Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা- ৯৪, ৯৫ ও ৯৬

2020-07-23
ফাঁক পূরণ করিবার জন‍্য মাস্টার মহাশয় চন্দ্রনাথবাবুর আবির্ভাব। তিনি যেন নিখিলেশের নীরব সত্তাকে ভাষা দিয়াছেন। বিমলার সহিত পুনর্মিলনের দৃশ‍্যেও যথেষ্ট রক্তধারা ও জীবনী-শক্তি সঞ্চারিত হয় নাই। মোট কথা নিখিলেশের অবিমিশ্র আদর্শবাদ তাহার ব‍্যক্তিত্বকে শীর্ণ ও ক্ষুণ্ণ করিয়াছে। অবশ‍্য লেখকের দিক হইতে বলা যাইতে পারে যে, ইহাই তাঁহার উদ্দেশ‍্য ছিল, নিখিলেশের চরিত্রে তিনি রক্ত-মাংসের আধিক‍্য ইচ্ছাপূর্বকই বর্জন করিয়াছিলেন। কিন্তু পাঠকের পক্ষে এই প্রকার কৈফিয়ত সন্তোষজনক নহে; কেননা উপন‍্যাসের পৃষ্ঠায় যদি কোনো আদর্শবাদের প্রবর্তন হয়, তবে তাহাকে অশরীরী ছায়ামূর্তি করিয়া রাখিলে চলিবে না; তাহাকে রক্তমাংসসমন্বিত, প্রাণবেগ-চঞ্চল করিয়া দেখাইতে হইবে। নিখিলেশের ক্ষেত্রে পাঠকের এই সম্পূর্ণ ন‍্যায়সংগত দাবি রক্ষিত হয় নাই
     গ্রন্থ-মধ‍্যে এক বিমলাই মতবাদের রিক্ততা অতিক্রম করিয়া প্রাণের পূর্ণ বিকাশ লাভ করিয়াছে। দুই বিরুদ্ধ মতবাদের বিপরীতমুখী আকর্ষণের মধ‍্যে পড়িয়া সে বিপর্যস্ত হইয়াছে, কিন্তু নিজে সে কোনও মতবাদের সহিত একাঙ্গীভূত হয় নাই। অবশ‍্য সন্দীপের মতবাদের প্রতি তাহার আকর্ষণ অধিক ছিল, কিন্তু ইহা স্ত্রীজাতির অস্থিমজ্জাগত বলপ্রয়োগের প্রতি স্বাভাবিক পক্ষপাত মাত্র। সন্দীপ ও নিখিলেশের তর্ক যুদ্ধ যেন 'বায়ু অস্ত্রের দ্বারা বায়ু-অস্ত্র ঠেকান'; কিন্তু এই আলোড়নের সমস্ত বেগ বিমলার সুখ-দুঃখ--চঞ্চল বক্ষের উপর প্রতিহত হইয়াছে। তাহা ছাড়া, বিমলাকে তাহার গৃহস্থালির সম্পূর্ণ প্রতিবেশের মধ‍্যে দেখানো হইয়াছে---সন্দীপ তো বাতাসে-উড়িয়া-আসা জীব ও নিখিলেশের সাংসারিক জীবন পদ্মপত্রের উপর জলবিন্দুর ন‍্যায় টলমল। পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, বিমলার প্রেম-জীবন অপেক্ষা সাংসারিক জীবনেরই উপর অধিক জোর দেওয়া হইয়াছে--স্বামীর প্রেম হারাইবার সম্ভাবনা অপেক্ষা সংসারের কর্ত্রী-পদ-চ‍্যুতি ও নিষ্কলঙ্ক সুনামে কলঙ্কস্পর্শের ভয়ই তাহার গুরুতর চিন্তার কারণ হইয়াছে। মোহর-চুরি ও অমূল‍্যকে বিপদের মুখে ঠেলিয়া পাঠানোর ব‍্যাপারেই তাহার অন্তর্দ্বন্দ্ব খুব তীব্র আবেগময় হইয়াছে। সর্বশুদ্ধ বিমলা তাহার আত্মাভিমান, তাহার প্রশংসালোলুপতা, তাহার আধিপত‍্যপ্রিয়তা, তাহার নারীসুলভ অস্থিরমতিত্ব ও চিত্তচাঞ্চল‍্য লইয়া সর্বাপেক্ষা সজীব চরিত্র হইয়া দাঁড়াইয়াছে।
     বিমলার চরিত্র আর একদিক দিয়াও লক্ষ‍্য করিবার বিষয়। গ্রন্থ-মধ‍্যে সে-ই লেখকের সহিত সর্বাপেক্ষা ঘনিষ্ঠভাবে একাঙ্গীভূত হইয়াছে। একমাত্র সে-ই লেখকের ভবিষ‍্যৎ-জ্ঞানের অধিকারিণী হইয়া শেষ ফলের আলোকে বর্তমান ঘটনা নিরীক্ষণ করিয়াছে। গ্রন্থারম্ভেই আত্মগ্লানির সুর তাহার মুখে ধ্বনিত হইয়াছে--গ্রন্থশেষে লব্ধ অভিজ্ঞতা গোড়া হইতেই তাহার উক্তিকে বিষাদভারাক্রান্ত ও মোহভঙ্গের হতাশ্বাসপূর্ণ করিয়া তুলিয়াছে। কিন্তু এই পূর্ব-জ্ঞানের মধ‍্যেও নিখিলেশের সঙ্গে তাহার সম্বন্ধ শেষ পর্যন্ত কীরূপ দাঁড়াইল, তাহার আভাস পাওয়া যায় না। ইহাতে অতীত ভ্রান্তির জন‍্য অনুতাপ-খেদ আছে, কিন্তু ভবিষ‍্যৎ পুনর্গঠনের কোনো ইঙ্গিত নাই। অন্তত নিখিলেশের সাংঘাতিক আঘাত ও মুমূর্ষু অবস্থা তাহার মনে যে কীরূপ বিপ্লব উপস্থিত করিল, সে সম্বন্ধেও কোনো আলোকপাতের চেষ্টা নাই। সুতরাং স্বভাবতই প্রশ্ন উঠিতে পারে যে, গ্রন্থারম্ভে বিমলার খেদোক্তি কতদূর পর্যন্ত ভবিষ‍্যৎ-জ্ঞানের উপর প্রতিষ্ঠিত---ইহাতে সামান‍্য রকমের অবিমৃশ‍্যকারিতার জন‍্য মৃদু অনুতাপের সুর আছে, স্বামীর রক্তাপ্লুত দেহদর্শনে আর্তদীর্ণ শিহরণ নাই। বিমলার চরিত্র-সংকল্পনে ইহা একটা প্রধান দোষ বলিয়া মনে হয়। অন‍্যান‍্য চরিত্রের মধ‍্যে এই ভবিষ‍্যৎ-জ্ঞান নাই, তাহাদের দৃষ্টি উপস্থিত বর্তমানেই সম্পূর্ণরূপে সীমাবদ্ধ। নিখিলেশ ও সন্দীপ উভয়েই বর্তমান ঘটনার আলোচনাকালে ভবিষ‍্যৎ পরিণতি-সম্বন্ধে সম্পুর্ণ অজ্ঞ রহিয়াছে। বিমলা যে গ্রন্থ-মধ‍্যে প্রধান চরিত্র, লেখকের সহিত একাঙ্গীভবনও তাহার আর একটা নিদর্শন।
     আর একটা অপ্রধান চরিত্রও অতর্কিতভাবে অত‍্যন্ত সজীব হইয়া উঠিয়াছে---সে মেজরানী। প্রথম প্রথম তাহার প্রবর্তন নিতান্ত গৌণ উদ্দেশ‍্য সাধনের জন‍্য বলিয়াই মনে হয়। বিমলার অপ্রত‍্যাশিত স্বামি-সৌভাগ‍্যের জন‍্য তাহার চতুর্দিকের প্রতিবেশে যে ঈর্ষা ফণা ধরিয়াছিল, সে যেন তাহার বিষোদিগরণের একটা যন্ত্রমাত্র। তা ছাড়া, তাহার দেবরের প্রতি স্নেহের মধ‍্যে অনুচিত লালসারও ইঙ্গিত যেন কিয়ৎ পরিমাণে মিশিয়া ছিল। ঈর্ষা বিমলার পদঙ্খলন-সম্ভাবনার প্রতি তাহার দৃষ্টিকে অসামান‍্যরূপে তীক্ষ্ণ করিয়াছিল--বিমলার সমস্ত হাবভাব-বিলাসকলার অন্তর্নিহিত গূঢ় অর্থটির সে যেন সহজ সংস্কার-বলেই মর্মভেদ করিতে পারিয়াছে কিন্তু হঠাৎ দেখা গেল যে, এই ঈর্ষামিশ্রিত লালসার পঙ্কিলতা ভেদ করিয়া বিমল স্নেহের মন্দাকিনীধারা প্রবাহিত হইয়াছে। বিমলার চিত্ত নিখিলেশের নিকট হইতে যতই সরিয়া গিয়াছে, মেজরানীর স্নেহধারা ততই শঙ্কা-ব‍্যাকুল সহানুভূতির সহিত তাহার দিকে অগ্রসর হইয়া আসিয়াছে; এবং শেষে এই পবিত্র স্নেহের মূল উৎসেরও সন্ধান পাওয়া গিয়াছে। বাল‍্যসাহচর্যের গভীর স্তরের মধ‍্যেই এই স্নেহের শিকড় বদ্ধমূল হইয়াছে। যৌবনের উন্মত্ত আবেগ বাল‍্যের শান্ত-মধুর সখ‍্যকে ক্ষণকালের জন‍্য অভিভূত করে বটে, কিন্তু যৌবনের আত্মঘাতী তীব্রতা ও প্রলয়ংকর ঝঞ্ঝাবাত ইহার মধ‍্যে নাই। নিখিলেশের সমস্ত জ্বালাময় ভাগ‍্য-বিপর্যয়ের মধ‍্যে মেজরানীর স্নেহ স্থিররশ্মি দীপশিখারই মতো একটি স্নিগ্ধ, অনিবার্য আলোক-রেখা বিকীর্ণ করিতেছে।
     উপন‍্যাসটির ভাষা ও বিষয়ালোচনা-সন্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের শেষ বয়সের উপন‍্যাসসমূহের যে সাধারণ সমালোচনা করা হইয়াছে, তাহা সম্পূর্ণভাবেই প্রযোজ‍্য। গ্রন্থ-মধ‍্যে এমন প্রচুর উক্তি আছে যাহার মধ‍্যে epigram-এর উচ্চতম উৎকর্ষ বর্তমান এবং যাহা। এই গুণের জন‍্য বঙ্গসাহিত‍্যের সুভাষিত-সংগ্রহের মধ‍্যে চিরস্থায়ী স্থান লাভ করা করিতে পারে। কতকগুলি মাত্র উদাহরণ যদৃচ্ছাক্রমে উদ্ধৃত হইল। ['এমন মানী সংসারের তরীটাকে একটিমাত্র স্ত্রীর আঁচলের পাল তুলে দিয়ে চালানো' (পৃ.  ৪৪); 'মেয়েদেরি বিস্তর অলংকার সাজে এবং বিস্তর মিথ‍্যাও মানায়' (পৃ.  ৮৭); 'যেন সৌর-জগৎকে গলিয়ে জামাই-এর জন‍্য ঘড়ির চেন ক'রবার ফরমাস'(পৃ. ৯৩); 'তোমাকে সাধু কথার ভিজে গামছা জড়িয়ে ঠণ্ডা রাখবে আর কত দিন?'(পৃ. ১৫৬); 'ঘরের প্রদীপকেঘরের আগুন করে তুলেছি' (পৃ.  ১৬৩); 'তারা আপনার হীনতার বেড়া দ্বারাই সুরক্ষিত, যেমন পুকুরের জল আপনার পাড়ির বাঁধনেই টিকে থাকে'(পৃ. ২২৫); 'চাঁদ সদাগরের মত ও অবাস্তবের শিব-মন্ত্র নিয়েছে, বাস্তবের সাপের দংশনকে ও মরেও মানতে চায় না।']

     অন‍্যান‍্য উপন‍্যাস-সম্বন্ধে যাহা হউক, বর্তমান উপন‍্যাসে এইরূপ epigram-সূচাগ্র ভাষা ও দ্রুতসঞ্চারী আখ‍‍্যান-প্রণালীর সর্বাপেক্ষা অধিক উপযোগিতা আছে। এই উপন‍্যাসে বিরুদ্ধ মতবাদের সংঘর্ষ এতই তীব্র ও আপস-নিষ্পত্তির অতীত যে, তাহা epigram-এর তীক্ষ্ণ দংশনেই উপযুক্ত প্রকাশ লাভ করে। মধূসূদন-কুমুদিনীর গৃহ-বিবাদ-বর্ণনাতে এরূপ ধারালো অস্ত্রপ্রয়োগ অপ্রাসঙ্গিক বলিয়া মনে হইতে পারে ; কিন্তু সন্দীপ ও নিখিলেশের মধ‍্যে যুদ্ধে এইরূপ অস্ত্রের উপযোগিতা অবিসংবাদিত। রাজনৈতিক যুদ্ধে ভাবগভীরতার অভাব অস্ত্রক্ষেপ নিপুণতার দ্বারা পৃর্ণ করিতে হয়; পারিবারিক বিবাদে সামান‍্য সূচিভেদেই গভীর হৃদয়-ক্ষত হয় বলিয়া তীক্ষ্ণাস্ত্র প্রয়োগ অনেকটা আখ‍্যায়িকার দ্রুত গতিও এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিষয়োপযোগী হইয়াছে। উপন‍্যাস-বর্ণিত সমস্ত ঘটনাই এমন দ্রুততালে ছুটিয়া চলিয়াছে, প্রলয়-সূচনার কম্পন সকলকেই এরূপ প্রচণ্ডভাবে নাড়া দিয়াছে, উন্মত্ত ভাবাবেগ সকলেরই সহজ-গতিকে এত প্রবলভাবে বর্ধিত করিয়াছে যে, এই দ্রুতধাবনশীল বর্ণনাভঙ্গিই এ ক্ষেত্রে উপযোগিতার দিক দিয়া প্রায় অপরিহার্য হইয়াছে। ঘটনাপুঞ্জের সবেগ অগ্রগতি যেন ত‍ৎ-সংশ্লিষ্ট মানুষগুলিকে অনিবার্য বেগে তাহাদের স্রোতপ্রবাহে ভাসাইয়া লইয়া গিয়াছে। 'শেষের কবিতা' বা 'যোগাযোগ'-এ কবিত্বপূর্ণ অনুভূতি ও ভাবগভীরতা-সমন্বিত বিশ্লেষণ আরও অধিক পরিমাণে আছে, সে বিষয়ে সন্দেহ নাই; সে দিক দিয়া 'ঘরে বাইরে' উহাদের সহিত সমকক্ষতার স্পর্ধা করিতে পারে না। নিখিলেশের পূর্বস্মৃতি-রোমন্থন বা বিমলার আত্মগ্লানি সময়ে সময়ে কবিত্বের উন্নত শিখর স্পর্শ করিয়াছে, কিন্তু মোটের উপর 'ঘরে বাইরে' খুব কবিত্ব-গুণ-সমৃদ্ধ নয়। কিন্তু কলাগত ঐক‍্য ও ভাবগত সুসংগতিতে--এক কথায় সাধারণ সমন্বয়-নৈপুণ‍্যে (general unity of atnisphere) ইহাদের স্থান খুব উচ্চে।
( ৭ )

'শেষের কবিতা' সহিত তুলনায় 'যোগাযোগ'-এ (১৯২৯) ভাবগত ও গঠনগত ঐক‍্য অপেক্ষাকৃত কম। ইহাতে বুদ্ধির তীক্ষ্ণ ঔজ্জ্বল‍্যের সহিত কবিত্বপূর্ণ ভাবগভীরতার সমন্বয় সর্বাঙ্গসুন্দর হয় নাই। বিশেষত, ইহার গঠনে অনেক আলগা তন্তু আছে। ইহার আরম্ভ ও শেষ উভয়ের মধ‍্যেই একটা অতর্কিত আকস্মিকতা লক্ষিত হয়। গ্রন্থের প্রথম ও দ্বিতীয় অধ‍্যায় মধূসূদনের বংশপরিচয় ও পূর্ব-ইতিহাস লইয়াই ব‍্যাপৃত; তৃতীয় হইতে নবম অধ‍্যায় পর্যন্ত কুমুদিনীর পৈতৃক ইতিহাস বর্ণিত হইয়াছে। অবশ‍্য মধূসূদন-কুমুদিনীর পরস্পর সম্পর্কের বিশেষত্বটুকু বুঝিবার জন‍্য কতকটা অতীত-আলোচনা অবশ‍্য-প্রয়োজনীয়। কিন্তু গ্রন্থের কলেবরের সহিত তুলনায় উপক্রমণিকা যেন একটু অযথা দীর্ঘ বলিয়া মনে হয়। বিশেষত কুমুদিনীর দিক দিয়া যখন কোনো পালটা আক্রমণের চেষ্টা নাই, তখন তাহার পূর্ব-ইতিহাস অতটা বিস্তৃত না হইলেও চলিত। কুমুদিনীর প্রথম অবস্থায় স্বামীর প্রতি একান্ত নির্ভরশীল আত্মসমর্পণ কতকটা তাহার মাতা-পিতার গূঢ়-অভিমান-ব‍্যথিত tragic সম্বন্ধের প্রতিক্রিয়া হইতে উদ্ভূত, সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। কিন্তু তথাপি উচ্চবংশীয় হিন্দু-পরিবারে এই প্রকারের মধুর, আত্মবিসর্জনশীল দাম্পত‍্য-সম্পর্ক এতই সাধারণ ও স্বাভাবিক যে, তাহার কোনো বিশেষ ব‍্যাখ‍্যার প্রয়োজন আছে বলিয়া মনে হয় না। এই প্রাথমিক অধ‍্যায় কয়টির ভাষা ও বর্ণনাভঙ্গিও ঠিক উপন‍্যাসের উপযোগী নহে--ইহাদের হ্রস্ব সংক্ষিপ্ততা ও তীক্ষ্ণ, ঝাঁজালো ব‍্যঙ্গপ্রবণতা যেন পূর্ব-পরিচিত বিষয়ের সারাংশ-সংকলনের লক্ষণাক্রান্ত। মুকুন্দলালের মৃত‍্যুদৃশ‍্যেও করুণরস অপেক্ষা বুদ্ধিগত আলোচনারই প্রাধান‍্য; লেখক যেন একটা বিশেষ উদ্দেশ‍্য লইয়াই ইহার অবতারণা করিয়াছেন, ইহার অন্তর্নিহিত করুণরসটি মোটেই তাঁহাকে অভিভূত করে নাই। Epigram-এর তীক্ষ্ণাগ্রভাগে যেটুকু অশ্রুবিন্দু উঠে, তাহা মোটেই পাঠকের হৃদয় দ্রব করিবার পক্ষে পর্যাপ্ত নহে।
     গ্রন্থের শেষদিকে এই অসংলগ্ন অতর্কিততা আরও প্রবলভাবে পরিস্ফূট। কুমুদিনীর স্বামিগৃহে প্রত‍্যাবর্তনের পরে স্বামীর সহিত তাহার সম্পর্ক কীরূপ দাঁড়াইল তাহার কোনো আভাসমাত্র পাওয়া যায় না। পুত্র-সম্ভাবনা তাহার সমস্ত সমস‍্যার চূড়ান্ত সমাধান বলিয়াই মানিয়া লইতে হইয়াছে। তাহাদের দাম্পত‍্য-বিরোধের অসাধারণ কৌতূহলোদ্দীপক ইতিহাসটি অকস্মাৎ এক বিরাট শূন‍্যত‍্যার গহ্বরমূলে আসিয়া থামিয়া গিয়াছে। সাধারণ দম্পতির ক্ষেত্রে সন্তানের জন্ম স্বামী-স্ত্রীর মধ‍্যে সংযোগ-সেতুর কাজ করিয়া থাকে; কিন্তু কুমুদিনি-মধূসূদনের মধ‍্যে যে প্রবল ও মূলীভূত অনৈক‍্য সৃষ্ট হইয়াছে তাহা এই অতি সহজ ও সাধারণ উপায়ে পূরণ হইবার নহে। তদ্ব‍্যতীত কুমুদিনীর স্বামিগৃহ-ত‍্যাগের পরবর্তী অধ‍্যায়গুলি কেবল স্ত্রী-জাতির অধিকার ও স্ত্রী-স্বাধীনতায় পুরুষের হস্তক্ষেপের সীমা-বিচার লইয়া তর্ক-যুক্তি ও বাগবিতণ্ডায় পরিপূর্ণ--উহা কেবল উদ্দেশ‍্যমূলক বক্তৃতা ছাড়া আর কিছুই নহে। যে বিরোধ-কাহিনী মানুষের হৃদয়ের মধ‍্যে শেষ হইয়াছে তাহাই সংস্কারকের বক্তৃতা-মঞ্চে অনর্থক পল্লবিত হইয়াছে, কিন্তু তাহাতে উপন‍্যাসের রস মোটেই সমৃদ্ধতর হইয়া উঠে নাই। উপন‍্যাসের দিক হইতে কুমুদিনীর স্বামিগৃহ-ত‍্যাগের সঙ্গে সঙ্গে যবনিকাপাত হইলে উহার গঠন-সৌষ্ঠব ও সমন্বয়-কৌশল আরও উন্নততর হইত।
     কিন্তু এই সমস্ত ত্রুটি-দুর্বলতা বাদ দিলে, চরিত্র-বিশ্লেষণের দিক দিয়া মধুসূদন-কুমুদিনীর চরিত্র-বৈপরীত‍্য ও তাহাদের প্রবল অন্তর্দ্বন্দ্বের বর্ণনা খুব উচ্চাঙ্গের হইয়াছে। ভাগ‍্যদেবতা যাহাদিগকে বিবাহের অচ্ছেদ‍্য বন্ধনে বাঁধিয়াছেন, তাহারা যেন দুই স্বতন্ত্র রাজ‍্যের জীব, তাহাদের মনোবৃত্তির মধ‍্যে কোথাও যেন একটা মিলন-ক্ষেত্র নাই। মধূসূদন যান্ত্রিক ব‍্যবসায়-সাফল‍্য-জগতের অধিবাসী; প্রতিবাদহীন, উদ্ধত আধিপত‍্য ও অবাধ প্রভুত্ব-বিস্তার তাহার জীবনের কাম‍্যতম প্রবৃত্তি; সে কুমুদিনীকে চাহিয়াছে প্রণয়িনীরূপে নহে, তাহার লাঞ্ছিত বংশগৌরবের সাহংকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন‍্য, তাহার সর্বগ্রাসী দাম্ভিকতার পূর্ণতম পরিতৃপ্তি হিসাবে। সে কুমুদিনীকে তাহার স্নেহ-সুশীতল পিতৃগৃহ হইতে ছিনাইয়া লইয়াছে তাহার উদ্ধত, আকাশস্পর্শী বিজয় মুকুট পরিবার জন‍্য, তাহার চিরপোষিত ক্রূরতম

প্রতিহিংসা-প্রবৃত্তির চরিতার্থতার জন‍্য-কুমুদিনীকে লইয়া তাহার হৃদয়বৃত্তির কোনো কারবার নাই। আর কুমুদিনী মধূসূদনকে চাহিয়াছে সম্পূর্ণ বিভিন্ন মনোবৃত্তি লইয়া--দৈবসংকেত তাহার স্বাভাবিক মধুর আত্মসমর্পণ-প্রবৃত্তিকে আরও ঘনীভূত করিয়াছে। ফুল যেমন তাহার বিকাশোন্মুখ সমগ্র হৃদয় লইয়া বসন্ত পবনের প্রতীক্ষা করে, বাঁশি যেমন করিয়া তাহার সমস্ত রন্ধ্রপথে ব‍্যাকুল আবেগ সঞ্চারিত করিয়া বাদকের ওষ্ঠস্পর্শের জন‍্য উন্মুখ হইয়া থাকে, সেইরূপ কুমুদিনী তাহার হৃদয়ের পবিত্রতম, মধুরতম অর্ঘ‍্য নিবেদন করিয়া আদর্শ দায়িতের জন‍্য প্রস্তুত হইয়াছিল। যখন ডাক আসিল, তখন সে কোনো বিচার-বিতর্ক না করিয়া, ফলাফল-নিরপেক্ষ হইয়া, তাহার সমস্ত ভক্তিপূর্ণ বিশ্বাসপ্রবণতার সহিত সে ডাকে ছুটিয়া বাহির হইল; সমস্ত দুর্লক্ষণ, অশুভ সংশয়, ভ্রাতার স্নেহপূর্ণ সতর্কবাণী, বহিজগতের সন্দিগ্ধ নিষেধ--সে সবলে প্রত‍্যাখ‍্যান করিয়া তাহার বিধিনির্দিষ্ট পথে যাত্রা করিবার জন‍্য পা বাড়াইল। বহির্জগতের মতো অন্তর্জগতের সংঘর্ষের যদি কোনো বাহ‍্য লক্ষণ থাকিত, তাহা হইলে মধূসূদন-কুমুদিনীর মিলন-মুহূর্তে ধূমকেতু-পুচ্ছপৃষ্ঠ বিলাতি ব‍্যান্ডের বাজনা, গোরানাচ ও প্রচ্ছন্ন শ্লেষপরিপূর্ণ শিষ্টাাচার-বিনিময় ছাড়া এই অন্তর্বিপ্লবের আর কোনো বাহিরের লক্ষণ প্রকাশ পাইল না। কুমুদিনীর পক্ষ হইতে এক আশঙ্কাজড়িত প্রতীক্ষা ও অন্তর্গূঢ় ভাববিপর্যয় নীরবে স্তব্ধ হইয়া রহিল।
     বিবাহের পর হইতেই এই দুই সম্পূর্ণ বিপরীত-প্রকৃতি মানবাত্মার মধ‍্যে এক প্রবল দ্বন্দ্ব বাধিয়া গেল। এই দ্বন্দ্ব-যুদ্ধে আক্রমণের ঝড়ো হাওয়ার সমস্তটা বহিয়াছে মধুসূদনের দিক হইতে। কুমুর দিকে প্রথম প্রাণপণ সহিষ্ণুতা, আদর্শের সহিত বাস্তবকে মিলাইবার করুণ, একাগ্র চেষ্টা ও এই চেষ্টা ব‍্যর্থ হইবার পর একটা মোহভঙ্গজনিত আত্মগ্লানি, নীরব বিমুখতা ও দৃঢ় অথচ সংস্কার-কুণ্ঠিত প্রত‍্যাখ‍্যান। এই প্রাণপণ সংগ্রামে উত্থান-পতন ও জয়-পরাজয়ের স্তর ও পরিবর্তনের চরম মুহূর্তগুলি অতি নিপুণভাবে বিশ্লেষিত হইয়াছে।
     পূর্বেই বলা হইয়াছে মধুূসূদনের বিবাহে প্রেমের নাম-গন্ধও ছিল না--ইহা কেবল বংশাভিমানের ও উৎপীড়নপ্রিয়তার নির্মম অভিব‍্যক্তি। এই মিলনে কোমল পুষ্পধনু অপেক্ষা ইস্পাতের অসিরই অধিক ব‍্যবহার হইয়াছিল। তাহার শ্বশুরবংশের যৎপরোনাস্তি অপমানের পর মধুসূদন যখন কুমুকে বিবাহের গাঁট-ছড়ায় বাঁধিয়া যাত্রা করিল, তখন এই বন্ধন যে প্রকৃতপক্ষে বন্দির লৌহশৃঙ্খল সে বিষয়ে সে কোনো মৌখিক শিষ্টাচারের ছলনাও রাখে নাই; তাহার যুদ্ধের বদ্ধমুষ্টি কোনোরূপ গোপনতার রেশমি দস্তানায় আবৃত হয় নাই। নূরনগরের সমস্ত কোমল, স্নেহমণ্ডিত স্মৃতিকে নির্দয় পেষণে পীড়িত করায় তাহার ক্রূরতম আনন্দ। সুতরাং তাহার প্রথম আক্রোশ পড়িয়াছে বিপ্রদাসের স্নেহোপহার নীলা আংটির উপর। কুমুদিনীর অনভ‍্যস্ত অপমান-ব‍্যথার মূর্ছাকে সে তীব্র ব‍্যঙ্গের সহিত উপহাস করিয়াছে; অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব‍্যাপারেও সে কুমুর স্বাধীন ইচ্ছাকে পদে পদে আহত ও অপমানিত করিয়াছে। হাবলুকে একটা সামান‍্য কাচের কাগজ-চাপা দিবারও যে তাহার অধিকার নাই, ইহা তাহাকে তীব্র অপমান-জ্বালার সহিত অনুভব করাইয়াছে; তাহার দাদার চিঠিপত্র ও আংটি চুরি করিয়াছে; স্বামী-স্ত্রীর সম্বন্ধের সমস্ত মাধুর্য ও সহজ পীতিটুকু সে কাণ্ডজ্ঞানহীন অমিতব‍্যয়িতার সহিত নিঃশেষ করিয়াছে। এই রূঢ় আঘাতে কুমুদিনীর মানস আদর্শ ভাঙিয়া খান খান হইয়াছে; তাহার সমস্ত শিক্ষাসংস্কার, আত্মদমন-ক্ষমতা লইয়াও সে এই মূঢ় পাশবিকতাকে স্বামীর ন‍্যায়সংগত অধিকার বলিয়া মিনিয়া লইতে পারে নাই। আঘাতের কোনো প্রতিঘাতচেষ্টা না করিয়া সে নীরব অসহযোগের অস্ত্র অবলম্বন করিয়াছে--শয‍্যাগৃহ ছাড়িয়া নীচে বাতিঘরে আপনাকে রুদ্ধ করিয়াছে। এ দিকে ভিতরে ভিতরে মধুসূদনের অন্তরেও একটা পরিবর্তন চলিতেছিল; তাহার দাম্ভিক অত‍্যাচারপ্রিয়তার তপ্তবালুকার মধ‍্যে একটা অর্ধপরিণত প্রেম ও প্রশংসার অনিবার্য উচ্ছ্বাস অন্তঃসলিলা ফল্গুর মতো বহিতে আরম্ভ করিয়াছে। কুমুর রূপ, তাহার আত্মবিস্মৃত, ধ‍্যানবিমুগ্ধ ভাব, তাহার সংসারানভিজ্ঞ সরলতা মধুসূদনকে রহিয়া রহিয়া এক অভিনব অনুভূতির স্পর্শে আবেশময় করিয়া তুলিতেছিল; ব‍্যবসায়-ক্ষেত্রের লৌহ-দণ্ড, অফিসের অক্ষুণ্ন কতৃত্বাভিমান যে এই নূতন রাজ‍্যে প্রযোজ‍্য নয়, এইরূপ একটা সম্ভাবনা তাহার বিস্ময়বিমূঢ়, সংকীর্ণ চিত্তে ভাসিয়া উঠিতেছিল। তাহার আদেশের চড়া সুরে একটু অনুনয়ের কোমল আভাস মিশিল। সে কুমুর নিকট তাহার পর্বোন্নত শিব একটু নত করিল---তাহার দাদার টেলিগ্রাম ফিরাইয়া দিল; নবীন ও মোতির মার নিকটে সে এই সর্বপ্রথম প্রকাশ‍্যভাবে নিজ ত্রুটি স্বীকার করিল। এইখানে দ্বন্দ্বের প্রথম স্তর শেষ হইল বলা যাইতে পারে।
     এই প্রকাশ‍্য ত্রুটি-স্বীকারের দ্বারা মধুসূদনের আকাশ অনেকটা পরিষ্কার হইয়া গেল; কিন্তু কুমুর কর্তব‍্য-সমস‍্যা আরও ঘনীভূত হইয়া উঠিল। মধুসূদনের যথোচ্ছারের মধ‍্যে যে বিমুখতা সহজ ও শোভন ছিল, তাহার নতি-স্বীকারের পর সেই বিমুখতা নৈতিক সমর্থন হারাইবার মতো হইল ও উহাকে কর্তব‍্যচ‍্যুতির সমপর্যায়ভুক্ত বলিয়া মনে হইতে লাগিল। মধুসূদন যাহাকে শান্তির শ্বেত-পতাকা বলিয়া তুলিয়া ধরিয়াছিল, কুমুদিনী তাহাকে অবাঞ্ছিতের নিকট আত্মসমর্পণের, হৃদয়গত ব‍্যভিচারের কলঙ্ক-কালিমালিপ্ত দেখিল। মধুসূদনের তর্জন-ভৎসনা অপেক্ষা তাহার কামনা-চঞ্চল, ব‍্যগ্র বাহুর আলিঙ্গন-বিস্তার তাহার নিকট আরও ভয়াবহ মনে হইল। অবশেষে একদিন মধুসূদনের লোলুপ নির্বন্ধাতিশয‍্যের নিকট সে আত্মসমর্পণ করিতে বাধ‍্য হইল, কিন্তু একটা ক্লেদাক্ত, অশুচি স্পর্শের স্মৃতি তাহার সতীত্বের মানস-আদর্শের গায়ে কাঁটার মতো বিঁধিয়া রহিল। এ দিকে অনিচ্ছার, অবহেলার দানে মধুসূদনের মনে একটা গভীর ক্ষোভ ও অতৃপ্তি জাগিয়া উঠিল--তাহার অস্থিমজ্জাগত প্রভুত্ব-জ্ঞান ইহাতে তাহার অভ‍্যস্ত, প্রত‍্যাশিত সম্মান পাইল না। সে কুমুর হৃদয় --অথবা হৃদয়লাভের সূক্ষ্ম অধিকারবোধ তাহার যদি নাও থাকে তবে--অন্তত তাহার দেহের অক্ষুণ্ন অসংকুচিত অধিকারলাভের জন‍্য অধীর হইয়া উঠিল। যেরূপ স্বতঃউৎসারিত একাগ্রতার সহিত কুমু হাবলুকে রুমাল দেয় বা তাহার নিকট এলাচদানার উপহার গ্রহণ করে, নির্লজ্জ ভিক্ষুকের ন‍্যায় মধুসূদন তাহার সহিত লেন-দেনের মধ‍্যেও সেই বেগবান আবেগের যাত্রা করিয়া ফিরিতে