Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা- ৯১, ৯২ ও ৯৩

2020-07-22
নিয়মহীন উদ্দাম খেয়ালেরই অনুবর্তন করিতেছে বলিয়া মনে হয়। যেন একটা পাগলা হাওয়া যদৃচ্ছাক্রমে চরিত্রগুলিকে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ও তাহাদের পরস্পর-সম্পর্কটিকে অস্থির পরিবর্তনের ঘূর্ণাবর্তে সর্বদা বিবর্তিত করিতেছে। উদ্দেশ‍্য-গভীরতার অভাব সর্বত্রই পরিস্ফুট। মাঝে মাঝে বর্ণনা বা বিশ্লেষণে অপ্রত‍্যাশিত কবিত্ব-শক্তি ও মনস্তত্ত্বাভিজ্ঞতার পরিচয় পাওয়া যায়। ধ্বংসোন্মুখ নীলকুঠির অযত্ন-বর্ধিত ফুল ও ঘাসের বর্ণনায় আশ্চর্য রকমের কবিত্বপূর্ণ ব‍্যঞ্জনা-শক্তর সন্ধান মিলে। গুহামধ‍্যে দামিনীর স্পর্শ অদ্ভুত কবিত্ব ও সুসংগতির সহিত সরীসৃপের ক্লেদাক্ত-পিচ্ছিল স্পর্শের সহিত উপমিত হইয়াছে। তপ্তবালুকাস্তীর্ণ শুষ্ক নদীর বর্ণনাতেও কবিত্বের ঐন্দ্রজালিক স্পর্শ অনুভব করা যায়---"যেন একটা মড়ার মাথার প্রকাণ্ড ওষ্ঠহীন হাসি যেন দয়াহীন তপ্ত আখাশের কাছে বিপুল একটা শুষ্ক জিহ্বা মস্ত একটা তৃষ্ণার দরখাস্ত মেলিয়া ধরিয়াছে।" ঔপন‍্যাসটির গঠন-শিথিলতার একটি প্রমাণ শচীশের জ‍্যেঠামহাশয়ের অনাবশ‍্যকরূপে পল্লবিত জীবন-বর্ণনায়। উপন‍্যাস-মধ‍্যে শচীশের জীবনাদর্শের উপর প্রভাব বিস্তার করা ছাড়া তাঁহার কোনো প্রত‍্যক্ষ অংশ নাই। অথচ শচীশ অপেক্ষা তাঁহার জীবন-কাহিনী অধিকতর ধারাবাহিকতার সহিত ও সবিস্তার বিবৃত হইয়াছে। গল্পের শিথিল আকস্মিকতা ও প্রাণবেগ-চঞ্চল লীলাচাপল‍্যের মধ‍্যে লেখক যেরূপ উচ্চাঙ্গের কবি-কল্পনার অবসর পাইয়াছেন সাধারণ উপন‍্যাসের দায়িত্বপূর্ণ বিশ্লেষণাধিক‍্যের মধ‍্যে তিনি কখনোই সেরূপ অবসর পাইতেন না এবং কবিত্বের এই অতর্কিত বিকাশগুলিই উপন‍্যাসের অন‍্যতম প্রধান আকর্ষণ।
( ৭ )

'ঘরে-বাইরে-এর (১৯১৬) আলোচ‍্য বিষয়ের মধ‍্যে দুইটি স্তর আছে--প্রথমটি রাজনৈতিক ও দ্বিতীয়টি সমাজনীতিমূলক। স্বদেশি আন্দোলনের প্রথম যুগে উচ্ছ্বসিত দেশপ্রীতির জোয়ারের তলে যে আত্মপ্রচার ও নীতিজ্ঞানবর্জিত সাফল‍্য-লোলুপতার একটা পঙ্কিল স্তর ছিল, লেখক সন্দীপের চরিত্রে তাহাই একেবারে অনাবৃতভাবে উদ্ঘাটিত করিয়াছেন। অবশ‍্য সন্দীপ যে এই আন্দোলনের খাঁটি প্রতীক, ইহা বলিলে আন্দোলনের প্রতি অবিচার করা হইবে। সমাজে এমন দুই-একজন লোক আছে, যাহারা মূলক anarchic, যাহাদের প্রচণ্ড ব‍্যক্তিত্ব নীতিজ্ঞানের মর্যাদা লঙঘন করিতে অণুমাত্র দ্বিধাবোধ করে না, যাহাদের নিঃসংকোচ বস্তুতন্ত্রতা আদর্শবাদের ক্ষীণ প্রলেপেরও অপেক্ষা রাখে না। ভোগসুর ও তাহার চরিতার্থতার দ্বিধাবোধ করে না, যাহাদের নিঃসংকোচ বস্তুতন্ত্রতা আদর্শবাদের ক্ষীণ প্রলেপেরও অপেক্ষা রাখে না। ভোগসুখ ও তাহার চরিতার্থতার মাঝে যে একটা অস্থিমজ্জাগত নৈতিক সংস্কার দুর্লঙঘ‍্য বাধার ন‍্যায় মাথা তুলিয়া দাঁড়াইয়াছে তাহাক‍ে তাহারা কাপুরুষোচিত দুর্বলতা বলিয়া উপহাস করে। দস‍্যুবৃত্তিই ইহাদের সমাজনীতি, দিগবিজয়ী রাজারাই ইহাদের আদর্শ পুরুষ। সমাজের স্বাভাবিক সুস্থ অবস্থায় ইহারা চতুস্পার্শ্বের পেষণে সংকুচিত থাকিতে বাধ‍্য হয়, ইহাদের বিরাট আত্মম্ভরিতা পূর্ণ প্রসারণের অবসর পায় না। কিন্তু দেশের মধ‍্যে যখন একটা অস্বাভাবিক উত্তেজনার হাওয়া প্রবাহিত হয়, যখন একটা প্রবল আবেগের ঝোঁকে আমাদের ন‍্যায়-অন‍্যায়-রোধের স্বচ্ছতা মলিন হয়, যখন চাণক‍্য-নীতি সাধারণ নীতি সাধারণ নীতিকে অপসারিত করিয়া দাঁড়ায়, যেন-তেন-প্রকারেণ কার্যসিদ্ধিই চরম সার্থকতা বলিয়া বিব‍েচিত হয়, তখনই এই জাতীয় লোক প্রাধান‍্যলাভের একটা সুবর্ণ-সুযোগ লাভ করে। তাহাদের চরিত্রে যে একটা রাজোচিত নির্ভীকতা ও দেশকে মাতাইয়া তুলিবার উদ্দীপনী শক্তি আছে, অনুকূল প্রতিবেশের মধ‍্যে তাহা পূর্ণরূপে বিকশিত হয় এবং দেশপ্রীতির উদ্দেশ‍্যে নিবেদিত অর্ঘ‍্য আত্মপ্রীতি-সাধনে লাগাইবার যে প্রচুর অবসর মিলে, কোনো স্বচ্ছদৃষ্টি, সত‍্যপ্রিয় সমালোচনার চাপে তাহা খণ্ডিত, সংকুচিত হয় না। রাজনৈতিক আন্দোলন সন্দীপের ন‍্যায় চরিত্র সৃষ্টি করে না, তাহাদিগকে ব‍্যক্তিগত জীবনের নির্জন কোণ হইতে টানিয়া আনিয়া দেশ-প্রতিনিধিত্বের রাজসিংহাসনে বসায় ও তাহাদের প্রকৃতিগত দস‍্যুবৃত্তিকে অবাধ ছাড়-পত্র দেয়। স্বদেশি আন্দোলনের সহিত সন্দীপের সম্পর্ক এই অনুকূল প্রতিবেশ-রচনামূলক, তাহা জন্ম-সম্পর্ক নহে।
     কিন্তু এই অসামাজিক দস‍্যুবৃত্তি ছাড়া আরও এক প্রকারের দস‍্যুবৃত্তি আছে, যাহা সমাজ- অনুমোদিত বা যাহার উপর সমস্ত সামাজিক অধিকারই প্রতিষ্ঠিত। ভাবিয়া দেখিতে গেলে সমস্ত সমাজ-দত্ত অধিকার বা স্বত্বাধিকারপ্রথার মূলেই আছে এই সমাজ-সমর্থিত জোর। বিশেষত স্বামী-স্ত্রীর সম্বন্ধের মধ‍্যে একটা বিশেষ রকম জটিলতা বা প্রচ্ছন্ন জবরদস্তি আছে। স্ত্রীর উপর স্বামীর যে অধিকার তাহা প্রতিদ্বন্দ্বিহীনতার জন‍্যই অসীম ও সর্বব‍্যাপী; স্বামীর প্রতি স্ত্রীর ভক্তি মূলত বন্দির নিরুপায় বশ‍্যতা-স্বীকার। অথচ এই একাধিপত‍্যমূলক স্বাধীনইচ্ছাবর্জিত সম্বন্ধ লইয়া আদর্শবাদের কতই না স্তব-স্তুতি রচিত হইয়াছে! নিখিলেশ এই আদর্শবাদের মধ‍্যে মিথ‍্যাবাদকে সবলে অস্বীকার করিতে চাহিয়াছে। অন্তঃপুরের সুরক্ষিত দুর্গের মধ‍্যে সে বিমলাকে পাইয়াছে, কিন্তু এ পাওয়াতে সে সন্তুষ্ট নয়। স্বয়ংবর-সভা ব‍্যতীত গলদেশে বরমাল‍্যলাভ ঘটে না; সমাজের দোকানে ফরমাইশ দিলে যাহা পাওয়া যায়, তাহা স্বর্ণশৃঙ্খল মাত্র, প্রকৃত প্রেমিকের তাহাতে মন উঠে না। বহির্জগতের অবাধ প্রতিদ্বন্দ্বিতা-ক্ষেত্রে যাহা লাভ করা যায়, তাহাই স্থায়ী সম্পদ, তাহাই অক্ষয় প্রেমস্বর্গ-রচনার উপাদান। সমাজ-দত্ত উপহারকে যুদ্ধজয়ের পুরস্কার-রূপে পুনর্লাভ করিলে তবেই তাহাতে প্রকৃত স্বত্বের দাবি করা যায়। নিখিলেশ বরাবরই বিমলাকে এই স্বাধীন নির্বাচনের সুযোগ দিতে চাহিয়াছে; কিন্তু বিমলা নিষ্প্রয়োজনবোধে সে সুযোগ বরাবরই অস্বীকার করিয়াছে। তারপর একদিন হঠাৎ স্বদেশ-প্রীতির কূলপ্লাবী স্রোত তাহাকে গৃহাঙ্গন হইতে ভাসাইয়া লইয়া গিয়া সন্দীপের রাজসিংহাসনতলে ফেলিয়াছে। এই উন্মাত্ত আবেগের মোহে সে সন্দীপকে ব‍্যক্তি-হিসাবে বিচার করে নাই--দেশমাতৃকার শ্রেষ্ঠ সন্তানের চরণে ভক্তি-পূত অর্ঘ‍্যস্বরূপ আপনাকে সমর্পণ করিতে উদ‍্যত হইয়াছে। সুতরাং এখানেও প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন নির্বাচন আমল পায় নাই। নিখিলেশের ক্ষেত্রে যেমন জড় অভ‍্যাস, সেইরূপ সন্দীপের ক্ষেত্রে মত্ত আবেগ বিমলার বিচার-বুদ্ধিকে অন্ধ করিয়াছে-- দেশানুরাগের অসংবরণীয় উত্তেজনা প্রেমের ছদ্মবেশধারণের দ্বারা তাহাকে প্রতারিত করিয়াছে। বাহিরের অগ্নিপরীক্ষায় তাহাদের প্রেম আরও একান্ত ও নিবিড়

হইয়াছে কি না, তাহার কোনো প্রমাণ নাই, তবে ইহার উত্তাপে তাহাদের সম্পর্কে যতটুকু অসার ভাবপ্রবণতার প্রলেপ ছিল, তাহা গলিয়া গিয়া তাহার মধ‍্যে জোড়াতালিগুলি বাহির হইয়া পড়িয়াছে। ইহার ফলে বিমলা ও নিখিলেশ আপন আপন ত্রুটি ও অপূর্ণতার বিষয়ে সচেতন হইয়াছে। বিমলা স্বীকার করিয়াছে যে, অতিরিক্ত পাওয়া ও কিছু না-দেওয়াই তাহার প্রণয়-জীবনের কেন্দ্রস্থ দুর্বলতা। অপরিমিত প্রাপ্তি কৃপণেরও মনে একটা মিথ‍্যা প্রতিদানেচ্ছা জাগাইয়া ত‍ুলে এবং এই অপ্রকৃত মনোভাবের বশে সেও নিজেকে স্বভাব-দাতা বলিয়া ভ্রম করে। অপর পক্ষ হইতে অজস্র দান পাইলেও নিজের প্রতিদানের বিশেষ কিছু দিবার না থাকিলে, প্রেম রক্তহীন ও দুর্বল হইয়া পড়ে ও বাহিরের অভিভব-প্রতিরোধের ক্ষমতা হারায়। নিখিলেশের স্বীকারোক্তি এই মর্মে যে, সে নিজের নৈতিক আদর্শের উচ্চতার মাপে বিমলাকে অস্বাভাবিকরূপে খাড়া করিতে চাহিয়াছে, তাহার স্বভাবিক প্রকৃতিকে বিকাশের অবসর দেয় নাই। আদর্শবাদীদের স্বাভাবিক দণ্ড এই যে, তাহারা তাহাদের চতুর্দিকে ভণ্ডামির সৃষ্টি করে। নিখিলেশের সমস্ত উদার নিরপেক্ষতা ও শাসনহীন প্রশ্রয়দানের মধ‍্যে একটা নৈতিকতার অত‍্যাচার কোথাও প্রচ্ছন্ন ছিল; বিমলার প্রতি তাহার সমস্ত ক্ষমতাশীল প্রণয়াবেগের মধ‍্যে কোথাও একটা হিমশীতল নিষেধাজ্ঞা উহার অদৃশ‍্য অঙ্গুলি তুলিয়াছিল। ইহারই ফলে বিমলার প্রকৃতিটি নিজের অজ্ঞাতসারেই সংকুচিত হইয়াছিল। প্রেমের অম্লান সূর্যকিরণে সে পূর্ণবিকশিত হইয়া উঠিতে পারে নাই, নিজের প্রকৃতিবিরুদ্ধ আদর্শবাদের উত্তর বায়ু তাহার অন্তঃকরণের চারিদিকে একটা সংকোচের অবগুণ্ঠন টানিয়া দিতে তাহাকে বাধ‍্য করিয়াছিল। নিখিলেশ ভবিষ‍্যতের জন‍্য প্রতিজ্ঞা করিয়াছে যে, তাহার প্রণয়ে নৈতিক তর্জনের ছায়ামাত্রও থাকিবে না, নিজের আদর্শে স্ত্রীকে গড়িয়া তোলার যে স্বাভাবিক ইচ্ছা প্রত‍্যেক স্বামীরই আছে, তাহাও সে বিসর্জন দিবে। প্রণয়ের ফুলশরকে সে গুরুমহাশয়ের বেত্রের ক্ষীণতম সাদৃশ‍্য লাভ করিতে দিবে না--এই সর্বপ্রকার ভেজালবর্জিত, বিশুদ্ধ প্রেমের বসন্ত-বায়ুহিল্লোলেই তাহাদের জীবন নব নব সৌন্দর্যে ও সার্থকতায় ভরিয়া উঠিবে।
     কিন্তু এই অগ্নিপরীক্ষার প্রকৃত যাচাই করার শক্তি কতখানি, তাহা আমাদের বিচার করিতে হইবে। এই বাহিরের দ্বারা গৃহের আক্রমণ অকস্মাৎ-বর্ষণস্ফীত পার্বত‍্য স্রোত‍ের মতোই ক্ষণস্থায়ী ও সাময়িক। সন্দীপের বাহিরে রাজবেশের অন্তরালে খড়-মাটি-রাংতার শুষ্ক কঙ্কাল যদি বাহির হইয়া না পড়িত, দেশপ্রীতির আবরণে তাহার নির্লজ্জ ভোগলোলুপতার বীভৎসতা উদঘাটিত না হইত, যদি সে নিখিলেশের যোগ‍্য প্রতিদ্বন্দ্বী-পদবাচ‍্য হইতে পারিত, তবে এই--অগ্নিপরীক্ষার কী ফল হইত, বলা যায় না। অবৈধ প্রেমকে হীন বর্ণে চিত্রিত করিয়া বৈধ প্রেমের উৎকর্ষ প্রমাণ করা সহজ; মানদণ্ড নিরপেক্ষভাবে ধরিলে বিচার এত সহজ হইত না। নিখিলেশ নিজে যাচিয়া এই পরীক্ষার প্রস্তাব করিয়াছে, কিন্তু পরীক্ষার আরম্ভমাত্রেই তাহার অন্তরের প্রেমিক-পুরুষ হতাশার দীর্ঘশ্বাস ফেলিতে আরম্ভ করিয়াছে। পরীক্ষাচক্র যত বেশি বার অবর্তিত হইয়াছে পিষ্ট-হৃদয়ের বেদনা ততই সত‍্যানুসন্ধিৎসাকে ছাপাইয়া আর্ত ব‍্যাকুলস্বরে হাহাকার-ধ্বনি তুলিয়াছে। প্রথম প্রথম সে বর্তমান হইতে প্রেমের পূর্বস্মৃতি-সমাকুল অতীতে আশ্রয় লইয়াছে; তারপর ধীরে ধীরে মোহভঙ্গজনিত মুক্তি প্রেমের স্থান অধিকার করিয়াছে। সে প্রেমের শূন‍্য সিংহাসনে কঠোর ব‍্যঞ্জনাহীন সত‍্যকে বারে বারে আহ্বান করিয়াছে; এই হতাশাপূর্ণ সংগ্রামে মাস্টার মহাশয় আসিয়া তাহার সহায় হইয়াছেন। কিন্তু এই সত‍্যের জয় theoretically বর্ণিত হইয়াছে মাত্র, ব‍্যবহারিক জীবনে তাহার ফলাফল প্রদর্শিত হয় নাই। একবার বিমলার ছলাকলাময় আবেদন সে প্রতিরোধ করিয়াছে। তাহার জীবনে সত‍্যের প্রতিষ্ঠার এই একমাত্র ব‍্যবহারিক পরিচয়। সর্বশেষে বিমলার নিঃসঙ্গ, দুর্বিষহ জীবনের প্রতি একটা বিরাট করুণা ও সহানুভূতি তাহার হৃদয় পূর্ণ করিয়াছে, কিন্তু ইহা প্রেমের নবরূপ কি না তাহা স্পষ্ট বোঝা যায় না। শেষ পর্যন্ত বিমলার সহিত তাহার সম্বন্ধ সহজ ও স্বাভাবিক হইয়াছে কি না, তাহা অনিশ্চয়তায় আবৃত আছে। তাহাদের কলিকাতা-যাত্রাকে প্রেমের নব-জীবন-যাত্রার আরম্ভ বলিয়া ধরিয়া লইলেও, ইহার সূচনাতেই একটা প্রচণ্ড ও সাংঘাতিক বাধা আসিয়া পড়িয়াছে। নিখিলেশের গুরুতর আঘাত, বিমলা ও সন্দীপ উভয়ে মিলিয়া যে বিষবৃক্ষ রোপণ করিয়াছে তাহারই অবশ‍্যম্ভাবী ফল। মৃত‍্যু-বিবর্ণতার সম্মুখে প্রেমের দীপ্ত অরুণরাগ যে কীরূপ উজ্জ্বল বর্ণে ফুটিয়া উঠিয়াছে, উপন‍্যাস-মধ‍্যে তাহার কোনো বর্ণনা নাই।
     বিমলার দিক দিয়াও পরীক্ষার ফল যে বিশেষ সন্তোষজনক হইয়াছে তাহা বলা যায় না। বিমলার উক্তিসমূহ আত্মগ্লানি ও অনুতাপের সুরে পরিপূর্ণ--কিন্তু প্রেমের একনিষ্ঠ আদর্শচ‍্যুতিই যে ইহার কারণ, সেই সম্বন্ধে আমরা নিঃসন্দেহ নহি। ইহার মধ‍্যে চুরি আসিয়া পড়িয়া ব‍্যাপারটির জটিলতা ঘনীভূত করিয়াছে। বিমলার অনুতাপ যেন মোহর-চুরির জন‍্যই বেশি, অন্তত এই মোহর-চুরিই তাহার অধঃপতনের মানদণ্ডস্বরূপ তাহাকে অধিকতর বিচলিত করিয়াছে। অমূল‍্যের প্রতি স্নেহ ও তাহাকে বিপদ-সাগরে ঝাঁপ দিবার জন‍্য প্রেরণও তাহার হৃদয়ের গভীর তলদেশকে আলোড়িত করিয়াছে ও তাহার অনুতাপের মধ‍্যে ইহাও একটি প্রধান সুর। পতিপ্রেম-রক্ষা অপেক্ষা পরিবারের মধ‍্যে নিজ সম্ভ্রম ও প্রাধান‍্যরক্ষা, বিশেষত মেজরানীর বক্রোক্তিপূর্ণ ইঙ্গিত হইতে নিজেকে অক্ষত রাখাই যেন তাহার প্রধান প্রার্থনীয় বিষয়। সন্দীপের মোহ তাহার ক্রমশ টুটিয়াছে সত‍্য, কিন্তু নিখিলেশের প্রেমের যথাযথ মূল‍্যও যে সে বুঝিয়াছে, তাহার কোনো প্রমাণ নাই। মোট কথা, উপন‍্যাস-বর্ণিত পরীক্ষার প্রেমের কষ্টি পাথর হিসাবে সেরূপ সার্থকতা নাই।
     উপন‍্যাসের মধ‍্যে সর্বাপেক্ষা প্রয়োজনীয় বিষয় হইতেছে সন্দীপ ও বিমলার পরস্পর আকর্ষণ। এই ব‍্যাপারটিই গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও তীক্ষ্ণ অনুভূতির সহিত বিশ্লেষিত হইয়াছে। সন্দীপের দেশ-সেবার জন‍্য সহযোগিতার অসংকোচ আহ্বান কীরূপে ক্রমশ ক্রমশ সুর চড়াইয়া ও রং মাখাইয়া প্রকাশ‍্য প্রণয়-নিবেদনের উঁচু পর্দায় গিয়া পৌঁছিল, বিমলার উপর তাহার প্রভাব কীরূপে প্রবল হইতে প্রবলতর হইয়া শেষে সম্মোহন-শক্তির পর্যায়ভুক্ত হইল, কীরূপে তাহার অন্তর্নিহিত লোলুপতা ও ভোগাসক্তি সমস্ত আদর্শবাদের সূক্ষ্ম আবরণ ভেদ করিয়া বীভৎসভাবে প্রকট হইয়া পড়িল, অমূল‍্যের উপর অধিকার লইয়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা-সূত্রে কীরূপে তাহার দুর্বলতা ঈর্ষার রন্ধপথ দিয়া প্রত‍্যক্ষগোচর হইল--তাহার প্রকৃতির এই সমস্ত বিকাশই খুব নিপুণভাবে চিত্রিত হইয়াছে। সন্দীপের চরিত্রে লেখক শেষ পর্যন্ত

একটা মহত্ত্ব ও গৌরবের সুর লুপ্ত হইতে দেন নাই--সে নিখিলেশের সম্মুখেই বিমলাকে প্রণয়িনীরূপে আহ্বান করিয়াছে, কোনো সংকোচ তাহার নির্ভিক স্পষ্টবাদিত্বের ও অরাজকতামূলক মনোবৃত্তির কণ্ঠরোধ করে নাই। বিমলার প্রেমকে স্থূল ও সূক্ষ্ম--এই উভয়ের মধ‍্যবর্তী একটা স্তরে সে অনুভব করিয়া হৃদয়ের চিরন্তন অধিকাররূপে গ্রহণ করিয়াছে। সে 'বন্দে মাতরম্' -এই উভয়ের মধ‍্যবর্তী একটা স্তরে সে অনুভব করিয়া হৃদয়ের চিরন্তন অধিকাররূপে গ্রহণ করিয়াছে। সে 'বন্দে মাতরম্'-এর পরিবর্তে 'বন্দে মোহিনীম্' মন্ত্র উচ্চারণ করিতে করিতে কতকটা মালিন‍্যগ্রস্ত জ‍্যোতির্মণ্ডলবেষ্টিত হইয়া আমাদের নিকট বিদায় গ্রহণ করিয়াছে।
     বিমলার মনোবিকারের চিত্রও খুব স্বাভাবিকভাবে বিবৃত হইয়াছে। স্বদেশি আন্দোলনের তীব্র উত্তেজনার মুখে নিখিলেশের নিষ্ক্রিয় নিরপেক্ষতা ও অবিচলিত নীতিজ্ঞানের সহিত সন্দীপের জ্বালাময় প্রচণ্ড আবেগ ও প্রবল ইচ্ছাশক্তির তুলনা করিয়া সে তাহার স্বামীর মনোভাবকে কাপুরুষচিত দুর্বলতা বলিতা ভ্রম করিয়াছে। তারপর ক্রমশ অজ্ঞাতসারে সে সন্দীপের দিকে আকৃষ্ট হইয়াছে। সন্দীপ নানাবিধ কৌশলে তাহার মোহাবেশ ঘনাইয়া তুলিয়াছে। একটা দেশব‍্যাপী স্বাধীনতা-আন্দোলনের নেত্রী যে ব‍্যক্তিগত জীবনের সংকীর্ণ নৈতিক মাপকাঠির অধীন নহে, তাহার বৃহৎ প্রয়োজনের সহিত মিলাইয়া তাহাকে আত্মনিয়ন্ত্রণের জন‍্য এক নূতন নৈতিক আদর্শ খাড়া করিতে হইবে, শাস্তের অনুশাসন ও স্বামিপ্রেম যে তাহার চূড়ান্ত লক্ষ‍্য হইতে পারে না---ইত‍্যাদিরূপ যুক্তি-তর্কের দ্বারা সে বিমলার উপর নিজ প্রভাব বদ্ধমূল করিয়া লইয়াছে। এই মাদকতার অবিরাম সেচনে বিমলার মনে একপ্রকার বিহ্বল অসাড়তার সৃষ্টি হইয়াছে--মানসিক ক্লোরোফর্মের মধ‍্যে নিখিলেশের সহিত তাহার প্রেম-সম্বন্ধ কখন ছিন্ন হইয়াছে, তাহা সে জানিতেও পারে নাই। অবশেষে এমন এক সময় আসিয়াছে যখন সে সন্দীপের উদ্দীপ্ত কামনার অনলে নিজেকে পতঙ্গবৎ আহুতি দিতে উন্মুখ হইয়াছে। কিন্তু ইতিমধ‍্যে সন্দীপেরও মনে হিতাহিত-জ্ঞানের বিষ প্রবেশ করিয়াছে, নিখিলেশের অনমনীয় আদর্শবাদকে যুক্তি-তর্কে ও লৌকিক ব‍্যবহারে সে খণ্ডন ও অস্বীকার করিয়াছে, কিন্তু ভিতরে ভিতরে তাহার অদৃশ‍্য প্রভাব তাহাকে আক্রমণ করিয়াছে। এই নবজাত ধর্মজ্ঞানের প্রভাবে তাহার প্রণয়াভিযান দ্বিধা-দুর্বল ও অনিশ্চয়তাগ্রস্ত হইয়াছে। সে বিমলাকে একেবারে চরম অধিকারের অন্তঃপুরে না আনিয়া ভাবাবেশ-লীলার অশোক-বনে, চরিতার্থতার মধ‍্যপথে রাখিয়া দিয়াছে। এই অবসরে মাহেন্দ্রক্ষণ চলিয়া গিয়াছে--অর্থের দাবি একটা বিসদৃশ ঝঞ্জনার সহিত প্রেমের মোহন ঐকতানে বেসুরা আনিয়া দিয়াছে। অর্থ চাওয়ার মধ‍্যে যে একটা আত্মবিসর্জন ও প্রেমের পরীক্ষার উচ্চ আদর্শ অন্তত প্রেমিকার কল্পনায় বিদ‍্যমান ছিল, পাওয়ার লুব্ধতা ও কাড়াকাড়ির অসংযমের মধ‍্যে তাহার সমস্তটাই কর্পূরের মতো কোথায় উধাও হইয়া গিয়াছে; শেষে সন্দীপের উদ‍্যত আলিঙ্গন তীব্র বিতৃষ্ণার সহিতই বিমলার নিকট প্রতিহত হইয়া ফিরিয়াছে---সর্বজয়ীর দ্বিধাহীন আত্মপ্রত‍্যয়ের মধ‍্যে পরাজয়ের অনুযোগপূর্ণ সুর ধ্বনিত হইয়াছে। বিমলা এইবার সন্দীপের ছদ্মবেশ ধরিয়া ও সবলে তাহার মোহাবেশ হইতে আপনাকে মুক্ত করিয়াছে। এই পুনরুদ্ধারের কার্যেই অমূল‍্যের বিশেষ প্রয়োজন হইয়াছে। যেমন খাঁটি টাকার সুরের সঙ্গে মেকির সুরের তুলনা করিয়াই আমরা উভয়ের প্রভেদ বুঝিতে পারি, সেইরূপ অমূল‍্যের প্রতি স্নিগ্ধ-শীতল, যুগ- যুগান্তর হইতে নিরাপদ প্রণালীতে প্রবহনশীল স্নেহধারাই সন্দীপের প্রতি জ্বর-বিকার-তপ্ত, অস্বাভাবিক, উন্মত্ত আকর্ষণের বিকৃতির দিকে বিমলার দৃষ্টি ফিরাইয়াছে। এক প্রকারের স্নেহ, কল‍্যাণবুদ্ধি ও চিরাগত ধর্মসংস্কারের সহিত মিলিত হইয়া, স্নেহাস্পদকে ধ্বংসের পথ হইতে ফিরাইয়াছে। অপরটি বিশ্ব-সংসারকে উপেক্ষা করিয়া, সর্ববিধ সংস্কার ও সংযম-বন্ধনকে সবলে বর্জন করিয়া এক আত্মঘাতী একাগ্রতার সহিত অনিবার্য বেগে রসাতলের দিকে ছুটিয়া চলিয়াছে। অমূল‍্যর মধ‍্যে পুরাতনের সুরটিই বিমলাকে নূতনত্বের মোহ হইতে উদ্ধার করিয়াছে এবং ভ্রাতৃস্নেহের সোপান বাহিয়াই সে পতিপ্রেমের মন্দিরে পুনারারোহণ করিতে সমর্থ হইয়াছে।
     উপন‍্যাসের চরিত্রগুলির মধ‍্যে মতবাদ-প্রাধান‍্য 'গোরা'র অপেক্ষাও প্রবলভাবে বর্তমান; সুতরাং মতবাদ-প্রাধান‍্যের জন‍্য 'গোরা'র বিরুদ্ধে যে সমালোচনা করা হয়, এখানে তাহা অধিকতর প্রযোজ‍্য। সন্দীপ, নিখিলেশ, মাস্টার মহাশয়--সকলেই এক-একটি বিশিষ্ট মতবাদের প্রতিনিধি ও সমর্থনকারী। সন্দীপের মতবাদের বিশ্লেষণ সন্দীপ-চরিত্র অপেক্ষা অধিকতর চিত্তাকর্ষক। তাহার নিজ জীবন-নীতির বিবৃতি তাহার ব‍্যবহারগত জীবনকে ছাপাইয়া উঠিয়াছে। নাখিলেশের সহিত তাহার সম্বন্ধ কখনও যুক্তি-তর্কের সীমারেখা ছাড়াইয়া উঠে নাই। বিমলার সহিত সম্বন্ধও যে তাহার হৃদয়কে গভীরভাবে ও চিরকালের জন‍্য স্পর্শ করিয়াছে, তাহারও কোনো প্রমাণ নাই। উপন‍্যাস-বর্ণিত ঘটনার ফলে তাহার চরিত্রে দুইটি মাত্র পরিবর্তন সংসাধিত হইয়াছে---১.   তাহার দ্বিধাসংকোচহীন জীবনে 'কিন্তু'র আবির্ভাব; ২. পরাজয়ের গ্লানির প্রথম অনুভব। কিন্তু এই সমস্ত পরিবর্তন তাহার মনের উপরিভাগের ব‍্যাপার বলিয়াই মনে হয়। বিদায়-মুহূর্ত পর্যন্ত সে মূলত অপরিবর্তিতই রহিয়া গিয়াছে--তাহার দীপ্তি কতকটা ম্লান হইয়াছে, তাহার গর্বিত আত্মপ্রত‍্যয় কতকটা মস্তক অবনত করিয়াছে। সংসারে এমন দুই-একটি বস্তু আছে যাহা সন্দীপেরও অপ্রাপনীয়, এই নবলব্ধ অভিজ্ঞতা কিয়ৎ পরিমাণে তাহাকে সংকুচিত করিয়াছে, কিন্তু তাহার অরাজকতামূলক জীবন-নীতির কোনোরূপ মৌলিক রূপান্তর সাধিত হয় নাই।
     নিখিলেশকেও ঠিক বিপরীত মতবাদের প্রতীক ব‍্যতীত স্বাধীন-ব‍্যক্তিত্বসম্পন্ন পুরুষ বলিয়া মনে করা দুরূহ। বিমলার উক্তির মধ‍্যে নিখিলেশের দাম্পত‍্য-জীবনের পূর্ব-ইতিহাসের কতক কতক আভাস পাওয়া যায়, কিন্তু উপন‍্যাসের মধ‍্যে তাহার কার্যকলাপ একেবারে আদর্শবাদের কাঁটার সঙ্গে সমতাল রাখিয়া নিয়মিত হইয়াছে। কোনো হঠাৎ-উচ্ছ্বসিত আবেগ, কোনো অচিন্তিত-পূর্ব প্রাণ-বেগ-স্পন্দন তাহাকে তাহার আদর্শবাদের বাঁধা রাস্তা হইতে একপদও বিচলিত করে নাই। বিমলাকে লইয়া যখন দেবাসুরের যুদ্ধ চলিয়াছে, তখনও সে এক মুহূর্তের জন‍্যও নিরপেক্ষ দ্রষ্টার অংশ ত‍্যাগ করে নাই, বিমলাকে আপনার দিকে টানিবার জন‍্য কোনো ব‍্যগ্র বাহু বিস্তার করে নাই। সমস্ত ব‍্যাপারটি যেন একটা রসায়নগারে পরিচালিত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা, ইহাতে যেন মানুষের চঞ্চল হৃদয়বৃত্তির কোনো সংযোগ নাই। অবশ‍্য তাহার নির্জন আত্মচিন্তার মধ‍্যে যথেষ্ট আবেগ সংক্রামিত হইয়াছে, কিন্তু ইহা নিভৃত চিন্তার গণ্ডি ছাড়াইয়া কোনো কর্ম-প্রচেষ্টার মধ‍্যে ঝাঁপাইয়া পড়ে নাই। তাহার আত্মপক্ষ সমর্থনের যে অংশ নিজমুখে প্রকাশ করা শোভন হয় না, সেই অপ্রকাশিত অংশের