেক অংশ ব্যাপিয়া আছে, এবং নায়ক-নায়িকার ব্যক্তিগত জীবন ইতিহাসের ঘূণ্যাবত্যে পড়িয়া বিশেষভাবে বিক্ষুব্ধ ও আলোড়িত হইয়াছে সত্য, কিন্তু তথাপি ইহার প্রধান ব্যাপার ব্যক্তিগত জীবনের বাধা-বিঘ্ন-খণ্ডিত প্রণয় লইয়া | 'চন্দ্রশেখর' ও 'সীতারাম' -এও ইতিহাসের এই দূরত্ব ও অপ্রধানতা সহজেই লক্ষিত হয়; শৈবলিনীর ও সীতারামের চরিত্র-বিশ্লেষণই ইহাদের মুখ্য উদ্দেশ্য | বিশেষত 'সীতারাম' -এ সীতারামের অন্তদ্ব্ন্দ্বই উপন্যাসের প্রধান বিষয়; তাহার রাজনৈতিক অধঃপতন নৈতিক অধঃপতনের পরোক্ষ ফল মাত্র বলিয়া বিবেচিত হইয়াছে | 'রাজসিংহ' ইহার সম্পূণ্য বিপরীত; এখানে ইতিহাসই প্রধান বিষয়, ব্যক্তিগত জীবন-সমস্যা ইতিহাসের অনুবত্যন করিয়াছে মাত্র | উপন্যাসের মূল ব্যাপার হইতেছে রাজস্ংহের সহিত আরংজেবের মহাযুদ্ধের বণ্যনা | তবে লেখক এই যুদ্ধের কেবল রাজনৈতিক ফলাফল নিদ্যেশ না করিয়া, ব্যক্তিগত জীবনের উপরে ইহার প্রভাব দেখাইয়াছেন; এই যুদ্ধের মহাবত্যে পড়িয়া যে কয়েকটি প্রাণী পরস্পরের সন্নিহিত হইয়া পড়িয়াছে তাহাদের মানসিক সংঘষ্য ও পরিবত্যনের চিত্রটিও উদ্ঘাটিত করিয়াছেন |
     সুতরাং 'রাজসিংহ' -এ ঐতিহাসিক অংশেরই প্রাধান্য; ইতিহাস এখানে পারিবারিক জীবনের সহিত নিতান্ত ঘনষ্ঠিভাবে বিজড়িত, অচ্ছেদ্য বন্ধনে গ্রথিত হইয়াছে; মানুষের ক্ষুদ্র ব্যক্তিগত জীবনের উপরে বষ্যণোম্মুখ মেঘের ন্যায় একটা বজ্র-গভ্য সম্ভাবনায় পরিপূণ্য হইয়া একান্তভাবে ঝুঁকিয়া পড়িয়াছে | বঙ্কিমের অন্যান্য উপন্যাসে ইতিহাস কেবল একটা সুদূর দিগন্তরেখার ন্যায় পারিবারিক জীবনেকে বেষ্টন করিয়াছে মাত্র, তাহার স্বাধীনতার গৌরবকে বিশেষ ক্ষুণ্ন করে নাই | যদিও সময়ে সময়ে ইতিহাস-সমুদ্রের দুই-একটি প্রবল তরঙ্গ আসিয়া আমাদের গৃহপ্রাঙ্গণে প্রতিহত হইয়াছে, ও আমাদের শান্ত জীবনে একটা প্রলয়-বিক্ষোভের সৃষ্টি করিয়াছে, তথাপি মোটের উপর ইহার সুদূর অস্পষ্ট কল্লোল ব্যাতীত ইহার অস্তিত্বের আর কোনো স্পষ্টতর পরিচয় আমাদের গোতর হয় নাই | 'রাজস্ংহ' -এ ইতিহাস তাহার উদাসীন দূরত্ব ত্যাগ করিয়া একেবারে অতি-সন্নিহিত হইয়া পড়িয়াছে ও আমাদের পারিবারিক জীবনকে প্রায় আলিঙ্গন করিয়াছে; তাহার উষ্ণ নিশ্বাস আমাদের শরীরে একটা রোমাঞ্চকর অনুভূতি, রক্তের মধ্যে একটা দ্রুততর স্পন্দন জাগাইয়া তুলিয়াছে | আমাদের সাধারণ মনোবৃত্তিসমূহ, আমাদের প্রেম, ঈষ্যা, প্রভুতি ক্ষুদ্র জীবননাট্যের অভিনেতৃবগ্য, ইতিহাসের ভ্রূকুটি-কুটিল দৃষ্টির তলে, ইতিহাসের নিম্যম অঙ্গুলিসংকেতে চালিত হইয়া, একটা অল্ঙঘনীয় প্রয়োজনের পেষণে আপন ভূমিকা অভিনয় করিতে বাধ্য হইয়াছে | এই অসাধারণ তীব্র প্রভাবের বেশ আমাদের সাধারণ জীবন তাহার সহজ-সরল স্বাধীনতা ও প্রসার হারাইয়া আপনার বিকাশকে ক্ষুদ্রতম পরিধির মধ্যে সংকুচিত করিয়া লইয়াছে, ও তীব্রতর গতিবেগের দ্বারা এই অপরিহায্য সংকীণ্যতার অসুবিধা পূরণ করিয়াছে |
     'রাজসিংহ' উপন্যাসটিকে মানব-চরিত্রের বিশ্লেষণ হিসাবে দেখিতে গেলে পদে পদে এই স্বাধীনতাসংকোচের পরিচয় পাওয়া যায় | প্রখম--বিষয়-নিব্যাচনে | 'রাজসিংহ' -এ বৃহত্তর সংঘটনের মধ্যে, ইহার যুগান্তকারী বিপ্লবের ভিতরে, সাধারণ নিম্নশ্রেণীর মানুষের কোনো স্থান নাই | যাহারা শ্যামল সমভূমিতে বৃক্ষচ্ছায়াশীতল প্রদেশের পণ্য-কুটিরে নিজ নিজ শান্ত, নিরুদবেগ জীবনযাত্রা নিব্যাহ করে, তাহারা এই উপন্যাসের জগতে প্রবেশাধিকার পায় নাই | ইহার পাত্র-পাত্রীরা সকলেই উচ্চপদস্থ, সকলেই রাজনৈতিক আবত্যের বিক্ষোভ-বিকম্পিত প্রদেশে, ইতিহাসের বজ্রমুষ্টির দুন্যিবার আকষ্যণ-পরিধির মধ্যেই জন্মগ্রহণ করিয়াছেন | যে সমস্ত নিম্ন উপত্যকাবাসী ক্ষুদ্র বৃক্ষ

তাহাদের ক্ষুদ্রত্বের জন্যই কালবৈশাখীর হাত এড়াইয়া যায়, এই উপন্যাসে তাহাদের কোনো প্রয়োজন নাই | পরন্তু যে সমস্ত মহামহীরুহ উত্তুঙ্গ পব্যত-শৃঙ্গে জন্মগ্রহণ করিয়া প্রবল ঝটিকার দুধ্ষ্য বেগকে আহ্বান করে ও তাহার দ্বারা বিধ্বস্ত, বিদলিত হয় তাহারাই এহ উপন্যাস-জগতের অধিবাসী | চঞ্চলকুমারী রাজকন্যা, নিজে আভিজাত্যগব্য-গৌরবান্বিতা, দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাজাধিরাজের সংঘষ্যের উপযুক্ত হেতু ও যোগ্য পুরস্কার | নিম্যলকুমারী বংশ-গৌরবে সামান্য হইয়াও নিজ বুদ্ধি ও সাহস-প্রভাবে এই রাজনৈতিক সংক্ষোভের ঠিক কেন্দ্রস্থলে আপনাকে অধিষ্ঠিত করিয়াছে | তাহার বিবাহিত জীবন কোন্ অতল সমুদ্রে তলাইয়া গিয়াছে; সে রাজপুতকুল-গৌরবের প্রতিনিধি হইয়া সগৌরবে ও অভ্রান্ত পদক্ষেপে রাজনৈতিক জগতের বন্ধুর, পিচ্ছিল রন্ধপথে বিচরণ করিয়াছে, ও স্বয়ং বাদশাহের সম্মুখীন হইয়া বাগবৈভবে ও চাতুয্যে তাঁহাকে নিরস্ত, নিরাকৃত করিয়াছে | গরিব দরিয়া, কেবল সংবাদ-বিক্রেতী বলিয়া নহে, আরও উচ্চতর, শ্লাঘ্যতর অধিকারে, শাহজাদীর প্রণয়-প্রতিদ্বন্দ্বিনীরূপে, রংমহালের বহ্নিজ্বালাময় প্রাসাদসমূহে প্রবেশাধিকার লাভ করিয়াছে | উপন্যাসের সমস্ত চরিত্রের মধ্যে কেবল এক মাণিকলাল তাহার অভাবনীয় রূপান্তর ও উচ্চপদে আরোহণ সত্ত্বেও, স্বাভাবসিদ্ধ ধূত্যতার জন্যই তাহার প্রাকৃৃত উদ্ভবের (plebeian origin) চিহ্ন রক্ষা করিয়াোছে, সম্পূণ্য লুপ্ত হইতে দেয় নাই |
     আবার অন্য দিক দিয়াও ইতিহাস পারিবারিক জীবনের মধ্যে প্রবেশ করিয়া তাহার স্বাভাবিক স্বাধীনতাকে সংকুচিত করিয়াছে, ও তাহার তুচ্ছতম ব্যাপারের সহিত একান্ত অপ্রত্যাশিত কঠোর পরিণতির সংযোগ স্থাপন করিয়া দিয়াছে | চঞ্চলকুমারীর একটা নিতান্ত তুচ্ছ কায্য, একটা সামান্য বালিকাসুলভ চাপল্য দুই জাতির মধ্যে তুমুল সংঘষ্যের সৃষ্টি করিয়াছে; যে আকাশ-বাতাসে দাহ্য পদাথ্য স্তূপীভূত হইয়া আছে, সেখানে একটা তুচ্ছ অগ্নিস্ফুলিঙ্গ প্রলয়ানল জ্বালাইয়া তুলিয়াছে | পারিবারিক জীবনে যাহা সব্যপ্রধান সমস্যা, বিবাহ--এ বিদ্যুদগ্নিগভ্য আকাশের তলে তাহার এক মুহূত্যেই সমাধান হইতেছে; প্রেম নিতান্ত অনুগত অনুচরের ন্যায় দেশভক্তি বা রাজনৈতিক প্রয়োজনের অবুসরণ করিতেছে | রাজসিংহের প্রতি চঞ্চলকুমারীর যে অনুরাগ তাহার মধ্যে ব্যক্তিগত ব্যাপার খুব কমই আছে; তাহা মূলত স্বজাতি-প্রীতির উচ্ছ্বসিত বিকাশ মাত্র; তাহা প্রণয়ীকে আত্মসমপ্যণ নহে, বীরের পদে শ্রদ্ধাপুষ্পাঞ্জলি | নিম্যলকুমারীর বিবাহ তো যুদ্ধের একটা অপ্রত্যাশিত আনুষঙ্গিক ফল মাত্র | এই রাজনীতির oxygen-পূণ্য বাতাসে অতি অভাবনীয় পরিবত্যনসকল এক মুহূত্যে সংসাধিত হইতেছে; দস্যু দেশভক্ত ও যুদ্ধকুশল সেনানীতে পরিণত হইতেছে --শ্রদ্ধা প্রেমে রূপান্তরিত হইতেছে, এবং প্রেম রমণীসুলভ লজ্জা-সংকোচ বিসজ্যন দিয়া, প্রত্যাখানভয়শূন্য হইয়া প্রেমাস্পদের নিকট আত্মসমপ্যণ করিতেছে; নিম্যম প্রয়োজন ইচ্ছাকে বশীভূত করিয়া মুহূত্যেকের পরিচিতের জন্য বরমাল্য রচনা করিতেছে | বিশেষত 'রাজসিংহ' -এর সপ্তম খণ্ড হইতে প্রায় অবিমিশ্র ঐতিহাসিক কাহিনী গ্রন্থকে ব্যাপ্ত করিয়া কল্পনাপ্রসূত উপন্যাসকে সবলে পিছনে ঠেলিয়া দিয়াছে | আরংজেব পাব্যত্য রন্ধপথে প্রবেশ প্রায় নীরব হইয়া গিয়াছে | বিপুল ইতিহাস ক্ষুদ্র ব্যাক্তিগত জীবনকে প্রায় গ্রাস করিয়া লইয়াছে | আরংজেব, রাজসিংহ ইঁহারা তো ঐতিহাসিক ব্যাক্তিই; কল্পনাপ্রসূত চরিত্রগুলিও---চঞ্চল, নিম্যল, মাণিকলাল, প্রভৃতি --ব্যাক্তিস্বাতন্ত্র্য বিসজ্যন দিয়া ঐতিহাসিক কোলাহলের মধ্যে নিজ নিজ কণ্ঠস্বর হারাইয়া ফেলিয়াছে, ও বৃহৎ ইতিহাস-যন্ত্রের অঙ্গপ্রত্যঙ্গমাত্রে পরিণত হইয়াছে | গ্রন্থের এই অংশকে ঠিক উপন্যাস না বলিয়া উদ্দীপনাপূণ্য, ঘাত-প্রতিঘাত-চঞ্চল ইতিহাস-পৃষ্ঠা বলিলেও চলে | মোটকথা, 'রাজসিংহ' উপন্যাসে ইতিহাসের প্রবল আকষ্যণে আমাদের সাধারণ জীবন তাহার স্বভাবমন্থর গতি হারাইয়া ঐতিহাসিক ঘটনার বেগবান প্রবাহের সহিত সমতালে চলিতে বাধ্য হইয়াছে |
     অবশ্য এই ইতিহাসের একাধিপত্যের বিরুদ্ধে বঙ্কিম যে যুদ্ধ করেন নাই এমন নহে; ইতিহাসের গ্রাস হইতে ব্যাক্তিগত জীবনের স্বাধীনতা রক্ষা করিতে তিনি বিশেষ চেষ্টা করিয়াছেন | যেখানে রাজনৈতিক কারণই আগুন জ্বালিবার পক্ষে পয্যাপ্ত, সেখানেও বঙ্কিম মানসিক-সংঘষ্যজাত অগ্নিশিখার ক্রীড়া দেখাইতে প্রয়াসী হইয়াছেন | যেখানে রাজপুতের অদম্য স্বাধীনতাস্পৃহা ও মোগলের মদোদ্ধত, বলদৃপ্ত অত্যাচার বিরোধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করিয়া রাখিয়াছে, সেখানেও বঙ্কিম মানব-চিত্তের স্বাধীন ক্রিয়া হইতেই প্রথম অগ্নিস্ফুলিঙ্গ প্রেরণ করিয়াছেন | এইরূপে তিনি ইতিহাসের সব্যগ্রাসী একাধিপত্য হইতে মানব-জীবনের স্বাধীনতা ও গৌরব বাঁচাইতে চাহিয়াছেন | আরংজেবের হিন্দুদ্বেষিতা যথেচ্ছাচার, জিজিয়া কর-স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে চঞ্চলকুমারীকৃত অপমানের প্রতিশোধস্পৃহাও তাহার কায্য করিয়াছে | অগ্নি জ্বালিবার ইন্ধনের মধ্যে বিক্রম শোলাঙ্কির অভিশাপ ও জ্যোতিষীর ভবিষ্যদবাণীও স্থান পাইয়াছে | তা ছাড়া ইতিহাসের দারুণ নিষ্পেষণের মধ্যেও চরিত্রগুলি তাহাদের ব্যাক্তি-স্বাতন্ত্র্য সম্পূণ্যভাবে হারায় নাই | চঞ্চল, নিম্যল--ইহারা রাজনৈতিক যন্ত্রে ঘূণি্ত হইয়াও তাহাদের ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙক্ষা সম্পূণ্য বিসজ্যন দেয় নাই | দরিয়া সম্বন্ধে এই কথা আরও বিশিষ্টভাবে প্রযোজ্য | সে ইতিহাস-প্রবাহের মধ্যে এক উন্মত্ত একাত্মতার সহিত, অভ্রান্ত লক্ষ্যে আপন হৃদয়ের প্রণয়ধারারই অনুসরণ করিয়া চলিয়াছে | স্বয়ং সম্রাট আরংজেবও সময়ে সময়ে নিজ উচ্ছপদের মহিমা হইতে অবরোহণ করিয়া কুটিলতাবম্যাবৃত হৃদয়ের রুদ্ধকবাট খুলিয়াছেন ও সাধারণ মানুষের ন্যায় আপন প্রাণের গভীর-স্তরস্থ অতৃপ্তি ও ক্ষোভকে বাক্যে প্রকাশ করিয়াছেন | এই প্রকারে বঙ্কিমচন্দ্র ঐতিহাসিক কাহিনীর মধ্যে উপন্যাসের বিশেষত্ব রক্ষা করিতে সমথ্য হইয়াছেন |
     এই ইতিহাস-নাগপাশের মধ্যে মানব-হৃদয়ের সব্যাপেক্ষা স্বাধীন স্ফুরণ হইয়াছে মবারক ও জেব-উন্নিসার প্রণয়-কাহিনীতে | এইখানে বঙ্কিম ইতিহাসের বন্ধন কাটাইয়া উঠিয়া তাঁহার ঔপন্যাসিক প্রতিভার পূণ্য পরিচয় দিয়াছেন, ইতিহাস এখানে মানব-হৃদয়-বিশ্লেষণকে অভিভূত না করিয়া তাহার অনুবতী্ হইয়াছে | মবারক রাজনৈতিক আবত্যের মধ্যে ঘূণি্ত হইয়াছে সত্য; কিন্তু সে কোথাও ইতিহাস-প্রবাহে নিশ্চেষ্ট-নিজি্ববৎ আপনাকে ভাসাইয়া দেয় নাই; তাহার নিজের স্বাধীন মনোবৃত্তিই প্রধানত তাহার ভাগ্য নিয়ন্ত্রিত করিয়াছে |