Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা-১২, ১৩ ও ১৪ এবং ১৫

2020-05-24
এমন কি মুসলমান গোষ্ঠীরও রুচি-সমথ্ন হইতে বঞ্চিত হইয়াছে | একেবারে হাল আমলে আমরা এই সাহিত্যকে পুনরাবিষ্কার করিয়া ইহাদের কাব্যোৎকষ্র ও আবেদনের অভিনবত্ব, বিশেষত ইহাদের অকৃতাথ্ সম্ভাবনা সন্বন্ধে সচেতন হইয়া উঠিয়াছি |
     নাথ-সাহিত্যের আখ্যানভাগের সহিত জীবনের যে বাস্তব রূপ ঔপন্যাসিক উপাদানরূপে গৃহীত তাহার সন্বন্ধ বিশেষ লক্ষণীয় নহে | 'গোরক্ষবিজয়' ও ' গোপীচন্দ্রের গান' -এর ভাববস্তু অতি প্রাচীনকালের ---- বোধ হয় 'চযা্পদে'র অব্যবহিত পরেই এই দাশ্যনিক ধম্যমতের সূচনা | কিন্তু, যে-কোনো কারণেই হউক, অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতক পয্যন্ত ইহার কোনো লিখিত রূপ পাওয়া যায় না | গ্রিয়ারসন সাহেব রংপুর অঞ্চলের নিরক্ষর কৃষকের মুখ হইতে এই কাহিনী সংগ্রহ করিয়া প্রথম প্রকাশ করেন ও ঊনবিংশ শতকের শেষ পাদে এতৎবিষয়ক আরও কয়েকজন কবির রচনার উদ্ধার ও প্রকাশ হইয়াছে | এই সুদীঘ্য কাল ব্যাপিয়া ইহার আখ্যানবস্তু যে কীরূপ রূপান্তর ঘটিয়াছে তাহা নিশ্চিতভাবে জানিবার উপায় নাই | এই আখ্যায়িকা অভিজাত-সাহিত্যের লিপিনিরূপিত স্হির রূপ না পাইয়া সমাজের নিম্নবণে্র অন্তগত নাথসম্প্রদায়ভুক্ত গ্রামবাসীদের মৌখিক আবৃত্তি ও অলিখিত স্মরণ-প্রক্রিয়ার মধ্যে আপন অস্তিত্ব রক্ষা করিয়াছে | ইহার মধ্যে একদিকে দুরূহ ধম্যতত্ত্ব ও যোগসাধনার হেঁয়ালিমূলক বণ্যনা, অন্যদিকে আদিম লোক-কল্পনার ও মাত্রাগানহীন বীভৎস রসের সীমালঙ্ঘী অতিরঞ্জনপ্রবণতা | এই দুই চাপের মধ্যে পড়িয়া ইহার বাস্তবতা যে অনেক পরিমাণে সংকুচিত হইয়াছে তাহা সুনিশ্চিত | নাথ-সাহিত্যের কাহিনী-অংশ রূপকথাধমী্ হইলেও রূপকথার সরল ঘটনাপ্রবাহ, নাটকীয় পরিণতি ও অতিপ্রাকৃত আবরণের স্বচ্ছ অন্তরালস্হিত লৌকিক জীবনের যথাথ্ প্রতিরূপ ইহাতে নাই | তবু সময় সময় ভাব-কুয়াশার অন্তরালে আশ্চয্ররূপ বণো্জ্জ্বল জীবনের খন্ডচিত্র-পরম্পরা ইহার মধ্যে হঠাৎ দীপ্তিতে ঝলকিয়া উঠিয়াছে | রাজারাজড়ার সংসার-বিলাস ও ঐশ্বয্-সমারোহ অভিজাত সাহিত্যের আলংকারিক অতিরঞ্জনমুক্ত হইয়া প্রাকৃত কল্পনার সীমাবদ্ধ জীবনবোধের ক্ষুদ্র ও মলিন দপ্যণে এক খব্যকায় বামনমূতি্র হাস্যকর ভঙ্গিতে প্রতিভাত হইয়াছে | স্হানে স্হানে অনভিজাত উপমা ও গ্রাম্য জীবন-সমালোচনা সাহিত্য-স্তম্ভের নীচে চাপ-পড়া মৃত্তিকাস্তরটিকে উপভোগ্যরূপে উদঘাটিত করিয়াছে | মোটের উপর নাথ-সাহিত্যে বাস্তবতার যে বিচ্ছিন্ন উপাদান আবিষ্কার করা যায়, তাহা অতি আধুনিক ঔপন্যাসিক-গোষ্ঠীর রচনার---যথা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পদ্মা নদীর মাঝি' বা সমরেশ বসুর 'গঙ্গা' র ক্ষীণ পূবা্ভাসরূপে উপস্হাপিত হইতে পারে |
     পরবতী্ যুগের মুসলমানি-সাহিত্যের গল্পভান্ডারও নিতান্ত দরিদ্র ছিল না | 'আরব্য উপন্যাস', 'হাতেমতাই', 'লয়লা-মজনু', 'চাহার-দরবেশ,' 'গোলে-বকাওলি', প্রভৃতি আখ্যায়িকাগুলি নিশ্চয়ই বাঙালি পাঠকের সন্মুখে এক অচিন্তিতপূব্ রহস্য ও সৌন্দযে্র জগৎ উন্মুক্ত করিয়াছিল | কিন্তু এই সমস্ত আখ্যায়িকা যে বঙ্গসাহিত্যের উপর কোনো স্হায়ী প্রভাব বিস্তার করিয়াছিল, পরবতী্ সাহিত্য সে সাক্ষ্য দেয় না | এই বৈদেশিক গল্পগুলি রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, সামাজিক বিরোধ ও রুচিগত অনৈক্যের সমস্ত বাধা অতিক্রম করিয়া যে বাঙালি পাঠকের মম্যস্হল স্পশ্ করিতে পারিয়াছিল, তাহা মনে হয় না | বাঙালি পাঠক সম্ভবত ইহার সমস্ত উচ্ছৃঙ্খল সৌন্দয্ ও অপরিচিত সমাজ-ব্যবস্হাকে অনেকীটা সন্দেহ ও বিরোধের চক্ষে দেখিয়াছিল, ও ইহার সম্মোহন প্রভাব হইতে নিজেকে যথাসম্ভব মুক্ত রাখিতে প্রয়াস পাইয়াছিল | তথাপি ইহার প্রভাব একেবারে ব্যথ্ হয় নাই | বেঙ্গল লাইব্রেরির গ্রন্হতালিকা খুঁজিলে দেখা যায় যে, ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে, যখন ইংরেজি সাহিত্যের আদশে্ আমাদের উপন্যাস-সাহিত্য ধীরে ধীরে গড়িয়া উঠিতেছিল এবং মুদ্রাযন্ত্রের সাহায্যে ও অনুবাদের কল্যাণে বৈদেশিক সাহিত্য-সম্ভার আমাদের সাহিত্য-শালায় জমা হইতেছিল, তখন এই শ্রেণীর মুসলমানি গল্পের অনুবাদ আমাদের সাহিত্যিক প্রচেষ্টার একটা প্রধান অঙ্গ হইয়াছিল | উহারা কিয়ৎ পরিমাণে পাঠকের হৃদয় স্পশ্ বা রুচি আকষণ করিতে না পারিলে, আমাদের সাহিত্যিক উদ্যমে একটা মুখ্য অংশ কখনোই উহাদের অনুবাদের প্রতি নিয়োজিত হইতে পারিত না | অন্তত এই সমস্ত গল্পের মধ্যে যে একটা চমকপ্রদ(sensational), বণ্-বহুল (romance), একটা নিয়ম-সংযমহীন সৌন্দয্য-বিলাসের অপরিমিত প্রাচুয্য আছে, তাহাই আমাদের একশ্রেণীর পাঠকের ধম্যশাস্ত্রাস্বাদক্লিষ্ট, অবসাদগ্রস্ত রুচিকে অনিবায্য বেগে আকষ্যণ করিয়াছিল | এই আকষ্যণ যে নিতান্তই ক্ষণস্হায়ী হইয়াছিল, তাহাতে সন্দেহ নাই; সংস্কৃত সাহিত্যের ন্যায় ইহাদিগকে আত্মসাৎ করিবার জন্য, ইহাদিগকে নিজের দেশ-বণ্যে রূপান্তরিত করিবার জন্য বঙ্গসাহিত্যের বিশেষ আগ্রহ দ্খা যায় নাই | বত্যমান উপন্যাসের মধ্যে যে এই ধারা রক্ষিত হইয়াছে, তাহারও বিশেষ কোনো চিহ্ন পাওয়া যায় না | তবে ইহার অব্যবহিত-পরবতী যুগে হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ-ঘটিত ও মুসলমানি মায়া-ইন্দ্রজাল-বেষ্টিত যে একপ্রকারের ছদ্ম-ঐতিহাসিক (pseudo-historical) উপন্যাসের আবিভা্ব হয়, তাহার সহিত বোধ হয় ইহাদের কতকটা সন্মন্ধ থাকিতে পারে | পরবতী্ ঐতিহাসিক সত্য ও এই কাল্পনিক আখ্যায়িকা-জগতের প্রেরণা কী পরিমাণে মিশ্রিত হইয়াছে তাহা নি়ধা্রণ করা সহজ নহে | মোটের উপর ইহার বঙ্গসাহিত্যের উপরে মুসলমানি গল্পের প্রভাবের একমাত্র নিদশন |
     ইংরেজি উপন্যাসের দ্বারা প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত হইবার পূবে্ বঙ্গসাহিত্যে বাস্তবতার ধারা কতখানি প্রবাহিত হইয়াছিল, ও উপন্যাসের পূব্যলক্ষণ ইহাতে কতটা পাওয়া যায়, এ পয্ন্ত তাহারই সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা গেল | প্রাচীন ও মধ্য-যুগের সাহিত্য হইতে বাস্তব-রস-সিক্ত জীবনের খন্ডাংশগুলি পৃথক করিয়া তাহাদিগকে উপন্যাসের দিকে অগ্রসরণের চিহ্ন বলিয়া ধরিয়া লওয়াতে কেহ কেহ আপত্তি করিতে পারেন | কিন্তু একটু ভাবিলেই দেখা যাইবে যে, এ আপত্তি বিশেষ মারাত্মক নহে | ইহা নিশ্চিত যে, যে-সমস্ত ধম্যশাস্ত,


কাব্যগ্রন্হ ও গল্প-আখ্যায়িকা হইতে এই সমস্ত বাস্তবতার চিহ্নাঙ্কিত অংশ বাছিয়া লওয়া হইয়াছে, তাহাদের লেখকদের মধ্যে কাহারও উপন্যাস লিখিবার কল্পনা ছিল না, বা উপন্যাস বলিয়া যে সাহিত্যের একটা দিক আছে, তাহারও অস্তিত্ব সন্মন্ধে তাঁহারা অগগো ছিলেন | তথাপি এই বাস্তব অংশগুলিকে উপন্যাসের পূব্যলক্ষণ বলিয়া ধরিয়া লওয়া নিতান্ত অসংগত হইবে না | গল্প বলিবার ও শুনিবার প্রবৃত্তি মানুষের একটি ভঙ্গিকে --- গল্পের মধ্য দিয়া মানুষের প্রকৃত জীবনের ছবি আঁকিবার চেষ্টা, ঘটনা-সংঘাতে তাহার চরিত্রস্ফুরণের উদযোগ, সামাজিক মানুষের মধ্যে যে অহরহ একটা আকষণ-বিকষ্যণের দ্বন্দ্ব চলিতেছে তাহারই সূক্ষ্ম আলোচনা, ও এই দ্বন্দ্বসংঘাতের মধ্য দিয়া মনুষ্য-জীবন সন্মন্ধে একটা বৃহত্তর, ব্যাপকতর সত্যকে ফুটাইয়া তোলা----ইহাকেই উপন্যাস বলা যাইতে পারে | সুতরাং যেখানেই গল্পের মধ্য দিয়া--- তা সে গল্প যে উদ্দেশ্যেই লিখিত হউক না কেন --- বাস্তবের প্রতি আকষণের কোনো লক্ষণ দেখা গিয়াছে, সধারণ রক্তমাংসের নর-নারীর চিত্র অস্পষ্ট ছায়া-রেখাতেও চারিদিকের কুহেলিকা হইতে স্বতন্ত্র হইয়া উঠিয়াছে, সেখানেই উপন্যাসের মৌলিক বীজের দশ্যন লাভ হইয়াছে বুঝিতে হইবে | সাহিত্যিক ক্রমবিকাশের ইহার সাধারণ নিয়ম | বিশেষত আমাদের ন্যায় ধম্যপ্রধান, বাস্তবতাবিমুখ, পরমাথ্যপর সাহিত্যে, যেখানে সমগ্র পাথি্ব ব্যাপারকে মরীচিকার ন্যায় সাহিত্য-ক্ষেত্র হইতে নিশ্চিহ্নভাবে মুছিয়া ফেলিবার ব্যবস্হা হইয়াছে, যেখানে উচ্চতর ধমে্র নামে আমাদের প্রকৃত জীবনের ভাষার নিম্যমভাবে কন্ঠরোধ কন্ঠরোধ করা হইয়াছে, সেখানে এই সমস্ত অস্পষ্ট, অসম্পূণ্ বাস্তব-চিত্রেরও মূল্য ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা আরও বেশি | অন্তত এইগুলিই আমাদের উপন্যাস-রাজ্যে প্রবেশ করিবার জন্য যথাসম্ভব আয়োজন; বাস্তবতার দিকে এইটুকু প্রবণতা লইয়া আমরা ইংরেজি উপন্যাসের পদাঙ্ক অনুসরণে প্রবৃত্ত হইয়াছিলাম | এই আয়োজনের পযা্প্ততার উপরেই আমাদের নিজের উপন্যাস-সাহিত্যের উৎকষ্ ও অপকষ্ নিভ্রর করিয়াছে | পরবতী্ অধ্যায়ে এই ধার-করা উপন্যাস-সাহিত্য আমারা কতদূর আপনার করিয়া লইতে পারিয়াছি, কতদূর ঘনিষ্ঠভাবে ইহাকে আমাদের সামাজিক জীবনের কেন্দ্রস্হলের সহিত যোগ করিতে পারিয়াছি, তাহাই আলোচিত হইবে |

দ্বিতীয় অধ্যায়


উপন্যাসের উদ্ভব ও প্রথম যুগের সামাজিক উপন্যাস
( ১)


ইংরেজি উপন্যাসের সহিত প্রত্যক্ষ পরিচয়ের পূবে্ বঙ্গসাহিত্য বাস্তবতার পথে কতদূর অগ্রসর হইয়াছিল ও উপন্যাসের আগমনের জন্য আপনাকে কতখানি প্রস্তুত করিয়াছিল, পূব্ অধ্যায়ে আমরা তাহার আলোচনা করিয়াছি | এক্ষণে ইংরেজি উপন্যাসের সহিত পরিচয়ের ফলে বঙ্গগসাহিত্যে উপন্যাসের কীরূপে আবিভা্ব হইল ও তৎকালীন সমাজের পরিস্হিতি কীরূপ ছিল, তাহার কিছু আলোচনা করিতে হইবে |
     অষ্টাদশ শতকের শেষ হইতে ইংরেজি শিক্ষা-সংস্কৃতি ধীরে ধীরে বাঙালির মনে প্রভাব বিস্তার করিতে লাগিল | ১৮১৭ খৃষ্টাব্দে হিন্দু কলেজের প্রতিষ্ঠা বাঙালির পাশ্চাত্য শিক্ষানুরাগের বিচ্ছিন্ন ও অনিয়মিত, স্বেচ্ছানিয়ন্ত্রিত স্ফুরণকে সুসংবদ্ধ, কেন্দ্র-সংহত রূপ দিল | কিন্তু তাহারও পূবে্ প্রায় অধ্যশতাব্দী ধরিয়া বাঙালি-সমাজে একটা অভূতপূব্ আলোড়ন চলিতেছিল | রামমোহন রায়ই সব্যপ্রথম ইংরেজের সহিত সম্পক্যকে ব্যবসায়িক বা অথ্যনৈতিক ভিত্তি হইতে বুদ্ধি ও মননশক্তিগত ভিত্তিতে উন্ননয়ন করিয়া এক বিপ্লবকারী পরিবত্যনের সূচনা করিলেন | তিনিই প্রথম দেখাইলেন যে, বাঙালি কেবল ইংরেজদিগের বাণিজ্য বা সাম্রাজ্য-বিস্তারের বাহন মাত্র নহে---তাহাদের শিক্ষাসংস্কৃতিরও উত্তরাধিকারী | পাশ্চাত্য যুক্তিবাদ তিনিই সব্যপ্রথম আমাদের সামাজিক ও ধম্যবিষয়ক আলোচনায় প্রয়োগ করিয়া বাঙালির সাহিত্যিক প্রচেষ্টাকে সম্পূণ্ নূতন খাতে প্রবাহিত করিয়া দিলেন | তিনি হিন্দুধম্য আচারকে একদিকে খৃষ্টান মিশনারিদের অযথা আক্রমণ ও অপরদিকে গোঁড়া রক্ষণশীলদের অন্ধ ও মূঢ় বাৎসল্য হইতে রক্ষা করিবার জন্য যে মনোভাব অবলম্বন করিলেন, যে স্বাধীন চিন্তা, দৃঢ় যুক্তিবাদ ও তীক্ষ্ণ বাস্তববোধের প্রয়োগ করিলেন, তাহাতেই বঙ্গদেশের সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ভবিষ্যৎ চিরকালের জন্য নিরূপিত হইল |
 :    এই বাদ-প্রতিবাদের কোলাহল-মুখর, উত্তেজিত প্রতিবেশে উপন্যাসের জন্ম হইল | দীঘ্য শতাব্দী ধরিয়া অনুসৃত ধম্যানুষ্ঠান ও আচার-ব্যবহার যখন আক্রমণের বিষয়ীভূত হয়, তখন আলোচনার ধারা যুক্তি-তকে্র মন্থর প্রণালী ছাড়াইয়া হৃদয়াবেগের বেগবান প্রবাহের সহিত সংযুক্ত হয় ---তথ্যবিচার সাহিত্যপদবীতে উন্নীত হয় | ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ-শ্লেষের মাজি্ত দীপ্তি ও শানিত তীক্ষ্ণতা এই মানস উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশস্বরূপ যুক্তি-তকে্র ফাঁকে ফাঁকে সূযা্লোকস্পষ্ট বষা্ফলকের মতো ঝলকিত হয় | এই শ্লেষপ্রধান মনোভাব ক্রমশ আশুপ্রয়োজনীয়ের সংকীণ্য গন্ডি ছাড়াইয়া নিরপেক্ষভাবে সমস্ত সমাজ-জীবনের উপর বিস্তৃত হয় | সমাজ-জীবনের ব্যাধি-বিকার, আতিশয্য-অসংগতির প্রতি মন সহসা সচেতন হইয়া উঠে---এই নব-জাগ্রত দেবতার জন্য বলি খুঁজিয়া বেড়ান | সমসাময়িক সামাজিক অবস্হার শ্লেষাত্মক পয্যবেক্ষণ ও ইহার হাস্যোদ্দীপক, বিসদৃশ দিকগুলির ব্যঙ্গচিত্র-অঙ্কন উপন্যাস-রচনার অব্যবহিত পূব্যবতী্ স্তর |

( ২)


এই সময়ে (১৮১৮) সংবাদপত্রের প্রতিষ্ঠা কিছুদিন ধরিয়া মনোমধ্যে সঞ্চিত শ্লেষ-প্ররবণতাকে অভিব্যক্তির ক্ষেত্র ও প্রেরণা যোগাইল | সংবাদপত্রের সহিত উপন্যাসের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পক্ | উপন্যাসের প্রথম খসড়া সংবাদপত্রের স্তম্ভেই রচিত হইয়াছে | খবরের কাগজের সম্পাদক পাঠকের মনোরঞ্জজনের জন্য দেশের মধ্যে যাহা-কিছু বিচিত্র, কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনা ঘটিতেছে তাহা সংগ্রহ ও সরবরাহ করিতে সচেষ্ট থাকেন| নানারকমের উড়ো পাখি --- আজগুবি খবর, অপ্রত্যাশিত ও চমকপ্রদ ঘটনা, যাহা মনকে নাড়া দেয় ও হাস্যকৌতুকের সৃষ্টি করে----এই সাংবাদিক বৃক্ষের শাখা-প্রশাখায় বাসা বাঁধে | নানাবিধ সমাজিক সমস্যার লঘু, সরস আলোচনা, নানা বিরুদ্ধ মতবাদের সংঘষ্, প্রতিপক্ষের কুৎসারটনা ও তাহার দুনী্তির নানা মুখরোচক উদাহারণ ইহাকে বাস্তব-জীবনের সত্য ও উপভোগ্য প্রতিচ্ছবির ময্যাদা দেয় | সংবাদপত্রের দপ্যণে সমাজ নিজ বহিরবয়ব ও মনোবাসনার নিখুঁত প্রতিবিম্ব দেখিতে পায় |
     বাস্তব-জীবনের খন্ড খন্ড ছবিগুলি ঐক্যসূত্রে গ্রথিত হইয়া, ঘটনার ধারাবাহিকতা ও শিল্পী-মনের সচেতন উদ্দেশ্যের সহিত যুক্ত হইয়া, এক সম্পূণ্, অন্তঃসংগতি-বিশিষ্ট কাল্পনিক চিত্রে সংহত হয় | ইহার সঞ্জান উপন্যাস-সৃষ্টির প্রথম অঙ্কুর | শ্রেণীবিশেষের জীবনের বিচ্ছন্ন অধ্যায়গুলি কীরূপে কাল্পনিক চরিত্রের সমগ্রতায় পরিণত হইল, তাহার প্রথম দৃষ্টান্ত পাই ১৮২১ খৃঃ অঃ 'সমাচারদপ্যণ'-এ

"বাবু" - চরিত্র-আলোচনার | সম্পাদক তাঁহার কাগজের দুইটি সংখ্যায় ---২৪ ফেব্রুয়ারি ও ৯ জুন --১৮২১ --- বড়োলোকের আদুরে-গোপাল, শিক্ষাচরিত্ররহীন ছেলের জীবনযাত্রা ও মতিগতির একটি সংক্ষিপ্ত বণ্যনা দিয়াছেন | এই তিলকচন্দ্র উপন্যাস-জগতের প্রায় আধুনিককাল পয্যন্ত প্রসারিত বাবু-বংশের আদিপুরুষ | ইনি মোসাহেব-মন্ডলে পরিবেষ্টিত ও আত্মাভিমানপুষ্ট হইয়া, বাহ্য আড়ম্বরে অন্তরের অন্তঃসারশূন্যযতা ঢাকিতে চেষ্টা করিয়া, নানা হাস্যযকর অসংগতি সৃষ্টি করিয়াছেন ও লেখকের বিদ্রূপ-বাণবিদ্ধ হইয়া পাঠকের শিক্ষাবিধান ও মনোরঞ্জজনের দ্বৈত-উদ্দেশ্য-সাধনের উপায় হইয়াছেন | এই আদি 'বাবু'র চরিত্রে দুঃশীলতা ও ব্যসন-বিলাস অপেক্ষা মোসাবের-মহলে প্রতিপত্ত বজায় রাখার প্রচেষ্টার প্রতি বেশি জোর দেওয়া হইয়াছে |

(৩)


ইহার পর দুই বৎসর পরে (১৮২৩ খৃঃ অঃ ) প্রকাশিত প্রমথনাথ শম্রার রচিত 'নববাবু-বিলাস' প্রথম উপন্যাসের গৌরব দাবি করে | প্রমথনাথ শমা্ "সমাচার-চন্দিকা" ও "সংবাদ-কৌমুদী" পত্রিকাদ্বয়ের সম্পাদক ও নিষ্ঠাবান হিন্দুসমাজের মুখপাত্র, ধম্যসভার কায্যাধ্যক্ষ ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছদ্মনাম | সম্ভবত ইনিই 'সমাচার-দপ্যণ' -এ প্রকাশিত তিলকচন্দ্রের জীবন-কাহিনীর সংকলয়িতা| এই অনুমান সত্য হইলে 'নববাবু-বিলাস' 'সমাচার-দপ্যণ- এর "বাবু' কাহিনীর পরিবতি্ত সংস্করণ --প্রথম মৌলিক পরিকল্পনার অপেক্ষাকৃত পল্লবিত বিস্তার | ইহাতে বাবু-জীবনের উচ্ছৃঙ্খলতা ও অমিতাচার, খেয়ালি অস্থিরমতিত্ব, সৌজন্য ও সুরুচির অভাব, বাল্যকালে হিতকর শাসন-সংযমের উল্লঙঘন ও পরিণামে দুগ্যতি সবিস্তার বণি্ত হইয়াছে | অস্হিরমতিত্ব, সৌজন্য ও সুরুচির অভাব, বাল্যকালে হিতকর শাসন-সংযমের উল্লঙঘন ও পরিণামে দুগ্যতি সবিস্তার বণি্ত হইয়াছে | কিন্তু লেখকের প্রধান লক্ষ ব্যক্তিবিশেষের চরিত্রস্ফুরণ নহে, সমস্ত সমাজ-প্রতিবেশের চিত্রাঙ্কন | বাবু অপেক্ষা যে সমাজে বাবুর উদ্ভব তাহার প্রতিই তাঁহার মনোযোগ বেশি |
     'নববাবু-বিলাস' ---গদ্যে পদ্যে, ছড়ায়-অনুপ্রাসে, সংস্কৃত গুরুগম্ভীর শব্দসমাবেশের ব্যঙ্গানুকৃতিতে ও চটুল কথ্যরীতিতে নানা-ভঙ্গির সংমিশ্রণজাত বণ্যসংকর ভাষাবিন্যাসের মাধ্যমে ও কৌতুকোচ্ছল, ব্যঙ্গসরস মেজাজে লিখিত | সদ্যোজাত গদ্যশিশু যেন খেয়ালখুশিমতো আবার পদ্যের তরলতা ও মৃদু সুরসংগতিতে প্রত্যাবত্যন করিতে অতিমাত্রায় উন্মুখ | শিশুটি যেন ক্রীড়াকৌতুকের আবেশে রং -এর ও কদ্যমে মিশাইয়া এই মিশ্রিত পদাথ্যটি ক্ষেপণাস্ত্রররূপে প্রয়োগ করিতে একেবারে মশগুল হইয়াছে | মোটকথা, উপন্যাসোচিত স্হির দৃষ্টিভঙ্গি ও যৌবনোচিত পরিণত প্রকাশরীতি এখনও অনায়ত্ত রহিয়াছে | জীবনবৃত্তের একটি অতিক্ষুদ্র খন্ডাংশকে, ক্ষণিক বিলাস-ব্যসনের উদ্দাম উৎক্ষেপকে জীবনের নিগূঢ় নিয়ম-শৃঙ্খলিত সামগ্রিকতার সহিত সমাথ্করূপে দেখানো হইয়াছে--- বহিবি্ক্ষোভ মথিত উদভ্রান্তিকে অন্তরের সত্য পরিচয়ের বিকল্পরূপে উপস্থাপিত করা হইয়াছে |
     নববাবুর পূব্পুরুষের ধনাজ্ন-রহস্য হইতে আরম্ভ করিয়া তাহার বিদ্যাশিক্ষার, পন্ডিতমুনশি ---ইংরেজি শিক্ষকের শিক্ষাদানপ্রণালীর বিস্তারিত ইতিহাস বিবৃত হইয়াছে | তাহার পর অমাত্যবগে্র স্তাবকতার মধ্যে বিদ্যাশিক্ষা সমাপ্ত করিয়া বাবুর বিষয়কমে্ হাতেখড়ির কথাও লেখক আমাদের সবিস্তার শোনাইয়াছেন | তাহার পর খালিপা তাহাকে বাবুগিরির জীবনতত্ব ও সাধনামাগে্ দীক্ষিত করিয়াছে | এই দীক্ষার ফল অচিরেই ফলিয়াছে ---নববাবু সমস্ত ধনসম্পদ হারাইয়া ফতুর হইয়াছে| তাহার স্ত্রীও তাহাকে বঞ্চনা করিয়াছে | কারাবাস, সম্ভ্রমহানি, কুৎসিত ব্যাধিগ্রস্ততা ও নিষ্ফল খেদে বাবুর জীবন চরম পরিণতির পযা্য়ে পৌছিয়াছে |
     লক্ষ্য করিবার বিষয় এই যে, বাবু একেবারে ব্যাক্তিত্ববহীন, সে কেবল পরবুদ্ধি-চালিত পুত্তলিকামাত্র, বিলাস-সমুদ্রে ভাসমান তৃণগুচ্ছের ন্যায় অসহায়ভাবে তরঙ্গতাড়িত | কখনো কোনো উপলক্ষেই সে নিজ স্বাধীন ইচ্ছার পরিচয় দেয় নাই | তাহার জীবন সব্যতোভাবে পরপ্রভাবগঠিত ও পরমুখাপেক্ষী | তাহার পিতার জীবদ্দশাতেই সে সমস্ত বদখেয়ালির নিরঙ্কুশ চচা্ করিয়াছে | তাহার জীবনে পারিবারিক প্রভাব একেবারেই অনুপস্থিত | তাহার স্ত্রীও তাহাকে সংশোধন করিবার কোনো চেষ্টা করে নাই --- তাহার সংসারানভিঞ্জতার সুযোগ লইয়া নিজ দুষ্প্রবৃত্তি চরিতাথ্ করিয়াছে | 'আলালের ঘরের দুলাল' --এর নায়ক মতিলালের সহিত তুলনায় সে একেবারে নিষ্প্রাণ, পারিবারিক-সংযোগসুত্র-বিচ্ছিন্ন ও ইচ্ছাশক্তিহীন | তাহার ব্যক্তিসত্তা নাই; সে কেবল প্রতিবেশ-বিক্ষিপ্ত ব্যসনাসক্তির একটা কেন্দ্ররসংহত বিন্দুমাত্র, সমাজদেহে ছড়ানো বিষের ঘনীভূত বিস্ফোটক | সুতরাং তাহার প্রতি আমাদের ঘৃণার পরিবতে্ সহানুভুতিই জাগে | ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মতিলালের সংশোধন হইয়াছিল, একতাল অক্ষম মাংসপিন্ডডরূপ নববাবুর অনুতাপও শিরাস্নায়ুগত দৈহিক আক্ষেপের ঊধ্বে্ উঠে নাই | বইটির প্রকৃত নায়ক ও গতিনিয়ামক খলিপা ঠক চাচার অগ্রদূত | অবশ্য ঠকের চক্রান্ত-কুশল শঠতা উহার নাই; সে মতলবাজ নহে, তাহার মুরুব্বিকে সরল ও খোলাখুলিভাবে উপদেশ দিয়াছে | সে চাবা্ক-নীতির অবিমিশ্র সাধক, উহার সহিত চাণক্য-নীতির কোনো উপাদান মেশায় নাই | কাজেই তাহার প্রতিও আমাদের অনুযোগের বিশেষ কারণ নাই | 'নববাবু-বিলাস' -এ তত্ব প্রধান, মানুষ গৌণ; 'আলাল' -এ মানবিকতা রক্ত-মাংস-সংযোগে আর একটু সুপরিস্ফুট |
     এই সময়ের কলিকাতা-সমাজে যে বিলাস ও ব্যভিচারের স্রোত বহিয়া গিয়াছে, তাহার সহিত পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সভ্যতার যে খুব প্রত্যক্ষ সম্পক্ ছিল, তাহা মনে হয় না | যে 'বাবু' এই সমাজের বিশিষ্ট সৃষ্টি, তিনি ইংরেজি শিক্ষা-দীক্ষার বিশেষ ধার ধারেন না | 'নববাবু-বিলাসে'র ৩৫ বৎসর পরে রচিত 'আলালের ঘরের দুলাল' -এর (১৮৫৮) নায়ক মতিলাল শেরবোন্ সাহেবের স্কুলে কিছুদিন যাতায়াত করিয়াছিল, কিন্তু কয়েকটা ইংরেজি শব্দ ও কিছু ইংরেজি হাব-ভাব ও চাল-চলন শিক্ষা ব্যতীত তাহার বিদ্যা অধিক দূর অগ্রসর হয় নাই | কাজেই ইহাদের উচ্ছৃঙ্খলতার জন্য পাশ্চাত্য শিক্ষাকে ঠিক দায়ী করা যায় না | এই দিক দিয়া ইহাদের সহিত পরবতী্ যুগের হিন্দু কলেজে শিক্ষিত, ইংরেজি আচার-ব্যবহারের সত্যকার অনুরাগী, সমাজবিদ্রোহী ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের আদশে্ অনুপ্রাণিত, নিজ