Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা- ৬১, ৬২ ও ৬৩

2020-06-28
জেব-উন্নিসার সহিত প্রথম প্রণয়-ব্যাপারে, মবারকের উৎপীড়্ত বিবেক তাহার অবৈধ, কলুষিত প্রেমের বিরুদ্ধে অন্তত একটা ক্ষীণ প্রতিবাদও করিয়াছে; এবং তাহার পরবত্যী জীবনের সমস্ত ভাগ্য-ব্পয্যয়কেও সে স্বেচ্ছায় বরণ করিয়া লইয়াছে | রূপনগরের যুদ্ধের পর জেব-উন্নিসাকে ত্যাগ, আবার পাব্যত্য যুদ্ধের পর দীনা, অনুতপ্তা সম্রাট-দুহিতাকে পুনগ্র্হণ, স্বজাতিদ্রোহিতার প্রায়শ্চিত্ত-স্বরূপ নিশ্চিত মৃত্যুকে উপেক্ষা করিয়া সম্রাট-শিবিরে প্রত্যাগমন--এই সমস্তই তাহার স্বাধীন ইচ্ছার ফল | ইতিহাসের পাষাণ প্রাচীর তাহাকে চারিদিকে বেষ্টন করিয়াছে সত্য, কিন্তু তাহার স্বাধীন আত্মাকে অভিভূত করিতে পারে নাই | তাহার এই অক্ষুণ্ন স্বাধীনতার শেষ প্রমাণ এই যে, রাজপুত-মোগলের অনলোদ্গারী কামানরাশির মধ্যে যে অস্ত্র তাহাকে মৃত্যুমুখে পাঠাইল তাহা দরিয়াহস্ত-নিক্ষিপ্ত |
     উপন্যাস-মধ্যে ব্যাক্তিগত জীবনের পূণ্যতম বিকাশ হইয়াছে জেব-উন্নিসার চরিত্রে | যেমন পব্যতের কঠিন বক্ষ বিদীণ্য করিয়া যে নিঝ্যরিণী নিগ্যত হইয়াছে, তাহার সৌন্দয্য সমধিক মনোহর, সেইরূপ ইতিহাসের পাষাণ-প্রাচীরের মধ্যে অবরুদ্ধা জেব-উন্নিসার অন্তরের গোপন কাহিনীটি অধিকতর মম্যস্পশ্যী, অনুপমমাধুয্যমণ্ডিত হইয়াছে | জেব-উন্নিসা ঐতিহাসিক চরিত্র; কিন্তু ঐতিহাসিকতাই তাহার প্রধান আকষ্যণ নহে; তাহার মধ্যে যে দুঃখজ্বালাপূণ্য প্রণয়াবেগশালী মানব-হৃদয় আছে তাহাই তাহার মুখ্য পরিচয় | গ্রন্থারম্ভে জেব-উন্নিসা ঐতিহাসিক চরিত্র-হিসাবেই প্রবত্যিত হইয়াছে; সে-ই সম্রাটের প্রিয় দুহিতা, সাম্রাজ্যশাসনে তাঁহার প্রধান সহায়, রংমহলের সব্যময়ী কত্যী | মবারক তাহার প্রণয়াস্পদ বটে, কিন্তু এই প্রেমকে সে একটা তুচ্ছ ব্যাপার বলিয়া নিতান্ত উপেক্ষার চক্ষেই দেখিয়া আসিতেছে--যেন প্রেমকে হৃদয়ে স্থান দান করিয়া সে প্রেমের প্রতি অত্যন্ত অনুগ্রহ প্রকাশ করিয়াছে | মবারকের বিবাহ-প্রস্তাবকে সে অবগ্যার হাসিতে উড়াইয়া দিয়াছে; প্রণয়ের মাহাত্ম্য সে প্রতি পদক্ষেপে অস্বীকার করিয়াছে; শেষে প্রণয়ী অপ্রাপ্য হইলে ব্যথ্য প্রণয়ের জ্বালা অপেক্ষা বাদশাহজাদীর কুপিত অহংকারই প্রেমাস্পদকে পিপীলিকার মতো টিপিয়া মারিতে তাহাকে প্রণোদিত করিয়াছে | ইহার পরই অপমানিত, অস্বীকৃত, নিব্যাসিত প্রেম আপনার অনিবায্য দীপ্ত তেজে তাহার হৃদয়-মধ্যে জ্বলিয়া উঠিয়া তাহার স্বাভাবিক মহিমার অবিসংবাদিত, অখণ্ডনীয় প্রমাণ দিয়াছে | এই নবজাগ্রত প্রেম তাহাকে সব ঐশ্বয্য হইতে নিম্যমভাবে টানিয়া আনিয়া একান্ত রিক্ততার মাঝে দাঁড় করাইয়াছে; তাহার সব্য অহংকার চূণ্য করিয়া তাহাকে প্রেমের অতি দীনা ও অনুতপ্তা পূজারিণীতে পরিণত করিয়াছে; তাহার শাহজাদীত্ব ঘুচাইয়া তাহাকে সাধারণ মানবীর সমতলভূমিতে আনিয়া অধিষ্ঠিত করিয়াছে | তারপর তাহাকে আর ঐতিহাসিক চরিত্র বলিয়া ধরা যায় না | বাহিরের সমস্ত বিপয্যয়ের মাঝে সে আপন চিন্তায় নিমগ্না, আপন শোকে অধীরা, পূব্যস্মৃতির বৃশ্চিক-দংশনে কাতরা | পিতার অপমান ও পরাজয়, নিজ উচ্চাভিলাষের উন্মূলন, সাম্রাজ্যের ধ্বংসের সূচনা--এ সমস্ত আর তাহার চিন্তায় স্থান পায় নাই | সব্যশেষে ইতিহাস আবার তাহার পুনল্যব্ধ প্রণয়ীকে তাহার বুক হইতে ছিনাইয়া লইয়া গিয়াছে বটে, কিন্তু তাহার জীবনের উপর আর আধিপত্য বিস্তার করিতে পারে নাই; তাহার ঐকান্তিক প্রেমের পরিসমাপ্তিকে এক মহাব্যথ্যতার করুণ সুরে ভরিয়া দিয়াছে মাত্র :
"বসুধালিঙ্গন ধূসরস্তনী
বিললাপ বিকীণ্যমূদ্ধ্জা ||"

     'রাজসিংহ' -এ এইরূপ দুই-চারিটি দৃশ্য ছাড়া উপন্যাসোচিত গুণ খুব বেশি নাই | চরিত্র-বিশ্লেষণ যদি উপন্যাসের প্রাণ হয়, তবে 'রাজসিংহ' -এ তাহার অবসর অপেক্ষাকৃত কম | ইতিহাসের প্রবল স্রোতে চরিত্রের বিশেষত্ব ভাসিয়া যাইবার উপক্রম হইয়াছে | এই বিশাল সমুদ্রমন্থনে যে রস উঠিয়াছে তাহা আমাদের সাধারণ জীবনের পক্ষে অতিশয় তীব্র | দুই যুদ্ধোদ্যত সৈন্যদলের মাঝে স্থিরভাবে দণ্ডায়মানা চঞ্চলকুমারীর মুখে যে সমস্ত তেজঃপূণ্য বাক্য দেওয়া হইয়াছে, তাহা জীবনের বীরত্বপূণ্য সন্ধিস্থলেরই উপযুক্তি; এই ভাব ব্যাক্তিগত নহে, typical, সেইরূপ বাদশাহের নিকট নিম্যলকুমারীর সরস বাকপটুতা ও সতেজ নিভি্কতাও তাহার ব্যক্তিগত বিশেষত্বের অপেক্ষা জাতির প্রতিনিধিত্বেরই অধিক সূচক | 'রাজসিংহ' -এ বিবৃত ঘটনাগুলি এতই বিচিত্র ও চিত্তাকষ্যক যে, পাঠকের মন চরিত্র-বিশ্লেষণের দাবি করিতে ভুলিয়া যায়; আর এরূপ রোমাঞ্চকর সংঘটনের মধ্যে চরিত্রের বিকাশ ও পরিণতিও অসম্ভব | সুতরাং সূক্ষ্ম সমলোচকের দৃষ্টিতে 'রাজস্ংহ' -এর মধ্যে উপন্যাসোচিত গুণের অপেক্ষাকৃত অভাব লক্ষিত হইবে | কিন্তু কেবল আখ্যায়িকা হিসাবে, একটা জাতিসংঘষ্যমূলক মহাযুদ্ধের জীবন্ত ও উদ্দীপনাপূণ্য বণ্যনা হিসাবে 'রাজসিংহ' অতুলনীয় | ইহার গঠন-কৌশলও (constructive power) অনবদ্য; দৃশ্যের পর দৃশ্য দ্রুতবেগে পরিণতির দিকে ছুটিয়া চলিয়াছে, কোথাও অনাবশ্যক বাহুল্য নাই, কোথাও গতিবেগ মন্থর হইয়া আসে নাই, কোথাও কেন্দ্রাভিমুখী রেখা হইতে তিলমাত্র বিচ্যুতি হয় নাই | অবশ্য স্থানে স্থানে দুই-একটি দৃশ্য অসম্ভবতাদোষে দুষ্ট হইয়াছে; দরিয়ার মোগল অশ্বারোহীর ছদ্মবেশ, মাণিকলালের ঐন্দ্রজালিক চতুরতা রোমান্সের পক্ষেও ঠিক সম্ভব বলিয়া বোধ হয় না | কিন্তু বঙ্কিম তাঁহার আখ্যায়িকাকে এরূপ প্রচণ্ড গতিবেগ দিয়াছেন যে, পাঠক এই সমস্ত ক্ষুদ্র ত্রুটির উপর মনোযোগ দিতেই অবসর পায় না | 'রাজসিংহ' -এ বঙ্কিম এক নূতন রকমের ঐতিহাসিক উপন্যাসের প্রবত্যন করিয়াছেন; তাঁহার কৃতিত্ব এই যে, তিনি একদিকে ইতিহাস-প্রসিদ্ধ ঘটনার মধ্যে চরিত্র-মূলক শৃঙ্খল যোদনা করিয়া দিয়াছেন, অপরদিকে ব্যক্তিগত জীবনে ইতিহাসের গতিবেগ সঞ্চার করিয়াছেন; এবং এইরূপে দুই বিভিন্ন প্রকৃতির উপাদানের মধ্যে এক অপূব্য সমন্বয় গড়িয়া তুলিয়াছেন |
৪.    সামাজিক ও পারিবারিক উপন্যাস--'ইন্দিরা', 'রজনী',
'বিষবৃক্ষ' ও 'কৃষ্ণকান্তের উইল'

এইবার বঙ্কিমের সামাজিক ও পারিবারিক উপন্যাসগুলির আলোচনায় প্রবৃত্ত হইব | চারিখানি উপন্যাসকে এই পয্যায়ভুক্ত করা যাইতে পারে : 'বিষবৃক্ষ' (১ জুন, ১৮৭৩), 'ইন্দিরা' (১৮৭৩), 'রজনী' (২ জুন, ১৮৭৭) ও 'কৃষ্ণকান্তের উইল' (২৯ আগস্ট, ১৮৭৮) |

বঙ্কিম সামাজিক উপন্যাসেও রোমান্সের প্রভাব হইতে সম্পূণ্য মুক্ত হইতে পারেন নাই---তাঁহার সামাজিক উপন্যাসগুলিও অনেকটা রোমান্সের লক্ষণাক্রান্ত | 'রজনী'তে এই অতিপ্রাকৃত ও অসাধারণের স্পশ্য খুব সুস্পষ্ট; 'বিষবৃক্ষ' -এও একটা সাংকেতিকতার আভাস বত্যমান; 'ইন্দিরা' ও 'কৃষ্ণকান্তের উইল' এই প্রভাব হইতে সব্যাপেক্ষা অধিক মুক্তিলাভ করিয়াছে | কিন্তু এই দুইখানি উপন্যাসেও অনৈসগি্কের ক্ষীণ প্রতিধ্বনি শুনিতে পাওয়া যায় | এই উপন্যাসগুলির কালানুক্রমিক আলোচনার বিশেষ প্রয়োজন নাই; 'ইন্দিরা' ও 'রজনী' এই দুইখানী পূণ্যাঙ্গ উপন্যাস নহে; ইহাদের মধ্যে চরিত্রের ঘাত-প্রতিঘাত অপেক্ষা ঘটনা-বৈচিত্র্যেরই প্রাধান্য বেশি | 'বিষবৃক্ষ' ও 'কৃষ্ণকান্তের উইল' এই দুইখানিই প্রকৃত উপন্যাস-পদবাচ্য, উপন্যাসের অথ্য-গৌরব ও সমস্যা-বিশ্লেষণ ইহাদের মধ্যে বত্যমান | সুতরাং আটে্র ক্রমবিকাশের দিক দিয়া প্রথমোক্ত উপন্যাস-পদবাচ্য, উপন্যাসের অথ্য-গৌরব ও সনস্যা-বিশ্লেষণ ইহাদের মধ্যে বত্যমান | সুতরাং আটে্র ক্রমবিকাশের দিক দিয়া প্রথমোক্ত উপন্যাস দুইঁটির আলোচনা প্রথমে হওয়া উচিত |
     'ইন্দিরা' একটি ক্ষুদ্রায়তন উপন্যাস; কিন্তু ইহার ক্ষুদ্র অবয়ব ঘটনাবিন্যাসে অনবদ্য, তীক্ষ্ণ পরিহাস-নিপুণতায় উপভোগ্য, হাস্যালোকপাতে ভাস্বর; একটা তীক্ষ্ণ বুদ্ধির আভা শানিত ছুরিকার চাকচিক্যের ন্যায়ই গল্পটিকে উজ্জ্বল করিয়াছে; এই তীক্ষ্ণ বুদ্ধি স্ত্রীজনোচিত মাধুয্য ও সহৃদয়তায়, কোমল প্রেম-বিহ্বলতায় মণ্ডিত হইয়াছে | পুরুষের পাণ্ডিত্যাভিমান ও অনিপুণ কক্শতা কোথাও ইহাকে স্পশ্য করে নাই, রমণীর সুরই গল্পটির আদ্যোপান্ত অভ্রান্তভাবে ধ্বনিত হইয়াছে | অবশ্য চিলিয়ানওয়ালা ও শিখদের বিশ্বাসঘাতকতার উল্লেখ বঙ্গ-পুরস্ত্রীর মুখে একটু অসংগতই শুনায়; কিন্তু এরূপ ভ্রান্তির দৃষ্টান্ত খুবই বিরল | বিশেষত শিখযুদ্ধ-প্রত্যাগত রসদ-বিভাগের কম্যচারীর পত্নীর পক্ষে এরূপ খবর রাখা নিতান্ত অবিশ্বাস্য নাও হইতে পারে | এই বিষয়ে 'রজনী'র সহিত 'ইন্দিরা'-র একটি গুরুতর প্রভেদ লক্ষিত হয় | 'রজনী'তে বিভিন্ন বক্তা ও বক্তীর মধ্যে ভাষাগত বিশেষ কোনো পাথ্ক্য রক্ষা করা হয় নাই---স্ত্রী-পুরুষ-নিব্যিশেষে সকলের মুখেই একরূপ ভাষা ধ্বনিত হইয়াছে, সে ভাষা লেখকের নিজের ভাষা হইতে অভিন্ন | অবশ্য বঙ্কিম যে এরূপ একটা প্রভেদ প্রতিষ্ঠিত করিতে চেষ্টা করেন নাই, তাহা নহে; রজনীর অন্ধতা, অমরনাথের দাশ্যনিকোচিত চিন্তাশীলতা, শচীন্দ্রের ভিন্নপ্রকৃতির বুদ্ধিমত্তা, লবঙ্গলতার রমণীসুলভ স্নেহশীলতা ও অতিপ্রাকৃত বিশ্বাসপ্রবণতা--এই প্রবৃত্তিগুলির বিশেষ প্রভাব তাহাদের মুখনিঃসৃত ভাষাতে প্রতিফলিত করিতে লেখক চেষ্টা করিয়াছেন সত্য; কিন্তু চেষ্টা বিশেষ সফল হইয়াছে বলিয়া মনে হয় না |
     'ইন্দিরা'র উপাখ্যান-ভাগ নিতান্তই সামান্য; গস্যুহস্তে অপহরণের পর ইন্দিরার দুঃখ ও স্বামীর সহিত পুনমি্লনের জন্য নানারূপ কৌশল-অবলম্বন---ইহার ইহার মুখ্য বিষয় | এই সামান্য আয়তনের মধ্যে কোনো গভীর সমস্যা আলোচিত হয় নাই, এবং বোধ হয় কোনো গভীর সমস্যার অবসরও ছিল না | কিন্তু গ্রন্থখানির স্বল্প-সংখ্যক পরিচ্ছেদ আনন্দ-রসে সিঞ্চিত, ও করুণ-মধুর সহানুভূতিতে আদ্র্ হইয়া উঠিয়াছে | চরিত্রগুলি--ইন্দিরা, সুভাষিণী, তাহার শাশুড়ি 'কালির বোতল', সোনার মা পাচিকা ও হারাণী ঝি--অল্প কয়েকটি রেখাপাতেই জীবন্ত ও উজ্জ্বল হইয়া উঠিয়াছে | আমাদের ঘটনা-বিরল, জীবনের সংকীণ্য পরিসরের মধ্যেই বঙ্কিমচন্দ্র প্রাণরসের প্রবাহ বহাইয়া দিয়াছেন; একটি পরিবারের ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যে জীবনের বিচিত্র লীলা ও চিত্তাকষ্যক ঘাত-প্রতিঘাতের চিত্র দেখাইয়াছেন | অবশ্য ইহাদের কাহারও মধ্যে বিশেষ একটা চরিত্রগত গভীরতা নাই; ইন্দিরার অদম্য কৌতুকপ্রিয়তা, সুভাষিণীর সরল ও আন্তরিক সহানুভূতি, গৃহিণীর সন্দেহপ্রবণতা ও পুত্রস্নেহ, সোনার মার কৌতুকজনক ঈষ্যা ও আত্মবিস্মৃতি খুব গভীর স্তরের ভাব নহে; কিন্তু ইহারাই আমাদের সাধারণ জীবনের উপাদান; আমাদের অধিকাংশের জীবনের যাহা-কিছু রস, যাহা-কিছু বৈচিত্র্য, তাহা ইহাদেরই ক্রিয়া ও পরস্পর ঘাত-প্রতিঘাতের ফল | অধিকাংশেরই জীবনে খুব গভীর স্তর থাকে না; ইহাদের প্রকৃতির মধ্যে গভীরতা ও জটিলতা খুঁজিতে গেলে চরিত্রসৃষ্টি প্রায়ই অস্বাভাবিক হইয়া উঠে | বিশ্লেষণ-প্রাচুয্যে ও বিশ্লেষণযোগ্য পদাথ্যের মধ্যে একটা গুরুতর অসামঞ্জস্য জন্মে; অথবা এই সমস্ত উপর স্তরের নীচে যে একটা আদিম পাশবিক স্তর আছে তাহাতেই অবতরণ করিতে হয় | সুতরাং ইন্দিরার চরিত্রগুলির মধ্যে গভীরতা না থাকুক, স্বাভাবিকতা যথেষ্ট আছে |
     গ্রন্থ-মধ্যে যদি কোথাও কলা-কুশলতার দিক হইতে কোনো সন্দেহের অবসর থাকে তবে তাহা ইন্দিরার স্বামি-লাভের জন্য অত্যন্ত দীঘ্য ও সুচিন্তিত ষড়যন্ত্রের বিবরণে | এই ষড়যন্ত্রের সমস্ত গ্রন্থিই সমান বিচারসহ নহে; বিশেষত ঊনবিংহ শতাব্দীতে নিজেকে স্বামীর উপর বিদ্যাধরী বলিয়া চালাইবার চেষ্টা ঠিক উপযোগী বলিয়া মনে হয় না | তবে ইন্দিরার স্বামীকে কুসংস্কারপ্রবণ ও ভূত-প্রেতে বিশ্বাসবান বলিয়া বণ্যনা করিয়া বঙ্কিম ব্যাপারটিকে অনেকটা বিশ্বাসযোগ্য করিয়া লইতে চেষ্টা করিয়াছেন | স্বামীকে বশীভূত করিবার অন্যান্য উপায় ও প্রচেষ্টাগুলি খুব সুকৌশলেই নিব্যাচিত হইয়াছে; স্ত্রীজাতির মোহ বাড়াইবার অমোঘ অস্ত্রগুলি সূক্ষ্মদশি্তার সহিত প্রদশিত হইয়াছে | মোটের উপর 'ইন্দিরা' সরস বণ্যনায়, অফুরন্ত হাস্যরসে ও একরূপ অবণ্যনীয় স্ত্রীজাতিসুলভ মাধুয্যে ও রমণীয়তায় উপভোগ্য হইয়াছে |
     'ইন্দিরা' ও 'রজনী'তে বঙ্কিম উপন্যাস-ক্ষেত্রে একটি নূতন প্রণালী প্রবত্যন করিয়াছেন, আখ্যায়িকাটি নিজে না বলিয়া উপন্যাসের চরিত্রগুলিকেই বক্তার আসনে বসাইয়াছেন | 'ইন্দিরা'তে একমাত্র ইন্দিরাই ব্যক্তী; সুতরাং এখানে ব্যাপার ততদূর জটিল হয় নাই | কিন্তু 'রজনী'তে উপাখ্যানটি বলিবার ভার অনেকের মধ্যে ভাগ করিয় দেওয়া হইয়াছে | এই ব্যবস্থাতে বঙ্কিম একটি নূতন গুরুতর দায়িত্ব নিজ স্কন্ধে চাপাইয়াছেন; প্রত্যেক বক্তার প্রকৃতির সহিত তাহার ভাষার সামঞ্জস্য-বিধানের চেষ্টা করিতে হইয়াছে | পূব্যেই দেখিয়াছি যে, এই চেষ্টা সম্পূণ্য সফল হয় নাই; বিভিন্ন বক্তার চরিত্রানুযায়ী ভাষাগত প্রভেদ বঙ্কিম রক্ষা করিতে পারেন নাই | নায়িকা রজনী-সম্বন্ধেই এই বিষয়ে একটা গুরুতর অসামঞ্জস্যের পরিচয় পাওয়া যায় | অন্যান্য চরিত্রের সাক্ষ্য হইতে অন্ধ রজনীর যে কোমল, ব্রীড়া-সংকুচিত, প্রকাশ-বিমুখ, সমবেদনাপূণ্য ও স্বাথ্যবিসজ্যন-তৎপর প্রকৃতিটি ফুটিয়া উঠে, তাহার নিজের পরিহাসপূণ্য, মৃদু-বিদ্রূপমণ্ডিত ও বিশ্লেষণকুশল

উক্তিগুলি ঠিক তাহার সমথ্যন করে না | তারপর তাহার মুখে যে সমস্ত গভীর চিন্তাশীলতাপূণ্য, দাশ্যনিকোচিত উক্তি দেওয়া হইয়াছে, তাহা তাহার প্রকৃতির পক্ষে ঠিক শোভন হয় নাই, তাহা অমরনাথ বা শচীন্দ্রের মুখে অধিকতর সংগত হইত | আবার তাহার কথাবাত্যায় যেরূপ গভীর সংসারাভিগ্যতার নিদশ্যন পাওয়া যায়, তাহাও তাহার মতো সমাজসংস্রবরহিত, সরল, অন্ধ যুবতীর পক্ষে অনধিগম্য বলিয়াই মনে হয় | তবে রজনীর চরিত্র-সম্বন্ধে যে অসামঞ্জস্যের কথা পূব্যে উল্লিখিত হইয়াছে, তাহার একটা স্বাভাবিক ব্যাখ্যা দেওয়া অসম্ভব নয় | রজনীর শান্ত, স্তব্ধ, পাষাণোপম মূতি্র অভ্যন্তরে যে একটা প্রবল প্রেমের আগ্নেয়গিরি জ্বলিতেছে, তাহা তাহার নিজেরই জানার সম্ভাবনা আছে; অপরের পক্ষে অন্ধের রূপোন্মাদ ও প্রবল চিত্তচাঞ্চল্য উপলব্ধি করা যে কত দুরূহ তাহা শচীন্দ্রের উক্তিতেই প্রমাণিত হইয়াছে | অন্তঃপ্রকৃতির এরূপ সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ, হৃদয়ের গোপন রহস্যের এরূপ পূণ্য উদ্ঘাটন অপরের নিকটে আশা করা যায় না; সুতরাং রজনীর আত্মপরিচয় ও অপরের বিবরণের মধ্যে এরূপ একটা অনৈক্য থাকাই স্বাভাবিক | বিশেষত গল্পের যে অংশে উপাখ্যানের সূত্র রজনীর হাত হইতে লওয়া হইয়াছে, তাহা তাহার জীবনের একটা সন্ধিস্থল; তখন সে বিজ্যন, অন্তগূ্ঢ় প্রেমের ধ্যান হইতে বাহ্য জগতের কোলাহলের মধ্যে গিয়া পড়িয়াছে | সুতরাং এই সময়ে তাহার চরিত্রের একটা পরিবত্যন ঘটাও সংগত | অমরনাথ ও শচীন্দ্র যখন বক্তার আসন গ্রহণ করিলেন, তখন রজনীর উপর বাহিরের জগতের দৃষ্টি পড়িয়াছে; সে যখন একটা বিপুল সম্পত্তির অধিকারী হইয়া দাঁড়াইয়াছে, তাহার প্রেম লইয়া একটা কাড়াকাড়ি, একটা প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা লাগিয়া গিয়াছে | তাহার অন্ধকার হৃদয়-কন্দরাবদ্ধ চিন্তা এখন বাহ্য জগতের জটিল সম্পক্যজালের মধ্যে আত্মপ্রকাশ করিবার অবসর পাইয়াছে; সে নিজের নব-লব্ধ প্রাচুয্য হইতে বিলাইতে বসিয়াছে; সে কৃতগ্যতা ও প্রেমের মধ্যে দ্বন্দ্বের মীমাংসা করিতেছে | এই সময়ে তাহার অন্তরের উচ্ছ্বাস অনেকটা শান্ত-সংযত হইয়াছে, তাহার কোমল, মধুর রমণীপ্রকৃতিটি প্রস্ফুট হইয়াছে | আবার এই সময়ে রজনীর হৃদয়-বিশ্লেষণের কাজ তাহার নিজের হাত হইতে অপরের হাতে চলিয়া গিয়াছে; কাজেই তাহার আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের চিত্রটি ফুটিয়া উঠে নাই | অমরনাথ বা শচীন্দ্র প্রেমিকের মুগ্ধ-দৃষ্টিতেই তাহার প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়াছে; লবঙ্গলতাও তাহাকে বাহিরের দিক হইতে দয়াবতী, পরদুঃখকাতরা রমণীরূপে দেখিয়াছে | সুতরাং রজনীর এই দুই চিত্রের মধ্যে একটা অসামঞ্জস্য অনেককাংশে অপরিহায্য | কেবল অমরনাথের ক্ষেত্রেই উক্তি ও প্রকৃতির মধ্যে একটা যথেষ্ট সংগতি লক্ষ্য করা যায়; তাহার উদাসীন, সংসার-বিমুখ, তত্ত্বজিগ্যাসু প্রকৃতি তাহার বাক্যের মধ্যেই ধ্বনিত হইয়া উঠিয়াছে | শচীন্দ্রের বাক্যে বা চরিত্রে সেরূপ উল্লেখযোগ্য বিশেষত্ব কিছুই নাই | লবঙ্গলতার ক্ষুরধার বিদ্ধির সঙ্গে অতিপ্রাকৃতে অন্ধবিশ্বাসের---'কামার বউ-এর পিতলের টুকনি সোনা করিয়া দিয়াছিলেন | উনি না পারেন কী?' --ইত্যাদি উক্তির সামঞ্জস্য করা একটু কঠিন |
     বঙ্কিম 'রজনী'তে যে বিশেষ প্রণালী অবলম্বন করিয়াছেন, তাহার আর একটি বিপদ আছে | উপন্যাসের পাত্র-পাত্রীরা যে তাহাদের নিজ নিজ অন্তঃপ্রকৃতির বিশ্লেষণ করিয়াছে, তাহা একদিকে খুব সরস ও জীবন্ত হইয়াছে; কিন্তু এখানে একটি প্রশ্ন জিগ্যাসা আছে | উপন্যাস-বণ্যিত ঘটনার কোন্ অংশ বা stage হইতে তাহাদের এই আত্মবিশ্লেষণ আরম্ভ হইয়াছে? অবশ্য ঘটনার শেষ হইবার পরেই বিবৃতি আরম্ভ হইয়াছে; শচীন্দ্র-রজনীর প্রেম সাথ্যকতা লাভ করার পরেই সকলে আপন অভিগ্যতা লিপিবদ্ধ করিয়াছে | তাহা হইলে লিখিবার সময়ে একজনও শেষ পরিণতি-সম্বন্ধে অগ্য ছিল না | এখন এই শেষ পরিণতির গ্যান তাহাদের অতীতের বিশ্লেষণকে নিয়ন্ত্রিত করিয়াছে কি না, বা করিয়া থাকিলে কতদূর করিয়াছে, ইহাই বিচায্য বিষয় | উপন্যাসের পাত্র-পাত্রীরা যখন কোনো বিশেষ ঘটনার আলোচনা করিতেছে, তখন তাহাদের দৃষ্টি বত্যমানেই সীমাবদ্ধ, না ভবিষ্যৎ পরিণতির দিকে তাহাদের লক্ষ্য আছে? অবশ্য লেখক নিজে বণ্যনা-করিলে, এ সমস্যা আসে না; কেননা তিনি উপন্যাসের চরিত্রগুলির ভাগ্য-বিধাতা, তাহাদের সম্বন্ধে ত্রিকালদশী্; বত্যমানের ক্ষুদ্রতম ঘটনার সহিত অতীতের অঙ্কুর ও ভবিষ্যৎ পরিণতির সংযোগ তাঁহার চক্ষুর সমক্ষে সব্যদাই দেদীপ্যমান | কিন্তু যখন উপন্যাসের মানুষগুলি আপন আপন কাহিনী বণ্যনা করিবার ভার লয়, তখন একটা অসুবিধা এই হয় যে, বত্যমানের আলোচনায় শেষকালের গ্যান তাহারা ধরিয়া লইবে কি না ! পদে পদে এরূপ ভবিষ্যত পরিণতির গ্যান ধরিয়া লইলে বত্যমান মুহূত্যের রস জমাট বাঁধিয়া উঠিতে পারে না | বত্যমান বিপদের বণ্যনার সময়ে যদি আমি আসন্ন উদ্ধারের উল্লেখ করি, তাহা হইলে নাটকোচিত সুসংগতির (dramatic fitness) হানি হয়; আবার কেবল বত্যমান মুহূত্যেই দৃষ্টি সীমাবদ্ধ করিলে, বত্যমানকে ভবিষ্যতের সহিত সংযুক্ত করিয়া না দেখাইলে, চিত্র খণ্ডিত, আংশিক, অসম্পূণ্য থাকিয়া যায় | এই উভয়-সংকট হইতে পরিত্রাণ পাওয়া খুব উচ্চাঙ্গের প্রতিভা ভিন্ন সুসাধ্য হইতে পারে না |
     এবার কতকগুলি বিশেষ উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টির আলোচনা করা যাউক | রজনীর উক্তিটি একেবারে আদ্যোপান্ত একটা গভীর ক্ষোভ ও খেদের সুরে পরিপূণ্য; তাহার প্রেম যে এরূপ আশাতীত সাফল্য লাভ করিবে, তৎসম্বন্ধে কোনো পূব্যগ্যান তাহার উক্তির মধ্যে পাওয়া যায় না | সুতরাং বুঝিতে হইবে যে, তাহার দৃষ্টি---হীরালালের সহিত তাহার গৃহত্যাগ ও বিজন গঙ্গা-সৈকতে তৎকতৃক বিসজ্যন--ইহাতেই সীমাবদ্ধ; তৎপরবত্যী ঘটনা সম্বন্ধে তাহার কোনো গ্যানের পরিচয় পাই না | রদনীর চক্ষে এইখানেই তাহার জীবন-নাট্যের যবনিকা পতন; তাহার যাহা-কিছু খেদোক্তি ও নৈরাশ্য-ভাব, সৃষ্টি-বিধানের বিরুদ্ধে, যাহা-কিছু বিদ্রোহ-গ্যাপন, সমস্তই এই সময়ের মানসিক ভাবের দ্বারা অনুপ্রাণিত | এই বত্যমানের প্রতি অখণ্ড মনোযোগ (concentration) নিশ্চয়ই আখ্যানের উৎকষ্য সাধন করিয়াছে; বণ্যনার মধ্যে একটা উচ্ছ্বসিত ভাবপ্রাবল্য আনিয়া দিয়াছে | কিন্তু এইখানেই দুই-একটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অসংগতিও আসিয়া পড়িয়াছে--ভবিষ্যতের বজ্যন লেখক যেরূপ সম্পূণ্যভাবে করিতে চাহিয়া ছিলেন, কায্যত তাহা হয় নাই; রজনীর আখ্যায়িকার দুই-একটি উপাদান ভবিষ্যৎ হইতে আহরণ করিতে হইয়াছে | যেমন হীরালালের অসচ্চরিত্র সম্বন্ধে গ্যান | এইখানে রজনীর উক্তি এই :