Go to content Go to menu
 


পৃষ্ঠা ৯,১০ এবং ১১

2020-05-13
৫. রূপকথা, চৈতন্যচরিতগ্রন্থ ও ময়মনসিংহ-গীতিকা

আমাদের লৌকিক গল্প ও রূপকথার মধ্যেও উপন্যাস-সাহিত্যের বিস্সয়কর পূব্সূচনা পাওয়া যায় | বাস্তবিক, প্রাচীন সাহিত্যের মধ্যে রূপকথাই উহার অবাস্তবতা সত্বেও উপন্যাসের দিকে সব্যাপেক্ষা অধিক অগ্রসর হইয়াছে | অন্তত দুইটি দিক দিয়া উপন্যাসের সহিত ইহার সাদৃশ্য বেশ স্পষ্টভাবে অনুভব করা যায় | প্রথমত, উপন্যাসের মতোই ইহার আখ্যানভাগ ইহার সব্প্রধান বিষয়বস্তু ও আকষণ; ইহা একটি খাঁটি, অবিমিশ্র গল্প --- ধম্রকাব্যের মতো ইহার গল্পাংশটি শুধু কোনো ধমতত্ত্বপ্রমাণ বা দেবতার মহাত্ম্যকীতনের উপায়মাত্র নহে | দ্বিতীয়ত, উহার মধ্যে যথেষ্ট অলৌকিকতা থাকিলেও, উহার আকাশ-বাতাসে মায়া-মোহ-ইন্দজালের একটি ঘন প্রলেপ থাকা সত্বেও, একটু সুক্ষ্মভাবে আলোচনা করিলে বুঝা যাইবে যে, লেখক ইহাতে মানুষের লৌকিক ও সামাজিক ব্যবহারেরই পরিণাম দেথাইয়া তাহারই উপর নিজ সমালোচনা লিপিবদ্ধ করিয়াছেন | সুতরাং মূলত ঔপন্যাসিকেরও যে উদ্দেশ্য, রূপকথার লেখকেরও অনেকটা তাহাই; এবং ধমকাব্যকারের অপেক্ষা রূপকথাকার এই উদ্দেশ্য আরও প্রত্যক্ষভাবে, আরও সরল ও প্রবলভাবে উপলব্ধি করিয়াছেন---- ধমে্র কুহেলিকার মধ্যে ইহাকে বিশেষ ম্লান হইতে দেন নাই | মোট কথা ধমকাব্যের সহিত তুলনায় রূপকথা ধমে্র অনধিকারপ্রবেশ হইতে অধিকতর মুক্ত; ও সেইজন্য খাঁটি আখ্যায়িকার গুহসমূহ ইহার মধ্যে প্রকটতর হইয়াছে | এই সমস্ত দিক দিয়া বিবেচনা করিলে উপন্যাসের সহিত ইহার নিকট সম্পক্ অস্বীকার করা যায় না |
        চৈতন্যদেবের চরিতগ্ররন্থথসমূহেও ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকের সামাজিক জীবনের নিভ্ররযোগ্য বিবরণ মিলে | তাঁহার নিজের জীবনের ঘটনাগুলিতে অনেক সময়ে চরিতকারদের উচ্ছ্বসিত ভক্তি ও তাঁহার দেবত্বে প্রগাঢ় বিশ্বাসের জন্য অলৌকিকত্বের রং মাখানো হইয়াছে | কিন্তু মোটের উপর তৎকালীন সমাজের রীতি-নীতি, চাল-চলন, রুচি-আদশ্, সাধারণ লোকের দৈনিক জীবনযাত্রা, তীথ্পয্টন, ধমবিষয়ক বিচার-বিতক্, প্রভৃতি বিষয়ের যে বিবরণ এই সমস্ত গ্রন্থ হইতে সংকলন করা যায়, তাহা বাস্ততবের সত্য প্রতিচ্ছবি | চৈতন্যদেবের আবিভা্ব কেবল যে আমাদের ধম্জীবনের নূতন অধ্যায় উদঘাটন করিয়াছে তাহা নহে, আমাদের ঐতিহাসিক বোধকেও উদ্বুদ্ধ করিয়াছে | তাঁহার জীবনের সহিত সম্পকি্ত তুচ্ছতম ঘটনাও সযত্নে লিপিবদ্ধ হইয়া বিস্মৃতি-বিলোপ হইতে রক্ষিত হইয়াছে | তাঁহার ভাবসমৃদ্ধ জীবন সন্মন্ধে তথ্যসংগ্রহের প্রবল আগ্রহ অসংখ্য ভক্তকে মহাকাব্য, কড়চা, জীবন-চরিত, নাটক, ধমব্যাখ্যা, প্রভৃতি নানাবিধ গ্রন্হরচনায় প্রণোদিত করিয়াছে-----সাহিত্যের মরাখাতে একটি কূলপ্লাবী জোয়ার আনিয়াছে | এই সমস্ত গ্রন্হে যে ঐতিহাসিক সত্যনিষ্ঠার খাঁটি আদশ্ অনুসৃত হইয়াছে তাহা নহে ----ভক্তিপ্লাবনে বৈঙ্গানিক আলোচনার সন্দেহপ্রণ সতকতা কোথায় ভাসিয়া গিয়াছে | তথাপি এই ধমো্ম্মাদের প্রভাবে একটা ঐতিহাসিক মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি, প্রত্যক্ষদশী্র নিকট সংবাদসংগ্রহ ও যথাশক্তি তাহার সত্যতা যাচাই করিয়া ভবিষ্যত কালের জন্য লিপিবদ্ধ করিবার আগ্রহপূব্ক প্রবণতা, সব্প্রথম প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে | মহাপ্রভুর পদাঙ্ক অনুসরণে ব্রতী ভক্ত ও অনুচরবগ্ নবদ্বীপ হইতে পুরী ও বৃন্দাবনে অবিরত গমনাগমনের দ্বারা যে পথ প্রস্তুত করিয়াছিলেন, সেই পথে ধ্যানমগ্ন ভক্তিবিহ্বলতা ও তীক্ষ্ণদৃষ্টি তথ্যানুসন্ধিৎসা হাত ধরিয়া পাশাপাশি যাত্রা করিয়াছে | দুভা্গ্যযক্রমে চৈতন্যযদেবের ঈশ্বরত্বে বিশ্বাস যত সবব্যাপী হইয়া পড়িল, ততই এই তথ্যানুরক্তি, অলৌকিকত্ব-আবিষ্কারে উন্মুখ কল্পনা ও আপন আপন গোষ্ঠী-গুরুর মাহাত্ম্য-প্রচারাকাঙক্ষী অন্ধভক্তির দ্বারা অভিভূত হইয়া, অতিরঞ্জনস্ফীত কিংবদন্তীর পযা্য়ে অবনমিত হইল | কাজেই চৈতন্যোত্ততর সাহিত্যে ইহা স্হায়ী প্রভাব বিস্তার করিতে পারে নাই |
        এই সম্পকে্ ময়মনসিংহের নিরক্ষর কৃষিজীবীর মুখ হইতে সংগৃহীত ও কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হইতে প্রকাশিত অধুনা-বিখ্যাত 'ময়মনসিংহ-গীতিকা'র নাম উল্লেখযোগ্য | এই সমস্ত গীতি-আখ্যায়িকার রচনাকাল ষোড়শ ও সপ্তদশ শতক বলিয়া অনুমিত হয় | এই অনুমান ঠিক হইলে ইহাদের আবিষ্কার আমাদের সাহিত্যিক ক্রমবিবত্নের একটি লুপ্ত অধ্যায় পুনরুদ্ধার করিয়াছে | কৃত্তিবাস-কাশীদাস-মুকুন্দরামের যুগ ও ভারতচন্দ্রের যুগের মধ্যে যে একটি বৃহৎ ব্যবধান অনুভূত হয়, 'ময়মনসিংহ-গীতিকা' তাহা পূরণ করিয়াছে | বাস্তবরসপ্রধানতার দিক দিয়া মুকুন্দরামের নিঃসঙ্গ বৈশিষ্ট্য বিষয়ে আমাদের যে ধারণা, তাহা এই সমস্ত রচনার দ্বারা খন্ডিত ও বিশেষভাবে পরিবতি্ত হইয়াছে | ধমগ্ররন্থ-প্রণয়নের ফাঁকে ফাঁকে মুকুন্দরাম যে বাস্তবরসধারা সঞ্চারিত করিয়াছেন, তাহাতে তিনি একেবারে একাকী নহেন, পরন্তু তিনি একটা নূতন সাহিত্যের ধারা প্রবতি্ত করেন, এবং এই বাস্তবতা-সৃষ্টিতে তাঁর অনেক সহকমী্ ও অনুচর ছিল---এই তথ্য এই সমস্ত আখ্যায়িকার দ্বারা প্রমাণিত হইয়াছে | আমাদের শূন্যপ্রায় সাহিত্যিক মানচিত্রে ইহাদের দ্বারা অনেক নূতন নগর-গ্রামের অবস্হিতি চিহ্নিত হইয়াছে |
        সুতরাং ইতিহাস-সংগঠনের দিক দিয়া ইহাদের মূল্য সামান্য নহে | মুকুন্দদরাম-ভারতচন্দ্রের ব্যবধানের উপর সংযোগ-সেতু নিমা্ণ করিয়াছে, মুকুন্দরামের একটা বৃহৎ ঙ্গতিগোষ্ঠী-পরিবারের সন্ধান দিয়াছে ও ভারতচন্দ্রের কৃত্তিম-কারুকায্পূণ্, তীব্রদ্যুতি-ঝলসিত রাজপ্রাসাদের ভিত্তিমূলে যে বাস্তব-জীবনের মৃত্তিকাস্তর বিদ্যমান তাহা উদঘাটিত করিয়া দেখাইয়াছে | আবার রূপকথার সহিতও ইহাদের একটা নিকট আত্মীয়তা আশ্চযরূপে প্রতিভাত হইয়াছে | গীতি-আখ্যানের সহিত 'কাজলরেখা' নামক রূপকথাটির একত্র সন্নিবেশ এই ঘনিষ্ট সম্পকরহস্যটি স্ফুটতর করিয়াছে | আমাদের সাহিত্যিক আকাশে নিশীথ-তারকার ন্যায় রূপকথার যে অপরূপ ফুল ফুটিয়াছে, এই আখ্যানগুলি তাহার বৃন্ত ও মূল; বাস্তব-জীবনের যে স্তর হইতে এই রূপকথা রস আহরণ করিয়াছে সেই বিস্মৃতপ্রায় প্রতিবেশের উপর ইহারা আলোকপাত করিয়াছে | আকাশের সুদূর কুহেলিকাচ্ছন্ন নক্ষত্রটি আমাদের সংসারযাত্রার শত-প্রয়োজন-চিহ্নিত

মৃৎপ্রদীপরূপে প্রতিভাত হইয়াছে | রূপকথার নামগোত্রহীন, রহস্যাবগুন্ঠিত অস্তিত্বের জন্মস্হান-নিণয় হইয়াছে ও বংশপরিচয় মিলিয়াছে | কয়লা ও হীরকখন্ড যেমন মূলত অভিন্ন, তেমনি বাস্তবতামূলক করুণ উৎপীড়ন-কাহিনী ও রূপকথার অবাস্তব দৈব-সংঘটন একই প্রতিবেশ-প্রভাব ও মনোবৃত্তির অভিন্ন অভিব্যাক্তি |
        এই সাদৃশ্যের কারণ অনুসন্ধান করিলে দেখা যাইবে যে, ইহা কতকটা প্রতিক্রিয়া ও কতকটা সমধমত্ববমূলম | বাস্ততবের কঠোর অভিঘাত দৈবানুকূল্যের প্রতি একটা করুণ লোলুপতা জাগায় ও পাতালপুরীর অবাস্তব ঐশ্ববযে্র স্বপ্ন দেখিতে প্ররণোদিত করে | যেখানে অত্যাচার শত বাহু বিস্তার করিয়া কন্ঠ চাপিয়া ধরিতে চায়, সেখানে মানুষ অনুকূল দৈবের অতকি্ত প্রসাদলাভ কল্পনা করে | ছেঁড়া কাঁথায় শুইয়া লক্ষ টাকার স্বপ্ন দেখা উপহাসের বিষয় হইতে পারে, কিন্তু ইহার মধ্যে মনস্তত্ত্বমূলক গূঢ় সত্যও নিহিত আছে | সেইজন্যই ময়মনসিংহ-গীতিকায় যে প্রতিবেশের পরিচয় মেলে, তাহার মধ্যে খুব স্বাভাবিক কারণেই রূপকথা জন্মলাভ করিয়াছে | উচ্ছ্বসিত হৃদয়াবেগের উৎপীড়নমূলক নিরোধই রূপকথার সূতিকাগার |
        আর একদিক দিয়া দেখিতে গেলে এই উভয় প্রকার রচনাকে সমধমী্ বলিয়া মনে হইতে পারে | যথেচ্ছাচারমূলক শাসন পদ্ধতি ও জীবনযাত্রার মধ্যেই দৈবের অতকি্ত আবিভা্বের প্রচুরতম অবসর | অত্যাচারীর কবল হইতে উদ্ধারলাভের মধ্যেই দৈবানুগ্রহ আত্মপ্রকাশ করিয়া থাকে | যেখানে প্রাত্যহিক জীবনে বজ্রপাতের মতো বিপদ আসিয়া পড়ে, সেখানে খুব স্বাভাবিক নিয়ামানুসারেই অপ্রত্যাশিত উদ্ধার অনুকূল দৈবশক্তির ইঙ্গিত দেয় | যেখানে রাক্ষস-খোক্কসের ছড়াছড়ি, সেখানেই শুকসারীর মুখ দিয়া বিপন্মুক্তির রহস্য উদঘাটিত হয় | যে দুশমন কাজী মলুয়াকে তাহার স্বামী-বক্ষ হইতে ছিনাইয়া লইয়াছে, অদৃষ্টচক্রের খুব স্বাভাবিক আবত্যনে সে শূলে প্রাণ দিয়া ভগবানের নিগূঢ ন্যায়নীতির মহিমা ঘোষণা করিয়াছে | কমলা উৎপীড়নের নিষ্ঠুর ষড়যন্ত্রে গৃহত্যাগিনী হইয়া দৈব-প্রসাদের ন্যায়ই 'মৈষাল বন্ধু' ও রাজকুমারের দশন পাইয়াছে | যে ঝঞ্ঝাবাত গৃহের নিরাপদ বেষ্টনী হইতে টানিয়া বাহির করে, তাহাই আবার পথিক-জীবনের নিরাশ্রয়তার ক্ষতিপূরণস্ববরূপ অপ্রত্যাশিত সৌভাগ্য মিলাইয়া দেয়, ---- পথে বাহির হইলেই ঘর-ছাড়া রত্ন কুড়াইয়া পায় |'মলুয়া' গল্পটির মধ্যে রূপকথার লক্ষণ সব্রাপেক্ষা অধিক প্রকট; যে 'মন-পবনের নাও' -এ চড়িয়া নায়িকা নিরুদ্দেশযাত্রা করিয়াছে, তাহা রূপকথার অতল সমুদ্রে পাড়ি দিতেই অভ্যস্ত |
        বাহ্য অভিভবের বাহ্য উপশম আছে; অনুকূল দৈব দুদৈ্বের প্রতিষেধক | কিন্তু আভ্যন্তরীণ সমাজপীড়নের কোনও সুলভ সমাধান নাই | যে সামাজিক সংকীণতা মলুয়ার সুখের পথে শেষ অন্ততরায় হইয়াছে তাহার প্রতিবিধান দৈবেরও ক্ষমতাতীত | কাজীর শূলের ব্যবস্হা হইল, কিন্তু দুবলচিত্ত চান্দদবিনোদ বা তাহার আচারমূঢ় আত্মীয়-স্বজনের জন্য সেরূপ কোনো আশুফলপ্ররদ প্রতিকারের ব্যবস্হা নাই | কারকুনকে নরবলি দিয়া আখ্যায়িকা হইতে বিদায় দেওয়া হইয়াছে, কিন্তু অথ্লোভী আত্মীয়াধম ভাটুক ঠাকুরের আসন সমাজবক্ষে স্হিরতর রহিয়াছে | অত্যাচারী কাজী, দেওয়ান, প্রভৃতি প্রবল প্রতিক্রিয়ার বেগে জ্যা-নিমুক্ত ধনুকের ন্যায় দূরে উৎক্ষিপ্ত হইয়াছে, কিন্তু নেতাই কুটনী, চিকর গোয়ালিনী, প্রভৃতি জীব, যাহারা অপরের লালসার বহ্নিত ইন্ধন যোগাইয়া আসিতেছে ও পারিবারিক জীবনের সুখ-শান্তি-পবিত্রতা নষ্ট করিতেছে, তাহারা চিকিৎসাতীত দুষ্ট ব্রণের ন্যায় সমাজ-দেহে অক্ষয় হইয়া বিরাজ করিতেছে | এই দিক দিয়া বতমান কালের সমাজ-জীবনের সহিত ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকের একটা অক্ষুন্ন যোগসূত্র রহিয়া গিয়াছে |
        এই বাস্তব উপাদানের প্রাচুযে্র জন্যই উপন্যাস-সাহিত্যের অগ্রদূতের মধ্যে ময়মনসিংহ-গীতিকার একটি বিশিষ্ট স্হান আছে | আখ্যায়িকাগুলির মধ্যে তৎকালীন সমাজের যে চিত্র ফুটিয়া উঠিয়াছে তাহা আংশিক হইলেও বাস্তবতার দিক দিয়া একেবারে নিখুঁত | কী প্রকৃতি-বণনা, কী রূপবণনা ও চরিত্রচিত্রণ ---- সব্ত্রই এই অকুন্ঠিত বাস্তবতার চিহ্ন সুপরিস্ফুট | সংস্কৃত-প্রভাবে অনুপ্রাণিত বঙ্গসাহিত্যের ভিতর দিয়া আমরা বঙ্গ-সমাজ ও প্রকৃতির যে চিত্র পাই, তাহা ঠিক খাঁটি জিনিসটি নয়, তাহার মধ্যে দেবভাষার সংশোধন ও পরিমাজ্ন-চেষ্টা যেন বিশেষভাবে প্রকট | সংস্কৃত সাহিত্যের বিশাল শাল্মলীতরু, বা তমালতালীবনরীজিনীলা সমুদ্র-বেলাভূমি, এমন কি বৈষ্ণব সাহিত্যের কেলিকদম্বকুঞ্জ------ইহার কেহই বাংলার বহিঃপ্রকৃতির খাঁটি প্রতীক নহে----ইহাদের মধ্যে একটা ভাবমূলক আদশবাদ নিছক বস্তুতন্ত্রতার চারিদিকে একটি সুষমাময় বেষ্টনী রচনা করিয়াছে | যুগব্যাপী অনুকরণের ফলে এইরূপ প্রকৃতি-বণনা বৈশিষ্ট্যহীন প্রথাবদ্ধতায় দাঁড়াইয়াছে | সেইরূপ মনে হয় যেন পৌরাণিক আদশ্ আমাদের অন্তঃপ্রকৃতিকে প্রভাবান্বিত করিয়া ইহার স্বাধীন, স্বচ্ছন্দলীলাকে এক বিশেষ ছন্দের নিগড়ে নিয়মিত করিয়াছে | কিন্তু বাংলার অন্তর-বাহিরের আসল স্বরূপটি চিনিতে হইলে আমাদিগকে সংস্কৃত-প্রভাব-নিমুক্ত পল্লী-সাহিত্যের দিকে চোখ ফিরাইতে হইবে | আমাদের বহিঃপ্রকৃতির মধ্যে যেমন একটা অসংস্কৃত আরণ্য উগ্রতা, ঘনবিন্যস্ত তরুলতার দুভে্দ্য জটিলতা, খাল-বিল-জলাভূমি-পাব্ত্যযনদীর দুলঙ্ঘ্য বাধাসংকুলতা আছে, সেইরূপ আমাদের অন্তরেও নম্র কমনীয়তা ও ধমা্নুরাগের সহিত একটা দুদমনীয় তেজস্বিতা, দৃপ্ত আত্মসম্মানবোধ ও আবেগের অন্ধ মাদকতা ছিল | আমাদের ধমনীতে যে অনায্ রক্ত প্রবাহিত ছিল, তাহাই আয্ সভ্যতা ও ধম্সংস্কৃতির প্রভাব উল্লঙঘন করিয়া এইরূপ উগ্রভাবে আত্মপ্রকাশ করিয়াছে | 'ময়মনসিংহ- গীতিকা'য় আমরা এই আরণ্য বহিঃপ্রকৃতি ও অন্তঃপ্রকৃতির সাক্ষাৎ পাই, যাহা বঙ্গগসাহিত্যের অন্যত্র সুদুলভ | ইহার নায়িকারা শাস্ত্রের অনুশাসনবাহুল্যের দ্বারা বিড়ম্বিত না হইয়া সতীত্বের আসল মযা্দা ও গৌরব রক্ষা করিয়াছেন, দেশাচার লঙঘন করিয়া নিজ হৃদয়বাণীর অনুবতন করিয়াছেন | ইঁহাদের অন্তরের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ শাস্ত্রানুশীলনের শান্তিবারিসেচনে একেবারে স্তিমিত-নিবা্পিত হইয়া যায় নাই | ইঁহাদের চরিত্রদৃঢ়তা ও দুঃসাহসিকতা ইঁহাদিগকে অসাধারণ-গৌরবমন্ডিত করিয়াছে |

        নায়িকাদের চরিত্র-চিত্ররণের ন্যায় তাহাদের রূপবণনাতেও গতানুগতিকতাহীন বাস্ততবতার নিদশন পাওয়া যায় | যে সমস্ত উপমার সাহায্যে তাহাদের সৌন্দয্ স্পষ্টীকৃত হইয়াছে, সেগুলি সমস্ত সংস্কৃত কাব্য-অলংকার-সাহিত্য হইতে সংগৃহীত নহে; লেখকদের সূক্ষ্ম পযবেক্ষণশক্তি বাংলার প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী হইতে সেগুলির অধিকাংশকে আহরণ করিয়াছে | তাঁহাদের চক্ষুর স্বাভাবিক গতি বাংলার নিজস্ব বহিঃ-প্রকৃতির দিকে; আখ্যায়িকার ফাঁকে ফাঁকে প্রকৃতির এই অপযা্প্ত আরণ্য-সম্পদ উঁকি মারিয়া আমাদের সৌন্দযবোধকে পরিতৃপ্ত করিয়াছে | পূববঙ্গের কথ্য ভাষাও এই বাস্তবতাকে আরও তীব্রতর করিয়াছে----ভাষার তীক্ষ্ণ, অকুন্ঠিত সরলতা গভীর ভাবপ্রকাশকে বেদনামাধুযে্ পূণ্ করিয়াছে | নায়িকাদের শোকোচ্ছ্বাস গ্রাম্য কথ্য ভাষার সংযোগে একেবারে আমাদের মম্স্হল স্পশ্ করে, সাহিত্যিক ভাষার অলংকার-শিঞ্জন হৃদয়-বাণীর অকৃত্তিম সুরীটিকে চাপা দেয় নাই | এই সমস্ত দিক দিয়াই 'ময়মনসিংহ-গীতিকা' উপন্যাস-সাহিত্যের উৎপত্তির সহিত ঘনিষ্ঠ-সম্পকা্ন্বিত | বাংলা দেশের সাহিত্যের আর কোথাও অবিমিশ্র বাস্তবতার এমন তীক্ষ্ণ, তীব্র আত্মপ্রকাশ দেখা যায় না | আখ্যায়িকাগুলির কোথাও কোথাও অতিপ্রাকৃতের স্পশ্ বা দেবকীতি্-প্রচারের প্রয়াস আছে | কিন্তু মোটের উপর যে মনোবৃত্তির প্রাদুভা্ব, তাহা অকৃত্তিম বাস্তবপ্রীতি, তীক্ষ্ণ পযবেক্ষণশক্তি, প্রতিবেশের ও সমাজ আবেষ্টনের নিখুঁত চিত্রাঙ্কন | ভাবপ্রকাশে কথ্য ভাষার প্রয়োগ ইহাদিগকে উপন্যাসের আরও নিকটবতী্ করিয়াছে |পল্লী-সাহিত্যের ধারা যদি আমাদের সাহিত্যে অক্ষুণ্ণ থাকিত, গ্রামের অখ্যাত আবেষ্টন ও অশিক্ষিত গায়কের সংস্পশে্র পরিবতে্ ইহা যদি কেন্দ্রস্হ সাহিত্যের পদমযা্দা লাভ করিত, ভারতচন্দ্রের বিকৃত, কুরুচিপূণ্ প্রভাব যদি আমাদের সাহিত্যিক প্রচেষ্টাকে কৃত্রিম প্রণালীতে প্রবাহিত না করিত, তবে সম্ভবত বঙ্গসাহিত্যে উপন্যাসের জন্মদিন আরও অগ্রবতী্ হইত | উপন্যাস-সাহিত্যের দিক দিয়া 'মনমনসিংহ-গীতিকা'র প্রয়োজনীয়তা সব্যথা স্বীকায্ |

৬. মুসলমানি রোমান্স-আখ্যান, গল্প-সাহিত্য ও নাথ-সাহিত্য


ইংরেজি সাহিত্যের সহিত পরিচয় হইবার পূবে্ বঙ্গসাহিত্য বাস্তবতার পথে কতদূর অগ্রসর হইয়াছিল, ও ভাবী উপন্যাসের আগমনের জন্য আপনাকে কতদূর প্রস্তুত করিয়াছিল, আর একটি বিষয়ের আলোচনা করিয়া তাহার উপসংহার করিব | ইংরেজি সাহিত্যের সম্পকে্ আসিবার পূবে্ বঙ্গসাহিত্য আর একটি বৈদেশিক সাহিত্যের সংস্পশ্ লাভ করিয়াছিল ---তাহা মুসলমান-সাহিত্য | এই মুসলমানি গল্প-সাহিত্যের দুইটি ধারা আছে | প্রথম, সপ্তদশ শতকের শেষাধে্ রচিত আরাকান রাজসভার সাহিত্য, যাহার শেষ্ঠ প্রতিনিধি ছিলেন আলাওল | আর দ্বিতীয় ধারাটি ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগে প্রচলিত আরব্য-পারস্য রোমান্সের কাহিনীসম্ভারের বঙ্গানুবাদপুষ্ট |
     আরাকান রাজসভায় বণি্ত মুসলমানি গাথা-সাহিত্য সপ্তদশ শতকের বাংলা সাহিত্যে এক অভিনব সংযোজন | এই মুসলমান কবিগোষ্ঠী ভাষারীতি ও উপমা প্রোয়োগের দিক দিয়া সংস্কৃতানুসারী প্রাচীন কাব্যধারার অবুবত্যন করিলেও ধম্যপ্রভাবমুক্ত প্রণয়-কাহি নীর প্রবতনে ইঁহারা নূতন বিষয়বস্তু ও আখ্যানভঙ্গির বৈচিত্র্য সৃষ্টি করিয়াছেন | বলিতে গেলে প্রণয়-রোমান্সের বণবৈভব ও চমকপ্রদ সংঘটন ইঁহারাই প্রথম বাংলা কাব্যে আনিয়াছেন | মঙ্গলকাব্যের ধম্যনিয়ন্ত্রিত পরিবার ও সমাজ-জীবন চিত্রের একঘেয়েমির সঙ্গে তুলনায় এই আখ্যানসমূহে স্বাদের অভিনবত্ব ও ঐহ্যিক জীবনের দৈবপ্রভাবহীন স্বাধীন আবেদন অনুভব করা যায় | ইহারা সমকালীন জীবনের বাস্তব চিত্র কি না সে বিষয়ে সন্দেহ আছে; ইহাদের মধ্যে কবিদের ধম্প্রধান অলৌকিকতা হইতে রোমান্সসুলভ বিস্ময়রসের দিকে মোড় ফেরার নিদশন মিলে | বরং মঙ্গলকাব্যে ঐহিক ও পারলৌকিক জীবন পাশাপাশি সন্নিবিষ্ট আছে; দেবজগতের প্রবল আকষণে মানবিক জীবন-কথা নিজ স্বাভাবিক কক্ষচ্যুত হইয়া ভিন্ন পথে পরিক্রমণ করিয়াছে | কিন্তু এই কক্ষ-পরিবতনের কথা বাদ দিলে মঙ্গলকাব্যের লৌকিক জীবন যে বাস্তবচিহ্নাঙ্কিত, সমাজের সত্য প্রতিচ্ছবি তাহা নিঃসন্দেহ | মুসলমানি কাব্য-কাহিনীতে সাম্প্রদায়িক হিন্দুধমে্র পরিবতে্ আছে সুফি মতবাদের প্রভাব ও ছদ্মবেশী রূপকাভিপ্রায়; ও ইহার ঘটনাবলীও প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিবিম্ব নহে, জীবনোদ্ভূত এক উচ্ছতর আদশ্-কল্পনার সুকুমারভাবরঞ্জিত ও অসাধারণত্বের স্পশদীপ্ত | তথাপি মোগল যুগের রাজসভা-সংশ্লিষ্ট জীবনযাত্রায় পরিবতনের দ্রুত-আবতি্ত ছন্দ, আমিরি ও ফকিরির মধ্য্ অস্থিরভাবে আন্দোলিত ভাগ্য-বিপয্য়, দুঃসাহসিক প্রেরণার স্পধি্ত আবেগ একটি বাস্তব জীবনসত্যরূপে সক্রিয় ছিল | আলাওল-প্রমুখ কবি এই ছন্দীটিকে তাঁহাদের কাব্যে বিধৃত করিয়া জীবনের একটা উপেক্ষিত অধ্যায়কে প্রকাশ করিয়া়ছেন ও উপন্যাসের বস্তুরপ্রধান অংশের সহিত তাঁহাদের কাব্যে বিধৃত করিয়া জীবনের একটা উপেক্ষিত অধ্যায়কে প্রকাশ করিয়াছেন ও উপন্যাসের বস্তুরপ্রধান অংশের সহিত তাঁহাদের তাঁহাদের ঘনিষ্ঠ যোগ না থাকিলেও উহার রোমান্স-প্রবণতার একটি বাস্তব ভিত্তি যোগাইয়াছেন | 'পদ্মাবতী', 'সিকন্দরনামা', 'সপ্তপয়কর' প্রভৃতি কাব্যের সহিত রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনী-কাব্য ও কমেশচন্দ্র দত্তের ঐতিহাসিক উপন্যাসাবসীর একটা যোগসূত্র আবিষ্কার করা কঠিন নহে |
     আলাওল -প্রমুখ মুসলমান কবির কাব্যের রচনাগত উৎকষ্ ও আস্বাদান-বৈচিত্র্য সত্ত্বেও ইহা সমকালীন কাব্যধারা ও সাহিত্য-রুচির উপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করিতে পারে নাই | মধ্যযুগে কবিতার প্রধান আবেদন ছিল প্রথানুগত্যে ও ধম্যবিশ্বাস-উদ্দীপনে; বিশুদ্ধ কাব্যসৌন্দয্ গৌণভাবে আদরণীয় ছিল | সুতরাং ঐতিহ্যধারার সহিত সংযুক্ত থাকাই কবির পক্ষে সবা্পেক্ষা প্রয়োজনীয় বিবেচিত হইত | মাল্যগ্রন্থিচ্যুত স্বতন্ত্র ফুলের সৌরভের প্রতি বিশেষ কোনো মূল্য দেওয়া হইত না | সেইজন্য মৌলিক প্রতিভার পরিচয় দেওয়া অপেক্ষা জনরুচিতে সুপ্রতিষ্ঠিত কোনো কাব্যধারার অন্তভুক্ত হওয়াই কবি-সমাজের বিশেষ কাম্য ছিল| দল-ছাড়া একক কবি বিশেষ স্বীকৃতি পাইতেন না | আরাকান রাজসভায় রচিত মুসলমানি কাব্যগুচ্ছ সংস্কৃত রচনারীতির ও হিন্দু পুরাণ হইতে সংকলিত উপমা উল্লেখ প্রভৃতির ব্যাপক ও নিপুণ অনুসরণ সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠিত কাব্যধারা হইতে বিচ্ছিন্ন থাকার ফলে সাহিত্যিক প্রভাব ও জনসাধারণের,